কোন এক দিন

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ০৭/০৯/২০২০ - ১০:০৩পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

-"আমরা সাড়ে সাতটার দিকে ছাদে যাব"।
বউয়ের কথা শুনে আমি কিঞ্চিত অবাক হলাম। ছাদে আমরা যাই মাঝে মাঝে, কাপড় মেলতে কিংবা টবের গাছগুলোতে পানি দিতে, কিন্তু সেতো বিকেল বেলায়। এই সন্ধ্যায় ছাদে কেন?
-"তখন ওই জিনিসটা দেখা যাবে"।-উত্তর পেলেও ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, কোন জিনিসের কথা বলছে।
-"আজকে ভিজিবিলিটি খুব ভাল ওই সময়"।

এতক্ষনে বুঝলাম সে নিওওয়াইজ ধুমকেতুর কথা বলছে। ফেসবুকে প্রবাসী লোকজন পোস্ট দিচ্ছে, তারা ধূমকেতু দেখতে এদিক সেদিক যাচ্ছে, ব্যাপার স্যাপার দেখে সেও বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। নানান রকম অ্যাপ নামিয়ে আকাশের কোন দিকে কখন সবচেয়ে ভালভাবে সেটাকে দেখা যাবে, তাই নিয়ে বিশাল গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তার সাথে যোগ হয়েছে আমার আট বছর বয়সী পুত্র। ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ার কারনে সে অবশ্য ধূমকেতু চেনেনা, তবে কমেটের নাম শুনেছে। মায়ের দেখাদেখি সেও অনেক অ্যাপ নামিয়েছে, ভুরু কুঁচকে সেগুলোর মাহাত্ম্য বোঝার চেষ্টা করছে।

আমার অবশ্য তেমন আগ্রহ ছিলনা। দুদিন পরপরই ফেসবুক বা অনলাইন পোর্টালে-"আজ আকাশে দেখা যাবে লাল চাঁদ" জাতীয় খবর পড়ে এসব ব্যাপারে আগ্রহ কমে গেছে। তাছাড়া তখন বেশ গরম পড়েছিল, সেই সাথে সন্ধ্যায় মশার উপদ্রব তো আছেই। তবে খানিকটা কৌতুহল তো ছিলই, আর উৎসাহ জিনিসটা খানিকটা সংক্রামকও বটে, সুতরাং মাতা-পুত্রের ধূমকেতু দর্শন মিশনে আমিও যোগ দিলাম।

ছাদে উঠেই আমার বউ আকাশের দিকে মোবাইল দাগল, এদিক সেদিক ঘোরাতে ঘোরাতে যেদিকে ধূমকেতু থাকার কথা সেই দিকে মোবাইল তাক করে দেখা গেল আমাদের বাসার লাগোয়া ছয়তলা বাড়িটা। আমাদের তিনতলা বাসার ছাদে বসে সেই ছয়তলা বাড়ি ডিঙিয়ে ধূমকেতু দেখার যে কোন আশা নেই সেটা আমি সাথে সাথেই বুঝলাম। অতঃপর হাল ছেড়ে দিয়ে আমি মশা মারায় ব্যাপৃত হলাম, সেই সময়ে সেটাই বেশি ফলদায়ক কাজ বলে মনে হচ্ছিল। আমার বউ অবশ্য দমল না, সে ছাদের বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে নানান কসরত করে ধূমকেতুর সন্ধানে লেগে থাকল।

নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে নিয়ে একটা গল্প চালু আছে। সে নাকি একবার চাবি হারিয়ে ফেলে খোঁজাখুঁজি করছিল। কিন্তু যেখানে হারিয়েছে সেখানে না খুঁজে সে খুঁজছিল অন্য জায়গায়। কারন জানতে চাইলে সে বলেছিল যে যেখানে চাবি হারিয়েছে সে জায়গায় বেজায় অন্ধকার, তাই সে আলোকিত জায়গায় খুঁজছে। আমার বউ সম্ভবত হোজ্জার বংশধর,কারণ পশ্চিম দিকে ছয়তলা দালান থাকায় সে এবার পূব আকাশে মোবাইল তাক করল, যেখানে ধূমকেতুর থাকার কোন কারন নেই। একেবারে বিফলে অবশ্য যায়নি সে চেষ্টা, কারন সেদিকে তাকিয়ে খোঁজ মিলল বৃহস্পতি আর শনির, আমাদের সৌরজগতের দুই 'বড় ভাই' গ্রহের। সে সময়টাতে কেন যেন বেশ কয়েকটি গ্রহ খালি চোখেই দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু অ্যাপ না থাকলে মেয়েদের কানের দুলের ওপর বসানো পাথরের মত ঝিকিমিকি করতে থাকা বৃহস্পতি বা শনিকে খালি চোখে দেখেও চিনতে পারতাম না। দুধের স্বাদ ঘোলে (কিংবা ধূমকেতুর সাধ গ্রহে) মিটিয়ে ছাদ থেকে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম।কাষ্ঠ হাসি হেসে বউকে বললাম - " চল যাই, বেঁচে থাকলে ছয় হাজার সাতশ বছর আবার চেষ্টা করে দেখব"।

রসিকতাটা নিজের বুকেই ধাক্কামত দিল। কোনভাবেই নিওওয়াইজের সাথে আর দেখা হবার সুযোগ নেই ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল।মৃত্যুপথযাত্রী মানুষেরা ভাবে আগামী বছর, বা মাস, বা পরের দিনের সূর্যোদয় হয়ত আর দেখা হবেনা। এখানেও ব্যাপারটা তাই, সময়ের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে নিলে আমরা আসলে সবাই মৃত্যুপথযাত্রী।নিওওয়াইজকে এর আগে শেষ যেবার দেখা গিয়েছিল, তখন মু্হাম্মাদ(সা), যীশু (আ), বুদ্ধ বা কনফুসিয়াসরা জন্ম নেননি, রবীন্দ্রনাথ বা শেকসপিয়ার দূরে থাক, মহাকবি হোমারই জন্মাননি। আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট তখনও বিশ্বজয় করেননি, তার বানানো শহর আলেকজান্দ্রিয়ায় বসে হাইপেশিয়া গনিতের আলো ছড়ানো শুরু করেননি। পম্পেই তখনো ছাইচাপা পড়েনি, ক্লিওপেট্রা তখনো জুলিয়াস সিজারকে মোহাবিষ্ট করেননি,তুতানখামেন তখনো পিরামিডের ভেতরে সমাধিস্থ হননি, চীনের প্রাচীর তখনো দাঁড়ায়নি। চার হাজার আটশ বছর বেঁচে থাকা এই মুহুর্তে পৃথিবীর প্রাচীনতম গাছ 'মেথুসালেহ' এর জন্ম হতে তখনো প্রায় দুই হাজার বছর বাকি!

নিওওয়াইজের যদি চোখ থাকত বা মন থাকত, সে অবাক হয়ে ভাবত এই ছয় হাজার সাতশ বছরে মহাবিশ্বের এক কোনায় অবহেলায় পড়ে থাকা এই একরত্তি নীল গ্রহে এত কিছু হয়ে গেছে? এরই মাঝে এত উত্থান পতন, সাম্রাজ্যের ভাংগা-গড়া, এত যুদ্ধ, এত দ্রোহ, এত প্রেম, এত আখ্যান?

আবার যখন এই ধূমকেতুকে পৃথিবী থেকে দেখা যাবে, তখন আমি থাকবোনা। সেই পৃথিবীর কোন মানুষ কি তখন এমন কোন একটা লেখা লিখবে? তার পেছনের হাজার বছরের গল্পগুলো ঠিক কেমন হবে?

কেন যেন মনে হল নিশ্চয়ই হবে, এরকম কিছু একটা আবার লেখা হবে। কেউ না কেউ আবার কখনো লিখবে, কোন এক দিন!

-গগন শিরীষ


মন্তব্য

সৌখিন  এর ছবি

অসাধারণ! যেন সীমার মাঝে অসীম দেখা গেল!

গগন শিরীষ এর ছবি

পড়ার জন্য ধন্যবাদ, সৌখিন!

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

একেবারে বিফলে অবশ্য যায়নি সে চেষ্টা, কারন সেদিকে তাকিয়ে খোঁজ মিলল বৃহস্পতি আর শনির, আমাদের সৌরজগতের দুই 'বড় ভাই' গ্রহের। সে সময়টাতে কেন যেন বেশ কয়েকটি গ্রহ খালি চোখেই দেখা যাচ্ছিল

একই অবস্থা! ঠিক নব্যজ্ঞানী বরাবর ঝুলে থাকা এক চিলতে মেঘের খপ্পরে পড়ে সৌরজগতের এই ইবনে বতুতার সাথে দেখা হয় নি। আহা-ছয় হাজার সাতশ বছর! মন খারাপ

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

গগন শিরীষ এর ছবি

হাহা, নব্য জ্ঞানী নামটা ভালই দিয়েছেন ভাই! হুম, নিরন্তর আফসোস হয়ে থাকল ব্যাপারটা সাক্ষী সত্যানন্দ।

নিবিড়  এর ছবি

আগামী কিংবা অতীতের ভাবনা ভাবলে ঘোর লেগে যায়। লেখা ভালো লেগেছে।

আঘ্রাণ প্রান্তর

গগন শিরীষ এর ছবি

আসলেই তাই। আপনার নিকনেমটাও বেশ ঘোর লাগানিয়া

সোহেল ইমাম এর ছবি

আপনার লেখা দেখেই পড়িমরি করে ছুটে এসেছিলাম। একটা মোহমুগ্ধকর সময় উপহার পেলাম। অনেক ধন্যবাদ।
আচ্ছা আপনার সচল একাউন্ট আছে(আমার ধারণা আপনি হাচল না পুরোই সচল) আপনি অতিথিলেখক হিসেবে লেখা দিয়েছেন দেখে অবাক লাগলো।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

গগন শিরীষ এর ছবি

বলেন কি সোহেল ভাই, আমি তো সবসময় অতিথি লেখক হিসেবেই লেখা দেই। আমি এত অনিয়মিত যে সচল দুরে থাক হাচল হব সেটাও ভাবি নি। আমি সচল না হাচল না এখনো অতিথি লেখ, সেটা বোঝার কোন উপায় আছে?

পড়ার জন্য ধন্যবা। আর এই ব্যাপারটা জানানোর জন্য এক্সট্রা ধন্যবাদ

সোহেল ইমাম এর ছবি

হ্যাঁ আপনি অতিথি লেখক হিসেবেই বেশ কিছু লেখা দিয়ে আসছেন। কিন্তু কবে যেন দেখেছিলাম মনে হলো যে আপনার নামেই লেখাটা সচলের পাতায় দেখাচ্ছে অতিথি লেখক হিসেবে নয়। আমার ভুলও হতে পারে। তবে সে যাই হোক আপনার লেখা ভালোলাগার ব্যাপারটাতো আর পাল্টাচ্ছেনা। কলমের কালিটা শুকোতে দেবেননা আরো লেখা চাই আপনার কাছ থেকে।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

মেঘলা মানুষ এর ছবি

আমাদের অস্থায়িত্ব আসলেই আমাকে ভাবায়। একটা সেলফোন হাতে থাকলে আমরা ভাবি আমাকে সামনের বছর আরেকটা ফোন কিনতে হবে, এটাতো কয়েক বছরের বেশিটিকবে না। অথচ, পৃথিবীর পুরো টাইমলাইনে আমরা যে কী অকিঞ্চিৎকর, সেটা সবসময় আমাদের মাথায় রাখি না।

কোন প্রাচীন একটা বড় পাথর, ঝর্ণা বা খোলা সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালেই আমার মনে আসে, আমরা আসলেই কত ক্ষুদ্র!

আরও মনে হয়, ঐযে আত্মম্ভরী, হামবড়া, মাটিতে পা না পড়া যাদের যাদের জানি বা চিনি তাদেরকে যদি এরকম বিশাল কিছুর সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করতে পারতাম, "কেন করেন এত্তসব?"

ভালো থাকবেন গগন শিরীষ।
শুভেচ্ছা হাসি

গগন শিরীষ এর ছবি

সেটাই মেঘলা মানুষ। কার্ল সাগান তাঁর 'দ্যা পেইল ব্লু ডট' এরকমই কিছু দুর্দান্ত বাক্য লিখেছিলেন। আপনিও ভাল থাকবেন মেঘলা মানুষ!

অবনীল এর ছবি

আহা! ছ'তলা দালানের ছাদে দূরবিক্ষন যন্ত্রটা নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে রাখতে পারতেন। শেষের উপলব্ধিটা বেশ লাগলো ।

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

গগন শিরীষ এর ছবি

ঢাকার আলোদূষিত আকাশে টেলিস্কোপ দিয়েও কিছু দেখা যেত কিনা সেই সন্দেহ উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছেন।

হাসান এর ছবি

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা '১৪০০ সাল' মনে পড়ে গেল। যাহোক উপস্থাপনা চমৎকার করেছেন।

গগন শিরীষ এর ছবি

পড়ার জন্য ধন্যবাদ হাসান।

অতিথি লেখক এর ছবি

যখন এতোসব ভাবছি, তখন হয়তো কোনো নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে, কোথাও মহাসাগর ভরে উঠছে জলে, কোথাও আকার নিচ্ছে ভ্রূণ ছায়াপথ, কোথাও নামহীন কোনো ধুমকেতু নামহীণ কোনো নক্ষত্রমণ্ডলে মাত্র প্রবেশ করছে, আবার কোনো এক পৃথিবী থেকে নিওওয়াইজ কে দেখতে পাওয়ার বা না পাওয়ার অনুভূতি বুকে নিয়ে কেউ হয়তো আবার কিছু একটা লিখতে বসে গেছে।

গগন শিরীষ এর ছবি

সেটাই, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি? কবি পৃথিবীটাকেই বিপুল বলেছেন। পুরো মহাবিশ্বের কথা ভাবলে মোটামুটি গায়ে কাঁটা দেয়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।