One day in the life of Ivan Denisovich (আইভান ডেনিসোভিচের জীবনের একদিন) - ১ম পর্ব : A novel by Alexander Solzhensitsyn

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৯/০১/২০১৭ - ১১:৩৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

বন্দী শিবিরের কথা =

লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত রাশিয়ার ক্ষমতায় আসে স্ট্যালিন। দোর্দন্ড প্রতাপ স্ট্যালিন। সমাজতন্ত্র রক্ষা আর দেশদ্রোহিতা দমনের নামে তার আমলে সমাজতন্ত্রের পথে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চলতে শুরু করা পৃথিবীর সর্ববৃহত দেশে শুরু হয় দমনপীড়নের এক দীর্ঘ কালো অধ্যায়। লেনিনের সময় ১৯১৮ সনে শুরু হওয়া শ্রম-শিবির “গুলাগ” নামের তকমা পায় ১৯৩০ সনে, স্ট্যালিনের সময়। গুলাগের আতঙ্কও পায় নতুন মাত্রা। সাইবেরিয়া সহ রাশিয়ার দূরতম, দূর্গম এবং চরম শীতল বিরুপ আবহাওয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই সব মানবতা বর্জিত শ্রম-শিবির নামক বন্দীশালায় নিয়মিত অপরাধী, যুদ্ধবন্ধীদের সাথে যোগ হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দীর্ঘ সারী। সরকারের গুরুতর বিরুদ্ধাচরন থেকে শুরু করে সরকার কিংবা সরকারী কর্মকর্তাদের নামে সামান্য কৌতুক বলার মত তুচ্ছ কারনেও লক্ষ লক্ষ মানুষকে বরন করে নিতে হয়েছে গুলাগ নির্বাসনের নিদারুন শাস্তি। ঐতিহাসিক দলিল মতে শুধু ১৯৩৪ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে গুলাম শ্রম-শিবিরের নিদারুন কষ্ট সইতে না পেরে মৃত্যু বরন করেছে ১০ লক্ষেরও বেশী বন্দী। তার আগের, অর্থাৎ ১৯১৯ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সময়ের মৃত্যুর কোন দলিল নেই, হিসেব পত্রও নেই।

তেমনই এক গুলাগ শ্রম-শিবিরের একজন বন্দী ছিলেন ১৯৭০ সনের নোবেল বিজয়ী লেখক আলেক্সান্দার সলঝেনিতসিন। নিকোলাই ভিতকোভিচ নামের এক বন্ধুকে লেখা ব্যাক্তিগত চিঠিতে স্ট্যালিনের যুদ্ধরীতি নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করাতে ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সোভিয়েত বিরোধী প্রচারনার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তখন তিনি ছিলেন রেড আর্মির ক্যাপ্টেন। সোভিয়েত পুলিশ NKTV’র স্পেশাল কাউন্সিল তার অনুপস্থিতিতেই ৮ বছরের গুলাগবাসের সাজা দিয়ে দেয় তাকে ১৯৪৫ সনের ৭ই জুলাই। তারপর জীবনের দীর্ঘ ৮টি বছর তাঁকে কাটাতে হয়েছে বিভিন্ন গুলাগ ক্যাম্পে, প্রতিটা দিন যেখানে ছিল অমানবিক, ছিল পাশবিক। বৈরী আবহাওয়া, ক্ষুধা, নির্যাতন, মানবেতর পরিবেশ আর হাড়ভাঙ্গা অমানবিক পরিশ্রমের নিয়ত চক্রে সহ্যের সীমা যেখানে প্রতি মুহুর্তে হত পরিক্ষার সম্মুখীন। স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ১৯৫৩ সালে ক্যাম্প থেকে মুক্তি। কিন্তু সাথে সাথে তাকে আবার দেয়া হয় ৩ বছরের নির্বাসন।

এই গল্পের চরিত্র আইভান ডেনিসোভিচ সূখোভের বন্দী জীবনের এক দিনের বর্ণনা, মূলতঃ উত্তর-পূর্ব কাজাখিস্তানের একিবাস্তুস শহরে লেখকের বন্দী জীবনের শেষ শ্রম শিবিরের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের Novy Mir (New World) নামক সাহিত্য জার্নালে। Penguin Books Ltd., Australia, বইটির অনুবাদ প্রকাশ করে ১৯৬৩ সনে।

গল্প (প্রথম পর্ব) :

প্রতিদিনকার মতই ঠিক ভোর ৫টায় স্টাফ কোয়ার্টারের কাছে ঝোলানো রেললাইনের একটা লম্বা পাতের তৈরী ঘন্টায় হাতুড়ির আঘাতে রেভেলি (Reveille : ভোরে জেগে ওঠার সংকেত) বেজে উঠলো। কিন্তু সেই থেমে থেমে বেজে যাওয়া শব্দ জানালার দু’আঙ্গুল পুরু বরফের স্তর ভেদ করে ঢুকতে পারলো সামান্যই, এবং শুরু হতে না হতেই মিলিয়ে গেল। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা, আর ক্যাম্পগার্ডেরও ইচ্ছে হচ্ছিলো না যে এই ঠান্ডার মধ্যে ওই ঘন্টাটা বেশীক্ষন পেটায়।

ঢং ঢং শব্দটা থেমে যেতেই যখন ল্যাট্রিনে যাওয়ার জন্য আইভান ডেনিসোভিচ সূকোভের ঘুম ভাংলো, তখনও কিন্তু বাইরে মাঝরাতের মত অন্ধকার। জানালার উপর পড়া তিনটে ল্যাম্পের হলদেটে আলো ছাড়া চারিদিকে নিকষ কালো – দু’টো ল্যাম্প বাইরে, আর একটা ক্যাম্পের ভেতরে।

এবং ব্যারাকের দরজার কপাট খুলে দেয়ার জন্যেও কেউ এলো না, সারারাত ধরে জমা হওয়া মল-মুত্র ভর্তি ড্রাম বাইরে বয়ে নিয়ে যাওয়া আর্দালিদের শব্দও শোনা যাচ্ছে না।

সূকোভ কখনোই রেভেলির পরে বিছানায় থাকে না। সবসময় সঙ্গে সঙ্গেই উঠে পড়া তার অভ্যাস। কাজের জন্য সবাইকে একত্র করার আগ পর্যন্ত ৯০ মিনিট সময় তার একান্ত নিজস্ব, কতৃপক্ষের না। পুরোন মানুষদের যারা এটা জানে, তারা এসময়টা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। কেউবা পুরোন লিলেন কাপরের টুকরো দিয়ে অন্যের জন্য দস্তানা উপর পরার মত মিটেনস (Mittens = এক ধরনের দুই ভাগে বিভক্ত দস্তানা, যার এক ভাগে বুড়ো আংগুল আর অন্যভাগে বাকী চার আংগুল থাকে) বানায়, কেউবা ডিপো থেকে শুকনো ভেলেংকি (হাঁটু পর্যন্ত লম্বা একপ্রকার ফেল্ট বুট)জোড়া জোগাড় করে দলের ঘুমন্ত সর্দারের বিছানার কাছে রেখে দেয় যাতে তাকে আর কষ্ট করে খালি পায়ে হেঁটে জুতোর গাদা থেকে নিজেরটা খুঁজতে না হয়, কেউবা ওয়্যার-হাউজের দিকে যায়, ঝাড়পোঁছ বা এধরনের টুকটাক কাজের আশায়, আবার কেউ খাবারঘরে ডাঁই করা এঁটো থালাগুলো জড়ো করে থালা বাসন মাজার লোকের কাছে পৌঁছে দেয় – নিশ্চিত থাকা যায় যে এসব করার জন্য ওরা তখন খাওয়ার জন্য কিছু দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব করার জন্য বহুলোকই মুখিয়ে থাকে। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হচ্ছে, যদি কোন বাটিতে এঁটো খাবার লেগে থাকে, তখন সেটা চেটেপুটে খাবার লোভ সামলানো দায়।

কিন্তু সূকোভ তার প্রথম সর্দার কুজিওমিনের কথাগুলো আজও ভোলেনি। সে ছিল এক পোড় খাওয়া কয়েদি, ১৯৪৩ সালেই তার ১২ বছর হয়ে গিয়েছিলো। বনের এক ফাঁকা জায়গায় ক্যাম্প-ফায়ারের ধারে জড়ো হয়ে বসা নতুনদের উদ্দেশ্যে সে বলেছিলো, “শুনে রাখো ছেলেরা, এখানে চলে শুধু তাইগা’র আইন (তাইগা : উত্তরের শীত প্রধান অঞ্চলের প্রচন্ড শীতল জলবায়ু বিশিষ্ট বনভূমি)। তবুও এখানে টিকে থাকা সম্ভব। কিন্তু ক্যাম্পে কারা আগে মারা পরে জানো? যারা অন্যের ফেলে দেয়া এঁটোবাসি চেটে খায়, সামান্য অসুখ-বিসুখ হলেই ডাক্তারের কাছে ছোটে, আর অন্যের নামে নালিশ করে বেড়ায়, তারাই।”

তার প্রতিটা কথাই হাড়ে হাড়ে সত্য, কেবল কানকথা লাগানো মানুষগুলোর পরিনতির বিষয়টা ছাড়া। ক্যাম্পে এরা টিকেই যায়। কেবল অন্যের রক্তের দামে নিজেরদের পিঠ বাঁচায়।

প্রতিদিন রেভেলির সাথে সাথেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়াই সূকোভের স্বভাব হলেও আজ উঠলো না। গত সন্ধ্যা থেকেই তার শরীর বেশ খারাপ লাগছিলো, জ্বর জ্বর। কাঁপুনি, ব্যাথা-বেদনা সব মিলিয়ে সারারাত ঠিকমত গা গরম করতে পারে নি। এমনকি ঘুমের মধ্যে একবার মনে হচ্ছিল শরীর খুব খারাপ করছে, আবার পরক্ষনেই মনে হচ্ছিল সব বুঝি ঠিক হয়ে যাচ্ছে। সারাটাক্ষন মনে হচ্ছিল সকালটা না হলেই বুঝি ভালো হয়। কিন্তু প্রতিদিনকার মত, ঠিকই সকালটা আসে। যাইহোক, রাতের প্রচন্ড ঠান্ডাতো তার কাছে আশ্চর্যের কিছু না। যেখানে জানালাগুলো থাকে বরফে ঢাকা আর বিশাল ব্যারাকের দেয়ালগুলো যেখানে ছাদের সাথে মিশেছে সেখানে দানাদানা তুষারের কুঁচি জমে মাকড়শার জালের মত ঝুলে থাকে, সেখানে উষ্ণতা কোথায়!

বাংকের সবচেয়ে উপরকার বিছানাটা ছেড়ে সে উঠলো না। কম্বল আর কোটের মাঝে মুখ গুঁজে সে তার পা দুটো গলিয়ে রাখলো আগাটা বিছানায় গুঁজে দেয়া দুমড়ানো জ্যাকেটের একটা হাতার ভেতর। সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না, কিন্তু তার কানে আসা প্রত্যেকটি শব্দ তাকে ঠিকই বলে দিচ্ছিলো ব্যারাকের কোথায় কি ঘটছে, বিশেষত যে অংশে তার দলটা থাকে সে অংশে। মল-মুত্র ভরা ড্রাম করিডোর দিয়ে সরিয়ে নিতে ব্যাস্ত আর্দালিদের পায়ের ভাড়ী আওয়াজ তার কানে আসলো। ব্যাপারটা দেখতে মনে হয় খুব সোজা, দুর্বলদের কাজ। কিন্তু সামান্যটুকুও যাতে উপচে না পড়ে সেভাবে বিষ্ঠাভরা ড্রামটা বাইরে সরানোর চেষ্টা করলেই কেবল বোঝা যায় কাজটা কত কঠিন। বুট শুকানোর শেড থেকে ৭৫ নম্বর দলের কয়েকজনের ফ্লোরে অনেকগুলো বুট ঠোকার শব্দ সে শুনতে পেলো। এবার তাদের দলের লোকেদের বুট ঠোকার শব্দ (এবার তাদের দলের পালা)।

তিউরিন, তাদের দলের সর্দার আর তার সহকারী পালভো নিঃশব্দেই যে যার ভেলেংকি পরে নেয় কিন্তু সে তাদের বাঙ্কের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শুনতে পায়। এখন পালভো যাবে রুটির স্টোরেজের দিকে আর তিউনিন পি.পি.ডি’র (প্রোজেক্ট প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট) স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে। আহা, কিন্তু আজ শুধু কতৃপক্ষের কাছে দৈনন্দিন কাজের রুটিনমাফিক রিপোর্ট করার জন্য নয়। সূখোভের মনে পড়ে যায় আজ তার ভাগ্য একটা পাল্লার উপর দুলছে, তাদের ১০৪ নম্বর দলকে দোকানের দালান থেকে সরিয়ে নতুন প্রকল্প এলাকায় নেয়ার পরিকল্পনা চলছে, যার নাম “সমাজতান্ত্রিক জীবনধারা”। সে এক হাওয়ায় ভেসে জমা হওয়া তুষারের পুরু স্তরে ঢাকা ধূধূ প্রান্তর, এবং সেখানে গিয়ে সবার আগে তাদের কাজ হবে বড় বড় গর্ত খুঁড়ে তাতে খাম্বা বসিয়ে সেই খাম্বাগুলোতে তারকাঁটা জুড়ে দেয়া। নিজেরাই নিজেদের তারকাঁটার সীমানার ভেতর বেঁধে ফেলা, যাতে তারা পালাতে না পারে। শুধুমাত্র তারপরেই শুরু হবে বিল্ডিং তৈরীর কাজ। পরবর্তী একমাস সেখানে থাকবে না কোন গা গরম করার আশ্রয়। একটা কুকুরের ঘরও না। আগুনেরতো প্রশ্নই ওঠে না, জ্বালানোর কোন ব্যাবস্থাই নেই। একমাত্র গা গরম রাখার উপায় গতর খাটিয়ে পরিশ্রম করে যাওয়া, একমাত্র বাঁচার উপায় সেটাই।

সর্দার স্বভাবতই উদ্বিগ্ন। তার একমাত্র ধান্দা হচ্ছে কাজটা কোনভাবে অন্য দলের উপর চাপিয়ে দেয়া, ১০৪ নম্বর দলের বদলে অন্য আরেকদল বেকুবের ঘাড়ে। এজন্য তাকে কোন বড় কর্তার সাথে দেখা করতে হবে। কিন্তু খালি হাতে তো আর যাওয়া যায় না। কয়েক পাউন্ড না হোক, অন্তত এক পাউন্ড পরিমান শুয়োরের চর্বিতো সাথে নিতে হবে ভেট হিসেবে।

চেষ্টা করে দেখতে তো দোষের কিছু নেই। ডাক্তারখানায় গিয়ে কয়েকদিনের বিশ্রামের ব্যাবস্থা করে নিতে পারলে ক্ষতি কি? আর তার শরীরের প্রতিটা অঙ্গের জোড়ায় জোড়ায় প্রচন্ড ব্যাথাতো আছেই। তখন সূখোভ ভাবতে লাগলো সম্ভাব্য কোন গার্ড সকালের দায়িত্বে থাকতে পারে। লম্বু আইভানেরই দায়িত্বে থাকার কথা, তার মনে পড়লো। আইভান রোগা, হ্যাংলা আর কালো তার চোখের মনি। প্রথমে দেখলে তাকে পাক্কা হারামজাদা বলেই মনে হবে, কিন্তু মেলামেশা করলেই ধীরে ধীরে বোঝা যায় যে ডিউটিতে থাকা সকল গার্ডের মধ্যে তার স্বভাব চরিত্রই সবচেয়ে ভালো। সে তোমাকে লক-আপে ভরে দেবে না, অথবা কতৃপক্ষের সামনে টানা-হেঁচড়া করবে না। সুতরাং সে আরো কিছুক্ষন বাংকে শুয়ে কাটানোর সিদ্ধান্তই নিলো, অন্তত যতক্ষন না ৯ নম্বর কুঠির লোকজন গন-খাবারঘরে আছে।

চার বিছানার বাংকটা কাঁপতে আর দুলতে শুরু করলো। দু’জন একই সাথে বিছানা থেকে নামছে। একজন তার বাংকের উপরের দিককার প্রতিবেশী ব্যাপ্টিস্ট আলয়োশা, আরেকজন তার ঠিক নিচের বাসিন্দা বুইনভস্কি, সে নৌবাহিনীর প্রাক্তন ক্যাপ্টেন।

রাতভর জমা হওয়া বিষ্ঠাভর্তি ড্রাম সরানোর পর কে গরম পানির জন্য যাবে এটা নিয়ে দুই আর্দালির মধ্যে লেগে গেলো বিতন্ডা। একেবারে খিটখিটে বুড়িদের মত ঝগড়া যাকে বলে। “এই ব্যাটারা, পটকাবাজীর মত ফুটুসফাটুস শুরু করেছিস!” গাঁক গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠে ২০ নম্বর দলের ইলেকট্রিক-ওয়েল্ডার, “মিটিয়ে ফেল বলছি”। সে ধাঁই করে একপাটি বুট ছুঁড়ে মারলো তাদের দিকে। একটা থামের সাথে বাড়ি খেয়ে ধুপ করে বুটটা পড়ে গেল। সে সাথে ওদের ঝগড়াও থেমে গেলো।

ঠিক পাশের দলের মেঝ-সর্দার রাগে গড়গড় করতে করতে চাপা স্বরে বললো, “ভেসিলি ফয়োডরোভিচ, সাপ্লাই হ্যাচের ওরা আমাদের সাথে আবার বাটপারি করেছে। গান্ধা ছুঁচোর দল, ওরা আমাদের দেয়ার কথা চারটা ৯০০ গ্রামের বনরুটি, আর পেলাম মাত্র তিনটা। এখন কাকে বাদ দেই?” তার গলার স্বর নিচুই ছিল, কিন্তু দলের প্রত্যেকেই ঠিকই তার কথা শুনতে পেল এবং সন্ধ্যাবেলা কার ভাগে রুটির টুকরো কম পড়ে সেটা জানার জন্য দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতে লাগলো।

চেড়াই কাঠের মিহি গুড়ো ভরা বহুদিনের পুরোন তক্তার মত শক্ত মেট্রেসের উপর সূখোভ শুয়েই রইলো। দুটোর যেকোন একটা হলেও হতো, হয় প্রচন্ড জ্বর অথবা হাড়ের বিভিন্ন জয়েন্টের ব্যাথা কমে যাওয়া।

ইতিমধ্যে আলয়োশা বিড়বিড় করে প্রার্থনা করতে লাগলো এবং বুইনভস্কি ল্যাট্রিন থেকে ফিরে এসে ঠিক কাউকে সরাসরি উদ্দেশ্য না করেই ক্রূর উল্লাস মেশানো গলায় ঘোষনা করলো “ভাইয়েরা আমার, দাঁতে দাঁত চেপে রাখো, তাপমাত্রা ত্রিশের নিচে, আমি নিশ্চিত।”

সূখোভ অসুস্থ রিপোর্ট করার সিদ্ধান্তই নিলো।

ঠিক সেই মুহুর্তে তার কম্বল আর জ্যাকেট স্বেচ্ছাচারীর মত এক ঝটকায় যেন সরে গেল। সে তার মুখ ঢেকে রাখা কোটটা ছুঁড়ে ফেলে উঠে বসলো। দেখলো, ঋজু শরীরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে সেই তাতার (তাতার জাতীর লোক, ক্যাম্পের গার্ড), তার উঁচু বাংকের বেড বরাবর তার মাথা।

তাহলে ডিউটির পালাবদলে সেই এখন দায়িত্বে আর চুপিচুপি এখানে এসে দাঁড়িয়ে।

“এস ৮৫৪,” তার কালো জ্যাকেটের পেছনে সেলাই করা কাপরের ফালির উপর লেখা নম্বর পড়ে সেই তাতার বললো, “তিনদিনের সশ্রম দন্ড।”

আধো অন্ধকার ঘর, যেখানে ২০০ লোক ছাড়পোকা ভরা বাংকে ঘুমায়, তার শ্বাসরুদ্ধকর কন্ঠ শুনে সবাই হুড়মুড় করে উঠে জামাকাপর পরা শুরু করলো।

“কি কারনে, সিটিজেন* চিফ?” (*বন্দীদের কমরেড শব্দটি ব্যাবহার করার অনুমতি নেই) যতটা না, তারচেয়ে বেশী বিরক্তি গলায় ঢেলে সূকোভ প্রশ্ন করলো।

সশ্রম কারাদন্ড – সে বরং অনেক অনেক কম ভয়ংকর। গরম খাবার পাওয়া যায়, আর চিন্তাভাবনা করার সময়ও পাওয়া যায় না। আসল বন্দীত্ব হচ্ছে কাজ হতে সরিয়ে রাখা।

“রেভেলির সঙ্গে সঙ্গে উঠতে না পারার জন্য। আমার পেছনে পেছনে ক্যাম্পে কমান্ডেন্টের অফিসে আয়।” অলস ভংগীতে বললো তাতার।

তার নির্লোম কুঁচকে যাওয়া চামড়ার চেহারা অভিব্যাক্তিহীন। সে আরেকটা শিকারের খোঁজে ঘুরে চারিদিকে চোখ বোলালো, কিন্তু ততক্ষনে আলো-আঁধার, বাংকের উপর-নীচ, সবখানে সবাই যার দুমড়েমুচড়ে থাকা প্যান্টের ভেতর পা গলিয়ে দিয়েছে, বা একেবারে কাপর পরে নিয়েছে, গায়ে কোট জড়িয়ে নিয়েছে, এবং ছুটে বেড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে যতক্ষন না তাতার যাচ্ছে।

এই শাস্তি যদি তার সত্যিই প্রাপ্য হতো, তাহলে সূখোভ এতটা রাগ হতো না।

তার জন্য যেটা কষ্টকর সেটা হচ্ছে সে সবসময় সবচেয়ে ভোরে ওঠা কয়েকজনের একজন। কিন্তু সে জানে তাতারটার কাছে অনুনয়-বিনয় করে কোন ফায়দা নেই। অভ্যাসমত সামান্য গাঁইগুঁই করে সে বাম হাঁটুর একটু উপরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কালো নম্বরওয়ালা তালি দেয়া প্যান্টটা হ্যাঁচকা টানে পরে নিলো, জ্যাকেট পরে নিলো (যার বুকে পিঠে একই নম্বর দেয়া), ফ্লোরের উপর থাকা বুটের স্তুপ থেকে থেকে তার ভেলংকি খুঁজে নিলো, টুপি পরলো (যার সামনে এক টুকরো জুড়ে দেয়া কাপরে তার নম্বর লেখা), এবং সেই তাতারকে অনুসরন করে ব্যারাক-ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো।

১০৪ নম্বর দলের সকলে তাকে বেড়িয়ে যেতে দেখলো, কিন্তু কেউ একটা শব্দও উচ্চারন করলো না। কি লাভ বলে, আর কিই বা তারা বলতে পারতো? দলের সর্দার হয়তো কিছু একটা করার চেষ্টা করে দেখতে পারতো, কিন্তু সে সেখানে ছিলো না। এবং সূখোভও কাউকে কিছু বললো না। সে তাতারটাকে বিরক্ত করতে চায় না। যাই হোক, তার সকালের নাস্তাটা তার সঙ্গীরা আলাদা করে রাখবে, এতটুকুই আশা।

তারা দু’জন ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। বাইরের ঠান্ডার প্রকোপে সূখোভ শ্বাস নিতে গিয়ে খাবি খেতে লাগলো।

দূরতম ওয়াচ-টাওয়ার থেকে দু’টো শক্তিশালী সার্চ-লাইট সারা ক্যাম্পময় চষে বেড়াচ্ছে। বর্ডার বাতিগুলো, ক্যাম্পের ভেতরের বাতইগুলোর মতই, জ্বলছে। এতবেশী বাতি যে তারার আলোও ওগুলোর কাছে ম্রিয়মান।

বুটের তলায় কড়কড় করে ভাঙ্গতে থাকা বরফের শব্দের সাথে সাথে বন্দীরা ছুটছে, যে যার কাজে, কেউ বা পার্সেল-অফিসের দিকে, কেউবা শস্যের বস্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য “আলাদা” রান্নাঘরের দিকে। সকলের মাথা নিচু, সব বোতাম লাগিয়ে উঁচু করে রাখা কোটের ভেতর গুঁজে দেয়া। সকলের হাড়মজ্জা পর্যন্ত জমে গেছে। যতটা না ঠান্ডার কারনে, তারচেয়ে বেশী সারাদিন এই প্রবল ঠান্ডায় কাটাতে হবে কিনা সেই চিন্তায়।

কিন্তু সেই তাতারটা নীল বোতাম ওয়ালা পুরোন আর্মি কোট পরে এমন নির্বিকারভাবে হাঁটছে, যেন ঠান্ডাটা তার কাছে কিছুই না।

তার হেঁটে গেলো উঁচু কাঠের বেড়া দেয়া লক-আপ বিল্ডিং এর পাশ দিয়ে, যেটা এখানকার একমাত্র ইটের দালান, কাঁটাতারের বেড়ার পাশ দিয়ে, যেটা ক্যাম্পের বেকারীটাকে বন্দীদের কাছ থেকে আলাদা করে রাখে; স্টাফ কোয়ার্টারের পাশ দিয়ে, যেখানে তুষারে জমে যাওয়া লম্বা রেল লাইনের টুকরো মোটা তারের ফালির সাথে ঝুলানো থাকে; আরেকটা খাম্বার পাশ দিয়ে, যেটার সাথে একটা থার্মোমিটার ঝুলে আছে (একটা ছাউনি দেয়া জায়গায়, যাতে তাপমাত্রা খুব বেশী কম না দেখায়)। সূখোভ অনেক আশা নিয়ে চোখের কোনা দিয়ে এর দুধ-সাদা টিউবটার দিকে তাকালো, যদি তাপমাত্রা মাইনাস ৪১ ডিগ্রী দেখায় তাহলে আর তাদের কাজে বের হতে হবে না। কিন্তু আজ তাপমাত্রা মাইনাস ৪১ ডিগ্রীর ধারেকাছেও না।

তারা হেঁটে স্টাফ-কোয়ার্টারের ভেতর ঢুকলো এবং তাতারটা তাকে সোজা গার্ড-রুমের দিকে নিয়ে গেলো; সূখোভ বুঝতে পারলো, আসার পথে সে যা ভেবেছিলো তাই, তাকে লক-আপে নেয়াই হবে না – আনা হয়েছে কেবলমাত্র গার্ড-রুমের মেঝে ঘষে পরিষ্কার করা দরকার তাই। তাতারটা বললো যে সে তাকে অল্পের উপরই ছেড়ে দিচ্ছে, এবং তাকে মেঝে ঘষে পরিষ্কার করার আদেশ দিলো।

মেঝে পরিষ্কার করার কাজটা ছিলো এক বিশেষ বন্দীর কাজ যাকে ক্যাম্পের বাইরে কাজ করার জন্য পাঠানো হয় নি – একজন কর্মী-আর্দালী। সে বহুদিন ধরে নিজেকে স্টাফ-কোয়ার্টারে বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছিলো; ক্যাম্পের কমান্ডেন্ট, শৃংখলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাক্তি এবং সিকিউরিটি অফিসার (যাকে সবাই Father Confessor ডাকে। যদিও Father Confessor বলতে সেই পাদ্রীকে বোঝায় যার কাছে খৃষ্টান ধর্মালম্বীরা পাপ স্বীকার করে) সবার কাছেই তার অবাধ যাতায়াত। তাদের জন্য ফুট-ফরমায়েশ খাটার সময় তার কানে অনেক কিছু আসতো যা গার্ডরাও জানতে পারতো না। কিছুদিন পর তার মধ্যে বেশ একটা নাক-উঁচু ভাব দেখা গেলো, এবং তার মনে হতে লাগলো যে এসব সাধারন ছোটখাট গার্ডদের মেঝে পরিষ্কারের কাজ করাটা তার মানায় না। তাকে দু’একবার ডেকে পাঠিয়ে গার্ডরাও ব্যাপারটা বুঝতে পারলো, এবং মেঝে পরিষ্কার করার জন্য তারা অন্য কয়েদীদের ধরে আনতে লাগলো।

গার্ডরুমের স্টোভ গনগনে উত্তাপ ছড়াচ্ছিলো। ময়লা টিউনিক পরা দু’জন গার্ড বসে ড্রাফটস (Draughts/Checker = এক ধরনের বোর্ড গেম) খেলছিলো, আরেকজন ভেড়ার চামড়ার কোট আর ভেলেংকি পরা অবস্থাতেই চিকন বেঞ্চের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলো। রুমের কোনায় একটা বালতি আর তার ভেতরে একটা ন্যাকড়া রাখা।

সূকোভ খুব খুশি। সে অল্পের উপর ছেড়ে দেয়ার জন্য তাতারটাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, “আজকে থেকে আমি আর জীবনে দেরী করে উঠবো না”।

এখানে নিয়ম খুব সোজা, কাজ শেষ তো ভাগো। এই কাজ পেয়ে তার মনে হলে শরীরের ব্যাথা-বেদনা যেন হাওয়ায় উবে গেলো।

তাড়াহুড়ো করে তার মিটেন জোড়া আনা হয় নি, তাই সে খোলা হাতেই বালতি নিয়ে কুয়োর দিকে গেলো।

পি.পি.ডি’র দিকে যাওয়ার পথে দলের সর্দারদের বেশ কয়েকজন থার্মোমিটার ঝোলানো খাম্বাটার কাছে দাঁড়ালো। এদের মধ্যে যারা বয়সে তরুন, তাদের একজন, যে কিনা প্রাক্তন “হিরো অফ দা সোভিয়েত ইউনিয়ন” (রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি অবদানের জন্য একসময় সোভিয়েত সরকারের দেয়া সর্বোচ্চ সম্মানসূচক পদক) সেই খাম্বাটা বেয়ে উঠে যন্ত্রটা মুছলো।

নিচ থেকে অন্যরা চিৎকার করে উপদেশ দিতে লাগলো, “দেখো আবার, এটার উপর নিশ্বাস ফেলো না যেন, তাহলে টেম্পারেচার বেড়ে যাবে”।

“বেড়ে যাবে? সম্ভাবনা কম। আমার নিশ্বাসে এর কিছুই হবে না”।

সূখোভের ১০৪ নম্বর দলের সর্দার তিউরিন সেখানে নেই। সূখোভ বালতিটা নামিয়ে রেখে, হাতদুটো জামার হাতার ভেতর ঢুকিয়ে আগ্রহ ভরে ওদের কান্ডকারখানা দেখতে লাগলো।

খাম্বার উপরের লোকটা কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে বললো, “সাড়ে সাতাশ, হারামীটা এর চেয়ে এক চুলও বেশী না।”। এবং আরো বেশী নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে আরেকবার দেখে সে তড়তড় করে নিচে নেমে পরলো।

“শালার জিনিষটার মধ্যে গোলমাল আছে, সবসময় মিথ্যা বলে”, কেউ একজন বললো। “তোমার কি মনে হয়, ওরা আসল টেম্পারেচার দেখাবে এমন থার্মোমিটার ঝুলিয়ে রাখবে?”

দলের সর্দারেরা যে যার মত ছড়িয়ে পরলো। সূখোভও কূয়োর দিকে ছুট দিলো। তুষার যেন কানটুপির ঢাকনার ভেতরেও তার কানদুটো খুঁটে খুঁটে খেতে চাচ্ছে। ঢাকনাদুটো কানের উপর নামানোই ছিলো, কিন্তু গিঁট দেয়া ছিলো না।

কূয়োর উপরের অংশটা এমন পুরু বরফের আস্তরের মধ্য দিয়ে সে কোনমতে কেবল বালতিটা নিচে নামাতে পারলো। দড়িটা একটা লোহার খুন্তির মত শক্ত হয়ে ঝুলে রইলো।

অবশ হয়ে যাওয়া হাতে সে জলভরা বালতিটা গার্ডরুমের ভেতর এনে রেখেই ঝপ করে হাতদুটো পানির মধ্যে চুবিয়ে দিলো। তাতে একটু উষ্ণ বোধ হলো।

ঘরে তাতারটা নেই। এখন ঘরে চারজন গার্ড। ড্রাফট খেলা আর ঘুম বাদ দিয়ে দলবেঁধে দাঁড়িয়ে এই জানুয়ারীতে ভুট্টোর সরবরাহ কতটুকু পাওয়া যাবে তাই নিয়ে তর্ক করছিলো (এই ক্যাম্পে খাবারের সরবরাহে ঘাটতি ছিলো, এবং যদিও রেশনিং ব্যাবস্থা বহু আগে উঠে গিয়েছিলো, কিছু জিনিসপত্র তাদের কাছে হ্রাসকৃত মূল্যে বিক্রি করা হতো, যেগুলো আবার এখানকার অসামরিক বাসিন্দাদের জন্য সুলভ ছিলো না)।

“দরজাটা বন্ধ কর, খবিশ কোথাকার, দেখছিস না ড্রাফট খেলা চলছে” একজন গার্ড বললো।

এই সাতসকালে বুট ভিজিয়ে ফেলার কোন অর্থই হয় না। সূখোভ এখন যদি হাঁচড়পাঁচড় করে তার কুটিরে ফিরেও যায়, তবুও বদলানোর জন্য একজোড়া বুট খূঁজে পাবে না। আট বছরের বন্দী জীবনে জুতো বরাদ্দ পাওয়ার নানা রকম কায়দা-কানুন তাকে শিখতে হয়েছে। একটা সময় গেছে যখন তাকে পুরো শীত পার করতে হয়েছে কোন ভেলেংকি বা বুট ছাড়াই। শুধুমাত্র ছাল-বাকলের তৈরী স্যান্ডেল বা মোটরগাড়ীর টায়ার কেটে তৈরী গ্যালোশ (একপ্রকার রাবারের তৈরী বুট) জাতীয় জুতো পরে টিকে থাকতে হয়েছে। তারা এগুলোকে বলতো “চেটয্”। চেলিয়াবিন্সক ট্রাক্টর ফ্যাক্টরির (সংক্ষেপে ChTZ) নামেই এই নাম দিয়েছিলো ওরা। এখন অবশ্য অবস্থা মনে হয় অনেক ভালো, অক্টোবরে সূখোভ একজোড়া শক্তপোক্ত বুট পেয়েছিলো। পালভোকে ধন্যবাদ দেয়াই লাগে, ওর পিছুপিছুইতো সে জুতোর স্টোর পর্যন্ত গিয়েছিলো। বেশ বড়সড় জুতো, পায়ে প্যাঁচানো কাপড়শুদ্ধ এঁটে যায়। পরের একসপ্তাহ সে জন্মদিনের উপহার পাওয়ার মত আনন্দে ছিলো, নতুন বুটের হিল দিয়ে সারাদিন শুধু খটাখট, খটাখট! এরপর ঠিক ডিসেম্বরেই এলো ভেলেংকির চালান। আহা, জীবন মনে হচ্ছিল কত না সুন্দর!

কিন্তু, বুটের দায়িত্বে যে ছিলো তার অফিসের কোন এক শয়তান কমান্ডেন্টের কানে মন্ত্র দিলো যে ভেলেংকি শুধু তাদেরই দেয়া হোক যারা আগের পাওয়া বুট জমা দেবে। বন্দীরা একসাথে দু’জোড়া বুট রাখা নাকি বন্দীশালার নিয়ম বিরুদ্ধ। যেকোন একটা বেছে নেয়াই ছিলো সূখোভের সামনে একমাত্র পথ। হয় পুরো শীত বুট পরে কাটাও, অথবা বুটজোড়া জমা দিয়ে ভেলেংকি পরো, এমনকি তুষার গলা থকথকে কাদার মধ্যেও। কি যত্নই না সে তার নতুন বুটজোড়ার নিতো, চামড়া নরম রাখার জন্য বুটে গ্রিজ মাখিয়ে রাখতো! আহা, সেই বুট জোড়া জমা দেয়ার চেয়ে কষ্টকর বুঝি কিছুই ছিলো না! তার বুটজোড়া তারপর ঢিবির মত গাদা করে রাখা অন্য বুটগুলোর মাঝে ছুঁড়ে ফেলা হলো, যেখান থেকে সেগুলো আবার বসন্তকালে খুঁজে পাওয়ার চিন্তা দুরাশা মাত্র।

এখন সূখোভ জানে তার কি করতে হবে। সে খুব নিপুনভাবে তার ন্যাকড়া প্যাঁচানো পা দু’টো ভেলেংকি থেকে বের করে নিলো। তারপর ন্যাকড়াগুলো ভেলেংকির ভেতর পুরে সেগুলো এক কোনায় রেখে দিলো (তার চামুচটা ফ্লোরে টুং করে শব্দ তুললো। লক-আপে যাওয়ার আশংকায় তারাহুরো করে তৈরী হয়ে নিলেও সে তার চামুচ সংগে নিতে ভোলে নি), তারপর খালি পায়ে সে মেঝের উপর পানি ছড়িয়ে দিলো, ঠিক গার্ডদের ভেলেংকির নিচ দিয়ে।

“এই বেল্লিকের বাচ্চা, আস্তে কর”, চেয়ারের উপর পা তুলতে তুলতে চিৎকার করে ধমকে উঠলো একজন গার্ড।

“চাল?” আরেকজন গার্ড আলাপ চালিয়ে যেতে লাগলো, “চাল অন্য জাতের জিনিস, চালের সাথে ভুট্টার তুলনা চলে না।”

“ফ্লোর ধুতে কত পানি লাগে রে, এভাবে কেউ ফ্লোর পরিষ্কার করে, বেকুব কোথাকার?”

“এভাবে ছাড়া সম্ভব না সিটিজেন চিফ, একেবারে কাদায় মাখামাখি অবস্থা।”

“এই ব্যাটা শুয়োর, নিজের বউকে কোনদিন ফ্লোর ধুতে দেখিস নি?”

সে উঠে দাঁড়ালো, হাতের ভেজা ন্যাকড়া থেকে ঝরঝর করে জল ঝরছে। তার মুখে ছড়িয়ে পড়লো একটা সরল হাসি, সেই সাথে বেড়িয়ে পরলো তার জায়গায় জায়গায় ফাঁকা ফোকলা দাঁতের পাটি, ১৯৪৩ সালে উস্ত-ইযমা ক্যাম্পে থাকাকালিন সময় স্কার্ভি রোগের ছোঁয়ার স্মৃতি। সে যেমন-তেমন ছোঁয়া! কিছু মুখে দিলেই তার দুর্বল পাকস্থলী সেটা উগড়ে দিতো, পায়খানার সময় মলদ্বার দিয়ে গলগল করে বেড়িয়ে আসতো শুধু থকথকে রক্তের ধারা। সেই সমস্যার এখন অবশ্য খুব সামান্যই বাকী আছে।

“সিটিজেন চিফ, স্ত্রীর কাছ থেকে আমাকে ধরে আনা হয়েছিলো সেই ’৪১ সালে। তার চেহারাই এখন আমার আর মনে পড়ে না।”

“এভাবে পরষ্কার করে খবিশের দল... চোদনার একটা কাজও এরা ঠিক মত করতে জানে না, শিখতেও চায় না। আমরা যে খাবার দেই, সেগুলো খাবার যোগ্য এরা না। এইগুলাকে গু খাওয়ানো উচিৎ।”

“যাগগে, প্রতিদিন এই ধোয়ামোছার দরকারটা কি? এইরকম স্যাঁতস্যাঁতে ভাব কার ভালো লাগে? এই ব্যাটা ৮৫৪, এদিকে তাকা। হালকার উপর মুছে দে যাতে সামান্য ভেজা ভেজা থাকে, তারপর এখান থেকে ভাগ!”

“না, তুমি কোনভাবেই চালকে ভুট্টার সাথে তুলনা করতে পারো না।”

কোন কিছু কিভাবে সামলাতে হয় তা সূকোভ ভালোই জানে। কাজ হচ্ছে একটা কাঠির মত। দুই প্রান্ত ওয়ালা। যখন তুমি কাজ জানা লোকের জন্য খাটবে, তখন তুমি কাজের মান খুব ভালো রাখবে; আর যখন কোন নির্বোধের জন্য কাজ করবে, তখন তাকে চোখে ধুলো দেবে। নাতো এতদিনে সকলেই অসন্তুষ্ট হয়ে যেতো। একথা তাদের সবারই জানা।

ফ্লোরের তক্তাগুলোতে কোন শুকনো ময়লার দাগ না থাকে মত করে ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে মোছার পর, সূখোভ সেটাকে না নিংড়েই চুলোর পেছনে ছুঁড়ে দিলো, তারপর দরজার কাছে রাখা ভেলেংকি পরে বালতির বাকী পানিগুলো বাইরে ক্যাম্পের কর্তাদের যাওয়া-আসার রাস্তাতেই ছুঁড়ে ফেললো। এরপর একছুটে গোসলখানা আর অন্ধকার, ঠান্ডা ক্লাবঘরের পাশ দিয়ে শর্টকাট মেরে গন-হলঘরের কাছে পৌঁছে গেলো।

ডাক্তারখানায় তাকে যেকোন ভাবে যেতেই হবে। গায়ে আবার ব্যাথা-বেদনা শুরু হয়ে গেছে। হলঘরের সামনে দাঁড়ানো গার্ডটার চোখে যে করেই হোক ধুলো দিতে হবে। ক্যাম্পের কমান্ডেন্ট কঠিন আদেশ, কোন কয়েদিকে একা ঘোরাফেরা করতে দেখলেই তুলে সোজা লক-আপে ছুঁড়ে দেওয়া হবে।

(ক্রমশঃ)

ইকরাম ফরিদ চৌধুরী


মন্তব্য

সত্যপীর এর ছবি

বাহ, ভালো লিখেছেন। গল্পটা কি অনেক বড়? মাঝপথে থেমে যাবেন না আশা করি।

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

কষ্ট করে পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। উৎসাহ পেয়েছি বলা বাহুল্য। নাহ, তেমন বড় গল্প না। ১৪৩ পৃষ্ঠার "সেবা প্রকাশণী" সাইজের পেপারব্যাক। আমি গল্পটা পড়ছি আর আক্ষরিক অর্থেই সমান্তরালভাবে অনুবাদ করছি। নিজেই এখনো জানি না শেষটায় কি আছে। যতটুকু পড়েছি বা অনুবাদ করেছি সেটাকে তিন ভাগের একভাগের কিছু কম বলা যায়। আরো দু'চার কিস্তি ব্লগে দেয়া যাবে স্টক থেকে। বাকীটা কি হয় সময়ে দেখা যাবে। তবে যেহেতু পড়তে ভালো লাগছে, সেহেতু বই পড়া শেষ হলে অনুবাদও শেষ হবে বলে আশা রাখি। বানান নিয়ে যে বড় রকমের ঝামেলায় আছি, সেটা হয়ত টের পেয়েছেন। প্রথম অনুবাদ বিধায় বানান বা অন্যান্য ক্ষেত্রে উপদেশ পেলে উপকার হয়। "শুদ্ধি অভিযান"টা এই সুযোগে বিনাশ্রমে সেরে ফেলা যাবে।

ধন্যবাদ,

ইকরাম ফরিদ চৌধুরী।

সত্যপীর এর ছবি

লিখে চলুন হাত খুলে। হাত চালু রাখা চাই।

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

আরো এক পর্ব আপলোড করেছি। আপনার চোখে পড়েছে কিনা জানি না।

এক লহমা এর ছবি

অনুবাদ চমৎকার লেগেছে।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। অনুবাদ যে কঠিন কাজ (অন্ততঃ আমার জন্য) সেটা এই কাজ করতে গিয়ে টের পেলাম। শেষ করার ইচ্ছে আছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপদেশ পেলে উপকৃত হব।

ধন্যবাদ,

ইকরাম ফরিদ চৌধুরী।

অতিথি লেখক এর ছবি

সলঝেনিৎসিনের এই লেখাটা অনুবাদ করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। অনুবাদ নিঃসন্দেহে পৃথিবীর কঠিনতম কাজগুলোর একটি। শুধু যে গল্পটা ফুটিয়ে তুলতে হয় তা নয়, নজর রাখতে হয় যেন গল্পের ভেতরে খুঁজে পাওয়া যায় মূল লেখকের লেখক সত্ত্বাটিকে। প্রথম কাজটি তুলনামূলক ভাবে সহজ। তবে সহজ কথা কি চাইলেই সহজে বলা যায়! আমি ঠিক জানিনা আপনি রাশান থেকে নাকি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন। ধরে নিলাম ইংরেজি থেকে। যিনি ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি নিশ্চয়ই সচেষ্ট ছিলেন তাঁর ভাষার শ্রেষ্ঠ শব্দগুলো নিয়ে একটার পর একটা বাক্য সাজিয়ে তুলতে। অনেক অনেক বছর আগে একবার এক আড্ডায় কবি নির্মলেন্দু গুন, বলেছিলেন "বাংলা ভাষায় তো অনেক শব্দই আছে। আমি যখন লিখতে বসি, তখন একটা ছাঁকনি দিয়ে কিছু শব্দ সেখান থেকে তুলে নেই। তারপর তাদের গন্ধ শুঁকি, কিছু শব্দ ফেলে দেই, কিছু শব্দ জিভে ঠেকিয়ে অনুভব করি তাদের স্বাদ। আরও কিছু শব্দ বাদ পড়ে। যেগুলো থেকে যায় তার থেকে একটা একটা কানের কাছে নিয়ে টোকা দিয়ে দেখি কেমন বাজলো। এভাবে হাজার হাজার শব্দ থেকে বেঁছে নিই আমার উচ্চারণ।" অনুবাদক এই কাজটি না করলে মূল লেখকের প্রতি অবিচার হয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিষয়টি, মূল লেখকের লেখক সত্ত্বাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরা, ভয়াবহ কঠিন। একজন লেখকের অনেকগুলো লেখা না পড়লে এটি করা দুষ্কর। বর্ণনার ধরন, সংলাপ নির্মাণ, যতি চিহ্নের প্রয়োগ, ............ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু দিয়েই আমাদের মুগ্ধ করেন লেখকেরা। অনুবাদ তখনই সার্থক যখন যখন গল্পের সাথে সাথে আমরা গল্পকারকেও খুঁজে পাই।

একটা কিস্তিই পড়েছি, ধীরে ধীরে অন্যগুলোও পড়ে ফেলবো। শুভেচ্ছা রইলো।

----মোখলেস হোসেন

অতিথি লেখক এর ছবি

মোখলেস ভাই, কষ্ট করে পড়ার জন্য এবং সময় নিয়ে মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য বিভিন্ন দিক থেকেই আমাকে বেশ ভাবিয়েছে। কবি নির্মলেন্দু গুনের উদাহারনটাও খুব ভালো লেগেছে। বিষয়গুলো মনে রাখবো। তবে অনুবাদ সহজপাঠ্য রাখাটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার অনুমান সঠিক। আমি ইংরেজী থেকে অনুবাদ করছি। পেঙ্গুইন প্রকাশনার ১৯৬২ সনের প্রথম সংস্করন থেকে। তবে অনুবাদের ক্ষেত্রে আপনার উল্লিখিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছাড়াও গল্পের পটভূমি যেই দেশ, রাজনৈতিক অবস্থা বা সময় নিয়ে , সেটার সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারনা থাকাটাও মনে হয় জরুরি। এ বিষয়টাও বেশ ঝামেলায় ফেলছে আমাকে। রাশিয়া যেহেতু যাওয়া হয় নি আর রাজনৈতিক ইতিহাসের জগতে যেহেতু আমার পদচারনা নেই বললেই চলে, সেহেতু পুরো ব্যাপারটা অনুমান করেই নিতে হচ্ছে।

আলেক্সান্দার সলঝেনিতসিনের সাথে আমার পরিচয় এই বইয়ের মাধ্যমেই, অনেকটা কাকতালীয়ভাবে। আর কোন বইই পড়া হয় নি। বইটার বিষয়বস্তু ভালো লেগে যাওয়াতে পড়া শুরু করি, এবং অনেকটা খেলাচ্ছলেই দু'এক পাতা অনুবাদও করে ফেলি গত বছর। উল্লেখ্য এটাই আমার প্রথম অনুবাদ প্রচেষ্টা। কি করে যেন ব্যাপারটা এক ধরনের নেশার পর্যায়ে চলে গেছে। তাই ধীরে ধীরে গল্পটা পড়ছি আর সমান্তরালভাবে অনুবাদ করছি। নিজেও জানি না শেষটায় কি আছে।

বাকী কিস্তিগুলো পড়ার অনুরোধ রইলো। আর যেহেতু প্রথম অনুবাদকর্ম, সেহেতু অনুরোধ রইলো এবারকার মত প্রতিবারই মূল্যবান মন্তব্যের মাধ্যমে ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়ার।

ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী।

বিঃদ্রঃ আপনার ধারাবাহিক লেখাগুলো কিন্তু মাঝপথে থেকে আছে। নতুন কিস্তির অপেক্ষার রইলাম।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA