ছাইরং মানুষের মুখ। দিলীপ চক্রবর্তী

মাহবুব লীলেন এর ছবি
লিখেছেন মাহবুব লীলেন (তারিখ: বিষ্যুদ, ২০/০৯/২০১২ - ৫:১২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


মারা গুয়া ডাজ নট কামব্যাক ফ্রম কাশী। এর মানে হলো- একবার গুয়ামারা খাইলে কাশীতীর্থ ভিজিট কইরাও কুনু লাভ নাই... এরকম কথাবার্তা ভদ্দরলোকি বৈঠক কিংবা বাক্য রচনায় ছিছি গোত্রীয় হলেও আড্ডায়-ঝগড়ায় কিংবা বেহুদা জীবনযাত্রায় হামেশাই আমরা এগুলো কিংবা আরো উচ্চগোত্রের ছিছি বাক্য ব্যবহার করি নিজেদের একেকটা উপগোত্রের মাঝে...

সেই উপগোত্রগুলো হয় আমাদের ব্যাখ্যাছাড়া হাসির জন্য; যুক্তিছাড়া তর্কের জন্য; দায়ছাড়া দোষারোপের জন্য; কারণছাড়া খেপার জন্য; সেন্সরছাড়া শব্দের জন্য আর মাঝে মাঝে হাস্যকর স্বপ্ন কিংবা অবহ দীর্ঘশ্বাস বিনিময়ের জন্য... আর সেজন্যই ভাত-ভর্তা পরিবার-পরিজন সমাজ-সংস্কার সবকিছুর দায়দেনা ঠিকঠাক মতো শেষ করে কিংবা খেলাপি রেখে সময়-পয়সা-এনার্জি খরচ করে আমরা গিয়ে হাজির হই নিজেদের উপগোত্রগুলোর মাঝে; সামান্য একটু অন্যরকম সময়ের আশায়....

দিলীপ চক্রবর্তী আমাদের সেরকম এক উপগোত্রের লোক। যে গোত্রে একসাথে সবকিছু চলে শুধু মাইন্ড খাওয়া ছাড়া...
কীরকম যেন শুরু হয়েছিল তার সাথে? নাটকের মানুষের সাথে নাটকেই শুরু হয়েছিল প্রথম। তখনও আমি সিলেটে কথাকলিতে কাজ করি। ২০০২ সালে কথাকলির যে অনুষ্ঠানে সর্বশেষ আমি সক্রিয় ছিলাম তা একটি নাট্য উৎসব। সেই উৎসবে দিলীপ দা দেশ নাটকের সাথে গিয়েছিল নিত্যপুরাণ নাটক করতে। মাসুম রেজার লেখা এবং নির্দেশনা। সেই উৎসবে এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ির কাজ ছিল আমার। দৌড়াদৌড়ির ফাঁকে ফাঁকে যা পারি উঁকিঝুকি দিয়ে নাটক দেখতাম। নিত্যপুরাণ শুরুর পর একটু উঁকি দিলাম... একটু দাঁড়ালাম... আচ্ছা আরেকটু দেখি... আরেকটু... এক সময় কাজকর্ম বাদ দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো নাটকটাই দেখে ফেললাম...

মঞ্চে তখন অচেনা দিলীপ দা। পুরো নাটকটাতেই সে। অথবা যে চরিত্রটাকে নিয়ে নাটক সেই চরিত্রটাই তার। নাটকের কাহিনী মহাভারত থেকে ভাঙানো। মহাভারতে বড়ো মানুষগুলোকে যেমন বড়ো করতে করতে অতিমানব করে ফেলা হয়েছে তেমনি তুচ্ছ মানুষগুলোকে তুচ্ছ করতে করতে একেবারে সংখ্যায় পরিণত করা হয়েছে। এরা মরে কিন্তু এদের মৃত্যুযন্ত্রণা কিংবা রক্ত দেখা যায় না। এরা পরাজিত হয় কিন্তু এদের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় না। মহাভারতে এইসব তুচ্ছ মানুষগুলোর জন্ম বীরদের হাতে হাজারে হাজারে মরে তাদেরকে বীরত্ব দেবার জন্য। তাদের বেশিরভাগেরই নাম নেই। খালি সংখ্যা। অত সহস্র। অত লক্ষ। অত কোটি... মাঝে মাঝে দুয়েকটা নাম উঁকি মারে নামধরে পরাজিত হতে কিংবা বীরদের হাতে মৃত্যুবরণ করতে। এরকম এক চরিত্র মহাভারতের একলব্য। মহাভারতের লেখকগোষ্ঠী কিংবা ভীষ্ম-কৃষ্ণ-দ্রোণ চরিত্রগোষ্ঠীর সবারই সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল অর্জুনকে সর্বদাই বড়ো করে তোলা কিংবা বড়ো করে রাখা। যেখানে তাকে চেষ্টা করেও বড়ো করে তোলা যায়নি সেখানে তারা তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে কেটে ছোট করে অর্জুনের হাঁটুর সমান বানিয়ে নিয়েছেন। অর্জুনের শিক্ষাগুরুও দ্রোণও তাই করলেন। যখন আবিষ্কার করলেন শিষ্য অর্জুন থেকে অজ্ঞাত অচ্ছুত একলব্য শ্রেষ্ঠ তিরন্দাজ। তখন একলব্য যে হাত দিয়ে ধনুক ধরে; সেই হাতের বুড়ো আঙুল কাটার ব্যবস্থা করলেন... বুড়ো আঙুল হারিয়ে একলব্য আর ধনুক ধরতে পারল না। অর্জুন বড়ো তিরন্দাজ হয়ে থেকে গেলো মহাভারতীয় কাহিনীতে আরো বহু বীরত্বের কৃতিত্ব অর্জনের জন্য... আঙুল কাটাপড়ে নিবীর্য হবার সাথে সাথে একলব্যের কাহিনীও শেষ। তারপরে কোনো এক জায়গায় তার অনুল্লেখযোগ্য একটা মৃত্যুসংবাদ ছাড়া আর কিছু নেই। একলব্য মহাভারতের কোনো চরিত্র ছিল না। মানুষও ছিল না। শুধুই ছিল অর্জুনের এক প্রতিদ্বন্দ্বী যাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যই উপাখ্যানে আনা হয়েছিল একটা নাম দিয়ে....

মহাভারতীয় অসংখ্য তুচ্ছদের মধ্য থেকে মাসুম রেজা এই একলব্যকে তুলে এনে মানুষ বানালেন। যার দুঃখ কষ্ট হাসি কান্না হতাশা আছে। যে একটা মানুষ; পরাজিত হবার জন্য তৈরি একটা চরিত্র শুধু নয়... বীর নয় কিন্তু একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ........
মাসুম ভাইয়ের লেখা নিত্যপুরাণ নাটকের সেই একলব্য চরিত্রটা ছিল দিলীপ দার। চোখের সামনে একটা জীবন্ত মানুষ। অতিমানবীয় পঞ্চপাণ্ডবের সামনে দাঁড়ানো একজন রক্তমাংসের অনুভূতিশীল তুচ্ছ মানুষ। তার অহংকার- তুচ্ছতা-স্বপ্ন-হতাশার প্রতিটা পরত যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল দিলীপ চক্রবর্তীর অভিনয়ে....

দিলীপদাকে সেই প্রথম দেখা। তারপর ঢাকায় এসে আমি দেশ নাটকেই যোগ দিলাম। দলের বাইরে আমাদের স্বপ্ন আর দীর্ঘশ্বাস বিনিময়ের কেন্দ্র কলাবাগানের আড্ডা। চলচ্চিত্র পড়ার জন্য ভর্তি হলাম স্ট্যামফোর্ডে। তিন জাগাতেই দিলীপ দা আর আমি একসাথে। ...নাটকের দল খালি নাটক করে না। সংগঠনও করে। আর সংগঠনের সাথে অনিবার্যভাবে যুক্ত তার ঝামেলা। আর ঝামেলা মানেই একজন এই পাশে গেলে অন্যজন যায় অন্যপাশে। বহুবার দলের এরকম সংকটে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। দলের সংকট থেকে আড্ডায় সংঘাত। আবার দলেরই অন্য সংকটে একই সাথে; একই কণ্ঠ... আমাদের সময়গুলো চলতে থাকে আড্ডায়- ঝগড়ায়- ঐক্যে- সংঘাতে....

প্রচুর গালাগালিও হতো তার সাথে। পিছলা মানুষ। সাংগঠনিক সংকটে তার অনিবার্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও পিছলে যেতে চাইত। বলত- আমি অভিনেতা মানুষ। আমাকে এসবে কেন? কিন্তু আমরা গিয়ে তাকে ধরে আনতাম। নাটকের দলে যে অভিনেতা সেই সংগঠক। যে সংগঠক সেই অভিনেতা নির্দেশক কিংবা নাটক লেখক... বছর দেড়েক আগে দেশ নাটক এক কঠিন সংকটে পড়ে... অতি কঠিন সংকট... সেই সংকটে সকলে এক হয়ে যায়... দিলীপ দাও এসে বিনা প্রশ্নে সক্রিয় হয়ে উঠে দলের অস্তিত্বের প্রশ্নে... সংকট কাটে... কিন্তু সংকট পার হয়ে এলেও দলের জন্য চাই নতুন নাটক। সে নাটক লেখার ভার পড়ে আমার উপর। জীবনে কোনোদিন মঞ্চ নাটক লিখিনি। বারবার লিখি আর দলে পড়ে শোনাই। প্রতিটি সদস্য সেটা সংশোধন করে... যোগ করে... বিয়োগ করে... আমি আবার লিখি। আবার... বারবার লিখতে লিখতে একসময় নাটকটা মঞ্চায়নের উপযোগী হয়ে উঠে। নাটকটি মহাভারতে শুক্রাচার্যের মন্ত্র হারানো উপাখ্যানের এক ভিন্ন পাঠ- অরক্ষিতা। অনিবার্যভাবে নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র শুক্রাচার্যে দিলীপ দার নাম চলে আসে। কিন্তু তার সময় সংকট। সময় সংকট তবু সে চরিত্রটা ছাড়ে না। ভালো চরিত্র আর অভিয়নের জন্য অকপট কৃপণ ছিল সে বরাবর। শুক্রাচার্য একদিকে অতি দাম্ভিক অহংকারী মাতাল আর অন্যদিকে অতি নমনীয় এক চরিত্র... এ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ সে ছাড়তে রাজি নয়। অরক্ষিতা নাটকের এই চরিত্রটিই অবশেষে হয়ে উঠে মঞ্চে তার জীবনের শেষ নাটক... পিছলা স্বভাবের জন্য তার উপর বহু কারণেই রাগ ছিল। আমি নাটকের ভেতরেই তাকে একটা খোঁচা মারি- ব্রাহ্মণদের শ্রদ্ধা করা চলে; কিন্তু বিশ্বাস করা কঠিন’... নাটকে সংলাপটা শুক্রাচার্য সম্পর্কে রাজা বৃষপর্বের মন্তব্য। দিলীপ দা সংলাপটা শুনে হাসে- মাইরা দিলেন? আমি বলি- হ। মাইর দেওয়ার চান্স পাইলে ছাড়ে কেডায়?

দিলীপ দা শুধু ব্রাহ্মণ নয় রীতিমতো পুরোহিত। তার গ্রাম টাঙ্গাইল মির্জাপুরের নগরভাতগ্রামে সকল পূজাপার্বণের পুরোহিত ছিলেন তার পিতা। তিনি মারা যাবার পর সে দায়িত্ব তাকেই পালন করতে হতো। যখন যেখানেই থাকুক না কেন; পূজায় তাকে গ্রামে যেতেই হতো পুরোহিতের কাজ করার জন্য। একবার পূজায় নগরভাতগ্রামে গিয়ে তার পৌরহিত্ব দেখে ছোটবেলায় শোনা ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে সবগুলো ত্যাড়াব্যাঁকা কথা তাকে শুনিয়ে দিয়েছিলাম। শুনে সে হাসে- পেশা তো না; দায় থেকে করি... নরগভাতগ্রামে তার দায় ছিল অনেক। সেখানেই বাবার হাত ধরে লোকনাটক আর যাত্রায় তার হাতেখড়ি। তার বাবার ভরসাতেই সেখানকার মানুষজন দেশবিভাগে দেশ ছাড়েনি... বাবা নেই। তাই তাকেই প্রয়োজনে গিয়ে দাঁড়াতে হয় গ্রামের মানুষদের পাশে...

মানুষটা একা ছিল। বাবা মা মারা গেছেন বহু আগে। একমাত্র বোন কলকাতা প্রবাসী। কেউ গুতা দেবার নেই; কেউ ঠেলা দেবারও নেই। নিজেকে গোছাতে গোছাতে মাত্র এমাসেই বিয়ের পরিকল্পনা করেছিল আর এমাসেই সে নিথর হয়ে গেলো তার কিছু অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। ... শুধু মঞ্চে অভিনয় করে জীবন যাপনের দুঃস্বপ্ন... বাবার নামে বাড়িতে একটা স্কুল তৈরির স্বপ্ন আর জীবন যাপনের জন্য অপছন্দের টিভি নাটকে অভিনয় করে জীবনটাকে ঠেলে ঠেলে নেয়া.... সবকিছুকে ধুপ করেই বন্ধ করে দিলো দিলীপ দা। মরার মাত্র দুদিন আগে গ্র“পে তার সাথে খিটখিটি হয়েছে আমাদের। সেদিনই ফেসবুকে তার সর্বশেষ আপডেট ছিল- তবুও জীবন যাচ্ছে চলে’... আমি কমেন্ট করেছি- থামাইয়া দেন। চালাইতে গেলেই তেলমবিল কিনতে হয়....

হা। সত্যি সত্যি হালায় থামিয়ে দেবে কে জানত? ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে যখন একজন তার কাছে এসেছিল তখন ফোনের উত্তর না পেয়ে আর ঘরের দরজা বন্ধ দেখে ভেবেছিল সে ঘুমে। যে বাসায় সে থাকত সে বাসার লোকজন দুপুরে খাবার জন্য ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়েও ভেবেছে সে ঘুমে। বিকেলেও সন্দেহ করেনি কেউ। এমন তো হামেশাই হয়; রাতে ঘুমিয়ে পরের রাতে ঘুম থেকে উঠা আর সারাদিন ফোন না ধরা... কিন্তু সন্ধ্যায় তাদের সন্দেহ হয়। ডাকাডাকি। দরজায় ধাক্কাধাক্কি। পুলিশ। দরজা ভাঙা। এবং তারপর... সে ঘুমিয়ে আছে চিৎ হয়ে। একেবারে নিশ্চিন্ত ঘুম। বুকের উপর বাম হাত রাখা। চোখ বন্ধ। পা দুইটা বিছানা থেকে মেঝেতে নামানো। যেন শোয়া থেকে উঠার জন্য পা নামিয়েছে কিংবা বসা থেকে শোয়ার জন্য মেঝেতে পা রেখেই বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়েছে... এক্কেবারে চুপচাপ একটা পিচ্ছিল মৃত্যু...

বাংলা যাত্রার অন্যতম প্রাণপুরুষ অমলেন্দু বিশ্বাসের জীবনীকে কেন্দ্র করে আমাকে দিয়ে একটা নাটক লিখিয়েছিল সে। নিজেই নির্দেশনা দিয়ে একজন অভিনেতার জীবনী অভিনয় করার উচ্চাশা ছিল তার। করি করি করে সময় হয়ে উঠছিল না। এর মধ্যে ১৭ তারিখ সন্ধ্যায় ফিরোজের ফোন- দিলীপ দা নেই....

দিলীপ দা নেই। দিলীপ দা নেই মানে আমাদের অন্যরকম সময়ের ভদ্রতাবিহীন উপগোত্রে একটা ফ্লাশব্যাক মেশিন চালু হয়ে যাওয়া....শুধুই পেছনে যাওয়া.... শুধুই পেছনে.... কবে কোথায় কোনখানে কী আলাপ কোন ঝগড়া কিংবা কোন স্বপ্নের বিনিময় হয়েছিল তার লাশ ঘাঁটাঘাঁটি করা.... মারা গুয়া ডাজ নট কামব্যাক ফ্রম কাশী.... মরা মানুষ কামসব্যাক ইন শুধু স্মৃতি....

০২
ফেসবুকে নিজের সম্পর্কে তার বক্তব্য ছিল-

কালের আবর্তে আমরা সবাই
আমার বলে কিছু নেই....

সত্যিই কি কিছু নেই?

২০ সেপ্টেম্বর ২০১২। বিষুদবার

..........................................
ছবিটা তার ফেসবুক থেকে নেয়া

ছবি: 
10/02/2007 - 10:56পূর্বাহ্ন

মন্তব্য

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

দীর্ঘশ্বাস...

উজানগাঁ এর ছবি

হৃদয় ছুঁয়ে গেল লীলেন ভাই !

দিলীপদার মতো মানুষগুলোকে এতো তাড়াতাড়ি কেন চলে যেতে হবে !

স্বপ্নবিভা এর ছবি

অনেকের কাছেই হয়তো মানুষটা অচেনা। তার সাথে অামার ও সামনা সামনি কখনো পরিচয় ও হয়নি। কিনতু বেশ কিছু ঘনিষ্ট বন্ধুর কাছে দীলিপদা ছিলেন খুবই কাছের মানুষ. ওদের কাছে উনার নামটা নিয়মিত শুনতে শুনতে কখন যেনো কাছের মানুষ হয়ে গিয়ে ছিলেন.

কল্যাণ এর ছবি

দুঃখিত লীলেনদা।

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

তীরন্দাজ এর ছবি

এই মানুষগুলো এভাবেই আসেন, আর এতোই পিচ্ছিল যে, চলে যাবার সময় টেরও পেতে দেন না। নিজের শিল্পীসত্তাকে সবচাইতে বড়ো অবলম্বন করে আর কাউকে কাছাকাছি হতে দেন না খুব একটা। তারপরও নিজের প্রায় পুরোটাই বিলিয়ে যান সবাইকে।

আমি তাঁকে চিনিনা। নামও কখনো শুনিনি। তারপরও খুব কষ্ট হলো আপনার লেখাটি পড়ে লীলেন।

**********************************
যাহা বলিব, সত্য বলিব

তারেক অণু এর ছবি
অচল এর ছবি

অনেক সাবলীল অভিনয় করতেন। শান্তিতে থাকুক উনার আত্মা । শ্রদ্ধা

লুৎফর রহমান রিটন এর ছবি

অসাধারণ লিখেছো লীলেন। হৃদয় ছুঁয়ে গেলো।

হাবু বেশ বড়সড়,গাবুটা তো পিচ্চি
হেরে গিয়ে হাবু বলে--উৎসাহ দিচ্ছি!

অতিথি লেখক এর ছবি

কমনজেন্ডার ছবিটার একটা গান প্রায় সময় বিভিন্ন চ্যানেলে দেখায়। এম্নিতে কমনজেন্ডার টেলিফিল্ম আমার দেখা ছিল। তাই ছবিটার প্রতি আগ্রহ ছিল বেশ, কিন্তু দেখা আর হয়ে ওঠেনি। তার অভিনীত কোন নাটকের নাম আমার মনে এখন পড়ছে না। মঞ্চনাটক দেখা খুব হয় না, তাই অভিনয় ফলো করা হয়নি। কিন্তু তার মৃত্যু আমাকে কষ্ট দিয়েছে। একাত্তরে প্রথম যখন ব্রেকিং দেয়, আমি তাকে এক নামে চিনতেও পারিনি, এটা সত্যি এবং আমার ব্যর্থতা বটে। তবে তার চলে যাওয়া আমাকে শোকাহত করেছে। ফেসবুকের মাধ্যমে যখন জানতে পারি তিনিই চলে গেছেন, থম মেরে ছিলাম কিছুক্ষণ। ভাবছিলাম, এই না কদিন আগেই পর্দায় কেমন জীবন্ত দেখেছিলাম! আজকে প্রথম আলোর বিনোদন পাতায় আফসানা মিমির স্মৃতিচারণ পড়ে বুক চিরে বেশ বড়সড় একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়েছে।

এমন মৃত্যু আসলে কেউ চায় না কখনো, যা কাঁদায়, ভাবায় আর প্রিয়জনদের মনে অবিরাম দুঃখের বৃষ্টি ঝরিয়ে যায়।

ভাল থাকুন দিলীপ চক্রবর্তী, যেখানেই থাকুন।

অস্পৃশ্যা।

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

সিলেটের কথায় মনে পড়লো, ১৯৬৯ সালে সিলেট রেডিওর কিছু লোকের অনুরোধে প্রয়াত জহুর আহমেদের (প্রখ্যাত অভিনেত্রী ডলি জহুরের স্বামী) সাথে একটা নাটকে অভিনয় করেছিলাম। আর আপনার মহাভারত বিষয়ক আলোচনায় কিছু মহাভারতীয় চরিত্র মনে পড়লো। লেখাটা মনে দাগ কেটেছে। ধন্যবাদ।

অরফিয়াস এর ছবি

মন খারাপ

----------------------------------------------------------------------------------------------

"একদিন ভোর হবেই"

অতিথি লেখক এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ লীলেন দা। লেখাটা আমাকে স্পর্শিত করে গেলো খুব।

২০০৯ সালে টিআইবি-এর একটি পাঁচ দিনের নাট্য কর্মশালার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। সিলেটে এসে তিনি খুব উৎফুল্ল ছিলেন। জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, কেন জানি না এই মৃত্তিকা আমার ভালো লাগে খুব। মাত্র তো পাঁচ দিন। কিন্তু এই পাঁচ দিন ছিল নিত্যপুরাণ-এর একলব্য কে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য। অহরকণ্ডল-এর আকমল দিলীপ দা আমার ভিষণ প্রিয় হয়ে গেলেন। তারপর থেকে খুব বেশি না তবে মাঝে মধ্যে যোগাযোগ রাখতাম দাদার সঙ্গে। অসম্ভব হাস্যজ্জ্বল আর প্রাণদীপ্ত মানুষটি আমাদের কঠিন ভুলের পরও হেসে উড়িয়ে দিয়ে মনোযোগ দিত কাজে।
ভাল থাকুন প্রিয় দিলীপ দা।

পাপলু বাঙ্গালী

উচ্ছলা এর ছবি

প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য কী অসাধারণ বুনোটে বাঁধা !

আপনার সবগুলো লেখা আমি পড়া শুরু করব আজ থেকে। প্রতিদিন একটা করে।

পুতুল এর ছবি

দিলীপের ছবিটা প্রথম দেখেছিলাম ফেসবুকে। সম্ভবত নিশাত আপার প্রফাইলে। আমার দেখা ২৫ বছর আগের দিলীপের সাথে ছবিটি মেলেনি। হবে কারও ছবি ভেবে নীচে কী লেখা তাও ভাল করে পড়িনি। কাজ থেকে এসে প্রতিদিন ই-মেইল, ফেসবুক, সচলায়তন। কাল রাতে আপনার লেখাটা শুরু করেও পড়িনি। সকালে উঠেছি সবার আগে। তারপর লেখাটা পড়লাম। বউকে বললাম আমার বন্ধু দিলীপ। দিনটা ভাল কাটেনি।
দেশ নাটক নিয়ে লেখার ইচ্ছা। কিন্তু সময় করে উঠতে পারি না। লেখাও হয় না। দিলীপের খবরটা শুনে ভেবেছিলাম; একটা লেখা লিখব, কিন্তু পারলাম না। বাদল সরকারের সাথে আমাদের একটা গ্রুপ ছবি ছিল আমার কাছে। দেশ নাটকের কথা প্রতিদিন স্মরণ করার জন্য ছবিটা কফির কাপে প্রিন্ট করে নিয়েছিলাম। কিছুদিন পর দেখি প্রতিদিন ধুতে ধুতে ছবিটা মুছে যাচ্ছে। তারপর থেকে তুলে রেখেছি। আজকে সকালে বের করে দেখি; ছবিতে আমাদের কারও চেহারাই আর স্পষ্ট নয়।
আমি পালিয়ে এসে এমন পাকে বাঁধা পড়েছি, আর ফেরা হল না। দেশে একবার গিয়েছিলাম দেশ নাটকে। মার্চে গেলাম মাত্র তিন দিনের জন্য। দেশ নাটকে যাওয়া হল না। দিলীপের সাথে শেষ দেখা হল না। আমরা প্রথম বছর ৩৬৫ দিন রিহার্সেল করেছিলাম। পলাশ, আওয়াল-রা থাকত রামপুরা। আমি, দিলীপ আর ধর (তার ডাক নাম মনে পরছেনা, ধর বলেই আমরা ডাকতাম) থাকতাম সদরঘাট। টিএসসি থেকে গুলিস্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতাম, বাকীটা বাসে। বিরসা কাব্যের মহড়া চলছে তখন।
কখনো খবরের কাগজ খুললেই এখনো দেখি দেশ নাটকের কোন খবর আছে নাকী।
সেই দেশ নাটকের জসিম চলে গেছে বহু আগে। এখন দিলীপ। এক সিগারেট তিন চার জনে মিলে ভাগ করে খাওয়ার সময় বড় হিরন্ময় কষ্টের। আজ দিলীপ নাই। আমাদের কখনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু হৃদয়ে সবাই এখনো আছে। দিলীপ তুইও থাকবি আজীবন।
তার জন্য আপনারা কোন শোক-স্মরণ সভা টাইপের কিছু করলে নিশাত আপাকে অনুরোধ করবেন ডুন্ডুভ-রুপের পক্ষ থেকে তিনি যেন দূরে কোথাও দূরে দূরে গানটা দিলীপের স্বরণে একবার করেন। বাদল সরকারের সম্মানে তিনি একবার গেয়েছিলেন। কোন যন্ত্র ছাড়াই। এমন দরদী গলায় গানটা ঐ একবারই শুনেছিলাম। এইটুকুন দরদ ২৫ বছর পথ-মঞ্চ নাটকে খেটে ছেলেটা অর্জন করেছে। দিলীপ তুই ভাল থাক।

**********************
ছায়াবাজি পুতুলরূপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ!
!কাশ বনের বাঘ!

সাবেকা  এর ছবি

টিভি নাটকে উনার অভিনয় দেখেছি, ভাল লাগত । নিউজে নাম পড়ে প্রথমে চিনি নি,ছবি দেখে পরে চিনতে পারলাম মনটা খুব খারাপ হল। আপনার লেখা পড়ে খারাপ লাগাটা অনেক বেড়ে গেল মন খারাপ

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

শনি-রবিবার পুরো দুটো দিন মাসুম রেজা ভাইয়ের সাথে কাটিয়ে রবিবার রাতে মাসুম ভাই নামিয়ে দিয়ে গেলো আমার মিটিঙের জায়গায়। সোমবার মাসুম ভাইয়ের ফেসবুক থেকেই জানলাম দিলীপদা নেই। আমি তাকে চিনতাম কিন্তু তিনি ব্যাক্তিগতভাবে আমাকে চিনতেন না, খুবই খারাপ লাগছে।

শ্রদ্ধা

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

ব্যাঙের ছাতা এর ছবি

পড়ে কিছুক্ষন চুপ করে বসে ছিলাম। বৃহস্পতিবারেই পড়েছিলাম, মন্তব্য করা হয়নি। এখন আবার পড়লাম আপনার লেখাটি। মঞ্চে তাঁকে দেখা হলো না। হবেও না। তিনি আরো বড় মঞ্চে এখন।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।