যে তরঙ্গ সন্ধান দেয় এক নতুন মহাজাগতিক সমুদ্রের....

বাহাউদ্দীন এর ছবি
লিখেছেন বাহাউদ্দীন [অতিথি] (তারিখ: সোম, ১৫/০২/২০১৬ - ১২:২৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

(আমি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হলেও এই লেখায় ইচ্ছা করেই পদার্থবিজ্ঞানের ভাষা এবং সংজ্ঞাগুলো খুব শক্তভাবে ব্যবহার করি নি... কারণ আমার লেখার উদ্দেশ্য মানুষকে বিজ্ঞানটা বুঝানো না, বিজ্ঞানের মানবিক দিকটা তুলে ধরা! এজন্য বিজ্ঞানমনস্ক পাঠকের কাছে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি!)

আমি বসে আছি আমাদের রাইস ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের হলরুমে, বিশাল বড় স্ক্রিনে আমাদের ইউনিভার্সিটির ছাত্র-শিক্ষকরাও যোগ দিয়েছেন লাইগোর (লেসার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি) প্রেস কনফারেন্সে... ফ্যাকাল্টিদের সবার মাঝে বেশ চাপা উত্তেজনা, আর আমাদের মত গণ্ডমূর্খ পি.এইচ.ডি ছাত্ররা ভাব ধরে বসে আছি যে সব বুঝতে পারছি! কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘোষণা আসলো যে, লাইগো গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে!! সাথে সাথে সবার হাততালি! আমিও যে খুব বুঝে হাততালি দিলাম তা না, শুধু এইটুকু জানতাম যে আইনস্টাইনের প্রায় ১০০ বছর আগের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি এর প্রথম সরাসরি প্রমাণ আমরা পেয়েছি! তার মানে গত ১০০ বছর ধরে আমরা যেই থিওরিকে আঁকড়ে ধরে তিল তিল করে আমাদের মহাবিশ্বকে জানার এবং বোঝার থিওরিগুলো দাঁড় করিয়েছি, সেগুলো আসলেই শক্ত মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে... আরও একবার প্রকৃতির রূপ রহস্যের খোঁজে মানুষের কৌতূহল আর কল্পনাশক্তির জয় হল। এমন সময় তাকিয়ে দেখি সামনের দিকে বসে থাকা আমাদের কসমোলজির এক প্রফেসর চশমা খুলে চোখ মুছছেন। হঠাৎ মনে হল, আসলেই আমরা অসম্ভব অসাধারণকে মাটিতে নামিয়ে ফেলেছি... বছরের পর বছর ধরে লেগে থাকা পৃথিবীর সেরা মেধাবী এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখা মানুষগুলোর পরিশ্রম বিফলে যায় নি... সেইসব স্বপ্নবাজ মানুষগুলো কিসের পিছনে ছুটেছেন সেইটা একটু বুঝার জন্যই এই লেখা!

পেছনে ফিরে দেখাঃ
গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষের কথা উঠলেই আমাদের মনে আসে নিউটন সাহেব আর তাঁর আপেলের কথা! কিন্তু মহাকর্ষের অস্তিত্ব নিয়ে মানুষ অনেক আগে থেকেই চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলঃ যেমন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অ্যারিস্টটল! তিনি বিশ্বাস করতেন যে কোন কিছুকে ছুঁড়ে দিলে সেটা আবার মাটিতে ফিরে আসে, কারণ সে জানে যে কোথায় তার থাকার কথা। তিনি যুক্তি দিয়ে এটাও বুঝিয়েছিলেন যে ফিরে আসার সাথে কোন কিছু কতটা ভারী সেটারও খুব ভালো একটা সম্পর্ক আছে, কারণ ভারী জিনিস দ্রুত পড়ে কিন্তু হালকা জিনিস আস্তে ধীরে পড়ে! (যদিও যুক্তিটা আসলে ভুল, হাল্কা জিনিস পরে পড়ে কারণ বাতাসের সাথে ঘর্ষণ)।
তারপর অনেক বছর পার হয়ে গেছে, গ্রীক এবং মুসলিম দার্শনিকরা এই সমস্যা নিয়ে ভেবেছেন, কেউ যুক্তি দিয়ে, কেউবা ধর্ম বা দর্শন দিয়ে সমাধান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তেমন গুছানো কোন কাজ আর পাওয়া যায়নি। ১৬-১৭ শতকের দিকে এসে গ্যালিলিও গ্যালিলি একটা দারুণ পরীক্ষা করেন, তিনি প্রমাণ করেন যে, একটা ভারী আর একটা হালকা জিনিস নিয়ে যদি একই উচ্চতা থেকে ফেলে দেয়া হয়, তাহলে দুইটা একই সময় এসে মাটিতে এসে পড়বে! (পিসার টাওয়ারের সেই বিখ্যাত পরীক্ষা, যেটা আসলেই ওই টাওয়ারের উপর থেকেই হয়েছে কিনা সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে!)। গ্যালিলিওর পরীক্ষার একটা অসাধারণ উপসংহার আছেঃ সেটা হল, কোন কিছুর মাটিতে পড়ার ত্বরণ সব সময় একই থাকে (বাংলায় বললে, যত উপর থেকে পড়বে তত গতিবেগ বাড়বে, এবং এই গতিবেগ বাড়ার হার ভারী বা হালকা বস্তু সবার জন্য একই... এমন না যে, হালকা হলে তাড়াতাড়ি গতিবেগ বাড়বে, বা ভারী হলে আস্তে আস্তে বাড়বে... সবার জন্য গতিবেগ সময়ের সাথে একই হারে বাড়বে)! এই উপসংহার পরবর্তীতে অনেক বছর পর আইনস্টাইনকে মহাকর্ষ তত্ত্ব বা জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি দাঁড়া করাতে সাহায্য করেছিল।

তার কিছুদিন পরেই আসলো নিউটন আর তাঁর আপেল। নিউটন সাহেব পরীক্ষা করে দেখলেন, এই দুনিয়ার যে কোন দুইটা জিনিসের মধ্যে সব সময় একটা আকর্ষণ কাজ করে। এটার মানে হল পৃথিবী যে শুধু আমাকে বা আপেলকে আকর্ষণ করে তা না, আপেল আর আমিও একজন আরেকজনকে আকর্ষণ করছি !! কিন্তু পৃথিবী বিশাল বড় বলে, আপেল আর আমার আকর্ষণ দৈনন্দিন জীবনে বুঝা যায় না ! পরীক্ষা করে নিউটন সাহেব আরও পেলেন যে, যে দুইটা জিনিস একজন আরেকজনকে আকর্ষণ করছে, তারা যত ভারী হবে, আকর্ষণের শক্তিও (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় “বল”) তত বেশি হবে!! আবার এই দুইজনকে যত দূরে রাখা হবে, তাদের আকর্ষণও সেই অনুযায়ী তত কমে যাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়ঃ দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক)!! নিউটন এই আকর্ষণ শক্তির নাম দিলেন গ্র্যাভিটি (বাংলায় মহাকর্ষ)!! নিউটন আরও একধাপ এগিয়ে বললেন, যে এই মহাকর্ষ ব্যাপারটা শুধু পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ না, গোটা মহাবিশ্ব বা বিশ্বজগতই এই নিয়ম মেনে চলে! বিজ্ঞানীসমাজ তখন এই সুত্র ধরে হিসাব করে দেখালেন যে ঘটনা সত্যি! চাঁদের জন্য জোয়ার-ভাটা, পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের ঘূর্ণন, সূর্যের চারদিকে পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহগুলোর ঘূর্ণন সবই আসলে এই মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল দিয়ে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়! তবে সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি বুধ গ্রহের কক্ষপথ হিসাবে খুবই খুবই সামান্য গরমিল পাওয়া গিয়েছিল, যেটা তখনকার বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, যন্ত্রপাতির ত্রুটি বা সূত্রে সামান্য পরিমার্জন করলে ঠিক হয়ে যাবে।
ভালো কথা, আমরা জানলাম, মহাকর্ষ বলে একটা বল আছে, যেটা দিয়ে আমরা সারাক্ষণ সবাই একে অপরকে টানাটানি করি। কিন্তু এখন আরও বড় প্রশ্ন!! আমাদের কি এমন ঠেকা পড়েছে এই টানাটানি করার!? মানে পৃথিবী কিভাবে বুঝে বা আপেল কিভাবে বুঝে যে অন্য কিছুকে টানতে হবে এবং ঠিক একটা নির্দিষ্ট বলেই টানতে হবে!! এই ব্যাপারটা নিয়ে নিউটনসহ সমসাময়িক অনেক বড় বড় বিজ্ঞানী চিন্তিত ছিলেন, অস্বস্তিতে ভুগতেন, কিন্তু সঠিক কোন ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেননি!

২০ শতকের শুরুর দিকে আইন্সটাইন একটা ব্যাখ্যা হাজির করলেন। ব্যাখ্যাটা বলার আগে আমি একটু পাঠককে প্রস্তুত করে নিতে চাই! এই ব্যাখ্যাটা খুব সম্ভবত ভিডিও দিয়ে দেখালে খুব সহজেই বুঝিয়ে ফেলানো যায়, তাও আমি লিখে বুঝানোর চেষ্টা করব!

মনে করি, আমাদের চারপাশে আমরা যা কিছু দেখি, তার কিছুই নেই। আমি নেই, আপনি নেই, ঘরবাড়ি, গাছপালা, পশুপাখি কিছুই নেই, এমনকি, পৃথিবী-চাঁদ-সূর্য, ওই দুরের নক্ষত্রগুলোও নেই... কোন কিছুই নেই। তখন আসলে কি থাকবে? সবকিছু না থাকলেও দুইটা জিনিস থাকবেঃ একটা হল ফাঁকা জায়গা আর আরেকটা হল সময়। একসাথে বললে বলা যায় স্থান-কাল (স্পেস-টাইম)! আইন্সটাইন বুঝেছিলেন, যে এই মহাবিশ্ব হল স্থান-কালের বুনন দিয়ে তৈরি, আর এই স্থান-কাল সবসময় জ্যামিতি মেনে চলে!

স্থান-কাল এর খুব সুন্দর একটা উদাহরণ আছেঃ ধরুন আপনি সুই-সুতা দিয়ে একটা চাদর বুনলেন এরপর চাদরটাকে শুন্যে ঝুলিয়ে টান টান করে তার চারটা মাথা আপনার ঘরের চার কোণে পেরেক দিয়ে আটকে দিলেন। এটা হল একটা দ্বিমাত্রিক মহাবিশ্ব, কারণ চাদর এর শুধু দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ আছে! এবার আসল গল্পে যাইঃ ধরুন চাদরের উপর আপনি একটা হালকা ছোট বল সোজা গড়িয়ে দিলেন... তাহলে কি হবে? বলটা সোজা গড়িয়ে যাবে। এবার একটু আলাদা কিছু করি। চাদরের মাঝখানে আমি একটা বিশাল বড় আর ভারী বল রাখি... এখন কি হবে? চাদরটা দেবে যাবে, তাই না? এবার আগের মত আপনি একটা হালকা ছোট বল সোজা গড়িয়ে দিন। দেখবেন এবার আর হালকা ছোট বলটা সোজা যেতে পারছে না, সে ভারী বলটার চারদিকে কিছুটা বৃত্তাকার বা গোলাকার পথে ঘুরে যাচ্ছে কিম্বা ঘুরতে গিয়ে বৃত্তাকার পথে আটকা পড়ে যাচ্ছে এবং একসময় ভারী বলটার কাছে গিয়ে পড়ছে! আইন্সটাইন তাঁর অসাধারণ মেধা দিয়ে এই ব্যাপারগুলো কল্পনা করেছিলেন, এবং অসংখ্য চিন্তা-পরীক্ষা (থট-এক্সপেরিমেন্ট) করেছেন! শেষ পর্যন্ত তিনি বলেছেন এরকম কিছুঃ (বিখ্যাত বিজ্ঞানী হুইলারের ভাষায়) “স্থান-কাল পদার্থের উপস্থিতিতে বক্র হয় বা বেঁকে যায়, আর পদার্থ যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায় তখন এই স্থান-কালের বক্র পথটাকে মেনে তাকে যাওয়া-আসা করতে হয়”। এই ঘটনার জন্য আমাদের মনে বিভ্রম হয় যে, গ্র্যাভিটি বলে কোন আকর্ষণ আছে। যেমন, আমরা দেখি পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে, এবং আমরা ভাবি সূর্যের সাথে পৃথিবীর কোন অদৃশ্য আকর্ষণ আছে! কিন্তু পৃথিবী আসলে স্থান-কালের চাদরে সোজাই যেতে চাচ্ছিল, কিন্তু সূর্যের মত ভারী জিনিস স্থান-কালের চাদরকে দাবিয়ে ব্যাঁকা করে রেখেছে... এখন পৃথিবী বেচারা কি করবে! আমার যাওয়ার রাস্তাই যদি বাঁকা থাকে, আমি যতই রাস্তা ধরে সোজা গাড়ি চালাই না কেন আমি তো খালি ঘুরতেই থাকব... এজন্যই পৃথিবী ঘোরা পথে আটকে থাকে। সোজা বাংলায়, আসলে কোন আকর্ষণ নেই, যেটা আছে সেটা হল বিশুদ্ধ জ্যামিতি।

এই অসম্ভব কল্পনা শুনতে যতই অসাধারণ লাগুক, এটা মানুষ কেন বিশ্বাস করবে? আর বিজ্ঞানীরা তো আরও নাকউঁচু, শক্ত যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া কোনভাবেই এই জিনিস তারা মানবেন না। সুতরাং আইন্সটাইন এটার জন্য গাণিতিক মডেল দাঁড়া করালেন। আমাদের জগত তো আর বিছানার চাদর না, আমাদের জগতে স্থানের ৩টা মাত্রা আর সময়ের ১টা, সব মিলিয়ে আইন্সটাইন একটা চতুর্মাত্রিক স্থান-কালের জ্যামিতি দাঁড়া করালেন, তাতে বক্রতা, পদার্থের অস্তিত্ব এবং গতি, এবং সেই গতির ফলে স্থান-কালের উপর প্রভাব সব ঢেলে তিনি দাঁড়া করালেন তাঁর বিখ্যাত ফিল্ড ইকুয়েশন! গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ থেকে আরম্ভ করে আমরা যা কিছু নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারতাম, সবকিছু আবার নতুন করে আইনস্টাইনের মডেল দিয়ে হিসাব করে দেখা হল। দেখা গেলো, আইনস্টাইনের মডেলও নিখুঁতভাবে সবকিছু বলে দিতে পারে, এমনকি বুধ গ্রহের কক্ষপথ হিসাবে যে সামান্য গরমিল ছিল, সেটাও দশমিকের পর অনেকঘর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে আইনস্টাইনের স্থান-কাল তত্ত্ব সঠিক হিসাব করে দিতে পারে!

অসাধারণ একটা থিওরি, কিন্তু বিশাল ঝামেলা আছে। ঝামেলাটা বলিঃ ধরা যাক, কোন কারণে হুট করে আমাদের সূর্যটা ভোজবাজির মত হারিয়ে গেলো! এক নিমেষেই উধাও বলে যাকে! প্রশ্ন হল, সূর্য উধাও হলে কতক্ষন পর পৃথিবী সেটা বুঝবে আর কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ে যাবে? নিউটনের মহাকর্ষীয় সুত্র অনুযায়ীঃ সূর্য নাই, তো আকর্ষণ নাই। সুতরাং পৃথিবী সঙ্গে সঙ্গে তার কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়বে! কিন্তু এখানে দুইটা ব্যাপার আছেঃ এক হলঃ আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি (সময় ও স্থান দুইটাই আপেক্ষিক) অনুযায়ী, আলোর চেয়ে বেশি গতিবেগে কোন খবর আসার কথা না, পৃথিবী থেকে সূর্য পর্যন্ত আলো আসতে প্রায় সাড়ে ৮ মিনিট লাগে, সুতরাং সাড়ে ৮ মিনিটের আগে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ার কথা না! দুই নাম্বার ব্যাপারটা হলঃ আমরা একটু আগে চাদর দিয়ে যেই পরীক্ষা করছিলাম, সেখানে আমি যদি হুট করে বড় ভারী বলটা সরিয়ে দেই, তাহলে কি হবে? চাদরটা উপরে নিচে দুলতে দুলতে আস্তে স্থির হবে! ওই সময় চাদরের উপরে থাকা ছোট বলটা কি দেখবে? সে দেখবে যেখানে ভারী বলটা ছিল সেখান থেকে ঢেউয়ের মত আসছে এবং সে তরঙ্গ এর প্রথম ঢেউ আসার পরেই সে বুঝতে পারবে যে মাঝের ভারী বলটা আর নাই!! মানে সে কিছুদূর আগের পথ গিয়েই সাথে সাথে বুঝতে পারবে যে স্থান-কাল আর বক্র নাই, সুতরাং তাকে আর ঘুরতে হবে না, সে এখন সোজা পথে চলতে পারবে!

এখন প্রশ্ন হলঃ কোনটা ঠিক? মহাকর্ষ কি আসলে একটা আকর্ষণ বল যেটা সবাইকে একটা অদৃশ্য সুতো দিয়ে আটকে রেখেছে আর টানাটানি করছে? নাকি আসলে পুরা ব্যাপারটাই আইনস্টাইনের কল্পনার মত? স্থান-কালের জ্যামিতি? যদি আইনস্টাইনের কথা ঠিক হয়, তাহলে এই স্থান-কালে ওই ঢেউগুলো নিশ্চয়ই তৈরি হওয়া সম্ভব বা এখনি এরকম ঢেউ তৈরি হচ্ছে এবং আমরা খুঁজলে পাব... এই ঢেউগুলোর নাম এজন্য মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ! এখন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যদি থাকে তাহলে স্থান-কালের এই কন্সেপ্ট বা চিন্তাটাও ঠিক, তার মানে দাঁড়াবে, স্থান-কাল আসলেই বক্র হয়, এবং আসলেই অংকের জ্যামিতি দিয়েই মহাবিশ্বের এই আকর্ষণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব, ঠিক যেমনটা আইন্সটাইন তাঁর জেনারেল রিলেটিভিটির ফিল্ড ইকুয়েশনে করেছিলেন!

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের খোঁজেঃ
আইন্সটাইনের স্থান-কালের বক্রতার তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য ১৯৬০-৭০ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা উঠেপড়ে লাগলেন। এখন প্রশ্ন হল এই তরঙ্গ কোথায় পাওয়া যাবে? উত্তর খুব সহজ, আমাদের চারপাশেই। আমরাই তো সারাক্ষণ এরকম তরঙ্গ তৈরি করছি। কিন্তু সমস্যা হল, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুবই দুর্বল। আমাদের চেনা জানা একটা বল হল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বা তড়িৎ -চৌম্বক বল, যেটার জন্য পজিটিভ চার্জ নেগেটিভ চার্জকে আকর্ষণ করে আবার দুইটা একই চার্জ একে অপরকে বিকর্ষণ করে। আমরা যদি দুইটা ইলেক্ট্রনের মহাকর্ষীয় বলের তুলনায় তড়িৎ- চৌম্বকবলের তুলনা করি তাহলে মহাকর্ষীয় বল তড়িৎ-চৌম্বকবলের ০.০০০০...(৪২টা শুন্য)...০০০.১ ভাগ! কিন্তু তারপরও মহাকর্ষীয় বলই বেশি প্রাধান্য পায়, কারণ এর কোন বিকর্ষণ নাই, শুধু আকর্ষণ আছে (ডার্ক এনার্জি বাদে)। এখন এত দুর্বল তরঙ্গ খুঁজে পেতে হলে আমরা সাধারণ প্রাণী বা বস্তু যথেষ্ট না, এমনকি আমাদের পৃথিবী বা সূর্যের মত ভারী বস্তুও যথেষ্ট না। (ভুলে যাওয়ার আগে আবার মনে করিয়ে দেই, সূর্য কিন্তু পৃথিবী থেকে ৩৩০,০০০ গুণ ভারী!) সূর্যের চেয়েও ভারী নক্ষত্র আছে আমাদের মহাবিশ্বে যেগুলো সূর্যের ভরের ২০, ৫০ বা ১০০ গুণ। এধরণের নক্ষত্রগুলো তাদের জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সুপারনোভা হয়ে বিস্ফোরিত হয়ে যায়, কিম্বা নিউট্রন স্টার হয়ে প্রচণ্ড ঘনত্ব নিয়ে ঘুরতে থাকে! অনেক ভারী নক্ষত্ররা হয়ে যায় ব্ল্যাকহোল, তারা এত ভারী এবং এত ঘন, যে তাদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ থেকে আলোও বাঁচতে পারে না। আর যেহেতু কোন কিছুর বেগ আলোর থেকে বেশি হওয়া সম্ভব না, সুতরাং আলো বের হতে না পারলে, আর কোন কিছুই এর প্রভাব থেকে বের হতে পারবে না! এজন্যই এর নাম ব্ল্যাকহোল! এখন যদি এমন হয়, যে দুইটা ব্ল্যাকহোল একে অপরকে ঘিরে ঘুরছে এবং আকর্ষণের কারনে আস্তে আস্তে নিজেদের কাছে নিজেরা এগিয়ে আসছে এবং শেষ পর্যন্ত একে অপরকে গ্রাস করে একটা ব্ল্যাকহোলে পরিণত হচ্ছে... তাহলে কি হবে? তখন আইন্সটাইনের কল্পনার জগতে আমরা দেখব যে স্থান-কালে দুইটা ভয়ঙ্কর ভারী এবং অসম্ভব শক্তিশালী জিনিস ঘুরে বেরাচ্ছে এবং তাদের প্রলয়ঙ্কারী গতির জন্য স্থান-কালে ব্যাপক আন্দোলন হচ্ছে! সোজা বাংলায়, এরা বিশাল বড় বড় ঢেউ এর মত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি করছে যেটা তরঙ্গের মত স্থান-কাল বেয়ে বেয়ে আশেপাশে সবকিছুর উপর আছড়ে পড়ছে! তাহলে এরকম একটা বাইনারি বা দ্বৈত-ব্ল্যাকহোল আসলে আমাদের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে বের করার জন্য আদর্শ !!

সমস্যা হল, দ্বৈত-ব্ল্যাকহোল সহজে পাওয়া যায় না! কোন একটা গ্যালাক্সিতেই হয়ত হাতে গোনা কয়েকটা থাকতে পারে! তবে জ্যোতির্বিদরাও নাছোড়বান্দা, তাঁরা খুঁজাখুঁজি করে ঠিকই এরকম একটা দ্বৈত-ব্ল্যাকহোল খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু আবারও সমস্যা হল এরা আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে, আরও ভালো করে বললে, ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে (১ আলোকবর্ষ = সাড়ে নয় লক্ষ কোটি কিলোমিটার)! আমাদের গ্যালাক্সি তে তো নাই-ই কাছের অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি থেকেও অনেক দূরে! এখন এত দূর থেকে মহাকর্ষীয় ঢেউ আসতে আসতে তো সে অনেক দুর্বল হয়ে যাবে! বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখলেন, যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আসবে সেগুলো স্থান-কালের সংকোচন-প্রসারণ ঘটাবে কেবল ১০০০০০…..(২১টা শুন্য)….০০০০০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র!

প্রশ্ন হল স্থান-কালের ঢেউ বা এরকম সংকোচন-প্রসারণ কিভাবে মাপব? ব্যাপারটা খুব সহজ না। একটু বুঝিয়ে বলি, সাধারণত আমরা কোন দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ বা উচ্চতা এসব কিছু মাপি স্কেল দিয়ে! ধরি আমার কাছে সেই ছোটবেলার বারো ইঞ্চি মাপের একটা স্কেল আছে যেটা দিয়ে আমি মেপে মেপে বারো ইঞ্চির দুইদিকে দুইটা দাগ দিলাম। এই দুই দাগের মধ্যে দূরত্বটা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আসার পর বাড়লো নাকি কমলো, সেটা কি আমি ঐ স্কেল দিয়ে মাপতে পারব? উত্তর হল, না! কারণ, তরঙ্গের কারণে স্থান-কাল প্রসারিত হলে তো স্থানের ভিতর থাকা দাগ, স্কেল, এবং আমি নিজে আমরা সবাই প্রসারিত হব! তাই আমি কিছুই টের পাব না, যেটা আগে ১২ ইঞ্চি ছিল, সেটা এখনও ১২ ইঞ্চিই মনে হবে!

এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে মহাবিশ্বের প্রাচীন সন্তানঃ আলো। আলোর গতি শুন্যস্থানে সব সময় একই থাকবে (স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি), এবং যেহেতু আলোর বেগ সবসময় একই তাই আলোর যাওয়া-আসার সময় দিয়ে আমি যে কোন কিছুর সঠিক দূরত্ব কতটুকু সেটা আমি মাপতে পারব! ধরা যাক, একটু আগে স্কেল দিয়ে হিসাব করা এক দাগ থেকে আরেক দাগে যেতে যদি আলোর ০.০০০০০০০০১ সেকেন্ড সময় লাগতো, দূরত্বটা প্রসারিত হলে কিন্তু এখন ০.০০০০০০০০১ সেকেন্ডের চেয়ে একটু বেশি লাগবে।

যাই হোক, অনেক থিওরি কপচালাম, এবার আসল পরীক্ষায় আসি! পরীক্ষাটা করব এভাবে, প্রথমে ৪ (চার) কিলোমিটার লম্বা ইংরেজি L আকৃতির সুড়ঙ্গ বানাবো, যেটার এক মাথা থেকে আরেক মাথায় লেজার আলো মারব। তারপর দেখব আলো যেতে এবং আসতে কত সময় লাগে? আলোর গতিবেগ যেহেতু জানি, তাই বেগকে সময় দিয়ে গুণ করে দূরত্ব হিসাব করতে পারব! এখন যদি কোন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ না থাকে তাহলে কখনই দূরত্ব ৪ কিলোমিটারের কমবেশি হবে না! কিন্তু যদি কমবেশি হয় তাহলে বুঝতে হবে স্থান-কালে ঢেউ আসছে! আর ঢেউ যখন আসবে, তখন সংকোচন এবং প্রসারণ দুইটাই থাকবে, তার মানে ডানে-বামে যদি প্রসারিত হয় তাহলে সামনে-পিছনে অবশ্যই সংকুচিত হবে। অর্থাৎ, L এর এক বাহুতে আলো যেতে কিছু বেশি সময় নিবে, এবং সেই অনুপাতে আরেক বাহুতে আলো যেতে কম সময় নেবে। দুই বাহুর হিসাব থেকে তরঙ্গ যে আসলেই আসছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে! এত কিছুর পরও আমার একটা অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারদের দল লাগবে। কারণ একটু আগেই বলেছি, যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আসবে সেগুলো স্থান-কালের সংকোচন-প্রসারণ ঘটাবে কেবল ১০০০০০…..(২১টা শুন্য)….০০০০০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র! আমাদের চেনা-জানা মৌলিক পদার্থগুলোর পরমাণুর ব্যাস প্রায় ০.০০০…(১০টা শুন্য)…০০১ মিটার! সুতরাং ৪ কিলোমিটারে যেই সামান্য সংকোচন-প্রসারণ ঘটবে সেটা মাপতে হলে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে পরমাণুর ভিতরের কণাগুলোর যেই সাইজ, ওই সাইজের পরিমাণ নড়াচড়া বা আন্দোলনও ধরতে পারা যায়! ধরলাম আমি সারা পৃথিবীর তাবৎ ব্রিলিয়ান্ট ইঞ্জিনিয়ার এবং অ্যাপ্লাইড সায়েন্টিস্ট ধরে এনে এরকম অসাধ্য একটা ডিটেক্টর বানালাম, যেটা কিনা এত ছোট নড়াচড়া বা আন্দোলনও ধরতে পারে, কিন্তু আমি কিভাবে বুঝব যে এই আন্দোলনটা অন্য কিছু থেকে হচ্ছে না?! পৃথিবী নিজেই সারাক্ষণ ঘুরছে, তার নিজস্ব একটা জিওলজিক্যাল ভাইব্রেশন বা আন্দোলন, আশেপাশে তো দুনিয়ার শব্দ, আলো, তাপ, চাপ সবরকম প্রভাব তো আছেই, যেগুলো কিনা নানা রকম তরঙ্গ তৈরি করতে পারে! আর এসব কিছুর পর যান্ত্রিক ত্রুটি আর মানুষের তৈরি বিভিন্ন তরঙ্গও থাকবে! সুতরাং এমন একটা ব্যবস্থা করতে হবে যাতে কোন রকম বাইরের এবং ভিতরের ঝামেলা বা ডিস্টারবেন্স এবং বিশেষ করে কোনরকম তরঙ্গ ঢুকতে না পারে! সবচেয়ে ভালো হয়, একবারে এরকম ২টা সিস্টেম কোন দেশের ২ মাথায় বানাতে পারলে! কারণ ২ জায়গায় একই সময়ে একই রকম তরঙ্গ বা ঝামেলার জন্য কোন ভুল সিগনাল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে!

লাইগোর (LIGO, Laser Interferrometer Gravitational wave Observatory, আমি এটাকে আগে “লিগো” ডাকতাম, কিন্তু পরে দেখলাম, এখানের সবাই লাইগো ডাকে) বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়াররা এরকম একটা অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন। এই মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টে ১০টিরও বেশি দেশের সহস্রাধিক বিজ্ঞানী কাজ করেছেন যেখানে ক্যালটেক, এম.আই.টি এবং ম্যাক্সপ্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউট এর মত বাঘা বাঘা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল (আমি যতদূর জানি, বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানীও লাইগো টিমে আছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ এসোসিয়েট ডঃ দীপঙ্কর তালুকদার)! ২০০১ সালে লাইগো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খোঁজা শুরু করলেও ২০১১ পর্যন্ত তাঁরা খুঁজে পাননি। কারণ এত নিখুঁত ব্যবস্থা আর সংবেদনশীলতা থাকার পরও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করার জন্য যে পরিমান সেনসিটিভি প্রয়োজন তার পুরোপুরি লাইগোর ছিল না! এজন্য ২ ধাপে এর উন্নয়ন করা হয়, Enhanced LIGO এবং Advanced LIGO. এই অ্যাডভান্সড লাইগো ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সন্দেহাতীতভাবে প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব খুঁজে পায়।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কেন এত বড় একটা ব্যাপার?
মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকাল, তখন আলো চোখে এসে পড়ার সাথে সাথে যেমন অতুলনীয় সব সম্ভাবনার দরজা খুলে গিয়েছিল, ঠিক তেমনভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারের সাথে সাথে আমরা নতুন একটা চোখ আজকে খুলতে পারলাম। আগের চোখ দিয়ে আমরা যেমন আলোকিত জগত দেখতাম, এখনের নতুন চোখ দিয়ে আমরা একটা মহাকর্ষীয় জগত দেখতে পারব। এটা যেন আমাদের সামনে নতুন এক গাদা রঙয়ের জগত খুলে গেলো, যেই রঙগুলো আমরা আগে কল্পনাও করতে পারতাম না। আরেকটু ভেঙ্গে বলিঃ মানুষ এক্সরে আবিষ্কারের আগে শরীরের ভেতরের জিনিস কিন্তু দেখতে পেত না! একইভাবে ইনফ্রারেড, রেডিওওয়েভ, টেরাহার্টজ ওয়েভ আসার আগে মানুষ নাইট ভিশন, রাডার এবং মোবাইল কমিউনিকেশনের কথা মানুষ চিন্তাও করতে পারত না। একইভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আমাদের সামনে অ্যাস্ট্রনমির একটা নতুন স্পেকট্রাম (বর্ণালী) খুলে দিয়েছে! লাইগোর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডেভিড রাইটজ এর ভাষায়, “Up until now, we've been deaf to gravitational waves, What's going to come now is we're going to hear more things, and no doubt we'll hear things that we expected to hear … but we will also hear things that we never expected.” এই সুযোগে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে পড়ুয়া একজন ছাত্র হিসেবে একটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না! আমাদের মহাবিশ্বের ১০০ ভাগের মাত্র ৩ ভাগ হল আমাদের জানাশোনা পদার্থ দিয়ে তৈরিঃ মানে আলোর কণা ফোটন, পদার্থের পরমাণুর ভিতরে থাকা ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন সহ যাবতীয় কণা যা আমরা আজ পর্যন্ত বের করতে পেরেছি, সব মিলিয়ে সমস্ত গ্যলাক্সি আর তাদের গ্রহ-নক্ষত্র এক করে মাত্র ৩ ভাগ হয়। বাকি ২৭ ভাগ বলা হয় ডার্ক ম্যাটার যেটা আমরা দেখতে পারব না, কারণ এরা আলোর সাথে কোন রকম ইন্টারঅ্যাকশন করে না, আর অবশিষ্ট ৭০ ভাগ ডার্ক এনার্জি, যেটা কি জিনিস সেটা আসলে আমরা তেমন নিশ্চিতভাবে কিছুই জানি না! এতদিন ডার্কম্যাটার সরাসরি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল কারণ আমাদের সব খুঁজাখুঁজি হত আলো দিয়ে! কিন্তু ডার্ক ম্যাটার মহাকর্ষ অনুভব করে এবং এজন্য এখন তাদেরকে সরাসরি খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি হল!! এধরণের একটা পদার্থ সরাসরি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলে এবং ভবিষ্যতে আহরণ করা গেলে পৃথিবীর প্রযুক্তি কোথায় চলে যাবে তা আসলে চিন্তাও করা যায় না!

ক্যালটেকের বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, লাইগোর ফাউন্ডারদের একজন এবং “ইন্টারস্টেলার” মুভির এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার ও সাইন্স অ্যাডভাইসর কিপ থর্ন সাহেব আরেকটা অসাধারণ কথা বলেছেন, “আজ পর্যন্ত আমরা স্থান-কালের যত রকম আন্দোলন দেখেছি সবই ছিল খুব দুর্বল এবং নিস্তরঙ্গ, যেন আমরা মহাসাগরের শুধু শান্ত-স্নিগ্ধ রূপটাই দেখে এসেছি। এই মহাসাগরের উত্তাল রূপটা আমরা কখনই দেখিনি। লাইগোর সাহায্যে দ্বৈত-ব্ল্যাকহোল এর স্থান-কাল দুমড়ে-মুচড়ে উন্মত্ত ঝড় তৈরি এবং সেটা আমাদের শুনতে পাওয়া আসলেই আমাদের চিন্তাভাবনার নাগালকে পুরোপুরি নতুন রূপ দিয়েছে”। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে তার বলা আমার সবচেয়ে পছন্দের অংশ মনে হয় এটাঃ “আমরা যখন রেনেসাঁ এর দিকে তাকাই, যে আমাদের পূর্বপুরুষরা ওই সময় সভ্যতাকে কি দিয়েছিল, তখন আমরা দেখি যে ওই সময়টাতে মানুষ সাহিত্য, শিল্প আর দর্শনে নতুন নতুন চিন্তাভাবনার জোয়ারে সমাজকে ভাসিয়ে দিয়েছিল। ঠিক একইভাবে কেউ যদি আমাদের প্রশ্ন করে যে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই যুগে কি রেখে যাচ্ছি, তার উত্তরটা খুব সম্ভবত হবে এরকমঃ আমরা আমাদের মহাবিশ্বের মৌলিক সূত্রগুলো তাদের জন্য রেখে যাচ্ছি, যেগুলো তাদের আরও শত সহস্র বছর প্রশ্ন জোগাবে... আর আমরা তাদের জন্য একটা সংস্কৃতি রেখে যাচ্ছি, যেখানে অসম্ভব প্রশ্ন করা যায়, অসম্ভব কল্পনা করা যায় এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রযুক্তি তৈরির সাহস করা যায়।”

একটুখানি জীববিজ্ঞান!
আগেই বলেছি, ব্ল্যাকহোল দুইটা আমাদের থেকে ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে, মানে এই ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি বছর আগে! জীববিজ্ঞানীদের মতে, ওই সময় খুব সম্ভবত এককোষী জীবন থেকে মাত্র বহুকোষী জীবন তৈরি হওয়া শুরু করেছে! মহাবিশ্ব কি জানত সেই বহুকোষী জীব বিবর্তনের ধারা পেরিয়ে আজকের এই পর্যায়ে এসে তার ডাক খুঁজে বের করবে?

শেষ হইয়াও হইল না শেষ!
লাইগোর এই বিশেষ এক্সপেরিমেন্টে পাওয়া ওয়েভটার ফ্রিকুয়েন্সি ৩০০ হার্টজ... মানে অ্যামপ্লিফাই করা হলে এই ওয়েভটা কানে শুনা যায়... আজকে শুনে আসলাম... শুরুটা হয় পাখির ডাকের মত তীক্ষ্ণ একটা শব্দ দিয়ে (এজন্য মনে হয় এটাকে ইংরেজিতে চার্প “chirp” বলে) আর শেষটা হয় পানির টুপটাপের শব্দের মত করে.... The Universe was talking to us gravitationally and this is the first time we can hear her!!

পরিশিষ্টঃ
১. আমি যখন লিখতে বসি তখন ভেবেছিলাম অনেক কিছু লিখব, প্রত্যেকটা সাইন্টেফিক টার্ম এবং টেকনিক্যাল জিনিসও সহজ বাংলায় বুঝানোর চেষ্টা করব। কিন্তু লিখতে লিখতে মনে হল, একটু ভিন্নভাবে লিখি, যেখানে আসলে কোন টেকনিক্যাল কথা থাকবে না, যে কোন ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষই পড়লে বুঝতে পারবেন! স্টিফেন হকিং যেমন ব্রিফ হিস্টরি অব টাইমে E = mc^2 ছাড়া আর কোন সমীকরণ ব্যাবহার করেননি, আমিও সেরকম একটু চেষ্টা করলাম... তবে বিস্তারিত বুঝার জন্য বিজ্ঞানযাত্রা এবং মুক্তমনায় অসাধারণ কিছু লেখা এসেছে, যেখানে ফিজিক্সটাকে ছবি দিয়ে খুব সহজ করে বুঝানো হয়েছে! আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন! আর সব কিছুর পর গুগল তো আছেই!!
২. বিজ্ঞানীদের ভাষায় লাইগোর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে বের করার গল্পঃ http://journals.aps.org/…/ab…/10.1103/PhysRevLett.116.061102
৩. লাইগো টিমের বাংলাদেশের বিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্রের অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ এসোসিয়েট ডঃ দীপঙ্কর তালুকদারকে নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত লেখাঃ http://www.prothom-alo.com/we-are/article/769513
৪. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শুনতে চাইলেঃ http://www.space.com/31916-what-gravitational-waves-sound-like-video.html

- বাহাউদ্দীন


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

চলুক

সচলায়তনে আরো লিখুন। আপনি যেহেতু জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার ছাত্র, আপনার কাছে পাঠক হিসেবে আমার চাওয়া:

১. ডার্ক ম্যাটার নিয়ে একটা লেখা, যেখানে একটু বুঝিয়ে বলা থাকবে, ঠিক কীভাবে আমরা জানলাম যে মহাবিশ্বের ৩ ভাগ ভর, ২৭ ভাগ ডার্ক ম্যাটার আর ৭০ ভাগ ডার্ক এনার্জি।

২. জ্যোতির্পদার্থবিদ্যায় ব্যবহৃত অনেক শব্দের বাংলা পরিভাষা নেই। সচলায়তনের ব্লগার শিক্ষানবিস একটা পরিভাষার সম্ভার তৈরি করেছিলেন, আপনি তার লেখাগুলো সময় করে একটু পড়তে পারেন। অবশিষ্ট যা কিছু, তা আপনি এবং আপনার মতো জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার ছাত্রদেরই তৈরি করে নিতে হবে। বিজ্ঞান নিয়ে বাংলায় লিখতে গেলে পথের ইঁটগুলোও নিজেদের তৈরি করে নিতে হয়। আপনার পাঠকরাও এ কাজে আপনাকে সহায়তা করবেন বলে আশা রাখি।

অগুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: এই লেখায় শতাধিকবার "!" চিহ্নটি ব্যবহার করা হয়েছে। পড়তে গিয়ে মাঝেমধ্যে হোঁচট খেয়েছি।

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ! আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- (আবারও "!" ব্যবহার করে ফেললাম) খাইছে মনে হয় এটা আমার মুদ্রাদোষ, এখন থেকে সচেতন থাকব হাসি

ডার্ক ম্যাটার নিয়ে লিখতে গেলে আরও একটু পড়াশুনা করে নিতে হবে, কারণ কসমোলজির অসাধারণ সুন্দর সুন্দর অনেক কিছু আসবে। আমি চেষ্টা করব আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে কিছু লেখার।

পরিভাষার ব্যাপারটা মাথায় থাকলো, আসলে কলেজে এবং ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে এই জিনিসটা খুব মনে হত, পরে ভুলে গিয়েছিলাম। মনে করিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

সজীব ওসমান এর ছবি

আপনার লেখার হাত বেশ ভাল। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আরও কিছু চমৎকার লেখা পাবো আশা করছি।

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! চেষ্টা থাকবে আরও কিছু লেখার। হাসি

শেহাব এর ছবি

আপনি ভীষণ ভাল লিখেন।

অতিথি লেখক এর ছবি

অনেক অনেক ধন্যবাদ! আমার মন্তব্য পড়ে অনেক ভালো লাগলো। ভালো থাকবেন।

সত্যপীর এর ছবি

দুর্দান্ত!

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

অনেক অনেক ধন্যবাদ! দেঁতো হাসি

শৌণক এর ছবি

পুরো লেখাটা চমৎকার ।
আরও একটা তথ্য যোগ করি- লাইগোর এই প্রজেক্টে দীপংকর তালুকদার সহ আরও একজন বাংলাদেশি আছেন । সেলিম শাহরিয়ার - উনি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন লেজার / অপ্টোইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে ।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্তকরনের প্রক্রিয়াটা আর একটু বিস্তারিত লিখলে মনে হয় ভাল হত । এক্সপেরিমেন্টাল সেকশনে- মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রভাবে লাইগোর দুই বাহুতে আলোর পরিভ্রমনের সময়ের ব্যবধান নির্ণয়ের পদ্ধতির যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে, সেটা অতিসরলীকরণ মনে হয়েছে । লাইগো তে ব্যবহৃত লেজারের ডেসট্রাকটিভ ইন্টারফারন্সের কথা টা মনে হয় উল্লেখ করলে বুঝতে সুবিধা হত কিভাবে এত সূক্ষ্ম সময়ের ব্যবধান মাপা হয়েছে ।
যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্তকরণ করা হয়েছে তার ফ্রীকুয়েঞ্চি ৩০০ হার্জ নয়, সঠিকভাবে বললে ৩৫ ‍থেকে ২৫০ হার্জ ।

অতিথি লেখক এর ছবি

হ্যাঁ আপনি ঠিক বলেছেন, আমি ইচ্ছা করেই অতিসরলীকরণ করেছি। আর এক্সপেরিমেন্টাল সেকশনটা মুক্তমনার লেখায় দারুণ ডিটেইলসে বুঝানো হয়েছে। আমি একবার লেখা শুরু করেছিলাম, পরে মনে হল তাহলে লেখাটা অনেক বড় হয়ে যাবে আর সাধারণ পাঠকরা হয়ত খেই হারিয়ে ফেলবেন। কিন্তু এখন আবার আফসোস লাগছে কেন লিখলাম না!

সত্যি কথা বলতে আমার ছোট কিছু জুনিয়র আছে, যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিবে। আমি তাদের ব্যাপারটা স্কাইপেতে বুঝিয়েছিলাম। এই লেখাটা লেখার সময় মাথায় ওদের কথাই ছিল হাসি !!

আর ফ্রিকুয়েন্সির কথাটা ঠিক, এটা ৩৫ থেকে শুরু হয়ে ২৫০ এর মত যায়, এরপর আবার কমে আসে। সংশোধন করিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ!
- বাহাউদ্দীন

সো এর ছবি

দারুণ!!!
আরো লিখুন। চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! চেষ্টা থাকবে আরও কিছু লেখার। হাসি

সজল এর ছবি

দারুন!

কিছু প্রশ্নঃ
১। এই তরঙ্গ যে পার্টিকুলার বাইনারী ব্ল্যাকহোল থেকেই আসছে সেটা কীভাবে বুঝা গেলো? (ওই বাইনারী থেকে আসা তরঙ্গ পৃথিবীতে এসে পৌঁছানোর সময় তার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আর কম্পাংকের প্রেডিকশনের সাথে লাইগোর খুঁজে পাওয়া তরঙ্গের বৈশিষ্ট্যগুলা মিলে গেছে?)

২। এক অক্ষে সংকোচন, আর এক অক্ষে প্রসারণ কেন হবে?

৩। অন্য বাইনারী বা ভারী নক্ষত্রের তৈরী মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে? কয়েকটা উৎস থেকে আসা তরঙ্গের লব্ধি থেকে তরঙ্গগুলা আলাদা করা যাবে কী করে যদি উৎসগুলা জানা না থাকে?

---
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ হাসি

১। বাইনারি ব্ল্যাকহোল এর নিজেদের মধ্যে ঘূর্ণন এবং কাছে আসতে আসতে শেষ পর্যন্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার ফলে যেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হবে সেটার সময়ের সাথে অ্যামপ্লিচিউড এবং ফ্রিকুয়েন্সি পরিবর্তনের খুবই ইউনিক একটা চেহারা আছে। লাইগো টিমের বিশাল একটা অংশ থিওরি এবং সিমুলেশন নিয়ে কাজ করে, তাঁরা সুপার কম্পিউটারে সিমুলেশন করে বের করেছেন যে সময়ের সাথে সাথে তরঙ্গটার প্রকৃতি কেমন হবে। এবং তাদের জার্নালটা পড়লে দেখবেন, যে প্রেডিকশনের সাথে তাদের পরীক্ষা হতে পাওয়া ফলাফল খুবই ভালভাবে মিলেছে।

২।মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সাধারণ অনুপ্রস্থ তরঙ্গের মত না, যেমনঃ পানির ঢেউ। পানির ঢেউ যখন যায় তখন উপরে-নিচে আন্দোলিত হয়, এবং ঢেউ এগিয়ে যায় সামনের দিকে। এজন্য একটা দ্বিমাত্রিক কাগজে আমরা এরকম তরঙ্গ আঁকতে পারি (ছোটবেলায় যেভাবে তরঙ্গ আঁকতাম)। এই কারনে এ ধরণের তরঙ্গকে বাইপোলার বলে। কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ হলেও এটি কোয়াড্র-পোলার, মানে এর নড়াচড়া হয় ৪ দিকে। এজন্য আমরা যদি কখনও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আঁকি তাহলে ত্রিমাত্রিক ছবি দিয়ে বুঝাতে হবে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে তরঙ্গ আন্দোলিত হবে উপরে-নিচে এবং ডানে-বামে আর এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। এজন্যই এক অক্ষে যখন সংকোচন হবে তখন আরেক অক্ষে সমান অনুপাতে প্রসারণ হবে।
এই লিঙ্ক দুইটা মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে আরেকটু সাহায্য করবেঃ
https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/5/5c/Gravwav.gif/220px-Gravwav.gif
http://38.media.tumblr.com/f437a2fcb5d36a1e908d06c30615bfc6/tumblr_inline_n2lgj2Y4oe1rpydpj.gif

৩। বর্তমান প্রযুক্তিতে আমরা যেই সব মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎস খুঁজে পাব সেগুলো হলঃ বাইনারি ব্ল্যাকহোল এর মার্জ, দুইটা ভারী নক্ষত্র যেমন নিউট্রন স্টারের প্রচণ্ড গতিতে ঘূর্ণন, একটা ভারী নক্ষত্র সুপারনোভা হয়ে যাওয়া। এরকম প্রত্যেকটা ঘটনার জন্য সিমুলেশন করে আমরা আগে থেকেই জানি যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গটা দেখতে কেমন হবে এবং সময়ের সাথে অ্যামপ্লিচিউড এবং ফ্রিকুয়েন্সি পরিবর্তনটা কেমন হবে! আরেকটা ব্যাপার হল, এখনও পর্যন্ত আমরা যেইসব উৎস থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পাচ্ছি, বা নিকট ভবিষ্যতে পাব এরা বেশ বিরল, তাই একই সময়ে দুইটা এমন ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। আর যদি হয়েও থাকে, আমাদের সিমুলেশন এবং অ্যাস্ট্রোনমিকাল অব্জারভেশন থেকে পাওয়া তথ্য থেকে ফ্রিকুয়েন্সি এনালাইসিস করে একাধিক ইভেন্টের মধ্যে পার্থক্য বের করা সম্ভব (এধরণের এনালাইসিস কিন্তু আমরা রেডিও বা মোবাইল কমিউনিকেশনে অহরহ করে থাকি)।

আশা করি উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পেরেছি। এরপরও প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই জানাবেন, সাধ্যমত উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

আমি আরও কিছু প্রশ্ন যোগ করি। উত্তর দেয়াটা শুধু পোস্ট লেখক বাহাউদ্দীনের কর্ম নয়, যিনি জানেন তিনিই বলতে পারেন।

১. সেপ্টেম্বরের ঘটনা সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত যেতে ফেব্রুয়ারী মাস চলে আসলো কী করে?

২. যা কিছু রেকর্ডেড হয়েছে সেটা ভেরিফাই করার উপায় কী? মানে, গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ আছে কি না নাই এমন প্রশ্ন না করেও যা রেকর্ডেড হয়েছে সেটা যে গ্রাভিটেশনাল ওয়েভের দরুণ সেটা কীভাবে প্রমাণিত হবে?

৩. গত ১৩০ কোটি বছরে (বা তারও আগে থেকে) অমন আরও বহু কৃষ্ণগহ্বরযুগল সমাপতন বা অনুরূপ আরও অনেক কিছু ঘটেছে। কয়েক দশক ধরে চলা এই গবেষণায় অমন অগণিত ঘটনার কোনটাই কেন ধরা পড়লো না?

৪. কী করে বোঝা গেলো এটা ১৩০ কোটি বছর আগের একটা কৃষ্ণগহ্বরযুগল সমাপতনের ঘটনা, অন্য কিছু নয়?

অটঃ আমি দুর্বল বিশ্বাসের মানুষ। মহাজ্ঞানী মহাজনেরা কিছু বললেই চট করে আস্থা আনতে পারি না। এমনকি প্রকৃতির মৌলিক সূত্রের প্রমাণ হিসেবে দাবি করলেও। ফান্ড হালাল করার জন্য বা ফান্ড টিকিয়ে রাখার জন্য শক্তপোক্ত নাটক সাজানোর ঘটনা আকছার ঘটে। গ্রহাণুতে প্রাণের অস্তিত্ত্ব পাবার বা অস্তিত্ত্বের সম্ভাবনা পাবার গাল্গল্প কিছুদিন পর পর শোনা যায়। বিশ্বাসীদের গ্রন্থের বিবরণের মতো ঘটনা ঘটে যাবার পর 'আমি আগেই কইছিলাম' জাতীয় কথা না বলে যা কিছু অচিরেই ঘটবে সেটা ফোরকাস্ট করতে পারাটা বরং প্রচলিত অনুকল্পটিকে প্রমাণের ভিত্তি প্রদান করে।

অতিথি লেখক এর ছবি

প্রশ্ন এবং মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ হাসি

১। প্রথমেই লাইগো টিমকে নিশ্চিত হতে হয়েছিল যে এটা আসলেই গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ কি না! কারণ এর কিছুদিন আগেই প্রাইময়ডিয়াল গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ পাওয়া গেছে বলে বাইসেপ-২ টিম জানিয়েছিল, যেটা আবার ইউরোপিয়ান স্যাটেলাইট টেলিস্কোপ প্ল্যাঙ্ক ভুল প্রমাণ করে। এজন্য লাইগো কোলাবরেশন আলাদা আলাদা ভাবে অনেকগুলো বিখ্যাত একাডেমিক গ্রুপকে (আমেরিকান এবং ইউরোপিয়ান) দিয়ে যাচাই-বাছাই করছিল। সত্যি কথা বলতে সিমুলেশন টিম এবং অব্জারভেশন টিমকে ওরা আলাদা করে রেখেছিল, যাতে কোনভাবে কেউ আগে থেকে জানতে না পারে যে কি খোঁজা হচ্ছে এবং ওইটাই পাওয়া গেছে কি না। শুধুমাত্র উচ্চপদস্থ কয়েকজন জানতেন যে সম্পূর্ণ চিত্রটা আসলেই কি! এ সব কিছুর জন্যই ওদের এত সময় লেগেছিল। হিগস বোসনও কিন্তু পাওয়ার সাথে সাথেই ঘোষণা দেয়নি। সাধারণত এত বড় কোলাবরেশনে ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ ভুল করতে চায় না, কারণ এর সাথে ভবিষ্যতের ফান্ডিং এবং রেপুটেশন অনেক বেশি জড়িত!

২। আমরা যদি আইন্সটাইনের ফিল্ড সমীকরণ নেই এবং এই বিশেষ ক্ষেত্র যেখানে "বাইনারি ব্ল্যাকহোল এর নিজেদের মধ্যে ঘূর্ণন এবং কাছে আসতে আসতে শেষ পর্যন্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া"-এই ঘটনাকে সমীকরণে বসাই এবং সমধান করি তাহলে আমরা দেখি যে স্পেস-টাইমে কোয়াড্র-পোলার ট্রান্সভার্স রিপল বা ঢেউ তৈরি হবে। এবং টাইম-ডিপেন্ডেন্ট সমীকরণ সমাধান করলে আমরা দেখব যে এই ঢেউয়ের অ্যামপ্লিচিউড এবং ফ্রিকুয়েন্সি একটা নির্দিষ্ট গাণিতিক মডেল মেনে পরিবর্তিত হচ্ছে। মহাবিশ্বে এমন তরঙ্গের উৎস খুব একটা সহজলভ্য না! তাদের জার্নালে তাঁরা দেখিয়েছে যে, সিমুলেশনের প্রেডিকশনের সাথে তাদের পরীক্ষা হতে পাওয়া ফলাফল মিলেছে। এমনকি একটা লাইগো থেকে আরেকটা যেতে গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ এর যেই সময় লাগার কথা সেটাও সঠিকভাবে মিলে গিয়েছে।

৩। হ্যাঁ সেটা হতে পারে, এবং লাইগো আসলে এরকম অনেক সিগন্যালই এ পর্যন্ত ধরেছে। তবে প্রথম ১০ বছরে তাদের সেন্সিটিভিটি যথেষ্ট ছিল না যে তাঁরা কোন কিছু নিশ্চিতভাবে দাবি করতে পারে। কিন্তু এই বিশেষ সিগন্যালটা সব দিক থেকে প্রমাণিত বলেই তাঁরা এটাকে প্রকাশ করেছে এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্বের পক্ষে ব্যবহার করেছে।

৪।এটা উপরে একবার বলেছিঃ বাইনারি ব্ল্যাকহোল এর নিজেদের মধ্যে ঘূর্ণন এবং কাছে আসতে আসতে শেষ পর্যন্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার ফলে যেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হবে সেটার সময়ের সাথে অ্যামপ্লিচিউড এবং ফ্রিকুয়েন্সি পরিবর্তনের খুবই ইউনিক একটা চেহারা আছে। লাইগোর থিওরি এবং সিমুলেশন টিম সুপার কম্পিউটারে সিমুলেশন করে বের করেছেন যে সময়ের সাথে সাথে তরঙ্গটার প্রকৃতি কেমন হবে। এবং তাদের জার্নালটা পড়লে দেখবেন, যে প্রেডিকশনের সাথে তাদের পরীক্ষা হতে পাওয়া ফলাফল খুবই ভালভাবে মিলেছে।

দুর্বল বিশ্বাস হওয়াটাই উচিত, আমি বরং বলব অবিশ্বাসী হওয়াই ভাল। এই পরীক্ষার পরও কিছুই ১০০ ভাগ বলা যায় না, ৯৯ দশমিক ৯৯ হয়ত বলা যায়। একটা থিওরিকে দাঁড়া করাতে হলে হয়ত হাজারটা প্রমাণ লাগে, কিন্তু একটা থিওরিকে ফেলে দেয়ার জন্য কিন্তু একটা প্রমাণই যথেষ্ট! আমাদের বিজ্ঞানের ভাষায়, কোন এক্সপেরিমেন্ট রিপ্রডিউস করা না গেলে সেটা গুড অ্যাজ ডেড! এখন লাইগোর কাজ যদি অন্য গ্রুপগুলোও বিভিন্ন পরিসরে স্বাধীনভাবে প্রমাণ করতে পারে, তাহলেই কেবল ১০০ ভাগ প্রমাণিত বলা যাবে। ইতিমধ্যে আরও বেশ কয়েকটি লাইগো তৈরির কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে চলছেঃ ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ইন্ডিয়াতে।

Naima এর ছবি

খুবই চমৎকার লেখা।হাততালি দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর মতন। প্লিজ আরও লিখুন। সহজ বাংলায় লেখা চালিয়ে যাবেন প্লিজ।

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! হাসি হাততালিতে অনুপ্রাণিত হলাম দেঁতো হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

আরও একটা কথা। টিভিতে/ইন্টারনেটে যা দেখেছি সেটা কম্পিউটার গ্রাফিক্সে বানানো একটা মুভি। আসল রেকর্ডটার চেহারা কেমন? মনিটরে ইসিজি/ইকেজি/সিডিটি/সিটিস্ক্যান/এমআরআই দেখার মতো কিছু?

অতিথি লেখক এর ছবি

এটা পরিশিষ্ট এর ৪ নং লিঙ্কে ভিডিওতে দেখান হয়েছে, এছাড়া ২নং লিঙ্কে ফিজিক্যাল রিভিউ এর পেপারেও দেয়া আছে হাসি

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

দারুণ লেখা। খুব সহজভাবে বুঝিয়ে লিখেছেন। আমার কিছু প্রশ্নঃ

১) চতুর্মাত্রিক স্পেস-টাইম কন্টিনিউয়ামে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কীভাবে সাউন্ড ওভেভ হিসেবে পাচ্ছি আমরা? সহজ কথায় এটা সাউন্ড ওয়েভ কেন এটা বুঝতে পারছি না। এটা ইলেক্ট্রোম্যাগ্নেটিক ওয়েভ না এই ব্যাপারটা ধরতে পারছি কিন্তু একটা চতুর্মাত্রিক জগতের তরঙ্গ কীভাবে শব্দ তরঙ্গ হিসেবে পাচ্ছি? আমরা এই সংকোচন প্রসারণের ব্যাপারটা তো ধরতে পারলাম আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের পার্থক্য হিসাব করে। সেখান থেকে হিসাব করে একটা কম্পাঙ্ক বের করার ব্যাপারটাও ধরতে পারছি কিন্তু এর বেশি আর পারছি না।

২) আমরা যদি আরও সুবেদী যন্ত্র তৈরি করতে পারি তখন আরও অনেক বস্তুর স্পেস-টাইম কন্টিনিউয়ামে নড়াচড়ার কারণে তৈরি হওয়া মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিশ্চয়ই সনাক্ত করতে পারব। কিন্তু অনেক উৎস থেকে আসা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কি আমাদের পরীক্ষাগারে একটা রেজাল্টেন্ট ফলাফল দেবে না? সেই ফলাফলগুলোকে আলাদা করা হচ্ছে (বা হবে) কীভাবে? বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ একে অপরকে ইন্টারফেয়ার করছে না এটা কীভাবে বুঝতে পারছি?

আর কিছু মাথায় আসলে পরে জিজ্ঞেস করছি। দারুণ একটা লেখার জন্য ধন্যবাদ জানবেন।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ হাসি

১। গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ কিন্তু সাউন্ড ওয়েভ না, সাউন্ড হয় পদার্থের মধ্যে কম্পনের ফলে, আর গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ হচ্ছে স্থান-কালের কম্পন। এটা অসম্ভব দুর্বল একটা সিগন্যাল। কিন্তু আমরা যদি সিগন্যালটাকে নিয়ে অ্যামপ্লিফাই করি এবং এরপর স্পিকারে বাজাই (মানে পদার্থের মধ্যে আন্দোলন করাই), তাহলে আমরা এই রকম শব্দ শুনতে পারব।

২। হ্যাঁ তা ঠিক, তবে আমাদের আসলেই সমস্যা হবে যদি আমাদের আশেপাশে খুব শক্তিশালী কোন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎস থাকে। আরেকটু সহজ করে বলিঃ দিনের বেলা কিন্তু টেলিস্কোপ দিয়ে কোন কিছু করা যাবে না, কারণ হল সূর্য খুবই শক্তিশালী একটা আলোর উৎস। কিন্তু রাতের বেলা সারা আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র থাকলেও আমরা কিন্তু মোটামুটি আলাদা করতে পারি এবং টেলিস্কোপ তাক করে কোন একটা বিশেষ তারা থেকে আসা আলো দেখতে পারি, সেটা বিশ্লেষণ করে গবেষণা করতে পারি। যথেষ্ট প্রযুক্তি থাকলে একই ব্যাপার এখানেও কাজে লাগানো যাবে। এরপরও আর যদি সিগন্যাল পলিউশন হয়েও থাকে, আমাদের সিমুলেশন এবং অ্যাস্ট্রোনমিকাল অব্জারভেশন থেকে পাওয়া তথ্য থেকে ফ্রিকুয়েন্সি এনালাইসিস করে একাধিক উৎসের মধ্যে পার্থক্য বের করা সম্ভব (এধরণের এনালাইসিস কিন্তু আমরা রেডিও বা মোবাইল কমিউনিকেশনে অহরহ করে থাকি)।

সত্যি কথা বলতে আমরা তো মাত্র জানলাম, যে এমন কিছু আছে, এখন সাইন্সটা যেহেতু এক্সিস্ট করে, টেকনোলজিটা সময়ের সাথে আশা করা যায় ঠিকই দাঁড়িয়ে যাবে হাসি

আশা করি প্রথম দুইটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছি। এরপরও প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই জানাবেন, সাধ্যমত উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব। আর আপনার ধন্যবাদ এর জন্য আবারও ধন্যবাদ, অনুপ্রাণিত হলাম দেঁতো হাসি

- বাহাউদ্দীন

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

ধন্যবাদ। সাউন্ড ওয়েভ ব্যাপারটা নিয়েই মূল কনফিউশান ছিল। ব্যাপারটা তাহলে এরকম হলো না যে আমি ৩০০ হার্জের একটা ইলেক্ট্রোম্যাগ্নেটিক সিগ্নাল পেলামকে ৩০০ হার্জের একটি সাউন্ড ওয়েভ হিসেবে শুনলাম? অনেকেই দেখলাম কনফিউজ করে ফেলছে যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শুনতে পাচ্ছে। এটা আসলে এক ধরণের ভুল ধারণার জন্ম দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে।

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

অতিথি লেখক এর ছবি

হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন। আমার আসলে আরও বুঝিয়ে লেখা উচিত ছিল মন খারাপ ধন্যবাদ বিষয়টা তুলে ধরার জন্য হাসি

স্পর্শ এর ছবি

লাইগোর শব্দ শুনে যে প্রশ্নটার উত্তর পাচ্ছি না, তা হলো- প্রায় প্রতি ২.৫ সেকেন্ড পর পর সাউন্ডটা বদলে যাচ্ছে কেন? শুনতে অনেকটা কিছুক্ষণ পানির নিচে কিছুক্ষণ পানির উপরে। এই ভিন্নতার হেতু কি?


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ!

আপনার প্রশ্ন থেকে যা বুঝেছি, তার উত্তর হল অনেকটা এরকমঃ মনে করুন সাউন্ড ওয়েভ, এটা কি? পদার্থের মধ্যে আন্দোলন। এখন যে কোন আন্দোলনের দুইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় আছেঃ ১। অ্যামপ্লিচুড (কত জোরে আন্দোলিত হচ্ছে) এবং ২। ফ্রিকুয়েন্সি (কত দ্রুত আন্দোলিত হচ্ছে)। এজন্য একই সাউন্ড ওয়েভ থেকে আপনি সা রে গা মা পা নানারকম শব্দ তৈরি করতে পারেন। প্রত্যেকটা ধ্বনির নিজস্ব ফ্রিকুয়েন্সি আছে। আপনি যদি অনেক জোরে "সা" বলেন তার মানে হল অ্যামপ্লিচুড বাড়িয়ে দিচ্ছেন। একই ভাবে লাইগোর এক্সপেরিমেন্টে আমরা যেই ঘটনাটা দেখতে পাই, সেটা হল দুইটা ব্ল্যাকহোল একে অপরকে ঘিরে ঘুরছে এবং আস্তে আস্তে কাছে আসছে এবং একসময় দুইজন মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তাহলে শুরুতে যখন তারা দূরে থেকে ঘুরছিল, তখন ঘোরার গতিবেগ অনেক কম ছিল, তাই সেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অ্যামপ্লিচুড এবং ফ্রিকুয়েন্সি দুইটাই কম ছিল। ব্ল্যাকহোল দুটো যত কাছে আসছে, তত তাদের মধ্যে আকর্ষণ বেড়েছে, ফলে ঘোরার গতি এবং স্থানকালকে বক্র করার পরিমাণও অনেক বেড়েছে। এতে করে একই সাথে অ্যামপ্লিচুড এবং ফ্রিকুয়েন্সি দুইটাই বেরে যাবে। এই দুইটি বাড়তেই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্ল্যাকহোল দুইটি সংঘর্ষ করে একসাথে মিলিত না হয়। মিলিত হওয়ার সাথে সাথে একটা বিশাল শকওয়েভ তৈরি হবে যেটা বিশাল শক্তি (এই ক্ষেত্রে ৩টা সূর্যের সমপরিমাণ শক্তি) মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আকারে ছাড়বে, এইজায়গায় আমরা ম্যাক্সিমাম অ্যামপ্লিচুড এবং ফ্রিকুয়েন্সি পাব। এখন, মিলিত হওয়ার পর কিন্তু নতুন ব্ল্যাকহোলটা আর আগের মত ঘুরবে না, সে আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে স্থির হয়ে আসবে, এতে করে অ্যামপ্লিচুড এবং ফ্রিকুয়েন্সি আবার কমে আসবে এবং আর কোন উন্মত্ত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঢেউ পাওয়া যাবে না। এজন্যই শব্দটা প্রথমে হালকা থেকে তীব্র হয় (ব্ল্যাকহোল দুটো মার্জ করা পর্যন্ত) এবং তারপর আবার টুপ একটা শব্দ করে মিলিয়ে যায়।

সবচেয়ে অসাধারণ ব্যাপারটা হল এত বিশাল এবং ভায়োলেন্ট একটা ব্যাপার হয় সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে। এটা বুঝানোর জন্যই লিংকে বার বার শব্দটা শোনানো হয়েছে। আসলে এই সিগন্যালটা মূল এক্সপেরিমেন্টে একবারই পাওয়া গিয়েছিল।

ঈয়াসীন এর ছবি

অসম্ভব ভাল লেখা। অতি কঠিন বিষয়াদি বুঝতেও সমস্যা হয়নি। ধন্যবাদ আপনাকে বিষয়টি এরকম সাবলীল ভাষায় ব্যাখ্যা করবার জন্য। তবে ক্ষুদ্র জ্ঞানের কারণে সম্পূর্ণটা বুঝতে আরো কিছু সম্প্রসারিত তথ্যের প্রয়োজন। তাই, এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আরো কিছু লেখা আশা করছি একজন পাঠক হিসাবে।

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! হাসি অনলাইনে কিছু ভালো বাংলা লেখা এসেছে এবং ইংরেজিতে তো অসংখ্য লেখা বের হয়ে গেছে। ওগুলো পড়াশুনা করে দেখতে পারেন। এরপরও প্রশ্ন থাকলে এখানে জিজ্ঞেস করতে পারেন, চেষ্টা থাকবে সাধ্যমত উত্তর দেয়ার।

কোন বিষয়ে আরও প্রাসঙ্গিক লিখলে ভালো হয় জানিয়েন, পড়াশুনা করে লেখার চেষ্টা করব খাইছে

রকিবুল ইসলাম কমল এর ছবি

চমৎকার লেখা! সচলায়তনে নিয়মিত লিখুন। চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! হাসি অনুপ্রাণিত হলাম দেঁতো হাসি

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

সচলে স্বাগতম! দারুণ লাগল। আরো লিখতে থাকুন, অপেক্ষায় রইলাম। হাসি
(যে প্রশ্নগুলো জমছিল সেগুলোর উত্তরও আগেভাগে মন্তব্যে পেয়ে ভাল লাগল।)

অটঃ আপনি কি ঢাবি এপিইসিই'র বাহাউদ্দিন? লেখার ধাঁচ দেখে তাই মনে হচ্ছে। শুভেচ্ছা জানবেন।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! হাসি

বাহাউদ্দীন তো খুব একটা দুর্লভ নাম না! ঢাবি এপিইসিই-এ অনেকের নামই বাহাউদ্দীন হতে পারে খাইছে তবে হ্যাঁ, আমি ঢাবি এপিইসিই-তেই পড়াশুনা করেছি হাসি আপনিও কি এই ডিপার্টমেন্টে ছিলেন? বা আছেন?

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

১। নামের বানান ভুল করার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত! লইজ্জা লাগে

২। আমি ২০০৬-৭ বা ২০০৭-৮ এর একজনকে চিনতাম। ইয়ে, মানে...

৩। নাহ, আমি এপিইসিই'র নই। তবে আশেপাশেই ছিলাম। হাসি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

আমার ব্যাচ ২০০৭-০৮! আর যতদূর জানি এই দুই ব্যাচে বাহাউদ্দীন শুধু আমি-ই ছিলাম। আপনি কিভাবে আমাকে চিনেন বলুন তো? হাসি

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

১। ঠিকাছে, তাইলে আপনারেই চিনি।

২। ইয়ে, কিছু কথা থাক না গুপন! খাইছে

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

চিন্তিত

মুদ্রা সংগ্রাহক এর ছবি

খুবই চমৎকার সহজবোধ্য একটা লেখা। সবাই যদি আপনার মত এত সহজ ভাষায় কঠিন কঠিন বিষয়গুলি বুঝিয়ে দিত ! ! !

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! হাসি অনুপ্রাণিত হলাম দেঁতো হাসি

জীবনযুদ্ধ এর ছবি

এ ধরনের লেখা আরো কাম্য, একটি দারুন সময়োপযোগী লেখা। ভালো লাগলো

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! ভালো থাকবেন! হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

অসাধারণ লেখা! হাততালি ভবিষ্যতে আরো লেখা পাবার অপেক্ষায়।

অর্ণব

অতিথি লেখক এর ছবি

অসাধারণ মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ!

কেউ একজন এর ছবি

খুব সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন ভাষায় লেখা।
আমি পদার্থবিদ্যার ছাত্র নই।দুটো প্রশ্ন মাথায় এসেছে,হয়তো কিছুটা বোকার মত প্রশ্ন:
১.স্থান-সময় কাঠামো বোঝাতে যে দ্বিমাত্রিক উদাহরণ ব্যবহৃত হয়েছে,সেখানে(আমার হিসেব মতে)বলগুলো নেটের উপর যে বক্রতা সৃষ্টি করে,সেটা তো পৃথিবীর গ্রাভিটির জন্যেই হচ্ছে।এখন,কোন গ্রাভিটি-বিহীন পরিবেশে নেট ঝুলিয়ে তার উপরে বলগুলো ছাড়লে আমরা কী ফলাফল পেতাম?
২.দ্বিনাত্রিক নেটের ওপরের ভারী-হালকা বলগুলোর দ্বারা সৃষ্ট বক্রতার জন্য যদি পৃথিবীর গ্রাভিটি দায়ী হয়,তাহলে স্পেস-টাইম কন্টিনামের এইসব বিবিধ বক্রতা(গ্রাভিটেশনাল ওয়েভের) জন্য কার গ্রাভিটি দায়ী?

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনি খুবই ভালো একটা প্রশ্ন করেছেন। সত্যি কথা বলতে আমি ভাবছিলাম যে চাদরের এনালজি দেয়ার সাথে সাথেই এই প্রশ্নটা উঠবে এবং আমার লেখাতেই এটা ব্যাখ্যা করা উচিত ছিল কি না!

চাদরের উদাহরণটি আসলে জেনারেল রেলিটিভিটির সবচেয়ে দুর্বল কিন্তু সহজবোধ্য এনালজি। কারণ, এই এনালজিতে গ্র্যাভিটিকে ব্যবহার করা হয়েছে গ্র্যাভিটি বুঝানোর জন্য। আসল কাহিনী হল এরকমঃ (আমি নিজে এখনও পিএইচডি স্টুডেন্ট, তাই শিখার পর্যায়ে আছি। কেউ এক্সপার্ট হলে হয়ত আমার থেকে অনেক ভালো বুঝাতে পারবেন) - প্রথমে বুঝতে হবে ভর কি? কেনো কোন জিনিস ভারী, বা কোন জিনিস হালকা? আবার আমরা জানি ভর আর শক্তি একই (E = mc^2, E = শক্তি, m = ভর)। ধরি, আমরা একটা পরিমাপক ডিফাইন করলাম, যেটার নাম দিলাম "স্ট্রেস-এনার্জি টেন্সর"। এই স্ট্রেস-এনার্জি টেন্সর যে কোন কিছুর শক্তিকে প্রকাশ করে। এখানে যে কোন কিছু বলতে মহাবিশ্বের যে কোন বস্তুকে বুঝান হচ্ছেঃ যার স্থিতি ভর আছে (ইলেক্ট্রন, প্রোটন ইত্যাদি) এবং যার স্থিতি ভর নাই (যেমনঃ আলোর কণিকা বা ফোটন)। স্থিতি ভর থাকুক বা না থাকুক, সবারই কিন্তু শক্তি আছে।

আইন্সটাইন বুঝেছিলেন যে, পদার্থ বা শক্তির সাথে স্থান-কালের একটা সম্পর্ক আছে, পদার্থ বা শক্তি স্থান-কালকে প্রভাবিত করে। এটা তিনি বুঝেছিলেন স্পেশাল রিলেটিভিটি এবং প্রিন্সিপাল অব ইকুইভ্যালেন্স এর যোগফল থেকে। তিনি থট-এক্সপেরিমেন্ট করে বুঝেছিলেন যে, এই প্রভাবটা জ্যামিতির নিয়ম মেনে চলে, এবং গ্র্যাভিটিকে এই প্রভাবের বাহ্যিক ফলাফল হিসেবে প্রকাশ করা যায়। এই সব কিছুর গাণিতিক রূপ থেকে আইনস্টাইনের ফিল্ড ইকুয়েশন আসছে, যা থেকে আমরা একটা সম্পর্ক দাঁড়া করাতে পারি যে, এই "স্ট্রেস-এনার্জি টেন্সর" স্থান-কালকে কিভাবে প্রভাবিত করে? আরও এক ধাপ এগিয়ে ফিল্ড ইকুয়েশন সমাধান করলে দেখা যায় যে, এই প্রভাবিত করাটা সবসময় জ্যামিতি মেনে চলে এবং এনার্জি ও মোমেন্টামের সংরক্ষণশীলতার সূত্র মেনে চলে।

তাহলে শেষ পর্যন্ত ভরকে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে যে, ভর হচ্ছে একটা পরিমাপক যেটা বলে যে, কোন বস্তু স্থান-সময়কে কতটুকু প্রভাবিত করবে। আর স্থান-কালের জ্যামিতির উপর ভরের গতিপথ নির্ভর করে। আর এ প্রভাব এবং প্রভাবিত - সব কিছুই প্রকৃতির মৌলিক গণিত এবং সূত্র মেনে হয়।

সবশেষে আপনি যদি আসল প্রশ্নটা করেন, "কেন স্থান-সময় প্রভাবিত হয়?", তাহলে এর কোন উত্তর আপাতত নেই। যদি গ্র্যাভিটির কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি দাঁড়া করানো যায় (যেটা করতে পারলে "ইউনিফিকেশন অব ফান্ডামেন্টাল ফোর্স" বা "থিওরি অভ এভ্রিথিং" বের করাও সম্ভব হবে), তাহলে হয়ত এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

আবার যদি প্রশ্ন হয়, কিভাবে কারো ভর আছে আবার কারো নাই, আবার থাকলেও কেন এরকম ভরই আছে, যেমন ইলেক্ট্রনের ভর কেনো প্রোটনের ভরের ১০০০ ভাগের ৫ ভাগ? এর অনেকগুলো হাইপোথেটিক্যাল উত্তরের মধ্যে একটা উত্তর হল হিগস মেকানিজম। খুব সরল করে বলা যায়, হিগস ফিল্ড মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুতে সবার ভর ঠিক করে দিয়েছিল। হিগস নিয়ে আরেকদিন গল্প বলব নে। আজ এখানেই ক্ষেমা দিলাম হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ।
প্যাঁচটা আসলে লেগেছিলো গ্রাভিটি দিয়ে গ্রাভিটি বোঝানোর জন্য।
তারমানে এনালজিটা সহজবোধ্য হলেও পুরোপুরি নিখুঁত না।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

১। সেক্ষেত্রে বলগুলো সরলরেখায় যেত। কারণ চাদরটা সোজাই থাকত।

২। প্রশ্নটা পরিষ্কার না। যেকোনো ভরযুক্ত বস্তুই (এমনকি আমি কিংবা আপনিও) এই বক্রতার জন্য দায়ী। হালকা বস্তুর জন্য বক্রতা এতটাই অল্প, যে সেটা হয়তো ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না। তাই আমাদের অপেক্ষা করতে হয় ব্ল্যাকহোলের মতন 'ভয়াবহ' ভারী যুগলের ভালবাসা করা পর্যন্ত। প্রযুক্তি আরও সূক্ষ্ম হয়ে উঠলে একদিন হয়তো আর ব্ল্যাকহোলেদের অভিসারের জন্য বসে থাকতে হবে না।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

তাহলে কি বলগুলোর নিজেদের ভরের জন্য চাদরের উপরে কোন প্রভাব নেই?

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

ভরযুক্ত হলে অবশ্যই আছে। (এইজন্য এনালজি জিনিসটা ভাল হইলেও ডরাই, কারণ সেটা অনেক সময় উল্টো বুঝতে প্রভাবিত করে।) গন্ডগোলমার্কা চাদরের এনালজিতে 'বড়' (অর্থাৎ ভর বেশি, হাতি/ডাইনোসরমার্কা) টাইপের একটা কিছুকে চাদরের ওপর ছাড়লে তার আশেপাশে 'ছোট' (অর্থাৎ কম ভরের, এমিবামার্কা) জিনিসপাতি (বল দিয়ে দেখানো) কিভাবে আচরণ করবে বা প্রভাবিত হবে সেটা বলা হয়। সেই প্রেক্ষিতে উত্তর দিয়েছিলাম। এখন, ধরেন ওই ছোট (এমিবামার্কা) জিনিসের জন্য চাদরে যে উঁচানিচাটা হবে সেখানে আবার আরও ছোট (কোয়ার্কমার্কা) জিনিসপত্র আটকায় যাবে। সূর্যের 'বক্রতায়' পৃথিবিসমেত আমরা আটকে আছি, পৃথিবীর সৃষ্ট বক্রতায় আবার চাঁদ আটকে গেছে। পুরা ব্যাপারটা জটিল একটা গানিতিক হিসাব। চাদর যার খুব দুর্বল একটা 'প্রতিরূপ' দাঁড়া করানোর চেষ্টা করে মাত্র। আর, বিজ্ঞানে 'মাপ' জিনিসটাও ধর্তব্য। ধরেন (এনালজি কিন্তু) পাঞ্জাবি বানাতে গেলে আমরা মিলিমিটারের হিসাব নিয়ে মাথা ঘামাই না, রাস্তা মাপতে গেলে এক-আধ মিটার এদিক-ওদিক হলেও কিছু যায় আসে না, আবার ধরেন চেয়ার-টেবিল বানাতে এক মিটারের এদিক-ওদিক হলে নিশ্চয় কাঠমিস্ত্রিকে ছেড়ে দেবেন না।

ওপরে মূল লেখক বিস্তারিত বলেছেন। আমি অফ গেলাম।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

হাসি ধন্যবাদ।
এনালজিই তাহলে সব নষ্টের গোড়া।

কেউ একজন

অতিথি লেখক এর ছবি

সুন্দর একটা লেখা উপহার দেবার জন্য ধন্যবাদ না জানিয়ে পারছিনা, শুধু লেখাই না মন্তব্যেও যেভাবে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছেন তাতে করে আরো লেখা যে আপনার কাছে আমাদের পাওয়া উচিত এটা আরেকবার অন্য সবার মতই ভাই মনে করিয়ে দিলাম।

সোহেল ইমাম

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ! আরও ভালো লেখার প্রচেষ্টা থাকবে হাসি

এক লহমা এর ছবি

অসাধারণ সুন্দর লেখা হয়েছে।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে হাসি !!

nipu এর ছবি

চমৎকার লেখা! ধন্যবাদ।
কয়েকটা প্রশ্ন।

দুরথেকে আসার সময় গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ দুর্বল হয় কিসের প্রভাবে? মানে অন্য গ্যালাক্সি যতই দুরে থাক গ্যালাক্সির গুলোর মাঝের যায়গাতো ফাকা।

দৈত ব্লাকহলো কতটা দূর্লভ? মানের আরো কয়েকটা এরকম পরীক্ষার সুযোগ আসতে আনুমানিক কত সময় লাগতে পারে বলে মনে হয়?

আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রের ম্যাসিভ ব্লাকহোল এবং এর তার অতি নিকটে হাজারো ম্যাসিভ নক্ষত্রের ঘুর্ননে তৈরী গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ কি পরিমাপ করার মত বড় নয়। মানে যদিও এটা দ্বৈত ব্লাকহোল দুর্বল কিন্তু জিনিসটাতো নিকটে।

অতিথি লেখক এর ছবি

মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ!

১। যে কোন এনার্জি যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায় যখন দূরত্ব অনুসারে সে শক্তি হারায়। একই ঘটনা আলো এবং অন্যান্য মৌলিক বলগুলোর ক্ষেত্রেও সত্যি। এর কারণ খুবই সহজঃ শক্তির সংরক্ষণশীলতা - ধরুন ১০ একক শক্তি কোন একটা কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে যাওয়া শুরু করল। এই ১০ একককে যদি আপনি ১ মাইল ব্যাসের বৃত্তাকার ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেন, তাহলে আমরা বৃত্তের সীমান্তে/পরিধিতে দাঁড়িয়ে যেই শক্তি পাব, আপনি যদি ১০০০ মাইলের বৃত্তাকার ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেন তাহলে অবশ্যই তার থেকে অনেক কম পাব। এজন্যই বহু দূর পথ পাড়ি দিয়ে আসতে আসতে তরঙ্গ দুর্বল হয়ে যায়। এর সাথে আরও আছে আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য উৎসের সাথে মিথস্ক্রিয়া।

২। দ্বৈত ব্ল্যাকহোল খুব বেশি দুর্লভ কিছু না (সাধারণত গ্যালাক্সি মার্জ করার সময় বা বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে এদের প্রায় সবসময়ই পাওয়া যায়), কিন্তু দ্বৈত ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ এবং মিলন বেশ দুর্লভ। তাও ভালো মত খোঁজাখুঁজি করলে ৫ বছরে দুই-একটা পাওয়া যেতে পারে (এটা আমি ১০০% নিশ্চিত না, অভিজ্ঞতার অনুমান থেকে বলছি)।

৩। হ্যাঁ, সেই প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু এখানে অন্য সমস্যা আছেঃ গ্যালাক্সির কেন্দ্র খুবই কোলাহলমুখর জায়গা। এখানে নিউট্রন স্টার, ছোট ব্ল্যাকহোল, সুপার ম্যাসিভ হট নেবুলা এবং আরও অনেক কিছু থাকে। এক একরকম সিস্টেমের জন্য সিগনালের অ্যামপ্লিচিউড এবং ফ্রিকুয়েন্সি বিভিন্ন হবে এবং এরকম ইন্টার-কানেক্টেড কমপ্লেক্স সিস্টেমের জন্য গ্রাভিটেশনাল ওয়েভের সিমুলেশন এবং প্রেডিকশন করা অনেক কঠিন। তবে এটা নিয়ে এখন খুব তোড়জোড়ে কাজ চলছে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA