যারা কবিতা শুনেছিলো (উৎসর্গ: তিথীডোর ও রোমেল চৌধুরী)

মহাস্থবির জাতক এর ছবি
লিখেছেন মহাস্থবির জাতক (তারিখ: রবি, ২১/১১/২০১০ - ১:৩৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আদিতে ছিলো শোক। তার থেকেই শ্লোক। নেতিবাচক আবেগের অভিঘাত বড্ড প্রবল, সাময়িকভাবে অনেক কিছুতেই বিভ্রান্ত করে। কিন্তু, সৃষ্টির প্রেরণাও যে জোগায়, তা আগে অতোটা নিয্যস ধরা পড়ে নি।

আমাদের আবেগের অরণ্য যখন মুখরিত হয়ে ওঠে শিল্পকুমোরটুলির ঘূর্ণিবায়ুময় কারিগরদের আঙুল ছেনেছুঁয়ে তৈরি করা শব্দপ্রতিমার অগমমধুর স্পর্শসুখলগ্ন অরূপ রূপমালায়, তখন আমরা রিরংসাকাতর হতে ভুলে যাই, তখন আমাদের দেহজ বুভুক্ষা নিতান্তই তাচ্ছিল্যমণ্ডিত হওয়ার বা করার শিক্ষা আমরা পাই, তখন আমরা স্বাতী নক্ষত্র আর কালপুরুষ একসাথে হাতের তালুতে রেখে দেখার আর অগাধ সৌন্দর্যে চাঁদনি রাইতে মাতোয়াল্লা হওয়ার স্পর্ধা দেখাতে পারি শ্যয়দ।

আর আশ্চর্য! যাঁরা এভাবে আবেগ কলমের ডগায় শব্দমুক্তো দিয়ে আটকে রেখে আমাদেরও উদ্বাহু আনন্দিত হওয়ার এবং দিগ্বিদিকভ্রান্ত হয়ে উন্মাতাল আনন্দজলপ্রপাতে অবগাহন নয়, দম-আটকানো সুখমৃত্যু ঘটানোর সুযোগ করে দেন, তাঁরাও কেন যেন অকারণে ব্যাখ্যা দিতে বা খুঁজতে বসে যান তাঁদের কৃতকর্মের। দত্তজা তাই গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসেন, "কে কবি, কবে কে মোরে"। ইলিয়ট তাই কলম কালিতে ডুবিয়ে বসেন 'আ প্রিফেস টু লিরিক্যাল ব্যালাড'-এর তরে, যদিও লেখা তো ততদিনে শেষ। দাশগুপ্ত (পরে দাশবাবু) গম্ভীরভাবে রায় দেন, "সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি", যদিচ সমকাল তাঁকেও অন্তত দ্বিতীয় শ্রেণীতে ফেলে নি। তবে, শেষকথা, আমি কবিতা পড়তে প্রেমানন্দের চাইতে বড় কিছু বা অন্তত কম কিছু পাই না।

সে এক ঠান্ডা রাতের কথা। নিঝুম নিশুতি রাতে, একা শুয়ে এককাতে একজনের নোটখাতা পরখ করে দিচ্ছি। শেষদিকের পাতা ওল্টানোর একটা বদভ্যেস থাকাতে কাজ শেষ করার আগেই হঠাৎ করে আমার চোখের সামনে উদ্ভাসিয়া ওঠে দুটো লাইন:

শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের ওপরে মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মত এইখানে কার্তিকের খেতে।

কী যেন হয় আমার। খরবেগে ধায় অ্যাড্রিনালিন। আমি উষ্ণ হয়ে উঠি সেই নগ্ন নির্জন শীতরাতে। আমি কি প্রেমে পড়ে যাই কবিতার? আমি কি তার বিনামূল্যে কেনা সুচিরক্রীতদাস হয়ে উঠি? আমি কি আমার জিনে রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসের জন্যে অযোগ্য একটা ট্রেইট ঢুকিয়ে নেই?

তা ঠিক জানি নি। তবে, আমার পুনর্জন্ম হয় সেই সম্ভাব্য হেমন্তরাতে। সেখাতায় আগে পরে আরো কিছু পংক্তি পাই। পাই অনবদ্য এক পূর্ণাঙ্গ কবিতা। পরে আবিষ্কার করেছি তার নাম 'খড়ের গম্বুজ', আল মাহমুদের সেসময়ের লেখা, যখন তিনি যুগপৎ কাম ও কমিউনিজমকাতর।

এভাবে ঢুকে পড়েন জীবনানন্দ, আসেন নির্গুণ, আগে থেকে নির্লজ্জভাবে যাঁর প্রেমে নিমগ্ন, সেই রবীন্দ্রনাথও প্রায়শ আমায় বিবশ কামাতুর করে তোলেন কাব্যবিভঙ্গে। পরে অবশ্য টের পেয়েছি, ওভাষা শৈশবের মায়ের হাতে-বানানো ছোট্ট সোয়েটারের মতো আলমারিতেই বেশ মানায়। ভালো লাগে ক্রমশ হুমায়ুন আজাদের কাব্যভাষামাখা গদ্য, বা তসলিমার কবিতা বা নির্বাচিত কলামের বেশ কিছু তরল ছন্দোময় লেখা। তিরিশিদের মাঝে বুদ্ধদেব যেন বড্ড স্মার্ট হওয়ার চেষ্টায় রত, প্রেমেন জোর করছেন কোথাও কিছুটা কর্কশ হওয়ার, বিষ্ণু দে আর সুধীন দত্ত যেমনি গদ্যে, তেমনি পদ্যে দুর্বোধ্যতার মাখোমাখো শিশিটা উপুড় করে ঢেলে দিয়েছেন (তবে, বিষ্ণু দে-র 'ঘোড়সওয়ার' আর সুধীন দত্তের অন্তত 'শাশ্বতী' আর অনুবাদ কবিতায় 'কী-করে-পারলেন' মুগ্ধতা ইনক্লুসিভ নয়, শর্ত প্রযোজ্য), অমিয় চক্কোত্তির প্রথম দিককার কবিতাগুনো বেশ ছুঁয়ে যায় ("রাম নাম সত্ হ্যায়" বা "অন্ধকারে মধ্যদিনে বৃষ্টি পড়ে মনের মাটিতে", দ্বিতীয়টাতো আমার ট্রেডমার্ক বৃষ্টিতে-হতে-পারতো ফেবু স্ট্যাটাস), সুকান্ত বিপ্লবস্পন্দিতবুকে দারুণ আঠারোর আগুন ঝরান, পুড়ি তাতে। আহসান হাবীবকে তুলনামূলকভাবে পরে খুঁজে পেলেও তাঁর শক্তিমত্তা চমকে দেয়, আর ভাবাতে শেখায় কেন তিনি অপরিচিত রয়ে গেলেন। সুনীল-শক্তির হাত ধরে (দ্বিতীয়জনের সাথে 'সিনাকি' অবশ্য আরো পরে) এরপর অনিয়মিতভাবে সৈয়দ হকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি, রুদ্রের সাথে মিছিলে আর প্রেমের আর যৌনতার স্বপ্নঢেউয়ে উঠি নামি, 'একাত্তরের দিনগুলি'-তে শামসুর রাহমানের 'গেরিলা' পড়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাই, খুঁজে ফিরতে থাকি কবির নাম অবিরত, অনবদ্য এক প্রায় অভিজাতআধুনিক ('অক্সিমোরন' হয়ে গেলো নাকি?) স্বাদ পাই 'দ্য লাভসং অব আলফ্রেড জে. প্রুফুক' শুনে, ইথারিত আকাশের ভিনদেশি তারা অন্যরকম আলো ছড়ায়। কেন বলবো না মন্দ্রাক্রান্তার পদাবলীতে আক্রান্ত আমার কথা, বা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের 'ভালোবাসার সাম্পান'-এ হঠাৎ-পড়া 'পার্শ্ববর্তী আমার সহপাঠিনীকে', বা শ্রীজাতের 'পাগলা দুই জোকার'-এ পড়া "ভগবানের তিনটে ভালো কাজ, অমিতাভের একটা মাত্র 'শোলে" বা, 'বিন্দুমাত্র/ইন্দুমাত্র/সিন্ধুমাত্র'-এর অন্ত্যমিল কারসাজি, অথবা আরো আগে সিকদার আমিনুল হকের ভূগোল-গোলা সনেট বা মাকিদ হায়দারের রাজাকার মামার কাহিনি, বা মাঝে মাঝে হাংরি মলয় রায়চৌধুরীর 'বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ ঘিলু ঝরানোর বেত্তান্ত কিংবা রফিক আজাদের 'বেশ্যার বেড়াল'-এর থরথর যৌনতা, শব্দটা বলে মনে পড়লো হুমায়ুন আজাদের 'ই-শ! ই-শ! এ-ই, আ-হ, এইখানে, প্রিয়!' এই মাঠে বুঝি অদ্বিতীয়; কেনইবা কেঁপে উঠে সমর্পিত হবো না শহীদ কাদরীর 'তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা'-র রোম্যান্টিক রাতজাগায়; ভিনভাষার কবিরাও এরপরে অল্পস্বল্প পরিচিত হয়ে ওঠেন, হায়াৎ মামুদের 'বও হাওয়া দেশান্তরী'-তে অনেকে, এছাড়াও নানান কালে নানান স্থানে নেরুদা, লোরকা, পায, হিকমত, মায়াকোভস্কি, আখমাতোভা, খৈয়াম, ইমরুল কায়েস, কাহলিল জিবরান, ব্লেক, শেলি, থোকাথোকা এমনি কতো উজ্জ্বল নাম, কতোশতো পংক্তি, কবিতা ইত্যাদি ভাবায়, ভালোলাগায়, ভালোবাসায়।

তবে, তারও আগে, তারও বেশ আগে একটা পাতায় দুটো লাইনে চোখ আটকে যায়।

"ওই মেয়েটির কাছে
সন্ধ্যাতারা আছে।"

কবিতার নাম, 'শ্রাবণে'। আসলেই, আর কিই বা নাম হতে পারতো? রবীন্দ্রনাথের প্রতি অকল্পনীয় স্মৃতিতর্পণ, নয়? কবির নামটিও অন্যরকম।

এরপর, সে-কবির কাব্যসংগ্রহ তিনখণ্ডই কিনে ফেলি।

তার আগে অন্য এক ঘটনা।

এইচএমভির পাঁচ খণ্ডের 'শতবর্ষের বাংলা গান'-এর ক্যাসেট নিয়ে আসি বন্ধুর বাসা থেকে। নতুন, না-শোনা এক মহিলা শিল্পীর অন্যরকম একখানা গান আমায় একেবারে পেড়ে ফেলে। প্রায় মুখস্থই হয়ে যায় গানখানা, নিশ্চয় তিনি ভালোবেসে গান তা, এবং গানটাও ভালোবাসার, তবে আবহ তুমুল বাস্তবতামণ্ডিত বেদনার। আবিষ্কার করি, ওই কবিবরেরই লেখা গানখানা। কাব্যসংগ্রহের দ্বিতীয় খন্ডে পরে খুঁজে পেয়েছি গানটা। দ্বিতীয় খণ্ডটা কিনেছি তিনবার। একবার নিজের জন্যে, একবার উপহার, একবার আবারো নিজের জন্যে, কারণ আগেরটা কেউ ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিলো।

যাগগে। সেরাতের কথা বলতে এসেছি, বলেই যাই বাড়া।

আমার সামনের মুখ এবং কানগুলো উৎসুক, হৃদয়গুলো নবীন, মস্তিষ্কগুলো সুগ্রাহী, বাইরে ঝরঝর না হলেও কিছুটা তো ঘোরঘনঘটা। আমার সময় প্রায় শেষ। বললাম সেই গান আকা কবিতাটা, কারণ কবিতাটাই গান হলো তো। আমারও হৃদয় ও দেহ তারুণ্যের কাঁচাডালেই ঝুলন্ত, তাই আবেগ যথাসম্ভব উৎসারিত করেছিলাম কণ্ঠস্বরে। শেষ করে দেখি সবাই নিস্তব্ধ, শুধু একজনের চোখে জলটলমল, আর একজন বেদনাভারে নুয়ে পড়েছে বেঞ্চে মাথা রেখে, হয়তো সে-মাথায় বেণী ছিলো!

কবিতাটার নাম ছিলো "মালতীবালা উচ্চ বিদ্যালয়"। কবি জয় গোস্বামী। গায়িকা লোপামুদ্রা মিত্র।

এরপর থেকে আমি যাকে দেবীপ্রতিমার সাথে যৌক্তিকভাবেই তুলনা করতাম, তার বান্ধবীদের কাছে এই গল্প শুনে সে বারবার অনুরোধ করেছিলো আমায় কবিতাটা আবার তাকে শোনানোর জন্যে। আয়োজনের অভাবে শোনাতেই পারি নি আর। অনেক আয়োজন করতে হতো ওটা শোনাতে গেলে। আর, ভয়ও পেতাম। কারণ, যদি দ্বিতীয়বার সেই ইন্দ্রজাল আবার সৃষ্টি না হয়? হায়, তখন কতো চিন্তিত প্রাক্তন চারজোট সরকারের মতো ভাবমূর্তি নিয়ে!

সে কি কখনো অন্য চোখে দেখতো আমায়?

নিশ্চিত হতে পারি নি আমি। একবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো মেহেদি আঁকার জন্যে, আঁকি নি, ব্যস্ততার কথা বলে বেরিয়ে এসেছিলাম; একবার খুদে বার্তা পাঠিয়েছিলো, "স্বপ্ন দেখি একা আমি/হায়রে আজব পাগলামি/আমার হয়ে গেলো কিযে/ওলটপালট আমি নিজে"; আরেকবার পাঠিয়েছিলো ভালোবাসা দিবসে আমার বড় প্রিয় একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের কটা লাইন, গানটা ছিলো, "কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া", সেটা পড়ে আমার আপন মনের মানুষটা মহাখ্যাপা, যদিও সে নিজেই তার রূপমুগ্ধ ছিলো; একবার মন খারাপ হওয়ার পর তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে বেশ অনেকক্ষণ ঘুরেছি তার সাথে, তাতে আবার শিডিউল মিস হওয়ায় পরে মানভঞ্জনের জন্যে প্রায় ঘণ্টাখানেক ফুটপাতে বসে, দাঁড়িয়ে কাটাতে হয়েছিলো, যদিও শেষতক রাগকে বাগ মানাতে পেরেছিলাম ইত্যাদি।

যাহোক, মোদ্দা কথা হচ্ছে এই যে, যদি কখনো তাকে প্রেম নিবেদন করতাম, বা অন্য যে-কাউকে, তাহলে একটা মোক্ষম কবিতার সন্ধান পেয়েছিলাম, ব্যবহার করতাম সেটা। তবে, প্রেমে পড়ার বেশ পরেই কবিতাটা পেয়েছিলাম, তাই সেটাও গেল বৃথাই। কেউ চাইলে দিতে পারি, মনে হয়েছিলো অব্যর্থ হবে।

আজ আর কবিতা পড়া হয় না তেমন একটা, সেই স্বাদও পাই না। সময় আর পরিস্থিতি আমার হরণ করে নিয়েছে অনেক, মরুভূমি বানিয়ে রেখেছে দিনযাপন, যন্ত্রণাকাতরতা আর ভোঁতা অনুভূতি এখন আমার নিত্যসঙ্গী, সুবলবলাই দাদার পায়ে মাথা রেখে করণীয় প্রশ্ন করতে শিখি নি বলে ঈশ্বর আমার রাতজাগার সঙ্গী নন, আমার তারাগুলো সবাই আমায় রেখে বিচ্ছিরি হয়ে গেছে বলে আমায় পিঠ বাঁকিয়ে একাই চলতে হয়, তাই এখানে কোমলকান্ত পদাবলীর কোন ঠাঁই নেই। শুধু একবার, একবার অনেকদিনের পর কিছুদিন আগে এক ঝরে-পড়া একদা ধ্রুবতারার জন্যে পড়েছিলাম, "পাগলী তোমার সঙ্গে", সে-ও জয়ের অবদান। সে-গল্প আরেকদিন, হয়তো না।

আমার দেবীর দিনও ভালো কাটে নি। ভুল মানুষকে ভালোবেসে তাকে কী মাশুল দিতে হবে জানি না, যোগাযোগও নেই অনেক দিন। তবে, 'ঠিক পাত্তর'কে বিয়ে করছে শুনলাম এইতো, এইতো সামনেই। তারপরেই, ল্যান্ড অব মিল্ক এন্ড হানি, ইয়াঙ্কিডুডলল্যান্ড, সৎপাত্রটি যে ওখানেই পিএইচডি কচ্ছেন।

তার আর কী দোষ! 'মানবজমিন'-এর মণিদীপার স্বপ্নপুরুষও যদি, হায়, সেদেশ নিবাসী হন? নিশ্চয় আমার আর কবিতা শোনাতে হবে না, শোনানো হবে না কখনো, কোনোটাই।


মন্তব্য

তাসনীম এর ছবি

দারুণ লাগলো।

সময় সংকটের কারণে বেশি বড় মন্তব্য করতে পারছি না। "মালতীবালা উচ্চ বিদ্যালয়" আমারও খুব প্রিয়, লোপামুদ্রা গানটা গেয়েছেনও দারুণ। কয়েকদিন আগে ইউটিয়ুব থেকে বের করে ক্রমাগত শুনছি।
________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

যাক, আরেকজন পুরনো পাপী পেয়ে দিল তর হয়ে গেল।

আহা, আসুন এমন পাপ কি সিলসিলা জোরসে জারি রাখি।
_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

তিথীডোর এর ছবি

'কবিতা যারা পড়ে না তারা কেন বেঁচে থাকে, চিত্রা, আর কেমন করেই বা বেঁচে থাকে!'
*মৌলিনাথ: বুদ্ধদেব বসু

জয় গোস্বামী এবং লোপামুদ্রা, দু-জনেই বড় প্রিয়...
লেখায় চলুক চলুক চলুক

_______________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নদীতে ভাসতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মা'য়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্তানের জন্য মরতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সূর্যকে হৃৎপিণ্ডে ধরে রাখতে পারে না।

যে কবিতা শুনতে জানে না
শস্যহীন প্রান্তর তাকে পরিহাস করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাতৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্ষুধার্ত থেকে যাবে।

যে কবিতা শুনতে জানে না
পরভৃতের গ্লানি তাকে ভূলুন্ঠিত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
অভ্যুত্থানের জলোচ্ছ্বাস তাকে নতজানু করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
পলিমাটির সৌরভ তাকে পরিত্যাগ করবে।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে তরঙ্গের সৌহার্দ থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
নিঃসঙ্গ বিষাদ তাকে অভিশপ্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মূক ও বধির থেকে যাবে।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নীলিমাকে স্পর্শ করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মধ্যাহ্নের প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত হতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্ত্রাস প্রতিহত করতে পারে না।

যে কবিতা শুনতে জানে না
যূথভ্রষ্ট বিশৃংখলা তাকে বিপর্যস্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
বিভ্রান্ত অবক্ষয় তাকে দৃষ্টিহীন করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম হীনমন্য থেকে যাবে।

কবিতাপাগল সম্প্রদায়ের সম্পাদকের প্রতি শুভেচ্ছা। আমার দৃঢ়মূল ধারণা, নারীদের স্বভাবজ সংবেদনপ্রবণতায় তাঁরা প্রকৃত কবিতার রীতিবহির্ভূত ভক্ত হন, কখনো নিজেরাই কবিতার উৎস। তাই, নারীরা নেই তো কবিতাও নেই।
_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

সাইফ তাহসিন এর ছবি

হে হে হে, এতো দেখি আমার বর্ননা, কপিতা শুনলেই আমার খিড়কি থেকে বাসার ছাদ পর্যন্ত চুলকাইতে থাকে গড়াগড়ি দিয়া হাসি গড়াগড়ি দিয়া হাসি

=================================
বাংলাদেশই আমার ভূ-স্বর্গ, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী

=================================
বাংলাদেশই আমার ভূ-স্বর্গ, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

শিরোনামটাতেই বুঝেছিলাম জয়ের দিকেই যাচ্ছেন... ভালো লাগলো লেখা। কিন্তু তালিকায় বিনয় মজুমদারকে না দেখে একটু হতাশ!
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

লেখাটা হুট করে put-করা। শুধু তিনিই নন, আমার প্রিয় নবনীতা দেবসেন, আবু হাসান শাহরিয়ার, অতিপ্রিয় আবুল হাসান, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কিছুটা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মল্লিকা সেনগুপ্ত, হারিয়ে-যাওয়া যতীন বাগচী, শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ আদি কতশত ভালোবাসার সাম্পানের মাঝি!

চেষ্টা করবো আপনাকে খুশি করতে, দেখি! কটা নাটক নামালেন এই ইদে?
_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

কৌস্তুভ এর ছবি

রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেস কমে যাওয়ার লাইনটা পড়ে খুশি হলাম, হাজার হোক দুনিয়াটা কম্পিটিশনের বাজার... বাকি লেখা সম্বন্ধে আর কিছু বললাম না, প্রশংসা আবার ওই ফিটনেস বাড়িয়ে দেয় কিনা...

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

মাভৈঃ বৎস! আপনি অন্তত আমার হাত থেকে নিরাপদ সম্পূর্ণ, তবে কি না দুনিয়াটা গোল। নইলে, কিরাকসম কেটে আপনাকে আশ্বস্ত করতাম।

আহহা রে, একটা দুখি মানুষের জন্যে আপনার করুণাও হয় না? এই যে এখন আর কাউকে কবিতা শোনাতে পারি না, তাতে কষ্ট পাচ্ছেন না, উল্টো প্রশংসাই বাদ দিয়ে দিলেন?
_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

তুলিরেখা এর ছবি

যতগুলারে পারা যায় ওই ফিটনেস কমানের ট্রেইট ঢুকান দরকার! দুনিয়াটারে তো বাঁচাইতে হইবো। তাই "কোনো প্রশংসা নয়, কোনো প্রশংসা নয়!" (জটায়ু স্টাইলে)
হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

হুমম (এটা দারোগা সুন্দরবাবু স্টাইলে)।

আর, প্রশংসা নাই করলেন, কিন্তু, আমার দুঃখে কি একটু সমবেদনাও জানাবেন না? এই যে আপনি নারী হয়েও আমি কোন নারীকে আর প্রাণঢালা প্রেমের কবিতা শোনাতে পারছি না, তার জন্যে কোন কষ্ট পেলেন না যে বড়?

আপনার লেখাগুলো পড়লে কেন যেন বারবার ইচ্ছে করে লীলা মজুমদারকে নিয়ে আমার বহুদিনের শখের একটা লেখা লিখতে। কী যে করি!

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

ভাই,
আপনার লেখাটি উৎসর্গ করে যে সম্মান আপনি আমায় দিলেন আমি তার যোগ্য নই, কোনদিন হতে পারবো কিনা জানিনা। আপিসের কাজ সেরে মন লাগিয়ে আপনার লেখাটি আবার পড়লাম। লেখাটি খুবই ভালো লাগলো, তবে তার চেয়ে বেশি ভালো লাগল আপনার কাব্যপ্রেম। আমি নিশ্চিত বলতে পারি, পরমার্থে দ্বিতীয়টিই কিন্তু অধিক মূল্যবান। আপনার লেখায় শব্দের ঝংকার আছে, আছে ভাষার ঠাসা বুনোট, আছে চমৎকৃত হবার মতো বুদ্ধিশালী বিশ্লেষণ। তবে কি, এমন লেখায় ‘শেষকথা’ লিখা কতটুকু সহনীয় হবে সেটা বিচারের ভার আপনার ভবিষ্যত প্রজ্ঞানুশীলনের উপরেই ছেড়ে দিলাম। এ মুহূর্তে আমার টেবিলের উপরে দু’টো কবিতার বই, একটি প্রেমেন্দ্র মিত্রের, অন্যটি অমিয় চক্রবর্তীর। ম্যারিয়েটা থেকে ১৯৮৬ তে কেনা, তখন আমি মনে-প্রাণে আওড়াতাম,

“মধ্যপথে কেড়েছেন মন
রবীন্দ্র ঠাকুর নন, সম্মিলিত তিরিশের কবি-”।
[কবিতার সাথে গেরস্থালি, শামসুর রাহমান]

ভেতরে-বাইরে-মলাটে পুরোনো উদ্ধৃত বই দুটির মণিকোঠায় সঞ্চিত মায়াবী শব্দরাজি কত নির্জন রাতে আমার কানে কানে কথা বলে গেছে। তবু আমি কি কখনো হবো না অবধারিত ধাবমান, অন্যকোন বিশাল বৃত্তের দিকে? নিজেকে প্রশ্ন করেছি বহুবার, মেলেনি উত্তর।
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

আমার লেখা উৎসর্গপত্র আপনি নিজ যোগ্যতাতেই অর্জন করে নিয়েছেন। আমি অতোটা কাব্যপ্রেমী না হলেও কখনো কখনো কবিতার শক্তি আর সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে পড়ি। কিন্তু, আপনি রীতিমত কবিতাভুক। সুতরাং...

আর, কোন 'শেষকথা' আমি বলি নি, বলেছি কি? শুধু আমার ব্যক্তিগত একটি অপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মন্তব্য করেছি। নিজস্ব কাব্যরীতি ভালোলাগা তো থাকবেই, তবে বয়োভেদে অবশ্যই তার রূপ জঙ্গম, এটাই মনে করি। ছোটবেলায় জীবনানন্দ মোট্টে ভালো লাগতো না। কবিতায় কোন গল্প নাই! তাই, রবীন্দ্রনাথের 'কথা ও কাহিনী'-র গল্পকবিতাগুলো খুব প্রিয় ছিলো। বড় হয়ে আমি জীবনানন্দের কুহকে অনেকসময় মূর্ছিত হয়ে পড়েছি। তাই, শেষ নহে যে, শেষকথা বলবে কে?

শুভকামনা।
_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

সৈয়দ আখতারুজ্জামান এর ছবি

ভালো লাগলো।

মহাস্থবির জাতক এর ছবি

ধন্যবাদ দিয়ে আর কি-ই বা হবে? তবে আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- দিলে কাজ হতে পারে, তরকারির সাথে এই শীতে, না?
_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

_______________________________
খাঁ খাঁ দুপুরে, গোধূলিতে আর রাতে বুড়ি পৃথিবী
কেবলই বলছে : খা, খা, হারামজাদা, ছাই খা!

(ছাই: মণীন্দ্র গুপ্ত)

নিশা এর ছবি

আপনার লেখা নিয়ে নতুন করে বলার আর কিছু নেই, প্রশংসাসূচক বিশেষণ এখানে ম্লান । অনেক ধন্যবাদ অনেকদিন পর আপনার লেখা পেয়ে ।

একটা অনুরোধ ছেলো ভাইজান, ইয়ে মানে...ওই আরকি...মানে ওই অব্যর্থ কবিতাটা দেয়া যায় কি ?

তিথীডোর এর ছবি

একটা অনুরোধ ছেলো ভাইজান, ইয়ে মানে...ওই আরকি...মানে ওই অব্যর্থ কবিতাটা দেয়া যায় কি ?

আমিও ইটা রাইখ্যা গেলাম... রাখলাম। হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।