আজো সভ্যতার চিবুক চুঁইয়ে পড়ে লুকোনো কালিমা...

আয়নামতি এর ছবি
লিখেছেন আয়নামতি [অতিথি] (তারিখ: বুধ, ০৭/০৫/২০১৪ - ৪:৩৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

'স্লেভ' শব্দটা উচ্চারণের সাথে সাথেই কেন জানিনা অ্যালেক্স হ্যালির রুটসের 'কুন্তাকিন্তে' কথা মনে পড়ে যায়! যে মানুষটা মালিকপক্ষ আর কর্মক্লান্তির নির্মম পেষণেও নিজের শেকড় বিস্মৃত হন না কখনো। 'আই অ্যাম স্লেভে'র মালিয়া যেন কিন্তাকুন্তের পদচিহ্ন ধরে হেঁটে আসা একজন। যে দিনশেষে রোজ নিজেকেই শোনাতো সে কে! কোথায় প্রোথিত রয়েছে তার শেকড়। তার সে শেকড়ের টানে ফিরে যাবার একাগ্রতায় আশকারা পায়না আর্তনাদের হাহাকার; বরং ঢের বেশি একরোখা ইচ্ছে নিয়ে যুযতে থাকে বিরুদ্ধ পরিস্হিতি। সহানুভূতিশীল অনেক মন মালিয়ার সে যাত্রায় জুড়ে গিয়ে তাকে নিজস্ব ঠিকানায় পৌঁছে দেবার জন্য আর্দ্র হয়েছে হয়ত। তাকে বিজয়ী দেখবার জন্য প্রার্থনাও করেছে কায়মনোবাক্যে কেউ কেউ।

" আই অ্যাম স্লেভ" মূলতঃ ম্যানডে নাজেরএর জীবনের ঘটনা ভিত্তিক চলচ্চিত্র। যা হিউম্যান ট্রাফিকিং বা মানব পাচার তথা আধুনিক দাসপ্রথা, মানবাধিকার, মানবতা ইত্যাদির উপর ছায়া ফেলে এবং আমাদের যেন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। মনে প্রশ্ন জাগে সভ্যতার গর্বে গর্বিত আমরা আসলে সত্যিই কতটা সভ্য মানুষ হতে পেরেছি? দুনিয়া জুড়ে এত সব সংস্হা, এত এত সনদ তৈরি এবং তাতে দস্তখত ইত্যাদি কেবলই কি বাণীসর্বস্ব আর ছাপানোর অক্ষর মাত্র? মুভির যে মেয়েটির জন্য আমাদের মানবতাবাদী মন কেঁদে ওঠে; আমাদের নিজ নিজ গৃহে বা কর্মক্ষেত্রে সেইসব 'মালিয়া' কতটুকু নিরাপদ? কতটা স্বাধীন? স্ব স্ব স্থানে আমরাও কি কমবেশি একজন 'লায়লা' কিংবা 'হালিমা' নই?

মনে পড়ে যায় ভীষণ রকম নারীবাদী এক আত্মীয়ার ক্ষোভের কথা। ঢাকা শহরে তখন কাজের মানুষের আক্রা। কম বেতনে বাসা বাড়িতে শ্রম দেবার চাইতে বেশির ভাগ মানুষ বিশেষত মহিলা কাজের মানুষেরা একটু বেশি বেতনের মোটামুটি সম্মানজনক গার্মেন্টসের চাকরিতে ঝুঁকছেন। আত্মীয়ার ক্ষোভ 'আমাদের বাসা বাড়িতে তবে কাজ করবে কে?' বড়লোক এবং স্বাধীন হবার এই আদিখ্যেতার অর্থ বুঝতে অক্ষম আত্মীয়ার কর্মজীবি এই শ্রেণীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা স্বাধীনভাবে বাঁচবার আকাঙ্খা কেন তাদের নারীবাদিতার সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে না সেটা তখন আমার কাছে ঘোলাটে হয়ে যায়। খুব সরলীকরণ হয়ে গেলেও বলা যায় এমন মানসিকতার মানুষগুলোর জন্যই এখনো ভিন্ন নামে দাসপ্রথা ঠিকই টিকে আছে পৃথিবী জুড়ে। যার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই একাডেমি পুরস্কার নিতে আসা 'টুয়েল্ভ ইর্য়াস অ্যা স্লেভ' এর নির্মাতা স্টিভ্ ম্যাককুইনের বক্তব্যে, "Right now, there are Solomon Northups in every region of the world who have been taken away from their families and placed in slavery."


দেশ থেকে দেশান্তরে এর পরিসংখ্যনের দিকে নজর দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
সারা বিশ্বে বর্তমানেপ্রায় ৫৩ মিলিয়ন গৃহকর্মী রয়েছে যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫%। এটি রেকর্ডকৃত সংখ্যা এর বাইরেও রয়েছে আরো কত শত হতভাগ্য মানুষ তার হিসাব কে রাখে! এর মধ্যে ১১.৫ মিলিয়ন গৃহকর্মীর বয়স ১৮ এর নীচে! বিশ্ব ব্যাপী ৭.৫ শতাংশের মানে বিশ্বে প্রতি ১৩ জনে একজন নারী গৃহকর্মী। ল্যাটিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ২৬.৬ শতাংশ বা প্রতি চারজনে একজন। সৌদি আরবে রয়েছে সর্বোচ্চ ৩১.৮ শতাংশ বা প্রতি তিনজনে একজন নারী গৃহকর্মী। আইএলও(ILO) জরিপ থেকে জানা যায় বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ দেশেই আন্তর্জাতিক শ্রম আইন লঙ্ঘন করে থাকে। চীন, ভারত,সৌদি আরব, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ইত্যাদি দেশগুলি এ তালিকার অন্যতম। গৃহকর্মীদের নির্যাতনে সবচে' বেশি এগিয়ে রয়েছে গলফ দেশগুলো যেমন সৌদি আরব, বাহরাইন, আরবআমিরাত।

বাংলাদেশ লেবার ফোর্স সার্ভের২০০৬ এর হিসাব অনুযায়ী দেশে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার, যাদের বয়স ১৫ বছরের উপরে। ধারণা করা হয় বর্তমানে দেশে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ গৃহকর্মে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০১০ অনুযায়ী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে এমন শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার, যাদের বয়স ৫-১৭ এবং শতকরা ৮০ভাগই মেয়েশিশু।

'আই অ্যাম স্লেভ' মুভির শেষাংশে একটি পরিসংখ্যান দেখানো হয় যাতে জানা যায় যে শুধু লণ্ডন শহরেই আনুমানিক ৫,০০০ তরুণী গৃহকর্মী রয়েছে। সুদানে এই সংখ্যাটা প্রায় ২০,০০০। বলাই বাহুল্য এসব হতভাগ্য মানুষগুলোর বরাতে ক্রীতদাসের বেশি আনুকুল্য জুটে না এবং মানুষের পরিবর্তে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি ভাবতেই ভালোবাসে মালিকপক্ষ। পরাধীন একটা জীবন এদের কাটিয়ে যেতে হয় ইচ্ছার বিরুদ্ধে। 'আলিয়া' তার পূর্বপুরুষ 'ম্যাসাভ্যানা( Massavana)'র আর্শিবাদ পাওয়া একজন বলেই হয়ত সেই বূহ্যচক্র ভেঙে মুক্তির স্বাদ পায়। কিন্তু সবাই তেমন ভাগ্যবান নয়।

২০১৩'র ১৩ ডিসেম্বরে মিডিয়া জগতে বেশ তোলপাড় পড়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরগাড়ের আটক এবং তাকে হেনস্হা সংশ্লিষ্ট খবর নিয়ে। তাকে শারিরীকভাবে তল্লাশির ব্যাপারটি প্রশ্নবিদ্ধ করা গেলেও, সেটিকেই ইস্যু করার ফলে আটকের প্রকৃত কারণটি চাপা পড়ে যায় একাট্টা ভারতীয় পদক্ষেপের শোরগোলে। আমরা নিজেদের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির শোক ভুলতে অনেকেই ধন্য ধন্য করে উঠি ভারতের এমন 'সাহসী পদক্ষেপের'। 'গৃহপরিচারিকার ভিসার আবেদনে জালিয়াতির আশ্রয় এবং তাকে নির্ধারিত মজুরির চেয়ে কম মজুরিদেয়ার অভিযোগটি মার্কিন ফেডারেল আদালতের কাছে গুরুতর হলেও আমরা অনেকেই হাই প্রোফাইলের দেবযানীর হেনস্হার ব্যাপারেই বেশী সরব হয়ে উঠি। কম মজুরি পাওয়া গৃহপরিচারিকাটি থেকে যায় আমাদের সহানুভূতির বাইরে। আইএলও(ILO)র সদস্য রাষ্ট্র ভারতভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘনের ছুঁতো তুলে দিল্লিতে আমেরিকান ক্লাব বন্ধ করতে যতটা সোচ্চার হয় ২০১১ ডোমেস্টিক ওয়ার্কাস কনভেনশনসনদের প্রতি ততটাই উদাসীন থেকে যায়। খুব সম্প্রতি নিউইর্য়কস্হ বাংলাদেশি কূটনীতিকের বিরুদ্ধেও এমন আচরণের কথা শোনা গেছে।

সমাজে সুবিধাভোগী শ্রেণীর নিজের সুবিধার জন্য গৃহকর্মী নিয়োগের যে রীতি সে তো আসলে আজকের নয়। এর রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতার ইতিহাসেই রয়েছে দাস শ্রেণীর ঘাম আর রক্তের চিহ্ন। সেসব যুগের মতো প্রকাশ্যে দাস বিক্রির চল আজ হয়ত নেই কিন্তু সেটি লোপ পেয়েছে সে কথা বলা যাবে না। বরং একথা বলা যায় যে, প্রথাটি বর্তমানে হিউম্যান ট্রাফিকিং, সেক্স ট্রাফিকিং ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়েছে। মানুষের অসহায় পরিস্হিতির সুযোগ নিয়ে যা চালু আছে পৃথিবী জুড়ে যেটা কিনা ক্রীতদাস যুগের রেকর্ডকেও হার মানায় অনেকক্ষেত্রে! মানবপাচার বর্তমানে সবচে' দ্রুত বর্ধনশীল একটি ব্যবসা এবং এর সাথে জড়িত রয়েছে পৃথিবীব্যাপী শক্তিশালী কিছু অপরাধী চক্র। ২০০৯/১০ এর হিসাব মতে দুনিয়া জুড়ে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন অসহায় মানুষ এই অপরাধী চক্রটির হাতে পাচার হয়। ২০১২/১৩ হিসাবে বলা হচ্ছে প্রায়২১ মিলিয়ন মানুষ পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়েছে এবং এই পাচারকে ঘিরে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে মানব পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছুটা অগ্রগতির জন্য জাতিসংঘের এ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে প্রশংসিত হলেও দেশটির বিশেষত বর্ডার চেকপোষ্টের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্যের সহায়তায় দিব্বি বেঁচেবর্তে আছে মানব পাচারের এই ঘৃণ্য অপরাধ। ভারত বাংলাদেশের মধ্যে বেনাপোল বর্ডারটি হচ্ছে এক্ষেত্রে অপরাধীদের অভয়ারণ্য। বলাই বাহুল্য এ ব্যবসার লাভের বখরা ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীর অসৎ সদস্যদেরও পকেটস্হ হয়। অসহায় মানুষদের চাকরী, সুন্দর জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হয় যার ভেতরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের শিশু থাকে। এই পাচার শুধুমাত্র ভারতেই করা হয় তা নয় বরং এর ব্যাপ্তি প্রায় পৃথিবী জুড়েই, এবং গন্তব্য নরকসম স্হান। যেখানে বিকিয়ে যায় শরীর, মনুষ্যত্ব!

এমনকি সভ্যতার শীর্ষে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে প্রতিবছর প্রায়৮০০,০০০ শিশু নিখোঁজ হয়। যাদের বয়স ৪ থেকে ৫ বছর এবং এদের বেশির ভাগই মেয়ে শিশু। এসব নিখোঁজ শিশুরা আর ফিরে আসেনা তাদের আত্মীয় পরিজনদের কাছে। কেননা তাদের পাচার করা হয় যৌন ব্যবসার পুজি হিসেবে। নিখোঁজদের প্রায় ৩৩ শতাংশ আবার আফ্রিকান আমেরিকান। নিউইর্য়কে এর পরিমান প্রায় ৬০ শতাংশ।

'স্টপ চাইল্ড ট্রাফিকিং নাও' নামের একটি সংস্হা এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগে সোচ্চার রয়েছে। এমন আরো অনেক সংস্হা পৃথিবী ব্যাপী হয়ে চলা এই ঘৃণ্য অপরাধ ব্যবসার ব্যাপারে সোচ্চার। খুব সম্প্রতি এক অস্ট্রেলিয়ান ব্যবসায়ীর উদ্যোগে ভ্যাটিকান থেকে পোপ ফ্রান্সিস এবং মিশরের আল আজহার মসজিদের প্রধান ইমাম মানব পাচারের ব্যাপারে ধর্মীয়ভাবে মানুষকে সচেতন এবং সর্তক করবার ব্যাপারে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। মানব পাচারের ব্যাপারে পোপ-ইমাম কতটুকু কী করতে পারেন সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এমন ঘৃণ্য অপরাধ দমনে সবার আগে লক্ষ্যবস্তু হবার মত জনগষ্ঠীকে সচেতন করার প্রয়োজন রয়েছে একথা অস্বীকারের উপায় নেই।

'মর্ডান ডে স্লেভারি'র এই চক্রটি যে খুব সহজে এবং কম সময়ে লোপাট করা সম্ভব হবে না সেকথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে 'এন্টি স্লেভারি ইন্টারনেশন্যাল' এর প্যাট্রন এবং 'টুয়েল্ভ ইয়ারস অ্যা স্লেভ' এর নির্মাতা স্টিভ ম্যাক কুইনের এই বক্তব্যে,"I hope that 150 years from now a film will not be made about our ambivalence to slavery. We have to do something about it."
আধুনিক দাসত্বের এধরণের ব্যবসায় ইন্ধন যোগানদার অপরাধী চক্রের সাথে এমন কিছু মানুষ এবং সংস্হাও জড়িত আছে যে নাম শুনলে রীতিমত চমকে উঠতে হয়! কেন প্রায় দেড়শ' বছরের টাইম লাইনের কথা আসে স্টিভ ম্যাককুইনের মন্তব্যে তার সামান্য ইঙ্গিত পাওয়া যায় যেন। এটি একটি সুসংঘবন্ধ চেইনের মাধ্যমে পরিচালিত অপরাধ। যা রাতারাতি বিনাশ করা আলাদিনের প্রদীপের দৈত্যের জন্য সম্ভব হলেও গোটা পৃথিবীর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। এটিকে আধুনিক সভ্য মানুষের জন্য ট্যাজেডি বলা যায় হয়ত।

অসৎ মানুষেরা অসৎ কাজে জড়িত থাকবে এটায় অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু খুব অবাক হই যখন শুনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর কেউ কেউ এই যৌনদাসের ব্যবসার সাথে জড়িত। সেরকম এক ঘটনা ফাঁস করে দেন নেব্রাস্কা'র প্রাক্তন পুলিশ ইনভেস্টিগেটর Kathryn Bolkovac। তিনি জাতিসংঘ বাহিনীতে কর্মরত পুলিশদের হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে কাজ করতেন DynCorp Aerospace এর পক্ষ থেকে। ১৯৯৯ সালে বসনিয়া এণ্ড হার্জেগোবিনায় কাজ করতে গিয়ে তিনি কিছু পুলিশ অফিসারকে সেক্স ট্রাফিকিং এর সাথে যুক্ত থাকতে দেখেন এবং ব্যাপারটি পরবর্তীতে রিপোর্ট করেন। ঘটনাটির সাথে যুক্ত অফিসারদের মিশন থেকে ফেরত পাঠানো হলেও স্বদেশে তাদের কোন বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। অথচ ক্যাথরিনকে চাকরী হারাতে হয় ঘটনাটি ফাঁস করার দায়ে। ঘটনাটি নিয়ে একটি মুভিও তৈরি হয়। সেটা রিলিজের পর ব্যাপারটা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের নজরে আসে এবং তিনি ঘটনার তদন্ত করার আশ্বাস দেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত উক্ত অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানা নেই।

বাধ্যতা মূলকভাবে গৃহকর্মী, যৌনকর্মী, কলকারখানার শ্রমিক ইত্যাদির জন্য পৃথিবী জুড়ে আজ যে মানব পাচারের অতি লাভজনক ব্যবসা চলছে সেটি যে একটি সুসংঘবন্ধ গোষ্ঠীর মাধ্যমে চেইন আকারে পরিচালিত হচ্ছে তাতে সন্দেহ নাই। আধুনিক যুগে আমরা প্রযুক্তির নানান সুবিধার ভোক্তা হওয়ার সাথে সাথে আদিম প্রবৃত্তিটিকেও জিইয়ে রেখেছি অতি চমৎকার ভাবেই। 'গৃহকর্মী দাস নয় শ্রমিক' এটি স্লোগানে ব্যানারে শোভিত হলেও আমরা আধুনিক মানুষেরা বর্বতার সীমা এতটাই লঙ্ঘন করি প্রায়শঃই যা দেখে প্রচণ্ড হিংস্র পশুও লজ্জা পাবে! যে শিশুটির বই হাতে স্কুলে যাবার কথা তাকে হতে হয় আমাদের পাশবিক লালসার স্বীকার। অন্ধকার অস্বাস্থ্যকর কলকারখানার ঘুপচিতে কান পাতলে শুনতে পাওয়া বিচিত্র নয় একজন সলোমন নর্থথুপসের হাহাকার। যে বা যারা জানে তাদের রক্তের বিনিময়ে আধুনিক সভ্যতা ঋদ্ধ হলেও তাদের জীবনে নেই সামান্য সুখের অধিকার।

শুধুমাত্র আইন কিংবা বাণীতে নয় সবার আগে যেদিন আমরা সত্যিকার মানুষ হিসেবে নিজেদের দাঁড় করাতে পারবো, যেদিন সত্যিই বিশ্বাস করবো এই পৃথিবীতে সৃষ্টির প্রত্যেকটি মানুষের রয়েছে বাঁচবার সমান অধিকার; সেদিনই হয়তবা আমাদের উপর থেকে মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে জোর জুলুমের অভিশাপের কালো মেঘ সরে যাবে। আমাদের সবার মাথার উপর একভাবে নীল আকাশটার মুক্ত আলো পড়তে সক্ষম হবে। আমরা যারা শখ করে বলি 'দাসের জীবন কাটাচ্ছি' তারা আসলে ভাবতেও পারবোনা সত্যিকারের একজন দাসের জীবন কতটা অভিশপ্ত! আমাদের পক্ষে একজন সত্যিকার দাসের কষ্ট অনুভব করা কখনোই সম্ভব না।

পৃথিবীর তাবৎ আলিয়া, সলোমনেরা কবে তাদের হারানো পরিবার-ঘর ফিরে পাবার অধিকার পাবে জানা নেই। শুধু তাদের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী হোক, জীবনের অফুরন্ত আনন্দ যজ্ঞে তারাও হোক আমাদের সমান, এমন একটা স্বপ্ন দেখি, খুব বেশিই দেখি!

-----------------------------------
উৎস:

১. উইকি(ক), (খ),
(গ)

২. মারকুইনব্লগ সিএনএন ডককম

৩. ছবিসূত্র

৪.বাজফিড ডটকম

৫. যায় যায় দিন

৬. কালের কন্ঠ

৭. বাংলানিউজ২৪ ডটকম

৮. নতুনবার্তা ডটকম

৯. গ্লোবালভয়েস

১০. আমানপ্যুর ব্লগস ডট সিএনএন


মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

চলুক খুব দরকারী, খুব ভাল লেখা আয়নাদিদি।
মানুষের জন্য মানুষকে দাস করে রাখা - এই চরম ঘৃণ্য আচরণ মানুষ, সেই মানুষ যে নিজেকে বিবেকী বলে মনে করে থাকে, কি করে করে আমার বোধে আসে না। আর এর ব্যাপকতা এত সর্বস্তরে, দেখলে শিউরে উঠতে হয়। প্রায় সমস্ত গৃহকর্মীদের প্রতিই যে দাস-খাটানোর আচরণ-ই করা হচ্ছে, তাদের খাটিয়ে নেওয়া মানুষ(!)দের সেটা বোধেই আসে না! আর শিশু গৃহকর্মীদের কেউ কি করে ব্যবহার করতে পারে, আমার ছোট মাথায় আসে না। আমার দৈনন্দিন জীবনে যে আমাকে ঐ ভয়ংকর অমানবিক কাজটা করতে হয় না, তার জন্য নিজেকে অশেষ সৌভাগ্যবান মনে করি। কিন্তু মনটা কুঁকড়ে যায় যখন ভাবি, সামাজিক ভাবে এই পাপের আমিও এক অংশীদার। হায় সভ্যতা!

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

আয়নামতি এর ছবি

সামাজিক ভাবে এই পাপের আমিও এক অংশীদার। হায় সভ্যতা!

চলুক মন খারাপ

আয়নামতি এর ছবি

জ্বী, ঠিক করে দিলাম আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-
*
আম্রিকার কথা শুনে এক ফ্রেণ্ড ঠিক এমনই আঁতকে ওঠে বলেছিল, কী বলিস এসব?
অসম্ভব ওদের এক বাচ্চা হারাইলেই সাদাবাড়ি কেঁপে ওঠে....হেহেহে যেন আমি বানিয়ে বলছি কিছু!
*
মানুষের এই স্ববিরোধীতাই তার জন্য বড় ট্র্যাজেডি হয়ত বা মন খারাপ

দীনহিন এর ছবি

নেব্রাক্সা'র

নেব্রাস্কা হবে না, আয়না?

মনকি সভ্যতার শীর্ষে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে প্রতিবছর প্রায়৮০০,০০০ শিশু নিখোঁজ হয়।

ভীতিকর তথ্য! খোদ আমেরিকাতেই?

আধুনিক দাসত্বের

মানুষ স্বাধীন হতে চায়, আবার মানুষ অন্যকে পরাধীনও করতে চায়, বেসিক হিউম্যান ইন্সটিংট, তাই দাসত্ব থেকে যায় চির আধুনিক, বারবার ফিরে আসে নতুন নতুন ফর্মেটে! অন্যকে পরাধীন করার সাধ তাই মানুষের যায় না অবলুপ্তির আগ পর্যন্ত!

.............................
তুমি কষে ধর হাল
আমি তুলে বাঁধি পাল

মন মাঝি এর ছবি

চমৎকার লেখা! চলুক

ইয়ে, রুট্‌সের নায়কের নাম কিন্তাকুন্তে না - 'কুন্তাকিন্তে' হবে। 'Kunta Kinte'।

****************************************

আয়নামতি এর ছবি

এহহে! পুরাই উল্টে দিয়েছিলাম দেখি নামটা খাইছে
বেপুক আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- মনমাঝি।

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

আমি অনেককাল ধরেই বলে আসছি, ক্রমাগত প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে বটে, সভ্যতার নয়।
শেষ লাইনে একটা টাইপো নজরে পড়লো,
অফুরান্ত > অফুরন্ত।
লেখাটার জন্য মানে বিষয় নির্বাচণের জন্য গুরু গুরু

আয়নামতি এর ছবি

শুধু শুধু বিজ্ঞানের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেদের কালি ঢাকতে আমাদের মত ওস্তাদ আর নেই।
আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- টাইপো ঠিক করে নিলাম।

মেঘের কান্না এর ছবি

আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে আরও উন্নত করার চেষ্টায় কতকিছুইনা উদ্ভাবন করে চলেছি। নিজেদেরকে আধুনিক ভাবছি, হাঁ আধুনিক হয়েছি হয়তো অনেক কিছুতেই, কিন্তু মানুষ নামের আড়ালে কিছু পশুর (যারা পশুর চাইতেও অধম) ধারাল থাবায় আমাদের সমাজ সবসময় মুখ থুবড়ে পরে। আয়্নাদি আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই লিখাটির জন্য গুরু গুরু । আমার কেন জানি মনে হয় আমরা যারা এই সচলায়তনে প্রায় আসি তাদের মধ্যেও কেউ আছেন যিনি হয়তো জানেন না যে তার মধ্যেও সেই পশুটি প্রতিদিন ক্রীতদাস বানিয়ে চলেছে অন্য কাউকে। সবার প্রতি অনুরোধ আমরা সবাই মিলে নিজেরাও আরো সচেতন হই এবং আমাদের সমাজকে আরো সচতন করি। Our collective actions can make a difference.

আয়নামতি এর ছবি

Our collective actions can make a difference

চলুক

তুলিরেখা এর ছবি

আয়নামতি, লেখাটা কী আর বলি! অনেক কথা বলার ছিল, কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না। মন খারাপ
সীমাহীন নিষ্ঠুরতার সামনে মূক হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী ই বা করতে পারি।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

আয়নামতি এর ছবি

সীমাহীন নিষ্ঠুরতার সামনে মূক হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী ই বা করতে পারি।

মন খারাপ

তাহসিন রেজা এর ছবি

চমৎকার লেখা!

আলিয়া, সলোমনদের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী হোক এই প্রত্যাশা।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

আয়নামতি এর ছবি

আলিয়া, সলোমনদের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী হোক এই প্রত্যাশা।

চলুক

নীড় সন্ধানী এর ছবি

২০১২/১৩ হিসাবে বলা হচ্ছে প্রায়২১ মিলিয়ন মানুষ পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়েছে এবং এই পাচারকে ঘিরে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হচ্ছে।

কী সাংঘাতিক ব্যাপার। কয়েক কোটি মানুষ পাচার হচ্ছে বছরে!! এই বিষয় নিয়ে তেমন কোন তোলপাড় নেই। যেন মেনেই নিয়েছে সবাই।

বাংলাদেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মী নির্যাতনের যে ভয়াবহ সংবাদ পত্রিকার পাতায় মাঝে মাঝে আসে, তার চেয়ে বহুগুন বেশী অন্তরালে থেকে যায়। আমাদের অজান্তে মানুষ কত ভয়াবহভাবে দাসবৃত্তির নোংরা জালে আটকে আছে তা কল্পনাও করা যায় না। মন খারাপ

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

আয়নামতি এর ছবি

বাংলাদেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মী নির্যাতনের যে ভয়াবহ সংবাদ পত্রিকার পাতায় মাঝে মাঝে আসে, তার চেয়ে বহুগুন বেশী অন্তরালে থেকে যায়। আমাদের অজান্তে মানুষ কত ভয়াবহভাবে দাসবৃত্তির নোংরা জালে আটকে আছে তা কল্পনাও করা যায় না।

মন খারাপ

অতিথি লেখক এর ছবি

নাড়িয়ে দেয়া লেখা!

-আনন্দময়ী মজুমদার

আয়নামতি এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- আনন্দদি।

অতিথি লেখক এর ছবি

আমরা যারা শখ করে বলি 'দাসের জীবন কাটাচ্ছি' তারা আসলে ভাবতেও পারবোনা সত্যিকারের একজন দাসের জীবন কতটা অভিশপ্ত! আমাদের পক্ষে একজন সত্যিকার দাসের কষ্ট অনুভব করা কখনোই সম্ভব না।

মন খারাপ

আয়নামতি এর ছবি

মন খারাপ

আনোয়ার সাদাত শিমুল এর ছবি

ভালো তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। চলুক

আয়নামতি এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

দুর্দান্ত এর ছবি

ভাল লাগলো।

আয়নামতি এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভাল লেখা। কিন্তু এরকম লেখা লিখতে না হলেই ভাল হত।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

আয়নামতি এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

তারেক অণু এর ছবি

গুরুত্বপূর্ণ লেখা। কুন্টা কিন্টে শুনেই হারিয়ে গিয়েছিলাম রুটসে

সাফিনাজ আরজু এর ছবি

গুরু গুরু
এমন সব লেখায় কি বলা উচিত বুঝে উঠতে পারিনা। মন খারাপ

__________________________________
----আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে---

প্রোফেসর হিজিবিজবিজ এর ছবি

মন খারাপ

____________________________

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

মন খারাপ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।