স্নানক্লান্তি

অনীক আন্দালিব এর ছবি
লিখেছেন অনীক আন্দালিব [অতিথি] (তারিখ: বুধ, ২৪/০৬/২০০৯ - ১১:২৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

auto
পানির ফোয়ারা মুখ থেকে অনর্গল সাপের মতো ফোটায় ফোটায় পানি ছুটে আসছে। প্রথমে তারা উচ্ছ্বাসে ঝাপটা দিল আমার কপালে, ঈষৎ নিচু করে রাখা মুখে দ্রুত গড়িয়ে নামল তারা, সদলবলে, সোল্লাসে। চোখের পাতা কেঁপে উঠলো কিছুটা, পানিবিন্দুর ভারে আবেশে বুঁজে এলো। পানির রথের সেদিকে খেয়াল নেই, দুর্দান্ত দাপটে সে গাল, চিবুক, ঠোঁট, থুতনি পেরিয়ে গেল অনায়াসেই। তারপরে কেউ কেউ ঝরে গেল সুদূর টাইল্‌সে। মহাপতন! কেউ কেউ সেই ঊর্ধ্বমুখী চলনে গড়িয়ে গেল গলায়, গোপনে-
গোপন সুখের মত আমি চোখ বুঁজেই থাকি। পানির অবিশ্রাম ধারা ঝরছে, অঝোরে, নিভৃতে। গলারভাঁজ থেকে গ্রীবার সমতলে তারা ছুটে চলে। নীরব, কিন্তু নিরলস। আমি খেয়াল করি পিঠের ওপরেও আছড়ে পড়ছে ক্ষুদেকণা, বিম্বিসার পথের মত, সেখানে পথ তৈরি হয় অচিরে। গহনপথের ঠিকানায় ঘোলা ঘামের দাগ বিস্মৃত হয়, যেভাবে আমি আমার শৈশব ভুলে গ্যাছি, যেভাবে গতকালের জীবন হারিয়ে ফেলেছি। সেভাবে জরুরি প্রত্যাদেশের মত নোটিশ ঝুলে উঠল পিঠে, জলের দাগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্লাবনেরও অধিক শোক মুছে দিতে পারে।
পানির ঢেউ আরো নিচে নেমে যেতেই থাকে আমাকে শিউরে দিয়ে। চোখ খুলে আমি পানির রঙ দেখি, উন্মনা দেহের সৌরভের মত রঙ পাঁপড়ির সামনে খেলা করে। চারপাশে পানির দোলায়মান দেয়াল, দুলছে, নাচছে, সরে যাচ্ছে, কাছে আসছে। আমিও অজান্তেই মাথা দুলাই। ঘুরতে থাকে পৃথিবী আমার চারপাশে, মানুষেরা বিম্বের মত বশংবদ হয়ে সঙ্গী হতে থাকে, কাতার কাতার মানুষ, অজস্র অসংখ্য অচেনা অবয়ব ঘিরে ধরে আমাকে। আমি টের পাই জলের পর্দার বাইরে সকলে হা হা করে আমার দিকে হাত বাড়িয়েছে। ডাকছে, আয়! আয়!
কিন্তু আমি নড়তেও পারি না। অচল পাথরের মত নিস্তব্ধ হয়ে আমি আমার শরীরে ক্রমাগত ঝাঁপিয়ে পড়া পানি, আর ঝরে পড়া বিন্দু গুনি। তার বাইরের পৃথিবী ঝাপসা, ক্রমশ দূরাগত, অভিমানী! সামনে ও পেছনে পানিপথে প্রবল স্রোত, আমি ভেসে যাই খড়কুটোর মত। নিঃশ্বাসেও জলজ অক্সিজেন আমার ফুসফুসে নৃত্য শুরু করে দেয়। আমি আরাম পাই, ধীরে ধীরে আমার পেশি শিথিল হয়ে আসে, চোখ বুঁজে ফেলি আবার, এবং এবারে আমি আর সেটা খুলতে চাই না। শুধুই অবিরাম বর্ষণ। শুধুই ঝরোসুর। শুধুই নীরবতায় পানির গান। আঁধারের পর্দা নেমে এলে আমার কোষ জেগে ওঠে পলিদ্বীপের মত, বাইশখালি চরের মত। চরের ধবল বালুর মত আমার শরীরে ভিন্‌রূপী ত্বক হেসে ওঠে। আমি চোখ না খুলেই অবাক হয়ে তার খিল খিল হাসি শুনি।
একটা সময়ে নেমে আসা পানির স্রোত থেমে যায়, স্রোতের ভেতরে বিন্দুর রথ স্থবির হয়ে আসে, উড়তে থাকা বাষ্প কণাও ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে আমার খুলির ভেতরে সেঁধিয়ে যেতে থাকে। আমি চোখ খুলি না তখনও, শিথিল শরীরে পড়ে থাকে শাদাটে হাড়ের মত সিক্ত মেঝেতে। শরীরে লেগে থাকা পানির বিন্দুগুলো সহোদর-মায়ায় মাটিতে নেমে আসতে থাকে, আমার আতিথেয়তা বুঝি তাদের আর ভালই লাগে না! দূরের পর্দার ওপাশে মূর্তির মত স্থির মানুষের মুখ, শতসহস্র মানুষের নির্বাক চোখ আমার বন্ধ চোখের ভিতর দিয়েও আমাকে বিঁধতে থাকে।


মন্তব্য

সাইফ তাহসিন এর ছবি

গোপন সুখের মত আমি চোখ বুঁজেই থাকি। পানির অবিশ্রাম ধারা ঝরছে, অঝোরে, নিভৃতে।

অসাধারণ!!
চলুক

=================================
বাংলাদেশই আমার ভূ-স্বর্গ, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী

অনীক আন্দালিব এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ সাইফ। এই লেখায় অনেকগুলো অপ্রকাশ্য অনুভব আনতে চাইছিলাম, লেখার পরে মনে হলো কিছুই আসেনি...
আপনার ভালো লাগা জেনে কিছুটা ভরসা পেলাম। হাসি

শামীম রুনা এর ছবি

চমৎকার!

_________________________________________________________
খাতার দিকে তাকিয়ে দেখি,এক পৃথিবী লিখবো বলে-একটা পাতাও শেষ করিনি।

_________________________________________________________
খাতার দিকে তাকিয়ে দেখি,এক পৃথিবী লিখবো বলে-একটা পাতাও শেষ করিনি। ( জয় গোস্মামী)

অনীক আন্দালিব এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ শামীম রুনা। আপনার চমৎকারিত্বে আমার ভাল লাগা রইলো।

দুষ্ট বালিকা এর ছবি

as usual... তোমার উপমায় আমি তব্দিত...:|

--------------------------------------------------
একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী...

**************************************************
“মসজিদ ভাঙলে আল্লার কিছু যায় আসে না, মন্দির ভাঙলে ভগবানের কিছু যায়-আসে না; যায়-আসে শুধু ধর্মান্ধদের। ওরাই মসজিদ ভাঙে, মন্দির ভাঙে।

মসজিদ তোলা আর ভাঙার নাম রাজনীতি, মন্দির ভাঙা আর তোলার নাম রাজনীতি।

অনীক আন্দালিব এর ছবি

উপমা ব্যবহার কমাতে চাইছিলাম। এ লেখায় কিন্তু সেটা কিছুটা কমই আছে, আগের লেখার চাইতে। আর উপমা অনেক সুন্দরী। তার সাথে মোলাকাত না হলে যে বিস্বাদ ঠেকে! চোখ টিপি

তব্ধা দ্রুত কাটিয়ে ওঠো, হারানো পথ খুঁজে পাইবা! হাসি

অনীক আন্দালিব এর ছবি

তরল জল নিয়ে লিখলাম, সেটা আবার স্নানঘরের আর্দ্রতায় বাষ্পও হচ্ছিলো। তাতেও কঠিন!! এরপরে তাহলে ইট কাঠ নিয়ে লিখবো, সেটা বেশ সহজ হবে, নাকি বলেন? চোখ টিপি

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

প্রচন্ড গরমে লেখাটা পড়ে একটু মনে হয় গা জিরিয়ে গেলো। ৫।

অনীক আন্দালিব এর ছবি

জ্বি, গরমে তো আমিও ভিজতেছি, পাঁপড়ের মত ভাজি হয়ে গেছি। বড়ো কোমল ভঙ্গুর হয়ে আছি, কেউ আলতো চাপ দিলেই মড়মড় করে ভেঙে যাবো! আমারও গা জুড়ানো দরকার ছিল, গত তিনদিন ধরে লেখাটা লিখবো ভাবছি, কিন্তু ঠিক গুছিয়ে নিতে পারছিলাম না, গরমের অত্যাচারে কী আর বলবো। এখন লেখার পরেও মনে হচ্ছে পুরো স্নানের কথা লেখা হয়নি।
পাঠের জন্য ধন্যবাদ প্রেমিক সাহেব।

ফারুক হাসান এর ছবি

দারুণ!
স্নানের বর্ণনা ভালো লেগেছে।

অনীক আন্দালিব এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ ফারুক। উৎসাহ পাচ্ছি খুব। হাসি

মামুন হক এর ছবি

অসাধারণ লেখা অনীক, খুব ভালো লাগল।
কিন্তু আমার একটা অন্যায় আবদার আছে, ছবিটা আমি ধার করতে চাই, একটা গল্প মাথায় আটকে আছে অনেকদিন তার প্রচ্ছদ হিসাবে ছবিটা খুব মানাবে। খুবই অন্যায় আবদার হলে মানা করে দিবেন মাইন্ড করবনা হাসি

অনীক আন্দালিব এর ছবি

ছবি মানে এইখানে যে ছবিটা ঝুলছে, সেটা তো? ওটা আমার তোলা নয়, সুতরাং আমার অনুমতির কোন দরকার নাই। তবু যখন বলছেন, আমি নাহয় আল্‌গা ভাব নিয়ে অনুমতি দিয়ে দিলাম। চোখ টিপি
ছবিটাতে ক্লিক করলেই, যেখান থেকে নিয়েছি, সেটা পেয়ে যাবেন। নির্দ্বিধায় ব্যবহার করুন।
লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। হাসি

সিরাত এর ছবি

অনেকটা নজরুলের দুরন্ত পথিকের সাথে মিল পেলাম শেষ দিকটায়।

ভাল লেগেছে, বেশ ভাল। এ ধরনের লেখাই আপনার বৈশিষ্ট্য; চালিয়ে যান!

অনীক আন্দালিব এর ছবি

আর তাই তো! আমি নিজেও লেখার সময়ে খেয়াল করিনি। শতসহস্র মুখের বর্ণনার ছবিটা পাকাপাকিভাবে মস্তিষ্কে বসে গেছে। এরকম গদ্যও ছিল বটে ওটা। আমি আসলেই খেয়াল করিনি বলে বেশ চমকে যাচ্ছি এখন।

মনোযোগ দিয়ে পড়লেন, খুব ভালো লাগলো সেটা। ধন্যবাদ মনওয়ার।

তীরন্দাজ এর ছবি

বাহ্ ! ভীষন কাব্যিক গদ্য আপনার!
**********************************
কৌনিক দুরত্ব মাপে পৌরাণিক ঘোড়া!

**********************************
যাহা বলিব, সত্য বলিব

অনীক আন্দালিব এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ তীরন্দাজ। পড়লেন জেনে ভালো লাগলো। হাসি

শাহেনশাহ সিমন [অতিথি] এর ছবি

চলুক

অনীক আন্দালিব এর ছবি

ধন্যবাদ সিমন। হাসি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।