আমার স্মৃতি কথনঃ হিজরত টু আমেরিকা-০২

Sohel Lehos এর ছবি
লিখেছেন Sohel Lehos [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ০২/১২/২০১৪ - ৩:২৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রথম পর্ব পড়তে চাইলে এখানে চিপি দিন

নানা দেশের আকাশ পেরিয়ে প্লেন যখন ল্যান্ড করল তখন আমস্টারডামে বিকেল হয়ে গেছে। যেখান থেকে প্লেন টিকেট কেটেছিলাম তারা বলে দিয়েছিল আমস্টারডামে এক রাত থাকতে হবে। টিকেটের সাথেই হোটেল বুকিং দেয়া আছে।

প্রথমেই বলে নেই সে আমলের ছেলে পেলে হিসাবে আমরা বিশাল ভোদাই ছিলাম। অভদ্রসুলভ বাক্য ব্যবহার করতে হল বলে নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। ঐ আমলে আমাদের চিন্তার বিস্তৃতি কেমন ছিল তার বিবরণ দিতে গিয়ে "ভোদাই" এর থেকে ভাল কোন শব্দ পেলাম না। সেই প্রাগৈতিহাসিক আমলে ইন্টারনেটের তেমন চল ছিল না। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লক্স কিংবা যমুনা ফিউচার পার্ক এর মতন অত্যাধুনিক মল ছিল না। ইস্টার্ন প্লাজায় তখন যে শপিং করত তখন তাকে আমরা ভাবতাম মালদার পার্টি। এখনকার ছেলেপেলেদের তুলনায় ঐ আমলে আমরা যার পর নাই বেয়াকুব ছিলাম।

যাহোক জীবনের প্রথম দেশের বাইরে পা দিয়ে খানিকটা খেই হারিয়ে ফেললাম। লাগেজ কি আমস্টারডামে নিতে হবে নাকি মিনিয়াপোলিসে গিয়ে নেব বুঝতে পারছিলাম না। এমন সময় প্লেনের সেই সফেদ সুন্দরী বিমান বালাদের একজনকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞাস করলাম। তিনি আমার টিকেট দেখে বললেন আমার লাগেজ মিনিয়াপোলিসেই গিয়ে নিতে হবে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

আন্দাজের উপর ভর করে এক লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিন দিনের ভিসা দেয়া হল। কাউন্টারে জিজ্ঞাস করলাম কিভাবে হোটেলে যাব। কাউন্টারে বসা ভদ্রলোক বললেন এয়ারপোর্টের বাইরে হোটেলের বাস পাওয়া যাবে। সেখানে গেলেই বাকিটা তারা বলে দেবে। আমি ধন্যবাদ দিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতেই কুঁকড়ে গেলাম। ওরে কি শীতরে! মনে হল উলের সোয়েটার বোনা হয় যে সুঁই দিয়ে ঠিক সেরকম মোটা দুটি সুঁই আমার দুই নাকের ফুটো দিয়ে কেউ ভচ করে ঢুকিয়ে দিয়েছে। পড়নে ছিল শুধু পাতলা এক সোয়েটার। ওই হাড়ের মজ্জা কাঁপানো শীতের কাছে আমার এই পাতলা সোয়েটারতো দুধ ভাত। আমার ঠক ঠক করে কাঁপুনি উঠে গেল। এক হোটেলের বাস এসে দাড়াল। তাকে আমার টিকেট দেখাতেই উঠে পড়তে বলল। আমি স্পাইডার ম্যানের মত এক লম্ফ দিয়ে বাসে উঠে গেলাম।

আমি বঙ্গ সন্তান। আমার দু চোখ রাস্তা ঘাঁটে কিলবিল করে মানুষ হেটে বেড়াচ্ছে দেখে অভ্যস্ত। এয়ারপোর্ট ছেড়ে মাইল দশেক চলে আসার পরও রাস্তায় কোন মানুষ না দেখে যার পর নাই বিস্মিত হলাম। এই দেশের জনগণ সব ঠান্ডার দাপটে লেপের নীচে আশ্রয় নিয়েছে কিনা কে জানে। বাসে আরো দুজন বাংলাদেশীর সাথে পরিচয় হল। উনারা যদিও একই প্লেনে আমস্টারডাম এসেছেন, কিন্তু আগামিকাল অন্য প্লেনে কানাডা যাবেন। বাঙ্গালী দেখে বুকে বেশ বল ফিরে পেলাম। বাস কিছুক্ষণের ভেতর হোটেলে পৌছে গেল।

হোটেল ফ্রন্ট ডেস্কে চেক ইন করে নিজের রুমে চলে এলাম। ছিম ছাম একটা রুম। জানালার পর্দা খুলে বাইরে তাকাতে শুধু পার্কিং লট আর সামনের রাস্তা পেড়িয়ে বন চোখে পড়ল। এই তাহলে বিদেশ? দেশ ছেড়ে আসার বিষাদের ছোঁয়া তখনও আমার গন্ডারের চামড়া ভেদ করে হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। গন্তব্য এবং সেখানে গিয়ে স্থিতু হয়ে বসার এখনও ঢের সময় বাকি আছে। আমি জানি একদিন কোন রকম বিপদ সংকেত না জানিয়েই সাইক্লোনের বেগে বিচ্ছেদের স্মৃতি এসে হৃদয়ের উপকূল ধরে ব্যাপক তান্ডবলীলা চালাবে। সেদিন এখনও বেশ দূরে। আমি হাত মুখ ধুয়ে সেই দুই বাংলাদেশীর একজনের রুমে চলে গেলাম।

শফিক সাহেবের (কাপ্লনিক নাম। আসল নাম মনে নেই) বয়স ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের ভেতর হবে। টরান্টোতে থাকেন। কোন এক বড়সর হোটেলের সেফ হিসাবে কাজ করে বিস্তর টাকা পয়সা করেছেন। এই পথে তিনি আগেও এসেছেন। এই হোটেল তার চেনা। তার বৌ-বাচ্চা সবাই টরান্টোতে। কি কাজে যেন দেশে গিয়েছিলেন। নিজের গল্প করছিলেন শফিক সাহেব। আমকে বললেন,

বুঝলেন ছোট ভাই, আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে। দুইটাই কানাডাতে জন্মাইছে। শরীর হইছে তুলার মত। যখন দেশে যাই তখনই এদের রক্ত আমাশা শুরু হইয়া যায়। তারপরও এক দুই বছর পর পরই দেশে নিয়া যাই। দেশে নিয়া গিয়া এগুলারে পুকুরে ছাইড়া দেই। সারাদিন হাঁসের মত দাপদাপি কইরা দুই দিন পর হয় একশ চার ডিগ্রী জ্বর। এদের মা আমার উপর অনেক চিল্লায়। কিন্তু আমি কেয়ার করি না। বাপ দাদার দেশে যাইয়া দেশী পোলাপানের মতন আনন্দ করব না এইটা কোন কথা কি কন ছোট ভাই?

আমি মাথা দুলিয়ে সায় দেই,

হক কথা। একেবারে ১০০% খাঁটি।

এর মধ্যে দ্বিতীয় বাংলাদেশী, মিজান সাহেব (কাল্পনিক নাম), এসে যোগ দিলেন। তার অবস্থা অনেকটা আমার মতই। জীবনের প্রথম দেশের বাইরে যাচ্ছেন। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার বলে তিনি কানাডার ভিসা পেয়েছেন। কানাডাতে কোথায় উঠবেন জানেন না। সেখানে তার চেনা জানা কেউ নেই। দেশ থেকে ডলার নিয়ে এসেছেন। কিছুদিন হোটেলে থেকে পরে কোন একটা ব্যাবস্থা করে নেবেন। বাংলাদেশে সরকারী উঁচু পদে চাকুরী করতেন তিনি। ছেলে মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তা করে দেশ ছেড়েছেন। কানাডাতে যেয়ে একটু স্থিতু হবার পর বউ বাচ্চা নিয়ে আসবেন। আহারে দেশ! কত কারণেই না আমরা নাড়ির টান ছিন্ন করি।

ঘন্টা খানেক আড্ডা দিয়ে নিজের রুমে চলে এলাম। বেশ ক্ষুধা ক্ষুধা লাগছিল। কি খাব কোথায় খাব বুঝতে পারছিলাম না। হোটেল রিসেপশন ডেস্কে জিজ্ঞাস করে জানা গেল এই বিল্ডিং এর পাঁচ তলায় রেস্তোরা কাম বার আছে। আমি পাঁচ তলার দিকে দৌড় লাগালাম।

রেস্টুরেন্টের বারে বসে জনা পাঁচেক চুল পাকা ভদ্রলোক গলা ভেজাচ্ছিলেন। আমি গিয়ে বসতেই বার টেন্ডার জিজ্ঞাস করলেন কি লাগবে। আমি মেন্যু হাতিয়ে দেখি কোন খাবারই চেনা লাগে না। দেশ ছাড়ার সময় একজন সর্ব জ্ঞানী মুরুব্বী বলেছিলেন কোন ক্রমেই যেন পর্ক না খাই। পর্ক হল শুকরের মাংস। আমি মেন্যুর দিকে তাকিয়ে পর্ক খুঁজি। বেখেয়ালে পেটের মধ্যে পর্ক চলে গেলে মুসিবত। কোথাও পর্ক লেখা দেখলাম না। সেই আমলে দেশে থাকতে "হট ডগ" বলে নতুন একটা জিনিসের নাম শুনেছিলাম। মেন্যুর এক জায়গায় চেনা নামটি দেখতে পেয়ে আমি তাই অর্ডার দিয়ে বসলাম। ভরপেট হট ডগ আর কোকা কোলা খেয়ে নিজের রুমে ফেরত আসলাম। আহারে তখন জানতাম না যে হট ডগ শুধু "হাম্বা হাম্বা" জাতীয় প্রানী থেকেই নয়, "ঘোত ঘোত" জাতীয় প্রানীর দেহ থেকেও আসতে পারে। প্রথমটির থেকে বরঞ্চ দ্বিতীয়টির থেকেই আসার সম্ভাবনা বেশি।

দীর্ঘ আকাশ পথ ভ্রমণে বেশ ক্লান্তি লাগছিল। জামা কাপড় খুলে শুয়ে পড়লাম। রিসেপশনে বলে রেখেছি সকাল ৮টায় যেন তুলে দেয়। আমার ফ্লাইট সকাল ১১ টায়। কুম্ভকর্ণ ব্যাতীত সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায় কারো ভাল ঘুম হতে পারে বলে আমার জানা নেই। সারারত শুধু এপাশ ওপাশ আর বিছানার সাথে কুস্তি লড়ে সকালে হাত মুখ ধুয়ে হোটেল বাসে করেই এয়ারপোর্টে চলে এলাম।

এয়ারপোর্টেও যে চাকুরীর মত ইন্টারভিউ দিতে হয় জানা ছিল না। প্লেনে ঢোকার আগে অনেক গুলো বুথ। আমেরিকাগামী যাত্রীদের আলদা আলাদা করে প্রতিটি বুথে ইন্টারভিউ নেয়া হচ্ছে। ইন্টারভিউয়ের প্রশ্ন পর্ব এই রকমঃ

আমেরিকায় কেন যাচ্ছেন?

আমেরিকার কোথায় যাচ্ছেন?

আমেরিকায় কার কাছে যাচ্ছেন? তাদের সাথে আপনার সম্পর্ক কি? তাদের ঠিকানা বলুন।

সাথে কোন ইলেক্ট্রকিক্স আছে কি? থেকে থাকলে কি ধরণের ইলেক্ট্রনিক্স?

আপনি কি আপনার লাগেজ নিজে গুছিয়েছেন? নাকি অন্য কেউ আপনার লাগেজ গুছিয়ে দিয়েছে?

আপনার লাগেজে আন্য কারো জন্য কি কিছু বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন? কি বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন?

মনে হচ্ছিল কঠিন জব ইন্টারভিউ। মাত্র একটী পদের বিপরীতে অনেক বাঘা বাঘা ডিগ্রীধারী এলেমদার ক্যান্ডিডেট। আমতা আমতা করে আমি কোন মতে উতরে গেলাম। আমাকে প্লেনের ভেতর ঢোকার অনুমতি দেয়া হল।

শুরু হল চরম ক্লান্তিকর ভ্রমণের দ্বিতীয় অংশ। প্রথমে যা নজরে এল তা হল এই প্লেনটি উন্নতমানের এবং দেখতে ভাল। বিমান সুন্দরীরা মোলায়েম গলায় কথা বলেন। আর ঢাকা থেকে যে প্লেনে এসেছিলাম তার অবস্থা বেশ কাহিল ছিল। ভেতরের জিনিশপত্র ছিল মলিন। এয়ার হোস্টেসদের ব্যবহার ছিল কর্কশ। গরীব দেশের মানুষের সাথে গরীবি ব্যাবহার আর কি। প্লেন আটলান্টিক মহা সাগরের উপর দিয়ে উড়ে চলল।

আমস্টারডাম থেকে মিনিয়াপোলিস আট ঘন্টার পথ। কিছু মানুষ যেকোন যানবাহনে উঠেই এক দিকে কাত হয়ে চায়ের কেতলির মত সুন্দর করে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে নাক ডাকা শুরু করেন। এদের দেখলে হিংসায় আমার গা জ্বলে যায়। ইচ্ছা করে এদের নাক চিপে ধরি। যত ক্লান্তই থাকি না কেন যাত্রা পথে আমি ঘুমাতে পারি না। আমার ঘুম আসে না। যানবাহনে উঠা মাত্রই পড়ি মরি করে আমার ঘুম দৌড়ে পালিয়ে যায়।

প্লেনের টিভিতে মুভি দেখাচ্ছে। ঘন্টা দুয়েক মুভি দেখার পর হাই তুলি কিন্তু ঘুমের দেখা মেলে না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে চোখে পড়ে মেঘ। মেঘের নিচে মেঘ এবং তার নীচে আরেক প্রস্থ মেঘ। নীচের মেঘে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখলাম। ওখানে বোধ হয় বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা শ'দুয়েক যাত্রী প্লেনের ভেতর। কেউ নাক ডাকছে, কেউ বই পড়ছে, কেউ টিভি দেখছে, কেউ আবার হিশু করার জন্য বাথরুমে যাবে। বাংলাদেশ থেকে বাসে করে আমেরিকা যাওয়ার ব্যাবস্থা থাকলে আমার জন্য অনেক ভাল হত। বাস ভ্রমণের মজাই আলাদা। বাইরের প্রকৃতি, রাস্তা-ঘাট, দোকান-পাট কত কিছুই না দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। বহুকাল আগে একবার চট্টগ্রাম যাবার পথে দীর্ঘ কেশী এক বিষণ্ণ কিশোরীকে দেখেছিলাম পুকুর ঘাঁটে বসে থাকতে। মজার ব্যাপার হল তখন ঝুমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। জায়গাটা ছিল নোয়াখালি আর চট্টগ্রামের মাঝামাঝি কোথাও। প্লেনে করে কি আর এমন হৃদয়ে দাগ কেটে যাওয়া দৃশ্য চোখে পড়ে?

অনন্ত কাল পর প্লেনের পি এ সিস্টেমে পাইলট সাহেবের গুরু গম্ভীর গলা শোনা গেল। আমরা ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ল্যান্ড করতে যাচ্ছি। বিমান সুন্দরীরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমসের ফর্ম দিয়ে যাবেন। সেগুলো যেন আমরা পূরণ করে ফেলি। প্লেন আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামতে লাগল।

আমার মোশন সিকনেস আছে। দুলনি খেলে আমার বমি বমি ভাব হয়। প্লেন মাঝে মধ্যেই দুলে উঠতে লাগল। আমার পেট ঠেলে বমি আসতে লাগল। হড়বড় করে বমি করে দিলে বিরাট লজ্জায় পড়তে হবে। আমি দাঁত মুখ খিঁচে বমি আটকে রাখলাম। প্লেন ভ্রমণের আরেকটি সমস্যা হল কানে তালা লেগে যাওয়া। প্লেন ওঠা নামা করার সময় দ্রুত বাতাসের চাপের পরিবর্তন হয় বলে কানে তালা লেগে যায়। অনেক সময় ঢোক গিলেও সে তালা ছোটানো যায় না। বমির সাথে আমার কানে তালা লেগে গেল। কি মুসিবত!

প্লেন শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের আমেরিকায় এসে ল্যান্ড করল। অনেকটা বিধ্বস্ত হয়ে প্লেন থেকে বের হলাম। শুনতে খুব ঘেন্না লাগবে জানি তারপরও একটা কথা বলি। প্লেনে পেট ফেটে বমি চলে এসেছিল। পাশে বসা যাত্রীদের উপর বমি করে দিলে অমানবিক হবে ভেবে কাজটা করিনি। যেখানকার জিনিস সেখানেই ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।

ইমিগ্রেশনে গিয়ে লাইন দিতে হল। বিশাল লাইন। দুনিয়ার সমস্ত দেশ থেকে মানুষ এসে লাইন দিয়েছে। কত রঙ বেরঙের চামরার মানুষ দেখলাম। কালো মানুষ, কুট কুটে কালো মানুষ, ভাষায় প্রকাশে অক্ষম এই রকম কিছু কালো মানুষ, হলুদ চামরার চৈনিক মানুষ, স্বাভাবিক সাদা মানুষ, সাদার থেকেও সাদা (আলবাইনো) অস্বাভাবিক সাদা মানুষ, বাদামী চামরার দেশী মানুষ...ইত্যাদি। ইমিগ্রেশন অফিসারের স্বাস্থ্য মাসাল্লাহ! মাটির হাতি আর জলের হস্তীর যদি সঙ্গম করার রেওয়াজ থাকত তাহলে তাদের মিলনে সৃষ্ট প্রাণীটি দেখতে বোধ করি এমনই হত। আমার সব কাগজের দিকে কিছুক্ষণ নজর বুলিয়ে অস্বাভাবিক মোটা গলায় তিনি বললেন,

ফলো মি।

তাকে ফলো করে যে রুমে গেলাম সেটা দেখতে অনেকটা শ্রেনী কক্ষের মত। অনেক গুলো বেঞ্চ পাতা। সামনে ডেস্কে বসে জনৈক ইমিগ্রেশন অফিসার কম্পিউটারের বোতাম টেপাটেপি করছেন। তার সামনে ফাইলের গাদা। আমাকে বসতে বলা হল। বসলাম। কিছুক্ষণ পর ডাক এল। আবার ছোটখাট ইন্টারভিউয়ের সম্মুখীন হতে হল।

ইমিগ্রেশন অফিসারঃ এসব কাগজ তোমাকে কে দিয়েছে?

আমিঃ ঢাকা ইউ এস অ্যাম্বেসী।

ইমিগ্রেশন অফিসারঃ ইউ এস এর কোথায় যাবে?

আমিঃ ম্যাডিসন, উইসকনসিন।

ইমিগ্রেশন অফিসারঃ সেখানে কেন?

আমিঃ আমার আংকেল থাকেন।

ইমিগ্রেশন অফিসারঃ তাদের ঠিকানা কি?

আমি ঠিকানা বললাম। অফিসার বললেন,

দেশে থাকতে তুমি কি তোমার আংকেলকে নিয়মিত চিঠি লিখতে?

আমিঃ না।

ইমিগ্রেশন অফিসারঃ তাহলে ঠিকানা মনে রেখেছ কিভাবে?

আমি ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে বললাম,

দেশ থেকে আসার আগে মুখস্ত করে এসেছি।

ইমিগ্রেশন অফিসার চেহারা কালো করে বললেন,

হুম।

আমার আঙ্গুলের ছাপ নেয়া হল। পাসপোর্টের উপর সীল দেয়া হল। পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসার বললেন,

ওয়েলকাম টু ইউ এস এ।

আমি হাঁফ ছেড়ে লাগেজ সংগ্রহ করতে ছুটলাম। লাগেজ নিয়ে বের হবার সময় কাস্টমস আটকালো। যথারীতি শুরু হল ইন্টারভিউ।

কাস্টমস অফিসারঃ তুমি সাথে করে কোন ফলমূল নিয়ে এসেছ?

আমিঃ না।

কাস্টমস অফিসারঃ গাছ-গাছালী, চারা, বীজ?

আমিঃ না।

কাস্টমস অফিসারঃ মাছা-মাংস জাতীয় খাবার?

আমিঃ না।

কাস্টমস অফিসারঃ তোমার লাগেজ খুলতে পারি?

আমিঃ হ্যা পার।

লাগেজ খুলে জিনিস পত্র হাতড়ে কাস্টমস অফিসার বললেন,

এগুলো কি?

আমিঃ শুকনা মিষ্টি।

কাস্টমস অফিসারঃ ওহ আচ্ছা।

আমাকে যেতে দেয়া হল। তখন ইউ এস এর সেন্ট্রাল টাইম জোন অনুযায়ী বিকেল ৪ টা বেজে ৩০ মিনিট। আমাকে নিতে আসবেন পারভেজ ভাই। আমাদের বাবারা এক সময়ের কলিগ এবং ঘনিষ্ট বন্ধু। আমরা একই জায়গায় বড় হয়েছি। পারভেজ ভাইরা নব্বই/একানব্বই সালের দিকে আমেরিকা চলে এসেছিলেন। তাকে দেখেছি ছোটবেলায়। চেহারা ঠিক মত মনে নেই। শুধু মনে আছে তাদের বাসায় গেলে সেভেন আপ-কোকা কোলা খেতে দিতেন। তখন কোমল পানীয়ের পাগল ছিলাম। দুখঃজনক ভাবে বাসায় খেতে দেয়া হত না। দাঁত নষ্ট হয়ে যাবে বলে।

রিসিভিং এড়িয়াতে এসে পারভেজ ভাইকে দেখলাম না। হাঁদার মত চারদিকে তাকাতে লাগলাম। ঘন্টা খানেক পার হয়ে যাবার পরও যখন পারভেজ ভাইয়ের দেখা মিলল না তখন আমার পাল পিটিশন বেড়ে গেল। ঘটনা কি? আমার বাবার চেনা এক লোকের ট্রাভেল এজন্সী থেকে টিকেট কেটেছিলাম। তাকে বলা হয়েছিল ম্যাডিসন, উইসকনসিনের যত কাছে সম্ভব কোন বিমান বন্দর পর্যন্ত টিকেট কেটে দিতে। সে লোক হে হে করে হেসে বলল,"অবশ্যই...অবশ্যই"। তিনি খোঁজ খবর নিয়ে মিনিয়াপোলিস, মিনেসোটা পর্যন্ত টিকেট করে দিলেন। পারভেজ ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেল মিনিয়াপোলিস ম্যাডিসন থেকে ২৭০ মাইল দূরে। গাড়িতে যেতে লাগে পাঁচ ঘন্টা। মেজাজ গেল তিরিক্ষি হয়ে। ট্রাভেল এজেন্সীর সাথে যোগাযোগ করা হল। তার বললেন টিকেট চেঞ্জ করতে হলে ব্যাপক গ্যাঞ্জাম পোহাতে হবে। এত গ্যাঞ্জাম এখন না করাই ভাল...ইত্যাদি।

এয়ারপোর্টের বাইরে গিয়ে একবার ঢুঁ মেরে আসলাম। বাবারে বাবা শীত কাহাঁকে বলে! বাইরে ট্যাক্সি-ক্যাবের লাইন। আমাকে দেখেই ঠিক বাংলদেশের পরিস্থিতি তৈরী হল। ঝক ঝকে সাদা দাঁতের কৃষ্ণ ট্যাক্সি চালকেরা আমাকে ছেঁকে ধরল। আমি বললাম আমকে নিতে লোক আসবে। এঁরা আবার আমাদের থেকে বেশ ভদ্র। উত্তর শোনার পর আমাকে আর জ্বালাল না। ঠান্ডায় টিকতে না পেরে আমি ভেতরে এসে বসলাম। কোন কারণে পারভেজ ভাইয়ের দেখা না পেলে ম্যাডিসন শহর পর্যন্ত যাওয়ার ব্যাবস্থা আমার নিজেকেই করতে হবে। সাথে পারভেজ ভাইদের ফোন নাম্বার ছিল। কিন্তু কাজের সময় অবধারিত ভাবে কিছুই পাওয়া যায়না। পকেট হাতড়ে নাম্বার খুঁজে পেলাম না। দেশের বাইরে প্রথম এসেছি। "কেমনে কি" কিছুই জানি না। আমি অসহায়ের মত ওয়েটিং এড়িয়াতে যখন বসে আছি তখন আমাদের মত দেখতে ফর্সা এক তরুনকে দেখা গেল তাড়াহুড়ো করে এসে ফ্লাইট ইনফরমেশনের টিভি মনিটরে চোখ বুলাতে। উনাকে দেখা মাত্রই চিনে ফেললাম- পারভেজ ভাই। আমার ঘাম দিয়ে জ্বর নেমে গেল। আমি উঠে গিয়ে তাকে ডাকলাম। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, "সরি দেরি হয়ে গেছে। এই পর্যন্ত যে কিভাবে আসব সেটা আমি নিজেও ঠিকমত জানতাম না"।

পারভেজ ভাই নিজেই আগে কখনও মিনেসোটা আসেননি। সে আমলে গুগল, ম্যাপ কোয়েস্ট, জি পি এস ইত্যাদির তেমন চল না থাকায় পারভেজ ভাই বাসে করে এসেছেন আমাকে নিতে। ফেরত যেতে হবে বাসে করেই। ট্যাক্সি নিয়ে আমরা গ্রে হাউন্ড বলে এক বাস কোম্পানীর টার্মিনালে চলে এলাম। বাস ছাড়বে ঘন্টা দুয়েক পর। পয়সা দিয়ে যে টিভি দেখতে হয় সেই প্রথম দেখেছিলাম। বাস টার্মিনালের ওয়েটিং এড়িয়ার প্রতিটি সিটের সাথে টিভি লাগানো আছে। তার ভেতর চার আনা করে ফেললেই আধা ঘন্টার মত টিভি দেখা যাবে।

পারভেজ ভাই বেশ হাসি খুশি মানুষ। দেশের খবর নিলেন। বললেন,

তুমি আসায় ভালই হয়েছে। আমাদের সকার টিমের একজন প্লেয়ার বাড়ল।

আমি মৃদু হাসলাম। তখন আমি এমনই বলদের বলদ ছিলাম আমেরিকায় 'সকার' দিয়ে যে ফুটবলকে বোঝানো হয় তাই জানতাম না। পারভেজ ভাই ভেন্ডিং মেশিন থেকে "স্ন্যাপল" কিনে দিলেন। জুস জাতীয় পানীয়। কোন কারণে স্বাদ ভাল লাগল না। কিন্তু ভাব দেখালাম খেয়ে খুব তৃপ্তি পাচ্ছি।

যখন বাস ছাড়ল তখন রাত ১১ টা বেজে গেছে। শুরু হল দীর্ঘ ক্লান্তিকর ভ্রমণের তৃতীয় অংশ।

যখন ম্যাডিসন পৌছালাম তখন সকাল হয়ে গেছে। বাস টার্মিনালের পার্কিং লটে গাড়ি রেখে গিয়েছিলেন পারভেজ ভাই। বাইরে বেশ ঠন্ডা। আমি গাড়ির ভেতর ঢুকে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলাম। পারভেজ ভাই উইন্ডশিল্ডে ঠান্ডায় জমা ফ্রস্ট পরিষ্কার করতে লাগলেন। মিনিট পাচেকের মধ্যে গাড়ির ইঞ্জিন গরম হতেই পারভেজ ভাই গাড়ির হিট চালু করে দিলেন। স্বস্তি পেলাম তখন। বাসায় পৌছাতে পনের মিনিটের মত লাগল।

বাসায় কাকা-কাকী আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। গোসল সেরে তাদের সাথে বসে নাস্তা করলাম। ঘুমে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলাম। আমাকে ঘুমানোর ব্যাবস্থা করে দেয়া হল। আমি ঘুমালাম একটানা ১২ ঘন্টা। ঘুম থেকে উঠার পর অদ্ভুত একটা অনুভূতি আমাকে জেঁকে ধরল। আমি আর বাংলাদেশে নেই। দেশ থেকে আমি নয় হাজার মাইল দূরে। এখানে বাতাসের গন্ধ আলাদা।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ খুব দ্রুত কেটে গেল। পারভেজ ভাই যদিও আমার থেকে বয়সে বড় কিন্তু তার সাথে সমবয়সী বন্ধুর মত সম্পর্ক হয়ে গেল। রাতে খাওয়া দাওয়ার পর দুজন মিলে হাটতে বেড় হই। দেশের গল্প করি। আমরা দুজন একই জায়গায় বড় হয়েছি। একই স্কুল এবং কলেজে গিয়েছি। যারা আমার পরিচিত তারাও তার পরিচিত। ভালই সময় কেটে যাচ্ছিল।

এই কয়েক দিনে বেশ কিছু জিনিস জানলাম। আমেরিকায় কাজ কারবার বাংলাদেশের সম্পূর্ণ উল্টো। যেমন-

১) এখানে গাড়ি রাস্তার ডানে চলে, বাংলাদেশে চলে বামে।

২) এখানে ইলেক্ট্রিক্যাল পাওয়ার রেটিং ১২০ ভোল্ট, বাংলাদেশে ২২০ ভোল্ট।

৩) এখানে সমস্ত কিছুর সুইচ উপরের দিকে উঠালে অন আর নীচে নামালে অফ, বাংলাদেশে এর উল্টো।

৪) এখানে চাবির খাঁজ কাটা অংশ উপরের দিকে দিয়ে তালায় ঢুকাতে হয়, আর বাংলাদেশে তালা খুলতে হলে খাঁজ কাটা অংশটি নীচের দিকে দিয়ে তালায় ঢুকাতে হবে।

৫) এখানে বাংলাদেশের মত মেট্রিক সিস্টেম ব্যবহার করা হয় না। উদাহরণ- কিলো মিটারের বদলে মাইল, কিলো গ্রামের বদলে পাউন্ড, মিলি লিটারের বদলে ফ্লুইড আউন্স...ইত্যাদি।

এখানে প্রথমেই যে সমস্যা হল সেটা হল খাওয়ার সমস্যা। দুই ধরণের মানুষ আছে। প্রথম টাইপের পাবলিকরা যখন বিদেশে যায় তখন সব খাবারে গন্ধ পায়। তাদের রুচি নষ্ট হয়ে যায়। আর দ্বিতীয় ধরণের পাবলিকদের এরকম কোন সমস্যাই হয় না। বরঞ্চ তাদের খাওয়ার রুচি আরো বেড়ে যায়। তার গাব গাব করে খাওয়া শুরু করে। আমি প্রথম শ্রেণীর। কিছুই খেতে পারি না। যাই খেতে যাই গন্ধ লাগে। বমি চলে আসে। পারভেজ ভাই বাইরে খেতে নিয়ে যান। খেতে পারি না। গন্ধ লাগে।

সপ্তাহ পার হয়ে মাস চলে গেল। শীত পেড়িয়ে ম্যাডিসনের আকাশে বসন্ত এসেছে। বাইরে তেমন একটা ঠান্ডা নেই। এখানে সবাই কাজে ব্যাস্ত থাকে। পারভেজ ভাই, কাকা, কাকী কাজে চলে যান। পারভেজ ভাইয়ের ছোট একটি ভাই নাম রিমন সেও স্কুলে চলে যায়। আমি বাসায় বসে টিভি দেখি। আমার মনে আছে টিভিতে উইল স্মিথের 'ফ্রেশ প্রিন্স অফ বেল এয়ার" দেখাত। আমার প্রিয় একটি কমেডি শো ছিল। রেডিওতে তখন প্রায়ই বাজত লা বুশের 'বি মাই লাভার'। কিছুদিন পর শুরু হয়েছিল "ম্যাকারেনা"।

বাসায় একা একা বসে থাকতে ভাল লাগত না দেখে বেড়িয়ে পড়তাম। একেক দিন একেক দিকে হন্টন পথে যাত্রা করতাম। এখানে সব ছবির মত বাড়ি ঘর। সুন্দর করে সাজানো গোছানো। রাস্তায় ধূলো নেই, ছেঁড়া কাগজের টুকরো নেই, আবর্জনা নেই, বাতাসে ধোঁয়া আর ময়লার উৎকট গন্ধ নেই। এখানে বুক চিড়ে ফেলা হর্ন বাজিয়ে কেউ রাস্তায় গাড়ি চালায় না। আমি মাইলের পর মাইল হাটি। মাঝে মধ্যে মনে হত ইউনিভারসিটি এভিনিউ বলে যে রাস্তা ধরে আমি হাটছি এই পথে অনন্ত কাল হেটে গেলে কি আমি ফকিরাপুল পৌঁছাতে পারব? তারপর এ গলি সে গলি করে আরামবাগ, মতঝিল, ইত্তেফাকের মোড়, ওয়ারী, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ি, রায়ের বাগ, সানাড় পার, চিটাগাং রোড, মিজমিজি হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ। সেখানের দূষিত বাতাসে আছে কটু গন্ধ, রাস্তার পাশে ডাস্টবিনের নোংরা, কোটি কোটি মানুষের কলরব, হন্যে হয়ে ছুটে চলা বিশৃঙ্খল গাড়িদের দঙ্গল। সেখানে আরাম আয়েশের কিছুই নেই, শুধু আছে বুক খালি করে দেয়া স্মৃতি। আমার শান্তির স্মৃতি।

(শেষ)


মন্তব্য

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

২য় ও ৩য় প্যারার সাথে নিজের পুরাই মিল খুঁজে পেলাম।

Sohel Lehos এর ছবি

আসেন কোলাকুলি করি।

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

অতিথি লেখক এর ছবি

আহা কী চমৎকার একটা মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা। কচি বয়সে একা একা বিদেশে আসা মোটামুটি সবারই কাহিনী কাছাকাছি। তবে পয়সা দিয়ে টিভি দেখতে হয় এরকম আমেরিকায় কখনো দেখিনি, আপনার কাছে প্রথম শুনলাম।

খাবারে গন্ধ পাওয়া নিয়ে ভুগেছেন মোটামুটি সব প্রবাসী বাঙালীই। তবে আশ্চর্যের ব্যাপের হলো, ৬ মাস থেকে ১ বছরের মাথায় এই সমস্যাটা বিলকুল গায়েব হয়ে যায়।

আমাকে যখন আমেরিকান এয়ারপোর্ট চেক ইনে জিজ্ঞাসা করসিলো যে বীজ জাতীয় কিছু আছে কিনা, আমি আমার ব্যাগে থাকা আস্ত ধনিয়ার কথা ভেবে বললাম, হ‌্যাঁ। বললো, ব্যাগ খুলো। আমি ব্যাগ খুলতেই দেখা গেলো ভেতরে লন্ডভন্ড অবস্থা----হাড়ি পাতিল, কাটিং বোর্ড থেকে রং বেরংএর জাঙিয়া মিলে একাকার অবস্থা। একনজর দেখেই বেটা বলে, ঠিকাছে যাও দেঁতো হাসি

----দিফিও

Sohel Lehos এর ছবি

লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ! ১৯৯৬ সালে মিনিয়াপোলিসের গ্রে হাউন্ড বাস টার্মিনালে পে টিভি দেখেছিলাম। গ্রে হাউন্ড বাস এর পর সম্ভবত আরেকবার নিতে হয়েছিল তাও প্রায় আজ থেকে ১৩/১৪ বছর আগে। এখন আর সে সিস্টেম আছে কিনা জানিনা।

শরীরের নাম মহাশয়। যাহা সহাবেন তাহাই সয়। ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে জিহ্বা সয়ে যায়। তখন আর গন্ধ লাগে না। তবে ৩/৪ বছর পর বাংলাদেশে যাওয়ার পর তখন আবার ওখানকার খাবারে গন্ধ লাগে।

আপনার কথা শুনে অনেক হাসলাম। ভাগ্য ভাল জাঙ্গিয়ার বরকতে বেঁচে গেছেন। আর নয়তো সাথে বিচি থাকলে অনেক ঝামেলা করে।

আপনাকে আবার ধন্যবাদ! হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

মরুদ্যান এর ছবি

চলুক। ভালই লাগছে।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে

Sohel Lehos এর ছবি

ধন্যবাদ ভাই! চলবে।

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

অতিথি লেখক এর ছবি

সেখানের দূষিত বাতাসে আছে কটু গন্ধ, রাস্তার পাশে ডাস্টবিনের নোংরা, কোটি কোটি মানুষের কলরব, হন্যে হয়ে ছুটে চলা বিশৃঙ্খল গাড়িদের দঙ্গল। সেখানে আরাম আয়েশের কিছুই নেই, শুধু আছে বুক খালি করে দেয়া স্মৃতি। আমার শান্তির স্মৃতি।

এই কথাটার সাথে মনে প্রাণে সায় দিচ্ছি - বিদেশে যত আরামেই থাকি না কেন, ঢাকা শহরের ধুলো বালি আর ধোঁয়া গন্ধের স্মৃতি সবসময় উঁকি দিয়ে যায়।

কবে যে দেশে ফিরব !!

মরুচারী

Sohel Lehos এর ছবি

সেটাই। আমরা প্রবাসে আসি কিন্তু শেকড়টাতো পড়ে থাকে দেশে। আপনি তাড়াতাড়ি দেশে ফিরুন এই দোয়া করি।

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

অতিথি লেখক এর ছবি

আঁই ও আমেরিকা যাইতাম ছাঁই...মনের মধ্যে কেইচ্চা ডর লাগে..হা: হা:।
আচ্ছা শুনেছি আমেরিকাতে নাকি অনেক সন্দীপ-য়ান গেছেন ঠিক নাকি
ট্রোল

Sohel Lehos এর ছবি

আমিও শুনেছি। আরও শুনেছি তারা নিউ ইয়র্ক এ বেশি থাকেন। হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

মাসুদ সজীব এর ছবি

মাঝে মধ্যে মনে হত ইউনিভারসিটি এভিনিউ বলে যে রাস্তা ধরে আমি হাটছি এই পথে অনন্ত কাল হেটে গেলে কি আমি ফকিরা পুল পৌঁছাতে পারব? তারপর এ গলি সে গলি করে আরাম বাগ, মতঝিল, ইত্তেফাকের মোড়, ওয়ারী, সায়েদা বাদ, যাত্রাবাড়ি, রায়ের বাগ, সানাড় পার, চিটাগাং রোড, মিজমিজি হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ। সেখানের দূষিত বাতাসে আছে কটু গন্ধ, রাস্তার পাশে ডাস্টবিনের নোংরা, কোটি কোটি মানুষের কলরব, হন্যে হয়ে ছুটে চলা বিশৃঙ্খল গাড়িদের দঙ্গল। সেখানে আরাম আয়েশের কিছুই নেই, শুধু আছে বুক খালি করে দেয়া স্মৃতি।

মন খারাপ মন খারাপ

সিরিজ কি শেষ? লেখা ভালোলেগেছে গল্পকার। আপনার লেখায় নিজের বিষাদী ভবিষ্যত দেখি

-------------------------------------------
আমার কোন অতীত নেই, আমার কোন ভবিষ্যত নেই, আমি জন্ম হতেই বর্তমান।
আমি অতীত হবো মৃত্যুতে, আমি ভবিষ্যত হবো আমার রক্তকোষের দ্বি-বিভাজনে।

Sohel Lehos এর ছবি

ধন্যবাদ মাসুদ সজীব! সিরিজ শেষ হয়নি। আমেরিকা কিভাবে আসলাম সে গল্প শেষ, কিন্তু আমেরিকা আসার পর অন্য কত কি অভিজ্ঞতা হয়েছে সেগুলো নিয়ে "আমার স্মৃতি কথন" শিরনামে ভবিষ্যতে আরো লেখার আশা রখি হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

স্মৃতি কথন শেষ হলেও জার্নি শেষ হয়নি বুঝতে পারছি। ভাল থাকুন বিদেশ বিভুঁই এ। মাঝে মাঝে দেশে এসে সম্পর্ক গুলোকে ঝালাই করে যান, সেই কামনা করি। শুভ রাত্রি।

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

Sohel Lehos এর ছবি

সুন্দোড় কথা বলেছেন। স্মৃতি কথন শেষ হয়েছে কিন্তু জার্নি শেষ হয়নি। জীবনটাইতো এক জার্নি। যখনই সম্ভব হয়ে দেশে আসার চেষ্টা করি। দেখি সামনের বছর যাব একবার হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

সত্যপীর এর ছবি

৩) এখানে সমস্ত কিছুর সুইচ উপরের দিকে উঠালে অন আর নীচে নামালে অফ, বাংলাদেশে এর উল্টো।

৪) এখানে চাবির খাঁজ কাটা অংশ উপরের দিকে দিয়ে তালায় ঢুকাতে হয়, আর বাংলাদেশে তালা খুলতে হলে খাঁজ কাটা অংশটি নীচের দিকে দিয়ে তালায় ঢুকাতে হবে।

আপনার পর্যবেক্ষণশক্তি চমৎকার।

..................................................................
#Banshibir.

Sohel Lehos এর ছবি

ধন্যবাদ! প্রথম আমেরিকায় আসার পর তালা খুলতে যেয়ে বিরাট ক্যাচালে পড়ছিলাম। তাই ভাল মনে আছে হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

জীবনে কখনো দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকতে হয়নি। তবু এই পোস্টের শেষ অনুচ্ছেদটা অনায়াসে বুকের ভেতরটা ছুঁয়ে গেল। লেখকের কৃতিত্বটা এখানে।

তাড়াহুড়া করার দরকার নেই। ধীরেসুস্থে প্রথম দিককার সবকিছুর গল্প বলে যান। স্থিত হয়ে যাবার পর সবকিছু তো দেশভেদে একই প্রকার। তাই ঐ অস্থির দিনগুলোর কথা আরো বেশি করে বলুন। আপনার দেখার চোখ আছে। তাই খুঁটিনাটি বাদ দেবেন না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

Sohel Lehos এর ছবি

ধন্যবাদ ষষ্ঠ পাণ্ডব! লেখা এখনো শেষ হয়নি। প্রবাস জীবনে অনেক অদ্ভুত আর মজার সব ঘটনা ঘটেছে। প্রথম দিকে সব নতুন চোখে দেখেছি বলে তখন অন্য রকম এক অনুভূতি ছিল। আমি নিশ্চিত সেগুলো শেয়ার করলে পাঠকরাও আনন্দ সহকারে পড়বেন। এই শিরনামেই অন্য অনেক স্মৃতি কথন নিয়ে ভবিষ্যতে হাজির হব। আশা করি সাথেই থাকবেন হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

মেঘলা মানুষ এর ছবি

পড়ালাম দুটো পর্বই। শুরুর দিন‌গুলো আসলেই 'কেমন কেমন' জানি।

ভালো থাকুন, শুভেচ্ছা হাসি

Sohel Lehos এর ছবি

লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ! শুরুর দিনোগুলো অন্যরকম থাকে- গন্ধ, স্বাদ, অনুভূতি সব অন্যরকম। আমি এখনো সেই শুরুর দিনগুলির গন্ধ পাই।

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

শিশিরকণা এর ছবি

ঢাকা থেকে যে প্লেনে এসেছিলাম তার অবস্থা বেশ কাহিল ছিল। ভেতরের জিনিশপত্র ছিল মলিন। এয়ার হোস্টেসদের ব্যবহার ছিল কর্কশ। গরীব দেশের মানুষের সাথে গরীবি ব্যাবহার আর কি।

এটা ঠিক গরীব দেশের মানুষের সাথে গরীবি ব্যবহার নয়। আমার অভিজ্ঞতা বলে ঢাকা থেকে যাওয়া আসা করা প্লেনগুলোতে দেশীয় যেসব যাত্রী উঠেন অনেকেই আদব কেতা মানেন না। সীটবেল্ট বাধতে বললেও উঠে ঘুরতে থাকেন, বিমান বালাদের কাজের লোকের মত মনে করেন এবং দূর্ব্যবহার করেন। এরকম ধরনের যাত্রীদের সাথে তাল মিলাতে সেরকম কড়া ভাবেই তাদের সাথে কথা বলতে হয় নিয়ম মানাতে। একই কারণে বিমানবালাদেরও মেজাজ কিছটা তিরিক্ষি হয়ে থাকে ( তারাও মানুষ), যেটা অন্য যাত্রীদেরও উপর পড়ে।

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

Sohel Lehos এর ছবি

ব্যবাহারের ব্যাপারে আপনার যুক্তি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু যতবার আমি দেশে গিয়েছি এবং ফেরত এসেছি লক্ষ্য করে দেখেছি বাংলাদেশ থেকে মিডল ইস্ট পর্যন্ত প্লেনের চেহারা ছুরত সুবিধার থাকে না।

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

তাসনীম এর ছবি

খুব ভালো লাগছে। আশা করি "শেষ" মানে সিরিজ শেষ না।

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

Sohel Lehos এর ছবি

তাসনীম, না ভাই সিরিজ শেষ হয়নি। আরো লেখা আসবে ভবিষ্যতে হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

শাব্দিক এর ছবি

দুটো পর্ব ই দারুন লাগল।
আরো পর্ব চাই শিগগীর পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।

Sohel Lehos এর ছবি

ধন্যবাদ শাব্দিক! লেখার সুযোগ পেলেই আরো পর্ব আসতে থাকবে হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

এত টাইপো কেন? এমন প্রাণবন্ত বর্ণনা টাইপোর জন্য বার বার হোঁচট খাচ্ছে আর আপনার উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে! রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে!
পেড়িয়ে > পেরিয়ে
ব্যবাহার>ব্যবহার
প্রাগ ঐতিহাসিক > প্রাগৈতিহাসিক
দাড়াতেই >দাঁড়াতেই
ঘাঁটে>ঘাটে
ব্যাবস্থা>ব্যবস্থা
কম্ভুকর্ণ>কুম্ভকর্ণ
ব্যাতীত>ব্যতীত
বিদ্ধস্ত>বিধ্বস্ত
চামরার>চামড়ার
এতকিছু ছাপিয়েও দারুণ মজাদার। দেখবার চোখ আছে আপনার, বটে!

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

Sohel Lehos এর ছবি

ভাই রোমেল, শান্ত হোন। বানান ভুল করা আমার কমন একটি রোগ। কোনমতেই এই রোগ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না। প্রচুর বানান ভুল লিখে আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ভুল আরো দেখতে পাবেন। রাগ না করে শুধু ভুলগুলো আমকে ধরিয়ে দেবেন। আমি ঠিক করে নেব। যাহোক এবার বানানগুলো ঠিক করে দিচ্ছি।

মাথা বেশি গরম হয়ে থাকলে কদুর তেল ব্যাবহার করে দেখতে পারেন। নিমিষেই ঠান্ডা দেঁতো হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

অতিথি লেখক এর ছবি

খুব ভালো লাগল চলুক । তোমার মত অত ছোট বয়সে না কিন্তু জার্মানিতেই প্রথম জীবনে একা একা ভিনদেশে যাত্রা। কিছু কিছু স্মৃতি একদম তোমার মত- এয়ারপোর্টে নিতে আসা, প্লেনে খারাপ লাগা, খেতে না পারা। যাই হোক হাত খুলে লিখতে থাকো এই কামনা করি।
বিঃদ্রঃ তুমি করে বলায় রাগ কোর না আবার খাইছে । তুমি বোন বানালে তাই আমিও ভাই বানালাম হাসি

ফাহিমা দিলশাদ

Sohel Lehos এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- প্রবাসীদের প্রায় সবার প্রথম দিককার অভিজ্ঞতাগুলো এক রকম হয়। না রাগ করি নাই। তুমি করে বলে ভালই করেছিস। তুই করে বললেও মাইন্ড করতাম না। এসব জিনিস নিয়ে মাইন্ড করার এত সময় কোথায় খাইছে

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাল হচ্ছে। প্রথম পর্ব পড়ে আসি।
অপর্ণা মিতু

Sohel Lehos এর ছবি

পড়ে আসেন। পড়ার জন্য ধন্যবাদ হাসি

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

পড়লাম। আপনার লেখা মজার। আমেরিকার জীবনের গল্প লিখতে শুরু করেন এবার!

আপনার নামটা সোহেল লেহস-ই থাকল তাইনা!

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

Sohel Lehos এর ছবি

অনার্য সঙ্গীত, ধন্যবাদ! "আপনার নামটা সোহেল লেহস-ই থাকল তাইনা!"- আপনি কি বুঝতা চাইলেন ঠিক বুঝলাম না। মানে আমি কি নামটা চেঞ্জ করব নাকি ইংরেজী থেকে বাংলা করব?

সোহেল লেহস
----------------------------------------------
হে দূর্দান্ত ভাবনারা, হেয়ালি করো না। এসো এ বাহুডোরে।

অনার্য সঙ্গীত এর ছবি

কিছুই করতে বলছি না। মন্তব্যটা হঠাৎ লিখে ফেলা টাইপ। ইংরেজি নাম দেখে অভ্যাস নেই বলে হয়তো। মন্তব্য গুরুত্ব দিয়ে নেয়া কিছু নেই হাসি

______________________
নিজের ভেতর কোথায় সে তীব্র মানুষ!
অক্ষর যাপন

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।