পাখিগ্রাম ভাটিনা

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শনি, ০৯/০১/২০১০ - ১০:৫৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

পাখি গ্রাম ভাটিনা

নাসরিন আপার বাড়িতে আজ দুপুরে দাওয়াত। জানেওয়ালা হিসেবে তার বেশ কদর রয়েছে। আছে নানা বিষয়ে পান্ডিত্যও।খাওয়া পর্ব শেষে তার সাথে চলে নানা গল্প , আলোচনা। এর মধ্যেই কিছুটা রহস্র রেখে ভাটিনা গ্রামে যাওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।কি আছে সেখানে। ম্লান হাসিতে জানান, ‘অন্য রকম ভালো লাগা’। আর কিছুই বললেন না তিনি।ভাটিনার রহস্য নিয়েই চলে এলাম পুলকদের বাড়ীতে। দিনাজপুরে হাতে গোনা যে কয়টি আদি হিন্দু পরিবার রয়েছে, পুলকবাবুরা তাদের মধ্যে একটি।কিšত্ত পুলকও জানাতে পারল না ভাটিনা গ্রামটির রহস্য।

রহস্য জানার আগ্রহ নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম ভাটিনার উদ্দেশ্যে। সঙ্গি হলেন তারুণ্যদৃপ্ত রায়হান। দিনাজপুরের রাজবাড়ীকে পেছনে ফেলে অল্প সময়ে পৌছে গেলাম উঁচু বাধের ওপর।পাশেই গা ছমছম করা শশ্মান।দূরে কালি পুজার মেলা বসেছে। বাধের দুই পাশে কোন পানির দেখা মিলল না।চারদিকে শুধুই ধান ক্ষেত।দূর থেকে বাতাসে ভেসে আসছে গানের আওয়াজ -‘ ডাক দিয়াছে দয়াল আমারে, রইব না আর বেশী দিন, তোদের মাজারে’। হঠ্যাৎ আমাদের রাস্তা নেমে গেল বাধ বেয়ে একেবারে ধানক্ষেতের পথে।ধুসর সবুজ ধান গাছে থোকা থোকা কাঁচা ধান ঝুলছে। খানিকটা যেতেই পানির বাধা ঠেকলো।গ্রামের লোকেরা পানি পার হচ্ছে খেয়া নৌকা দিয়ে। খেয়ার মাঝি জানায়,এটি গর্ভেশ্বরী নদী।চর পড়ে নদীটি মৃত হলেও এক সময় এর গর্ভ স্পর্শ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।বর্ষা মৌসুমে চলতো নদীর ভাঙ্গাগড়ার খেলা।এ কারণেই শহরের চারদিকে তৈরী করা হয়েছে বাধ।খেয়ার ওপারে নদীর তীর ঘেষা চওড়া রাস্তা।চারপাশে সারি সারি লিচু গাছ।লোক বসতি বেশ কম। রাস্তায় মাঝে মাঝেই হুমড়ি খেয়ে পড়তে হলো গ্রাম্য মাটির উচু বাধায়।বিরক্ত মুখে কিছু দূর যেতেই এক কৃষক দেখিয়ে দিল ভাটিনা গ্রামের মেঠো পথটি। ঢুকতেই থমকে দাড়ালাম। বড় একটি সাইনর্বোডে লেখা ‘ পাখি সংরক্ষিত এলাকা- পাখি মারা নিষেধ’।

আমরা ঢুকে পড়লাম গ্রামটিতে।ভাটিনার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই চোখে পড়ার মতো বাঁশঝার।সারা গ্রামেই রয়েছে ছোট ছোট পুকুর। পুকুরগুলো বাঁশ আর আম গাছে ঘেরা। এছাড়া চারদিকে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত। একটি বড় পুকুর পেরিয়ে যতই এগুচ্ছি ততই শত শত পাখির চিৎকারের শব্দ স্পষ্ট হচ্ছে। সামনে আসতেই আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম খানিকক্ষণ। একটি বাঁশবাগানের প্রায় প্রতিটি ডালেই দেখা গেল নানা জাতের শত শত পাখি। মনের আনন্দে সকলেই চেচাচ্ছে।এ যেন পাখির মহা মিলন স্থল।মনের ভেতর এক অন্য রকম ভালো লাগা টের পেলাম।এ এক অন্য রকম মন ঝুরানো দৃশ্য। অন্য পাশের আরেকটি বাঁশঝারে বসেছে অজস্র বক আকৃতির কালো পানকৌড়ি। চোখের সামনেই কয়েকটি পানকৌড়ি পানিতে ডুবে ঠোট দিয়ে ধরে আনলো বেশ কয়েকটি মাছ। একটি দেশী শালিককে দেখা গেল বড় একটি পানকৌড়িকে ঠোকর দিতে পিছু নিয়েছে। এত পাখি দেখে আমরা নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। দেখার আনন্দে ছটফট করতে লাগলাম।একটি ছোট্ট পুকুরের চারদিকের গাছগুলোতে অজস্র বক আকৃতির এক ধরণের বাদামী রংয়ের পাখি দেখা গেল। চোখবন্ধ করে বেশ আয়েশী কায়দায় শান্তভাবে ঘুমাচ্ছে তারা।পেছন থেকে একজন জানালো, এরা রাতচোরা। হয়তো এ কারণে চোরদের মতো দিনে ঘুমাচ্ছে।্পাখি উড়াতে একজন বিশেষ কায়দায় শব্দ করতেই বিস্ময়কর এক দৃশ্যের অবতারণা হলো।হাজার হাজার পাখি গাছ থেকে বেড়িয়ে আকাশের দিকে ছুটে চলল।মনেই হয় নি গাছগুলোতে এত পাখি ছিল।এ এক অন্য রকম দৃশ্য্। মাথার ওপর আকাশের সব খানেই হাজার হাজার পাখি উড়ছে।মনে হচ্ছে ক্রমেই আকাশ থেকে পাখিদের একটি বড় জাল আমাদের ঢেকে দিবে। ভাটিনা গ্রামের লোকেরা এরকম মন জুরানো দৃশ্য দেখছে প্রতিদিন। শত শত পানকৌড়ি,সাদাবক,কুনিবক,গুটকল,রাতচোরা,ঘুঘু, শালিক,টিয়া আর ময়নার ভয়হীন অবাধ আনাগোনা চলে গ্রামটিতে। কাদের মহতি উদ্যোগে তৈরী হয়েছে পাখিদের এমন প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য। স্থানীয় লোকেরা এক বাক্যে জানালো আলোর ভুবন যুব সমবায় সমিতির কথা।

১৯৯৬ সাল। ভাটিনা গ্রামের লোকেরা তখন ছিল খানিকটা শিক্ষা বিমুখ। আর্থিক দৈন্যতাই এর প্রধান কারণ।পরিবেশগত কারণে গোটা গ্রামেই ছিল পাখির আনাগোনা।ফাঁদ পেতে বক ও পাখি ধরা ছিল গ্রামবাসীর দৈনন্দিন ব্যাপার।এছাড়া গ্রামটিতে বিত্তশালীদের এয়ার গান আর বন্দুকের শব্দ চলতো প্রায় সারাদিন।দিন শেষে একঝাক মৃত পাখির দেহ ঝুলতে থাকতো শিকারীদের মটর সাইকেলে।

গ্রামের কলেজ পড়–য়া একরামূল হক থাকেন খালার বাড়ীতে। নিজেদের ভাগ্যগড়া আর গ্রামের জন্য কাজ করার স্বপ্ন ছড়িয়ে দেন যুবকদের মাঝে। অল্প সময়ে তৈরী হয় আলোর ভুবন যুব সমবায় সমিতিটি।প্রথমে ২৫টি পরিবার থেকে শিক্ষা বৃত্তির জন্য প্রতি সপ্তাহে সংগ্রহ করা হয় ১ টাকা করে।তার সাথে অন্যান্য সদস্যদের সঞ্চয় দিয়ে চলে শিক্ষা কার্যক্রম।যুবকদের এই উদ্যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয় মেম্বার ও বিশিষ্ট্য মুক্তিযোদ্ধা হাশেম তালুকদার। মূলত হাশেম তালুকদারের সম্পৃক্ততার কারণেই সমিতিটি সহজেই গোটা গ্রামে আলো ছড়িয়ে দিতে থাকে।অল্প সময়েই আলোর ভুবন সমিতি মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। কয়েক মাস কেটে গেলে সমিতির সভাপতি একরামূল প্রস্তাব করেন গোটা গ্রামটিতে পাখির অভয়রাণ্য তৈরী করার। প্রথমেই পাখি না মারার প্রস্তাবে সম্মতি দেন হাশেম তালুকদার নিজেই।পাখি মারার দীর্ঘদিনের অভ্যেস ত্যাগ করে ছুড়ে ফেলেন নিজের এয়ার গান আর বন্দুকটিকে। গ্রামের প্রভাবশালী হওয়ায় অন্যান্যরাও অনুসরণ করে তাকে। গোটা গ্রামবাসী মেতে উঠে পাখি প্রেমে। পরিকল্পনা মোতাবেক ভাটিনায় ঢোকার ৩টি প্রবেশমুখে টাঙ্গিয়ে দেয়া হয় পাখি মারা নিষেধ লিখিত বড় সাইন বোর্ড। গ্রামবাসীর ভালোবাসায় ক্রমেই ভাটিনা পরিচিত হয়ে ওঠে পাখি গ্রাম হিসেবে।

এভাবেই কেটে যায় ১৩ বছর।দিনাজপুর শহরে থাকা ইমরান জানায় নিজের অভিগতার কথা। একবার সাইনবোর্ডের নির্দেশকে উপেক্ষা করে পাখি মারতে ইমরান ঢোকে ভাটিনা গ্রামে। পাখি মারার অপরাধে গ্রামের ছোট ছেলে-মেয়ে ও মহিলারাসহ সকলেই তাকে কয়েক ঘন্টা আটকে রাখে।পাখি না মারার প্রতিশ্র“তি দিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পায় সে। এরপর থেকে ইমরান আর পাখি শিকার করে না।পেছনের কথা মনে হলে পাখি হত্যার অপরাধে আজো তিনি লজ্জিত হন।

ভাটিনা গ্রামটি সারা বছরই থাকে নানা ফসলে ভরপুর। টমেটো আবাদ হয় শত শত একর জমিতে।টমেটো চাষি মনসুর জানায় , সাধারণত টমেটো ক্ষেতে পোকার উপদ্রব এত বেশী হয় যে কিটনাশক ছিটিয়েও তা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। কিন্ত ভাটিনা গ্রামের শত শত পাখি ঐ সব পোকা খেয়ে ফেলে। ফলে কিটনাশক ছাড়াই পোকা দমন হয়্। এ কারণে এখানকার কৃষকেরা টমেটো ক্ষেতে বাঁশের কঞ্চি গেড়ে পাখিদের বসার বিশেষ ব্যবস্থা রাখে। তা ছাড়া পাখি থাকার কারণে ধান ক্ষেতে কারেন্ট পোকার আক্রমণ নাই বললেই চলে।

আলোর ভুবন সমিতির বর্তমান পরিকল্পনার কথা জানায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম।পাখিদের খাদ্যের কথা চিন্তা করে ইতিমধ্যে সমিতির উদ্যোগে গ্রামের রাস্তার পাশে লাগানো হয়েছে প্রায় ৩০০টি বট ও পাকুর গাছ। এছাড়া অন্যান্য গ্রামেও পাখি মারা বন্ধ করতে সমিতি প্রতি শুক্রবার মসজিদে মসজিদে সচেতনতা মূলক প্রচার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ৫টি পুকুর নিয়ে মাছ চাষ প্রকল্প এবং একটি লেয়ার মুরগির ফার্মসহ বিভিন্ন আয় বৃদ্ধিমূলক প্রকল্প থাকলেও সমিতির সদস্যরা মনে করে পাখি রক্ষার উদ্যোগটিই তাদের ব্যাপক পরিচিতি ঘটিয়েছে, করেছে সম্মানিত।

ঝড়ের পর পরই ভাটিনাবাসী বেড়িয়ে পরে কুলা হাতে।খুঁজে খুঁজে বের করে ঝড়ে আহত পাখিগুলোকে। সাধ্যমতো চিকিৎসা করে ছেড়ে দেয় তাদের গন্তব্যে।পাখিদের সাথে রয়েছে গ্রামবাসীর নাড়ীর টান। পাখি রক্ষার নায়ক একরামুলের স্বপ্ন - এক সময় ভাটিনাসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে পাখি মারা নিষেধ সংশ্লিস্ট সকল সাইন বোর্ড উঠে যাবে।পাখির মতো একটি প্রাণীকে হত্যা করার কথা কারো চিন্তায়ও আসবে না। ছোট শিশুরা বেড়ে উঠবে পাখিদের প্রতি ভালবাসা নিয়ে।পুথিগত শিক্ষা না পৌছালেও জীবের প্রতি দয়ার মহত্ব নিয়ে বেড়ে উঠবে শিশুরা।সকলের মনে পাখির প্রতি থাকবে মমতাবোধ ও ভালোবাসা।

ভাটিনা গ্রামে এখন আর কোন বন্দুকের শব্দ নেই। নেই কোন পাখি হত্যাকারীদের আনা গোনা।সকাল সন্ধ্যা গোটা গ্রামে চলে পাখিদের অবাধ আনন্দ চিৎকার।ছুটিরদিনে আশেপাশের শত শত পাখি প্রেমীদের পদধুলিতে ধন্য হয় গ্রামটি।অনেকের কাছে তাই ভাটিনা এখন পাখি গ্রাম।
সালেক খোকন


মন্তব্য

তিথীডোর এর ছবি

ভাটিনার গল্প পড়েছি পত্রিকায়, দেখেছি টিভিতে... আজ আবারো সবিস্তারে জানা হলো!
হোঁচট খেলাম বেশকিছু বানানপ্রমাদের ঘায়ে (আমি নিজেই যে ব্যাপারে কুখ্যাত) নিয়মিত লিখুন!

--------------------------------------------------
"সুন্দরের হাত থেকে ভিক্ষা নিতে বসেছে হৃদয়/
নদীতীরে, বৃক্ষমূলে, হেমন্তের পাতাঝরা ঘাসে..."

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

লেখাটা ভালো লাগলো। ছবি থাকলে আরো ভালো লাগতো।
কিন্তু বানান খুব খিয়াল কইরা
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

শেখ নজরুল এর ছবি

ভালো লাগলো লেখা

শেখ নজরুল

শেখ নজরুল

শুভাশীষ দাশ এর ছবি

লেখাটা ভাল। আরো যত্ন নিয়ে লিখলে অনেক ভাল হত।

সচলের দেশীয় ছবিওয়ালারা ভাটিনা নিয়ে মারাত্মক সব ফটোব্লগ করতে পারেন।

ওডিন এর ছবি

যেতে হবে। দিনাজপুর শহর থেকে কতখানি দূরে?
______________________________________
যুদ্ধ শেষ হয়নি, যুদ্ধ শেষ হয় না

লাবন্য [অতিথি] এর ছবি

বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই যদি এরকম একজন করে একরামুল/হাশেম তালুকদার থাকত!!

তানবীরা এর ছবি

পড়তে ভালো লাগলো। এরকম কিছু সব সময় আশা জাগায়
*******************************************
পদে পদে ভুলভ্রান্তি অথচ জীবন তারচেয়ে বড় ঢের ঢের বড়

*******************************************
পদে পদে ভুলভ্রান্তি অথচ জীবন তারচেয়ে বড় ঢের ঢের বড়

অতিথি লেখক এর ছবি

অভয়ারন্যের কথা শুনেছিলাম কিন্তু সেটা এত ব্যাপক লোকের অংশগ্রহনে এত চমৎকার ব্যাপার এটা প্রথম জানলাম । সবচে ভালো লাগলো কীটনাশকের ব্যবহার উঠে গেছে শুনে। প্রকৃতির ব্যবস্থাই সবচে ভালো ।

ধন্যবাদ চমৎকার একটা বিষয়ে জানানোর জন্য।

--
ইমতিয়াজ মির্জা।

আনন্দী কল্যাণ এর ছবি

এ বিষয়ে লেখার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
পাখিদের গ্রাম ঘুরে এসেছেন, আহা!

ইবরাহিম যুন [অতিথি] এর ছবি

প্রকৃতি ফিরিয়ে দেয় তার সমস্ত দেনা। এটাই প্রকৃতির আইন।
“সাধারণত টমেটো ক্ষেতে পোকার উপদ্রব এত বেশী হয় যে কিটনাশক ছিটিয়েও তা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। কিন্ত ভাটিনা গ্রামের শত শত পাখি ঐ সব পোকা খেয়ে ফেলে।“
পরিবেশকে বাঁচালে পরিবেশও আমাদের বাঁচাবে। আপনার লেখা ভালো লাগলো।

ইবরাহিম যুন

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।