পৃথিবীর পথে

রোমেল চৌধুরী এর ছবি
লিখেছেন রোমেল চৌধুরী [অতিথি] (তারিখ: রবি, ০৫/১২/২০১০ - ৭:৪২অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রথম পর্ব

গ্রেট রিফট ভ্যালিতে এসে আমরা একজনের পেছনে আরেকজন দাঁড়িয়ে পড়লাম। এক সারিতে, দুহাত প্রসারিত করে। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া থেকে পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রান্তর। ৬০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বুক মেলে দিয়ে শুয়ে আছে প্রসন্ন বদনে। এখানে আকাশ পারে মৃত্তিকার বাদামী আয়নায় মুখ দেখে নিতে। এখানে মিশেছে এসে কত সভ্যতার সান্দ্রস্রোত, যুগে যুগে। সিনাইয়ের সুর ভেসে আসে কোন সে সুদূর থেকে, দূরচারী উটের গ্রীবার মতো। সেই সুরে মিশে থাকে গোলানের যুদ্ধগন্ধী বাতাস। জর্ডান নদীর বাষ্পীভূত জলকণা পরিমিত বর্ষণে সিক্ত করে নিদাঘ সময়। লোহিত সাগরের বালুকণা হতে চায় ডাকাতিয়া মরুঝড়ের প্রতিরূপ। দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়া আফ্রিকান প্লেটের আর্তনাদ ম্লান হয়ে আসে। নবজাতকের প্রথম চিৎকারের মতো সোমালি কিম্বা নাবিয়ান প্লেট মাতা-পৃথিবীকে জানান দেয় নিজেদের আগমন বার্তা।

আমদের দেখার ছিল অনেক, সময় ছিল কম। এমনই তো জীবনের অনিবার্য সূত্র। আমরা সবাই সেটা জানতাম। সদ্য কলেজের চৌহদ্দি পেরুনো নাওকো সেটি জানতেন। জানতেন কেটি ওরিরি, যে প্রৌঢ়ার মুখে বলিরেখা নিপুণ জালের মতো দিন দিন দখল পাকাপোক্ত করে চলেছে। আমরা তাই এক জায়গায় বেশীক্ষণ আটকে থাকতে চাই নি। জীবনের গতিময় প্রস্থানকে চলিষ্ণুতার বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছিলাম সাততাড়াতাড়ি। তবু আমাদের বিরতি নিতে হয়েছিল। সেখানে নানা রঙের স্যুভেনিরের পসরা সাজিয়ে রাস্তার পাশের দোকানগুলো যেন সেজে গুঁজে আমাদের পথ চেয়ে বসে ছিল রূপবতী মাসাই রমণীর মতো। সেখানে নৈঃশব্দ্যের ঝাঁঝালো তীর রৌদ্রদগ্ধ দুপুরের বুক চিরে দিয়েছিল।

আমরা কি খুঁজে ফিরছিলাম সেখানে? সেখানে কুড়িয়ে পাওয়া ফসিলের গন্ধ শুঁকে শুঁকে বংশগতির নদীপ্রবাহ ধরে আমাদের কেউ হেঁটে যেতে বলেনি। আমরা কেউই ছিলাম না কিংবদন্তীসম প্রত্নতত্ত্ববিদ ডোনাল্ড জোহানসনের ছাত্র-ছাত্রী কিম্বা নিবিষ্ট অনুসারী। আমদের কারুরই অতীতের খণ্ড খণ্ড শব খুঁড়ে তুলবার দুর্দমনীয় অভীপ্সা ছিলোনা কখনো। ঝাঁঝালো যুদ্ধের দিনশেষে ইতালীয় যুদ্ধবন্দীদের মতো শ্রমের জোয়াল কাঁধে আমরা স্বপ্নে ফিরিনি ঘুরে। শাবল-গাইতির শব্দে রুগ্ন পঙক্তিমালার মতো রচিনি কোন ‘গ্রেট নর্থ রোড’। সেখানে পাহাড় ছিল, ছিলো বৃহৎ জলাধার। এইসব পাহাড় বহু সুউচ্চ স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। এইসব জলাধার বহু দীর্ঘ পথগামী নদীর উৎস হয়েছে। তবু আমাদের যাত্রাপথে ছিলো না মহত্তর কোন ঊর্ধ্বগামী অভিযাত্রার উচ্চাশা। ছিলো না সেইসব সুপ্রাচীন পবিত্র জলে ডুব দিয়ে শুদ্ধ হবার বাসনা। তবু আমরা সবাই দুরন্ত আগ্রহের বলশালী ঘোড়ায় সওয়ার হয়েছিলাম। ছুটে গিয়েছিলাম গ্রেট রিফট ভ্যালি পেরিয়ে মাসাই মারার পথে...(চলবে)।


মন্তব্য

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

রোমেল ভাই, অপেক্ষা করছি পরের পর্বগুলোর। এপর্বে ঠিক ক্লিয়ার হলোনা। আমার মাসাই মারা ভ্রমণ কাহিনী কিন্তু আসছে দুএক দিনের মধ্যে।

======================================
অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলো, সেইতো তোমার আলো।
সকল দ্বন্ধ বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো, সেইতো তোমার ভালো।।

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

রাতঃস্মরণীয় ভাই,
লেখাটির প্রথম পর্ব শেষ হয়নি। মুস্কিল হয়েছে এই যে, আমার প্রাযুক্তিক ক্ষুদ্র বিদ্যের পিঠে সওয়ার হয়ে কিছুতেই একটির বেশী ছবি জুড়ে দিতে পারছি না। বেছে বেছে নেয়া কটি ছবির উপর ভর করে লেখাটি এগিয়ে নেবার পরিকল্পনা করেছিলাম, তাই কিস্তিগুলো ছোট রাখতে একরকম জেলবন্দী কয়েদির মতো বাধ্য হচ্ছি। ভাবছি কয়েকটি কিস্তিতে প্রথম পর্বের কিস্তিমাত ঘটাবো।

নামান না আপনার 'মাসাই মারা' কে! স্মতিচারণের মোহন আনন্দকে ভাগাভাগি করে বহুগুণ বাড়িয়ে নেবার এমন সুযোগ কি সহসা আসে?
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

রাতঃস্মরণীয় এর ছবি

পরের পর্ব তাড়াতাড়ি নামান রে ভাই, তর যে আর সয়না। ছবিতে হ্যাট পরা রে-ব্যান লাগানো দাদাটাই কি রোমেল চৌ?

======================================
অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলো, সেইতো তোমার আলো।
সকল দ্বন্ধ বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো, সেইতো তোমার ভালো।।

------------------------------------------------
প্রেমিক তুমি হবা?
(আগে) চিনতে শেখো কোনটা গাঁদা, কোনটা রক্তজবা।
(আর) ঠিক করে নাও চুম্বন না দ্রোহের কথা কবা।
তুমি প্রেমিক তবেই হবা।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

জী ভাই, পেটমোটা, ঠ্যাংবাঁকা শ্যামলা জন্তুটিই রো চৌ!
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

অতিথি লেখক এর ছবি

রোমেল ভাই, পরের পর্বগুলোর অপেক্ষায় থাকলাম।

--শাহেদ সেলিম

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

শাহেদ ভাই,
অপেক্ষা প্রতীক্ষার মতো মধুরতর করে তোলার তেমন কোন যোগ্যতা নেই আমার।
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

অতিথি লেখক এর ছবি

সুন্দর, সাবলীল লেখা পরের পর্বগুলোর জন্য আকাঙ্খা বাড়িয়ে দিল।

পাগল মন

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

ভাই,
আপনার ত্রিলোচনের শুভ্র দৃষ্টিতে সবকিছু স্বচ্ছ হয়ে ফোটে। আপনাদের আকাঙ্খা পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাবো।
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

বাউলিয়ানা এর ছবি

লেখা ভাল হইসে। আর ছবি নাই?

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

বাউল ভাই,
অনেক অনেক ছবি আছে, সেই সাথে রোমাঞ্চকর ভিডিও। কিন্তু মুস্কিল হয়েছে এই যে, কিছুতেই একটির বেশী ছবি জুড়ে দেবার কায়দাটা রপ্ত করতে পারছি না। বাছাই করা কটি ছবির উপর ভর করে লেখাটি এগিয়ে নেবার পরিকল্পনা করেছিলাম, তাই কিস্তিগুলো ছোট রাখতে একরকম জেলবন্দী কয়েদির মতো বাধ্য হচ্ছি। ভাবছি কয়েকটি কিস্তিতে প্রথম পর্বের কিস্তিমাত ঘটাবো।
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

তিথীডোর এর ছবি

চলুক
পরের পর্বগুলোর অপেক্ষা থাকছে...

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

বোন,
টেনশন দিয়ো না, আমি বেশী টেনশন নিতে পারি না!
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

তাসনীম এর ছবি

চলুক

আপনাকে চেনা চেনা লাগলো, আপনি বুয়েটে পড়তেন মনে হয়...আমি ৮৮ ব্যাচ, ইইই। আওয়াজ দিয়েন tmhossain@জিমেইলডটকম।

ধন্যবাদ।
________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

________________________________________
অন্ধকার শেষ হ'লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে...

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

তাসনীম ভাই,
পুলিশের চোখ আপনার! আমিও ইইই ১৯৮৬। ই-মেল লিখে নিলাম। আমারটা পত্র দিয়েন।
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

সাদাকালোরঙ্গিন এর ছবি

যাক কেনিয়া ভ্রমন নিয়ে আড্ডা ভালই জমেছে। রাত:স্মরনীয় ভাই এর লেখাগুলোর মতই আপনিও চমৎকার বর্ননা করেছেন। কেনিয়া ভ্রমনের কথা মনে পড়লেই আবার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে ঐসব জায়গায়। মাসাইমারা যাওয়ার পথে সন্ধ্যার আগে আগে গ্রেট রিফট ভ্যালি পাড়ি দেয়ার অভিজ্ঞতার কোন তুলনাই নেই। ভ্যালির মধ্যে আমাদের গাড়ি একবার নষ্টও হয়েছিল। সেসময় সেই জনমানব শুন্য মরু প্রান্তরে রাত কাটানোর মানসিক প্রস্তুতিও প্রায় নিয়ে ফেলেছিলাম। অসাধারন ছিল সেই সময়গুলো।

গ্রেট রিফট ভ্যালির আপনার ছবিগুলো শেয়ার করুন। আমিও কয়েকটা শেয়ার করলাম।

এই ভ্যালি প্রায় ২ ঘন্টা ড্রাইভ করে পার হতে হয়। এমন জায়গায় গাড়ি নষ্ট হওয়া সত্যিই ভয়াবহ ব্যাপার।

DSC01025

দিগন্ত জোড়া গ্রেট রিফট ভ্যালি:

DSC01024

ধুসর মাঠ সুনীল আকাশ :

DSC01021

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আঁকাবাঁকা রাস্তা:

DSC01020

শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে :

DSC01018

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

সাদাকালোরঙ্গিন ভাই,
কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো আর কি বিনিময়ে যে আপনার ঋণ শোধ করবো সকাল থেকে তাই শুধু ভাবছি! আপনি আমার বিনম্র সেলাম গ্রহণ করুন, এ ঋণ শুধবার চেষ্টা করা মূর্খতারি নামান্তর!
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

কৌস্তুভ এর ছবি

আপনার লেখা আপনার কবিতার মতই মসৃণ। তবে লেখার সাথে পর্যাপ্ত ছবি দিতে পারেননি শুনে ব্যথিত হলাম। ফ্লিকার কি ইমেজশ্যাক ইত্যাদি কোনো সাইটে আপলোড করে এমবেড করে দেন না। সমস্যা হলে আওয়াজ দিয়েন। আর ছবিতে তো আপনি ছিলেন বলে মনে হল না?

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

কৌস্তুভ ভাই,
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে!
আপিসের আইটি কর্তারা 'ফ্লিকার' রেস্ট্রিক্টেড করে দিয়েছে। দেখি, ইমেজশ্যাক কাজ করে কিনা। রোমাঞ্চকর নভিসেস ভিডিও আছে কিছু, ডিস্কাভারী বা এনিমেল প্ল্যানেট থেকে একেবারেই ভিন্ন। ছবিতে আছি রে ভাই, আত্মপ্রচারের এমন সুযোগ কি বাঙ্গালী হাতছাড়া করে?
পুনশ্চঃ কই ই-মেল পেলাম না তো? প্রতীক্ষার প্রহর বড়ো মধুময়!
-----------------------------------
যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

কৌস্তুভ এর ছবি

ও, ওই কালোচশমার পেছনেই আপনি নাকি?

ইমেল তো কয়েকদিন আগেই করেছি! বরং আমিই প্রতীক্ষায় দিন গুনছিলেম...

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।