সাংবাদিক নির্যাতন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা/রেনেসাঁ

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ৩১/০১/২০১০ - ৯:৩২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

IMG_9345_jipfff
ডঃ সাখাওয়াত আলী খান দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। সাংবাদিক নির্যাতন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর সাথে কথা হল কয়েকদিন আগে। সেই আলাপচারিতার কিছু অংশ তুলে ধরলাম।

রেনেসাঁ: বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে সাংবাদিক নির্যাতনের হার বাড়ছে। সিপিজে’র রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৯ সালে সারাবিশ্বে কমপক্ষে ৬৮ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যা পরিসংখ্যানের দিক থেকে গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ... ...

ডঃ সাখাওয়াত আলী খান: বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। তবে সংখ্যাটি সারাবিশ্বে বেড়ে গেলেও বিশ্বের সবদেশে একই মাত্রায় সাংবাদিক নির্যাতিত হচ্ছেনা এবং এমন অনেক দেশ আছে যেখানে আদৌ কোন সাংবাদিক নির্যাতিত হচ্ছে না। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে উন্নত দেশ অপেক্ষা উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোতে এই সংখ্যা বেশী।

রেনেসাঁ: সারাবিশ্বে সাংবাদিক নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী?
ডঃ সাখাওয়াত আলী খান: আমার ধারণা পৃথিবীর সব দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ধরন এক না বা একই কারণে এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে না। এক একটা দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো, শিক্ষার হার সব কিছুর উপর নির্ভর করে । কোন দেশে হয়ত বেশী পরিমাণে সাংবাদিক নির্যাতত হচ্ছে আবার কোন দেশে একজন সাংবাদিকও নির্যাতত হচ্ছেনা। ফলে নির্যাতন বেড়ে যাবার কারণ এক কথায় উত্তর দেয়া কঠিন। এক নম্বর কারণ হতে পারে উন্নয়নশীল দেশে আগে এত অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টিং হত না। উন্নয়নশীল দেশগুলো ব্রিটিশ কলোণী থেকে স্বাধীনতা লাভের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকতা সম্পর্কে তারা সম্যক জ্ঞান লাভ করতে থাকে, বুঝতে পারে রিপোটিং মানে শুধু যা দেখলাম তাই লিখলাম, তা নয়। খবর মানে খবরের পিছনের খবর সংগ্রহ করা। আর এই খবরের পিছনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা যেন বিষধর সাপের গর্তে হাত দিয়ে ফেলল। সাপের গর্তে হাত দেবার ফলে তারা ছোঁবল দিয়ে বসছে। আগে সাংবাদিকরা এই জায়গাগুলোতে কাজ করতনা, এখন এখানে কাজ করার ফলে সাংবাদিকদের শত্রুর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
আর একটা কারণ হতে পারে সারা বিশ্বে সব ক্ষেত্রেই সহনশীলতার মাত্রা কমে যাচ্ছে। তুচ্ছ কারণে মানুষ মানুষকে খুন করে ফেলছে। আগে সাংবাদিক লিখেছে তার জন্য তাকে খুন করতে হবে এটা কারও মাথায় আসত না। কিন্তু এখন মানূষকে খুন করা খুব সহজ হয়ে গেছে। খুন করলেও কোন বিচার হয়না। সমস্ত কিছু মিলিয়ে এখন ম্যানেজ করা যায়।

রেনেসাঁ: বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রধান প্রধান কারণ কী?
ডঃ সাখাওয়াত আলী খান: উপরের কারণগুলো তো আছেই তারপরে আর একটা বড় কারণ হল সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিভক্তি। এই বিভক্তির কারণে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো ক্রমশঃ দূর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের দাবী-দাওয়া আদায় করা দূরহ হয়ে পড়ছে। যতক্ষন এই বিভক্তি না কাটবে ততদিন পর্যন্ত তাদের অবস্থা ভাল হবার কোন সম্ভাবনা আমি দেখিনা।
আর প্রধান দুইদল যে যখন ক্ষমতায় গেছে তখনই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেছে। ক্ষমতায় গেলেই তারা নিজেদের সর্বেসর্বা ভাবে। ফলে আরেকদল ক্ষমতায় এসেই প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠে। রাজনীতিবিদরা প্রায়ই ক্ষমতা ব্যবহার করার মাত্রা ভুলে যান। ফলে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনদ্বারা প্রায়শঃই সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হন।

রেনেসাঁ: ঢাকা অপেক্ষা মফস্বলের সাংবাদিকরা বেশীমাত্রায় নির্যাতনের শিকার হয় কেন?

ডঃ সাখাওয়াত আলী খান: সাংবাদিকদের ট্রেনিং করানো বা বিভিন্ন কারণে আমি সারাদেশ ঘুরে যেটা দেখেছি, ঢাকার সাংবাদিকরা মফস্বলের তুলনায় অতটা অসহায় না। চাইলেই চট করে ঢাকার সাংবাদিকদের হেনস্তা করা যায়না। ঢাকার সাংবাদিক নির্যাতিত হলে প্রতিক্রয়াটা যত বেশী হবে মফস্বলের ক্ষেত্রে সেটা হয়না। মফস্বলের সাংবাদিদের স্থানীয় প্রসাশনের বিরূদ্ধে যাওয়া কঠিন। যার বিরূদ্ধে লিখছে পরক্ষনেই তার সাথে দেখা হচ্ছে। ঢাকার সাংবাদিদের সুবিধা হল তারা যার বিরূদ্ধে লিখছে বা বলছে তারা খুব সহজে সাংবাদিদের ধরতে বা চিনতে পারছে না আর তাছাড়াও নিজের অফিসের একটা বড় শক্তি তাদের পিছনে আছে। মফস্বলে নিরাপত্তার ব্যাপারটা দূর্বল। দুই একজন যারা সাহসী সাংবাদিকতা করছে তাদের উপরই খরগটা নেমে আসছে।

রেনেসাঁ: এই ক্ষেত্রে মিডিয়া হাউজগুলি কী ভূমিকা রাখতে পারে?
ডঃ সাখাওয়াত আলী খান: আমার মতে মফস্বল বা রাজধানী বিবেচনা না করে বরং কোন কোন ক্ষেত্রে মফস্বলের জন্য তাদের সাপোর্টটা বাড়িয়ে দেওয়া। যদি এই রকম নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তাহলে সেটা প্রতিরোধে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা দরকার। এতে করে সাংবাদিকরা মনের জোর পারে এবং বস্তুনিষ্ঠ খবর সংগ্রহে আরও মনোযোগী হবে।

তবে আর একটা ব্যাপার বলে ফেলা ভাল, যত সাংবাদিক নির্যাতিত হচ্ছে সবটাই কিন্তু সাংবাদিকতার জন্য হচ্ছেনা । ব্যক্তিগত, সামাজিক, পারিবারিক, গোষ্ঠীগত দ্বন্ধ এবং বিভিন্ন ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের জের ধরে এই ঘটনাগুলো ঘটছে। ঘটনাক্রমে ঐ ব্যক্তিটি সাংবাদিক হওয়ায় মিডিয়াতে বেশী আলোচনায় আসছে। মফস্বলের নানান জটিল ব্যবস্থার কারণে কখনও কখনও সাংবাদিকতার সাথে সম্পর্কহীন কোন বিষয় নিয়েও সাংবাদিক নির্যাতিত হচ্ছে বা খুন হচ্ছে।

রেনেসাঁ: আপনার মতে সাংবাদিকদের প্রধান প্রতিপক্ষ কে?
ডঃ সাখাওয়াত আলী খান: সাংবাদিকদের নিদিষ্ট কোন বন্ধু বা শত্রু নেই। সবাই বন্ধু আবার সবাই শত্রু। যার বিরূদ্ধে লেখে সেই শত্রু হয়ে যায়। সাংবাদিক যার বিরূদ্ধে লিখে তার সাথে ব্যক্তিগত একটা রেষারেষি থেকেই যায়।

রেনেসাঁ: অনেক সাংবাদিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, এমন অভিযোগও পাওয়া যায়। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি?
ডঃ সাখাওয়াত আলী খান: এ বিষয়ে আমার ....... (চলবে)

রেনেসাঁ
৩১.০১.২০১০


মন্তব্য

হাসিব এর ছবি

উপরের কারণগুলো তো আছেই তারপরে আর একটা বড় কারণ হল সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিভক্তি। এই বিভক্তির কারণে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো ক্রমশঃ দূর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের দাবী-দাওয়া আদায় করা দূরহ হয়ে পড়ছে।

এটা এভাবে ইন্টারপ্রেট করা যায় যে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিভক্তি একটা বড় কারন । এখন উন্নত দেশগুলোও তো প্রকাশ্যে পার্টির ধামাধরা হয়ে চলে । সেখানে কেন এই রাজনৈতিক মেরুকরণ বাঁধা হয়ে দাড়ায়নি ?

সাংবাদিকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে অধ্যাপক ড: সাখাওয়াতের বক্তব্যের অপেক্ষায় থাকলাম ।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি

এক্ষেত্রে মনে হয় মাত্রার ব্যাপারটা টানা যায়। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে এটা চরম আকারে। সে তুলনায় উন্নত দেশে এটা বিরাজমান হলে-ও ব্যাপক নয়। তাছাড়া সেসব দেশে দলসমূহের একটা রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে, বাঙলাদেশের মতো দেশে সেটা অপ্রতুল, প্রয়োজনের অনেক কম। মনে হলো।

===============
@ লেখক
পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

==============================
ঢাকার মৌন ঘ্রাণে বকুলফুলের নাভি
==============================
হা-তে এ-ক প্র-স্থ জো-ছ-না পা-ড়ে-র ঘ্রা-ণ

রেনেসাঁ [অতিথি] এর ছবি

ধন্যবাদ আশরাফ মাহমুদ। খুবই সুন্দর মতামত দিয়েছেন।

পরের পর্ব আগামীকাল ...

রেনেসাঁ [অতিথি] এর ছবি

উন্নত দেশেও গণমাধ্যম প্রকাশ্যে পার্টির ধামাধরা হয়ে চলে ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশের মত রাজনৈতিক মতপার্থক্য সেখানে কম। পৃথিবীর খুব কম দেশেই স্বাধীনতাবিরোধীরা প্রকাশ্যে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। কিন্তু আমার দেশে তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পাচ্ছে। আর এখানে গোষ্ঠীস্বার্থের চেয়ে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পায়। তাই বোধহয় রাজনৈতিক মেরুকরণ বাঁধা হয়েছে এখানে ।

পরের পর্ব আগামীকাল ...

সুরঞ্জনা এর ছবি

চলুক

বাকি অংশের অপেক্ষায় রইলাম।

-----------------------------------------------------------------
জগতে সকলই মিথ্যা, সব মায়াময়,
স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয় ।

............................................................................................
এক পথে যারা চলিবে তাহারা
সকলেরে নিক্‌ চিনে।

রেনেসাঁ [অতিথি] এর ছবি

ধন্যবাদ সুরঞ্জনা হক । মডুদের কাঁচি থেকে ছাড়া পেলে পরের পর্ব আগামীকাল ...

সুরঞ্জনা এর ছবি

ওনার এই সাক্ষাৎকার কি কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে? হলে চোখ এড়িয়ে গেছে বোধ হয়।
-----------------------------------------------------------------------
জগতে সকলই মিথ্যা, সব মায়াময়,
স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয় ।

............................................................................................
এক পথে যারা চলিবে তাহারা
সকলেরে নিক্‌ চিনে।

রেনেসাঁ [অতিথি] এর ছবি

চোখে যদি পড়ে দয়া করে জানাবেন।

নাশতারান এর ছবি

প্রসঙ্গটি উত্থাপণ করার জন্য ধন্যবাদ।

_____________________

আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।