বাংলাদেশে যেভাবে শিবিরের উত্থান- ০৩

জাহামজেদ এর ছবি
লিখেছেন জাহামজেদ [অতিথি] (তারিখ: রবি, ২২/০৮/২০১০ - ৩:৩৮পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

‘আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা শিবিরকে প্রতিহত করার যে ঘোষণা দিয়েছে, আমরা তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছি। পৃথিবীর সকল অস্ত্র জড়ো করে আমাদের পরাস্ত করা যাবে না।’
রেজাউল করিম, সভাপতি, ছাত্রশিবির
(দৈনিক সংগ্রাম, ১৯.০১.২০১০)

ইসলামি ছাত্রশিবিরের ৩৩তম কেন্দ্রীয় সম্মেলনে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১০ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই কথা বলে শিবিরের কেন্দ্রিয় সভাপতি ।

ছাত্রজীবনে যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে ইসলামী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম, এখন আল্লাহ্তায়ালা ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে সে স্বপ্ন পূরণের ব্যবস্থা করেছেন।’
মতিউর রহমান নিজামী
(দৈনিক সংগ্রাম, ১৯.০১.২০১০)

একই অনুষ্টানে প্রধান অতিথির ভাষণে এই কথা বলে জামাতের আমির মতিউর রহমান নিজামী।

উপরে উল্ল্যেখিত দুজনের বক্তব্য পরিস্কারভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিবির সভাপতি তার বক্তব্যে শিবিরের শক্তি আর সামর্থের দাপট দেখিয়েছে। চোথে আঙ্গুল দিয়ে রাস্ট্রকে দেখাতে চেয়েছে, দেখো, আমরা তোমাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেই, আমরা প্রকাশ্যে বলতে পারি, তোমাদের যত অস্ত্র আছে তার চেয়ে বেশি অস্ত্র আমাদের কাছে আছে। অন্যদিকে নিজামী তার বক্তব্যে কি বলতে চেয়েছে, তবে কি একাত্তরে এত এত রক্ত দেখে, এত এত খুন করেও তার মন ভরেনি ? তার আরো রক্তের প্রয়োজন ? আরো লাশের প্রয়োজন ?

স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম কি তাহলে জামাত শিবিরের নতুন স্বপ্ন? একাত্তরে যে হত্যাগুলো করতে পারেনি নিজামীর আলবদর রাজাকার বাহিনী, স্বাধীন বাংলাদেশে নিজামীদের অসমাপ্ত কাজ এখন কি তাহলে শিবির করবে ?

শুধু শিবির সভাপতি বা নিজামীই না, তৃণমূলেও শিবিরের নেতারা এমন আগ্রাসী ও আক্রমনাত্বক বক্তব্য দিয়ে থাকে, সেটা কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হোক, ভোলার কোনো চর হোক, অথবা হবিগঞ্জের প্রতন্ত্য অঞ্চলের কোনো গ্রামই হোক, সব জায়গাতেই শিবিরের বক্তব্যের ধরণ এক, আক্রমণের ভাষা এক।

প্রতিষ্টার পর রাজধানী ঢাকায় বাঁধা পেয়ে শিবির মফস্বল, গ্রামকেন্দ্রিক আর শিক্ষাঙ্গন টার্গেট করে যে রাজনীতির পরিকল্পনা করে চট্টগ্রামের পর তারা এই হিংস্র ও খুনের রাজনীতির সফল প্রয়োগ করে রাজশাহীতে।


রাজশাহীতে শিবির যেভাবে ডালপালা মেলেছে :

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গন দখলের যে রাজনীতি শুরু করে শিবির তার ধারাবাহিকতায় তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৭৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা চত্বরে এক জনসভার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যারয়ে শুরুতেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রী আর জাসদ ছাত্রলীগের বাঁধার মুখে পড়ে। কিন্তু হত্যা আর রগকাটার রাজনীতি শুরু করে শিবির সেই বাধাকেও তুচ্ছ করে ফেলে। একপর্যায়ে শিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির চট্টগ্রামের মতো একই কায়দায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্রে রেখে বিশ্ববিদ্যারয়ের চারপাশে তাদের শক্তিমত্তা বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোকে তারা বানিয়েছে তাদের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম মেহেরচন্ডী, বিনোদপুর, বুধপাড়ায় শিবিরের অনেক কর্মী ও ক্যাডার স্থানীয় মেয়েদেরকে বিয়ে করে এসব গ্রামে নিজেদের শক্তি বাড়িযেছে। এছাড়া আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার কারণে শিবিরের এসব কর্মী ও ক্যাডারদের কথায় স্থানীয় অনেকেই জামাত শিবিরের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। একে একে শিবির বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। অন্যদিকে গোটা রাজশাহী মহানগর জুড়ে প্রগতিশীল ও বাম সংগঠনগুলোর ব্যর্থতা, অদক্ষতা, কর্মক্ষমহীনতা, অসততা যত বেড়েছে শিবির বিপুল উদ্যোগে সেই ফাঁকা জায়গায় তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। মহানগরী জুড়ে কোচিং সেন্টার, মেস, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ নানারকম ক্ষুদ্র ব্যবসায় তারা লগ্নি করেছে। এই অর্থলগ্নির একটা বড় অংশ শিবির সংগঠনের পেছনে খরচ করা হয়েছে। এই আর্থিক প্রণোদনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যা লাঘব করেছে। টিউশনি, লজিং ইত্যাদি জুগিয়ে ছাত্রজীবনে আর্থিক সহায়তার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির নিশ্চয়তার ধারাবাহিক পথ তৈরি করে জামায়াত তাদের ছাত্র সংগঠনকে মজবুত করার কাজে লাগিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে যে আর্থিক কর্মকান্ড তার প্রায় পুরোটাই এখন জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রণে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডারসহ সকল রকমের স্টেশনারি, পরিবহন বাণিজ্যের মূল অংশের নিয়ন্ত্রক এখন শিবির-জামায়াত। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন দোকান, বাজার, পার্শ্ববর্তী গ্রামে দীর্ঘদিনের শ্রমে শিবির সমর্থকদের জুটিয়ে জামায়াত তাদের একটি শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝেনি তখন জামায়াত শিবির রাজশাহী মহানগরী এবং বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে সংগঠনের স্বার্থকে পরিপুষ্ট করেছে। জামায়াত বিশ্বাস করেছে এই এলাকায় জামায়াতের অবস্থান শক্ত হলে, এখানকার প্রশাসন এবং সকল আর্থিক ব্যবস্থাপনাও তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। তাদের এই বিশ্বাসকে তারা কর্মে পরিণত করেছে। এই পরিকল্পনা রাজশাহী জেলা এবং পার্শ্ববর্তী জেলা বগুড়া, নাটোরের একাংশ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতে তারা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে বিএনপির দুই মন্ত্রী রাজশাহীর ব্যারিস্টার আমিনুল হক, নাটোরের রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, জামায়াতের সাংগঠনিক-আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে মুক্তহস্তে সমর্থন জুগিয়ে গেছে।

রাজশাহীতে আধিপত্য বিস্তারে শিবিরের তান্ডব ও হত্যা :

১. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শিবির চট্টগ্রামের মর মতোই নৃশংসতার পথ বেছে নেয়। সর্বপ্রথম ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবির ক্যাডাররা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাসভর্তি বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। এই সহিংস ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

২. রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মেইন হোস্টেলের সামনে ১৯৮৮ সালের ৩ মে প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষাথীদের সামনে ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আক্তার রতনকে কুপিয়ে ও হাত পায়ের রগ কেটে হত্যা করে শিবিরের ক্যাডাররা

৩. চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে ১৯৮৮ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা জালালকে তার নিজ বাড়ীর সামনে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা।

৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা যখন ঘুমিয়ে ঠিক সেই সময়ে , ১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই ভোর রাতে বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ূব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়।

৫. একই বছরের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের বাসভবনে শিবির বোমা হামলা করে।

৬. ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সন্ত্রাসীদের হাতে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত খুন হন। এদিন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্র হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।

৭. শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে হরতাল কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে জাসদের মিছিলে ১৯৯২ সালের ১৯ জুন শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। শিবিরের হামলায় ঐদিন সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে জাসদ নেতা মুকিম মারাত্মক আহত হন এবং ২৪ জুন তিনি মারা যান।

৮. ১৯৯২ সালের আগস্ট মাসে শিবির নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্ববর্তি নতুন বুধপাড়া গ্রামে শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়ীতে বোমা বানানোর সময় শিবির ক্যাডার আজিবর সহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিন জন নিহত হয়।

৯. শিবিরের খুনীরা ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবির সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। ছাত্রদল ও সাবেক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ওপর শিবিরের হামলায় ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপন সহ ৫ জন ছাত্র নিহত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ঐদিন শিবির সবচেয়ে বড় তান্ডব চালায় ।

১০. বহিরাগত সশস্ত্র শিবির কমীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শেরেবাংলা হলে হামলা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার জুবায়েদ চৌধুরী রিমুকে ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।

১১. শিবির কমীরা বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্ববতী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাসের যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে।

১২. ১৯৯৬ সালে জাসাস বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা।

১৩. রাবি অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে ২০০১ সালে শিবির কর্মীরা হাত পা বেধে জবাই করে হত্যা করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা হস্তক্ষেপে ঐদিন তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

১৪. ২০০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মোঃ ইউনুসকে ফজরের নামাজ পড়তে যাবার সময় কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা । এর আগে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্র শিবির অধ্যাপক ইউনুসকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।

১৫. ২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জামাতপন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্র শিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহী সহ আরো দুইজন শিবির ক্যাডার মিলে একযোগে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে রাবি’র ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে। বর্তমানে সালেহী এই মামলা থেকে খালাস পেয়ে শিবিরের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

১৬. চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতের আধারে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে তার লাশ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবিরের খুনী পিশাচরা ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের চাঁদাবাজি :

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি শিবির ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় এলাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজি করে থাকে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডারসহ সকল রকমের স্টেশনারি, পরিবহন বাণিজ্যের মূল অংশের নিয়ন্ত্রন ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকান ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্টান থেকে শিবির নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে। এমনকি তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বায়তুল মালের নামে চাঁদাবাজি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্প বেতনের মালী-ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের ক্ষুদ্র দোকানির কেউই। ফারুক হত্যাকান্ডের পরপরই শিবিরের বেশ কিছু গোপন নথি উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা শিবিরের গোপন নথিপত্রে মিলেছে এসব চাঁদাবাজির ফিরিস্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত কগুলোতে দফায় দফায় তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ উদ্ধার করেছে তাদের চাঁদাবাজির তালিকা। তালিকায় দেখা গেছে, গত জানুয়ারি মাসেও তারা চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে বহু বছরের অভ্যাসবশে। শিবিরের নির্বিচার চাঁদাবাজি থেকে বাদ পড়েনি ওই হলের কর্মচারীরাও। সোহরাওয়ার্দী হল থেকে উদ্ধার করা শিবিরের চাঁদাবাজির তালিকায় দেখা যায়, তারা হলের ২৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে নিয়মিত ধার্য করা চাঁদা তুলত। এদের মধ্যে হলের মালী চান মিয়া ও লোকমানের কাছ থেকে ১শ টাকা করে, মালী জাবেরের কাছ থেকে ১শ টাকা, ঝাড়ুদার সাইদুরের কাছ থেকে ১শ টাকা, প্রহরী আলাউদ্দিন, চান মিয়া, মোহাম্মদ আলী ও রাজ্জাকের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে, প্রহরী আমজাদের কাছ থেকে ৩০ টাকা, ক্যান্টিন ম্যানেজার আবুল হাশেমের কাছ থেকে ১শ টাকা, লাইব্রেরি কর্মচারী আজহার আলীর কাছ থেকে ১শ টাকা, ডাইনিং কর্মচারী ইসমাইলের কাছ থেকে ৫০ টাকা, গেমরুমের কর্মচারী আলী ও আশরাফের কাছ থেকে ১শ টাকা করে, ক্রীড়া শিক মন্টু সিংয়ের কাছ থেকে ৩শ টাকা এবং ডাইনিং কর্মচারী হকের কাছ থেকে ১শ টাকা করে চাঁদা আদায় করেছে শিবির। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও চাঁদাবাজি করেছে শিবির। সোহরাওয়ার্দী হল থেকে উদ্ধার করা শিবিরের চাঁদা আদায়ের একটি রসিদে দেখা গেছে তারা নানা প্রক্রিয়ায় হলের সাধারণ শিার্থীদের কাছ থেকে ৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত নিয়মিত চাঁদা আদায় করেছে । সোহরাওয়ার্দী হলের কাছেই বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বাজার এলাকা। হলের আশপাশেও রয়েছে বেশকিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান। স্বল্প পুঁজির এসব ব্যবসায়ীর কাছে থেকেও নিয়মিত চাঁদা নিত শিবির। হল থেকে উদ্ধার করা শিবিরের চাঁদাবাজির তালিকায় দেখা যায় গত জানুয়ারি মাসে স্টেশন বাজার এলাকার সেলুন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১শ টাকা, চা দোকানি আজিজের কাছ থেকে ১শ টাকা, ফল ব্যবসায়ী চান মিয়ার কাছ থেকে ১শ টাকা, হাবিব ভ্যারাইটির কাছ থেকে ৩শ টাকা, বটতলা হোটেল থেকে ২শ টাকা, ফটোকপি ব্যবসায়ী লিখনের কাছ থেকে ১শ টাকা, ক্ষুদ্র দোকানি মিন্টুর কাছ থেকে ৫০ টাকা, মোবাইল ব্যবসায়ী মুনিরের কাছ থেকে ৫০ টাকা, বিসমিল্লাহ হোটেল ৫০ টাকা, মোবাইল ব্যবসায়ী নাজিরের কাছ থেকে ২শ টাকা, ক্ষুদ্র দোকানি গাফফার ও মাজদারের কাছ থেকে ১শ টাকা, মনোহারী দোকানি মামুনের কাছ থেকে ৬শ টাকা এবং মোবাইল ব্যবসায়ী আনিসুরের কাছ থেকে ৫০ টাকা চাঁদা আদায় করেছে শিবির ক্যাডাররা। ৮ ফেব্রুয়ারির পর ক্যাম্পাসে শিবিরের দাপট কমলেও এসব চাঁদাবাজি নিয়ে মুখ খুলতেও ভয় পান এসব ব্যবসায়ী। একজন ক্ষুদ্র মোবাইল ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভাই, ভয়ে নিয়মিত টাকা দিছি। না দিলে খালি ঝাড়ি মারত।’ এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মুসতাক আহমেদ বলেন, ‘দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের কাছ থেকে যারা এমন নির্দয়ভাবে চাঁদাবাজি করেছে এদের চেয়ে বর্বর কেউ থাকতে পারে না। এদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’http://www.sachalayatan.com/comment/reply/34370/354111[২]

পরীক্ষায় পাশের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি :

চাঁদাবাজি আর খুনের রাজনীতি ছাড়াও পরীক্ষায় পাশের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির আশ্রয় নেয় শিবিরের নেতা কর্মীরা। তারা সংশ্লিস্ট বিভাগের জামাত শিবির সমর্থিত শিক্ষকদের সহযোগিতায় নিজেদের রুমে পরীক্ষার খাতা নিয়ে এসে উত্তর লিখে তারপর সেই খাতা জমা দিয়ে দেয়। রেজাল্ট বের হওয়ার পর দেখা যায় শিবিরের অনেক নেতাকর্মী ও ক্যাডার প্রথম শ্রেণীতে পাশ করে। ফারুক হত্যাকান্ডের পর এসব বিষয় পুলিশের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে। http://www.sachalayatan.com/comment/reply/34370/354111[৩]


পড়ুন আগের পর্বগুলো
বাংলাদেশে যেভাবে শিবিরের উত্থান-০১
বাংলাদেশে যেভাবে শিবিরের উত্থান - ০২


মন্তব্য

বেলাল আহমেদ [অতিথি] এর ছবি

''স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম কি তাহলে জামাত শিবিরের নতুন স্বপ্ন? একাত্তরে যে হত্যাগুলো করতে পারেনি নিজামীর আলবদর রাজাকার বাহিনী, স্বাধীন বাংলাদেশে নিজামীদের অসমাপ্ত কাজ এখন কি তাহলে শিবির করবে ?''

এই প্রশ্নগুলো তাহলে সব তরুনকেই খুড়ে খায়।

বেশ তথ্যবহুল লেখা। আশাকরি জাকির ভাই আরো কিছু জরুরি তথ্য আমরা পাব পরের লেখাগুলুতে।

তাসনীম এর ছবি

যথারীতি তথ্যবহুল লেখা। চলুক আপনার এই সিরিজ, মন দিয়ে পড়ছি।

+++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

জাহামজেদ এর ছবি

সাথে আছেন বলে ভালো লাগছে...

.........................................................................
বৃষ্টির মধ্যে রোদ হয়ে তুই
পাতার গায়ে নাচ
কষ্টের রঙে সুখ হয়ে তুই
আমার মাঝে বাঁচ...

__________________________________
মরণের পরপারে বড় অন্ধকার
এইসব আলো প্রেম ও নির্জনতার মতো
__________________________________

দেবজ্যোতি দাস দেবু এর ছবি

আমার কাছে সবচেয়ে খারাপ লাগছে এই ভেবে যে,ঐ শুয়রের বাচ্চারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ওদের কেন্দ্রীয় সম্মেলন কিভাবে করে ?এর অনুমতি ওরা কিভাবে পায় ?

ওদের এইসব মন্তব্য কি প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কেউ দেখেন না ?এই সম্পুর্ণ সিরিজটা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সামনে রাখা উচিৎ এবং জিজ্ঞেস করা উচিৎ এতো নৃশংসতা করার পরও কেন এই রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে না ?

অতিথি লেখক এর ছবি

১৯৯৩ সালের হামলায় আমার মামা গলায় রাইফেলের গুলি খেয়েও কোনক্রমে বেঁচে ছিলেন।

অনেক লোকের কাছে শুনেছি ছাত্রমৈত্রি নেতা রাগিব আহসান মুন্নাই নাকি শিবিরকে রাজশাহী ভার্সিটিতে ঢুকিয়েছিলেন। পরে শিবির তার প্রতিদান দিয়েছিলো তাকে রামধোলাই দিয়ে মুমুর্ষ করে, শুধু প্রাণে মারেনি। এনিয়ে ফজলে হোসেন বাদশার সাথে মুন্নার নাকি একসময় বিরোধও সৃষ্টি হয়েছিলো।

রাতঃস্মরণীয়

শান্ত [অতিথি] এর ছবি

লেখা যথারীতি ভালো লাগলো।

শিবিরের এই হত্যা ও তাণ্ডব কাহিনী শুনে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।

এদের যেকোন মূল্যে প্রতিহিত করা দরকার।

একুশ তাপাদার [অতিথি] এর ছবি

ভালো হচ্ছে , চলুক।

বিএনপি দপ্তর সম্পাদল রিজভী আহমেদকেও নাকি শিবির খুব কুপিয়ে ছিলো একবার, সেই দাগ নাকি তার গায়ে এখনও আছে?

@ দেবজ্যোতি দাস দেবু, নির্দিষ্ট ফিস দিয়ে যে কেউ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ভাড়া নিতে পারে। শুধু নিষিদ্ধ কোন সংগঠন ছাড়া। শিবির যেহেতু নিষদ্ধ নয় তাই আইনত ভাড়া পেতে কোন সমস্যা হয় না ।

শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেই হবে না , জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলতে হবে ।

শেখ নজরুল এর ছবি

অনেক কিছু জানা হলো। ধন্যবাদ।

শেখ নজরুল

শেখ নজরুল

ওডিন এর ছবি

পড়ছি। চলুক
এই লেখাগুলো একটা ই-বই হিসাবে বের হবার দাবি রাখে।

______________________________________
যুদ্ধ শেষ হয়নি, যুদ্ধ শেষ হয় না

ধুসর গোধূলি এর ছবি

শিবির হলো শুয়োরের বাচ্চা।
যারা শিবির করে এবং যারা এদের প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সবাই বাংলাদেশের শরীরে ক্যান্সারের মতো। পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই এদের কেটে বাদ দেয়া অবশ্য কর্তব্য। না হলে পুরো শরীরটাই বাতিল হয়ে যাবে।



বিএসএফ—
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকাণ্ড । বিএসএফ ক্রনিক্যালস ব্লগ

অতিথি লেখক এর ছবি

পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই এদের কেটে বাদ দেয়া অবশ্য কর্তব্য। না হলে পুরো শরীরটাই বাতিল হয়ে যাবে।

আপনার মন্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ একমত ধুসর ভাই। জামাত-শিবির নিয়ে কোনও গান নাই, গান আছে 'সহমর্মী' নিয়ে। এখানেই বিশাল প্রবলেম। কম্বল থেকে পশম বেছে ফেলে দেওয়ার যে প্রবলেম।

রাতঃস্মরণীয়

কী কমু [অতিথি] এর ছবি

আমরা কিন্তু বন্ধুবান্ধবেরা প্রায়ই ব্যবহার করি, কুত্তার বাচ্চা, শিবিরের বাচ্চা...শুয়োর আর শিবিরের মধ্যকার তফাৎটুকু অনেক আগেই ঘুচে গেছে।

নাশতারান এর ছবি

এই শ্রমসাধ্য সিরিজের জন্য কৃতজ্ঞতা জানবেন।

_____________________

আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।

জাহামজেদ এর ছবি

ধন্যবাদ ।

____________________________
বৃষ্টির মধ্যে রোদ হয়ে তুই
পাতার গায়ে নাচ
কষ্টের রঙে সুখ হয়ে তুই
আমার মাঝে বাঁচ...

__________________________________
মরণের পরপারে বড় অন্ধকার
এইসব আলো প্রেম ও নির্জনতার মতো
__________________________________

বঙ্গসন্তান এর ছবি

আপনার লিখাটা একটু এদিক ওদিক করে এখানে দেওয়া হচ্ছে...
http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=8b2b3227d4041565691957bba030b4c1
http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=3f14abec624c951312a8876860e0221d&nttl=2011092112124058771&toppos=1

-
বঙ্গসন্তান

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।