হুমায়ুন আজাদের প্রবচন

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ০৯/০৪/২০০৮ - ১২:২৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সুশান্ত বর্মন

তীব্র, সুদৃঢ়, শাণিত, মর্মভেদী এবং সত্যাশ্রয়ী মন্তব্যকে প্রবচন বা প্রবাদ বলে। এর ইংরেজি হলো- Aphorism, Maxim, Pensee, Sententia, Proverb ইত্যাদি। বিভিন্ন ভাষা ও জাতির মধ্যে প্রবচনের বিষয়ে উপলব্ধিবোধ বিভিন্ন থাকার কারণেই নামের এই বৈচিত্র্য। এগুলোতে মানুষ এবং সময় সম্পর্কে সংহতভাবে সাধারণ সত্য প্রকাশ করা হয়। ‘ম্যাক্সিম’ রচয়িতার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীকে ধারণ করে। ‘পঁসে’ বা ‘অ্যাফরিজম’ অনেকটা ম্যাক্সিমের মতো। ‘সেন্টেনশিয়া’ এখন কটাক্ষের বাহন হয়ে গেছে। এরিস্টটল, অস্কার ওয়াইল্ড, আলবেয়ার কাম্যু, কোলরিজ, গ্যেটে, চসার, নিৎসে, প্র“স্ত, বার্নার্ড শ, ফ্রান্সিস বেকন, উইলিয়াম ব্লেক, ভলতেয়ার প্রমুখ বিদেশী লেখকেরা তাদের লেখায় প্রবচন ব্যবহার করেছেন। বাংলা ভাষায় ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, জীবনানন্দ দাস প্রমুখের লেখায় প্রবচন পাওয়া যায়। জীবনচেতনার গভীর অনুভব এগুলোতে বিভিন্নরূপে ধরা পরেছে।
প্রবচন সাধারণত নৈর্ব্যাক্তিক দৃষ্টিতে লেখা হয়। তবে যাঁদের প্রবচন বেশ বিখ্যাত তাঁরা প্রবচনের জন্য প্রবচন লেখেননি। তাঁরা রচনার বিভিন্ন জায়গায় নির্মোহ ভাবেই প্রবচনের জন্ম দিয়েছেন। প্রথম সচেতনভাবে প্রবচন লেখেন লা রশফোকো (La Roche Foucault)। ১৬৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘Maximes‘ ফ্রান্সের সাহিত্য জগতে আলোড়নের সৃষ্টি করে। পাস্কাল ১৬৭০ সালে প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত ‘‘Defence of Christian Religion‘ নামক পঁসের সংগ্রহ। ১৬৯২ সালে বের হয় জর্জ হ্যালিফ্যাক্সের ‘Maximes of State’। ১৭৪৬ সালে বের হওয়া ভবনার্গ এর প্রবচনগুচ্ছে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও দিদরো, জোজেফ জোবের প্রমুখ সাহিত্যিক উপলব্ধির মর্মলোকে দাঁড়িয়ে পঁসে রচনায় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। বাংলা ভাষায় সচেতনভাবে প্রবচন রচনার কোন ঐতিহ্য নেই। হুমায়ুন আজাদই প্রথম সচেতনভাবে প্রবচন রচনা করেন। ১৯৮৯ সালে এগুলো ‘অরুণিমা’ নামে একটি সাময়িকীতে প্রথম মুদ্রিত হয়। তিনি মানুষ, বাঙালি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্মসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্মোহ উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন। নিচের সুনির্বাচিত প্রবচনগুলি হুমায়ুন আজাদের ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘প্রবচনগুচ্ছ’ বইতে দেয়া বানানরীতি মেনে প্রকাশ করা হলো।

* পশু আর পাখিরাই মানবিক।
* এক বইয়ের পাঠক সম্পর্কে সাবধান।
* মৌলিকতা হচ্ছে মঞ্চ থেকে দূরে অবস্থান।
* বিনয়ীরা সুবিধাবাদী, সুবিধাবাদীরা বিনয়ী।
* প্রতিটি দগ্ধ গ্রন্থ সভ্যতাকে নতুন আলো দেয়।
* মানুষ মরলে লাশ হয়, সংস্কৃতি মরলে প্রথা হয়।
* বদমাশ হওয়ার থেকে পাগল হওয়া অনেক মানবিক।
* আবর্জনাকে রবীন্দ্রনাথ প্রশংসা করলেও আবর্জনাই থাকে।
* সৎ মানুষ মাত্রই নিঃসঙ্গ, আর সকলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।
* পুঁজিবাদী পর্বের সবচেয়ে বড়ো ও জনপ্রিয় কুসংস্কারের নাম প্রেম।
* ইতিহাস হচ্ছে বিজয়ীর হাতে লেখা বিজিতের নামে একরাশ কুৎসা।
* যে বুদ্ধিজীবী নিজের সময় ও সমাজ নিয়ে সন্তুষ্ট, সে গৃহপালিত পশু।
* রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ বিপরীত বস্তু: একটি ব্যাধি অপরটি স্বাস্থ্য।
* শাড়ি প’রে শুধু শুয়ে থাকা যায়; এজন্যে বাঙালি নারীদের হাঁটা হচ্ছে চলমান শোয়া।
* বাঙালি একশো ভাগ সৎ হবে, এমন আশা করা অন্যায়। পঞ্চাশ ভাগ সৎ হ’লেই বাঙালিকে পুরস্কার দেয়া উচিত।
* মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, তবে বাঙালির ওপর বিশ্বাস রাখা বিপজ্জনক।
* বাঙালি যখন সত্য কথা বলে তখন বুঝতে হবে পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে।
* গণশৌচাগার দেখলেই কেনো যেনো আমার বাঙালির আত্মাটির কথা বারবার মনে পড়ে।
* বাঙালির জাতিগত আলস্য ধরা পড়ে ভাষায়। বাঙালি ‘দেরি করে’, ‘চুরি করে’, ‘আশা করে’, এমনকি ‘বিশ্রাম করে’। বিশ্রামও বাঙালির কাছে কাজ।
* বাঙালি অভদ্র, তার পরিচয় রয়েছে বাঙালির ভাষায়। কেউ এলে বাঙালি জিজ্ঞেস করে, ‘কী চাই?’ বাঙালির কাছে আগন্তুকমাত্রই ভিক্ষুক। অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে বাঙালি বলে, ‘দাঁড়ান।’ বসতে বলার সৌজন্যটুকুও বাঙালির নেই।
* রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়া দরকার ছিলো না, কিন্তু দরকার ছিলো বাঙলা সাহিত্যের। পুরস্কার না পেলে হিন্দুরা বুঝতো না যে রবীন্দ্রনাথ বড়ো কবি; আর মুসলমানেরা রহিম, করিমকে দাবি করতো বাঙলার শ্রেষ্ঠ কবি হিশেবে।
* রবীন্দ্রনাথ এখন বাঙলাদেশের মাটি থেকে নির্বাসিত, তবে আকাশটা তার। বাঙলার আকাশের নাম রবীন্দ্রাকাশ।
* সৌন্দর্য রাজনীতির থেকে সব সময়ই উৎকৃষ্ট।
* এখানে অসতেরা জনপ্রিয়, সৎ মানুষেরা আক্রান্ত।
* যতোদিন মানুষ অসৎ থাকে, ততোদিন তার কোনো শত্রু থাকে না; কিন্তু যেই সে সৎ হয়ে ওঠে, তার শত্রুর কোনো অভাব থাকে না।
* গাধা একশো বছর বাঁচলেও সিংহ হয় না।
* মানুষ সিংহের প্রশংসা করে, কিন্তু আসলে গাধাকেই পছন্দ করে।
* সুন্দর মনের থেকে সুন্দর শরীর অনেক আকর্ষণীয়। কিন্তু ভণ্ডরা বলেন উল্টো কথা।
* অধিকাংশ সুদর্শন পুরুষই আসলে সুদর্শন গর্দভ।
* অধিকাংশ রূপসীর হাসির শোভা মাংসপেশির কৃতিত্ব, হৃদয়ের কৃতিত্ব নয়।
* শ্রদ্ধা হচ্ছে শক্তিমান কারো সাহায্যে স্বার্থোদ্ধারের বিনিময়ে পরিশোধিত পারিশ্রমিক।
* বাস্তব কাজ অনেক সহজ অবাস্তব কাজের থেকে; আট ঘন্টা একটানা শ্রম গাধাও করতে পারে, কিন্তু একটানা এক ঘন্টা স্বপ্ন দেখা রবীন্দ্রনাথের পক্ষেও অসম্ভব।
* কোনো দেশের লাঙলের রূপ দেখেই বোঝা যায় ওই দেশের মেয়েরা কেমন নাচে, কবিরা কেমন কবিতা লেখেন, বিজ্ঞানীরা কী আবিষ্কার করেন, আর রাজনীতিকেরা কতোটা চুরি করে।
* মানুষ যখন তার শ্রেষ্ঠ স্বপ্নটি দেখে তখনি সে বাস করে তার শ্রেষ্ঠ সময়ে।
* কবিতা এখন দু-রকম: দালালি ও গালাগালি।
* মসজিদ ও মন্দির ভাঙার সময় একটি সত্য দীপ্ত হয়ে ওঠে যে আল্লা ও ভগবান কতো নিষ্ক্রিয়, কতো অনুপস্থিত!
* ধার্মিক কখনোই সম্পূর্ণ মানুষ নয়, অনেক সময় মানুষই নয়।
* মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে দুটি তত্ত্ব রয়েছে: অবৈজ্ঞানিকটি অধঃপতনতত্ত্ব, বৈজ্ঞানিকটি বিবর্তনতত্ত্ব। অধঃপতনতত্ত্বের সারকথা মানুষ স্বর্গ থেকে অধঃপতিত। বিবর্তনতত্ত্বের সারকথা মানুষ বিবর্তনের উৎকর্ষের ফল। অধঃপতনবাদীরা অধঃপতনতত্ত্বে বিশ্বাস করে; আমি যেহেতু মানুষের উৎকর্ষে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করি বিবর্তনতত্ত্বে। অধঃপতনের থেকে উৎকর্ষ সব সময়ই উৎকৃষ্ট।
* ইচ্ছে হয় নষ্ট সমাজ, সমস্ত প্রথা, আর ভণ্ডামোকে এক লাথিতে মহাকালের নর্দমায় ফেলে দিতে।
* পৃথিবীতে যতো দিন অন্তত একজনও প্রথাবিরোধী মানুষ থাকবে, ততো দিন পৃথিবী মানুষের


মন্তব্য

স্বাধীন এর ছবি

হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুলো পড়া ছিল না। জানা হল একেই বলে প্রবচন। সংগ্রাহককে ধন্যবাদ।

মুহম্মদ জুবায়ের এর ছবি

এই বইটা প্রকাশের পরপরই হস্তগত হয়েছিলো। হারিয়ে ফেলেছি। এটা কি এখনো বাজারে পাওয়া যায়?

-----------------------------------------------
ছি ছি এত্তা জঞ্জাল!

অতিথি লেখক এর ছবি

হিহি আমার মনে পড়ে, বইমেলায় আমরা বন্ধুরা মিলে পরিচিতদের ধরে ধরে বইটা কিনাতাম আগামীর স্টল থেকে, আগামী প্রকাশনীতে এখনো পাওয়া যাবে আশা করি ।

- খেকশিয়াল

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।