নগরী ঢাকা ৩

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ২৬/০৭/২০২০ - ৩:৪০পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ইউএন হ্যাবিটেট বা জাতিসংঘ বসতি টেকসই প্রতিবেশ পরিকল্পনার (sustainable neighbourhood planning) উদ্দেশ্যে নতুন যে কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে সেখানে নিচের পাঁচটি নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ ব’লে ঘোষণা করছে-
১. রাস্তা আর রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা : রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য মোট জমির অন্তত ৩০ শতাংশ থাকা দরকার। সেই সাথে প্রতি বর্গকিলোমিটারের জন্য কমপক্ষে ১৮ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা থাকতে হবে।
২. অধিক জনঘনত্ব: প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ১৫,০০০ মানুষ। সেই হিসাবে প্রতি হেক্টরে ১৫০ জন বা প্রতি একরে ৬১ জন।
৩. জমির মিশ্র-ব্যবহার: যে কোনো প্রতিবেশে মেঝের (floor area) মোট পরিমাণের অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থকরী কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা উচিৎ।
৪. সামাজিক সংমিশ্রণ (মিক্সের বাংলা হিসেবে সংযোগও হ’তে পারে এক্ষেত্রে): প্রতিটা প্রতিবেশে বিভিন্ন দাম আর মেয়াদের বাসার সংস্থান থাকতে হবে যেন তা নানা আয়সীমার মানুষকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনতে পারে। আবাসনের জন্য থাকা মোট মেঝের অন্তত ২০ থেকে ৫০ শতাংশ নিম্ন-আয়ের মনুষের আবাসনের জন্য (লো-কস্ট হাউজিং) রাখা উচিত। আর বিশেষ কোনো মেয়াদী-নমুনাই (টাইপ) পুরো প্রকল্পের অর্ধেক হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।
৫. জমির নির্দিষ্ট ব্যবহারের সীমা: একটা জায়গা বা প্রতিবেশকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য গ’ড়ে না তোলার জন্য; কোনো একটা উদ্দেশ্য (ফাংশন) সমাধার জন্য তৈরী করা ব্লক যেন কোনো প্রতিবেশের মোট জায়গার ১০ শতাংশের বেশি জায়গা নিয়ে না নেয়।

যেহেতু সারা পৃথিবী জুড়েই নগরীর চৌহদ্দি বাড়ছে, বলা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট মনুষ্য জনসংখ্যার অর্থেকই নগরে বাস করবে, সেই হেতু ভবিষ্যতের নগরীকে কিভাবে টেকসই হিসেবে গ’ড়ে তোলা যায় সেটা এই সময়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জাতিসংঘ বসতি এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে তারা এই বিষয়ে অনেক ধরণের গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেছে। টেকসই প্রতিবেশ বা পাড়া নিয়ে তাদের কিছু আলোচনার সাথে ঢাকার বর্তমান আর ভবিষ্যতের বেড়ে ওঠার ধরণ/ধরণগুলোকে মিলিয়ে দেখার একটা চেষ্টা এই লেখাটা।
নেইবারহুড ব’লতে পাড়া, মহল্লা বা প্রতিবেশ যা-ই বলি না কেন নগরের চরিত্র তৈরীতে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটা সময় নারিন্দা আর গ্যান্ডারিয়া মহল্লাগুলোর চরিত্র বেশ আলাদা ক’রেই সনাক্ত করতে পারতেন এর অধিবাসীরা। এখনো হয়তো মিরপুর আর ধানমন্ডির বৈশিষ্ট্যগুলোও বেশ মোটাদাগেই সনাক্ত করা যায়। এই মোটাদাগের একটা বিষয় হ’লো এই জায়গাগুলোর রাস্তাগুলো। তুলনামূলকভাবে যেমন ধানমন্ডির রাস্তাকে প্রশস্ত বলা যায়, ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেখানকার রাস্তাগুলোতে ফুটপাথের উপস্থিতি আছে, কোনো কোনো জায়গাতে রাস্তার সাথেই বড় বড় গাছের সমাবেশ আছে। আর মিরপুরের আবাসিক প্লটগুলোর সংলগ্ন রাস্তার প্রশস্ততা ২০ ফুট থেকে ২৫ ফুটের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। ফলে সেসব রাস্তাতে ফুটপাথ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেইও। অথচ মিরপুরের রাস্তাতেই পায়ে হাঁটা মানুষের ভিড় থাকে বেশি।
আবাসিক এলাকার ধরণের সাথে তাই এর রাস্তার প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভরশীল। আবাসিক প্লটের আকার আর সেখানে বাস করা অধিকাংশ মানুষের আয়সীমার উপর নির্ভর করে কোনো এলাকার আবাসনের ধরণ। যাদের আয়ের সীমা উপরের দিকে তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি থাকে। নিম্ন-আয়ের মানুষের প্রবণতা থাকে গন-পরিবহন (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট) ব্যবহারের দিকে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন আয়-সীমার মানুষের বসতি নিয়ে গ’ড়ে তোলা পাড়াগুলোর রাস্তার ধরণে আর পরিমাণে ভিন্নতা থাকাবেই। জাতিসংঘ বসতি যে অন্তত ৩০ শতাংশ জমি রাস্তার নেটওয়ার্কের জন্য বরাদ্দ রাখতে বলছে তা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের কথা মাথায় রেখেই। কিছু পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে যে বর্তমানে ঢাকা শহরের মোট জমির ৯ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য আর ৬ শতাংশ জায়গা পাকা বা পেভমেন্টের (চিপা-গলিগুলো এর অন্তর্ভুক্ত) জন্য আছে।(১) জাপানের টোকিওতে শহরের মোট জমির ১৬ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য আছে। মোটামুটি ভাবে বলা হয় বেশ কিছু উন্নত শহরে রাস্তার পরিমাণ শহরের মোটা জমির ২৫ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থাৎ জাতিসংঘ বসতি রাস্তার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে নিতে পরামর্শ দিচ্ছে। ঢাকার মতো একটা পুরোনো শহরে সেটা করা সম্ভব হবে কিনা সেটা ভেবে দেখার মতো। তবে শহরের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে যে দিকগুলোতে সেখানে রাস্তার পরিমাণ বৃদ্ধির একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। উত্তরা থার্ড-ফেইজ বা পূর্বাচলে রাস্তার পরিমাণ ২৫ শতাংশের কাছাকাছি ব’লেই দাবি করা হয়। রাজউক ব’লছে পূর্বাচলের মোট জমির ২৫.৯ শতাংশ রাস্তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।(২) এটা থেকে ধ’রে নেওয়া যায় এই এলাকাগুলো মোটামুটিভাবে উঠতি মধ্যবিত্ত্ব আর উচ্চবিত্ত্বের মানুষের আবাসন আর কাজের জায়গার প্রয়োজনকে মাথায় রেখেই করা হয়েছে।
শহরের জন-ঘনত্বের ব্যাপারে জাতিসংঘ বসতি যে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৫০০০ মানুষের থাকার কথা বলছে সেটাও হয়তো ঢাকাতে নিশ্চিত করা যাবে না। এখনই ঢাকাতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩০০০ এর উপরে মানুষ বাস করছে। দিন দিন সেই ঘনত্ব আরো বাড়ছে। আর বাড়ছে ব’লেই কমছে পড়ে থাকা জমির পরিমাণ। যেমন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা বা আফতাব নগরের ফাঁকা প্লটগুলোতে প্রতিদিনই তৈরী হচ্ছে নতুন নতুন ভবন। আবার গুলশান বা ধানমন্ডির দোতলা আর ছয়তলা ভবনগুলোর বেশির ভাগ এরই ভেতরে ১৪ তলা হ’তে শুরু করেছে। যে গতিতে এই ভবনগুলোর সংখ্যা বাড়ছে তার সাথে আনুপাতিক হারে বাড়ছে ঢাকার জন-ঘনত্ব। ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান জন-ঘনত্ব নিকট ভবিষ্যতে ঠিক কতটা টেকসই কিমবা বাসযোগ্য হবে সেটা এই মুহূর্তে বলা শক্ত। তবে ঢাকার জন-ঘনত্বের সাপেক্ষে এর ভবনগুলোর গড়পড়তা উচ্চতা যে বেশ কম, পৃথিবীর অন্য বড় শহরগুলোর অনুপাতে, তা নিশ্চিত ক’রেই বলা যায়। এ থেকে বলা যায় ঢাকার মানুষের জনপ্রতি ব্যবহৃত জায়গা বা বর্গফুটের পরিমান খুবই কম। দ্বিতীয়ত ভবনগুলো যেহেতু উচ্চতায় বেশি নয় সেহেতু তারা বেশ গায়ে গা লাগিয়ে দাড়িয়ে আছে। দুই কারণেই ঢাকার বাতাসের গুণগত মান কমছে। আবাসিক ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো ঢুকতে পারছে না। সব মিলিয়ে ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলো, সে এর উচ্চবিত্ত্বের আবাসিক এলাকাগুলোও, বসবাসের পক্ষে যথেষ্ট স্বাস্থকর থাকছে না। রেম কুলহাস কিছুদিন আগে মানুষের এত ঘন-বসতিপূর্ণ শহর তৈরীর আগ্রহকে সমালোচনা করেছেন, এই করোনা-মহামারিকে বিবেচনাতে নিয়ে। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে শহরে বসবাসের কথা ব’লে তাদেরকে একধরণের অস্বাস্থকর পরিবেশে টেনে আনা হচ্ছে ব’লে মনে করছেন তিনি।
আবার পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে নগরের সংখ্যা আর আয়তন বৃদ্ধি করা ছাড়া এত মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে ব’লেও মনে হয় না। মনে রাখা দরকার এখন মূলত বয়স্ক মানুষের সংখ্যাই বাড়তির দিকে। আর বয়স্ক মানুষের জন্য প্রয়োজন বাড়তি চিকিৎসা ব্যবস্থা। যার সংস্থান শহর ছাড়া করা সম্ভব নয়। ফলে শহর বা নগরের সংখ্যা বৃদ্ধিও একটি বাস্তবতা। এই অবস্থাতে শুধুমাত্র ঢাকাকে আয়তনে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিয়ে আগালে খুব কার্যকর ফল পাওয়া নাও যেতে পারে। ২০/২৫ বছর পরও ঢাকাকে টেকসই একটা শহর হিসেবে দেখতে চাইলে প্রয়োজন এখনই বেশ কিছু মাঝারি আকারের শহরকে বড় শহরে পরিণত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া। আমরা সুযোগ পেলেই বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলি। সেটা সম্ভবত সঠিক সমাধান নয় এই ক্ষেত্রে। ১৬ থেকে ২০ কোটির দিকে যেতে থাকা জনগোষ্ঠির নিরাপদ জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজন বহু-কেন্দ্রীকরণ। অর্থাৎ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ নগর বা কেন্দ্র তৈরী করা। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ঠিক কতগুলো বড় নগর তৈরী করা প্রয়োজন তা নিয়ে সমীক্ষা হওয়া উচিত। সচেতন ভাবে না হ’লেও সরকার হয়তো সেই দিকে যাচ্ছে ব’লে মনে হচ্ছে যদিও খানিকটা। যেমন চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট আর খুলনাতে চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরীর উদ্যোগ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি নতুন এমবিবিএস করা ডাক্তাররা শুধুমাত্র উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য ঢাকাতে থাকতে বাধ্য হন। কারণ ঢাকার বাইরে এ ধরণের কোনো সুযোগ নেই।
ঘূর্ণিঘড় সিডর আর আয়লার পর উপকূলীয় এলাকা থেকে অনেক মানুষকে কাজের খোঁজে ঢাকাতে চ’লে আসতে দেখেছি। ঢাকা এই মানুষগুলোর জন্য তখন কতটা প্রস্তুত ছিলো বলা কঠিন। কিন্তু আমাদের যদি আরো কিছু বড় শহর থাকতো তবে হয়তো দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে ঢাকার উপরে জন-ঘনত্ব বৃদ্ধির চাপটা একটু কম পড়তো। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সাথেও এর সম্পর্ক আছে।
এবার আসি জমির মিশ্র ব্যবহার প্রসঙ্গে। ঐতিহ্যগত ভাবেই আমাদের বাঙালিদের জীবনাচরণে মিশ্র-ব্যবহারের প্রবণতা আছে। এবং তা বেশ বেশি ভাবেই আছে। গ্রামের চাষী-বাড়িতে, কুমার-বাড়িতে একটা উঠান আগে থাকতই। পানাম নগর কিমবা পুরানো ঢাকার আগের বাড়িগুলোর অনেকগুলোই উঠানের উপকারিতা মেনেই তৈরী হয়েছিলো। রূপলাল হাউজে এখনো কিছু উঠান দেখা যায়। এই উঠান মিশ্র-ব্যবহারের সংস্কৃতির উদাহরণ। আমাদের পুরোনো বাড়িগুলোতে, সে গ্রামের দোচালা বা চারচালা ঘরগুলোতেও, প্রশস্ত বারান্দা থাকতো। এই বারান্দাগুলোতে দিনের নানা সময়ে নানা ধরণের কাজ করা হ’তো। ফলে ভারী আর জড়োয়া ফার্নিচার সেখানে রাখা হ’তো না বললেই চলে। তাতে সহজেই প্রয়োজন অনুযায়ী পরিসরের চরিত্রকে পাল্টে নেওয়া যেতো। দুপুরে যেখানে বসে বাড়ির লোকজন পাটি পেতে খেয়ে নিতে পারে সেখানেই হয়তো বিকালে আড্ডা বসে। বা বর্ষার সময় কাঁথা পাতা আর সেলাই করার আয়োজন হয়। ফসলের মাড়াই আর প্রক্রিয়াকরণের নানা কাজ উঠানে করা হতো। ফলে আমাদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সাথে মিশ্র-ব্যবহারের পরিচয় আছেই। এখন এটাকে শহরের সাথে সম্পৃক্ত ক’রে নেওয়া যায় কিভাবে সেটা ভেবে দেখতে হবে।
আবাসন, নাগরিক সুবিধা (সার্ভিস) আর পেশাগত কাজের জায়গাগুলোকে কিভাবে বিন্যস্ত করা যায় সেটা নিয়ে নতুন ক’রে ভাবার সময় এসেছে। ১৯২০ থেকে ১৯৭০ সময় কালে পৃথিবীব্যাপী শহরের বৃদ্ধি আর পরিকল্পনাতে যে ভাবনাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তাতে মিশ্র-ব্যবহারকে এড়ানোর প্রবণতা ছিলো প্রচণ্ডভাবে। তখনকার নতুন প্রযুক্তিগুলো একরকম বাধ্য করেছিলো সেটা করতে। ফলে অফিস পাড়া, কারখানা এলাকা, পার্ক, বাজার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আর আবাসনের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এতদিন। তাতে ব্যবহার অনুযায়ী গ’ড়ে ওঠা এক ধরণের জায়গা থেকে আর এক ধরণের জায়গাতে মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন বেড়েছে। তাতে বেড়েছে রাস্তা আর গাড়ির প্রয়োজনীয়তাও। ফলস্বরূপ অটো-মোবাইল কারখানার চাহিদা বেড়েছে। অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণাতাও বেড়েছে। সেই সাথে দূষণ আর যানজটের যন্ত্রণা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। শহর পরিকল্পনা নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা অনেকেই তাই এখন মনে করছেন অফিস পাড়া, কারখানা কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা এমনতরো স্পষ্ট ভাগ না ক’রে মিশ্র-উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়। তাতে মানুষের সময় আর অর্থেরও সাশ্রয় করা সম্ভব।
পুরোনো ঢাকাতে এখনো অনেক ভবন আছে যার নিচতলাতে ব্যবসার জয়গা আর উপরে মানুষের আবাস। কোথাও কোথাও হয়তো কারখানাও আছে। তবে সেই কারখানাগুলো নিরাপত্তার প্রশ্নে কতটা যুক্তিসংগত সেটা বিশ্লেষণ করে দেখার সময় এসেছে। মিরপুর আর মোহম্মদপুরের অনেক আবাসিক ভবনের নিচের তলাতে এ্যাম্ব্রয়ডারির ম্যাশিন দেখা যায়। এটা কতটা ঝঁকিপূর্ণ জানি না, তবে মিশ্র-ব্যবহার হিসেবে বেশ কর্যকর ব’লে মনে হয়েছে। জমির মিশ্র-ব্যবহার ভবন কেন্দ্রিক হ’তে হবে এমনও নয়। একটা বড় জমি বা ব্লক কেন্দ্রিকও হ’তে পারে। একটা বড়সড় ব্লকের জন্য প্রয়োজনীয় হাসপাতাল সুবিধা, স্কুল, বাজার আর খানিকটা অফিস এরিয়া সমন্বিত ক’রে গ’ড়ে তোলা গেলে সামগ্রিক হিসাবে শহরের মানুষের যাতায়াতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যাবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে হাউজিং বা আবাসন পরিকল্পনার তৃতীয় ফেইজে সুপার-ব্লক কেন্দ্রিক এই ধরণের মিশ্র-ব্যবহারের কিছু চেষ্টা নেওয়া হয়েছিলো, যেগুলো নাগরিক সুবিধার বিচারে খুব উপযোগী হয়েছিলো। ফলে জমির মিশ্র-ব্যবহার যে শহর পরিকল্পনাতে উপকার দিতে পারে সেটা এখন মোটামুটি জানা। কিন্তু প্রশ্ন হ’লো ঢাকা তথা বাংলাদেশে আমরা সেটা বিবেচনা করছি বা করেছি কিনা।
ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান বা উত্তরার পরিকল্পনাতে জমির মিশ্র ব্যবহারকে বিবেচনা করা হয়নি ব’ললেই চলে। কিন্তু সময়ের সাপেক্ষে প্রশস্ত রাস্তাগুলোর পাশে মিশ্র-ব্যবহারের চাহিদা তৈরী হয়েছে। মানুষ নিজের প্রয়োজনেই তা গ’ড়ে নিয়েছে। রাজউক বা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এসব ক্ষেত্রে কখনো নিরব থেকেছে, কখনো অসুবিধার সৃষ্টি করেছে আবার কখনো প্লটের ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য বিধি তৈরী করেছে, আবার সেই বিধি ব্যবহার করে নানা ধরণের সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকার প্রায় সমস্ত এলাকাতেই জমির মিশ্র-ব্যবহার গ’ড়ে উঠেছে। এমনকি ডিওএইচএসগুলোও এখন আবাসিক আর অফিস এলাকার মিশ্রণ।
প্রয়োজন এই মিশ্রণের প্রকৃতির অভিজ্ঞতা নিয়ে আগামী দিনের শহর পরিকল্পনা করা, সে যেমন ঢাকার বর্ধিত অংশে তেমনই অন্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোও যে গুলোর নতুন কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেই সাথে বর্তমানের শহরের যে নিত্য-পরিবর্তন তাতে দিক-নির্দেশনা দেওয়া।
সামাজিক সংমিশ্রণ ছাড়া কোনো শহরই সাস্টেইনেবল বা টেকসই হতে পারে না। করাইল আর মহাখালির বস্তি ছাড়া গুলশানের আবাসিক এলাকা এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে পারবে না। এই বস্তিগুলো তুলে দিলে শুগশানের আবাসিক ভবনগুলোর পরিচালন ব্যায় অনেক বেড়ে যাবে। আবার কাছের বাড্ডা আর রামপুরার মতো মধ্যবিত্ত্বের এলাকাগুলো না থাকলে গুলশানের অফিস পাড়াতে পরিণত হওয়ার সুযোগও যেতো কমে। শহরের কোনো এলাকার চরিত্র গঠন আর পরিবর্তনে এরকম নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের ভূমিকা এড়াবার নয়। আর যে শহর পরিবর্তিত হ’তে থাকে না তা এক সময় গুরুত্ব হারাতে থাকে।
শেষ যে কথাটা বলা হয়েছে সেটা হ’লো ব্যবহার মিশ্র করতে গিয়ে আবার যেত কোনো একটা বিশেষ ফাংশনকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে না ফেলা হয়, যেমনটা ঢাকার গুলশানের ক্ষেত্রে হয়েছে। আবাসিক এলাকা হিসেবে গ’ড়ে তোলা গুলশান-বনানীকে এখন ঢাকার নতুন বিজনেস-ডিস্ট্রিক্ট বা বড়বাজার হিসেবেই মনে করেন অনেকে। একসময় মতিঝিলকে যা মনে করা হ’তো।
প্রতিবেশ বা পাড়া তৈরীতে তাই অন্য ব্যবহারগুলো যেন মূল ব্যবহারের ১০ শতাংশকে পেরিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে ব’লছে জাতিসংঘ বসতি।
সূত্র :
১) http://article.sciencepublishinggroup.com/html/10.11648.j.ijtet.20160201.11.html
২) http://www.rajukdhaka.gov.bd/rajuk/projectsHome?type=purbachal
নোট: বাঁক হরফের লেখা গুলো ইংরেজি থেকে অনুবাদকৃত।
(রাজীব রহমান)


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

খেলার মাঠ বা আচ্ছাদিত স্থান দরকার। ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, পিংপং এমন খেলাগুলোর সুযোগ বাড়াতে হবে (এ খেলাগুলো অল্প জায়গার মধ্যে প্রচুর ছুটোছুটির সুযোগ দেয়, আর খেলা শেষে কোর্ট বা চারপাই তুলে জায়গাটা অন্য কাজে ব্যবহারের জন্যে ছেড়ে দেওয়া যায়)। শুধু ছোটদেরই নয়, মাঝবয়সী মানুষের জন্যেও দলগত খেলার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

অতিথি লেখক এর ছবি

পাড়া তৈরীর জন্য কমিউনিটি (বাংলা কি হবে ব'লতে পারছি না। সমাজ বলা যায় কি?) তৈরী করাটা পূর্বশর্ত। ঢাকাতে নতুন নতুন যে হাউজিং প্রকল্পগুলো হচ্ছে তাতে প্রচুর মানুষ হয়তো থাকছে, কিন্তু সেই মানুষগুলোর সমন্বয়ে সমাজ বা কমিউনিটি হয়তো হচ্ছে না। না হওয়ার একটা বড় কারণ কমন কিছু ফ্যাসিলিটি তৈরীর দিকে একেবারেই নজর না দেওয়া। খেলার মাঠ, পাঠাগার, সিনেমা বা কনসার্ট হল এই ধরণের কিছু কমন ফ্যাসিলিটি। যে শহরে বংশানুক্রমিক ভাবে বেশির ভাগ মানুষ বাস করে সেখানে কমিউনিটি তৈরীর জন্য বাড়তি আয়োজন কম থাকলেও চলে। কিন্তু নগরে কমিউনিটি তৈরীর কাজটা খুব সচেতন ভাবে করতে হয়, কারণ নগরের বেশির ভাগ মানুষ নগরের স্থায়ী/পুরোনো বাসিন্দা নন। মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ করার বাসনাটা একেবারেই আদিম একটা প্রবৃত্তি। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও নানা ভাবে কমিউনিটি গ'ড়ে তুলতে সাহায্য করে।
ঢাকাতে এখন ওয়ার্কিং কমিউনিটির বাইরে ভিন্ন কোনো ধরণের কমিউনিটি তৈরী হয় কিনা তা সার্ভে বা সমীক্ষা ছাড়া বলা কঠিন। অন্তত আমরা অনেকেই যে ওয়ার্কিং কমিউনিটি আর পারিবারিক বলয়ের ভেতরে আটকে গেছি সেটা নিশ্চিত। খেলাধুলা কেন্দ্রিক কিছু আয়োজন শীত কালে চোখে পড়ে যদিও ঢাকার কিছু কিছু এলাকাতে। তাতে সব বয়সের মানুষের অংশগ্রহন থাকে না। নারীদের তো থাকেই না।
ইনডোর গেইমসের (আবারো বাংলার জন্য হাতড়ানো!) পরিকাঠামো পাড়ার স্কুলগুলোতে সহজেই করা যায়। স্কুল চলাকালীন সময়ে যেটা শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করলো। আর বিকাল বা রাতে ব্যবহার করলো পাড়ার অন্যরা, যারা হ'তে পারে সব বয়সের, নারী পুরুষ উভয়ই।
(রাজীব)

হিমু এর ছবি

ইনডোরকে অন্দরি আর আউটডোরকে বাহিরি বলা যায় বোধহয়। অন্দরি খেলা আর বাহিরি খেলা বললে লেখা আর বলা দুটোই সহজ হয়।

মন মাঝি এর ছবি

আপনি অন্য কোনো একটা পোস্টে আমার প্রশ্নের জবাবে Interchangeable-এর একটা বাংলা প্রস্তাব করেছিলেন যা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল সে সময়ে কিন্তু এখন ভুলে গিয়েছি। সেটা কি ছিল মনে আছে??

****************************************

হিমু এর ছবি

ইন্টারচেইঞ্জেবলি বোধহয় পরস্পরবিকল্পে বলেছিলাম। দুটো জিনিস ইন্টারচেইঞ্জেবল হলে তারা পরস্পরবিকল্প

অতিথি লেখক এর ছবি

অন্দরি আর বাহিরি শব্দ দুটোই পছন্দ হ'য়েছে। খেলার সাথে যোগ করে অন্দরি/বাহিরি খেলা বা ক্রিড়া কোনোটাই কানে বাজছেও না। ধন্যবাদ।
ইনডোর, আউটডোর আর সেমি আউটডোর স্পেস শব্দবন্ধগুলো স্থাপত্যে বারবার ব্যবহার করতে হয়। স্পেস ব'লতে পরিসর একরকম গৃহীত শব্দই বলা যায়। ইনডোর-স্পেসের জন্য অন্তঃপরিসরের ব্যবহার মন্দ লাগে না। এটাকে অন্দরি-পরিসরও হয়তো বলা যাবে। তবে আউটডোর-স্পেসের জন্য বহি-পরিসর ব্যবহৃত হলেও আমার মন ঠিক সাই দেয় না। বাহিরি পরিসরেও মন ভরছে না পুরো। আবার সেমিআউটডোর তো সেমিইনডোরও। আধাবহি-পরিসর হয়তো বলা যায়। তবে এগুলোকে আরো ছোট আকারে আনতে পারলে বোধ হয় আরো ভালো হ'তো।
(রাজীব)

হিমু এর ছবি

স্থাপত্যের ভাষা যেহেতু সচরাচর গম্ভীর, অন্তস্পরিসর (ইনডোর স্পেস), বহিষ্পরিসর (আউটডোর স্পেস) আর আঙ্গণিক পরিসর (সেমি-আউটডোর স্পেস) বলা যায় কি? আমি বিসর্গ সন্ধির নিয়ম অনুসরণের পক্ষে।

আরেকটু আটপৌরে ঢঙে বলতে গেলে অন্দরি, বাহিরি, অঙ্গনি বলা যায় হয়তো (মানে, 'পরিসর' তখন না বললেও চলে)।

কিংবা অন্তরাল (ইন্টারমিডিয়েট স্পেস)-এর আদলে অন্দরাল, বহিরাল আর অঙ্গণাল বলা যায়।

আবরার এর ছবি

'পুরোনো ঢাকা' বললে কানে বাজে। পুরান-ঢাকা শুনলে মনে যে ছবি ভেসে ওঠে, সেটা 'পুরোনো ঢাকা'য় অনুপস্থিত। এর লিখিত রূপ পুরান-ঢাকাই থাকুক (ইংরেজিতেও Puraan Dhaka-র পক্ষপাতী আমি)।

অতিথি লেখক এর ছবি

আসলে ভাষায় তো ডায়ালেক্ট থাকেই। একই শব্দ একেক মানুষ একেক ভাবে উচ্চারণ করেই। পুরোনো ঢাকার লোকজনকে পুরান-ঢাকা বলতে শুনেছি। আবার বেশির ভাগ সময় পুরোনো পল্টনের উচ্চারণ শুনেছি পুরানা পল্টন। আমার কোনোটাতেই আপত্তি নেই। আবার কোনোটার প্রতি বাড়তি ঝোঁকও নেই। যত দূর মনে করতে পারছি জীবনানন্দ দাশের 'কয়েকটি লাইন' কবিতাতে তিনি 'পুরানো' আর 'পুরোনো' দুটো বানানই ব্যবহার করেছিলেন। এটা হয়তো বাংলা ভাষার এক ধরণের সৌন্দর্য।
(রাজীব)

মন মাঝি এর ছবি

আমি সম্পূর্ণ একমত। পুরোনো দিনের কথা, পুরনো বা পুরোনো গাড়ি/বাড়ি/কাঁথা/কম্বল - এইগুলির কোনোটাতেই আমার আপত্তি নাই - ইন ফ্যাক্ট আমি সেটাই বলি। কিন্তু "পুরান-ঢাকা" বা "পুরানা পল্টন" কিভাবে যেন ঢাকার অবিচ্ছেদ্য নাগরিক কালচারাল হেরিটেজ এবং সে বিষয়ে আমাদের কালেক্টিভ স্মৃতির সাথে জড়িত ও সিক্ত একটা অবিকল্প চিত্রকল্প হয়ে উঠেছে! এই শব্দ (হুবহু) বা চিত্রকল্পটা হারিয়ে ফেললে সেই হেরিটেজ ও তার ইউনিক আমেজ-মেদুর স্মৃতিটাও বোধহয় আমরা হারিয়ে ফেলব। তাই এই শব্দ/চিত্রকল্পটা স্রেফ যে কোনো একটা শব্দ নয় - বা অন্য কোনো শব্দ বা অন্য কোনো বানান বা উচ্চারণের সাথে ইন্টারচেঞ্জেবলও নয়, এই বানান ও উচ্চারণেই শব্দদু'টি নিজেরাই আমাদের একটা অবিস্মরণীয় অ-বর্জনীয় ঐতিহ্য!

****************************************

অতিথি লেখক এর ছবি

একটা সম্পূরক প্রশ্ন: যে কোনো ঐতিহ্যকে কি হেরিটেজ বলা যায়? সাধারণ অভিধান যদিও বলে উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া যে কোনো কিছুই একধরণের হরিটেজ। তবে স্থাপত্য পাঠের একাডেমিতে হেরিটেজ ব'লতে ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ বা উৎকৃষ্ট উদাহরণগুলোকে বোঝানো হয় সাধারণত। ভাষা বা কালচারের জন্যও কি তেমনটা নয়?
(রাজীব)

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।