প্রজেক্ট আইবেক

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শনি, ১২/০৫/২০১৮ - ৪:১৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এক.
আজ মঙ্গলবার, তেইশে অগাস্ট দু’ হাজার ষোল। প্রজেক্ট আইবেকের একত্রিশতম দিনে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি প্রথম চিন্তক। আমার পাশে রাগী রাগী চেহারার যে মানুষটিকে আপনারা দেখছেন তাঁর নাম ইর্তেজা নাসির।

এই ঘরে আসবাব বলতে একটি বিছানা, দুটো চেয়ার, আর বেলা সাড়ে তিনটেতে থেমে থাকা একটি গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক। পূর্বদিকের দেয়ালটি কাঁচের। দেয়ালের বাইরে ঘন নীল আকাশ, সে আকাশে পেঁজা তুলোর মতো ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। মেঘের আড়াল ডিঙিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে সকালের রোদ। এমন ঝলমলে একটি সকালে রাগী রাগী মুখ করে ঘরে বসে থাকার লোক ইর্তেজা নাসির নন। এর জন্য আপনারা অবশ্য আমাকে দায়ী করতে পারেন। আমি দৃশ্যমান জগতটাকে খানিকটা পাল্টে দিয়েছি। এই মুহূর্তে একটি ঘোলাটে কালো আকাশ আর সেই আকাশে থেকে থেকে খেলে যাওয়া বিজলির চমক ছাড়া আর কিছুই দেখছেন না তিনি। ইর্তেজা নাসির যে ভয়ানক একটা বিপদের মধ্যে রয়েছেন সে কথা আমি আপনাদের আগেই জানিয়েছি। তাঁকে ঘরে আটকে রাখার জন্য এই সামান্য ছলনাটুকু করতে হয়েছে বলে আমি যারপরনাই লজ্জিত। এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না আমার, বিপদের কথা তিনি জানেন না। আর জোর করে তাঁকে আটকে রাখলে হিতে বিপরীত হতে পারতো।

তিনজন নতুন চিন্তক উপস্থিত রয়েছেন আজকের সভায়। তাদের সুবিধার জন্য প্রজেক্ট আইবেক নিয়ে প্রাথমিক কিছু কথা আবার বলছি আমি।

ঘটনার শুরু মাস খানেক আগের এক শুক্রবারে। তখন রাত প্রায় আড়াইটা। আমাদের গল্পের দ্বিতীয় চরিত্র, মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন, একটি বিশেষ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার জন্য এসেছেন তড়িৎকর্মার প্রধান কার্যালয়ে। তড়িৎকর্মা একটি কনসালটেন্সি ফার্ম। সমস্যার তড়িৎ সমাধানই এদের অঙ্গীকার। দেশে সমস্যার অভাব নেই, কমতি নেই মানুষের আগ্রহের, তড়িৎকর্মার প্রধান কার্যালয় তাই খোলা থাকে চব্বিশ ঘণ্টাই। ইর্তেজা নাসির এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পলিচালক।

মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিনের সমস্যাটি জটিল, কিঞ্চিৎ লজ্জারও। ভদ্রলোকের ধারণা কেউ একজন তাঁকে অনুসরণ করছে। অনুসরণকারীকে তিনি কখনো দেখেন নি, কেবল মাঝে মাঝে তার পায়ের আওয়াজ শুনতে পান। আওয়ায়জটা হয় তিনি একলা থাকলে। প্রথম দিকে ভেবেছিলেন মনের ভুল, অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল। গত কয়েকদিনে এ ধারণার পরিবর্তন হয়েছে।

দিন সাতেক ধরে তাঁর অফিসের টেবিলে আবির্ভাব ঘটছে বিচিত্র সব জিনিসের। কোনদিন এক গোছা রাবার ব্যান্ড, কখনো একটা হাঁসের ডিম, দুকুচি বাদাম……একফালি তরমুজ……জর্দার মিহি গুড়ো…। তিনি অফিসের দরজায় পাহারার ব্যাবস্থা করেছেন, সেই সাথে অষ্টপ্রহর সিসি টিভি, কিন্তু কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না কে এসব রেখে যাচ্ছে। তিনি মোটামুটি নিশ্চিত ব্যাপারটি ভৌতিক। তুকতাকে তাঁর আস্থা নেই, কোন ওঝা বা মৌলবির কাছে না গিয়ে চলে এসেছেন তড়িৎকর্মায়।

ইর্তেজা নাসির ঘোরতর নাস্তিক। ভূত প্রেত দত্যি দানোতে তাঁর তীব্র অবিশ্বাস। বাধ্য হয়েই এই কেইসে জড়িয়েছেন তিনি। মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন একজন জাঁদরেল পুলিশ অফিসার।

আমার হাতে তড়িৎকর্মার একটি ফাইল দেখতে পাচ্ছেন আপনারা। ফাইলের উপর প্রথমটায় লেখা ছিল “প্রজেক্ট কুতুবউদ্দিন”। পরবর্তীতে কুতুবউদ্দিন কেটে দিয়ে লেখা হয়েছে “প্রজেক্ট আইবেক”। আইবেক শব্দটি প্রাচীন কালের একজন সম্রাটের নাম থেকে নেওয়া, তাঁর পুরো নাম কুতুব আল-দিন আইবাক। প্রথম জীবনে কুতুব আল-দিন ছিলেন একজন ক্রীতদাস। সুদূর তুরস্ক থেকে ভারত বর্ষে এসে ঘটনাচক্রে হয়ে উঠেন দিল্লীর সম্রাট, মামলুক সাম্রাজ্যের স্থপতি। স্থানীয় উচ্চারণে সম্রাটের তুর্কি নামটির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। কুতুব আল-দিন আইবাক হয়ে যান কুতুবউদ্দিন আইবেক।

আমাদের বর্তমান যে সংকট তাঁর সাথে কুতুবউদ্দিন আইবেকের একটা সম্পর্ক রয়েছে। অবশ্য ইর্তেজা নাসির এতো কিছু জানেন না বলেই আমার বিশ্বাস। তিনি চিন্তাক্লেশ গুহায় পৌঁছুনোর কিছু আগেই শিলালিপিটি আমরা সরিয়ে আনতে পেরেছিলাম। এই মুহূর্তে সেটি আমাদের সংরক্ষণাগারের রক্ষিত আছে, আমি যথা সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব।
তার আগে চলুন দেখে নেওয়া যাক কী রয়েছে তড়িৎকর্মার ফাইলে। আমি প্রথম এন্ট্রি থেকে শুরু করছি।

****শুক্রবার, জুলাই ২২, ২০১৬।

বলা নেই কওয়া নেই কাল রাত আড়াইটায় কমিশনার কুতুবউদ্দিন সাহেব এসে হাজির। সিভিল ড্রেসে থাকায় আমাদের দারোয়ান তাঁকে চিনতে পারেনি। রাইসুর দোষ নেই, কমিশনার সাহেব শহরের পরিচিত মুখ নন, মাত্র এক সপ্তা আগে তিনি খাগড়াছড়ি থেকে প্রমোশন নিয়ে এখানে এসেছেন।

আমাদের অফিস চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকার মানে এই নয় যে কেউ একজন চাইলেই গটগট করে ঢুকে পড়বে। অচেনা লোকেদের জন্য সেন্ট্রি রুমের বাইরে অপেক্ষা করার ব্যাবস্থা রয়েছে। ভেতর থেকে ক্লিয়ারেন্স এলে তবেই দারোয়ান ঢুকতে দেয়। স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল, আমাদের কাজের যা ধরন তাতে এইটুকু ব্যাবস্থা না নিলেই নয়। শোরগোল শুনে নিচে নেমে দেখি কুতুবউদ্দিন সাহেব উত্তেজিত গলায় রাইসুকে শাসাচ্ছেন। আমি বুঝিয়ে সুজিয়ে তাঁকে শান্ত করে আমার অফিসে নিয়ে এলাম। এতো রাতে এখানে আসার কারণ বুঝতে পারছিনা। পাঁচ দিন আগেই ভদ্রলোকের সাথে আমার দেখা হয়েছে। পুলিশের বড় কোন কর্তা ট্রান্সফার হয়ে শহরে আসলে আমি নিজে গিয়ে সালাম দিয়ে আসি- স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল।

গিয়েই বুঝেছিলাম মানুষটা বেশ সৌখিন। তাঁর টেবিলের পাশে একটা শেলফ জুড়ে রয়েছে বিচিত্র সব সুভেনির। আমার মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে নিজে থেকেই বলেছিলেন এসব তিনি সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন দেশ থেকে। আমি অবশ্য সুভেনির দেখতে যাইনি, আর তিনিও সেটি বিলক্ষণ জানেন। এক দুটা সৌজন্যমূলক কথার পর সোজাসাপ্টা কাজের কথায় চলে এসে বলেছিলেন, আগের কমিশনারের সাথে যা ব্যাবস্থা ছিল সেটা থাকলেই চলবে।

তবে কি অংকটা তাঁর পছন্দ হয়নি! এমন সন্দেহ যে আমার ছিলোনা তা নয়, জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়ে চলেছে আজকাল! তড়িৎকর্মার অফিসে এধরনের আপতকালিন সময়ের জন্য এক দুটা খাম তৈরি থাকে। আমি একটা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিতেই মাছি তাড়াবার মতো করে সরিয়ে দিয়ে বললেন,

“আরে ওসব নয়, এসেছি একটা কাজে।”

আমি রীতিমত বিব্রত হয়ে বললাম,

“কী দেব স্যার, চা না কফি? অন্য কিছু চাইলে সেটারও ব্যাবস্থা আছে।”

“এতো রাতে চা-কফি! আপনি তো দেখছি মারবেন আমাকে। এমনিতেই
পুলিশের চাকরিতে ঘুমের কোন ঠিক ঠিকানা নেই!”

“মেহেরবানি করে বলুন কী করতে পারি আপনার জন্য।”

“ভূত প্রেত নিয়ে জানাশোনা আছে আপনার? একটা ভূত আমাকে কদিন ধরে জ্বালাচ্ছে খুব, আমি চাই আপনি ব্যাপারটা একটু দেখেন।”

কুতুবউদ্দিন সাহেবের কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। একবার ভাবলাম রসিকতা করছেন। পরক্ষনেই মনে পড়ল রসিকতা শব্দটি পুলিশের সাথে বেমানান। বললাম,

“আমরা তো স্যার অতীন্দ্রিয় ব্যাপার স্যাপার নিয়ে কাজ করিনা। আপনি কি ওই লাইনের কারও সাথে যোগাযোগ করেছেন?”

“এই বুদ্ধি নিয়ে ব্যাবসা চালান কী করে ইর্তেজা সাহেব? বুজরুকিতে আমার আস্থা নেই। আর তাছাড়া আমি ওদের কাছে যাওয়া মানে বোঝেন? সেই নাইন্টিন নাইনটি নাইনে একটা দলকে ধরেছিলাম। পায়ের তলায় রুলার দিয়ে কয়েক ঘা দিতেই গড়গড় করে বলে দিলো সব। কত লোকের হাড়ির খবর যে বেরুলো, কী সব ক্লায়েন্ট একেকজন, কী সব তাঁদের কীর্তি!”

বুদ্ধির খোঁটা হজম করেই বললাম,

“পুলিশের গোয়েন্দারা কী ভাবছে?”

“অফিসের লোকজনকে এখানে ইনভলভ করতে চাইনা। আপনি নিজে হলে কি তাই করতেন? জানে শুধু আমার আর্দালিটা, তবে সে খুব বিশ্বস্ত। নয় বছর ধরে আমার সাথে আছে।”

কুতুবউদ্দিন সাহেব বেশিক্ষণ বসেন নি। যাবার আগে বলে গিয়েছেন বিষয়টা যেন অবশ্যই গোপন থাকে। বুঝতে পারছিনা কীভাবে শুরু করবো। গোপন কথা বলার সময় মানুষ বেশ রেখে ঢেকেই বলে। আমার আরও তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু পুলিশকে না জানিয়ে পুলিশের ব্যাপারে ঘাঁটাঘাঁটি করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ভাবছি দিদারকে দায়িত্বটা দেব, ঘাঁটাঘাঁটির ব্যাপারে ওর জুড়ি নেই।****

প্রথম এন্ট্রি এখানেই শেষ। দ্বিতীয় এন্ট্রিতে দিদারের সাথে ইর্তেজা নাসিরের কথপোকথন আর সম্ভাব্য খরচের একটা তালিকা ছাড়া তেমন কিছু নেই। এন্ট্রির শেষ বাক্যটি অবশ্য চোখে পড়ার মত। লাল কালিতে আন্ডারলাইন করে লেখা, “দীদার রয়্যাল ডিসট্রিক্টের মানুষ, ওর ব্যাপারে আমাকে একটু সাবধান হতে হবে”।

আপনারা জানেন রয়্যাল মানে রাজকীয়। আমার ধারণা দিদার সেই রাজপুরুষ যার কথা কুতুবউদ্দিন আইবেক তাঁর শিলালিপিতে লিখে গিয়েছেন।

দিদারকে দেখে মনে হতে পারে জীবনের বসন্তময় দিনগুলো তিনি ফেলে এসেছেন অনেকদিন আগে। মাথায় চুল খুব একটা নেই, চুলের অভাব পুষিয়ে নিতেই যেন মুখমণ্ডল ঢেকে রয়েছে অবিন্ন্যাস্ত দাঁড়ি গোঁফে। সুপ্রশস্থ মধ্যাঞ্চল এবং ক্রম প্রসারমান গ্রীবায় এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান যে তিনি পরিশ্রম বিমুখ, যারপরনাই অলস একজন মানুষ। অবশ্য আলসেমিকে শখ হিসেবে নেবার মত বিপুল বিত্ত তাঁর রয়েছে। ইর্তেজা নাসির যদিও বলেছেন দিদার রয়্যাল ডিসট্রিক্টের মানুষ, আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি তাঁর পূর্ব পুরুষদের আদিনিবাস ছিল এদেশের দক্ষিণ প্রান্তে, নিউক্যালি নামের একটি অঞ্চলে। প্রায় আড়াইশ বছর আগে দিদারের এক ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ, মুন্সি আতিকুল কবির, চলে যান নাটোরের দীঘাপতিয়ায়। সেখানে তখন রাজত্ব করছিলেন রাজা আনন্দ নাথ রায়। দুই যুগ পর মুন্সি আতিকুল কবির ফিরে আসেন নিউক্যালিতে, জনশ্রুতি রয়েছে তিনি নাকি ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। ভাষাগত জটিলতায় এই ছুঁচ এবং ফালের বিষয়টা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। তবে বাকি জীবনটা বিপুল ঐশ্বর্য নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি, লোকে তাঁকে বলতো রাজা, আর সম্ভবত সেকারণেই নিউক্যালিকে রয়্যাল ডিসট্রিক্ট।

দিদার বিবাহিত, দুই সন্তানের জনক। পরিবারের মানুষেরা তাঁকে খুব একটা ঘাঁটান না। তাঁর জীবন কাটে আনন্দে, রাজা আনন্দ নাথ রায়ের মতোই। রাজরাজড়াদের কোন না কোন শখ থাকে, দিদারের শখ অণুসন্ধান। ক্ষমতাবান লোকেদের দুর্বলতা নিয়ে তাঁর আগ্রহের সীমা নেই। সে আগ্রহ নিরসনে তাঁর নিষ্ঠাও তুলনাহীন। তড়িৎকর্মার ফাইলের চতুর্থ এন্ট্রিতে এর কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। আমি সেখান থেকে পড়ছি-

***বুধবার, জুলাই ২৭, ২০১৬

মিটিং ছিল বিকেলে, কিন্তু হেলতে দুলতে দুপুরেই এসে হাজির দিদার। আমি তখন ফোনে কথা বলছিলাম কুতুবউদ্দিন সাহেবের সাথে। ভদ্রলোক কোন কারণে দারুণ উত্তেজিত। দিদার কথা না বলে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো। ফোন শেষ করে পাশ ফিরে দেখি আমার টেবিলে একটা ম্যাপ, দুটো ট্রেনের টিকেট আর একটা শান্তি নিকেতনি ব্যাগ। ব্যাগটা ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়ে আছে।

“কী ব্যাপার বলোতো! ম্যাপটা কিসের? ট্রেনের টিকিট আর ওই ঝোলাটাই বা কী করছে আমার টেবিলে?”

“তোমার হাতে সময় আছে, এই ধর দিন তিনেক? ভাবছি খাগড়াছড়ি থেকে একটু ঘুরে আসি। ভদ্রলোক তো আগে ওখানেই ছিলেন, তাইনা?”

“দেখ দিদার, তড়িৎকর্মা একটা ট্রাভেল এজেন্সি নয়। আর আমরাও এখানে পিকনিক করে বেড়াই না। আমাদের কাজকর্ম সিরিয়াস সব বিষয় নিয়ে।”
“আমি কি তোমাকে পিকনিক করার জন্য খাগড়াছড়ি যেতে বলছি? ব্যাপারটা সিরিয়াসই। তুমি বোধহয় জাননা খাগড়াছড়িতে বছর দুয়েক আগে একটা ঘটনা ঘটেছিলো। ব্যাপারটা ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট নিয়ে।”

“কুতুবউদ্দিন সাহেবের সাথে কালো ছাগলের সম্পর্ক কী?”

“সম্পর্ক খোঁজার জন্যই তো যেতে চাইছি। কেবল জেনে রাখো সেবার কোন এক বিচিত্র কারণে খাগড়াছড়ির কালো ছাগল গুলো সব সাদা হয়ে যাচ্ছিলো।”

“বটে! এটা নিয়ে এতো ভাবাভাবির কী রয়েছে? গরু ছাগলের তো কত ধরনের অসুখ বিসুখ হয়, এতদিনে সেরে গিয়েছে নিশ্চয়ই।”

“খাগড়াছড়ির আগে কুতুবউদ্দিন সাহেব কোথায় ছিলেন জানো?”

“জানি, বোতসোয়ানার ইউ এন মিশনে।”

“ঝোলাটা খোলো, নিউ ইয়র্ক টাইমসের পুরনো একটা সংখ্যা আছে। প্রচ্ছদে চোখ বুলিয়ে দেখো।”

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে সাধারণত পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের ছবি থাকে। কিন্তু এই সংখ্যাটায় দেখতে পাচ্ছি একটা চতুষ্পদ জানোয়ারের ছবি, দেখতে খানিকটা জেব্রার মত। নিচে লেখা, ইটস ব্ল্যাক, ইটস হোয়াইট!

“ছবিতে যেটাকে দেখতে পাচ্ছ সেটার নাম হুতুম্বুবু ছাগল। বোতসোয়ানার হুতুম্বুবু গোত্রের মানুষেরা হাজার বছর ধরে পুষে আসছে কালো রঙের এই ছাগল। দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল গোটের মতোই। সব আফ্রিকান গোত্রই ছাগল পোষে, তবে স্বাদে গন্ধে হতুম্বুবু ছাগল ছিল তুলনাহীন। বছর দশেক আগে কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে হুতুম্বুবু ছাগল গুলোর গায়ের রং পাল্টে যেতে শুরু করে। লোকে বলে এটা নাকি কিনিমাম্বোদের তুকতাকের ফল। কিনিমাম্বোরা পুষতো সাদা ছাগল, যার তিনটে বিকোয় একটা হুতুম্বুবু ছাগলের দামে। আফ্রিকাতে গোত্রে গোত্রে খুটখাট লেগেই থাকে, ছাগল নিয়ে সেবারে একেবারে গৃহযুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিলো। সেই যুদ্ধ থামাতেই ইউ এন মিশন, আর কুতুবউদ্দিন সাহেবের বিদেশ যাত্রা।”

“নিউ ইয়র্ক টাইমসে এসব লিখেছে?”

“বিশ্বাস না হলে প্রতিবেদনটি পড়ে দেখো। যা বলছিলাম - যুদ্ধ এখনও চলছে, তবে যে ছাগল নিয়ে এতো কাণ্ড সেই হুতুম্বুবু ছাগল আজকাল আর দেখা যায় না। কুতুবউদ্দিন সাহেব বতসয়ানায় দু বছর কাটিয়ে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। নতুন পোস্টিং নিয়ে খাগড়াছড়িতে পা দেবার ঠিক এক মাসের মাথায় ব্ল্যাক বেঙ্গল গোটের রঙ হারানোর খবরটা ছাপে প্রথম কালো।”

“তোমার ধারণা কুতুবউদ্দিন সাহেব আফ্রিকা থেকে ছাগলের রোগ বয়ে এনেছেন বাংলাদেশে!”

“কেন নয়? তাঁর চেহারাটা একবার ভাবো। মাথা ভর্তি কুচ কুচে কালো চুল, নাকের তলায় ঝাঁটার মত কালো গোঁফ, থুতনিতে এক গোছা ছাগুলে দাঁড়ি, ধবধবে সাদা। বোতসোয়ানায় যাবার আগে তিনি ছিলেন মাকুন্দা।”

“দেখো দিদার, তোমার কল্পনা শক্তির প্রশংসা না করে যদিও পারছিনা, কিন্তু কোথায় আফ্রিকা, আর কোথায় খাগড়াছড়ি! আবার যোগ করেছো কমিশনারের ছাগুলে দাঁড়ি।

“তোমার কি আর কোন থিওরি আছে? আর রোগের কথা আসছে কেন? আফ্রিকা তন্ত্রমন্ত্রের দেশ। আমার ধারণা কুতুবউদ্দিন সাহেব কিনিমাম্বোদের অভিশাপ নিয়ে ফিরে এসেছেন। ভূতের ব্যাপারটা ধরে নাও এর সাইড এফেক্ট। সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে চলে এসো। খেয়ে দেয়ে রাতের ট্রেনেই চিটাগং রওনা দেবো, সেখান থেকে খাগড়াছড়ি।”***

তড়িৎকর্মার ফাইলের বাকি এন্ট্রিগুলো পড়ার আগে বোতসোয়ানার সেই দুর্ঘটনাটার দিকে দৃষ্টি ফেরাতে চাই। আমাদের রিএক্টরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিলো না। বিস্ফোরণের পর জানা যায় হতুম্বুবুদের কালো ছাগলগুলোই এর জন্য দায়ী। এরা নিজেদের মধ্যে বিশেষ একটা তরঙ্গে যোগাযোগ করে, শুনতে অনেকটা ম্যা এবং ব্যা’র মাঝামাঝি। রিএক্টরের তরঙ্গের সাথে সেই তরঙ্গ মিশে যাওয়াতেই ওই দুর্ঘটনা।

একপাল ছাগলের কারণে গবেষণার কাজ তো আর থেমে থাকতে পারেনা। অনেক ভেবে আমরা তাই সিধান্ত নিয়েছিলাম ডাইসন স্ফিয়ার প্রয়োগের।

আপনারা জানেন ডাইসন স্ফিয়ার চিন্তক সভ্যতার শ্রেষ্ঠতম প্রযুক্তি। সাধারণত নক্ষত্রের শক্তি সংগ্রহেই এটি ব্যাবহৃত হয়। তবে আলো এক অর্থে যেহেতু তরঙ্গই, ছাগল সমস্যার সমাধানে এটির প্রয়োগ অস্বাভাবিক নয়। প্রায় হাজার খানেক মিনিয়েচার ডাইসন স্ফিয়ার ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো হুতুম্বুবুদের গ্রামের আশেপাশে।

এরপর আর কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারণে ছাগলগুলোর গায়ের রঙ বিকৃত হতে শুরু করলো। আমাদের মনোবিদদের ধারণা তরঙ্গ পাল্টে যাওয়াতে ওদের ভাষাগত কোন বিপর্যয় ঘটেছিল, সেখান থেকে বিষণ্ণতা, ফলশ্রুতিতে জেনেটিক মিউটেশন। হুতুম্বুবু আর কিনিমাম্বোদের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় এ বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি ভাবার আর প্রয়োজন হয়নি।

যুদ্ধের কিছু দিনের মধ্যেই হুতুম্বুবুরা আমাদের গবেষণাগার থেকে অনেক দুরে, জঙ্গলের গভীরে চলে যায়। ছাগল নেই, নেই তাদের তরঙ্গ, রিএক্টর চলছিলো কোন সমস্যা ছাড়াই। হুতুম্বুবু গ্রামে ছড়িয়ে রাখা স্ফিয়ারগুলোর কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। কোনভাবে তার একটি এসে পড়ে মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিনের হাতে। আমরা জেনেছি তিনি এটি ব্যাবহার করতেন বাদাম ভাঙার কাজে। ওজন এবং আকৃতিতে স্ফিয়ারটি একটি সাধারণ নুড়ি পাথরের মতোই।

পত্রিকায় খাগড়াছড়ির ছাগল সংক্রান্ত খবর ছাপা হলে আমরা বুঝতে পারি কী হয়েছে।আমাদের চিন্তাহরণ দল স্ফিয়ারটি উদ্ধার করার আগেই মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন একটি মারাত্মক বোকামি করে বসেন। ফলশ্রুতিতে পুনরুত্থান ঘটেছে অচিন্তকনৈনিতালের।

অচিন্তকনৈনিতাল কী? প্রশ্নটি এভাবেও করা যায়, “অচিন্তকনৈনিতাল কে?”, কোনটিই সঠিক প্রশ্ন নয়, আবার দুটো প্রশ্নই সঠিক। অচিন্তকনৈনিতাল একই সাথে কে এবং কী।

দুই.
বাক্সটি তিন’শ বছরের পুরনো। মিউজিয়ামের গুদামঘরে আর দশটা ফেলনা জিনিসের সাথে পড়েছিলো। গুদামঘরে তো কত কিছুই থাকে, আমি মিউজিয়ামের কিউরেটর নই যে পড়ে থাকা আবর্জনা নিয়ে মাথা ঘামাবো। আমি একজন চোর, সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র চোর।

একটা সময় চোর পাওয়া যেতো হাটে-মাঠে-ঘাটে। নতুন পৃথিবীতে হাট-বাজার বলতে কিছু নেই। দেশ নেই, মহাদেশ নেই, গোত্র নেই, জাতি নেই, দারিদ্র্য নেই, নেই ধর্ম বর্ণ কোন কিছুই। এটি সম্ভব হয়েছে বিমূর্ত ক্রিস্টালের কারণে। এটি যে কী তা বলে বোঝানো মুশকিল। এই ক্রিস্টাল আমাদের অস্তিত্বের অংশ, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছেই রয়েছে একটি করে। অনেকটা রূপকথার গল্পে শোনা সাপের মাথার মনির মতো। বিমূর্ত ক্রিস্টাল মানুষের ইচ্ছে পূরণ করে। কীভাবে, সে আমি ঠিক বলতে পারবো না। বিচ্যুত হবার পরবর্তী কয়েকটি বছরে অনেক খোঁজাখুঁজি করে যা জেনেছি তা হচ্ছেঃ

তিন’শ বছর আগে কে বা কারা অদ্ভুত কিছু পরীক্ষা চালিয়েছিলো। জটিল একটা ধাঁধার উত্তর খুঁজছিল তারা। পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে একটা বিপর্যয় ঘটে, তার বর্ণনা বা ব্যাখ্যা কোথাও নেই, সমাধানটি হারিয়ে যায়। পাঁচ দশক পর সমাধানটি আবার খুঁজে পায় মানুষ এবং তৈরি হয় প্রথম প্রজন্মের ক্রিস্টাল।
ক্রিস্টাল পরবর্তী প্রথম দশকটি ছিল দারুণ সংঘাতের। মানুষের ইচ্ছের কোন শেষ নেই, আর ইচ্ছেরা বড় দ্বান্দ্বিক। একটা সময় সে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। কেমন করে তা আমি জানিনা। মহাপ্রাণ মংপ্রুর কাছে যা শুনেছি তার অর্ধেকই আমার মাথায় ঢোকেনি। কেবল বুঝেছি এটা কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রায়োগিক একটি রূপ।

আমার চোখের সামনে পড়ে থাকা ওই ভাস্কর্য, আমার গায়ের ঘন নীল জামা, এমনকি এই আমি, আমাদের ভাঙতে ভাঙতে যখন আর ভাঙা যায়না, আমরা তখন প্রবেশ করি কোয়ান্টাম ভুবনে। সে রাজ্যে পৃথিবী পদ্যময়। সেখানে বাস করে কিছু কণা। কিন্তু এই যাকে ভাবলাম কণা, সে নাকি আবার একই সাথে তরঙ্গও! সে কখনও লাফায়, কখনও ঝাঁপায়, কখনও বা থেকে থেকে কেঁপে চলে প্যাঁচানো তারের স্প্রিং এর মতো। সে এই আছে এই নেই, আবার একই সংগে আছে এবং নেই। মহাপ্রাণ মংপ্রুর মতে ব্যাপারটা নাকি নির্ভর করে আমাদের দেখার উপর। এই যেমন আমার পাশের বন্ধ বাক্সটা, হয়তো একটা বেড়াল রয়েছে সেখানে, হয়তো নেই। থাকলে হয় সে বেঁচে আছে, কিংবা মৃত। বাক্সটা না খোলা পর্যন্ত কিছুই জানিনা আমি। দশটা বাক্সের দশটাতেই হয়তো সে ঘুমিয়ে আছে, আবার কোনটিতে হয়তো জেগে। সে ভারি বিচিত্র কাণ্ড!

বিমূর্ত ক্রিস্টাল যেন বেড়ালবন্দী সেই বাক্সটা। পার্থক্য একটাই, আমার যা কিছু কল্পনা, কণার রাজ্য ওলট পালট করে তার সবকিছু নিয়ে আসতে পারে আমার ক্রিস্টাল। কষ্ট করে বানাতে হয়না, দোকানে গিয়ে কিনতে হয় না, ছিনিয়েও আনতে হয়না কারও কাছ থেকে। এমনও নয় যে আমি পেলাম বলে আর কেউ পেলো না। কোয়ামটাম ভুবনে কণারা ছড়িয়ে রয়েছে অসীম হয়ে অসীমে অসীমে, ইচ্ছেরা তাই আর পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

যে কোন কিছু করে দেবার ক্ষমতা বিমূর্ত ক্রিস্টালের রয়েছে। কিন্তু ইচ্ছে পুরন মানেই তো আর সৃষ্টিশীলতা নয়! মানুষ পেতে চায় নির্মানের আনন্দ, সৃষ্টির সুখ।

অনেকেই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন।

এঁদের কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিলেন বিমূর্ত ক্রিস্টাল ছাড়াই জীবন চালিয়ে নেওয়া যায় কিনা তা পরখ করে দেখার। প্রথম দিকে খুব একটা নজর না কাড়লেও গত নব্বই বছরে ধীরে ধীরে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে জীবন যাপনের এই ব্যাতিক্রমি ধারণা। ভাবনা হিসেবে এটি অবশ্য মৌলিক নয়। ইতিহাসে আমিশ নামে এক সম্প্রদায়ের কথা জানা যায়, যারা ছয় শতাব্দী জুড়ে টিকে ছিল নতুন কালের প্রযুক্তিকে অগ্রাহ্য করে।

ক্রিস্টাল নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা সহজ হয় নি। তিন’শ বছরে হারিয়ে গিয়েছে অনেক কিছুই। উদ্যমী সেই মানুষেরা হারিয়ে যাওয়া অতীতের ছেঁড়া ছেঁড়া অংশ খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করে জমিয়ে রেখেছেন আলটপকায়। আলটপকা আমাদের মিউজিয়ামের নাম। নামে মিউজিয়াম হলেও এটা আসলে একটা বাড়ি, কাঠ-পাথর-কাদা দিয়ে হাতে বানানো এবড়ো থেবড়ো একটা স্থাপনা। আড়াই ‘শ বছরে এই প্রথম কোন স্থাপনা তৈরি হয়েছে বিমূর্ত ক্রিস্টালের সহায়তা ছাড়াই। তিন তলা বাড়ির প্রথম তলায় প্রদর্শন কক্ষ, দ্বিতীয় তলায় বিনিময় কেন্দ্র, আর তৃতীয় তলায় রয়েছে গুদাম ঘর। গুদাম ঘরে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। আমার অবশ্য অনুমতি না হলেও চলে। চোরকে আটকায় সাধ্যি কার!

গত তিনদিন ধরে আমি লুকিয়ে রয়েছি গুদামঘরে। মুজতবার লোকজন আমাকে খুঁজছে। মুজতবা বিমূর্তদের নেতা। নেতা নেত্রীর কোন বালাই ছিলোনা এতকাল। ইচ্ছে পূরণের পৃথিবীতে মানুষ ছিল একা, ক্রিস্টালে গড়ে তোলা নিজের নিজের বিমূর্ত সাম্রাজ্যে। মহাপ্রাণ মংপ্রু আর মহামতি টেকচাঁদ বিমূর্ত জগৎকে প্রত্যাখ্যান করে বেরিয়ে আসার পর সব কিছু অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। তাঁদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন আরও আটজন। দশ থেকে কুড়ি, কুড়ি থেকে সহস্র, সহস্র থেকে অযুত - আলটপকা কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিচ্যুতদের বসতি। গতর খাটিয়ে, ঘাম ঝরিয়ে বানানো ছোট ছোট কুঁড়েঘর, ঠিক যেন গল্পের সাত বামনের বাড়ির মত এক একটা বাড়ি।

পৃথিবীতে এখন দুটো দল, একদল চাইছে বিমূর্ত ক্রিস্টালের আওতা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের মতো করে বাঁচতে। আরেকদল চায় এই জাগরণের বিলুপ্তি। বিমূর্ত এবং বিচ্যুতের এই দ্বন্দ্বে ক্রিস্টালের প্রয়োগ অর্থহীন। ক্রিস্টাল কেবল ইচ্ছে পূরণ করে, অন্যের ইচ্ছেকে দাবিয়ে রাখার ক্ষমতা তার নেই।
বিমূর্ত থেকে বিচ্যুতি ঠেকাতে তাই বিচ্যুত হয়েছে বিমূর্তরাও। তারাও শিখেছে ক্রিস্টালের বাইরে এসে ভাবতে, সংগঠিত হয়েছে- সংগঠন ভাঙার প্রত্যয়ে।
বিচ্যুতদের নেতা মহাপ্রাণ মংপ্রু আমাকে একটা কাজ দিয়েছেন, চুরির কাজ। একটা ফাইল রয়েছে মুজতবার কাছে, সেটা হাতিয়ে আনা। কিন্তু কপাল মন্দ হলে যা হয়, ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছি। যা চেয়েছিলাম তা পাইনি, তবে যা পেয়েছি তার মূল্যও কোন অংশে কম নয়! মুজতবার ক্রিস্টালটা এখন আমার বুকপকেটে।

মংপ্রুর সাথে দেখা করবার সময় পাইনি, তাড়া খেয়ে পেছনের পাহাড়টা ডিঙিয়ে সোজা ঢুকে পড়েছি আলটপকায়। বেরুতে সাহস হচ্ছেনা, কাকে বিশ্বাস করবো এই ঘোর দুঃসময়ে!

বের হবার রাস্তা নেই, কোন উপায় নেই কারও সাথে যোগাযোগ করার। সংগে শুকনো কিছু খাবার আছে ভাগ্যিস, নইলে না খেয়ে মরতাম। ক্রিস্টালের কাছে চাইলে খাবার পাওয়া যায়, কিন্তু আলটপকায় ক্রিস্টালের ব্যাবহার নিষিদ্ধ।

গুদামঘরে পড়ে থাকা জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেই সময় কাটছিলো আমার। দ্বিতীয় দিন সকাল বেলা জিনিসটা চোখে পড়লো, রুপালী রঙের গোল একটা চাকতি, আধখোলা হয়ে লেগে ছিল কালো একটা বাক্সের গায়ে। ধরতে গিয়ে হাতের ধাক্কায় চাকতিটা বাক্সের ভেতরে চলে যেতেই অবাক কাণ্ড! ঘরের দেয়াল জুড়ে ফুটে উঠলো কথা বলা সব ছবি।

এই দুইদিনে অসংখ্য বার দেখেছি ছবিগুলো। অসম্পূর্ণ, এবং কেমন যেন খাপছাড়া। এক এক বার মনে হচ্ছে বানিয়ে বানিয়ে বলা গল্প, যেমনটা হতো আদ্যিকালে। কী যেন বলতো লোকে! ও হ্যাঁ, খেলোচিত্র।

ইর্তেজা নাসির ছাড়া আর কারও শারীরিক উপস্থিতি নেই খেলোচিত্রটায়। 'প্রথম চিন্তক' নামের কেউ একজন দাবি করছেন তিনি ইর্তেজা নাসিরের পাশেই দাঁড়িয়ে, কিন্তু বক্তব্যটি আমার কাছে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। করিৎকর্মার পরিচালককে দেখে মনে হচ্ছে এইঘরে তিনি একলা। হয়তো কিছুক্ষণ আগে ঘুম থেকে উঠেছেন, হাতে একটা পানপাত্র, সেখান থেকে চুমুক দিচ্ছেন মাঝে মাঝে। পাশে দাঁড়িয়ে একটানা কেউ কথা বলে চললে একটা প্রতিক্রিয়া তাঁর হবার কথা। সেরকম কোন প্রতিক্রিয়া আমার চোখে পড়ছে না। তাই বলে বলছি না তিনি ভাবলেশহীন, উল্টোটাই বরং সত্যি। গভীর মনোযোগে কিছু একটা ভাবছেন তিনি। আমার মনটা আঁকুপাঁকু করছে মহাপ্রাণ মংপুকে খেলোচিত্রটা একবার দেখানোর জন্য।

মহাপ্রাণ মংপুর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো পুবের পাহাড়ে। তার কিছুদিন আগেই তামারার কথায় নেচে উঠে আমার ক্রিস্টালটা ছুঁড়ে ফেলেছি সমুদ্রের জলে। আমার তখন দিশেহারা অবস্থা। আলটপকার পেছনের একটা কুড়েতে আমি আর তামারা থাকি। আমাদের ভালোবাসা বলতে গেলে অস্তমিত প্রায়। কোনমতে বেঁচে আছি স্রেফ নারকেল খেয়ে।

সমুদ্রের তীর থেকে পুবের পাহাড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে শত শত নারকেল গাছের সারি। আমরা সকাল হলেই বেরিয়ে পড়ি নারকেল পাড়ার জন্য। আমরা মানে যে শুধু আমি আর তামারা তা কিন্তু নয়। আমাদের মতো আছে আরও শ তিনেক, সবাই সদ্য বিচ্যুত হয়েছি বিমূর্ত জগত থেকে। আমাদের শেখানো হচ্ছে কী করে বেঁচে থাকতে হয়। আপাতত শিখছি সংগ্রহ এবং বিনিময়, তারপর শিখবো উৎপাদন।

দু ধরনের নারকেল গাছ রয়েছে সমুদ্র তীরে, সবুজ আর লাল। যেকোনো নারকেল গাছে চড়তে পারি আমি, কেবল একটাই শর্ত। নিজে যে রঙেরটা সংগ্রহ করবো সে রঙেরটা রাখতে পারবো না। অন্য কারও নারকেলের সাথে বদলে নিতে হবে। নারকেল বিনিময়ের জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে, পূবের পাহাড় থেকে অনেকটা পথ দৌড়ে যেতে হয় সেখানে। আমরা সারাদিন দৌড়াই। ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে যাই নারকেল বনে, নারকেল হাতে দৌড়ে যাই বিনিময়ের জায়গায়, সেই নারকেল কুঁড়েতে রেখে আবার নারকেল বনে, আবার বিনিময়, আবার কুঁড়ে……এই চলে দুপুর অবধি। ব্যাপারটা সহজ নয় মোটেই। হয়তো আমি পেড়েছি সবুজ নারকেল, আমার তাই প্রয়োজন লাল। কিন্তু বিনিময় কেন্দ্রে পৌছুতে পৌছুতে সব লাল শেষ। হাতের সবুজ নারকেল তখন মূল্যহীন, সব ফেলে দিতে হয় সমুদ্রের জলে। আমার মাথায় একদিন একটা বুদ্ধি এলো।

--চলবে


মন্তব্য

সোহেল ইমাম এর ছবি

আবার চলবে’র মুলো শেষে??????
কাহিনির শুরুটা পড়ে কৌতুহলে ফেটে পড়ছি, কিন্তু শ্রয়েডিঙ্গারের বিড়ালের মত কাহিনির একটা পরের কিস্তি থাকতেও পারে আবার মরাবিড়ালের মত এখানেই শেষ। আপনার ফাঁসি হওয়া উচিত এভাবে পাঠকের অনুভূতি নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগে।
মোখলেস ভাই বই বের করেন, পয়সা দিয়ে কিনে পড়ি, নয়তো আপনি কোন কাহিনিই শেষ করবেননা। আপনি লোক ভালোনা। দেঁতো হাসি

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

অতিথি লেখক এর ছবি

আর বই! সচলায়তনে তাও একজন পড়েছেন। বই বের করলে সেই বই দিয়ে আমার অসমান ফার্নিচারগুলোর তলায় ঠেকা দিতে হবে। নাহ সোহেল ইমাম, বই বের করার ইচ্ছে টিচ্ছে নেই আমার। লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। তবে ফাঁসি যাতে না হয় সেই চেষ্টা করছি।

----মোখলেস হোসেন।

সোহেল ইমাম এর ছবি

প্রজেক্ট আইবেক এর পরের কিস্তি দেন, সাসপেন্সটা ঝুলিয়ে রাখবেননা। পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনার তাড়া খেয়ে ঠিক করলাম আজ রাতে বসবো লেখাটা নিয়ে।

---মোখলেস হোসেন

অতিথি লেখক এর ছবি

রাত পর্যন্ত আর অপক্ষা করলাম না। হাতে খানিকটা সময় ছিলো, দ্যালাম ঠুকে এক কিস্তি। এখন বাকিটা মডুদের দয়া।

---মোখলেস হোসেন

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA