বিচ্ছিন্ন ভাবনা: বাংলা সাহিত্যে পারিবারিক উত্তরাধিকার

আরিফ জেবতিক এর ছবি
লিখেছেন আরিফ জেবতিক (তারিখ: শুক্র, ০৮/০৬/২০০৭ - ৬:৩৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:
আজকে প্রথম আলো পত্রিকায় একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় দেখলাম।শুক্রবারের সাহিত্য পাতার প্রথম পৃষ্ঠাটি পুরোটাই সাজিয়ে দেয়া হয়েছে লেখিকা তাহনিমা আনাম আর তার বই "গোল্ডেন এজ" দিয়ে। তাহনিমা আনামের বইটি এখনও আমার পড়া হয় নি।ওয়ার্ড এন পেজ-এ গত সপ্তাহে জিজ্ঞেস করেছিলাম,বললো সব কপি শেষ! কয় কপি এসেছিল সেটা পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম,কাউন্টারে থাকা লোকটি শুধু হাসলো।(পেলেও কিনতাম কি না নিশ্চিত না,কারন দেশে যখন ভালো মন্দ ইংরেজী বইগুলোর পাইরেটেড কপি ১০০/১৫০ টাকায় পাওয়া যায়,তখন কোন না কোন তাহনিমা আনামের বই বারোশো টাকা দিয়ে কিনলে মধ্যবিত্তের বুকে খচ খচ করেই।) প্রথম আলো'র লেখা আর স্বাক্ষাৎকারে কৌশলে তাহনিমা আনামকে বড়ো লেখিকা হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করা হয়েছে।সব বইয়ের কপি শেষ,সেটাও জোর গলায় বলা হয়েছে,এবং এ'ও বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে ইংরেজী ভাষায় মঞ্জু ইসলাম ছাড়া এই প্রথম কোন বাংলাদেশী লিখলেন। কে জানে,হতেও পারে।মনিকা আলীকে বাংলাদেশী বলা যাবে কি না সেটা নিয়ে হয়তো প্রথম আলো'র কোন সিদ্ধান্ত আছে। যাক,তাহনিমা আমার আলোচনার বিষয় না।তার যা ইচ্ছা করুক,ভালো লিখে বাঙালির মুখ উজ্জল করুক,খাস দিলে দোয়া করি। কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে,রাজনীতির মতো আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিতেও কি পারিবারিক উত্তরাধিকার চালু হবার লক্ষন দেখা দিয়েছে? সংস্কৃতিতে তো এই বিষয়টি বেশ কিছু দিন ধরেই চলছে।নাটককের কর্তাব্যক্তিদের ছেলে মেয়েরা হুটহাট ভালো ভালো চরিত্রে অভিনয় করছেন।কিন্তু লেখালেখির ক্ষেত্রেও যদি এই ট্রেন্ড চাল হয় তাহলে আমাদের দূ:খের সীমা থাকবে না। রবীন্দ্র কিংবা নজরুলের ছেলে মেয়ের নাম আমরা জানি না,জানার প্রয়োজনও পড়ে নি,কিন্তু হুমাযূন আহমেদের ছেলের নাম আমার জানি।দুধের বাচ্চা ইদানিং বই লিখছেন,সেই বই ঘটা করে পাবলিশ হচ্ছে,অথচ কতো শতো তরুন একটা ভালো প্রকাশক পেতে গলদঘর্ম হচ্ছে। এখন মাহফুজ আনামের কন্যা তাহনিমা আনাম যদি বাবার জোরে প্রথম আলোতে বিশাল ফোকাস পান,হুমায়ুন পুত্র নুহাশ যদি বড়ো লেখক হয়ে যান আর হুমায়ূন আজাদের কন্যা মৌলি কিংবা সৈয়দ হকের পুত্র দ্বিতীয় হক যদি আগামী বই মেলায় বই লেখার ঘোষনা দেন,তাহলে সেটা দেখে আমার বিমর্ষ হবার কিছু নেই। তবু কেন জানি বিরক্তি লাগছে। উপেন্দ্র সন্তান সুকুমার রায় সবাই হতে পারে না,এটা যতো তাড়াতাড়ি আমাদের লেখক নন্দনরা বুঝবেন,ততোই তাদের বাপেদের প্রতি সুবিচার করবেন বলেই আমার ধারনা।

মন্তব্য

ভাস্কর এর ছবি
আমি পড়তে শুরু করছিলাম...মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস...কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পইড়া ইংরেজীতে "ব্যর্থ্য হুমায়ুন আহমেদীয়" মনে হইতেছিলো বিধায় আর আগাইতে পারি নাই। মৌসুমরে কইছি পারলে পইড়া কইও কি লিখছে...এর চাইতে ভারতীয় বিক্রম শেঠও উচু মাপের ইংরেজী ভাষার লেখক বইলা আমার কাছে প্রতিভাত হইছে। ----------------------------------------------------- বরফখচিত দেশ ক্যান এতোদূরে থাকো!

স্বপ্নের মতোন মিলেছি সংশয়ে...সংশয় কাটলেই যেনো মৃত্যু আলিঙ্গন...

আরিফ জেবতিক এর ছবি
বিষয়টি তাই হতে পারে।কারন তাহনিমা নাকি আগে কোনদিন কিছু লেখালেখি করেন নি,হঠাৎই একটা ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে ভর্তি হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাস নিয়ে উপন্যাস লিখলেন। মজার ব্যাপার হলো,সেই বইতে নাকি কোন রাজাকারের কথা উল্লেখ নেই,মানে ঐসময় যে এন্টি মুক্তিযুদ্ধ একটি পলিটিক্যাল বাঙালি সুবিধাবাদী ছোট ফোর্স ছিল,সেটি তিনি সযতনে এড়িয়ে গেছেন।এ কারনে এড়িয়ে যেতে হয়েছে ১৪ ডিসেম্বরের ঘটনাটিকেও। আর তখনই লেখিকার চরিত্র,মাহফুজ আনামের চরিত্রের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
আরিফ জেবতিক এর ছবি
ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স করে কেউ যদি নিজেকে ভালো লেখক হিসেবে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারেন,সেটা ভালোই।বাংলা একাডেমীর তরুন লেখক প্রকল্প থেকে ভালো কেউ বেরুলে আমি জানি না,কিন্তু আমি অনেকগুলো ছাগলকে সেই কোর্স থেকে বেরুতে দেখেছি।
কনফুসিয়াস এর ছবি
যতদূর জানি, এই উপন্যাসটাও ঐ কোর্সেরই রিকোয়ারমেন্ট হিসেবে লেখা। প্রথমবার এটা শুনে মনে হয়েছিলো, এসাইনমেন্ট হিসেবে যেই গল্পটা লেখা, সেটাই পাবলিশার পেয়ে গেলো কেমন করে? এখনো পড়ি নাই বইটা, তাই কেমন হয়েছে বলতে পারবো না। তবে সত্যি যদি ভাল হয়, তাহলে তো বাংলাদেশের জন্যে ভালই। -কনফুসিয়াস

-----------------------------------
বই,আর্ট, নানা কিছু এবং বইদ্বীপ

হাসিব এর ছবি
আরিফ জেবতিক এর ছবি
আমার জানা মতে এই সব কোর্সের লেখাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রকাশক যোগাঢ় করে ছাপিয়ে দেয়।অনেকটা ইন্টার্নিশিপ জোগাড় করে দেয়ার মতো।(তাহমিনা জানিয়েছেন,এখানেও তাই ঘটেছে।) আমার পয়েন্ট অন্য জায়গায়।আসলেই কি কবি সাহিত্যিকদের ছেলে মেয়ে হলেই ভালো লিখবেন?যে পরিমান ফোকাস পাচ্ছেন,তাতে তো তাই মনে হচ্ছে।
হাসান মোরশেদ এর ছবি
দখলদারিত্বের সংস্কৃতি । দেখাযাবে,বিজ্ঞাপনের কল্যান আর মিডিয়ামোঘলদের সাহচর্য্যে এই বালিকা বাংলাসাহিত্যের কালোমুখ আলো করছেন, হয়তো বিশ্বসভায় ও স্থান পাচ্ছেন । বাংলা একাডেমির লেখকপ্রকল্প বেশ মজার জিনিস ছিলো। আমাদের কেউ কেউ গিয়েছিলো তো । প্রকল্প শেষে বিনামুল্যে বই ছাপানোর ও একটা ব্যবস্থা ছিলো মনে হয় । শফিক-তালেয়া দম্পতি ও এরকম 'নিবিড় লেখক খামার'গড়েছিলো । -------------------------- আমি সত্য না হলে গুরু সত্য কোনকালে?

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

নিঘাত তিথি এর ছবি

দেখাযাবে,বিজ্ঞাপনের কল্যান আর মিডিয়ামোঘলদের সাহচর্য্যে এই বালিকা বাংলাসাহিত্যের কালোমুখ আলো করছেন, হয়তো বিশ্বসভায় ও স্থান পাচ্ছেন ।

ভবিষ্যত বানী তো দেখি সত্যি হলো!
----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ

আরিফ জেবতিক এর ছবি
শফিক-তালেয়া দম্পতি কিন্তু অন্য আইটেম বানিয়েছিল।তারা লেখালেখি শিখাচ্ছিল না,তারা নিজেদের গোত্রের লেখকদের একসাথে দেখার জন্য দিনব্যাপী সম্মেলন করছিল।(যায়যায়দিনকে দৈনিক করার প্রথমবারের প্রয়াস।)তারা সেটাকে বলতো "লেখক সম্মেলন" মানে আগেই স্বীকার করে নিয়েছিল যে সেখানে যারা আছেন,তারা লেখক এবং সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। তারপর প্রোগ্রামে বিস্তর খাওয়া দাওয়া আর সুন্দরী অংশগ্রহনকারীনিদের ব্যাপক ভিড় ছিল,ঢাকা শহরে থাকা ছিল ফ্রি, যথেচ্ছা ফলের জুস আর কফি খাওয়া যেত,(গাড়িভাড়া দিসিল কি না মনে নেই),টী শার্ট,কলম,ক্যাপ,ফাইল,ফ্রি কয়েকটা বই..জিতে রহো শফিকজি,তার বিরুদ্ধে এই বিষয়ে কোন কথা নেই আমার(চামহাসি)।
হিমু এর ছবি
মহিলার নাম মনে হয় তাহমিমা ... যাই হোক। বইটা হাতে আছে, কিন্তু পড়া শুরু হয়নি। এমনকি বইটা নিয়েও কিছু পড়া হয়নি। কানে শুনে যা বুঝতে পারছি, যুদ্ধকালীন সময়ে কোন মহিলার চোখে দেখা ঘটনা নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিয়ে লেখা সবকিছুতে রাজাকার বা বুদ্ধিজীবী নিধনের প্রসঙ্গ উঠে আসবে এমন আশা করিনা। সব উপন্যাসকে যে যুদ্ধের কালপঞ্জী হতে হবে, এমনও মনে করিনা। হয়তো আমাদের অভ্যাস গড়ে উঠেছে এমন সব ক্লাসিক উপন্যাস পড়ে যেখানে যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটুকুর এক আখ্যান রচিত হয়ে যায়। অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের কথা বলতে পারি, কী অদ্ভুত দুঃখজাগানো বর্ণনা, এখনও পড়লে পলের জন্য, কাৎসিনস্কির জন্য কান্না চলে আসে চোখে। উপন্যাস শুরু হয় যুদ্ধক্ষেত্রে, কিন্তু বার বার ফিরে আসে যুদ্ধের শুরু, আর উপন্যাস শেষ হয় পলের মৃত করোটিতে প্রজাপতির উচ্ছ্বাসে। কিন্তু যুদ্ধের ভেতরে একজন মানুষ তো সবটুকু দেখতে পাবে না, সে দেখবে তার আক্রান্ত জীবনকে। আমি আমার মাকে মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করি যুদ্ধের সময়ের নানা অভিজ্ঞতার কথা, সেখানে আক্রান্ত হবার, পালিয়ে বেড়ানোর তেমন কোন তীব্র ঘটনা নেই, আবার আমার এক বন্ধুর বাবা, সারাটা মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শুধু পালিয়ে বেড়িয়েছেন এখান থেকে ওখানে ... এক একজনের কাছে তো যুদ্ধ এক এক রকম। এর একটা অংশ নিয়ে কেউ যদি কিছু লেখে, তার মধ্যে নতুন কিছু তো থাকার কথা। হুমায়ূন আহমেদের অনেক লেখাই আমি পড়ি না, কিন্তু ভদ্রলোক বখে যাবার আগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসাধারণ কিছু গল্প লিখেছেন, যুদ্ধকালীন জীবনের খন্ডিত অংশ নিয়ে। উপন্যাসের বিস্তৃতি নিয়ে লেখার কাজটা কঠিন, সেজন্যেই অনেকে হয়তো লেখে না। তাহমিমার লেখাটা যদি এমনই কোন গল্পের ব্লোআপ হয়, তাহলে বলতে হবে এটা একটা সাহসী গবেষণা। উপন্যাসটা শুরু না করে মান নিয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না। তবে মিডিয়া যাঁরা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁরা নিজেদের সন্ততিকে প্রোমোট করবেন না, এমন আশা আমরা এই ২০০৭ এর বাংলাদেশে বসে না করলেই বোধহয় বাস্তবতার ধারেকাছে থাকা যাবে। তাছাড়া ভারতীয়রা যখন ইংরেজি সাহিত্যে নিজেদের Fair share বুঝে নেবার জন্য যেমন খুশি তেমন লিখে নামযশ কুড়ানোর ইঁদুরদৌড়ে লিপ্ত, সেখানে বাংলাদেশের একজন তাহমিমা কেন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? তবে তাহমিমাই প্রথম ইংরেজি লিখিয়ে, এ মন্তব্য প্রথম আলোর অজ্ঞতাপ্রসূত। আদিব খান বহু আগে থেকে লিখছেন।
আরিফ জেবতিক এর ছবি
আপনার কথার সাথে একমত।বিশেষ করে উপন্যাসের ব্যাপ্তি নিয়ে যেটা বললেন,সেটার সাথে।বইটি পড়ার আগে কনটেন্ট নিয়ে মন্তব্য করতে পারছি না। আর আমাদের যে প্রচুর ইংরেজী ভাষায় লিখিয়ে মৌলিক লেখক দরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেটি আমিও বহুদিন ধরে ভাবি। তাহমিমা (স্যরি,আগে ভুল করেছি) সম্মন্ধে আমার কোন আলাদা জাজমেন্ট নেই।আমার আসল ফোকাস হচ্ছে অন্য জায়গায়। আমি আশংকা করি,যে হারে সব লেখকের পুত্র কন্যাগন বাই বর্ণ লেখক হয়ে যাচ্ছেন,সেটি হয়তো ভবিষ্যতে একটি ক্যাচাল হয়ে দাড়াতে পারে।
সৌরভ এর ছবি
বই পড়ি নাই তাই কমেন্ট করার দুঃসাহস দেখাচ্ছিনা । তবে ডেইলি স্টার আর প্রথম আলো পড়ার সুবাদে খবরটা দেখছিলাম, আজ সাময়িকীর সাক্ষাৎকারটাও পড়লাম। সবশেষে, হাসান মোরশেদের কথাটাই মনের মধ্যে বাজতে থাকলো অনেকক্ষণ । দখলদারিত্বের সংস্কৃতি । রাজনীতি অথবা রাষ্ট্রশাসন পেরিয়ে এখন সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও । কথাটা কেন মনে হলো, বলি । একটা বই বাজারে আসার আগেই, লোকে জানার আগেই যখন "ম্যানিপুলেটেড সাড়া" তৈরি করা হয় - তখন এ ছাড়া আর কী বলার থাকে? ------ooo0------ এই আমি যদি জেগে উঠি অন্য কোন সময়ে অথবা অন্য কোন পৃথিবীতে ,তবে কি পারতাম আমি অন্য একজন হয়ে উঠতে ?

আবার লিখবো হয়তো কোন দিন

হিমু এর ছবি
আমার ব্যক্তিগত ভাবনা হচ্ছে, লেখকদের পুত্রকন্যা লেখালেখির জগতে আসার আগে কয়েকবার চিন্তা করে দেখা উচিত। কারণ একটা বড়সড় প্রত্যাশার ভার তাদের স্কন্ধে আগে থেকেই চাপানো থাকে। অমুকের ছেলে বা অমুকের মেয়ে, কাজেই অন্তত অমুকের মতই লিখতে হবে, এমন একটা মধ্যবিত্ত প্রত্যাশার পাহাড় তাদের সামনে তৈরি হয়ে যায়। প্রত্যাশাভঙ্গের পরিণতি সাধারণত করুণ হয়। তবে বাবার বা মায়ের গরম করে যাওয়া তাওয়ার পরোটা সেঁকতে যারা আসছেন, তারা কিন্তু আগের চেয়ে অনেক নিষ্ঠুর পৃথিবীতে লিখবেন, এ চিন্তাটা মাথায় থাকলেই হলো। তবে শেষ পর্যন্ত নিজের লেখা দিয়েই টিকে থাকতে হয় লেখককে, বাপের নাম মায়ের নাম বিস্মৃত হতে থাকে একটু একটু করে।
আরিফ জেবতিক এর ছবি
ঠিক@হিমু।
হিমু এর ছবি
ভারতীয় বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত যাঁরা এখন লিখছেন এবং নাম কামাচ্ছেন, তাঁদের একটা বড় অংশের ফোকাস হচ্ছে অভিবাসন। অভিবাসীদের জীবন, সংস্কৃতির সংঘর্ষ, প্রজন্মান্তরে দূরত্বের বৃদ্ধি, ঘুরে ফিরে এসবই। আমাদের দেশে বসে কেউ তেমন একটা লেখেন না, হয়তো লেখার মতো প্ল্যাটফর্ম বেশি তৈরি হয়নি বলেই। বাংলাদেশ এত অসম্ভবের দেশ, একজন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনপঞ্জীও পাকা হাতে পড়লে অসাধারণ উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে। তাহমিমা শুরু করেছেন আমাদের ইতিহাসের মহত্তম অধ্যায় দিয়ে, এ যেমন গৌরবের বিষয়, একই সাথে তিনি এড়িয়ে গেলেন যুদ্ধের নৃশংসতাটুকু (জেবতিক আরিফের পোস্টের সূত্র ধরে বলছি, মূল লেখাটি পড়িনি), সেটিও কিন্তু হবে একটি পলায়নবাদিতার উদাহরণ। তিনি বলতে পারেন, তিনি যা খুশি তা নিয়ে লিখতে পারেন, কিন্তু এ-ও সত্যি যে উপন্যাসটি একটি মৃদু বার্তা বহন করবে এর পাঠকসমাজের কাছে। অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট উপন্যাসটির উদাহরণ টানি আবার, এর পরতে পরতে বন্ধু হারানোর বেদনা আছে, পড়ে একটা ক্লাস সিক্সের বাচ্চাও বুঝবে যুদ্ধ হলে মানুষ একা হয়ে যায়, একা হতে থাকে। যদি রেমার্ক এখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কোন রক্তক্ষয়ের কথা না লিখতেন, ক্লাস সিক্সের একটা বাচ্চা হয়তো ভাবতো যুদ্ধ জিনিসটা খারাপ কিছু নয়। কামরুজ্জামান কামুর একটা কবিতা আছে, যেখানে একজন আক্ষেপ করে যুদ্ধকে বলছে কয়েকজন মানুষের প্রচন্ড শব্দ করা, যে শব্দ শুনে তার পছন্দের হাঁসগুলি গ্রামের জলা ছেড়ে উড়ে চলে গেছে, এবং তারা আর ফিরে আসে না। খুব চমৎকার এবং বিষণ্ন এই কবিতাটা যদি আজ মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে, অনেকের কাছেই মুক্তিযুদ্ধের কোন আবেদন থাকবে না (অরনিথোলজিস্টরা ছাড়া) হয়তো। আমি নিজেও চাই না, একটা উপন্যাস শুধু হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনের ফিরিস্তি হয়ে থাকুক, কিন্তু পাশাপাশি তাতে চিহ্ন থাকা জরুরি, কারণ বই মানুষ ফিরে ফিরে পড়ে, বিভিন্ন সময়ের মানুষ বিভিন্ন ছাপ খোঁজে একটা বইয়ের মধ্যে। তাহমিমার বইতে সে মেসেজ যদি না থাকে, তাহলে অন্য কাউকে লিখতে হবে।
ভাস্কর এর ছবি
হিমু আমি তাহমিমার সমালোচনা যেই কারনে করছিলাম সেইটা হইলো বইয়ের যেই কয় পাতা আমি পড়ছিলাম তাতে দুইটা পরিবারের কচকচি ছিলো...মুক্তিযুদ্ধে মধ্যবিত্ত একটা পরিবারের টেনশনরে রূপায়িত করতে চাইছেন লেখক। কিন্তু এই জমানায় আইসা যদি ব্যর্থ হুমায়ুন আহমেদ হইতে হয়...আমি তারে ব্যর্থ হুমায়ুন আহমেদ কইছি এর মানে আমি হুমায়ুন আহমেদরে খারাপ বলতেছিনা। সে হুমায়ুন আহমেদরে ব্যর্থ অনুকরণ করনের চেষ্টা করছে সেইটাই বলতে চাইছি। ভারতের অনেকেই ইংরেজীতে অভিবাসনধর্মিতার বাইরেও লিখতাছেন বা লিখছেন আর খ্যাতিও পাইছেন...যেমন বিক্রম শেঠ'এর যেই বইটার কথা আমি কইচি আগে ঐটাও তার নিজের পরিচিত গন্ডীর মানুষরে নিয়াই লিখা। অমিতাভ ঘোষের প্রথম বইটাও তাই...আরকে নারায়ন কিম্বা এখনকার রোহিতন মিস্ত্রীএ ভারতের কাহিনীই লিখে... আপনের ঐ জায়গাটা আমারো শুনতে ভালো লাগছে...যুদ্ধ থাকলেই খুন-ধর্ষণ-লুটপাট থাকতে হইবো এইটা নেসেসারি না। একজন রাজাকারের পরিবারের যাতনাও মুক্তিযুদ্ধের বিষয় হইতে পারে। কিন্তু এই ধরনের উপন্যাসে বরং বানাইয়া লিখনের স্কোপ কম, নিজের অভিজ্ঞতা না থাকলে পরে তাতে অনেক গবেষণা লাগে...নাইলে ক্যাচাইয়া যাওনের সম্ভাবনা থাকে। আর ইংরেজী ভাষাটাও পইড়া আরাম পাই নাই... ----------------------------------------------------- বরফখচিত দেশ ক্যান এতোদূরে থাকো!

স্বপ্নের মতোন মিলেছি সংশয়ে...সংশয় কাটলেই যেনো মৃত্যু আলিঙ্গন...

আরিফ জেবতিক এর ছবি
আমি যেহেতু বই পড়িনি,তাই কনটেন্ট নিয়ে আলোচনা মুলতবি থাকলো। কিন্তু যতোদূর জেনেছি,তিনি লিখেছেন ঢাকার অবরুদ্ধ কাহিনী,আর সেখানে ইন্টারকন্টিনেন্ট হোটেলের বোমা হামলার ঘটনাটাও আছে। অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে একজন মধ্যবিত্ত মানুষ যদি রাজাকারের কথা না জানেন,তাহলে আমার বলার কিছু নেই। হুমায়ূনের অনিল বাগচীর একদিন অথবা মুহম্মদ জাফর ইকবালের রাশেদের ডায়েরী তে যে ছোট ছোট মুক্তিযুদ্ধ কাহিনী উঠে এসেছে,সেটার সাথে অবরুদ্ধ ঢাকাকে উপজীব্য করে লেখা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের তফাত আছে। তাহমিমা শুরু করেছেন,খুশির খবর।কিন্তু তাকে নিয়ে যদি এতো লাফালাফি হয়,তাহলে তো নিজেরই ক্ষতি।হয়তো কোন একদিন তার পক্ষে পোড় খাওয়া এক লেখক হবার সম্ভাবনা ছিল,বাবা মাহফুজ আনাম আর চাচা মতিউর সাহেব বুঝি আর সেটা হবার সুযোগ রাখতে চাইছেন না।
হিমু এর ছবি
ভাস্কর ভাই, আসলে আমিই লজ্জিত, আমার কথাটা পড়লে মনে হয় আমি আপনার লেখার ত্রুটি নির্দেশ করছি। তবে হুমায়ূন আহমেদ অনেকদিন যাবৎ খারাপ লেখে, এই কথা জোর দিয়ে বলতে কুণ্ঠিত না আমি। তবে হুমায়ূন আহমেদের দৌড় মধ্যবিত্ত পর্যন্ত, এবং মধ্যবিত্তের জীবনচিত্রণের মধ্য দিয়ে একটা উপন্যাসের স্তরও "মধ্যবিত্ত" হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাকেই যে আপনি হুমায়ূন আহমেদীয় বলেছেন, সেটা বোধহয় ধরতে পেরেছিলাম। তবে তাহমিমা নাকি সাত বছর ধরে উপাত্ত ও উপাদান সংগ্রহ করেছেন, সত্যি নাকি? অমিতাভ ঘোষ কিন্তু চট করে চলে গেছেন ইতিহাসের ঘটনাশ্রয়ী উপন্যাসে. ইন অ্যান অ্যান্টিক ল্যান্ড কিংবা দ্য গ্লাস প্যালেসের কথা ধরেন? রোহিন্তন মিস্ত্রি নিজের সম্প্রদায়ের গন্ডি নিয়ে লেখেন, শুরুও করেছিলেন ভারতভাগ নিয়ে (আ ফাইন ব্যালান্সের কথা বলছি), কিন্তু ফ্যামিলি ম্যাটারস এ এসে, দেখেন, অভিবাসনমুখী একটা পরিবারের কাহিনী উঠে আসে। আর কে নারায়ণ পড়ে দেখিনি এখনও। তবে এঁরা সবাই অন্য সময়ের। এখন যারা লিখছেন, যারা প্রথম বই, দ্বিতীয় বইতে এসে খ্যাতির শিখরে উঠে যাচ্ছেন, তাদের হাইপটা অভিবাসন নিয়ে, এটাই বলতে চাইছিলাম।
আরিফ জেবতিক এর ছবি
অভিবাসন নিয়ে ইংরেজীতে বেশি লেখালেখি করছেন উপমহাদেশীয় লেখকরা কারন বইয়ের বেশির ভাগ পাঠকই ইংরেজী ভাষাভাষি প্রবাসী কিন্তু এই মাটিরই সন্তান।তাদের একটা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস হচ্ছে এই সময়ে,জেনারেশন গ্যাপ হচ্ছে,সে জন্যই এই বইগুলো পাঠকপৃয়তা পাচ্ছে। মনিকা আলীর বৃকলেনও বিচ্ছিন্ন কোন লেখা নয়,এই ট্রেন্ড এরই ধারাবাহিকতা।
হিমু এর ছবি
তাহমিমাকে নিয়ে হৈচৈ হবেই। এ হচ্ছে পিঠ চুলকানোর ব্যাপার। মনিকা ইউনুসকে নিয়েও হৈচৈ হবে, হৈচৈ হবে যে কোন হোমড়াচোমড়ার ছেলেমেয়েকে নিয়ে। এখন পৃথিবীটাই বিপণনের যুগে। মিডিয়াতে হৈচৈ না হলে কেউ পাত্তা পায় না।
আরিফ জেবতিক এর ছবি
প্রচার দরকার।আমাদের ছেলেমেয়েরা যদি আন্তর্জাতিক বইয়ের বাজারে ভালো অবস্থান নেয়,তাহলে আমাদের সবার জন্যই সুখবর। কিন্তু প্রচার অপরিপক্ষকে ধ্বংস করে দেয়,এটাও খেয়াল রাখাটা সেলিবৃটিদের সন্তানদের নিজ স্বার্থেই দরকার।
সুমন চৌধুরী এর ছবি
পড়ি নাই। ....................................... ঋণম্ কৃত্বাহ ঘৃতম্ পীবেৎ যাবৎ জীবেৎ সুখম্ জীবেৎ
কনফুসিয়াস এর ছবি
জমে গেছে। ঠিক এইরকম আলোচনাই চাই! -যা দেখি তা-ই বলি...

-----------------------------------
বই,আর্ট, নানা কিছু এবং বইদ্বীপ

মুহম্মদ জুবায়ের এর ছবি
মজা লাগলো। বইটা আমরা কেউ পড়িনি! তাতেই এতো এতো আলোচনা। প্রথম আলোর আর দোষ কী!

-----------------------------------------------
ছি ছি এত্তা জঞ্জাল!

হিমু এর ছবি
:) @ জুবায়ের। এই আলোচনা-তর্ক-মতদ্বিমতেরঘূর্ণিঝড় আরো জমে উঠুক। যোগ দিন যোগ দিন।
শোহেইল মতাহির চৌধুরী এর ছবি
না পড়ে এত কথা। পড়া শেষ হলে আরো কত হবে...কে জানে... একটা তথ্য যোগ করি। আজকের পশ্চিমা বিশ্বে প্রায় সব বাণিজ্যমুখী লেখকরাই ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স করে থাকেন। এটা সাধারণত: মাস্টার্স হিসেবে করেন সবাই। তার আগে তারা লিটারেচারের ওপর ডিগ্রি করেন। হলিউডের বেশিরভাগ নবীন স্ক্রিপ্টরাইটাররা ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স করে এসেছেন। লেখালেখি আজকাল অনেক টেকনিক্যাল হয়ে গেছে। টেলিভিশনের সোপগুলো পর্যন্ত লেখে এমন সব ট্রেইনড লোকজন। বড় ধরনের বাণিজ্য। প্রযোজকরা রিস্ক নেয় না। আপনারা আরেকটু ধৈর্য ধরেন। একজন লেখকের প্রথম বই তার শেষ বই না। বিকশিত হতে দেন। নতুবা নবীনদের কলম তো অচল হয়ে যাবে।

-----------------------------------------------
মানুষ যদি উভলিঙ্গ প্রাণী হতো, তবে তার কবিতা লেখবার দরকার হতো না

আরিফ জেবতিক এর ছবি
কলম অচল হবে কেমনে?সচলায়তনে লেখকের প্রথম বই না পড়েই আলোচনা হলো,এটা কি লেখকের কম বড়ো এচিভমেন্ট? (চামহাসি'র ইউমোকটিন।কেমনে দেয় জানি না)
হিমু এর ছবি
:D @ আরিফ।
উৎস এর ছবি
হুমায়ুন আহমেদের ছেলে আসলেই গল্প লিখেছে?
আরিফ জেবতিক এর ছবি
গল্প না উপন্যাস কি জানি লিখছে।গত বইমেলায় দেখলাম অন্যপ্রকাশের স্টলে ঘটা করে প্রকাশনা উৎসব করছে।হুমায়ূন আবার সেটা নিয়ে নাকি খুব উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন।(হতেই পারে,বাবা বলে কথা)

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।