মানুষের পৃথিবীতে মানুষের জয় হোক

মাসুদ সজীব এর ছবি
লিখেছেন মাসুদ সজীব [অতিথি] (তারিখ: রবি, ০১/১১/২০১৫ - ৫:৪০অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কেমন আছে বাংলাদেশ এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এখন খুব কঠিন কিছু না। চারিদিক থেকে ঘনিয়ে আসা অন্ধকার ক্রমশ ঘিরে আসছে বাংলাদেশে এ কথা আমরা সবাই জানি। না ভুল বললাম, সবাই জানি না, ধর্মান্ধতা আর জঙ্গিবাদের বিস্তারের চেয়ে ও উন্নয়ন যাদের কাছে বড় কথা, জিডিপি আর চ্যাম্পিয়ান অব আর্থ পুরষ্কার পাওয়াটা বড় অর্জন মনে করে যারা, তাদের কাছে বাংলাদেশ ভালো আছে, ভীষন ভালো আছে। শুধু রাজনীতি বিশ্বাসে দলান্ধ মানুষ না, মূল ধারার নাম করে পা-চাটা সাহিত্যিক-রা, বাক-স্বাধীনতার নাম করে অপ-সাংবাদিকতার অগ্নিপুরুষ চটি সাংবাদিকরা, তোষামদ করে পদকের আশায় বুভুক্ষ থাকা নানান শ্রেণীর সাংস্কৃতিক কর্মীরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের লালদল-নীলদল সহ নানান ভাগে ভাগ হওয়া শিক্ষক থেকে শুরু করে ফেসবুকের গাজা-মায়ানমারের জন্য ঘুম হারাম করে দেওয়া বড় বড় মানবধিকার প্রেমীরা, সবার চোখেই দেশ ভালো আছে।

শুধুমাত্র অভিজিৎ, ওয়াশিকুর, অনন্ত, নিলয় আর তাদের মতো কিছু বোকা ব্লগারদের চোখে বাংলাদেশ ভালো নেই। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেশপ্রেমিক যারা উৎপান্ন করে সেই দেশে বসে যারা বলে দেশ ভালো নেই, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন করতেই পারে। আর কিছু না থাকুক আপনার জানা উচিত বাঙালির দেশপ্রেম আর ধর্মপ্রেম এভারেষ্টের চূড়ার থেকেও উঁচু, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতার চেয়েও অতল। ডক্টর স্যামুয়েল জনসন নামক কোথাকার কোন এক আহম্মক কবে বলেছিলো “দেশপ্রেম বদমাশের শেষ আশ্রয়”। আরে ব্যাটা তোদের দেশে দেশপ্রেম ছিলো না বলে কি অন্য কোথাও কি থাকবে না?

তো সেই দেশপ্রেমিকদের অভয়ারণ্যে দেশদ্রোহীদের কি বেঁচে থাকার অধিকার থাকতে পারে? সেই দেশদ্রোহীরা যদি নাস্তিক হয়, নাস্তিকের বন্ধু হয়, ভাই হয়, সহপাঠী, সহকর্মী হয় তাহলে? না তাহলে তাদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই এই বঙ্গদেশে। ঠিক সেই কারণেই এদের কে হত্যা করা রাষ্ট্রীয় ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে, ধর্মীয় ভাবে, সামাজিক ভাবে আর সাংস্কৃতিক ভাবে প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। এদের কে হত্যার প্রতিবাদে তাই মানুষের মাঝে হাহাকার জাগে না, শূন্যতার সৃষ্টি হয় না। মানবতাবাদী দের মানবতা আর এদের জন্যে দাঁড়িয়ে যায় না, ভিন মানচিত্রে ধর্মের ভাইদের হত্যা করলে রক্ত যতটা গরম করে ঠিক ততটাই রক্ত শীতল করে এই বিপদগামী ব্লগারদের হত্যা করা হলে।

সত্যিকার অর্থে এমন হত্যাকান্ড শুধুমাত্র ব্লগারদের আর সংখ্যালুঘু মুক্তমনাদের আঘাত করে। এমন হত্যার পর সহ ব্লগারদের মাঝে যে অসহায়ত্ব জন্ম নেয়, দাবানলের মতো বুকের পাঁজরে যে ক্রোধের আগুন জ্বলে, মানচিত্র-বিশ্বাস-প্রথার বিরুদ্ধে ঘৃণার যে বিস্তার ঘটায় সেগুলো কে কোনদিন শব্দ বিন্যাসে প্রকাশ করা যাবে না। সেই নিরর্থক চেষ্টা করতে এই লেখার জন্ম নয়। বরং নিজের ভেতর জন্ম নেওয়া ক্ষোভ, ঘৃনা, অবিশ্বাস আর ক্রোধের সুনামির পরে যে ভাবনাটি, যে প্রশ্নটি কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তার উত্তর খুঁজতেই এই ছাইপাশ লিখতে বসা।

প্রথম যে প্রশ্নটি গত বছর দুয়েক মাথার ভিতর কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে তা হলো “কবে হতে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে ভালো নেই? কবে থেকে বাংলাদেশে এই ঘোর অন্ধকার নেমে আসা শুরু করেছে? সময়ের নানান বাঁকে ঘুরে ঘুরে লম্বা একখান ইতিহাস রচনা করে বড় ইতিহাস অজ্ঞ প্রমাণ করা যায়, আমি সেই চেষ্টা করবো না। ৭৫এ ইতিহাসের নির্মম হত্যাকান্ড, স্বৈরাশাসনের পতাকায় ডুবে থাকা থেকে শুরু করে বিম্পি-জামাতের ২০০১-০৬ সালের অপ-শাসন সবকিছু কে সমান দায়ী করে এই অন্ধকার কে আরো অন্ধকারে নিয়ে যাবো না। কারণ আমি জানি সেই অন্ধকার সময়গুলো কে ঠিকি সফলতার সাথে পেছনে ফেলেছিলো বাংলাদেশ। অথচ সময়ের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো যারাই এই অন্ধকার কে পেছনে ফেলেছিলো আজ তারাই আবার সেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশ কে। হ্যাঁ এটাই এখন ছাপান্নো হাজার বর্গমাইলের দেশে সবচেয়ে বড় সত্যি। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ নামক সংগঠনটি কি হঠাৎ করে একদিনে এমন উল্টোপথে চলা শুরু করেছে? না, একদিনে তারা এমন উল্টো পথে চলা শুরু করেনি। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আদর্শ কে বিকিয়ে দিয়ে তাদের এই উল্টোপথে পথ চলাটা দীর্ঘ সময়ের। যদিও তাদের এই বিচ্যুতি কে আমরা জন্মলগ্নের সময় অস্বীকার করেছি কিংবা এড়িয়ে গেছি। ভেবেছি, বলেছি অন্তত রাজাকারের বিচারের জন্যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যে, মুক্তমনে লেখার জন্যে ওরা ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প নেই!

কিন্তু সময়ের কি নির্মম পরিহাস এড়িয়ে যাওয়া সেই ব্যাধি-ই আজ আমাদের সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে গেছে। বছর কয়েক আগে বন্ধুদের এক আড্ডায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মৌুখিক সন্ত্রাস দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলাম। আমার সেই বন্ধু বৌদ্ধ ধর্মালম্বী ছিলো। আমার সেই বন্ধু ভীষন পড়ুয়া আর প্রগতির মশাল ছিলো। সেই বলেছিলো সংবিধান-ই রাষ্ট্রধর্মের জন্ম দিয়ে আমাদের কে দিনের পর তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রেখেছে। কেন একটা অসম্প্রদায়িক দল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দল রাষ্ট্রধর্মে বিশ্বাসী থাকবে? কতকিছু সংশোধন হয় কেন বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম সংশোধন হয় না, হবে না? আমরা তখন উপহাস করে বলেছিলাম আরে ব্যাটা কবে কার আমলে তোরা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক ছিলি। আমরা বলেছিলাম রাষ্ট্রের বেশিভাগ মানুষ যদি অশিক্ষিত আর ধর্মান্ধ হয় তাহলে টিকে থাকার স্বার্থেই কিছুটা তাদের সাথে আপোষ করতে হয়, কিছুটা কৌশলী হতে হয়। আজ এই অবেলায় বুঝতে পেরেছি সেই সঠিক ছিলো, আমি আর আমরা ভুল ছিলাম।

মূলত ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকেই বাংলাদেশের আলো-অন্ধকারের মাঝে দৃশ্যমান সবচেয়ে বড় পার্থক্যটির পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে আসা। শাহবাগে জন্ম নেওয়া সেই গণজাগরণ-ই স্পষ্ট করে দিয়েছে এ্ই মানচিত্রে জন্ম নেওয়া দুই ভিন্ন পথের মানুষদের। সেই সময়েই অন্ধকারের অগ্রদূতদের হাতে খুন হয়েছিলেন ব্লগার রাজীব হায়দায়। তারপর মত আর বিশ্বাসের সেই বিভক্তি শুধুমাত্র প্রকাশের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি, শুরু হয় কতল করার প্রক্রিয়া, শুরু হয় মৌলবাদের বীজে ভয়ের চাষাবাদ প্রক্রিয়া। আর সেই কর্মে ইতিহাসের পাতা থেকে আজ পর্যন্ত জয়ী দলটার নাম ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠন। গনজাগরণের ঠিক তিনমাস পরে ৫ই মে, অন্ধকারের লাঠিয়াল-রা নিজেদের আর আড়াল রাখেনি, বরং বীরদর্পনেই অন্ধকারের গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে জড়ো হয়েছিলো রাজধানীর বুকে। সেখানেই হেফাজতে ইসলাম নামের মৌলবাদী সংগঠনটি ১৩ দফা দিয়েছিলো সরকার কে। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখ যোগ্য ছিলো আল্লাহ্‌, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করতে হবে এবং কথিত শাহবাগী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-র শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী কুলাঙ্গার ব্লগার ও ইসলাম বিদ্বেষীদের সকল অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই দাবি আদায়ে জন্যে ঢাকা ঘেরাও করার দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক সন্ত্রাসের জন্ম দিয়েছিলো ধর্মীয় শান্তি আর সম্প্রীতির ধারক ও বাহকেরা। সেই স্মৃতি মৃত্যুর আগেও ভুলার কথা না বাঙালির।

পর্দার সামনে দৃশমান ঘটনায় বল প্রয়োগ করে তাদের সেদিন সরালেও পর্দার আড়ালে ওদের কেই বুকে টেনে নিয়েছিলো একশ ভাগ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ আর আন্তর্জাতিক মানের অসম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধের দলটি। মৌলবাদী সংগঠন টি কে শান্ত করতেই তাদের তৈরি করে দেওয়া ব্লগার দের গ্রেফতার করেছিলো মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী সরকার। সত্যিকার অর্থে সেই প্রথম নিবিড় করে মৌলবাদের সাথে আপোষের বীজ বুনেছিলো দলটি। তারপর দিনে দিনে মৌলবাদী সংগঠন টি হয়ে ওঠেছে তাদের সবচেয়ে কাজের আপনজন। একদিন ঘোষনা আসে ছাত্রলীগ-আওয়ামিলীগ আর হেফাজত পরস্পর বন্ধু! সেই বন্ধুত্বের ঘোষনার মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় হেফাজতে লীগ। হেফাজতে লীগ কে সরকারী জমি দান করার বিপরীতে তার শত্রুদের নরম করে লেখার পরামর্শ দেওয়া হলো আওয়ামী সরকারের নানান মহল থেকে। সেটিতে ও যখন পোষা দলটি তৃপ্ত হলো না তখন তাদের জন্যে ৫৭ ধারা নামক এক মধ্যযুগীয় ধারার জন্ম দেওয়া হলো।

কিন্তু রক্তপিপাসুর দানবের দল তাতেও তুষ্ট হলো না, তাই নিজেরাই তাদের মতের কিংবা বিশ্বাসের বাহিরের মানুষ কে কঠোর শাস্তি দিতে মাঠে নেমে পড়লো। তারপর তালিকা লম্বা হলো, চাপাতির তলে যাওয়া মানুষের পরিচয়ে ভিন্নতা এলো। লেখক, প্রকাশক, ধর্ম যাজক, ধর্ম প্রচারক, শিয়া সম্প্রদায় থেকে শুরু করে যারাই তাদের মতের-বিশ্বাসের বাহিরে গেলো তাদের জীবন-ই স্বাধীন সার্বভৌম জন্মভূমে বিপন্ন হয়ে উঠলো। আর রাষ্ট্র তথা অসম্প্রদায়িক সরকার ততদিনে গর্তে ঢুকে পড়া ইঁদুরের বনে গেলো, যদিও মাঝে মধ্যে বেরিয়ে এসে এসব বিচ্ছিন ঘটনা, এগুলো দেশী-বিদেশী চক্রান্ত, স্বাধীনতা বিরোধী দোসর চক্রের ঘটনা বলে নিজেদের অসম্প্রদায়িক দায়িত্ব শেষ করতে থাকলো। এভাবেই চলতে চলতে একদিন এসব হত্যায় প্রিয়জন হারানো মানুষদের আশ্বাস কিংবা সান্তনা দেওয়ার নৈতিক সাহসটুকু ও তারা হারালো। ছাড় পাওয়া রক্তপিপাসু ঘাতকদের দেখেই অনুপ্রাণিত হলো অসম্প্রদায়িক দলটির দেশপ্রেমিক কর্মী বৃন্দ-রা। তারাও শুরু করলো হিন্দুদের ঘর বাড়ি দখল, পেটের বাচ্ছাকে লাথি মেরে মৃত্যুদানের মতো মহৎ কর্ম সম্পাদন করা। শুরু হলো লুটের উৎসব, শুরু হলো যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার পাওয়ার উল্লাস। এর মাঝে একদিন জাতির ভবিষ্যত রাষ্ট্রনায়কের থেকে ঘোষনা আসে ব্লগার হত্যার প্রতিবাদ যারা করছে তারা নির্বোধ! তারা ভুলে গেছে এরচেয়ে খারাপ ছিলো বিম্পি-জামাতের সময়ে এবং তারা নিজেরা নাস্তিক প্রমাণিত হতে চায় না। এরপর ঘাতকেদের বুঝতে বাকী থাকে না বর্তমান আর ভবিষ্যত সরকার প্রধান যখন পণ করছে তাদের ধরবে না তখন আর রাতের আধাঁরে কেন? তারপর শুরু হলো প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাযজ্ঞ, বাসায় ঢুকে, মার্কেটের মতো জনবহুল এলাকয় খুনের উৎসব। এমন হত্যাকান্ডের উৎসবের শেষ কোথায় জানি না, আদৌ শেষ হবে কিনা তাও অজানা। তবে এইটুকু জানি ক্ষমতার লোভে, ভোটের লোভ করে যে সহনশীলতা আর আপোষনামায় বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ নাম লিখিয়েছে তাতে একদিন দলটি-ই দংশিত হবে আর সেদিন-ই গভীরতম অন্ধকারটি চিরস্থায়ী ভাবে নেমে আসবে বাংলাদেশে।

এভাবে দিনের পর দিন মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যার খবর শুনার পর সহ ব্লগার থেকে শুরু করে মুক্তমনা মানুষদের যে প্রতিক্রিয়াটি হয় সেটি হলো ‘না আর লিখবো না’। আমি খুব ভালো করে জানি, অনেক অনেক হতাশা, তারচেয়েও বেশি অপরাধবোধ আর একটু একটু ভয় থেকে জন্ম নেওয়া এই বোধ ক্ষণস্থায়ী। যারা আপোষ করতে শিখেনি, প্রশ্ন ছাড়া কিছুকে কোনকালে মেনে নেয়নি, কিছু পাওয়া আশায় যারা কারো কাছে মাথা নত করতে জানেনি, তাদের পক্ষে কোনদিনও লেখালেখি বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব না। অন্যায়, অত্যাচার, ধর্মান্ধতা যাদের ভেতরের সমস্ত সত্তায় রক্তক্ষরণ ঘটনায় তাদের জন্যে লেখাটাই বেঁচে থাকা। তাই যারা একবার এই আপোষনামার স্বর্গভূমে বিনা প্রশ্নে সব মেনে নেওয়ার সাথে বিরোধ করেছে তারা কোনদিন লেখা থামাতে পারবে না।

কিন্তু শুধু লিখেই এ অবস্থা দূর করা যাবে এমনটা বোধহয় আর সম্ভব না। লেখার পাশাপাশি সময় এসেছে রাজনৈতিক দল তথা সরকারের উপর চাপ প্রয়োগের, সময় এসেছে মাঠের আন্দোলনের। রাজনৈতিক দল ছাড়া, রাজনৈতিক সরকার ছাড়া এ ঘোর অন্ধকার থেকে দেশকে মুক্ত করার দ্বিতীয় কোন পথ নেই। আলো আসবেই, আলো আসবেই করে আশার বেলুন উড়াতে থাকলে সেই বেলুন একদিন ঠিকি চুপসে যাবে কিন্তু আলো আর আসবে না। এই মানচিত্রের ইতিহাস বলে এখানে কোন কিছুই রাজপথের আন্দোলন ছাড়া, রাজপথের রক্ত ছাড়া অর্জিত হয়নি। এমন কি রাজাকারের বিচারে যখন কোথায় একটা অাপোসের সুর বেজেছিলো, তখনি কিছু ব্লগার আর মুক্তমনা মানুষ রাজপথে বেরিয়ে কোটি মানুষের মাঝে আন্দোলনের তেজদীপ্ত শিখা ছড়িয়ে দিয়েছিলো। আজও তেমন করে কিংবা তারচেয়েও প্রবলভাবে প্রতিবাদ করার সময় এসেছে। বই পড়ুয়া থেকে শুরু করে হিন্দি সিরিয়াল দেখা মানুষ এখন আর কেউ নিরাপদ নয়। লেখক-প্রকাশক, নাট্যকর্মী-চলচ্চিত্রকর্মী, বুদ্ধিজীবি থেকে শুরু করে আপতত নিরীহ ফেসবুক ব্যবহার কারী কেউই নিশ্চিত নয় আজ কিংবা কাল কোপটা যে তার উপর পড়বে না। সুতরাং প্রতিবাদ হতে হবে সর্বস্তরে। এই প্রতিবাদে, এই প্রতিরোধে একটা কথা মনে রাখতে হবে মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দল-ই আমার-আপনার বন্ধু নয়, ছিলো না কোন কালে। আপনি যেমন ছিলেন, আপনি যেমন চেয়েছেন তারা তেমনি হয়েছে। তাই নিজের অস্তিত্ব, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে নিরাপদ একটা আবাসভূমি রেখে যাওয়ার প্রত্যয়ে ঘরে-বাহিরে সবখানে জেগে উঠতে হবে।

ছোটবেলায় শুনেছিলাম যে দেশে গুণীদের কদর করা হয় না সে দেশে গুণী মানুষ জন্মায় না। বাংলাদেশে নেমে আসা এই ঘোরতর অন্ধকার দূর করতে সাহসহীন গুণী মানুষের কোন প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই ইউনুস-আবু সায়ীদদের মতো তেলে-জলে মিশে থাকা গুণী মানুষের, প্রয়োজন নেই ”আমরা কি পারি না সবাই কে ভালোবাসতে” বলে চুপা পাকুপ্রেমী ফারুকী গংদের, বাংলাদেশের প্রয়োজন আরজ আলী মাতুব্বর, মুনীর চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদের মতো সাহসী আলোর পথের দিশারীদের, বাংলাদেশের প্রয়োজন রফিক-সালাম-বরকরতের মতো রাজপথের চিরনির্ভীক মুখের। এরাই পারে মানুষের পৃথিবীতে মানুষের-ই জয় নিশ্চিত করতে। অমানুষের ভিড়ে জয় হোক মানুষের।


মন্তব্য

নজমুল আলবাব এর ছবি

হেফাজতের প্রথম সমাবেশ হয় এপ্রিলের ৬ তারিখে। মে মাসে ২য় সমাবেশ। এপ্রিলে দেওয়া হয় ১৩ দফা। এর পর ব্লগারদের আটক করা হয়।

গণজাগরণের প্রথম সপ্তাতেই জঙ্গিবাহিনী প্রস্তুতি শুরু করেছে সম্ভবত। এজন্যই দশ দিনের মাথায় রাজীব হায়দার খুন হয়েছেন।

এক লহমা এর ছবি

"রাজনৈতিক দল ছাড়া, রাজনৈতিক সরকার ছাড়া এ ঘোর অন্ধকার থেকে দেশকে মুক্ত করার দ্বিতীয় কোন পথ নেই। আলো আসবেই, আলো আসবেই করে আশার বেলুন উড়াতে থাকলে সেই বেলুন একদিন ঠিকি চুপসে যাবে কিন্তু আলো আর আসবে না। এই মানচিত্রের ইতিহাস বলে এখানে কোন কিছুই রাজপথের আন্দোলন ছাড়া, রাজপথের রক্ত ছাড়া অর্জিত হয়নি।" - চলুক

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

দীপন ভাইয়ের বাবা বলেছেন, মানুষের শুভ বুদ্ধি জাগ্রত হওয়া প্রয়োজন, যা তার ছেলের হত্যাকারীদের বিচারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। আজ একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষের গলা কেটে ফেলার পরও যখন মানুষের এতটুকু অনুভূতি হয় না, বরং নির্লিপ্ত স্বরে বলে, "ও, এও বুঝি নাস্তিক ছিল!', তখন দীপন ভাইয়ের বাবার কথাকেই গ্রহনযোগ্য মনে হয়, আসলেই তো, কি হবে এসব বিচার করে? কাদের জন্য করা হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ? তাই স্যারের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে বলতে চাইঃ জাগ্রত হউক মানুষের শুভবুদ্ধির, মানুষের পৃথিবীতে মানুষের জয় হউক!
।।।।।।।।।।।।।
অনিত্র

নীড় সন্ধানী এর ছবি

শাহবাগের গণজাগরণকে যেদিন থেকে নাস্তিক সমাবেশ হিসেবে ঘোষণা করলো আমার দেশ ও মাহমুদুর রহমান, সেদিন কেন যেন সরকার মাহমুদুরের বাক স্বাধীনতাকে অতিমাত্রায় স্পেস দিয়েছিল, তাকে যখন ঘাড় ধরে জেলে পোরা হলো ততদিনে অনিষ্ট যা হবার তা হয়ে গেছে। আজকে তারই ধারাবাহিকতা চলছে।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

অতিথি লেখক এর ছবি

রাগে ক্ষোভে শরীরের রক্ত টগবগ করে ফোটে ভাই। ভীষণ ইচ্ছে করে কলম চালিয়ে যেতে জীবন, যৌবন তুচ্ছ করে। কিন্তু বাবা মা যখন চোখে জল এনে বলে, "চুপ করে থাকিস বাবা, কাউকে কিচ্ছু বলবি না" তখন তাদের শীতল চোখে তাকিয়ে সব শান্ত হয়ে যায়। আমি হারতে অভ্যস্ত হই।

-কাফের

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।