ডাকসু ও এক দিবাস্বপ্ন

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ২০/০১/২০১৯ - ১২:০৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এক মরুর দেশে পঞ্চাশ বছর পর বৃষ্টি হবে।

বুড়োদের কাছে , ছেলেরা জিজ্ঞেস করে, দাদু, বৃষ্টি জিনিসটা কি? খাওয়ার না পান করার?

খবরের কাগজে, ডাকসু নির্বাচনের খবর দেখে, ঢাবি থেকে পাশ করা, প্রৌঢ়দের কাছে আমার জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হয়, ডাকসুটা কি জিনিস, খায় না পান করে?

আমি ঢাবিতে ঢুকেছিলাম, নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে। তখন লাইব্রেরীর পাশে, মায়া-ইনকা সভ্যতার রেলিকের মতো একটা ডাকসু ভবন ছিলো। আমাদের হলে বিভিন্ন উপলক্ষে যাতায়াত করতেন, ডাকসুর শেষ নির্বাচনে জগন্নাথ হলের সর্বশেষ ভিপি, সুভাষ সিংহ রায়। জগন্নাথ হলে, আমার শরণদাতা প্রলয় কুমার জোয়ার্দারের সাথে উনার উঠাবসা ছিলো, তাই উনাকে চাক্ষুষ দেখা ও কথা বলার সুযোগ ছিলো। নতুবা, আমার কাছে মনে হতেই পারতো, ডাকসুর নির্বাচিত ব্যক্তিরা হয়তো ডায়ানোসরদের মতোই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী।

ডাকসু নির্বাচন যত ভারিক্কিই লাগুক না কেন, কার্যত এটি একটি ছাত্রসংসদ নির্বাচন। যদিও রাজনীতির বিভিন্ন মারপ্যাঁচে, এটি একটা পেন্ডিং পানিপথের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

আমি অনার্স ও দুই বিষয়ে মাষ্টার্স মিলিয়ে, প্রায় নয়বছর ঢাবিতে পড়েছি। ছাত্রসংসদ দেখার সুযোগ ঘটে নি। কানাডায় এসে একটা কলেজে পড়েছি আট মাস। আর তাতেই ছাত্রসংসদ ও নির্বাচন দু'টো দেখার শিকেই ছিঁড়ে গেল।

এখানকার ছাত্রসংসদের কাজটা কি? স্কুলের স্টুডেন্টদের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধা খেয়াল রাখা।

বেশ কয়েকবার কলেজের ছাত্রসংসদের অফিসটাতে গেছি। এরা , ছাত্রদের পার্ট টাইম চাকুরী জোগাড় দেয়। বিভিন্ন অভিযোগ শোনে, কর্তৃপক্ষের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে। বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়। একদিন, ছাত্রসংসদে গিয়ে দেখি, কোনায় একটা টেবিলে কিছু কনডম রেখে দিয়েছে।

আমার একটা অভ্যাস আছে। সুযোগ হলে, ভিন্নদেশীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে যাচাই করে নিতে চাই। আমার সাথে এক চায়নীজ বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান ষ্টুডেন্ট ছিলো, তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি মন কর না যে, ছাত্র সংসদ কনডম বিতরণ করে, সেক্সুয়াল প্রমিস্কুয়িটি প্রোমোট করছে?

আর যাই কই?

উত্তরে আমার সহপাঠীটি বললো, আর ইউ কিডিং? তুমি তো দেখে উনিশ শতকের চার্চের মতো কথা বলছো। নতুন যৌবন প্রাপ্ত ছাত্রদের যৌনতা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ। তুমি তো নিজেও এ বয়স পার করে এসেছো, তুমি তো জানোই বয়সটা কেমন। ছাত্রসংসদ কনডম দিক বা না দিক, তারা এই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে না। ছাত্র সংসদ বরং উপকারই করছে। কনডম অপরিণত বয়সে প্রেগন্যান্সি প্রতিরোধ করে, এইডস ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধ করে। এতে অন্যায়ের কি আছে।

উত্তর শুনে আমার তো 'ত্রাহি মম!' 'ত্রাহি মম' অবস্থা। ঈশ্বর রক্ষা কর, এ কোন সডম রাজ্যে এসে পড়লাম। ইন্দ্র বজ্র দাও! এই সডম রাজ্য ধ্বংস হোক। কিন্তু পুরাকালের মতো, ঈশ্বর আর সডম-সদৃশ রাজ্যগুলো ধ্বংস করতে কাউকে প্রেরণ করে না। ঈশ্বরের প্রায়োরিটি লিষ্টে, এগুলি নেই। ঈশ্বরের নির্বিকারত্বের সুযোগ নিয়ে এরা বেশ আছে!

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। প্রার্থীরা লিফলেট ছাপায়। ডিবেট করে। ছাত্রদের বাস বাড়ানো কথা বলে। অন্যান্য সুবিধার কথা বলে। আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগে, নষ্টালজিক হয়ে উঠি। কই, আমার যৌবনবেলার সেই শ্লোগনগুলো কই। আমি তো ছাত্র রাজনীতি বলতে বুঝি, শ্লোগান। বিখ্যাত সব শ্লোগান।

'জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো।' আর কত আগুন জ্বালবো আমরা?

'দিয়েছিতো রক্ত! আরো দেবো রক্ত।' আর কত রক্ত দেবো আমরা?

'রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়।' আর কত রক্ত দিলে, আমাদের দেশে অন্যায় ভেসে যাবে।

' ---র দালালেরা , হুঁশিয়ার, সাবধান!' আর কতদিন আমরা পরষ্পরকে দালাল বলে গালি দেবো।

ক'দিন পরেই হয়তো, ডাকসুর নির্বাচন হবে। প্রসিদ্ধ ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদ নির্বাচন। এই ছোট নির্বাচনটিকে ঘিরে কি রাজনীতির কলুষিত সাইমুম ঝরটি বন্ধ হবে? ছাত্ররা কি সত্যি জাতীয় প্রলয়ংকরী বিভেদের খেলা হতে বিরত থাকবে?

বাংলাদেশে এমন একটি স্থান কি আছে যেখানে , এই বিভেদটি নেই। ছাত্র , শিক্ষক, ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ , আমলা, শ্রমিক, সবখানেই যেন সবাই দুইভাগে বিভক্ত।

পুরো একটা দেশ , এমন নির্মম ভাবে বিভক্ত । মুক্তিযুদ্ধে এতো প্রাণ ঝরে গেলো। তারপরও সেই বিভেদ!

খুব খেয়াল করে দেখবেন, এই বিভেদের বীজটি কিন্তু শুরু হয়, একে বারেই শিশুকাল থেকে। জন্মমাত্রই আমরা আমাদের শিশুদের বিভেদের বিষ গেলাই। সমাজের প্রতিটি পরতে পরতে , এমনকি উপাসনালয়ে, ধর্মীয় বক্তৃতায়, শুধু বিভেদ আর অসহিষ্ণুতা খেলা করে।

ডাকসু নির্বাচনে কি এমন হতে পারে না, যেখানে প্রার্থীরা কেবল নিজেদের কথা বলবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির কথা বলবে।

এমনকি হতে পারে না, যেখানে জাতীয় বিভেদের মৃত্যুশয্যাটি এখানেই শুরু হবে।

আমার বাবার লেখা একটা কবিতা দিয়ে শেষ করি।

'কে তুমি দাঁড়াবে, পুরোভাগে।
এসো বন্ধু! ডাকো, তোমার বজ্রনাদে,
তূর্যনিনাদের গম্ভীর সুরে।
পাঁচশ' কোটি পৃথ্বী-সন্তান প্রস্তুত হয়ে আছে, যোগ দিতে
কুমেরু হতে, সুমেরু অবধি মিছিলে স্রোতে।'

বাবার বয়স হয়েছে। যৌবনে তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন, এখন আর দেখেন না। আমাদের তরুণেরা স্বপ্ন দেখা সম্পূর্ণ ভুলে যাবার আগে, আবার কি কখনো জেগে উঠবে?

স্নেহাশিস রায়


মন্তব্য

নুশান এর ছবি

সুন্দর লিখেছেন মোখলেসদা।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আশা করার কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। খুব স্বল্প ব্যতিক্রম বাদ দিলে ছাত্র রাজনীতি এখন পুরোটাই লেজুড়বৃত্তিক। ছাত্ররা এখন আর নিজেরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় না, রাজনৈতিক দলগুলোর ভুলের সমালোচনা করে না, বৈপ্লবিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় না। তারা নেতাদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে, তাদের কৃপাপ্রার্থী হয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকে। নেতা বা দল যদি তাকে বিবেক, মানবতা, নৈতিকতা, দেশের স্বার্থ ইত্যাদির বিপরীতে ভূমিকা নিতে বলে তখন সে প্রতিবাদ না করে নিষ্প্রাণ বেতালের মতো মরিয়া হয়ে সেটাই করে। রাজনীতি যখন থেকে ব্যবসায়ের আরেকটি শাখাতে পরিণত হয়েছে তখন থেকে ছাত্র রাজনীতি ব্যবসায়টির নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের সংস্থাতে পরিণত হয়েছে। চিন্তা, বিবেক, বিবেচনা, নৈতিকতা, মানবতাকে বন্ধকদেয়াদের পক্ষে ধনাত্মক কোন পরিবর্তন আনার সূচনা করা সম্ভব না।

যে নেতাটি ছাত্রাবস্থায় কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে বসে আছে তার কাছ থেকে তো বটেই, তাকে সরব বা নিরব সমর্থন দেয় যে ছাত্রটি তার পকেটে কোন টাকা না থাকলেও তার কাছ থেকেও ধনাত্মক কিছু আশা করার নেই।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ, ষষ্ঠপাণ্ডবদা। রাজনীতি হোক বা অন্যকিছু। খুব গভীরে প্রোথিত সংস্কৃতির পরিবর্তনটি ভীষণ এক দূরাশা।

আয়নামতি এর ছবি

আচ্ছা আপনার তো ডাকসুর নির্বাচিত শেষ ভিপি সুভাষ সিংহ রায়কে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, তাহলে কেন মনে প্রশ্ন জাগছে ডাকসু খায় না মাথায় দেয়? মনে হয় আমি বুঝতে ভুল করেছি।

ডাকসু'র মাধ্যমে কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয় না, বরং সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে তাদের নানান ক্যাচাল ম্যাচালে।

অতিথি লেখক এর ছবি

ডাকসু কি জিনিস, তা সবাই জানে, এমনকি গত ত্রিশ বছরে একটা নির্বাচন না হলেও। তারপরও প্রশ্নটা করার ইচ্ছেটা হয়েছিল, উত্তরটি জানার উদ্দেশে নয়। বরং ত্রিশ বছরে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন না হতে পারার আক্ষেপ থেকে।
স্নেহাশিস রায়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA