যে নেই

নিলয় নন্দী এর ছবি
লিখেছেন নিলয় নন্দী [অতিথি] (তারিখ: শুক্র, ২৩/০৩/২০১২ - ৬:০৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

খেতে বসে বাবার বিষম লেগে যায়। মুখে ভাত নিয়ে কী যেন বলতে চাইছিলেন, হঠাৎ কথাটা না বলতে গিয়েই গেল গলায় ভাত ঠেকে।
‘আহা, কী যে কর না! একটু রয়েসয়ে খেলেই তো পারো। দোকান কি তোমার পালিয়ে যাচ্ছে নাকি?’ মা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে বাবার মাথায় চাপড় দেন,‘একটু জল খাও। ঠিক হয়ে যাবে।’
বাবা গ্লাসে জল ঢেলে মুখে তোলেন। পাশেই ছোট গ্লাসটা রাখা ছিল। কী মনে করে তিনি গ্লাসটা হাতে তুলে নিলেন। ধুলো জমেছে নাকি? ‘এই শোনো, এটা ধুয়ে রাখ না কেন?’
‘রেখে দাও এখন,’ মা বলে, ‘আমি ধুয়ে দেব।’
বাবা গ্লাস রেখে আনমনে ভাত মুখে তোলেন। এভাবেই খেতে খেতে তখন ‘খুকি-মা কই রে’ বলে ডেকে উঠতে চেয়েছিলেন। একটুর জন্য সামলে গেছেন। তাকিয়ে দেখেন ছোট থালাটাও রাখা আছে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে। পিঁপড়ের সারি চলেছে দেয়াল বেয়ে। থালাটার জন্যেই একটু বাঁক খেয়ে চলে যাচ্ছে জানালার চৌকাঠ বেয়ে দেয়ালের ওপাশে। জানালার বাইরে আমগাছের দিকে বাবা চেয়ে থাকেন। তাঁকে আনমনা দেখেও মা কিছু বলে না। থাকুক না, একটু সময় নিজের মতো।

সন্ধ্যেবেলায় ঘরে ঘরে ধূপধুনো দিতে গিয়ে মা দেখে, চিলেকোঠার ঘরের পাশে দাদু বসে আছেন একা। মেঘের গায়ে গায়ে তখনও আলোর আভাস। পাখিরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। দাদুর খুব শখ ছিল পায়রা পোষার। কী ভেবে একদিন সব উড়িয়ে দিলেন। বিকেলের দিকে এখন শুধুই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা। পোষা পায়রাগুলো যাবেই বা কোথায়? ফিরে এসে কয়েকটা বসে ঘরের উঠোনে, কয়েকটা ঘুলঘুলিতে।
‘বাবা, এখানে বসে কেন? মশা কামড়ায় না আপনাকে?’ মা এগিয়ে এসে পায়ের কাছে ধূপাতি নেড়ে দিতে থাকে। ধোঁয়ায় ভরে ওঠে ছাদের কোন। দাদু বোধহয় একটু বিরক্ত হন।
‘আহা, একটু বসি না মা। এখনই উঠে যাব।’
‘তাহলে উঠুন। অযথা মশার কামড়ের মধ্যে বসে থাকতে হবে না।’
দাদু উঠে সিঁড়ি বেয়ে নেমে নিজের ঘরে যান। বিছানায় যাওয়ার আগে দেয়াল আলমারির দিকে হাত বাড়ান। কত ধর্মের বই, কত পুরাণের বই, গল্প, উপন্যাস, কবিতা সব কিছু ছাড়িয়ে হাত পড়ে কালো রঙের একটা শ্লেটে। শ্লেটটা টেনে বের করতে গিয়ে ধাক্কা লাগে চকের বাক্সে। ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে ভাঙ্গা চক। দাদু ওদিকে খেয়াল করেন না। শ্লেটে কি লেগে আছে আঁকাবাঁকা অক্ষর? আলোর কাছে গিয়ে ভালো করে দেখেন তিনি। হ্যাঁ, এই যে আবছা দুটো অক্ষর- চ আর ম পড়া যায়। বাকিগুলো মুছে গেছে। দাদু কী ভেবে মাথা নাড়েন। বুকে হাত বোলান। কিছু মোছে না। কিছুই মুছে যায় না।
এই তো সেদিনের কথা। হরেনের মা ছেঁড়া ন্যাকড়ায় ঘর মোছে আর বকবক করে। কত কী যে বলে কেউ শোনে-কেউ শোনে না। ঘর মোছা হয়ে গেলে হাত ধুয়ে উঠে আসে। বিছানায় শোয়া খুকির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,‘অ মনি, আর লাফালাফি করলে চলবে না নে। শুয়ে থেকো চুপটি করে। কাল আমি অড়হর পাতা এনে দেব। রস করে খেয়ে নিতে হবে। কয় দিন খেলেই ভালো হয়ে যাবে নে।’
বড় বড় হলদে চোখ দুটো মেলে খুকি হেসে বলে, ‘দন্ডিস দন্ডিস।’
‘হ্যাঁ, খুব শখ করে বাঁধিয়েছ তো অসুখটা। এখন যে আসে তাকেই শখের অসুখের নাম বলো।’ হরেনের মা আঙ্গুল নাড়ে, ‘উঠবে না কিন্তু এই বলে দিচ্ছি।’ চলে যাবার সময় হরেনের মায়ের চোখে পড়ে আজিম ডাক্তার কখন এসে বারান্দায় বসে আছে। উঠোনে তার সাইকেলটা স্ট্যান্ড দিয়ে রাখা। খুকির বাবা আর দাদু দুজনেরই মুখ গম্ভীর।
আজিম ডাক্তার বাবার কাঁধে হাত রাখেন, ‘ভয় পাবেন না দাদা। ওপরওয়ালা আছেন একজন- তিনিই সব দেখবেন। আমি যে ওষুধ দুটো লিখে দিয়ে গেলাম ওটা ঠিক মতো খাওয়াবেন। এই অসুখের আসল ওষুধ হলো বিশ্রাম। আপনার মেয়েটা যে দুরন্ত। একটু সামলে রাখবেন শুধু।’
‘কীভাবে অসুখটা বাঁধাল বলো তো আজিম?’ দাদু কাতর গলায় বলেন।
‘কীভাবে বলি কাকা বলেন? পানি থেকে আসতে পারে।’ আজিম ডাক্তার বাবার দিকে ফেরেন, ‘এলাকার কোন পুকুরের পানি খুকি খেয়েছিল নাকি?’
‘জানি না, মেয়েটাকে তো চোখে চোখেই রাখি সবাই। তবু কোন সময় বাইরে গিয়েছিল কিনা!’ বাবা হঠাৎ চমকে ওঠেন,‘ওই দেখেন কোথায় গেল!’
কখন নেমে এসে বিছানা থেকে, জানালা দিয়ে আসা চড়ুই পাখি ধরতে ছুটেছে খুকি ।

ভর দুপুরে বৃষ্টির আভাস। মা ছাদের কাপড়গুলো তুলতে গিয়ে থমকে যান। এপাশের চিলেকোঠার জানালার শিকের সঙ্গে ওপাশের থামটার গায়ে লম্বা লোহার তার বাঁধা। সব শেষের এই তারটায় বেশি মেলা হতো খুকির কাপড়। মেয়েটা মাঝেমাঝেই দাদুর চেয়ারে উঠে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলত। ‘দে দোল- দে দোল।’ বেশিক্ষণ দুলতে না দুলতেই ধপাশ! খুকি হেসে গড়াগড়ি, ‘মা দেতো,পা পিচলে আলুদ্দম আলুদ্দম।’
মা দৌড়ে এসে কানটা ধরে টেনে তোলে, ‘পা পিছলে পড়বে যেদিন ছাদ থেকে, বুঝবে মজা।’ খুকির কান্নার শব্দে দাদু উঠে আসেন ছাদে।
‘কী হয়েছে দাদু?’
মা তাড়াতাড়ি কাপড়গুলো গুছিয়ে নেন। ‘দেখেন বাবা, কি বদমাশিটা না করছে। এখান থেকে ঝুলে ঝুলে টাঙ্গানো তারটাকে কোথায় নামিয়ে এনেছে দেখেন!’
‘কী হয়েছে তাতে? ঝগড়ুকে ডেকে আবার লাগিয়ে নেবে না হয়।’ দাদু খুকির গায়ের কাপড় ঝেড়ে দেন, ‘দুষ্টুমিটা একটু বেশি হচ্ছে কিন্তু দাদু।’
খুকির কান্নাকাটি মিটে গেছে ততক্ষণে,‘বাবা দোতানে যাচ্চে দাদু। আমি বলব পুতুলের তাপর আনতে?’
‘যাও না!’
খুকি ইঁটের রেলিং ধরে ঝুঁকে পড়ে, ‘বাবা, আমার দন্য তাপর এনো। পুতুলের সারি বানাব।’ নাহ! বাবাটা কিছু শুনতেই চায় না।‘বাবা, সোনো পুতুলের সারি- ’
‘কী?’ বাবা সাইকেলে উঠতে গিয়ে ছাদের দিকে তাকান।
‘আমি তোমাকে বলছি নারকেল তেল শেষ হয়ে গেছে। রাতে ফেরার সময় নিয়ে এসো!’ মা অবাক হয়ে সাইকেলের পেছনে এসে দাঁড়ায়। বাবার দৃষ্টি বেয়ে ছাদের রেলিঙে্র দিকে তাকিয়ে মা কাউকে দেখে না। ইঁটের রেলিঙে দুটো পায়রা বসে পাখা ঝাপটায়। রেলিঙ ছাড়িয়ে আরো কত উঁচুতে আকাশে কালো মেঘের দল। বাবা মাথা নেড়ে সাইকেল চালিয়ে চলে যান। মোড়ের কাছে গিয়ে রুমাল বের করেন পকেট থেকে। চোখ দুটো এত ঝাপসা হয়ে গেছে! শহরে গিয়ে এবার ডাক্তারকে দেখাতে হবে। বয়স হয়ে গেছে- ভালো দেখাও যায় না আজকাল।

তারপর সন্ধ্যে নামে, রাত হয়। ভোর হয় অবশেষে। জানালার রোদ এসে ঘরে ঢোকে। ছড়িয়ে থাকে ঘরময়। এই রোদে হেঁটে যেত খুকি। এই রোদে পড়ত ছোট ছোট পা। খুকি কই? জানালার বাইরে থেকে চড়ুই এসে ঘরে ঢোকে। একটি পাখি। দুটি পাখি। আরো কিছু চড়ুইয়ের আনাগোনা বাইরে আমগাছের ডালে ডালে। কিচিমিচি স্বরে একটাই প্রশ্ন। খুকি কই? খুকি কই?
গাছের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়ে উঠোনের কোনে। ডালের কোনে বসে কাঠবিড়ালী কান পাতে। কারো পা কি পড়ছে শুকনো পাতার ওপর? এক ঝলক বাতাস বয়ে যায় বাড়ির ওপর দিয়ে। বাতাসে যেন ফিসফিসিয়ে কার কন্ঠ শোনা যায়? রোদের আলো শোনো- চড়ুইয়ের দল শোনো-ভাঙ্গা জানালা- গাছের ছায়া- কাঠবিড়ালী- শুকনো পাতা- আমি আছি।
আমি আছি, আমি আছি।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছিন্নমুকুল কবিতার ছায়া অবলম্বনে।

নিলয় নন্দী


মন্তব্য

পারী এর ছবি

ছোটবেলায় এই কবিতাটা পড়তেই মন খারাপ হয়ে যেতো। গল্পটা পড়েও ঠিক তেমন অনুভূতিই হয়েছে।

অনেক ভালো লেগেছে।

নিলয় নন্দী এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-
গল্পটা লেখার সময়ও খুব মন খারাপ হয়েছিল। কবিতাটা আসলেই উত্তম জাঝা!

সৃষ্টিছাড়া এর ছবি

মন খারাপ চলুক

নিলয় নন্দী এর ছবি

মন খারাপ মন খারাপ মন খারাপ

নিলয় নন্দী এর ছবি

হাসি গল্পটা আসলে কিশোরদের জন্য লেখা। আমার মনে হয় 'কিশোর-গল্প' ট্যাগ লাগালে কেউ পড়তেই আসবে না। তাই সববয়সীর ট্যাগ। এই বাঁকা পথটুকুকে সোজা পথ হিসেবে দেখতে অনুরোধ জানাচ্ছি।

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

মন খারাপ
লেখা খুব ভাল লাগল ।

নিলয় নন্দী এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মর্ম এর ছবি

মন খারাপের দিনে আরও মধ খারাপ হল মন খারাপ

~~~~~~~~~~~~~~~~
আমার লেখা কইবে কথা যখন আমি থাকবোনা...

নিলয় নন্দী এর ছবি

ইয়ে, মানে...
জাতীয় মন খারাপ দিবস।

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি
নিলয় নন্দী এর ছবি

অনেক আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

ব্যঙের ছাতা এর ছবি

চলুক সুন্দর হয়েছে।
জসীমউদ্দিনের "পরী" কবিতাটির কথা মনে পড়ে গেল।

নিলয় নন্দী এর ছবি

পরী? পড়ি নি তো! গুগল সার্চ দিয়ে দেখছি।

ব্যঙের ছাতা এর ছবি

"হাসু" কাব্যগ্রন্থের। আমার লাইগুলো এখনো মনে মনে আছে "সোনা মুখখানি হইতে সদাই, হাসিফুল ঝরে পড়ে, এমন সোনার পরীরে সেদিন ধরিল দারুন জ্বরে, মরন তাহারে কেড়ে নিল তার মার কোল খালি করে"
গুগলে সার্চ করে পেরেছেন? না পেলে জানাতে পারেন, মেইল করে দিব হাসি

নিলয় নন্দী এর ছবি

গুগলে নেই। আমার নিজের 'অ-চলিত' মেইলটায় পাঠিয়ে দিন, প্লিজ। ম্যাঁও

সত্যপীর এর ছবি

চমৎকার গল্প। টেবিলের পায়া ভেঙে গেলে টেবিল সেই ভাঙা পায়ার দিকেই ঝুঁকে থাকে।

আরো লিখুন।

..................................................................
#Banshibir.

নিলয় নন্দী এর ছবি

সচলে আপনার মন্তব্যগুলো আলাদাভাবে চোখে পড়ে। তবে শুধু ভালোলাগা নয়, খারাপলাগাটাও জানিয়ে দিন। নিজেকে শুধরে নিতে সুবিধা হবে।
আপনার দরগায় শ্রদ্ধা

সত্যপীর এর ছবি

খারাপটাও লিখি, সচলে আমার রেপুটেশন ভাল নয়। আমার কড়া কথা অনেকেরই বুকে বাজে। আপনার লেখনী চমৎকার। আমি অনুবাদক তার কারন মৌলিক লিখার ক্ষমতা আমার নাই। কারো সেই ক্ষমতা দেখলে ভাল লাগে।

..................................................................
#Banshibir.

ব্যঙের ছাতা এর ছবি

কী সুন্দর কথা! "টেবিলের পায়া ভেঙ্গে গেলে টেবিল সেই ভাঙ্গা পায়ার দিকেই ঝুঁকে থাকে" হাততালি

কুমার এর ছবি

গল্প চমৎকার, আপনার বর্ণনাভঙ্গি খুব ভালো।

নিলয় নন্দী এর ছবি

ধন্যবাদ
কোলাকুলি

এবিএম এর ছবি

অসাধারন লিখেছেন। বর্ননাভঙি চমৎকার।
আরো লিখবেন।

নিলয় নন্দী এর ছবি

ধন্যবাদ। আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-
দাঁত সুড়সুড় করছে। একটা নতুন গল্প আসি আসি করছে। কিন্তু কী আসতে চাইছে বুঝতে পারছি না। হাসি
নিশ্চয়ই লিখব, একটু অপেক্ষা করি। লইজ্জা লাগে

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।