জাতিস্মর

তুলিরেখা এর ছবি
লিখেছেন তুলিরেখা (তারিখ: সোম, ০১/০৩/২০১০ - ১:৫০পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আমি জন্মেছিলাম চাঁদসদাগরের সময়ে, ওরই গাঁয়ে। তখন আমার নাম ছিলো জীমূতবাহন, আমি ছিলাম জাহাজ বানাবার কারিগর। চাঁদ আর ওর নাবিকেরা মিলে সমুদ্রে বাণিজ্যে যেতো, ওদের জাহাজ বানাবার বরাত পেতাম আমরা।

তখন মাসের পর মাস নদীতীরে পাকাপোক্ত তক্তা টক্তা নিয়ে খট খট আওয়াজে জাহাজ বানানো, আলকাতরার লেপ মারা--শয়ে শয়ে লোক কাজ করতো একসঙ্গে।

ওদের নৌবহর যখন সমুদ্রযাত্রা করতো শুভদিনে, তখন আমরা তাকিয়ে থাকতাম পাড়ে দাঁড়িয়ে। ওরা বিদায় নিতো, আস্তে আস্তে ছোটো হয়ে আসতো বহরের সবকটি নাও, ছলছল করতো নদী আর নদীতীরের গাঁওখানির হৃদয়। স্বপ্নে দেখতাম সাদা পাল উড়িয়ে রাজহংসের মতন সেই চাঁদের নাও চলেছে নীল সমুদ্রের উপর দিয়ে।

ওদের কে বানিয়ে দিতো দিকনির্দেশের যন্ত্রপাতি? নক্ষত্রমন্ডল দেখে দিকনিরূপণের কে হতো দিশারু? ঐ অনন্ত নীল সমুদ্রে দিনে রাতে দিকচিহ্ন নেই কোনো, ওখানে কী করে পথ খুঁজে পেতো ওরা? কে জানে!!!

আমার ওসব জানা ছিলো না, ফিরে এলে উৎসবে যখন নেমন্তন্ন করতো চাঁদ সওদাগর, তখন সবাই ভীড় করে বড়ো বড়ো চোখ করে নাবিকদের গল্প শুনতো। ওদের গল্পে কী আর ওসব যন্তরেরমন্তরের কথা থাকতো? কখনো না।

গল্পে থাকতো কোন্ আশ্চর্য দ্বীপে কত অদ্ভুত ম্যাজিকের মতন ঘটনা ঘটেছিলো, কোথায় দ্বীপ মনে করে তিমির পিঠে নেমে পড়েছিলো কজন নাবিক, কোথায় কোন্ উপকূলে নেমে জঙ্গলে ঢুকে কী হয়েছিলো, কোথায় সাগরপাড়ে মস্ত মস্ত লৌহমুখ পাখী এত বড়ো যে পায়ের নখে বড়ো বড়ো ছাগল ভেড়া তুলে নেয়--এইসব যত আধা বিশ্বাস করা যায় এমন গল্প।

আর অনেক ঝড়ের গল্প, উত্তাল সমুদ্রে মোচার খোলার মতন কাঁপছে নৌকা, জল ঢুকছে জল ঢুকছে ফুটোফাটা দিয়ে, সবাই যে যা হাতের কাছে পাচ্ছে তা দিয়ে জল সেঁচে ফেলছে। কালির মতো কালো অন্ধকারে আকাশসমুদ্র সব লেপেপুঁছে গেছে। ঝড়ের গল্পগুলো বানানো ছিলো না, ওগুলো সত্য। একবারে সমুদ্রে গিয়ে আর কেউ ফিরলো না, ঝড়ের সমুদ্রে ডুবে গেলো গোটা নৌবহর, হারিয়ে গেলো সব নাবিক।

সবাই ভেবেছিলো ঐ নাবিকেরা সবাই হারিয়ে গেছে, নাবিকদলই রইলো না, আর জাহাজের বরাত্ কোত্থেকে পাবো? আমাদের কারিগররা সবাই চাষেবাসে নেমে পড়লো, ধান পাট গম আখ এইসব চাষ করতাম আমরা,আস্তে আস্তে বিয়ে থা করে থিতু হয়ে গেলো সবাই, ছেলেপুলে নিয়ে সংসার হয়ে গেলো সকলের। আস্তে আস্তে সবাই ভুলে গেলো ঐ নাবিকদের কথা। ওদের বৌছেলেপুলেরা কেউ কেউ তখনও ঐ গাঁয়েই ছিলো, কেউ কেউ তখনো স্বামী ফেরার আশায় ছিলো, সাত বচ্ছর হয়ে যাবার পরে অবিশ্যি নিয়ম অনুযায়ী ওরা সধবা বেশ ত্যাগ করেছিলো। কিন্তু সমুদ্রে ততদিনে দেখা দিয়েছে জলদস্যুদের জাহাজ, তারা পারের গাঁয়ে গাঁয়ে হানা দিয়ে লুঠপাঠ করতে শুরু করেছে, পুড়িয়ে দেয় বাড়ীঘর, মানুষ তুলে নিয়ে যায় কোন্ দূর দেশে দাস করে বেচে দেবে বলে। সমর্থ পুরুষেরা বাধা দেবার জন্য সংঘবদ্ধ হতে থাকে, কাঠের বাঁশের ও ধাতুর অস্ত্র চালাতে শিখতে থাকে।

তারপরে একদিন! প্রচন্ড গ্রীষ্ম তখন, জৈষ্ঠের তাপে পুড়ে যাচ্ছে পৃথিবী। বেশ অনেকদিন বৃষ্টি নেই, খড়ের চালাটালা গরম হয়ে আছে, শুধু ফুলকির অপেক্ষা। এইসময়ে জলদস্যুরা এলো। ঘোর আগুন লেগে গেলো সারা গাঁয়ে, আর কিছুই মনে নেই। হয়তো ঐ আগুনে পুড়েই মারা গেছিলাম! পোড়া মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো শত শত হাজারে হাজারে ছড়িয়ে রইলো পোড়া গাঁয়ে।

(চা খেয়ে এসে বাকীটা! হু হু, সাধে কী সিরাতের ড্যানিয়েল সাহেব চায়ের উপর খাপ্পা? হাসি )


মন্তব্য

মূলত পাঠক এর ছবি

শুরু তো খাসা কিন্তু ঐ যে, চা!

কালির মতো কালো হবে, এক যদি না মা কালী বলতে চেয়ে থাকেন।

তুলিরেখা এর ছবি

ধন্যবাদ। বানান ঠিক করে দিলাম।
চা-ফুলুরি শেষ করেই আসছি। হাসি
-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ধুসর গোধূলি এর ছবি

- ভালোই লাগছিলো। যেই না জমে উঠলো অমনি আপনাকে ধরে বসলো চা খাওয়ার ব্যামোতে! ঠিক হলো?

লেখাটা পড়তে পড়তে একটা বি-শা-ল লেখা লিখতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। এই সময়গুলোতে ভীষণ লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বেশিক্ষণ যে মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছি না। চোখ জলে ভরে যাচ্ছে। কেউ দেখলে ভাববে লেখা পড়ে ধুগো কাঁদছে!

এই যে, আবারো চোখের জল এসে গাল বেয়ে পড়ছে গড়িয়ে। মন খারাপ
___________
চাপা মারা চলিবে
কিন্তু চাপায় মারা বিপজ্জনক

তুলিরেখা এর ছবি

তাড়াতাড়ি গিয়া চোখে ড্রপ দ্যান মিয়া। চোখ হইলো গিয়া বিরাট কাজের বস্তু, অবহেলা কইরেন না।
তারপরে সেই বিশাল লেখাটা দ্যান।
-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

দ্রোহী এর ছবি

আয়হায়! এতদূর এসে কেউ থামে? চা খাওয়া শেষ হইলে আওয়াজ দিয়েন।

তুলিরেখা এর ছবি

দিমুনে আওয়াজ। হাসি
-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

তিথীডোর এর ছবি

ঘোর অন্যায়....
আজ থেকে আমিও চায়ের উপর খাপ্পা!!!

--------------------------------------------------
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

তুলিরেখা এর ছবি

শুধু চা না, লগে ফুলুরিও আছে। হাসি
-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

হরফ এর ছবি

তা হ্যাঁ ভাই আর কতো চা খাবেন? তারপর কি হ'ল লিখুন শিগ্গির।

তুলিরেখা এর ছবি

ভাই,
চা ফুলুরি পাঁঠার ঘুগনি কচুরি সব মিলে সময় তো লাগবেই। হাসি
-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ফারুক হাসান এর ছবি

ও ভাই চা ফেলে ফিরে আসুন, এইদিকে আমার বেলা যায়!

তুলিরেখা এর ছবি

আপনিও চা সামোসা নিয়ে বসুন। হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

চাঁদ সদাগর দড় শিরদাঁড়ার লুক আছিলেন। মনসারে থোড়াই কেয়ার করছেন। শেষমেষ ফুল মারছিলেন মনসার কান্দনের চোটে, তাও পিছন ফিইরা। উনার নাম নেওনের লাইগা আপ্নেরে শুক্রিয়া জানাই।

তুলিরেখা এর ছবি

দুঃসাহসী বীর না হইলে সমুদ্রবাণিজ্যে যাওয়া যায় নাকি সহজে? দ্যাহেন কলম্বাস ফলম্বাসেরা ম্যাজিলান ফ্যাজিলানেরা কেমুন দুনিয়া জয় কইরা ফালাইলো আর আমোগো হাজারো ঠাকুরদেবতা ব্রতপার্বন জাতপাত ছোঁয়াছুঁয়ি লইয়াই আটকাইয়া গেলাম আমরা! অমন এক বীর শেষে পাঁচালিতে গিয়া পড়লেন! আফশোষ আরকি!
"সনকা" রা ও যদি সমুদ্রে বার হইতে পারতো বাণিজ্যে বা দেশ আবিষ্কারে, তা হইলে হয়তো ইতিহাস অন্য হইতো।
শরদিন্দুর "রক্তসন্ধ্যা" পড়েছেন?
-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

না গো দিদি। পড়ি নাই।

আর পাঁচালির মধ্যেও তিনি-ই বীর। মনসা ভীষণ ন্যাকা।

s-s এর ছবি

প্রত্যূষাদি, চা খেয়ে এসো কোনো সমস্যা নেই। গল্পটা বেশ লাগছে, কিন্তু সওদাগরের নাম ইন্দ্রের নামে কেন সেটা বুঝলাম না, অপ্সরা টপ্সরা পাবে নাকি পরে?

তুলিরেখা এর ছবি

এই তো ভালোমানুষের মত কথা! আহা, চা খেতে আর খাওয়াতে অনেক মজা। যাবো নাকি দাওয়াতে? হাসি
সওদাগর না সে, সে কারিগর।
আর পৃথিবীর কোন্‌ পুরুষ না ইন্দ্র হতে চায়? ভাবে আহা আহা উর্বশী মেনকা রম্ভার নাচ দেখবো আর সোমপান করবো! হাসি নহুষ, মহিষাসুর, শুম্ভ নিশুম্ভ, নমুচী অনেকেই হতে চেয়েছিলো, অনেক ঝঞ্ঝাট-ঝামেলার পরে বোঝে ব্যাপারটা মজার না! শুধু রম্ভাকেই পায় তাও আটটা! হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

ফকির লালন এর ছবি

মনসা অনার্য দেবী নয় কি? বোধ হয়।

সেজন্য সদাগরের এত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য। কিংবা তার কাহিনীর কথকদের/লেখকের। ধারনা করি, নদীর দেশে তাকে যারা মানে তারা আদিবাসী, তারা তাকে বহুকাল ধরেই মানতো, ভয়ে, বিস্ময়ে। কিন্তু যারা মানতে চায়নি তারা এখানে নতুন, মাইগ্রান্ট। কিন্তু প্লাবন সমভূমিতে তাকে অত উপেক্ষাও বোধ করি সম্ভব ছিলো না। তাই শেষতক পূজা, পিছন ফিরে তাও।

তুলিরেখা এর ছবি

সওদাগর নিজেও কি আর সেই নাকউঁচু আর্য? সে তো শিব আর কালীর পূজা করতো, শিব আর কালীও তো ভূমিমানুষদের দেবতাই, কালে কালে নাকউঁচুরা তাদের মডিফাই করে নিজেদের দেবতার দলে নিলো!

তবু বাংলায় মনসামঙ্গলের আবেদন অনেক বেশী, অন্যান্য মঙ্গলকাব্যের চেয়ে এর জনপ্রিয়তাও অনেক বেশী। হয়তো জলজঙ্গলের দেশের জীবনের সঙ্গে এ কাহিনি জড়ানো বলে। কালকেতু-ফুল্লরার চেয়ে আমাদের অনেক বেশী কাছের মানুষ বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর। কাহিনির উৎকর্ষও খুব, কতরকমের টুইস্ট! এ জিনিস তেমন তেমন কবির হাতে মহান মহাকাব্য হতে পারতো। ওভাবে একলা একটি প্রায়কিশোরী মেয়ে মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে আনছে তার স্বামীর জীবন, দিনের পর দিন সে চলছে চলছে, মৃত প্রিয়মানুষটির নশ্বরদেহ শেষ হয়ে গেছে শুধু তার হাড়গুলি বেহুলার আঁচলে-সেরকমভাবে বলা হলে এ জিনিসের কাছে সাবিত্রীর কাহিনি ও জায়গা ছেড়ে দিতো! এ কাহিনির তুঙ্গস্পর্শী তুলনা শুধু মেলে মিশরের দেবী আইসিসের আর দেবতা ওসিরিসের কাহিনিতে, তবে কিনা তাঁরা হলেন মহাশক্তির অধিকারী দেবদেবী আর এরা মরমানুষের দুনিয়ার দুটি বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়ে, ভালোবাসার জোরে তাদের সঙ্গে এক কাতারে। তাই মাঝে মাঝে আপশোষ হয়, আমাদের আশ্চর্য কাহিনিগুলি বিশ্বজুড়ে দেখা দিতে পারলো না বলে।

লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।