জীবন যেমন

গৃহবাসী বাউল এর ছবি
লিখেছেন গৃহবাসী বাউল [অতিথি] (তারিখ: সোম, ১০/০২/২০২০ - ৬:৫১পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অনেকদিন বোলগ দিয়ে ইন্টারনেট চালাই না। মনটা চায়, কিন্তু সময় আর সুযোগ দুয়ে ইম্রুল কায়েসের ব্যাট আর ইশান্ত শর্মার বলের মত একত্র হয় না। সময়টাও কেমন জানি অস্থির যাচ্ছে। পিএইচডি শেষের দিকে, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। দেশে কিছুদিন পরপর কিছু একটা নিয়ে অস্থিরতা, পরিবারে, সমাজে। সব মিলিয়েই #কিয়েক্টাবস্থা। সবচেয়ে বেশি প্যারা দিচ্ছে পিএইচডি। মুরুব্বিরা বলেন (যারা ইতোমধ্যে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন) পিএচডির ৯৯% হলো সুপারভাইজার। করতে এসে হাড়ে মজ্জায় টের পাচ্ছি।

অনেকদিন বোলগ দিয়ে ইন্টারনেট চালাই না। মনটা চায়, কিন্তু সময় আর সুযোগ দুয়ে ইম্রুল কায়েসের ব্যাট আর ইশান্ত শর্মার বলের মত একত্র হয় না। সময়টাও কেমন জানি অস্থির যাচ্ছে। পিএইচডি শেষের দিকে, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। দেশে কিছুদিন পরপর কিছু একটা নিয়ে অস্থিরতা, পরিবারে, সমাজে। সব মিলিয়েই #কিয়েক্টাবস্থা। সবচেয়ে বেশি প্যারা দিচ্ছে পিএইচডি। মুরুব্বিরা বলেন (যারা ইতোমধ্যে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন) পিএচডির ৯৯% হলো সুপারভাইজার। করতে এসে হাড়ে মজ্জায় টের পাচ্ছি। আমার মাস্টার্সের সুপারভাইজার ছিলো প্যাক-কাদার মানুষ। আর এখনকারটা পুরাই অস্থির।

উদাহরণ দিচ্ছি, প্রথম যখন ল্যাবে জয়েন করি, কিছু একটা ইনকিউবেশনে দিয়ে কফি খেতে যেতাম। শুরুর কিছুদিন কিছু বলেনি, আমিও জানি কানাডায় এইটাই নরমাল। সকালে এসে একটু কাজ করে টিম হর্টন্সে একটা কফি না খেলে দিন শুরু হয় না অনেকের। একটা পর্যায়ে সেটা অভ্যাসে এবং সেখান থেকে আসক্তিতে পরিণত হয়। আমার ওস্তাদ কানাডায় বড় হয়নি, কানাডার অভ্যাসও রপ্ত করতে পারেনি, কারণ সে নাকি কফি খায় না এবং টিম হর্টন্স তার দুই চোখের বিষ। কিন্তু আমার টিম হর্টন্সে যাওয়া নিয়ে একটা পর্যায় পর্যন্ত কিছু বলে নি। ল্যাবের পুরনো লোকজনও দেখি যায় না। একটা লিবিয়ান ল্যাবমেট আছে, সে খুব খুশিমনে আমার সাথে যায়, কয়েকদিন পর, হঠাত করে একটা পরীক্ষণ (এক্সপেরিমেন্ট) ঠিকমত কাজ করছে না, আমি ল্যাবের বেঞ্চ কামড়ে পড়ে আছি, একের পর এক চেষ্টা করে যাচ্ছি। একদিন, আমি গেছি টিম হর্টন্স, এসে শুনি বস আমাকে ইতোমধ্যে দুইবার খুঁজেছে। আমি গেলাম, কথা বললাম, ভালো মানুষ, এক্টু ভার ভার মনে হল। বিকালে সে চলে গেলে, আমি কাজ করতেই থাকলাম। আমি নরমালি ল্যাবে একা থাকলে দরজা বন্ধ করে কাজ করি। রাত সাড়ে আটটা নটার দিকে, আমি ভিতরের রুমে কাজ করছি, হঠাত শুনি পিছন থেকে বস ডাকছে, ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকিয়ে দেখি, আসলেই বস, সে কিছু একটা দরকারে এসেছে। আমাকে দেখে তাজ্জব হয়ে বল্ল, কি ব্যাপার? তুমি এখনও কাজ করছ? ঘটনা বললাম। “অকি ডকি” বলে চলে গেল। আমি এগারটা সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাসায় এসে, খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে আবার সকাল নটায় বস আসার আগেই ল্যাবে। সে এসেই প্রথম প্রশ্ন, “রাতে কয়টা পর্যন্ত ছিলা?” বললাম, "এগারোটা পর্যন্ত"। সে কিছু সেকেন্ড চিন্তা করে, মাথা নেড়ে, আঙ্গুল দিয়ে কপাল বেয়ে ঝুলে যাওয়া কয়েকটি বেদ্দপ চুলকে যায়গামত গেঁথে দিয়ে বল্ল, “দিনের বেলা কফি খাইতে গেলে এত রাত্র পর্যন্ত কাজ করতেই হবে”। আমি রীতিমত মাননীয় স্পিকার হয়ে গেছি, আধাঘন্টা-পৌনে একঘন্টা কফি খেতে গেলে সর্বোচ্চ এক-দেড় ঘন্টা বেশি কাজ করতে হবে, তাই বলে এগারোটা পর্যন্ত! কী দিগদারি! এরপর আরো কয়েকবার ঘ্যান ঘ্যান করেছে, চেতে মেতে শ্লা’র কফি খাওয়াই বাদ দিয়েছি। এখন চা খাই, তাও ল্যাবে আসার পথে বাসে বসে। দুই মিনিট ল্যাবে না দেখলেই ইমেইল, তোমারে তো পাইলাম না, তাই মেইল দিলাম। সকাল থেকে টয়লেট চেপে কাজ করছি, কোনও খবর নেই, যেই মাত্র বারোটার দিকে টয়লেটে যেয়ে বসেছি, অম্নি ইমেইল, তোমারে তো ল্যাবে দেখলাম না, তাই ইমেইল দিলাম। সারাটা দিন বরবাদ করে দেয়। থাক, বসের কথা বলে আর বিরক্ত না করি। আমি নিশ্চিত এর চেয়ে প্যারাময় বস অনেকের ছিলো/আছে। এখন মেনে নিয়েছি, ল্যাবের বাইরে না পারতে যাই না, আর কোথাও গেলেও বলে যাই, তার নিয়মেই খেলি। ইংরেজিতে বললে, আফটার অল, ইটস আ পার্ট অফ দ্যা গেইম।

কিছুদিন আগেই ক্যান্ডিডেছি (Candidacy) পরীক্ষা দিলাম। এর আমেরিকান কাউন্টারপার্টকে খুব সম্ভব কম্প্রিহেন্সিভ এক্সাম বলে। কম্প্রিহেন্সিভে কি হয় জানি না, তবে্, ক্যান্ডিডেছি হল কানাডিয়ান পিএইচডি স্টুডেন্টদের জন্য সবচেয়ে ভীতিকর সময়। পাশের ল্যাবের একটা মেয়েকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম পরীক্ষার আগে, তার অভিজ্ঞতা কি ছিল, তার ভাষায় ,"ইউ উইল হেইট এভ্রি সিংগেল সেকেন্ড অফ ইয়ুর লাইফ"। ভাইরে, বিশ্বাস করেন, এভ্রি সিঙ্গেল সেকেন্ড না, আই হেইটেড এভ্রি সিঙ্গেল ন্যানোসেকেন্ড অফ মাই লাইফ। একটু খুলে বলি, বুঝতে পারবেন। এই পরীক্ষায় দেখা হয় একজন ছাত্র কতটুকু স্বাধীনভাবে, সুচিন্তার সাথে একা একা একটি গবেষণাকাজ করতে পারবে। তার মানে, একজন ছাত্রকে একটি প্রজেক্ট বের করতে হবে, এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন করতে হবে, গ্রান্ট এপ্লিকেশন লিখতে হবে, সেটা সাবমিট করতে হবে কমিটি মেম্বার এবং এক্সটারনাল দের কাছে (কমপক্ষে চারজন), এবং এর সবি করতে হবে সুপারভাইজারের সাহায্য ছাড়া, এবং পরীক্ষার কমপক্ষে ৪৫ দিন আগে, এবং যবনিকাপাত ঘটবে একটি বিভীষিকাময় (ইংরেজীতে বললে, ট্রমাটাইজিং) মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে পিএচডি স্টুডেন্ট থেকে পিএইচডি ক্যান্ডিডেটে রুপান্তরে। সাধারণত, এই পরীক্ষার এক দুই মাস আগে থেকেই সবাই ল্যাবে কাজ করা বাদ দিয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে পড়তে পড়তে আধাপাগল টু ত্রিকোয়ার্টার পাগল হয়ে যায়। সুপারভাইজাররাও জানে, তাই ছাড় দেয়। কিন্তু আমার বস তো আমার বসই। সে ঘোষনা দিলো, পরীক্ষার জন্য কোনও এক্সপেরিমেন্ট লই চুদুর ভুদুর চইলত ন। পরীক্ষা প্রস্তুতি এবং এক্সপেরিমেন্ট দুইই একসাথে চালাতে হবে। খাড়ার উপ্রে র‍্যাগ খেয়ে গেলাম। সারাদিন ল্যাবে কাজ করতাম, আর বিকেলে সবাই চলে গেলে পড়তে বসতাম। দুনিয়াদারি আর সংসারের মায়া ত্যাগ করে রীতিমত ধ্যানে বসার মত অবস্থা। পরীক্ষার পদ্ধতিটাই এমন যে, যে কেউ ভয় পেতে বাধ্য। দুইজন থিসিস কমিটি মেম্বার, একজন আর্মস লেংথ আর একজন এক্সটারনাল থাকে পরীক্ষক হিসিবে। তারা কয়েক ধাপে প্রশ্ন করবে, প্রতিজন প্রথমে ২০ মিনিট করে, সবার একবার করে হয়ে গেলে, দ্বিতীয়বার ১০ মিনিট এবং তারা যদি এতেও সন্তুষ্ট না হয় তাহলে তৃতীয়বারে যাবে। শেষমেশ, যতক্ষণ না পরীক্ষার্থী বলবে যে আর পারছি না গুরু, ততক্ষণ চলতেই থাকবে। ৫/৬ ঘন্টা ধরে এই পরীক্ষা হওয়ার রেকর্ডও আছে, তবে কমপক্ষে আড়াই/তিন ঘন্টা লাগেই। পরীক্ষার একমাস আগে সব পরীক্ষকের সাথে দেখা করতে হয়, তারা কিছু পড়ার মত পেপার বা বিষয় নির্ধারণ করে দেন যা সরাসরি শিক্ষার্থীর গবেষণার সাথে সম্পর্কিত নয়। তারা এও বলে দেয়, যে এইখান থেকেই আলুচনা শুরু হবে। তারমানে এই যে, তারা যেইসব পেপারস দিবে, সেখান থেকে প্রশ্ন করতেও পারে, নাও পারে। আমার ক্ষেত্রে তিনজন কাছাকাছি বিষয় দিলো, একজন এমনই এক বিষয় দিলো, যা আমার তো দুরের কথা, আমার ওস্তাদেরও গন্ডির বাইরে। এটা নিয়ে ডিপার্ট্মেন্টে পরে বেশ আলোচনাও (সমালোচনা) হয়েছে এবং পরবর্তীতে যাতে এই রকম না হয় সে জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্যারা তো আমি যা খাওয়ার খেয়ে গেছি। এইভাবে করতে করতে একদিন পরীক্ষার দিন এসে গেল, হার্টবিটের আওয়াজ রীতিমত বাইরে থেকে শুনা যাচ্ছিল। একসময় পরীক্ষাও শুরু হল, রুদ্ধদ্বার। সেকেন্ড রাউন্ডেই সবাই ঘোষনা দিলো আর কারো কোন প্রশ্ন নেই। এই সময় পরীক্ষার্থীকে রুম থেকে বের করে দেয়া হয়, এবং সবাই আলোচনা করে পাশ করানো যাবে কি যাবে না তা নিয়ে। মিনিট দশেক পরে আমাকে আবার ভিতরে ডেকে নেওয়া হল, এবং আমাকে জানানো হলো আমি সর্বসম্মতিক্রমে, কারো কোন আপত্তি এবং বিনাশর্তে পাস দিয়েছি। শর্তের ব্যাপারটা হচ্ছে, কারো পরীক্ষা যদি সর্বসম্মতিক্রমে সন্তোষজনক না হয়, তখন মাত্রা বুঝে তাকে হয়ত কিছু রিডিং ম্যাটেরিয়াল দেয়া হয়, অথবা ৬ মাসের মধ্যে আবার এই পরীক্ষা দিতে হবে। এরপরও যদি সন্তোষজনক না হয়, তাহলে তাকে পিএইচডির বদলে মাস্টার্স দিয়ে আলবিদা। উফফ, কি যে অভিজ্ঞতা। আমার ঠিক মনে নাই, সবাই কংগ্রাচুলেট করার পর কেমন লেগেছিল, শুধু মনে আছে, আমার মনে হল, পিঠ থেকে খুব ভারী একটা ব্যাকপ্যাক নামিয়ে ফেললে যেমন হাল্কা লাগে, তারচেয়ে কয়েকশগুণ হাল্কা হয়ে গেলাম। চোখের সামনে থেকে কেউ একটা কুয়াশার চাদর ঝট করে টেনে সরিয়ে ফেল্ল। আমি চেষ্টা করেও দুই তিনটার বেশি প্রশ্ন মনে করতে পারি নি। অনেকেই (‍‌‌‍‍৮০%) এই পরীক্ষার পর সপ্তাহখানেক ছুটি নেয় ট্রুমা থেকে বের হয়ে আসার জন্য। আমি ল্যাবে ফেরা মাত্রই বস বল্ল, আজকে কি কোন কাজ করবা? বললাম, আজকে সম্ভব না, মাফও চাই, দয়াও চাই। “ঠিক আছে, তাইলে কালকে গত সপ্তাহের রেজাল্ট আর এই সপ্তাহের বাকি দিনে কি করবা তার ফিরিস্তি কালকে সকালে দিও” বলে উনি চলে গেলেন। পরদিন থেকে আবার শুরু। Run…Forrest….Run…

সপ্তাহখানেক আগে বিখ্যাত কানাডিয়ান উইন্টার সাহেব দেখা দিয়ে গেলেন। তাপমাত্রা নেমে গেল -৪০-এ আর ফিলস লাইক (উইন্ড চিল) নেমে গেলে -৫০ এর নিচে। এইটা যে কি ভয়াবহ মাত্রার ঠান্ডা হতে পারে তা নিজে না খেলে কাউকে বুঝানো যাবে না। এম্নিতেই সেপ্টেম্বর থেকেই এইখানে তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে চলে যায়। -১০/১৫ সেঃ পর্যন্ত আমি সহ্য করতে পারি, এর নিচে নেমে গেলেই আমার জন্য তা অত্যাচার হয়ে যায়। বাঙ্গালিদের অনেকের সহ্য ক্ষমতা -২০/২৫ পর্যন্তও আছে, কিন্তু আমার খুবই কম। তার উপর তুষারাবৃত সবকিছু, গাছপালা, ঘরবাড়ি, গাড়ি, রাস্তা, ফুটপাথ, ঘরের ব্যাল্কনি, এমনকি জানালা পর্যন্ত জমে থাকে। এরমধ্যেও এইখানে জীবন থেমে থাকে না। পরিচিত অপরিচিত যার সাথেই কথা হোক না কেন, শুরু হয় তাপমাত্রা, আবহাওয়া এইসব নিয়ে। আমরা যারা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্ছল থেকে এসেছি তাদের যেমন কষ্ট হয়, যারা সারাজীবন এই জায়াগার আলো বাতাস খেয়ে বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়িয়ে বড় হয়েছে তাদেরও সমান কষ্টই হয়। অনেকেই বলে যে, প্রতিবছর এই সময় এলেই তাদের মনে হয় যেন সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে। কোউতুহলবশত, অনেকেকেই জিজ্ঞেস করি, কেমন জায়গায় যেতে চাও? উত্তরে আসে, যেখানে এত ঠান্ডা নেই, প্রকৃতি সুন্দর, সবুজ আছে, বছরের আটমাস বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকে না, মানুষ আছে। প্রতিবারই আমার এইরকম একটা জায়গার কথাই ভেসে ঊঠে মনের কোণে। সেই জায়গায় বছরে ছয়বার ঋতু বদলায়, বছরের অর্ধেক বরফের নিচে, টাকলা গাছ গুলোসহ যেকোনও দিকে ক্যামেরা তাক করে শাটার টিপ্লেই একটি সাদাকালো ছবি উঠে না, যেখানে ঘর থেকে বের হতে গেলে ৫ মিনিট যাবত স্তরে স্তরে কাপড় পড়তে হয় না, নিঃশ্বাস নিতে হয় না ভয়ে ভয়ে, যদি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে গেলে বুক জমে যায়, আর অদৃশ্য কালো বরফে পিছলে পড়ে কোমর পর্যন্ত কাস্ট পরে ঘুরে বেড়াতে হয় না, সেখানে নদী গুলোতে স্রোত থাকে, ছোট ছোট নৌকা থাকে, দুরন্ত কিশোরেরা ঝপাঝপ নদীতে লাফিয়ে পড়ে দুপুরের কড়া রোদে চোখ লাল করে ঘরে ফেরে, নদীগুলো ঠান্ডায় জমে মৃতপ্রায় হয়ে থাকে না। থাক, এই নিয়ে আর লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কল্পনা কল্পনার জায়গায় থাক, বাস্তবতা নিতান্তই ভিন্নমাত্রার।

পিএইচডির শেষ দিকে মনে হয় সবার জন্যই একটু বিষন্ন হতাশাময় হয়। কাজ করতে ইচ্ছে হয় না, লিখতে হবে, কিন্তু বসতে ইচ্ছে হয় না। অনেকটা বয়ঃসন্ধিকালের মত। কিছুই ভালো লাগে না, নিজেকে সবার সামনে অপাংতেয় মনে হয়। পরিচিতজনরা জিজ্ঞেস করে, পিএইচডি শেষ করে কি করব? এই নিয়ে কিছুদিন আগে সায়েন্স ম্যাগাজিনে একটি লেখা এসেছিলো। সেখানে লেখক খুব সুন্দর করে বলেছিলেন, “দয়া করে আমাদের জিজ্ঞেস করবেন না ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি, আমরা নিজেরাই জানি না, তবে যখনই জানতে পারবো, সবাইকে জানাবো।“ আমারো এখন সেই অবস্থা। সকাল বিকাল ল্যাবে আসি, আন্ডারগ্র্যাড সুপারভাইজ করি, বিনা পয়সায় বসের ক্লাস নেই, এক্সপেরিমেন্ট করি, সারাদিন কুকুরে তাড়াখাওয়া বালকের মত উর্ধশ্বাসে দৌড়াই সন্ধ্যা পর্যন্ত। আবার পরদিন সেই রুটীন, সপ্তাহশেষে বসের সাথে মিটিঙয়ে রেজাল্ট দেখাই, বস আবার তিন সপ্তাহের কাজ এক সপ্তাহে করতে বলে, পরের সপ্তাহে আবার সেই দৌড়। এভাবেই চলছে। দেখি কয়দিন চলা যায়।

মা-বাবার সাথে প্রায় প্রতিদিনই ফোনে বা ভিডিওতে কথা হয়। তারাও অপেক্ষা করে আছে, কবে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাব। অনেকবছর আগে যখন বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে প্রথমবার ঘর ছাড়ি, আম্মু কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, আব্বু, এইযে যাচ্ছ, আর কি ফিরবা? আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, কি বল মা, এইত চার বছর, তারপরই তো ফিরে আসছি। আহারে, তখনও বুঝিনি, মা আসলেই বুঝতে পেরেছিলেন, এই যাত্রাই ছেলের চুড়ান্ত যাত্রা, আর হয়ত ফিরবে না ঘরে। আসলেই, সেই যে বের হয়েছি, আজো ফিরতে পারিনি মায়ের কাছে। আম্মুকে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম, আব্বু কেমন আছে, পাশে বসা আব্বু উত্তর দিলেন, যখন বাপ হবা, ছেলে তোমাকে ফেলে রেখে অনেক দূরে চলে যাবে, তখন বুঝবা বাপ কেমন থাকে। শুনে খারাপ লাগে, মাঝে মাঝে একা থাকলে চিন্তা করি, অজান্তে হয়ত হৃদয়ের সাথে চোখও আদ্র হয়, কিন্তু পড়ালেখা আর উচ্চাকাঙ্খার বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা আমি আর কিছুই করতে পারি না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই এখনও সামনাসামনি দেখিনি। কখন দেখবো তাও জানি না। একদিকে যেমন নতুনদের দেখতে পারিনি এখনও, তেমনি আত্মীয়স্বজনদের বা পাড়াপ্রতিবেশীদের অনেককেই আর কোনদিন দেখবো না। কিছুদিন পরপরই আম্মু খবর দেন, তোমার ওই আঙ্কেল বা ওই আন্টি আজকে মারা গেছেন। চোখের সামনে ভেসে উঠে তাদের সাথে কাটানো কোন একটা সময়ের দৃশ্য। আহা! অনেকেই শয্যাশায়ী বা কিছুদিন পরপর হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদেরও আবার দেখবো কিনা জানি না। বিদেশে থাকার অনেক প্যারার মধ্যে এটাও একটা। হঠাত দেশ থেকে অসময়ে একটা ফোনকল, ধ্বসে যাবে পায়ের নিচের মাটি, সরে যাবে মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকা সবচেয়ে বড় বটগাছটি, অথবা ফোনের ওপাশ থেকে শোনা যাবে না সেই কন্ঠস্বর যা শোনার জন্য সারদিন অপক্ষা করা যায়, আর দেখা যাবে না সেই মুখ যার বদলে সারা দুনিয়ার সম্পদ এনে দিলেও গ্রহনে অস্বীকার করা যায় এক নিমিষে। এমন দেশে থাকি, ফোনের সাথে সাথে রওনা দিলেও দেশে পৌঁছতে পৌঁছতে কমসে কম ২৮ ঘন্টা। গত কয়েকমাসে এই রকম কয়েকটা ফোনকল এসেছে খুব কাছের কিছু মানুষের, তাদের নিঃশব্দ দমকা কান্না আমাকেও মনে করিয়া দিয়েছে সময়ের কাছে কতটা অসহায় আমরা। প্রতিবার মনে হয়ছে, অনেক হয়েছে বিদেশ, পড়ালেখা; সব কিছু ছেড়েছুড়ে মুহুর্তেই উড়ে যাই দুরের সেই দেশে।

আশা করি একদিন যাব। ফিরে যাব মায়ের কাছে, বাবার কাছে। হয়ত!


মন্তব্য

Sagor chowdury এর ছবি

প্রবাস জীবন সত্যিই খুব কষ্টের হয়।তবুও সকল স্বদেশীদের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শুভ কামনা রইল।তোমরা সফলতা নিয়ে দেশে ফিরে এসো এটাই আমাদের কামনা...

গৃহবাসী বাউল এর ছবি

প্রবাস জীবন কষ্টের এই কথার সাথে দ্বিমত করার কোন অবকাশ নেই। তবে কষ্টের রকমফের আছে। মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মাটির উপর গনগনে সূর্যের নিচে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামতে থাকা শ্রমিকের প্রবাস জীবন আর পাশ্চাত্যের আমাদের রাজার হালের প্রবাস জীবনের কষ্টের মাত্রা ভিন্ন। তবে, কায়িক বা মানসিক শ্রমের প্রকার, মাত্রা বা আচরণের ভিন্নতা থাকলেও দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে দুশ্চিন্তা সবার জন্যই এক। তাই আমি মাঝে মাঝেই বলি, দেশের সব মানুষকেই কয়েক বছরের জন্য “বিদেশ করানো” উচিত। দেশ কি জিনিস টের পাবে হাড়ে হাড়ে।
পড়ার ও মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।

-----------------------------------------------------------
আঁখি মেলে তোমার আলো, প্রথম আমার চোখ জুড়ালো
ঐ আলোতে নয়ন রেখে মুদবো নয়ন শেষে
-----------------------------------------------------------

guest_writer এর ছবি

খুব আকর্ষণীয় বিষয় এবং ঝরঝরে লেখা। মাথায় বিশেষ একটি পোকার কামড়ে বিভ্রান্ত হয়ে, নভেম্বর ২০১৯ এ ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টো থেকে মাস্টার্স শেষ করলাম। তাতে এক বছরে ওজন কমেছে ছয় কেজি, চশমার পাওয়ারও বেড়েছে, জীবনসঙ্গিনীর কাছে ‘মেনিমুখো’ উপাধি লাভ হয়েছে, আর সামাজিক মেলামেশার স্বাভাবিক দক্ষতা কমেছে। মোটকথা, নিজেকে মাঝে মাঝে জম্বি মনে হয়। আর ভয় লাগে যখন ইন্টারভিউ বোর্ডের সাদা মেনিমুখোরা খুব সুন্দর করে বলেঃ “ওহ! ইউ আর ফ্রম ইউ.এফ.টি., ইউ আর আ হাই এচিভার ... বাট আওয়ার কমনপ্লেস অপারেশন্স কান্ট এফোর্ড ইট।” টেবিলের এপাশ থেকে আমি মনে মনে বলিঃ ওরে, আর বাঁশ দিস নে, বরং এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দে। কিন্তু এখনও তা কারো কাছ থেকে পাইনি।
আর আপনি তো আছেন পি.এইচ.ডি. প্রোগ্রামে। মানে জোড়াসাঁকো’র বুড়োর ভাষায়ঃ আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।
গ্র্যাড স্টুডেন্টদের করুণ জীবন-কাহিনী আমি আমাদের ডিপার্টমেন্টেই স্বচক্ষে দেখেছি। চোখে দেখা যায় না, কহতব্যও নয়। আর প্রিয় স্বদেশ আর কাছের মানুষদের জন্যে মন খারাপ বেশী হলে, ভাববেনঃ সমুদ্রে পেতেছেন শয্যা, শিশিরে কি ভয়? আপনার জন্যে সবিশেষ শুভকামনা রইল।
পুনশ্চঃ চরম উদাসের

এসো নিজে করি ০৩-কিভাবে গবেষণা করবেন

শীর্ষক প্রভুখন্ডটি পড়ে ফেলুন। ১০০% গ্যারান্টি, মনে শান্তি পাবেন।
স্বরূপ-সন্ধানী
------------------------------------
অন্ধকারে সব-চেয়ে সে-শরণ ভালো
যে-প্রেম জ্ঞানের থেকে পেয়েছে গভীরভাবে আলো।

গৃহবাসী বাউল এর ছবি

খুব আকর্ষণীয় বিষয় এবং ঝরঝরে লেখা।

- অনেক ধন্যবাদ।

নভেম্বর ২০১৯ এ ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টো থেকে মাস্টার্স শেষ করলাম

-অভিনন্দন হাততালি

জীবনসঙ্গিনীর কাছে ‘মেনিমুখো’ উপাধি লাভ হয়েছে

- অল্পের উপর পার পেয়ে গেছেন। আবারো অভিনন্দন।

এপয়ন্টমেন্ট লেটার পেয়ে যাবেন। চিন্তার কিছু নেই। লেগে থাকেন। লেগে থাকলে হয়ে যাবে। অ্যাল্বার্টায় চেষ্টা করেন। এইদিকে ভালো সুবিধা আছে অনেক ক্ষেত্রে।

পড়ার ও মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।
কোলাকুলি

-----------------------------------------------------------
আঁখি মেলে তোমার আলো, প্রথম আমার চোখ জুড়ালো
ঐ আলোতে নয়ন রেখে মুদবো নয়ন শেষে
-----------------------------------------------------------

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

অনেক দুঃখকষ্টের কথা এক লেখায় ঝেড়ে দিলেন! শান্তির আশায় নাকি? হবেনা। থিসিস ছুঁড়ে মেরে প্রফেসরের দাঁত না ভাঙা পর্যন্ত নির্বাণ লাভ হয়না।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল, কয়েকটা দেশ বাদে বাকি দুনিয়া পিএইচডি গবেষকদের "গণিমতের মাল" মনে করে। এদের সঙ্গে সেইরকম আচরণও করে।

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

গৃহবাসী বাউল এর ছবি

আমাদের এইদিকে গ্রাডদেরকে বলে “চিপ লেবার”। প্রাদেশিক ন্যুনতম মজুরির (প্রভিন্সিয়াল মিনিমাম ওয়েজ) চেয়ে কম খরচে কাজ করাতে পারলে তাদের তো অসুবিধা নেই।

পিএচডি’র সময়কার কষ্টের কথা আরেকজন পিএইচডি ছাত্রই বুঝতে পারবে। আপনার পিএইচডি কি শেষ?

শান্তির আশায় লিখেছি কিনা জানি না, লিখে শান্তি লাগছে।

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

-----------------------------------------------------------
আঁখি মেলে তোমার আলো, প্রথম আমার চোখ জুড়ালো
ঐ আলোতে নয়ন রেখে মুদবো নয়ন শেষে
-----------------------------------------------------------

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।