শৈশবের বৃক্ষকথন

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ১৪/০১/২০১৩ - ১০:৩২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

রাজধানী ঢাকার সেই মফস্বল রূপের অন্যতম হৃদয়গ্রাহী আকর্ষণ ছিল তার সবুজ। গাছগাছালিতে ঢাকা পুরো শহরটাই ছিল মনোমুগ্ধকর এক শান্ত নগরী। বৃক্ষপ্রেমী দাদীমার কল্যাণে আমিও বেড়ে উঠতে পেরেছি ছায়াঘেরা সবুজের মাঝে। স্কুলের ছুটিতে গ্রামের নানাবাড়িতে আম কাঁঠালের গাছে অনেক লাফিয়ে উঠেছি। শহুরে ঘড়িবাঁধা রুটিনের শৈশবেও কাছে পেয়েছি আম কাঁঠালের সুবাস। মনে পড়ে জানুয়ারি মাসের শীতের প্রভাতে আমাদের আমগাছে দেখা মিলতো মুকুলের। হলুদ রঙের আম্রমুকুলে ভরা বৃক্ষের মুগ্ধতা আজো আমায় শিহরিত করে। বাড়িতে আমগাছ ছিল চারটি, আকারে আর স্বাদে ভিন্নতা ছিল ফলে। শুনেছি প্রতিটি আমগাছ বুনেছিল আমার দাদীমা। কোথাও বেড়াতে গিয়ে হয়ত মিষ্টি আম কেটে খেয়েছে, ফেরার সময় সাথে নিয়ে এসেছে আঁটি। আমার শৈশবে দাদীমার বোনা সেই গাছগুলো ছিল পরিপূর্ণ ফলবতি। দোতালার ছাদে বসে কত আমই না খেয়েছি বন্ধুদের সাথে। শত কাক বাসা বেঁধেছিল গাছের ডালে, হাজারো মৌমাছি তিলে তিলে গড়েছে মৌচাক প্রতিটি বছর সেই আমগাছে।

কাঁঠাল গাছ ছিল দুটি। ঢাকার ভ্যাপসা গরমে অস্থির যখন হতো প্রাণ, জানালা দিয়ে আসতো পাকা কাঁঠালের মিষ্টি সুঘ্রাণ। বাংলাদেশের জাতীয় ফলটি দূর থেকেই সুঘ্রাণে জানিয়ে দিতো তার পরিপূর্ণতা। বিশাল বপুর সেই পাকা কাঁঠাল গাছ থেকে কেটে আনাও ছিল আনন্দময় এক দৃশ্য। ফলের মতই মজা লাগতো তা বীচির তরকারি, রোদে শুকিয়ে নিয়ে গরম কড়াইতে পুড়িয়েও খেয়েছি সেই কাঁঠালবীচি। পাড়ার দুধওয়ালা যেচে নিয়ে যেতো কাঁঠালের অবশিষ্ট ফেলে দেয়া অংশ, গরুকে খাওয়াবে বলে।

বাড়ির মুরগির খোঁয়াড়ের পাশেই ছিল পেয়ারা গাছ। কাজীপেয়ারা তখনও ঢাকায় আসেনি, আমাদের বাড়ির সেই দেশী পেয়ারাগাছে ফল আসতো প্রায় সারা বছর, খেতেও ছিল অসাধারণ। টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে যখন কচকচে আপেল দেখি আমার মনে পড়ে বাড়ির সেই কচকচে সবুজ পেয়ারার স্মৃতি। পাকা পেয়ারা দিয়ে মার হাতে বানানো জ্যাম খেয়েছি ওরিয়েন্ট ব্রেড দিয়ে।

নারিকেল আর সুপারি গাছের সারিতে বাঁধা ছিল বাড়ির সীমানা। সুদূর বরিশালে আমাদের আদি পিতৃপুরুষের বাড়ির স্মৃতি বহন করত এই সুউচ্চ গাছগুলি। কচি ডাবের মিষ্টি পানি আর শাঁস, আর শীতকালে পাকা নারিকেল কুরোনো দিয়ে তৈরি পিঠের স্বাদ ভুলতে কি পারবো কোনদিন? দাদীমার বানানো দোদুলের প্রধান উপকরণ ছিল বাড়ির গাছপাকা নারিকেল। সুপারি গাছগুলিও ছিল তার অতিপ্রিয়। কালবৈশাখীর মাতাল হাওয়ায় দুলতো গাছগুলি, বদ্ধ ঘরে শুনতে পেতাম দুরুম দুরুম... ...বাড়ি খাচ্ছে আমাদের সানশেডে।

দাদীমার রান্নাঘরের পিছনেই ছিল এক বিশাল শিমুল গাছ। বাড়ির পোষা কবুতরগুলি বসে থাকতো তার কাঁটাযুক্ত ডালে। ডিম পাড়ার আগে কবুতর জোড়া বেঁধে খোঁয়াড়ে তার কামরা সাজাতো শিমুলের বোটা দিয়ে। শিমুল ফুলের সেই উজ্জ্বল রঙ মাতিয়ে তুলত বসন্তের নীল আকাশ। হাজারো পাখির কলরবে মুখিয়ে উঠত সন্ধ্যার পরিবেশ। পাশেই ছিল আইশফল গাছ, ফল দেখতে লিচুর মত কিন্তু আকারে ছোট। মুকুল দেখতে অবিকল আমের মুকুলের মত। গাছের নিচে ছিল রাজহাঁসের খোঁয়াড়। আহা কত সুন্দরই না ছিল সদ্য ডিমফোঁটা হলুদ তুলতুলে হাঁসের ছানাগুলি। মা রাজহাঁস গলা বাগিয়ে তেড়ে আসতো তার ছানার বিপদে। বাড়িতে ভিখারীর আনাগোনা ছিলনা সেই রাজহাঁসের পাল আর টমির ক্যারেক্টারে।

উই পোকা এক বিশাল ঢিবি বানিয়েছিল বাড়ির পিছনে, ঠিক বেলগাছ আর কার্পাস তুলা গাছের মাঝে। পাকা বেলের শরবত মিলত গরমের শীতল পানিয় হিসেবে। কার্পাস গাছের তুলা দিয়ে বানানো বালিশে ঘুমিয়েছি আমি। প্রতিটি তুলো ছিল আমার নিজের হাতে আরোহিত। সানশেড ডিঙ্গিয়ে আর পাশের শিউলি-মাধবিলতা গাছের শুয়োপোকা এড়িয়ে তুলতে যেতাম সেই ধবধবে সাদা তুলো।

আমার শৈশবের ঢাকার মহল্লার দৃষ্টিকটু বিষয় ছিল কাঁচা ড্রেনগুলি। অতিবর্ষণে উপচে পড়ত তার নোংরা পানি। আমাদের বাড়ির এইরকম এক ড্রেনের ধারে ছিল এক রজনীগন্ধা গাছ। পুরো বাড়িটাকেই সুগন্ধে মাখিয়ে রাখতো সাদা ফুলগুলি। ভগোনভিলা গাছের লাল আর গোলাপি ফুলে সেজে থাকতো বারান্দা। কলপাড়ের এলাচি গাছে ফুল ফুটতে দেখেছি, ফল কখনো দেখেনি। একই ব্যাপার ঘটেছে বাড়ির সীমানার খেজুর গাছে। ২৩ বছরে এক ফুটও বাড়তে দেখেনি গাছটিকে। খেজুর পাতা ভাসিয়ে দিতাম ড্রেনের জলে শৈশবের ঐ দুরন্ত দিনগুলিতে।
কলা গাছের প্রায় এক বাগান ছিল বাড়ির অপর সীমানায়। বীচিওয়ালা সেই সুমিষ্ট পাকা কলাগুলির বাজারি চাহিদা ছিলনা বলে কোনদিন বাজারে বেচতে দেখিনি। কাঁচা কলা দিয়ে রান্না হতো ইলিশ মাছ আর কলার মোচা রান্না হতো চিংড়ি মাছ দিয়ে। ছায়াঘেরা কলার বাগানে জন্মাতো কচুর গাছ। কচুর লতি, পাতা আর ডগা কিছুই বাদ যেতোনা আমাদের সাপ্তাহিক মেন্যুতে।

তাল গাছে দেখেছি বাবুইয়ের বাসা। তালপাতায় গড়েছি শৈশবের জঙ্গলবাড়ি। জামরুল গাছে বেঁধেছে টুনটুনির বাসা। দাদীমার অতিপ্রিয় ডালিম গাছের ঝরা ফুলে গেঁথেছি মালা। আজ আমার সেই দাদীমাও বেঁচে নেই, প্রবাসি আমি খুঁজে বেড়াই সেই প্রিয় শৈশব। হৃদয়ে থাকবে সবকিছু, হারাবেনা কিছুই।

……জিপসি


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

ছুঁয়ে গেলো আপনার স্মৃতিচারণ। আরো লিখুন হাত খুলে। কয়েকটা বানান চোখে লাগছে, একটু দেখে নিবেন।

ফারাসাত

অতিথি লেখক এর ছবি

ভুল বানানের দোষে আমি চিরকাল দুষ্ট। সতর্ক থাকব ভবিষ্যতে। স্মৃতিশক্তিও কিছুটা প্রতারনা করেছে আমার সাথে। মূল লেখায় রজনীগন্ধা ফুলের নাম এসেছে, আসলে বলতে চেয়েছিলাম গন্ধরাজ ফুলের কথা। গন্ধরাজ নামটি ভুলে যাবার বিষয় না ... মাথায় কত মেখেছি হাঁস মার্কা গন্ধরাজ নারিকেল তেল!
এক যুগ পড়ে গন্ধরাজ বৃক্ষ আবার দেখতে পাই দক্ষিন আমেরিকাতে। আকারে কিছুটা বড় কিন্তু বর্ণে আর সুবাসে সেই একই ফুল। ওরা বলে jazmin.

... জিপসি

অদ্ভুত মেয়েটি এর ছবি

খুব ভাল লাগল। ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো আসলেই অসাধারন ছিল। মাঝে মাঝেই তারা স্মৃতির পাতায় ভিড় করে নস্টালজিক করে দেয় আমাদের।

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

চলুক
আরো লিখুন। ভালো লেগেছে।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

আমাদের বাড়িগুলোতে আগে মানুষ গাছ আর সামাজিক পশুপাখির মিলিত আবাস ছিলো, এখন শুধু 'মানুষ' থাকে

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

অতিথি লেখক এর ছবি

সহমত। খোদ ঢাকা শহরে ১৯৮৮ সালের বন্যার পূর্বে সন্ধাবেলা শিয়ালের হুক্কাহুয়া আমি নিজের কানে শুনেছি। মহল্লার কাঁচা রাস্তা সিমেন্টে ঢেকে দেয়ার নামে কেটে ফেলল বাড়ির সীমানার প্রিয় গাছগুলি। ব্যাডমিন্টন আর ক্রিকেট খেলার মাঠে রাতারাতি গড়ে উঠল বহুতল ফ্লাটবাড়ি।

...জিপসি

Firoz এর ছবি

ভাল লাগল

সাফিনাজ আরজু এর ছবি

গাছে ঘেরা এক দারুন শৈশব আমারও ছিল।
উঠোন ভরা মুরগী, দুয়েকটা হাঁস, বেঁধে রাখা ছাগল।

আরও লিখুন। আরেকটু গুছিয়ে, বানানের দিকে আরেকটু সতর্ক দৃষ্টি রেখে।
কিছুটা বড় হলে ভাল লাগত আরও। হাসি

__________________________________
----আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে---

অতিথি লেখক এর ছবি

বানান বিভ্রাট নিয়ে বেশ ঝামেলায় আছি। বরাবরই বাংলা ২য় পত্রের দুর্বল ছাত্র আমি, পরিবারে বাংলা জানা দ্বিতীয় প্রাণী নেই। ঠিক করেছি অভিধান পাশে রেখে লিখব ভবিষ্যতে। যে শহরে থাকি সেখানে বাঙলা ডিকশনারী কেনার সুযোগ নেই, নেট থেকে ডাউনলোড করতে হবে। কেউ কি লিঙ্ক দিতে পারবেন?
আপনার সুন্দর মন্তব্বের জন্য ধন্যবাদ।

...জিপসি

কৌস্তুভ এর ছবি

কলকাতা শহর থেকে যে রাস্তাটা প্রায় গ্রাম আর মাঠের মধ্যে দিয়ে দমদম এয়ারপোর্টের দিকে যেত, সেটার নাম ছিল ভিআইপি রোড। এই শুনশান রাস্তাটা ঘিরে রাখত বহু পুরোনো উঁচু উঁচু শিশু শাল শিরীষ ইত্যাদি গাছগুলো। এখন চারিদিক শুধু দোকান বাড়ি আর যানজট, সব গাছ কেটে নয়ত বিষ দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। মন খারাপ

অতিথি লেখক এর ছবি

আমাদের ঢাকাতেও একই অবস্থা। আমার মাধ্যমিক স্কুলে পাশাপাশি ফুটবল মাঠ ছিল দুটি, বড় পুকুর দুটি আর শতবর্ষী ফলের গাছে ঘেরা চারদিক। টিচার্স কোয়াটার আর স্কুল সম্প্রসারণের নামে ভরে ফেলল পুকুর, কেটে ফেলল বৃক্ষ। অনেক বছর বাদে স্কুলে গিয়েছিলাম সার্টিফিকেট তুলতে, মন খারাপ করে বাসায় ফিরেছিলাম। নেই সেই বিশাল কাঁঠাল গাছটি যার ছায়ায় বসে আমি টিফিন খেতাম।

…জিপসি

David Aloysius এর ছবি

অনেক দিন পর খুব সুন্দর একটা লেখা পড়লাম , খুব ভালোলেগেছে
লেখকে অনেক অনেক অভিনন্দন

অতিথি লেখক এর ছবি

থ্যাঙ্কস ভাইয়া!!

......জিপসি

কুমার এর ছবি

আগেই পড়ে গেছি। খুব ভাল আপনার লেখার হাত।
আরও পড়তে চাই।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।