হেমিংওয়ের শেষ ফুটো পয়সা

তারেক অণু এর ছবি
লিখেছেন তারেক অণু (তারিখ: মঙ্গল, ২৭/০৭/২০২১ - ১২:০৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সে এক বিশাল ইতিহাস, বিশ্ব জুড়ে প্রবল জনপ্রিয় লেখক আর্নেষ্ট হেমিংওয়ে তখন ফ্লোরিডার ‘কী ওয়েস্টে’ তাঁর ২য় স্ত্রী Pauline Pfeiffer এর সাথে ছিলেন। এবং যে চমৎকার বাড়িতে প্রায় ১০ বছর তারা ছিলেন, যা এখন হেমিওংয়ে জাদুঘর হিসেবে বিখ্যাত, তা মূলত ছিল পাওলিনের ধনবান চাচার বাড়ি। সেই আংকেল গাস আবার ভাতিজির জামাই বিদ্যান হেমিংওয়েকে খুব পছন্দ করতেন, এমনকি তাদের নিয়ে আফ্রিকা ভ্রমণে সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেছিলেন, যা এই আমলের হিসেবে প্রায় আধা মিলিয়ন ডলার( যে ভ্রমণ নিয়ে হেমিংওয়ে Green hills of Africa লিখেছিলেন)।
সে যাক, বিয়ের প্রায় এক যুগ পার হয়ে গেছে, হেমিংওয়ে গোপনে চুটিয়ে প্রেম করছেন বিখ্যাত সাংবাদিক মার্থা গেলহর্নের সাথে ( পরবর্তীতে উনার ৩য় স্ত্রী), এইসব আঁচ পেয়ে পাওলিন হেমিংওয়ের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ান, এবং বুঝতে পারেন যে এক পর্যায়ে আসলেই স্বামী আর তাঁর সাথে থাকবেন না, সেই তাল কেটে গেছে সংসারের।

তো সেই প্রাসাদপম বাড়ীর বাগানের এক কোণে হেমিংওয়ে তাঁর বক্সিং চর্চার রিং বানিয়ে ছিলেন ( আপনাদের জানার কথা কৈশোর থেকে মুষ্টিযুদ্ধের প্রতি তাঁর ব্যপক দুর্বলতা ছিল, এবং রিং-এ ঘুষি খেয়ে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াতেই তিনি ১০ বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে নাম লেখা না পেরেই অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে যোগদান করেন), আর পাওলিন সেখানে অনেক দিন ধরেই একটা সুইমিংপুল করতে চাচ্ছিলেন। এক ভ্রমণে যেখন হেমিংওয়ে বাহিরে তখন পাওলিন সেই রিং সরিয়ে ফেলে সেখানে বেশ বড় এক সুইমিংপুল খনন করেন, যা আজ অবধি কী-ওয়েস্টের সবচেয়ে বড় সুইমিংপুল, এবং যা খননে এবং পানি ভরে রাখতে এই আমলের হিসেবে লক্ষ ডলার খরচ হয়েছিল। উল্লেখ্য এই পুলের পাশেই হেমিংওয়ে পেশাবখানা বানিয়েছিলেন যা এখনো আছে, কেবল ব্যবহৃত নয় আর কী!

তো বাড়ি ফিরে শখের বক্সিং রিং এর জায়গায় এই টলটলে পুল দেখে তো হেমিংওয়ে চরম মন খারাপ করে উত্তেজিত অবস্থায় ঝগড়া শুরু করেন। এবং পরে স্থানীয় পানশালা থেকে মাতাল অবস্থায় বাসায় ফিরে ঝগড়া অব্যাহত রাখেন, পাওলিন তখন সুন্দর করে সরাসরি বলেন যে এটা তাঁর চাচার বাড়ি, মানে তারই বাড়ি ভবিষ্যতে, এবং তাঁর যা ভালো হয়েছে তাইই করেছেন।

হেমিংওয়ে মুষড়ে পরে বলেন কিন্তু এর পিছনে কী বিপুল ব্যয় হবে সেটা ভেবে দেখছ? এমনিতেই আমার কাছে কোন টাকা নেই, এই বলে তাঁর ট্রাওজারের পকেট হাতড়ে একটিই পয়সা পান ( সম্ভবত ২৫ পয়সা) , সেটি তিনি পাওলিনের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলেন, এত কিছু নিয়েছ, এইটাও নাও, এই আমার শেষ পয়সা, আমি হেমিংওয়ে এখন সর্বস্বান্ত!

পাওলিন এই পয়সাটা লুফে নিয়ে বাগানের এক কোণে মাটির নিচে রেখেছিলেন, এবং তাদের ডিভোর্সের পরে যখনই কেউ সেই বাড়ি দেখতে আসত, উনি সেই পয়সা ফের বের করে দেখাতেন আর গর্ব নিয়ে বলতেন , “ দেখো, আমিই সেই মেয়ে যে হেমিংওয়ে সর্বশেষ ফুটোপয়সাটিও কেড়ে নিয়ে তাকে সর্বশান্ত করে ছেড়েছি।“

সেই ঘটনার স্মৃতিতে জাদুঘরটির একপ্রান্তে মেশিন বসানো আছে, যাতে কয়েক ডলার দিয়ে চাপ দিলেই একটা চ্যাপ্টা ধাতব মুদ্রায় হেমিংওয়ের ছবি খোঁদাই হয়ে বের হয়ে আসে, সেই শেষ পয়সার স্মরণে!

(হেমিংওয়ের কী-ওয়েস্টের বাড়ি ভ্রমণের সময়ে এটিকে স্যুভেনির হিসেবে কিনে উপহার দিয়েছিলেন আমার দিকবিদিক ঘুরে বেড়ানো, দিকভ্রষ্ট, দিকবিহীন কিন্তু জীবনের সঠিক দিকে থাকা বন্ধু সালমান নিবিড়, যাকে ছাড়া ফ্লোরিডার সেই ভ্রমণ সম্ভবই হতো না। পয়সাটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে লাইব্রেরীর হেমিংওয়ে কর্নারে রাখার ইচ্ছে আছে।)

ছবি: 
07/07/2011 - 11:39অপরাহ্ন

মন্তব্য

রণদীপম বসু এর ছবি

একেই বলে ফুটোপয়সার ফুটানি ! হা হা হা !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

তারেক অণু এর ছবি

যা বলেছেন দাদা

Sohel Lehos এর ছবি

২০১৬ সালে কি ওয়েস্টে গিয়েছিলাম। তবে হেমিং ওয়ের জাদুঘর দেখা হয়নি। একটাই ছবি?

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

তারেক অণু এর ছবি

বেশ ভালোই আছে জাদুঘরটা। সেটার কাছেই আরেক জাদুঘরে অডুবনের আঁকা কয়েকটা পাখির ছবি আছে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।