আমাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্প

তানভীর এর ছবি
লিখেছেন তানভীর (তারিখ: রবি, ০৪/০৩/২০১২ - ১:৫৬অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাহাজ ভাঙাকে শিল্প বলা হয়, যদিও ভাঙচুর ব্যাপারটাকে আদৌ শিল্প বলা যায় কিনা আমি নিশ্চিত নই। পৃথিবীতে পাকিস্তান, ভারত (শুধু গুজরাট), চীন, বাংলাদেশ এরকম হাতে গোণা কয়েকটি দেশে শুধু জাহাজ ভাঙা হয়। পরিবেশ দূষণের কারণে উন্নত বিশ্বসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই জাহাজ ভাঙা নিষিদ্ধ। চীন অবশ্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আবদ্ধ প্রক্রিয়ায় জাহাজ ভাঙে। আর আমরা ভাঙি খোলা সমুদ্র সৈকতে হাতুড়ি, ছেনি দিয়ে প্রাগৈতিহাসিক উপায়ে। আমাদেরকে তাই বলা যায় পৃথিবীর 'ভাগাড়’ এবং এতে যে আমরা লজ্জিত নই তার প্রমাণ হলো এই ভাঙা জাহাজের ব্যবসাকে আমরা আদর করে ডাকি ‘শিল্প’ বলে। যাক, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। ভাঙাভাঙি থাক, আজ হোক নির্মাণের গল্প।

সম্প্রতি বাংলাদেশে যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে তার একটি হলো আমরা জাহাজ-ভাঙা ‘শিল্প’ থেকে জাহাজ-নির্মাণ শিল্পের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছি। আমাদের শিপ ইয়ার্ডে নির্মিত জাহাজ কিছুদিন আগে ইউরোপে রপ্তানী করা হয়েছে। আমাদের জন্য এটা খুবই আনন্দের সংবাদ। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের বৃত্ত থেকে বের হতে হলে শিল্পায়নের দিকে নজর দেয়া জরুরী এবং এর মধ্যে যে কয়েকটি সেক্টর প্রচুর সম্ভাবনাময় তার মধ্যে আমার ধারণা ‘জাহাজ নির্মাণ শিল্প’ তালিকার ওপরে রাখা উচিত।

জাহাজ নির্মাণের ইতিহাস এদেশে কিন্তু নতুন নয়। প্রাচীনকালে চট্টগ্রাম সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের জন্য বিখ্যাত ছিলো। ঔপনিবেশিক আমলেও ব্রিটিশ বিভিন্ন রণতরী এখানে নির্মিত হতো। কিন্তু তারপর বঙ্গোপসাগরে অনেক জল গড়িয়েছে। জাহাজ নির্মাতা থেকে কালে কালে আমরা হয়েছি জাহাজ ভাঙার দুর্বৃত্ত। সম্প্রতি বিশ্বের জাহাজ চলাচলে কিছু আইনগত পরিবর্তনের ফলে আমাদের হৃত গৌরব পুনরূদ্ধার করার সুযোগ এসেছে। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন কিছুদিন আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এখন থেকে কোনো জাহাজ ২৫ বছরের বেশি আর চলাচল করতে পারবে না এবং যেসব জাহাজের বয়স ২৫ হয়ে গিয়েছে তাদের অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। এর ফলে সারা বিশ্বজুড়ে নতুন জাহাজ নির্মাণের চাহিদা বেড়ে গেছে। জাহাজ ভাঙার মতো জাহাজ নির্মাণেও তেমন বেশি দেশ জড়িত নয়। আইএমওর সিদ্ধান্তের ফলে যে সব দেশ এতদিন জাহাজ বানাত তারা এত বেশি জাহাজ নির্মাণের অর্ডার পেয়েছে যে আগামী ৫ বছর তারা আর কোনো নতুন অর্ডার নিতে পারছে না। ফলে জাহাজ নির্মাতারা বাধ্য হয়ে এখন বাংলাদেশসহ অন্য ছোটো দেশগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছে। এটা আমার ধারণা আমাদের দেশের জন্য একটা বিশাল সুযোগ। আমি একটা হিসাব দেখেছি যে জাহাজ নির্মাণের চাহিদা এখন এতই ব্যাপক, যারা এতদিন জাহাজ বানাত তাদের কেবল এর শতকরা ৭৫ ভাগ চাহিদার যোগান দেয়ার সামর্থ্য আছে, বাকি ২৫ ভাগ চাহিদা পূরণের জন্য নির্মাতাদের বাংলাদেশের মতো দেশ যারা এতদিন আভ্যন্তরীণ নৌচলাচলের জন্য কিছু জাহাজ বানাত, তাদের ওপর নির্ভর করতে হবে। এই ২৫ ভাগের মার্কেট কম বড় নয় কিন্তু।

তাছাড়া ছোট মার্কেটে যদি সুনামের সাথে ব্যবসা করে যেতে পারে, তবে এক সময় বড় মার্কেটেও প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে। দঃ কোরিয়া একসময় এভাবেই উঠে এসেছে। জাপানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কোরিয়ার অবস্থা ছিলো আমাদের মতো হতদরিদ্র। দঃ কোরিয়া যে কয়টি শিল্পের মাধ্যমে আজ উন্নত বিশ্বের কাতারে উঠে এসেছে তার মধ্যে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এ সেক্টর থেকে তারা বাংলাদেশের বাজেটের (নাকি মোট রপ্তানী আয়ের?) তিন গুণের বেশি অর্থ আয় করে। বাংলাদেশ এখন জাহাজ নির্মাণের যে অর্ডারগুলো পাচ্ছে তা মূলত কন্টেইনার জাতীয় জাহাজের। আমাদের সস্তা শ্রম, বিশাল সমুদ্র ও নৌ বন্দরগুলির কারণে নির্মাতারাও এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী। কিন্তু আমাদের খেয়াল রাখা উচিত এটা যেন গার্মেন্টসের মতো শুধু শ্রমদায়ী শিল্পে পরিণত না হয়ে যায়। কোরিয়াও একসময় জাহাজ নির্মাণে শুধু সস্তা শ্রম দিত। তাদের জাহাজের ডিজাইন করে দিতো জার্মান এঞ্জিনিয়াররা। এখন কোরিয়ার উল্লেখযোগ্য অর্থই আসে হাই-টেক জাহাজ নির্মাণের মাধ্যমে।

জাহাজ নির্মাণে দঃ কোরিয়ার সাফল্য এসেছে শিক্ষার প্রসার ও সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে। বাংলাদেশে প্রকৌশল শিক্ষার সুযোগ এমনিই সীমিত, নৌ-প্রকৌশলের অবস্থা যে করূণ তা বলাই বাহুল্য। বুয়েটের নেভাল আর্কিটেকচার ও মেরিন এঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ছাড়া আর কোথাও জাহাজ নির্মাণবিদ্যা শেখানো হয় কিনা জানি না (মেরিন একাডেমি?)। এ বিভাগে দেখলাম সম্প্রতি ছাত্র সংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ জন করা হয়েছে। তবে বুয়েট ছাড়াও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন এই বিভাগ খোলার সময় এসেছে। প্রয়োজনে জাহাজ নির্মাণ হাতে-কলমে শেখার সুযোগ-সুবিধাসহ (ফিজিকাল ফেসিলিটিজ) আলাদা ইন্সটিটিউট গড়ে তোলাও জরুরী। এছাড়া হাই-টেক জাহাজ বলতে যেটা বুঝলাম এখানে কম্পিউটার/ইলেক্ট্রনিক্সের ব্যবহার সাধারণ মালবাহী জাহাজ থেকে অনেক বেশি ও জটিল। নৌ-প্রকৌশলের পাশাপাশি তাই কম্পিউটার/ইলেক্ট্রনিক্স বিভাগুলোও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারে। জাহাজ নির্মাণের লিংকেজ শিল্প (যেমন জাহাজের আসবাবপত্র যোগানশিল্প) হিসেবেও আরো অনেক শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রচুর।

তবে এ শিল্প সুষ্ঠুভাবে গড়ে ওঠার জন্য নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশ সরকার দেখলাম ইতিমধ্যে জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে (এ ঘোষণা দিলে কী হয় জানি না, হয়ত বুয়েট এজন্যই ছাত্রসংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ জন করেছে, এর বাইরে আর কিছু চোখে পড়ে নি)। পার্ক চুং-হি কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হবার পর সে দেশের একজন জাহাজ-নির্মাণ বিশেষজ্ঞকে এ শিল্প বিকাশের রোড ম্যাপ প্রস্তুত করে দিতে বলেছিলেন যার ওপর ভিত্তি করে আজকের দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাণ শিল্প দাঁড়িয়ে আছে। রোড ম্যাপ প্রস্তুতের জন্য আমাদের জাহাজ নির্মাণ বিশেষজ্ঞের কোনো অভাব আছে বলে মনে হয় না, দরকার শুধু একজন পার্ক চুং-হির।


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

আমাদের সময় কিন্তু এনএএমইতে সিট ছিলো দশখানা, মনে আছে?

সস্তা শ্রমের পাশাপাশি আমাদের রিসোর্সও কিন্তু পানির দরে শিল্পে যোগানো হয়। পোশাক শিল্পে যে শুধু জলের দরে গ্যাস বিদ্যুৎ পানি সরবরাহ করা হয়, তা-ই নয়, সেখানে গ্যাস চুরিরও প্রচ্ছন্ন সুযোগ রাখা আছে। পোশাক শিল্প মালিকরা তাদের হামার আর বিএমডব্লিউ গাড়ি থেকে নেমে জায়গায় বেজায়গায় ভেউ ভেউ কানতে কানতে বলে সারা বিশ্বে মন্দা, তাদের দুটো খেয়ে পরে বাঁচতে হলে এখন অমুক কর তুলে দিতে হবে, তমুক শুল্ক তুলে দিতে হবে, অমুক জিনিসের দাম কমিয়ে সরবরাহ করতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার শুনি এই শিল্প নাকি নানারকম কর অবকাশের সুবিধাও পায়। জাহাজ নির্মাণ শিল্পও কি এরকম আরেকটা কর-আহ্লাদ োদানোর জায়গায় পরিণত হবে?

তানভীর এর ছবি

হ। আমিও জানতাম এতদিন ১০টা। খুঁজতে গিয়ে দেখলাম এর মধ্যে ৫৫টা হয়ে গেছে।

নিঃসঙ্গ পৃথিবী এর ছবি

হ্যাঁ, গত বছর পর্যন্ত ৩০ খানা ছিল। এ বছর বাড়িয়ে ৫৫ সিট করা হয়েছে।

অদ্রোহ এর ছবি

কদিন আগে আরো একটা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের উদ্বোধন হয়ে গেল, এটাকে অবশ্য সবচেয়ে বড় বলেই দাবি করা হচ্ছে। নৌ প্রকৌশল হালে বেশ চাহিদাসম্পন্ন একটা বিষয়, তাই স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি করাটা সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে জাহাজ নির্মাণ শিল্প প্রসারে শুধু নৌ পরিবহন প্রকৌশলে ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়ে ফায়দা হবেনা, এর সাথে বিনিয়োগের সুবিধার পাশাপাশি অবকাঠামোগত গুণগত মানোন্ন্যনেও জোর দিতে হবে।

--------------------------------------------
যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি-বাড়ি যায়
তথাপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়।

তানভীর এর ছবি

হ্যাঁ ঠিক। বুয়েটের এঞ্জিনিয়ার মানে তো এমনিতে মুখস্থবিদ্যার এঞ্জিনিয়ার, শুধু সংখ্যায় বাড়ায়ে তেমন লাভ নাই। কোরিয়া থেকে মেরিন এঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রফেসর নাকি বুয়েটের নৌ প্রকৌশল বিভাগ দেখে অবাক হয়েছে যে এখানে জাহাজ নির্মাণ হাতে-কলমে শেখা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নাই। ব্যাটা যদি ভিত্রের খবর জানত! খাইছে

আর বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত মানোন্নোয়ন- এসব তো রাষ্ট্র/সরকারের ওপর নির্ভর করে।

রাজিব মোস্তাফিজ এর ছবি

চলুক
ভালো লাগল লেখাটি। সত্যিকার একটি শিল্প হিসেবেই জাহাজ নির্মাণ শিল্প গড়ে উঠুক। আমাদের বর্তমান নেতৃত্বই পার্ক চুং-হির মত দূরদর্শী হয়ে উঠুক এই কামনা করি আর সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে এরই মাঝে এটাকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে ঘোষণা করার জন্য সাধুবাদ জানাই!

----------------------------------------------------------------------------
একশজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।তাই কখনো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না--চেষ্টা করতে হয় খাঁটি হওয়ার!!

তানভীর এর ছবি

চলুক

নীড় সন্ধানী এর ছবি

পৃথিবীতে জাহাজ নির্মান শিল্পের পুরোধা তিনটা দেশ
১। কোরিয়া
২। চীন
৩। জাপান

বাকীদের চেয়ে কোরিয়া অনেকদূর এগিয়ে। বিশ্ববাজারে তাদের শেয়ার ৫৩% এর মতো। কোরিয়াকে ধরার মতো আপাতত কেউ নেই। কোরিয়ার কথা ভাবলে লোভই জাগে। ওদের Hyundai প্রতি চারদিনে একটা করে ৮০ মিলিয়ন ডলারের জাহাজ সাগরে ভাসায়। ভাবা যায়? কোরিয়ার মতো দেশগুলোই বাংলাদেশের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। ওরা এখন সাধারণ জাহাজ বানানো ছেড়ে দিয়ে হাইটেক জাহাজ বানায়। আমেরিকার জন্য যুদ্ধজাহাজ, বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইত্যাদির কাজ করে। ফলে সাধারণ মালবাহী জাহাজের অর্ডার বাংলাদেশের জন্য সুযোগ বয়ে আনছে। এই সুযোগ কি আমরা কাজে লাগাতে পারবো?

পারতাম যদি সরকার কেবল থ্রাষ্ট সেক্টর ঘোষনা না করে অবকাঠামোগত কাজের জন্য বাজেট ঘোষনা করতো। বিমানবন্দরের জন্য পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা বাজেট না করে জাহাজ নির্মান শিল্পের অবকাঠামোতে খরচ করলে বাংলাদেশ বছরে একটা বিমানবন্দর তৈরীর মতো টাকা কামাতে পারবে বিশ্ববাজার থেকে। কিন্তু এখনো সেরকম কোন লক্ষণ নেই। ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ আছে ব্যাপারটা। আগামী বিশ বছর বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনার সময়। কেবল গার্মেন্টসে থেমে থাকলে আমরা বেশীদূর যাবো না। জাহাজ নির্মান বিষয়ক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরী।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

হিমু এর ছবি

জাহাজ নির্মাণ শিল্পেরও কিছু গোমর আছে বস। কনট্র্যাক্ট স্পেসিফিকেশন পড়লে দেখবেন সেখানে প্রায় সব যন্ত্রপাতিই আনতে হয় বিদেশ থেকে। আমাদের দেশে মূলত জাহাজটাকে সংযোজন করা হবে। আমরা ভ্যালু অ্যাডিশন করতে পারবো সংযোজন পর্যায়েই। প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা যেমন আসবে, তার সিংহভাগ কিন্তু বেরিয়েও যাবে। এখন এই শিল্পে যদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তাহলে নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে এই শিল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রাজস্বসংস্থানও করবে।

বাংলাদেশের উচিত কারিগরি খাতে দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলা। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় দক্ষ ওয়েল্ডারের। ওয়েল্ডিং এমনই এক স্কিল যে সারা জীবন পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় কাজে লাগে। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়েল্ডারদের বাজার কিন্তু দখল করে রেখেছে ভারতীয় আর পাকিস্তানীরা। আর আমরা সেখানে একেবারে কাঁচা গায়ে খাটা শ্রমিকদের পাঠানোর জন্য ক্ষেপে উঠি। কেন?

জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে থ্রাস্ট সেক্টর ঘোষণা করে বসে থাকলেই হবে না, এই সেক্টরে দক্ষ শ্রমিক যোগানোর জন্যে তাদের প্রশিক্ষণ অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে, প্রয়োজনে শিল্পকে সেই অবকাঠামোতে বাধ্যতামূলক ইনপুট যোগানোর বিধান রেখে। কর অবকাশ পেতে চাও, খুব ভালো কথা, অমুক জায়গায় পাবলিককে বিনামূল্যে ওয়েল্ডিঙের ট্রেনিং দাও বছরের এতদিন। খালি মাগনা খেয়ে যাবা আর আন্ডার ইনভয়েসিং ওভার ইনভয়েসিং করে পয়সা বিদেশে জমাবা সেইটা চলবে না।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

একমত। দক্ষ শ্রমিক তৈরীও যে একটা শিল্প এটা বোঝার শক্তি এখনো কোন সরকার পেল না। জনশক্তি দপ্তর কেবল আদম রপ্তানীর সার্টিফিকেট দিয়েই খালাস। এই শ্রমিককে দক্ষ করে রপ্তানী করলে ১০ বিলিয়নের বদলে ২০ বিলিয়ন রেমিটেন্স আসতো সেটা না বোঝার কারণ কি। আসলে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে মাথাব্যথাই নেই।

জাহাজশিল্প গড়ে ওঠার আগে এই ব্যাপারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো স্টীল মিল নির্মান। আমরা তো চালাতে পারছি না বলে স্টীলমিলকে স্ক্র্যাপ করে বিক্রি করে দিয়েছি। অথচ যে কোন ভারী শিল্প গড়ে ওঠার প্রধান শর্ত হলো স্টীল মিল। আজকের কোরিয়াকে গড়েছে পোসকো স্টীল, জাপানকে গড়ার পেছনে কোবে স্টীল। প্রত্যেকটা দেশেই এমন। এই শর্ত পূরন না করে থ্রাস্ট সেক্টর ঘোষনা করে বসে থাকলে ঘোড়ায় ডিম পাড়তেই থাকবে।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

হিমু এর ছবি

জনশক্তি রপ্তানি খাতে প্রচুর ইনফরমেশন ব্যারিয়ার তৈরি করা থাকে, যেটা আদমব্যাপারী ছাড়া আর কারো পকেট ভারি করে না। মালদ্বীপের কথাই ধরুন। সেখানে চাহিদার পাঁচগুণ শ্রমিক গিয়ে বসে আছে। ফলে সেখানে শ্রমের বাজারে শ্রমের মূল্য প্লামেট করেছে। যে আদমব্যাপারীরা সেখানে লোক পাঠিয়েছে, তাদের লাভ কিন্তু ঠিকই হচ্ছে। এসব ব্যাপারে রেগুলেটরি ভূমিকা পালনের কথা দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলরের। তারা কী বাল ফ্যালে সেটা তারাই ভালো জানে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রেখে শ্রমের বাজার টিকিয়ে রাখার এবং নতুন খাত উন্মোচনের বদলে এই গোটা খাতই আদমব্যাপারীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে বলে সাদাচোখে মনে হয়। আর নীতি নির্ধারণে প্রবাসী শ্রমিকদের কি কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ রেখেছে সরকার? তাদের কী সমস্যা, সেটা কোনো ফোরামেই তাদের মুখ থেকে শুনতে পাই না আমরা। দেশের ভিতরে আর প্রবাসে, দুই জায়গাতেই নানা মধ্যস্বত্বভোগীরা এদের ভোগ করে যাচ্ছে। আমাদের রেমিট্যান্স চতুর্গুণিত হতে পারতো এই চতুর দালালদের হাত থেকে নিস্তার পেলে।

নীড় সন্ধানী এর ছবি

আদম বেপারীরা যে কি পরিমান বেপরোয়া আমি গতবছর ভুটান গিয়ে শুনেছি। অবাক হবেন শুনলে ওখানেও বাংলাদেশী শ্রমিকের চাহিদা আছে। ফলে কিছু ফাজিল আদমবেপারী মধ্যপ্রাচ্য নেবার কথা বলে লেবারদের নিয়ে গেছে ভুটান, যারা গেছে তারাও ঠকেছে আর যাদের জন্য নিয়ে গেছে তাদের কাছেও বাংলাদেশের সুনামের বারোটা বেজেছে। এইসব ফাউল আদম বেপারীকে সামলানোর দায়িত্ব যাদের, তাদের কোন নিয়ন্ত্রনই নেই।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

তানভীর এর ছবি

মূল্যবান তথ্য সংযোজনের জন্য অনেক ধন্যবাদ নীড়সন্ধানী। কোরিয়াও শুরুতে শুধু মালবাহী জাহাজ বানাত। ওখানে হাত পাকিয়ে তারা হাই টেকের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। আমাদের যদি এ সেক্টরের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা না থাকে, তবে মাঝে মাঝে অমন একটা-দুটো উচ্ছিষ্ট মালবাহী জাহাজের অর্ডার পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

ভালো লাগল লেখাটি।
বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্প বিকশিত হোক। আমাদের শিপ ইয়ার্ডে নির্মিত জাহাজ ইউরোপে রপ্তানী করা হচ্ছে, এটি নি:সন্দেহে সুসংবাদ।
আশা করি আমাদের দেশের নেতৃত্ব পার্ক চুং হি-এর মত জাহাজ নির্মান শিল্প বিকাশে বলিষ্ট উদ্যোগ নিবে।

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

আনন্দ  এর ছবি

খুবই আগ্রহ নিয়ে লেখাটি পড়ছি | আরো একটু বিস্তারিত হলে মজা পাইতাম| বুএট এর অতি ক্ষুদ্র নৌ স্থাপত্য বিভাগের বেশিরভাগ দেশের বাইরে| জাহাজ নির্মান একটি মহাযজ্ঞ | দক্ষ শ্রমিক থেকে সুরু করে হায়দ্রদিনামিকস বিশেষজ্ঞ , সবই দরকার | অনেকটা গার্মেন্টস এর মত হলেও , বেশ খানিকটা আলাদা | এই বিষয়ে সচল এ আরো লেখা চাই |

তানভীর এর ছবি

আমি আদার বেপারী, তাই ছোট করে একটু জাহাজের খবর নিলাম। খাইছে
এ পেশা/শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কারো কাছ থেকে আমিও বিস্তারিত পোস্ট আশা করছি।

এমকেউ এর ছবি

এদেশে কিন্তু জাহাজ ডিজাইনের আউটসোর্সিং ফার্মও আছে বেশ কয়েকটা।

তানভীর এর ছবি

জাহাজ ডিজাইনের ফার্মগুলো নিয়ে পোস্ট দিন না একটা। আমরাও কিছু জানি এ বিষয়ে। এখানে শামসুল আলম সাহেবের 'মেরিন হাউজ' নামের ডিজাইন ফার্ম সম্পর্কে একটা লেখা পেলাম।

মাহবুব রানা এর ছবি

চলুক

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

চলুক

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

সুহান রিজওয়ান এর ছবি

আপনি একেকটা নতুন নতুন বিষয়ের দিকে মনোযোগ টানেন, মজা লাগে। হাসি

জাহাজনির্মাণ শিল্পের পরিবেশগত কিছু প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটা আলোচনা কোন পত্রিকায় পড়েছিলাম। থ্রাস্ট ফ্যাকটর- করবার আগে আশা করি সেদিকে কর্তৃপক্ষ খেয়াল রেখেছেন।

_________________________________________

সেরিওজার গল্প

তানভীর এর ছবি
আপনার নাম এর ছবি

ইনজিণিয়ারদের বেতন নাই। পাশ করে কয় জন দেশে থাকে খবর নিয়েন। মেধার যেখানে দাম নেই , সেটা ঠেলা গাড়ির মতই আগাবে।

তানভীর এর ছবি

মন খারাপ

নুভান এর ছবি

দঃ কোরিয়ার অন্যতম বৃহৎ জাহাজ নির্মান প্রতিষ্ঠান ডিএসএমই (দাইয়ু শিপিং এন্ড মেরিন ইঞ্জঃ)-এ এক মাস থাকবার সৌভাগ্য হয়েছিলো। কোরিয়াতে মাস্টার্স করার সময় একটা প্রজেক্টের কাজে ওখানে গিয়েছিলাম, জায়গাটা একটা দ্বীপ (গোজে আইল্যান্ড বলে)। বাংলাদেশে বড় পরিসরে জাহাজ নির্মান প্রতিষ্ঠান করতে চাইলে প্রথমত দরকার এমন একটা দ্বীপ বা সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা। সেক্ষেত্রে মহেশখালি/হাতিয়া অথবা লোহাখোর বলে পরিচিত সীতাকুন্ডে বসাতে পারে। বেসরকারী বিনিয়োগ এক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অবিরত শক্তির জোগান। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ভারী শিল্পে খুব বেশী দক্ষ হয়ে ওঠেনি আর এ শিল্পে কাজ করার মতন লোকবলেরও অভাব আছে (হিমু ভাই যেমনটা বললেন - ওয়েল্ডারের কথা)। আশা করা যায় আমরা অচীরেই জাহাজ ভাঙ্গা থেকে জাহাজ গড়া শিল্পের দিকে মনোযোগ দিতে পারবো।

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-
জাহাজ ভাঙা 'শিল্পের' কারণে সীতাকুণ্ডের পরিবেশ এমনিতে দুর্বিসহ, ওখানে আর কিছু না হওয়াই ভালো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

১। এনএএমই থেকে পাশ করা আমার একজন সাবেক সহপাঠী নিজেই জাহাজের ডিজাইন, নির্মাণ, সুপারভিশন ইত্যাদি বিষয়ে প্রফেশনাল সার্ভিস দিয়ে থাকেন। তাঁর মতো আরো কয়েকজন আছেন যারা বুয়েটের এনএএমই থেকে পাশ করে এমন কাজ করছেন। জাহাজ বানিয়ে রফতানী করছেন এমন সিনিয়রের কথাও জানি।

২। মেরিন ইনস্টিটিউট থেকে পাশ করা আত্মীয়স্থানীয় এক ভদ্রলোককে জানি যিনি অনেক বছর ধরে নিজেই জাহাজ বানিয়ে বিক্রি করছেন। বাংলাদেশে কার্গো ব্যবসা যারা করেন তাদের ৯০%-এর বেশি জাহাজ দেশে তৈরি। এমনকি গভীর সমূদ্রে মাছ ধরার জাহাজও দেশে তৈরি হচ্ছে। তবে স্বাভাবিকভাবেই এগুলোর মূল যন্ত্রপাতি বাইরে থেকে আনানো।

৩। জাহাজ নির্মাণের ব্যাপারটাকে আমি পজিটিভলিই দেখতে চাই। কোট-টাই পরে দাদাদের মুড়ি, চানাচুর, সাবান বিক্রি করার চেয়ে অনেক ভালো তো বটেই।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

তানভীর এর ছবি

পত্রিকা অনুসারে বাংলাদেশ ২০০৮ সালে প্রথম বিদেশে জাহাজ রপ্তানী করেছে। যাদের কথা বলছেন ওনারা হয়তো আগে থেকে আভ্যন্তরীণ নৌচলাচলের জন্য নির্মিত জাহাজ ডিজাইনের সাথে জড়িত।

জাহাজ নির্মাণ তো অবশ্যই পজিটিভ একটা ব্যাপার। আমার ধারণা, সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকলে এ শিল্পকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

shafi.m এর ছবি

চলুক আশার আলো।

শাফি।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA