ব্লগার রাজীব হত‍্যা মামলার রায়ঃ লাইভ ব্লগ

হাসিব এর ছবি
লিখেছেন হাসিব (তারিখ: বিষ্যুদ, ৩১/১২/২০১৫ - ১০:২৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রায় তিন বছর পর আজ ব্লগার রাজীব হায়দার হত‍্যা মামলার রায় হতে যাচ্ছে। এই হত‍্যাকান্ডের দায় দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে আল কায়েদা অফ ইনডিয়ান সাবকনটিনেন্টের সহযোগী সংগঠন আনসারুল্লাহ স্বীকার করে।

আল কায়েদার নেতা আয়মান আল জাওহিরি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপমহাদেশীয় আল কায়েদা প্রধান মাওলানা আসিম ওমর বলেছিলো,

আল্লাহর সাহায্যে আল-কায়েদা উপমহাদেশের ভাইয়েরা বেশ কিছু দ্বীনের উপহাসকারী এবং রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কটূক্তিকারীদেরকে জাহান্নামের পাঠিয়ে দিয়েছে। করাচীতে ডা. শাকিল ওজ এবং আনিকা নাজ (ব্লগার) আর বাংলাদেশে আহমেদ রাজীব হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যিন্দিক প্রফেসর এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেট ব্লগার আমেরকান আধিবাসী হিন্দু অভিজিৎ রায়কে আল-কায়েদা উপমহাদেরশের মুজাহিদ ভাইয়েরা মাংশ কাটা চাপাতি দিয়েই হত্যা করেছে। অত্যাধুনিক টেকনোলজির আধিকারীদেরকে আবারো এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, মুমিন ব্যক্তি তো তরবারী ছাড়াই সাহসিকতার সাথে লড়ে। আলহামদুলিল্লাহ, এইগুলো অপারেশনের ধারাবাহিকতা যা আল-কায়েদা’র বিভিন্ন শাখা মুহতারাম আমীর শাইখ আইমান আল-জাওয়াহিরী (আল্লাহ তাঁকে হেফাজত করুক) এর সাধারণ নির্দেশনা মোতাবেক এবং শাইখ উসামা বিন-লাদিন (আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন) এর শপথকে বাস্তবায়ন করার জন্য শুরু করেআনকোটছে।

রাজীব হত‍্যাকান্ড সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ফেলা হত‍্যাকান্ড। রাজীব হত‍্যাকান্ডের আগেও ব্লগার ও প্রগতিশীল আন্দোলনগুলোতে জড়িতদের উপর হামলা হয়েছে। তবে ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন শুরুতেই এই হত‍্যাকান্ড এবং এই হত‍্যাকান্ড পরবর্তী ব্লগার বিরোধী মিডিয়া প্রোপাগান্ডা বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজতে ইসলামের উত্থান ঘটায়।

সেই সময়টাতে এরকম একটা ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয় যে শাহবাগের সবাই নাস্তিক ব্লগার ও তারা তাদের নাস্তিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে আন্দোলন করছে। শীর্ষ কওমী আলেম তখন নাস্তিকদের হত‍্যা করা ওয়াজিব বলে ফতোয়া দেন। সম্ভবত এই নাস্তিক ইস‍্যুতে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কওমী মাদ্রাসা গ্রুপ (হেফাজতে ইসলাম) এবং আলিয়া মাদ্রাসা গ্রুপ (জামাত-শিবির প্রভাবিত) একসাথে রাস্তায় নামে। এবং এরা এমন একটা দলের হত‍্যাকান্ডের সমর্থনে নামে যারা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়েদার সহযোগী সংগঠন আনসারুল্লাহ টিম নামে পরিচিত। সংক্ষেপে রাজীব হত‍্যাকান্ড ও পরবর্তীতে আমার দেশ ও তার সহযোগী বুদ্ধিজীবি মহলের অব‍্যাহত প্রচারণা দার্শনিকভাবে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ও প্রভাবশালী ইসলামপন্থী দলকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভূতপূর্ব।

রাজীব হত‍্যাকান্ড স্বভাবতই চাঞ্চল‍্য সৃষ্টি করে। দ্রুত গ্রেফতার হয় হামলায় জড়িত ৫জনকে। পরে আরো দুজনকে গ্রেফতারের পর এই মামলার আসামী দাঁড়ায় ৮জন যার মধ‍্যে একজন পলাতক। রাজীব হত‍্যাকান্ডের টাইমলাইনটা এরকম,

হত‍্যাকান্ডঃ ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
১লা মার্চ, ২০১৩ — আসামী গ্রেফতারঃ ৫জন
ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ (২২) , মাকসুদুল হাসান অনিক (২৩), এহসান রেজা রুম্মান (২৩), নাঈম সিকদার ইরাদ (১৯) ও নাফিস ইমতিয়াজ (২২)।
অগাস্ট ১৪, ২০১৩ — আসামী গ্রেফতারঃ ১জন, সাদমান ইয়াসির মাহমুদ
১লা জুন, ২০১৪ — আসামী সাদমান ইয়াসির মাহমুদ ৬ মাসের জামিনে মুক্ত
১১ই জুন, ২০১৪ — আসামী সাদমান ইয়াসির মাহমুদের জামিন স্থগিত
১১ই অগাস্ট, ২০১৪ — আসামী মুফতী জসিমউদ্দিন রাহমানী গ্রেফতার
অভিযোগ গঠনঃ ২৪শে জানুয়ারি, ২০১৪
বিচার শুরুঃ ১৮ই মার্চ, ২০১৫
সাক্ষ‍্যগ্রহণ শুরুঃ ২১শে এপ্রিল ২০১৫
দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে মামলা হস্তান্তরঃ ১১ই মে, ২০১৫
সংশোধিত অভিযোগঃ ২১শে মে, ২০১৫
সাক্ষ‍্যগ্রহণ শেষঃ ২১শে ডিসেম্বর, ২০১৫
আত্মপক্ষ সমর্থনের জন‍্য জিজ্ঞাসাবাদঃ ২২শে ডিসেম্বর, ২০১৫
রায়ঃ ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৫

মামলার আসামী ও তাদের বিপক্ষে আনীত অভিযোগ আনা হয়েছে দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারাতে। শুধুমাত্র জসিমউদ্দিন রাহমানির বিরুদ্ধে ৩৪ ধারার পরিবর্তে ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আটক ও গ্রেফতারঃ সর্বমোট ৭ জন। একজন পলাতক।

  • সাদমান ইয়াসির মাহমুদ (দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারা)
  • আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতী মোঃ জসীমউদ্দিন রাহমানী (দন্ডবিধির ৩০২ ও ১০৯ ধারা)
  • ফয়সাল বিন নাঈম দীপ (দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারা)
  • এহসান রেজা রুম্মান (দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারা)
  • মাকসুদুল হাসান অনিক (দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারা)
  • নাঈম ইরাদ (দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারা)
  • নাফিজ ইমতিয়াজ (দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারা)
  • রেদোয়ানুল আজাদ রানা (পলাতক) (দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারা)

আসামীদের মধ‍্যে সাদমান ছাড়া গ্রেফতারকৃত বাকি সবাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষ মামলা সাজাতে ৫৫জন সাক্ষী প্রস্তাব করে যাদের মধ‍্যে আদালত ৩৪ জনের সাক্ষ‍্য নিয়েছে। সর্বশেষ ২২ ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে আসামী পক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের মাধ‍্যমে বিচারকাজ শেষ করে আজ ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে রায়ের দিন ধার্য করা হয়েছে।

সচলায়তনের একজন প্রতিনিধি এই মুহুর্তে আদালত প্রাঙ্গনে রয়েছেন। তিনি আমাদের লাইভ আপডেট জানাবেন।

আপডেটসমূহঃ

দুপুর ১৩৩০ — রাজীব হায়দারের বাবা এই রায় প্রত‍্যাখ‍্যান করেছেন এবং বিচারকে প্রভাবিত করা হয়েছে এমনটা বলেছেন। তিনি হত‍্যাকান্ডের জন‍্য জামাত-শিবিরকে দায়ি করেছেন। (ভিডিও সংযুক্ত হবে)

দুপুর ১৩০০ — (ভিডিও সংযুক্ত হবে)
২ জনের (দীপ এবং রানা) ফাঁসির আদেশ ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা।
অনিককে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা।
রুম্মান, নাফিজ ইমতিয়াজ, নাইম ইরাদ — ১০ বছরের কারাদন্ড
মুফতী রাহমানী ৫ বছর সশ্রম কারাদন্ড।
সাদমানের ৩ বছরের কারাদন্ড যা ইতিমধ‍্যে সে ভোগ করেছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ তদন্তকার্য ও অভিযোগ সাজাতে দক্ষতার পরিচয় দেয়া হয়নি।

আসামী পক্ষের আইনজীবির বক্তব‍্য

দুপুর ১২৩০ — কোর্ট হাজত থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বন্দীদের। কিছুক্ষণের মধ‍্যে রায় শুরু হবে।

সকাল ০৯৩০ — প্রিজন ভ‍্যান থেকে আদালতের প্রিজন সেলে স্থানান্তর

সকাল ০৯০৫ — আদালত চত্বরে প্রিজন ভ‍্যানের প্রবেশ। পুলিশি প্রহরা প্রস্তুত


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

এই রায়ে একজন ব্লগার হিসেবে আমি হতাশ। ব্লগার খুনের উসকানিদাতার ৫ বছরের আরামদণ্ড প্রকৃতপক্ষে দেশের চিন্তাশীল মানুষদের খুন হওয়ার রাস্তা চওড়া করবে।

হাসিব এর ছবি

আমার কাছে মনে হয়েছে এই কেইস কম্প্রোমাইজড। এই কম্প্রোমাইজ কেইস সাজানোতে দুর্বলতা দেখে আন্দাজ করা যায়। যে সাদমান ৩ বছরের আরামদন্ড পেল সে খুনের স্বীকারোক্তি দেবার পরও জামিন পেয়েছিলো। সেই জামিন ১১ দিন পর হাইকোর্টে স্থগিত হয়। এই সাদমান এরকম স্পেশাল ট্রিটমেন্ট কেন পায় সেটা বুঝতে আইনস্টাইন হবার দরকার নেই।

ইয়ামেন এর ছবি

রায় পড়ার সময় বিচারক যখন ব্লগারদের তাদের লেখালেখির জন্য 'বকে' দেন, তখন সেটা থেকে কি বিচারকের ব্লগারদের প্রতি একটা প্রিকনসিভড বায়াস প্রকাশ পায় না? আর বায়াসড বিচারকের দেয়া রায় কিভাবে গ্রহনযোগ্য হয়?

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

হাসিব এর ছবি

দুই পক্ষকে থামানোর জন‍্য দুইজনের দোষ দেখিয়ে জিনিসপাতি ইক‍্যুয়েট করার একটা প্রবণতা আছে। উদা ১,

একাত্তরে পাকিস্তানিরা বাঙ্গালি মেরেছে, মুক্তিযোদ্ধারাও বিহারী মেরেছে। তাহলে বলেন কে ভালো!

বিচারপতি সাঈদও এরকম দুপক্ষকেই বকে দিয়ে ব‍্যালেন্স ঠিক রাখার চেষ্টা করেছেন। আলু পেপার থেকে কোট করি,

ব্লগারদের উদ্দেশে বিচারক বলেন, ‘শুনেছি, ব্লগারদের অনেকেই এমন লেখা প্রকাশ করেন, যা কেউ পড়লে তাঁদের খুন করতে উৎসাহিত হয়। এ ধরনের লেখা থেকে অবশ্যই ব্লগারদের বিরত থাকতে হবে। আবার সামান্য কারণে মানুষ খুন করার মতো ঘটনাও আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এখনকার কিছু কিছু যুবক বিপথগামী হচ্ছে, এটিও ভাবনার বিষয়।’

ইয়ামেন এর ছবি

সেটাই। মেয়েটা ধর্ষিত হয়েছে খুবই খারাপ কথা, কিন্তু তার কাপড়চোপড়ও ঠিক ছিল না মার্কা কথাবার্তা। আমার কাছে রায়ের চেয়ে বিচারকের এহেন বক্তব্যগুলো থেকে আরও বেশী হতাশ লেগেছে। কারন এ থেকে বিচারক সাহেবের নিজের এটিচিউডটা স্পষ্ট।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সব বেদনা মুছে যাক স্থিরতায়
হৃদয় ভরে যাক অস্তিত্বের আনন্দে...

মাহবুব লীলেন এর ছবি

মূল হোতারে আরামদণ্ড দিয়া কার্যক্রম চালাইয়া যাইবার সুযোগ দিয়া ব্লগারগো বইকা দেওয়া মানে কী?
মানে হইল- সিধা হইয়া যাও। নাইলে তিনারা কিন্তু বাইচা থাকলে ভবিষ্যতে তোমাগো সিধা করার লাইগা

০২
আপিলের পর এই রায়গুলার কতটা টিকব? আদালতে তো এইটাও বলা হইছে যে যথেষ্ট সাক্ষী প্রমাণ জোগাড় করতে পারে নাই পুলিশ

হাসিব এর ছবি

বকে দেবার মানে হলো যে খুন হইছে তারও কাপড়চোপড় ঠিক ছিল না এইটা মনে করায় দেয়া। আর আপিলের মাধ‍্যমে আরও আরামের সূচনা হবে এইটা আশা করা যায়।

অতিথি লেখক এর ছবি

আপিলের পর এই রায়গুলার কতটা টিকব? আদালতে তো এইটাও বলা হইছে যে যথেষ্ট সাক্ষী প্রমাণ জোগাড় করতে পারে নাই পুলিশ

- এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। নিম্ন আদালতের রায় দেখে উৎফুল্ল হবার কিছু নেই। কেস দুর্বলভাবে গঠিত হলে, সাক্ষ্য-প্রমাণ অপর্যাপ্ত হলে নিম্ন আদালতে দেয়া অনেকের আরামদণ্ড উচ্চ আদালতে বেকসুর খালাসে পরিণত হয়। এই কেসেও সেটা হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। এই মামলার গঠন ও তদন্তসংশ্লিষ্ট যারা ছিলেন তারা রাজীব, রাজীবের লেখালেখি এবং হত্যাকাণ্ডকে কীভাবে দেখেন সেটা জানতে পারলে ইন্টারেস্টিং তথ্য বের হয়ে আসতো মনে হয়।

রানা মেহের এর ছবি

হাসিব ভাই, এই কেইস কম্প্রোমাইজড কোন অর্থে?
রাহমানির রায় এর থেকে বেশি আর কিছু হতে পারতো কি?

তবে কেইস সাজানোর দুর্বলতাটা চিন্তা করার মতো। দেখা যাক আপিলের রাইয়ে কী দাঁড়ায়।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA