উদ্ধারকাজে নিজস্ব প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবন আশু প্রয়োজন

হিমু এর ছবি
লিখেছেন হিমু (তারিখ: শুক্র, ০৩/০৫/২০১৩ - ৬:১৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনা আমাদের মনে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে রেখে গেলেও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী আর কেমন হবে, তা নিয়ে এখনই নীতিনির্ধারকদের জরুরি ভিত্তিতে হোমওয়ার্ক করা প্রয়োজন। আর এ ব্যাপারে উদ্ধারকাজে জড়িত পেশাদার ও স্বেচ্ছাসেবীদের ডেকে একটি গণশুনানি করা হলে তারা উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা আর অভাবের মুখোমুখি হয়েছেন, সেগুলোও সমন্বিত হবে।

রানা প্লাজা ধ্বস নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে, এবং অতীতের আর সব প্রতিবেদনের মতোই সেগুলোর ওপর ধূলোর স্তর পুরু হবে। যেহেতু এই গোটা ঘটনাটিই ঘটেছে কর্তৃপক্ষীয় গাফিলতি আর দুর্নীতির কারণে, এই একই কর্তৃপক্ষকে তাই আর জনচক্ষুর অন্তরালে কোনো নীতি নির্ধারণের সুযোগ দেওয়ার কোনো অর্থ নেই। কী করা হবে সামনে, তা সারা বাংলাদেশের মানুষকে দফায় দফায় জানিয়ে স্থির করতে হবে।

উদ্ধার কার্যক্রমে প্রযুক্তি ও কৌশলের অভাব বা যথাযথ প্রয়োগের অভাব আমরা একাধিকবার প্রত্যক্ষ করেছি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিছু ভুল ঘটবে না, এমন প্রত্যাশাও করা উচিত নয়। কিন্তু সেসব ত্রুটি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতের প্রয়োগে সেগুলোর অনুপস্থিতি নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

কিছু বিষয় আমার নজরে এসেছে বলে সেগুলোকে উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি। আমি নিশ্চিত, পাঠকও এমন আরো অনেক কিছু লক্ষ্য করেছেন, যা ‌এক জায়গায় তালিকাবদ্ধ হওয়া জরুরি। মন্তব্যের মাঠে অনুগ্রহ করে আপনার পর্যবেক্ষণ যোগ করুন।

১. একটি গার্মেন্টস কারখানায় বিপদজনক একাধিক যন্ত্র চলমান থাকে। জেনারেটর আর বয়লারের মতো ভারি, তাপোৎপাদী যন্ত্রের পাশাপাশি সেখানে থাকে গরম পানির পাইপ, স্টিম পাইপ, এবং গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে অসংখ্য সহজদাহ্য কাপড়। তাই চলমান অবস্থায় একটি কারখানা ভবন ধ্বসে পড়লে তার ভেতরে অগ্নিকাণ্ডের সমূহ রসদ মজুদ থাকে, যা আক্রান্ত ও উদ্ধারকর্মীদের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধ্বংসস্তুপের ভেতরে শতভাগ বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাম্প করা হলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বাড়ে, যেহেতু অক্সিজেন দহনে সহায়তা করে। একবার আগুন লেগে গেলে ধ্বংসস্তুপের ভেতরে বিভিন্ন পকেটে সঞ্চিত সামান্য অক্সিজেনও আগুনের কবলে পড়ে নিঃশেষিত হয়ে যাবে, এবং আক্রান্তরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাবেন ৪ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে। স্বল্প অক্সিজেনবহ পরিবেশে দহনের কারণে উৎপন্ন কার্বন মনোক্সাইডও আটক ব্যক্তিদের মৃত্যু ত্বরান্বিত করবে। এরকম পরিস্থিতিতে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাম্প না করে ব্লোয়ারের সাহায্যে বাইরে থেকে বাতাস এয়ার ফিল্টারের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করে ভেতরে পাম্প করা যেতে পারে। পাম্প করার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, ব্লোয়ারের ডেলিভারি প্রেশারটি যেন খুব বেশি না হয়, অন্যথায় ভেতরে ধ্বংসস্তুপে জমা হওয়া সব ধূলা উড়তে শুরু করবে।

২. ভেতরে আটকদের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তি এই মুহূর্তে আমাদের উদ্ধারকর্মীদের হাতে নেই। তারা যেভাবে কাজ করেছেন, তা হচ্ছে নিজেরা যতদূর পর্যন্ত ঢুকতে পেরেছেন, ঢুকে চিৎকার করে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছেন। যারা সাড়া দিতে পেরেছেন তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর চেষ্টা করে প্রাণ রক্ষার কাজ করেছেন। কিন্তু প্রক্রিয়াটি যেহেতু মন্থর, এবং আহতরা সবসময় উদ্ধারকর্মীদের মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট জোরে শব্দ করতে পারেন না, তাই এ ব্যাপারে প্রযুক্তি ও কৌশলের সাহায্য নেওয়া জরুরি। আর এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে আসতে পারে।

মানুষের শরীরের তাপ দূর থেকে শনাক্ত করা সম্ভব, কিন্তু ধ্বসে পড়া ভবনে প্রচুর তাপবাহী উপকরণ থাকায় এবং দিনের বেলা কংক্রিটও তাপ সঞ্চয় করে বলে সঠিকভাবে এই প্রযুক্তি কাজে লাগানো একটু কঠিন। তা ছাড়া হিট সিগনেচার স্ক্যানার বেশ ব্যয়বহুল। তারপরও স্বল্প ব্যয়ে যদি হিট সিগনেচার স্ক্যানার নির্মাণ করার একটি অ্যাসাইনমেন্ট বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাঝে বন্টন করা যেতে পারে।

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে প্যাসিভ ট্র্যান্সপন্ডারবিশিষ্ট আরএফআইডি চিপ ব্যাজ আকারে গার্মেন্টস কর্মীদের পোশাকের সাথে পরিধান করা। এটি তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা, এবং উদ্ধারকর্মীদের হাতে আরএফআইডি রিডার থাকলে তারা আশেপাশে কয়েক মিটারের মধ্যে আটকে পড়া কর্মীদের (জীবিত বা মৃত) অবস্থান শনাক্ত করতে পারবেন। এই পদ্ধতির মুশকিল হচ্ছে, এটি আহত আর নিহতের মাঝে পার্থক্য করতে পারবে না, আর কংক্রিটের স্তুপের কারণে এর স্বল্প মাত্রার তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ বেশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে।

তৃতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে, প্রত্যেক গার্মেন্টস কর্মীকে নিজের সাথে একটি হুইসল রাখতে বলা। আটকে পড়লে তারা ক্রমাগত চিৎকার না করে কিছুক্ষণ পর পর হুইসল বাজাতে পারেন। সেই সাথে এ ধরনের হুইসলের শব্দ ও রেঞ্জ শনাক্ত করার জন্যে একটি স্বল্প ব্যয়সাপেক্ষ শনাক্তকরণ যন্ত্রের প্রোটোটাইপ তৈরি করার জন্যে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চিন্তা করে দেখতে পারে।

সরকার যদি এ ব্যাপারে গবেষণার জন্যে কিছু অর্থ বরাদ্দ করে, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে প্রাণহানি আরও কমানো সম্ভব হবে।


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

আমি চিন্তা করছিলাম, প্রতিটা শ্রমিকের ওয়ার্ক স্টেশনে একটা বেসিক ইমার্জেন্সি ব্যাগ রাখার কথা- বেশি কিছু না, একটা পানির বোতল, একটা টর্চ (এক ব্যটারির ছোট টর্চ), কয়েকটা ব্যটারি, একটা কাপড়ের নোজ মাস্ক। সব মিলিয়ে খরচ প্রতি শ্রমিকের জন্য বড়জোর ৩৫-৪০ টাকার মত পড়বে।
ছোট টর্চ এর মাধ্যমে আলোর সিগনাল দেয়া সম্ভব মনে হয়।

আরেকটা বিষয়- আগুন লাগার ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় মেইন গেট বন্ধ রেখে দেয়ার ব্যপারটা। এই ক্ষেত্রে সরকার বা নীতি নির্ধারকরা কী প্রতি ফ্লোরে একটা গ্রীল-কাটার রাখার বিষয়টা বিবেচনা করতে পারেন?

ফায়ার ব্রিগেড বা ফায়ার ডিফেন্স সার্ভিসকে নাগরিক উদ্যোগে কোন রকম সাহায্য (ইন্সট্রুমেন্ট কিনে দেয়া, ইমার্জেন্সি ইকুইপমেন্ট এর ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ) করার উপায় থাকলে সম্মিলিত ভাবে প্রচেষ্টা করা যেতে পারে। দুর্ঘটনা ঘটলে কিন্তু এই বাহিনীই আমাদের ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।

মিডিয়ার মাধ্যমে হোক আর প্রত্যাক্ষভাবেই হোক, এখন থেকে কিছু মৌলিক ইমার্জেন্সি সারভাইভাল কৌশল এবং উদ্ধার কৌশল সবার কাছে জানিয়ে দেয়া হোক।

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

হিমু, এ সবের কিছুই হবে না। সরকার, প্রশাসন, রাজনীতিবিদদের আরো অনেক অনেক জরূরী কাজ আছে।

এই দুর্ঘটনার পরে আমার অফিসের একজন সহকর্মী বলছিল, তার এই সেক্টরে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। সে বলছিল, এই ধরনের ফ্যাক্টরীতে যে সব মেশিন কাজ করে তা খুব ভারী হয়। কাজেই ভবনগুলো যেন শক্ত ভিতের ওপর ও বেশী তলা না বানানো হয়। এ রকম অনেক স্ট্যান্ডার্ড মেনে ভবন নির্মান করা উচিত। কী হবে বলুন? প্রথমে শুনেছিলাম বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছিল রানা প্লাজার জমি। পরেতো শুনলাম তাও না। গার্মেন্টসের জুট ফেলে ভরাট করা হয়েছিল। খোদ প্রধানমন্ত্রীই যদি বলে দেন বাংলাদেশের সিংহভাগ কারখানা ভবনেরই কোন সেফটি কোড মানা হয় না,তাহলে আর আশা কোথায়। আল্লাহর মাল আল্লাহয় নিবে, কার কী করার আছে?

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

নৈর্ব্যক্তিক এর ছবি

ধ্বংসস্তুপের ভেতরে জীবিতদের জন্য বাতাস সরবরাহের বিষয়টা ভালো করে ভাবা উচিত্‍। এক্ষেত্রে অক্সিজেন সিলিন্ডার কতখানি নিরাপদ?

সাভারে ২০০ শয্যার ""পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রবলসহ"" একটি হাসপাতাল সরকারি(বা যৌথ) উদ্যোগে তৈরি করে দেয়া উচিত্‍। প্রতিবার কোন বেসরকারি হাসপাতাল ঝাঁপিয়ে পড়বে এ আশায় থাকা বোকামি। সুদিনে এ হাসপাতাল শ্রমিকদের সাধারণ ২য় স্তরের হাসপাতালের মতোই রুটিন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাবে। দুর্যোগকালীন এটি প্রধান চিকিত্‍সাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

এতে সীমিত পরিসরে আইসিইউ/এইচডিইউ রাখা যায়(একটু বেশি চাওয়া হয়ে গেল যদিও, তবে এটি ছাড়া হলেও হোক)। এ হাসপাতালের প্রধান ফোকাস হবে অর্থোপেডিক ও বার্ন ইউনিট।এ দুটি বিভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতেই হবে। স্বল্পকালীন স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ সুবিধা ও মান যোগ করা গেলে উদ্যোগ আরও ফলপ্রসূ হবে।

আমাদের আরেকটা সমস্যা হল জায়গামত প্যারামেডিকের অভাব। আদতে আপদকালীন চিকিত্‍সার অনেক পরের অংশে গ্র্যাজুয়েট চিকিত্‍সক দরকার হয়। তাই ফিল্ডে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্যারামেডিক খুব দরকার। এক্ষেত্রে এ বিষয়ে বর্তমান চিকিত্‍সা সহকারী, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী ও সিএইচসিপিদের জোরদার প্রশিক্ষণ দেয়া যায়। হাসপাতালটি এদের আঞ্চলিক ট্রেনিং সেন্টার হিসেবেও থাকতে পারে।

হাসপাতালের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সকলে আপদকালীন চিকিত্‍সা সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান এবং সুবিন্যস্তভাবে গ্রুপওয়ার্ক করার পেশাদারিত্ব অর্জন করবেন।বিশেষ প্রকল্প না, হাসপাতালের রুটিন কাজই হবে প্রতি তিন মাসে এই শিক্ষা ঝালাই করে নেয়া। আবেগ বা হুজুগ না, সঠিক সুবিন্যস্ত গ্রুপওয়ার্কের অভাবই দেখা যায় বেশি।

হাসপাতালটির সেকেন্ড লাইন ডিফেন্স হিসেবে একটি ৩য় স্তরের হাসপাতালকে ট্যাগ করে দেয়া যায়। এটি ঢামেকহাই থাকবে নাকি সোহরাওয়ার্দি মেকহা হবে তা ভেবে দেখা দরকার।

স্বাভাবিক/দুর্যোগ কালে শ্রমিকদের সরকারি সরবরাহের বাইরের যাবতীয় চিকিত্‍সাব্যয় শিল্পমালিকরা মেটাতে দায়বদ্ধ থাকবেন। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ে প্রতি শ্রমিকের হেলথ অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে মালিকদের টেকাটুকা রাখার ব্যবস্থা থাকা উচিত্‍। পর্যুদস্ত শ্রমিকদের মনোবলও এতে বাড়বে।

রাজীব রহমান এর ছবি

দুর্ঘটনার রকমফের তো অনেক। সে তুলনায় আমাদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা তেমন একটা না। তারা যে ধরণের গাড়ি ব্যবহার করে তার সবগুলো আমাদের সব রাস্তাতে ঢুকতেই পারে না। আমাদের রাস্তার সাথে হাইড্রেন্টের ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। বিল্ডিঙের ভেতরে রাইজার ব্যবহার ব্যায় সাপেক্ষ। এই অবস্থায় দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য আমাদের নিজেদের কিছু উদ্ভাবনা আসলেই খুব দরকার। আর সেগুলো হওয়া দরকার স্বল্প মূল্যের আর সহজে ব্যবহার করার মত।

আমাদের শহরগুলো নিয়ে পরিকল্পনা করা দরকার। এত কাছাকাছি একটার পর একটা বিল্ডিং আমরা বানিয়ে রাখছি যে তার কোন একটাতে বিপর্যয় নেমে আসলে তাতে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করার মত জায়গাই পাওয়া যায় না। ফলে উদ্ধার কাজের জন্য লেগে যায় বেশ দীর্ঘ সময়। তাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যায় বেড়ে। আর বিল্ডিং কোড দরকার পুরো দেশের জন্য। দরকার তা বাস্তবায়নের জন্য একটা কার্যকর অথরিটি। তা না হলে বিল্ডিং বিপর্যয় কমানো যাবে না।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনটা যদি পুরাপুরি কম্পানি নির্ভর করা যেত তাহলে বোধহয় ভাল হতো। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি ডিভেলপার দের থেকে নিজস্ব মালিকরা কোড অগ্রাহ্য করতে বেশি আগ্রহী। কোন কম্পানির বিল্ডিঙে যদি কোন সমস্যা দেখা দেয় তাহলে তাদের ব্যবসা বাতিল করে দেয়া যেতে পারে। তাতে কম্পানির স্বার্থেই ন্যুনতম মান বজায় রাখার প্রয়োজন দেখা দেবে। রাষ্ট্রের পক্ষেও সহজ হয়ে যাবে মনিটরিঙের ব্যাপারটা। কিন্তু তাতে খরচ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হবে খানিকটা। আর তাই এই ব্যাপারগুলো নিয়ে বিস্তৃতভাবে ভাবার সময় এসেছে এখন।

ভাল পোস্ট। ধন্যবাদ হিমু।

মরুদ্যান এর ছবি

সবার আগে দরকার সদিচ্ছা, তারপর রাস্তা একটা না একটা বের হবেই।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে

ছাইপাঁশ  এর ছবি

খুব ভালো একটি পোস্ট। কিছুদিন ধরে একই রকম ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। নিjজ প্রযুক্তি উদ্ভাবিত না হলে সব সময় হায় হুতাস করেই কাটাতে হবে আমাদের। প্রফিট অরিয়েন্টেড না এমন মানব হিতৈষী প্রযুক্তি বিদেশ থেকে কিনে এনে শুধু বিপদ সংকুল মানুষ বাচানোর জন্যে ব্যবহার করার মত আর্থিক এবং মানবিক উদার্য আমাদের নীতি নির্ধারকরা এখনো অর্জন করতে পারে নাই। তাই বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ফাইনাল ইয়ারের প্রজেক্টএর বিষয় ঠিক করার সময় এধরনের উদ্ধার কাজ এবং বিপর্যয় গুলো হবার আগেই অগ্রিম ডিটেকশনের জন্যে সহজলভ্য কোনো প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা হতে পারে।

কিছুদিন আগে অসলো ইউনিভার্সিটির রিসার্চ পার্কে এর ইনোভেশন সেন্টারে দেখেছি। একধরনের ব্রেসলেট যেগুলো সাধারণত উদ্ধার কর্মীদের হাতে পরানো থাকে। উদ্ধার কাজ করতে গিয়ে কেউ যদি কোথায় আটকা পরে যায় বা অক্সিজেনের অভাবে অজ্ঞান হয়ে যায় তাহলে ব্রেসলেটটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে বাইরে থাকা সিগনাল ডেটেকটার এ সিগনাল পাঠিয়ে অবস্থান জানান দেয়। আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এধরনের ব্রেসলেট উদ্ভাবনের চেষ্টা করে দেখতে পারে।

ফাইনাল ইয়ারের একটা প্রজেক্ট থেকে যদি পরবর্তীতে পিপীলিকার মত একটা সার্চ ইঞ্জিন বানানো সম্ভব হয়। তাহলে আগ্রহ নিয়ে কাজ করলে ঠিক মত ফান্ডিং পেলে এধরনের কোনো কিছু আবিস্কার করাও অসম্ভব হবে না বলে মনে করি।

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

গুরুত্বপূর্ণ কারিগরী লেখা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কি এগুলো পড়ে দেখবেন? আমি অনুরোধ রাখবো পাঠকদের মাঝে যাদের পক্ষে সম্ভব এই লেখাটা নীতিনির্ধারনী মহলের সাথে শেয়ার করার। গতকাল আমাদের অফিসের DIPECHO ম্যানেজারের সাথে কথা হচ্ছিলো- সাভার ট্র্যাজেডির উপর কিছু কাজের ব্যাপারে। হিমু অনুমতি দিলে আমি এই লেখাটার একটা ইংরেজি তর্জমার চেস্টা করে দেখতে পারি এবং সেটা DIPECHO ৭ম ফেজের ম্যানেজমেন্টের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। ওদের পক্ষে সুযোগ আছে বিষয়টি সরকার এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের গোচরে আনার। প্লাস, DIPECHO ৭ম ফেজের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর সাথে পেশাগত জানাশোনা আছে- কিছু বললে গুরুত্ব দেবে।

দ্বিতীয়ত- উদ্ধারকাজের জন্য মানব্দম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টাও খুবই জরুরী। প্রতিটি কারখানায় নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক কর্মীকে উদ্ধারকাজের বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জনের জন্য দীপু (আমিনুল কাওসার, নিচের ছবিতে, দেশের অন্যতম প্রধান উদ্ধার ব্যাক্তিত্ব। সাভারে উদ্ধারকাজের শেষ মুহুর্ত পর্যন্তু সক্রিয় ছিলেন) ভাইয়ের মতো মানুষের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে যাতে দুর্ঘটনার ঘটার সাথে সাথে বাইরের সাহায্য আসার আগেই তারাই প্রাথমিক উদ্ধারকাজ শুরু করে দিতে পারে।

NARRI বাংলাদেশের (National Alliance for Risk Reduction and Response Initiatives, Bangladesh) ফেসবুক পেইজে এই লেখাটি শেয়ার দিলাম। এই পেইজে DIPECHO-র কর্তারা সবাই মেম্বার।

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

হিমু এর ছবি
স্যাম এর ছবি

চলুক চলুক
এ ব্যাপারে উদ্ধারকাজে জড়িত পেশাদার ও স্বেচ্ছাসেবীদের ডেকে একটি গণশুনানি করা হলে তারা উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা আর অভাবের মুখোমুখি হয়েছেন, সেগুলোও সমন্বিত হবে। -
গণশুনানি দিয়েই শুরু হোক।

ইশতিয়াক রউফ এর ছবি

দরকারি লেখা। আমার দুই পয়সা যোগ করি (বিভিন্ন কথোপকথনে বিভিন্ন জনের মাথা থেকে বের হওয়া)।

১/ প্রস্তুতির সময় আমরা যেন "সাভারে কী কী কাজ আরও সুচারু ভাবে করা যেতো?" প্রশ্নে মশগুল না থাকি। ঢাকা শহরে মাঝারি মাপের একটা ভূমিকম্প হলে সাভারের সহস্রগুণ ক্ষয়ক্ষতি হবে। আমরা সেই পরিস্থিতির জন্য কতটা প্রস্তুত? সাভারে নেই-নেই করেও যেটুকু পাওয়া গেছে সেই সাহায্য তখন হাতের কাছে থাকবে না।

২/ বিপর্যয়ের মুহূর্তে activate করার মতো একটি বড়-সড় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রয়োজন। হাজার হাজার মানুষ একই জিনিসের পিছনে না ছুঁটে কীভাবে সবার মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া যায় সেই রকম একটা কিছু তৈরি করা কম্পুকৌশলের ছাত্রদের জন্য মামুলি ব্যাপার।

৩/ বিপর্যয়কালীন নেতৃত্বের জন্য একটি কাঠামো আনুষ্ঠানিক ভাবে স্থির করে রাখতে হবে। সাভারের দুর্ঘটনার সময় দুর্যোগব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব উভয়েই অনুপস্থিত ছিলেন। ভবিষ্যতে এই রকম ব্যাপারে কিছু প্রোটোকল থাকা উচিত।

৪/ সেই প্রোটোকলেরই অংশ হিসাবে প্রতি ১০-১৫ বর্গকিলোমিটারে জরুরী ত্রাণকার্যে প্রয়োজনীয় কী কী উপাদান আছে তার একটি তালিকা থাকা প্রয়োজন। দেশব্যাপী সেলুলার সার্ভিসের যুগে সেগুলো track করা কষ্টের ব্যাপার না। এই ক্ষেত্রেও কিছু ছাত্র খুব সহজেই একটি সমাধান তৈরি করে দিতে পারে।

৫/ ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। সাহায্যের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার, ইত্যাদিতে সাম্প্রতিক সময়ে খুবই তড়িৎ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষাটুকু যেন tribal থেকে না যায়। দেশের প্রতিটি কোণায় এটা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরী। পাশাপাশি এটাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত যে ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনায় মোবাইল সার্ভিসও বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কেও কিছু মডেল এখনই তৈরি করার সময় এসেছে।

৬/ ঘুর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে যেমন আগাম সংকেত দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি মানবিক বিপর্যয়ের জন্যও একটি মাত্রা থাকা উচিত। কোন মাত্রার বিপর্যয়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কত উঁচু পর্যায় থেকে নেতৃত্ব দেওয়া হবে, ইত্যাদি নির্দিষ্ট করা থাকে। বাংলাদেশে কোনটা গণ্ডগোল এবং কোনটা জরুরী অবস্থা, তার কোনো সুনির্দিষ্ট মাত্রা আছে কি না জানা নেই আমার। তেমন কিছু থাকলে সুবিধা হতো।

৭/ সমন্বয়, সমন্বয়, সমন্বয়। আমি নিশ্চিত যে এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ ব্যাক্তি/গোষ্ঠি কাজ করেছেন। তাঁদের সেই কাজের নির্যাসটুকু সবার জানার সময় এসেছে। এই প্রশ্নগুলোর জবাব নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও লেখা আছে। সেটা আমাদের সম্মিলিত জ্ঞানভাণ্ডারে নিয়ে আসা খুব জরুরি।

রেজওয়ানুল হক জামি এর ছবি

আমি ৩য় দিন উদ্ধার কাজের পাশে ছিলাম।
বোল্ট কাটার, গ্যাস মাস্ক, টর্চ এগুলো নিয়ে গেছিলাম।

একটা খুব সস্তা ডিভাইস দিয়ে সার্চের কাজে ভালো সাহায্য পাওয়া সম্ভব মনে করি।

আমি একটা ইকমার্স সাইট চালাই। সেটার জন্য চায়না থেকে একটা ডিভাইস ইমপোর্ট করছি।
ছোট্ট চাবির রিং এর মত একটা ডিভাইস আর সাথে ক্রেডিট কার্ডে,র মতো একটা ফাইন্ডার। ৪০ মিটারের মধ্যে চাবির রিংটা থাকলে কার্ডের বাটনে চাপ দিলে একটা এলইডি ফ্ল্যাশ জ্বলতে থাকে, তীক্ষ্ন একটা শব্দ করে (চাবির রিংটা) আর ভাইব্রেট করতে থাকে। দাম শুনলে হাসবেন। ২ ডলার।

আমি প্রোডাক্ট টা আনছিলাম যারা চাবি বা অন্য কিছু প্রায়ই ভুলে যান তাদের জন্য। কিন্তু সাভারে যাবার পর মনে হয়েছিল, ইশ! এই পিচ্চি চাবির রিং গুলা যদি সব শ্রমিকের আইডি কার্ডের সাথে থাকতো।

আপনার সাথে সহমত। বুয়েটের পোলারা যদি ভোটিং মেশিন আর ইলেকট্রিসিটি / গ্যাস মিটার বানাতে পারে, আর সরকার যদি সেটাতে ফান্ডিং করতে পারে, এরকম হাস্যকর রকম সহজ ডিভাইস তৈরী করা তো কোন ব্যাপারই হবার কথা না।

ফাহিম হাসান এর ছবি

প্রোডাক্টটার লিংক দিতে পারেন? বা কোন ডেমো ভিডিও?

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

আপনি যে ডিভাইসটার কথা বলছেন, তার সম্পর্কে দয়া করে একটু বিস্তারিত বলুন দয়াকরে। বা ফাহিম যেমনটি বলেছে, লিঙ্ক বা ডেমো? বিষয়টি নিয়ে আমরা সিরিয়াসলি কিছু চিন্তা ভাবনা শুরু করেছি।

অন্য কারও কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য থাকলে দিয়ে সহায়তা করবেন প্লিজ!

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

জোহরা ফেরদৌসী এর ছবি

বুয়েটের ছাত্র-শিক্ষকদের একটি সমন্বিত টিম যদি নিয়মিত বিরতিতে এই সব কারখানা পরিদর্শন করতো...জানি না সেটা সম্ভব কী না।

গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকে কোনভাবে কিছু নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থাও যদি করা যেত। কোথাও ফাটল কিংবা ইলেক্ট্রিক লাইনের গলদ দেখলে কর্তৃপক্ষকে জানানো। “কর্তৃপক্ষ” লিখেই থমকে আছে। ঠিক জানি না কে বা কারা হবে সেই কর্তৃপক্ষ।

__________________________________________
জয় হোক মানবতার ।। জয় হোক জাগ্রত জনতার

বিধুভূষণ ভট্টাচার্য এর ছবি

আগে জননিরাপত্তা, তারপর রপ্তানী আয়! বেশীরভাগ কারখানা ঝুকিপূর্ণ। বসে বসে দুর্ঘটনা ঘটার অপেক্ষা করার সময় আর নেই। সর্বাগ্রে গার্মেন্টস কারখানাগুলিকে উপযুক্ত ভবনে সরিয়ে নিতে হবে এবং সব ধরনের নিরাপত্তা ও সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করতে হবে। তার পরও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এ জন্য পোস্টে বর্ণিত প্রস্তাবগুলির বাস্তবায়ন করতে হবে।

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

সকল কারখানার কাঠামোগত নীরিক্ষা করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার একটা নির্দেশ জারী করা হয়েছে। দেখা যাক কি হয়। তবে যে দেশে অ-প্রকৌশলীরা বড় বড় প্রকৌশল বিষয়ক মন্তব্য করে ও সিদ্ধান্ত দিয়ে বসে (উদাঃ মখা, ইউএনও, প্রমূখ), সেখানে এই উদ্যোগ কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। তবে হ্যাঁ, সংশ্লিষ্ঠ কারখানার এলাকার মানুষেরা যদি এই রিভিউ এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় 'ঘুলুঝুলু' দেখতে পেয়ে 'হাউকাউ' জুড়ে দেয়, কিছুটা হলেও তা কাজে দেবে। শ্রমিকেরা আমার মনে হয় এ নিয়ে কিছু বলবে না কারন কারখানা বন্ধ ঘোষিত হলে ওদের চাকরী যাবে এবং নতুন একটা জোটাতে সময় লাগবে।

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

চলুক
গবেষণার জন্য আনুমানিক কীরকম ফান্ড লাগতে পারে?

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

মন মাঝি এর ছবি

@হিমুঃ

১। হিট সিগনেচার স্ক্যানার আর থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা কি একই জিনিষ? এই ব্যাপারটা আরেকটু খোলসা করবেন? আপনি বলেছেন, "ধ্বসে পড়া ভবনে প্রচুর তাপবাহী উপকরণ থাকায় এবং দিনের বেলা কংক্রিটও তাপ সঞ্চয় করে বলে সঠিকভাবে এই প্রযুক্তি কাজে লাগানো একটু কঠিন"। কথা হচ্ছিল বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ভূমিকম্প ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষজ্ঞের সাথে। তার কাছে থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরার কথা বলাতে তিনিও একই কথা বললেন। আরও বললেন আমাদের আর্মির কাছে নাকি এরকম ক্যামেরা আছে, কিন্তু সাভারে কাজে লাগেনি। লাগানো যায়নি নাকি লাগানো হয়নি সেকথা ফোনে আর জিজ্ঞেস করার সুযোগ পাইনি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমি নেটে দেখেছি এই ধরণের যন্ত্র উন্নত বিশ্বে ফায়ার সার্ভিসও ব্যবহার করে এবং আম্রিকায় জ্বলন্ত বাড়ির ভেতরেও এটা সাফল্যের সাথে ব্যবহার করা হয়েছে। আগুনের মধ্যেও যদি এটা কাজে লাগে, তাহলে উত্তপ্ত ধ্বংসস্তুপে অসুবিধা কোথায়? নাকি আমার ভুল হচ্ছে কোথাও? এই ব্যাপারটা কি একটু খোলসা করা যায়?

২। প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীকে প্রধান করে একটা কমিটি হয়েছিল বোধহয় কয়েক বছর আগে, যেটা এধরণের স্পেশালিস্ট ইকুইপমেন্ট কেনাকাটার ব্যাপারে কিছু সুপারিশ করেছিল। পথিক পরানের এই লেখায় সেই প্রসঙ্গটা এসেছে। আমি যে বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলছিলাম, তিনিও সেটা জানালেন। আরও জানালেন এজন্যে নাকি ১৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল! অবশ্য এই অঙ্কটা নিয়ে আমার একটু সন্দেহ রয়ে গেছে - শুনতে ভুল করলাম কিনা, নাকি এটা এবার বরাদ্দ হয়েছে বুঝতে পারছি না। তবে ঠিক শুনে থাকলে - এই রকম অঙ্ক দিয়ে প্রচুর বিশাল বিশাল ক্রেন ও হেভি-লিফটিং যন্ত্রপাতি কেনা না (?) গেলেও, উপযুক্ত ও লাগসই অনেক উপকরণ ও প্রযুক্তিই তো কেনা যাবে, তাই না? নেটে দেখলাম থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা কয়েক হাজার ডলারেই পাওয়া যায়। আর দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করতে পারলে আরো কম পড়বে হয়তো।

৩। আপনি আরও লিখেছেন, "এবং আহতরা সবসময় উদ্ধারকর্মীদের মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট জোরে শব্দ করতে পারেন না, তাই এ ব্যাপারে প্রযুক্তি ও কৌশলের সাহায্য নেওয়া জরুরি।"

নেটে দেখলাম এজন্যে স্পেশালাইজড সিসমিক/এক্যুস্টিক লিসেনিং ডিভাইস পাওয়া যায়। এরকম একটা প্রস্তুতকারকের সাথে যোগাযোগ করতে তারা জানালো ভবনধ্বসের জন্য ডিজাইনিকৃত এরকম উচ্চমানের (যে দুটি মডেলের ব্যাপারে আমি জানতে চেয়েছিলাম) ডিভাইসের খুচরা মূল্য ১২-১৩ হাজার ডলারের মত। ১৬০ কেন, শুধু ৬০ কোটি বাজেট হলেও এটা আনএ্যফোর্ডেবল হওয়ার কথা না। আরো মজার ব্যাপার হল, যাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম তারা জানিয়েছে বাংলাদেশেই তাদের ডিস্ট্রিবিউটার আছে। অর্থাৎ এই যন্ত্রের ক্রেতা এখানে আছে, কারও কারও কাছে এই জিনিষ ইতিমধ্যেই আছে!

৪। উপ্রের অঙ্কটা মাথার মধ্যে ঘুরছে। এইরকম অঙ্কের সামান্য একটা অংশ দিয়েই তো মনে হয় আপনার প্রস্তাবমত বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে অনেক এসাইন্মেন্ট দেয়া ও তাদের গবেষনা ফাণ্ড করা যায়। তারা আমাদের অবস্থা ও প্রয়োজন সবচেয়ে ভাল বুঝবে এবং প্রকৃত লাগসই ও এ্যফোর্ডেবল প্রযুক্তি তাদের হাত দিয়েই হয়তো আসতে পারে।

বিবিসির এই পেইজটা দেখেন, এখানে ভবনধ্বসের উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত প্রচলিত প্রযুক্তি চমৎকার ভাবে ছবি এঁকে দেখানো হয়েছে।

****************************************

হিমু এর ছবি

থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা খুব খরুচে কিছু নয়, আমরাও এখানে একটা কোর্সে ব্যবহার করেছিলাম বাড়িঘরের তাপসরবরাহ ব্যবস্থার এফিশিয়েন্সি নিয়ে পড়ার সময়।

তবে অগ্নিসেনারা তাপস্বাক্ষর শনাক্ত করেন অন্য কারণে। ধরুন কোথাও আগুন লেগেছে, দৃশ্যমান আগুন আপনি পানি বা রাসায়নিক ছিটিয়ে নিবিয়ে দিলেন। কিন্তু তার পরপরই দমকলের গাড়ি হাঁকিয়ে চলে না গিয়ে সাধারণত বাড়িঘরের বিপদজনক রকমের উত্তপ্ত অংশগুলো শনাক্ত করে সেগুলো ঠাণ্ডা করার বা আবৃত করার ব্যবস্থা করতে হয়, নাহলে একটু পর আবার আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাড়ি বলুন আর কারখানা, প্রচুর সহজদাহ্য উপকরণ তো ছড়ানো থাকেই চারপাশে।

তাপস্বাক্ষর শনাক্ত করা হয় আলোকতরঙ্গের অবলোহিত অংশ দিয়ে। এখন ধরুন আপনার চারপাশে আগুন, মাঝখানে আপনি। বাইরে থেকে কিন্তু আগুন থেকে নিঃসরিত অবলোহিত আলোই শনাক্ত করা যাবে, মাঝখানে আপনাকে সবসময় বোঝা না-ও যেতে পারে। যদি আপনি আগুনে আংশিক নিমজ্জিত থাকেন, তাহলে হয়তো একটা অ্যাপারচার পাওয়া যাবে, কিন্তু সেটাও সবসময় বোঝা যাবে না যদি আপনি প্রচুর নড়াচড়া না করেন।

এখন চিন্তা করুন ধ্বসে পড়া পোশাক কারখানার কথা। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস, যা আমাদের দেশে বছরের একটা দীর্ঘ সময়ের পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রার কাছাকাছি। বিধ্বস্ত ভবনের কংক্রিট সারাদিন রোদে উন্মুক্ত থাকলে সেটার তাপমাত্রা মানুষের শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে খুব ভিন্ন কিছু হবে কি? তারওপর আহতরা যদি নড়াচড়া না করেন, তাহলে তাপস্বাক্ষরচিত্র থেকে তাদের শনাক্ত করা আরো কঠিন হবে। পটভূমির তাপমাত্রা যদি আটক ব্যক্তিদের তাপমাত্রার কাছাকাছি হয়, তাহলে শনাক্তকরণের কাজটা অনেক কঠিন হবে। আর এই ক্যামেরাও হতে হবে বহনযোগ্য, যাতে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তুপের খানিকটা ভেতরে প্রবেশ করে ছবি তুলতে পারেন। তখন পদ্ধতিগত ব্যয় অনেক বাড়বে। এ কাজে ব্যবহৃত সফটওয়্যারও যতদূর জানি খানিকটা দুর্মূল্য। এ খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের করার আছে অনেক কিছু।

সাইজমিক লিসনিং ডিভাইসের সমস্যাটা হচ্ছে নয়েজ বা অসঙ্কেত। আপনি ধ্বংসস্তুপের বাইরে বা ওপরে এটা বসালে সে কিন্তু আশেপাশে সমাগত হাজার হাজার মানুষের চলাফেরার অসঙ্কেতও কান পেতে শুনবে। কোনটা কাজের, কোনটা অকাজের, তা ছেঁকে বার করার কাজটা বেশ দুরূহ। তবে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সঙ্কেত প্রক্রিয়াকরণ থিসিসের জন্যে জনপ্রিয়, হয়তো কোনো কৌশল আমাদের মেধাবী ছাত্ররা ঠিকই উদ্ভাবন করে ফেলবেন।

আমি আমার স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, সরকারের আমলারা (সামরিক বলুন আর বেসামরিক) বড় বড় ক্রয়ে আগ্রহী থাকেন, কারণ চুরিচামারি করার সুযোগটা প্রশস্ত হয়। সেসব ক্রয় কতোটা সাধারণ মানুষের কাজে আসে, তা নিয়েও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। আমি এখন পর্যন্ত কোনো অবিলাসী সাধারণবিত্ত উচ্চপদস্থ আমলা দেখিনি হাসি । আপনি দেখেছেন কি?

তাছাড়া আমাদের উদ্ধারকাজের উপকরণ মূলত রাবল সরানোর কথা চিন্তা করে প্রস্তাব করা হয়। আক্রান্ত জীবিত মানুষকে উদ্ধারের জন্যে আমাদের একটু বাক্সের বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। কোটি কোটি টাকা যদি খরচ করতেই হয়, কেন গবেষণা খাতে নয়? আমাদের বাঘের বাচ্চা সব ছেলেমেয়ে আছে, যাদের একটু প্রণোদনা আর দিকনির্দেশনা দেওয়া গেলে তারা তুলকালাম সব কাণ্ড করতে পারে।

একটা দেশ তখনই সামনে এগোয় যখন তার নীতিনির্ধারকরা সমকালে বাস করে ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা করেন। আমাদের জাতিটাই হচ্ছে "রাখে আল্লা মারে কে" ঘরানার ভাবনদার, নীতিনির্ধারকরাও তাই।

সুমিমা ইয়াসমিন এর ছবি

গবেষণায় উদ্ধার পরবর্তী কার্যক্রম অর্থাৎ আক্রান্তদের কী প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা যেতে পারে, এ বিষয়ে একটা ছক তৈরি করে রাখা যেতে পারে।

মন মাঝি এর ছবি

আরেকটা জিনিষ খুব জরুরী মনে হয়।

নানা বিবেচনাতেই এধরণের সফিস্টিকেটেড ও স্পেশালাইজড সার্চ এণ্ড রেসকিউ অপারেশনের দায়িত্ব মূলত/প্রধাণত অন্য কাজে ট্রেইন্ড মানুষকে না দিয়ে, শুধুমাত্র এই কাজেই ট্রেইণ্ড, স্পেশালাইজড ও ডেডিকেটেড সংস্থাকে দেয়া উচিৎ। যেমন আগুন নেভানোর দায়িত্ব ফায়ার সার্ভিস পালন করে, অন্য কেউ না। এই কাজ তারাই সবসময় করে এবং যখন করে না তখনও এই কাজেরই মহড়া দেয় সর্বক্ষণ। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে জানমালের নিরাপত্তা প্রদানই তাদের মূল ও একমাত্র মিশন। এটা মনে হয় একধরণের 'মানসিকতা'ও সৃষ্টি করে এই কাজের প্রফেশনালদের মধ্যে, যা অন্য ধরণের প্রফেশনালদেরর পক্ষে অর্জন করা অত সহজ না। এমনকি অন্য প্রফেশনালদের অন্য ধরণের ট্রেনিং এই কাজে হয়তো নানারকম বাধাও সৃষ্টি করতে পারে। এবার সেটা্ খুব ভাল ভাবে বুঝা গেছে। তাই আমার মনে হয় ভবনধ্বস, ভূমিকম্প ও এই জাতীয় দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমাদের এই ধরণের কাজের জন্যই বিশেষায়িত সংস্থা বা বাহিণী থাকা দরকার, যারা অন্য কোন সংস্থা বা বাহিণীর অংশ বা অঙ্গসংগঠন হবে না, বরং নিজেরাই মূল সংস্থা হবে। প্রয়োজনে অন্য সংস্থাগুলি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, কিন্তু অপারেশনের নিয়ন্ত্রন, পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই সন্সথাই একক নেতৃত্বে থাকবে।

****************************************

হিমু এর ছবি

বর্ণে বর্ণে সহমত। শুনলাম সরকার এমন একটা কিছু করার কথা ভাবছে। সেই ভাবনা মূর্তরূপ কবে পাবে ক্যাঠায় জানে?

লুৎফুল আরেফীন এর ছবি

হু পর্বতারোহনের অভিজ্ঞতা থাকলেও মুসা ইব্রাহীম কিছুই করতে পারল না; কয়েকটা ছবি তোলা ছাড়া। বেচারা!

তানভীর এর ছবি

কম খরচে এরকম একটা প্যানিক বাটন ডিজাইন করা যায় যেটা সবাই কারখানায় ঢুকলে হাতে পড়বে বা গলায় ঝুলাবে। তারপর কোন দুর্ঘটনা ঘটলে বাটনে চাপ দিলে অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যাবে। এটা ভবন ধ্বস ছাড়া অন্য এমার্জেন্সিতেও কাজে লাগবে (হার্ট এটাক বা যে কোন মেডিকেল ইমার্জেন্সি, ভবনে আটকা পড়া ইত্যাদি)। এমপ্লিফাই হবে এমন সাউন্ডের ছোট প্যানিক বাটন বানানো মনে হয় তেমন জটিল হবার কথা না। ইলেক্ট্রিক্যাল বা মেকানিকালের কোন স্টুডেন্টকে প্রজেক্ট হিসেবে কাজটা দেয়া যায়। তারপর এটা প্রোডাক্ট হিসেবে মার্কেটে ছেড়ে কারখানা মালিক, পাবলিককে ব্যবহারের জন্য কনভিন্স করানো যায়। আপাতত সহজ আইডিয়া এটাই মনে হলো।

একটু এডভান্স লেভেলে প্যানিক বাটনের সাথে রিসিভার ডিজাইন করা যেতে পারে যেখানে সিগনাল যে বাটন থেকে আসছে তার ইনফরমেশন, লোকেশন ইত্যাদি উঠবে। কিন্তু ভবন ধ্বসে পড়লে বিল্ডিংয়ে থাকা রিসিভারও হয়তো ড্যামেজ হবে। তখন আর এটা কাজে আসবে না যদি না ভবনের বাইরে কোথাও এটা সেটআপ করা যায়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।