ঘরে ফেরা

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ১৩/০৮/২০১২ - ৯:৩৯পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

একবার পিকনিকে গিয়েছিলাম ইন্ডিয়ান বর্ডারের কাছে এক জায়গায়। লোকাল এক লোক আমাদের বলল সামনের আখ-খেত পার হলেই ওপার থেকে গুলি করবে। ক্লাস এইট কি নাইনে পড়ি তখন, খেতের শেষ মাথায় কি আছে দেখতে নেমে পড়লাম। মাঝপথে হঠাত খুব জোরে বাঁশী বেজে উঠল, ভয়ে দৌড় দিলাম। কিভাবে যেন আমি পড়ে গেছি নালায়। এক বন্ধু টেনে তুলল। একটু দূরে দাড়িয়ে এক ফকির এইসব দেখে হাসছে, রাগ করতে পারলাম না, একটা দশ টাকার নোট ধরিয়ে দিলাম।

এরপর আরো একবার পড়েছি, নিউ জার্সীর বরফে আছাড় খেয়ে। আশে পাশে তখন কেউ ছিলনা ।

***

"বলতে পারো, জ্যামাইকানরা কেন স্প্রিন্টে ভালো, আর আফ্রিকানরা লং রানে?" খুব বিজ্ঞের মতো মুখ করে বলল হাসান।
"আফ্রিকাতো অনেক বড়, লায়ন-টায়নে এটাক করলে দৌড়াইতে হবে কয়েক মাইল। আর জ্যামাইকাতে কয়েকশ' মিটার গেলেই তুমি সাগরে পড়বা।" এই হচ্ছে হাসান - কখনো দুইটা চুটকি বলে বাচ্চাদের খুশি করা, কখনো ভাবিদের এটা-সেটা নিয়ে কমপ্লিমেন্ট দেয়া, ছেলেদের সাথে কারেন্ট পলিটিক্স, অলিম্পিকস নিয়ে খুব সিরিয়াস আলোচনা। আবার হাসান ভাবীর রান্নার হাতও ভাল। তার বাসায় দাওয়াত সাধারণত কেউ মিস করেনা।

আমি ব্যাক-ইয়ার্ডে দাড়িয়ে সিগারেট টেনে যাচ্ছি। বাসার ভেতর থেকে হাসি-তামাশা, হট্টগোলের শব্দ আসছে। হয়তো একটু পরে সবাই চুপ হয়ে যাবে, কেউ একজন রবীন্দ্র সংগীত গাইতে শুরু করবে। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা বিষণ্ণ ভাব আছে। অচেনা মানুষ। দুরের মানুষ। প্রয়োজনের তাগিদে জড়ো হওয়া একদল মানুষ। এরা হাসবে। এরা গান গাবে। এরা ঘুমিয়ে পড়া বাচ্চা কোলে নিয়ে বাসায় ফিরে যাবে।

একবার রিনা এসে পাশে বসে। হাতে দুটো ড্রিংকস। জিজ্ঞেস করে, 'হোয়াই ডু ইউ হেইট আস সো মাচ?' রিনা জানে কথাটা সত্যি না। তবুও জিজ্ঞেস করবে, আমি হাসব, কিছুক্ষণ বসে থেকে রিনা উঠে যাবে। রুটিন। মাইক্রোওয়েভের বোতাম টিপে সবাই রেডিমেড হ্যাপিনেস চায়। অবশ্য, চাইবে নাই বা কেন। ইকোনমি ডাউন, রিনার অফিসে নতুন ম্যানেজমেন্ট, কাজের চাপে পাগলের মত অবস্থা। ঘরে জমাট আড্ডা ফেলে ব্যাক-ইয়ার্ডে সিগারেট নিয়ে বসে থাকা বোরিং মানুষ নিয়ে ঊইকএন্ডে কে ঘরে ফিরতে চায়?

ঘরে ফেরাটাই যে সবকিছু নষ্ট করে দেয় এই কথাটা কখনো রিনাকে বলা হয়ে ওঠেনা। পথ-ঘাট, আখের খেত, ঘরে ফেরার ব্রীজ-কালভার্ট সব ভেঙ্গে-চুরে আজকে আমি মিঃ হাসানের পার্টি এটেন্ড করতে এসেছি। স্যরি রিনা, আই এম লস্ট ইন দিজ ফাকিং মেইজ। আমার চামড়ার নিচের ক্ষতগুলো হয়তো কোনদিনই শুকাবে না।

***

রাত এগারোটার দিকে বাসস্টপ থেকে বাসার দিকে হাটছিলাম। দু'-চারটা ছোট রাস্তা পার হতেই ঘটনাটা ঘটল। অন্ধকার ছিল। গাড়ি টাড়ি কিছু চোখে পড়েনি শুরুতে। শেষ মুহুর্তে আর সরে যাওয়ার টাইম পাইনি। ঠিক কখন মারা গেছি বলতে পারবনা, অথবা আদৌ মারা গেছি কিনা সেটাও আমি নিশ্চিত না। যাই হয়ে থাকুক সেটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নাই। কুত্তা-বিলাই থেকে শুরু করে রাজা-বাদশা পর্যন্ত সবাই আচমকাই মরে যায়। প্লান-প্রোগ্রাম করে মরার মতো কপাল আর কয়জনের হয়। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, আরো একটা বর্ডার ক্রস করা হয়ে গেল।

---
পাভেল মাহমুদ


মন্তব্য

নাসির এর ছবি

দুর্দান্ত !

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ নাসির হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

থেকে থেকে কয়েকটা টোকা দিলেন। একটু সময় নিয়ে একটা দারুন স্টাইল দাঁড় করাতে পারতেন। করলেন না। দেখার চোখ আছে আপনার। এটাকে ঘোলা করবেন না। চালিয়ে যান। শুভকামনা হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

লেখার পরে মনে হয়েছে আরেকটু বড় করা যেত হয়তো। সামনে কিছু লিখলে মাথায় রাখব। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
-পাভেল

অচল এর ছবি

গুরু গুরু

আইলসা এর ছবি

ভালো হইছে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

পাভেল মাহমুদ, সবাই গল্প বলতে/লিখতে পারে না - এটা আপনি পারেন। লেখালেখিতে আর একটু সময় দিন। যে লেখাটা শেষ হলো সেটা নিয়ে আরেকটু ভাবুন। আপনার কাছ থেকে দুর্দান্ত সব গল্প আশা করা যেতেই পারে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

অনেক বড় কমপ্লিমেন্ট দিয়ে দিলেন :)। আমি গল্প লিখেছি এখন পর্যন্ত মাত্র দুইটা, সময় পাইনা আর প্লট ও মাথায় আসেনা তেমন কিছু। তবে চেষ্টা করব সামনে আরেকটু বড় গল্প লেখার।
-পাভেল

নীড় সন্ধানী এর ছবি

কিছু গল্প আছে পড়া শেষ করে রেটিং না করলে স্বস্তি লাগে না। এটা সেরকম একটা।
আপনার স্টাইলটা খুব পছন্দ হলো। আরো লেখা আশা করা যায়।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

অতিথি লেখক এর ছবি

স্টাইল ভাল লেগেছে জেনে খুশি হলাম। কোনো প্লট মাথায় আসলেই আবার লিখে ফেলব হাসি
-পাভেল

শাব্দিক এর ছবি

দারুণ লাগল, লিখতে থাকুন।

---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।

মেঘা এর ছবি

আপনি লিখুন আরো। আমার আর কিছু বলার নাই। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলাম এই গল্প পড়ে। ৫ তারা দাগিয়েছি।

--------------------------------------------------------
আমি আকাশ থেকে টুপটাপ ঝরে পরা
আলোর আধুলি কুড়াচ্ছি,
নুড়ি-পাথরের স্বপ্নে বিভোর নদীতে
পা-ডোবানো কিশোরের বিকেলকে সাক্ষী রেখে
একগুচ্ছ লাল কলাবতী ফুল নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছি

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ। চিয়ার আপ হাসি
-পাভেল

দুর্দান্ত এর ছবি

বাহ!

Muhammad_asaduzzaman এর ছবি

খুব ভালো লেগেছে

Asad

তারেক অণু এর ছবি
শিশিরকণা এর ছবি

ভালো!

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

রিসালাত বারী এর ছবি

ভাল্লাগছে

কুমার এর ছবি

সেইরাম হইছে পাভেল ভাই।

ওডিন এর ছবি

ভালো লাগলো। বেশ ভালো লাগলো

পান্ডবদার কথাটা ইট্টু খিয়াল রাইখেন ভাই। হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ সবাইকে গল্প পড়ার এবং কনস্ট্রাকটিভ ক্রিটিসিজমের জন্য হাসি
-পাভেল

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।