পাঠ পরবর্তী প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক চিন্তাভাবনাঃ যদ্যপি আমার গুরু

আশফাক আহমেদ এর ছবি
লিখেছেন আশফাক আহমেদ [অতিথি] (তারিখ: শনি, ২৯/১০/২০১১ - ১:১৪পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

০।
এই লেখাটিকে মোটাদাগে কোন 'পাঠ প্রতিক্রিয়া' বলা যাবে না নিশ্চয়ই। পাঠ প্রতিক্রিয়ায় পাঠক পঠিত গ্রন্থের উপর একটা চমৎকার আলোচনা আশা করেন। সেরকম কিছু আশা করলে বিজ্ঞ পাঠককে হতাশ হতে হবে। কেননা "যদ্যপি আমার গুরু" পড়ার পর থেকেই অনেকদিন ধরে জমে থাকা কিছু কথা ভাষায় ফুটিয়ে তোলার জন্য কীবোর্ডটা আকুপাকু করছে। কিন্তু কিছুতেই লেখাটা গুছিয়ে নিতে পারছি না। আমি আসলে কাকে ফোকাস করে লিখবো- আহমদ ছফাকে, প্রফেসর রাজ্জাককে না সরল অর্থে এই বইটাকে? তার উপর আহমদ ছফা ও এই বইটির পূর্বাপর নিয়ে সচল শুভাশীষদা এতো চমৎকার একটা সিরিজ লিখেছেন, যে এরপর কিছু বলতে যাওয়াটাই বাহুল্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু য়ামাদের গুরু তো অনেক আগেই বলে গিয়েছেন, "ওরে প্রাণের বাসনা, প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি"। সেই ভরসাতেই লেখাটায় হাত দিলাম। ভুলত্রুটি কিছু হলে বিজ্ঞ পাঠক ক্ষমাসুলভ দ্‌ষ্টিতে দেখবেন, এইটুকু আশা করতেই পারি।

১।
মহাপুরুষদের সম্পর্কে বিশ্বাস্য অবিশ্বাস্য নানা মিথ গড়ে উঠবে---এটাই স্বাভাবিক। প্রফেসর রাজ্জাক সম্পর্কেও মিথের ঘাটতি ছিল না। দুষ্টজনেরা বলে বেড়াতেন, উনি নাকি বইয়ের ফ্ল্যাপ পড়ে জ্ঞান কপচাতেন। সারবস্তু বিশেষ কিছু জানতেন না। শিষ্য আহমদ ছফা দুর্জনের এই যুক্তির বিরুদ্ধে কোন পাল্টা যুক্তি খাড়া করে সময় নষ্ট করেননি। একজন গুণী মানুষকে যতোটুকু সম্মান দেয়া দরকার, তিনি ঠিক ততোটুকুই দেবার চেষ্টা করেছেন গোটা বই জুড়ে। হ্যাঁ, কোথাও কোথাও গুরুভক্তির প্রভাবে লেখাটা আর নির্মোহ থাকেনি। তাতে কী? গ্রন্থের নামই তো "যদ্যপি আমার গুরু"। বাংলা সাহিত্যে আর কেউ কী তার গুরু বা শিক্ষককে নিয়ে এমন চমৎকার লেখা লিখতে পেরেছেন? আমার জানাশোনার পরিধি অল্প। সামান্য ক'টা বই পড়েছি এ জীবনে। তাই...জানি নে। ছফা যখন তাই রাজ্জাককে ছয় দফা কিংবা বাংলাদেশের স্রষ্টা বলেন, তখন আমরা কিঞ্চিৎ অস্বস্তিতে পড়ে যাই। যে মানুষটি মিস্টার জিন্নাহর বড়সড় ভক্ত কিসিমের ছিলেন, তিনি কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা হন। এ প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখলাম। প্রফেসর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে এসেছেন, এমন মানুষ এখনো হয়তো বিরল নয়।

প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদও তার আত্নজীবনীমূলক গ্রন্থ 'বলপয়েন্ট'-এ রাজ্জাকের প্রসঙ্গে দু-চার কথা বলেছেন। অকপটেই স্বীকার করেছেন, রাজ্জাকের বাসভবনে সবসময় রথী-মহারথীদের এতোটাই ভীড় লেগে থাকতো যে, সেই ভীড় ঠেলে খুব কমই তিনি তাঁর সান্নিধ্যে আসতে পেরেছেন। সেই রথী-মহারথীদের কেউ যদি সেই সময়, সমাজ ও বিশেষ করে প্রফেসর রাজ্জাককে নিয়ে নিজেদের স্ম্‌তিটুকু আমাদের সাথে শেয়ার করেন, বাংলা সাহিত্য অপক্‌ত হবে না, এইটুকু আশা করা যায়।

২।
হুমায়ূন আহমেদের প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন হু.আ. ও ছফার সম্পর্ক নিয়ে সামান্য কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। আমার ধারণা, হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আহমদ ছফার এক ধরণের অন্ধ স্নেহ ছিল। স্নেহের এই দুর্বলতাটুকু তিনি প্রকাশ্যেই ঢেকে রাখার চেষ্টা করতেন। বলতেন, হুমায়ূন আহমেদ পয়সার জন্য ছাইপাশ লেখা শুরু করেছে, তাতে আমার কী? [উপলক্ষের লেখা]। এই বইয়েও খুব সামান্য হলেও হুমায়ূন আহমেদের প্রসঙ্গ এসেছে। হুমায়ূন আহমেদের লেখা সম্পর্কে প্রফেসর রাজ্জাক কী ভাবতেন, তা উঠে এসেছে ছফার জবানীতে। রাজ্জাক সাহেব ছফার মতই হুমায়ূনের প্রথম দিককার লেখাগুলো নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। আমার ধারণা, এই অংশটুকু ছফা বইয়ে না ঢোকালেও পারতেন। কেনো তিনি এই কাজটুকু করতে গেলেন? হুমায়ূনের প্রতি এককালে তার যে ভালোবাসা এবং বিশ্বাস ছিল, তা অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়েও যে ফুরিয়ে যায়নি, এই প্যারাটুকু তার প্রমাণ। ছফা হয়তো বিশ্বাস করতেন, বাংলা সাহিত্যকে কিছু দেবার মত ক্ষমতা হুমায়ূনের এখনো আছে। অবশ্য ছফা আজ, ২০১১তে বেঁচে থাকলে তার এই বিশ্বাসটুকুও অটুট থাকতো কিনা সন্দেহ।

৩।
ছফার যে কোন আত্নজীবনীমূলক লেখায় আরো দু'জন মানুষের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা হরহামেশাই পাওয়া যায়। একজন শিল্পী সুলতান (আমি উনাকে "এস এম সুলতান" এইরকম প্রফেসরসুলভ নামে না ডেকে শিল্পী সুলতান ডাকতেই শ্বচ্ছন্দ বোধ করবো), আরেকজন কবি জসীমউদ্‌দীন ('পল্লীকবি' জসীমউদ্‌দীন বললে উনাকে অনেকখানি সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলা হয়। তাই, এই প্রিফিক্সটা আর ব্যবহার করলাম না)। জসীমউদ্‌দীনকে অবশ্য আধুনিক কবিরা 'কবি' স্বীকার করতেই রাজি নন। আমি কাব্য বিশারদ নই। তাই, সে প্রসঙ্গে কিছু বলছি না। ছফার সূত্র ধরে এবং মুনতাসীর মামুনের ঢাকার ইতিহাস পড়ে যদ্দূর জেনেছি, তাতে এটুকু বলতে পারি, লোকটা খাঁটি বাঙালী ছিলেন। 'খাঁটি বাঙালী' যেমন এ যুগে দুর্লভ, তেমনি সে যুগেও বড্ড সুলভ ছিল না। জসীমউদ্‌দীন ছিলেন যুগের বিপরীতে এক অনন্য ব্যতিক্রম। কবির গদ্যরচনার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন প্রফেসর রাজ্জাক। শিষ্য ছফাকে তাই নিজ থেকে আদেশ দিয়েছেন কবির আত্নজীবনীটি পড়ে দেখার জন্য।

প্রতিবারই যখন বইমেলায় যাই, জসীমউদ্‌দীনের বই দিয়ে সাজানো স্টলটা অবহেলায় নেড়েচেড়ে চলে আসি। পরের বার যখন যাব, তখন নিশ্চয়ই আত্নজীবনীটি বাগিয়ে নিয়ে আসবো।

৪।
আর শিল্পী সুলতানের সাথে ছফার বন্ধুত্ব নিয়ে অধিক আর কী বলবো? বিজ্ঞ পাঠকমাত্রই জানেন, বাঙালী সুধীসমাজ যখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ছাড়া আর কোন শিল্পীকেই শিল্পীর মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করতো, তখন এই আহমদ ছফা পাগলাটে সুলতানকে সুধী সমাজের অঙ্গনে পরিচিত করে তোলেন। সুলতানের বেশ কিছু এগজিবিশনের আদ্যোপান্ত দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। সুলতানকে কিছুদিনের জন্য প্রফেসর রাজ্জাকের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন এই ঠোঁটকাটা ভদ্রলোক। সেই সুবাদে রাজ্জাকের পরিবারের সাথে এক হ্‌দ্যতাপূর্ণ সম্পর্কও তৈরি হয় সুলতানের। সুলতানকে নিয়ে প্‌ষ্ঠার পর প্‌ষ্ঠা লিখে গেছেন ছফা। আমার পড়া বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে দীর্ঘ বাক্যটিও তিনি লিখেছেন সুলতানকে নিয়ে। হয়তো বেঁচে থাকলে সুলতানকে নিয়েই 'যদ্যপি আমার বন্ধু' শিরোনামের একটা আস্ত মাস্টারপিসও লিখে ফেলতেন।

৫।
সাতচল্লিশের দাঙ্গার জন্য প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে হোশেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীকে দায়ী করা হয়। হুমায়ূন আহমেদের 'মধ্যাহ্ন' উপন্যাসের একটি চরিত্র সোহ্‌রাওয়ার্দীর চরিত্রের এ দিকটি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বলা হচ্ছে, সোহ্‌রাওয়ার্দী সাহেব দিনরাত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলতেন, এদিকে গোপনে তার কর্মীদের ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিতেন, "হিন্দু কমাও। হিন্দু কমাইতে পারলে তুমরা আলাদা দেশ পাবা।" প্রফেসর রাজ্জাক অবশ্য বিশ্বাস করেন না, কেবল সোহ্‌রাওয়ার্দীর ইন্ধনেই কলকাতার দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিলো। অভিযোগ, এই জাতীয় নেতা কলকাতার মুসলমান পুলিশদের ক্ষেপিয়ে দাঙ্গার সূত্রপাত করেছিলেন। এদিকে রাজ্জাক বলছেন, কলকাতায় তখন মুসলমান পুলিশের সংখ্যা গোটা পুলিশ বাহিনীর এক-চতুর্থাংশও হবে না। এরা যদি দাঙ্গা শুরুও করে, অন্য জনগোষ্ঠীর পুলিশেরা আন্তরিক হলে অবশ্যই সে দাঙ্গা দমন করা যেত। তবে এটা ঠিক, রাজ্জাকের সমস্ত চিন্তাভাবনার মধ্যেই মোটাদাগে বাঙালী মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি এক ধরণের দুর্বলতা লক্ষ করা যায়।

৬।
আহমদ ছফার থিসিসের বিষয়বস্তু ছিল ঊনিশ শতকে বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ। সেই সূত্রেই ছফার সাথে রাজ্জাকের পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। তো সেই সময়কার কিছু প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই এই গ্রন্থে এসেছে। সেই সময়কার সবচেয়ে বড় মানুষ কে, এ প্রশ্নের জবাবে রাজ্জাক নির্দ্বিধায় বিদ্যাসাগরের নাম উল্লেখ করেন। এই মানুষটি সম্পর্কে যতই জানতে পারি, ততই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। কী পরিমাণ ডেডিকেশন থাকলে একজন মানুষ শিক্ষা বিস্তারের জন্য ঘরের খেয়ে গ্রামে গ্রামে মোষ তাড়িয়ে বেড়ান, ভাবতে অবাক লাগে। এ প্রসঙ্গেউ রামমোহন ও সৈয়দ আমীর আলীর কথাও এসেছে। মাধ্যমিকে থাকতে সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের বদৌলতে এদের রচনাবলীর নামই মুখস্ত করেছি কেবল। কখনো মাথায় এ প্রশ্নের উদয় হয়নি, যে সময়টায় রামমোহন ও অন্যান্য হিন্দু লেখকেরা বাংলা গদ্যের ভিত্তি স্থাপন করছেন, সেসময় আমীর আলী সাহেবেরা ইংরেজিতে 'দ্যা স্পিরিট অফ ইসলাম' লিখে জনসমাজের কোন উপকারটা করছেন? বাঙালী মুসলমান সমাজ সেসময় ব্যাপকার্থে অশিক্ষিত ছিল, তাই হয়তো তিনি ইংরেজি শিক্ষাপ্রাপ্ত অভিজাত মুসলিম সমাজের জন্যই বইটি লিখেছিলেন। বাঙালী মুসলমানের কপাল মন্দ, যে তাদের মধ্যে একজন বিদ্যাসাগরের আবির্ভাব ঘটেনি; ঘটলে হয়তো দু-দশ বছর পরে হলেও আমরা এই বিষয়েই আরো চমৎকার কোন বই পেতাম যার ভাষা হত 'বাংলা'।

৭।
এই স্থলে প্রফেসর রাজ্জাকের চরিত্রের দুটো বৈশিষ্ট্যের দিকে একটূ আলো না ফেললেই নয়। ছফার জবানী থেকেই বলছি, রাজ্জাক সাহেবের কাছে নানাজন নানারকমের আদর-আবদার নিয়ে আসতো। এবং সম্ভব হলে এইসব ন্যায়-অন্যায় আদর-আবদার তিনি মেটাতেনও। তার মত একজন জ্ঞানসাধক কেন এইসব ছোটখাট ব্যাপারে জায়গায়-অজায়গায় সুপারিশ করতেন, এই ব্যাপারটা ছফাকে বিস্মিত করেছে। গ্রন্থের শুরুর দিকে তিনি একবার বলেছেন, "পরে আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি।" পাঠককে তিনি এমন একটা ইঙ্গিতও দেন, যে গ্রন্থের শেষভাগে এসে তিনি বিষয়টার জট খুলবেন। আমি তখনই মোটামুটি নিঃসন্দেহ, এটা লেখকের পাঠক ধরে রাখার একটা কৌশল মাত্র। লেখকেরা প্রায়ই পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখার জন্য এই ফর্মুলাটা এ্যাপ্লাই করেন। গ্রন্থের শুরুর দিকে একটা পাঠককে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন বা রহস্যের গেরো খুলতে বলেন এবং আশ্বাস দেন যে, আমার সাথে গ্রন্থের অলিগলিতে হাঁটুন। আপনি আপনার প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখক তার ওয়াদার কথা বেমালুম ভুলে যান। আমরা শূদ্র পাঠকরা তাই আর জানতে পারি না, প্রফেসর রাজ্জাক কেন আর দশটা প্রফেসরের মত সুপারিশের বাণিজ্য করতেন কিংবা এজন্য তিনি আদৌ রিশওয়াত নিতেন কিনা।

৮।
দেশের ছেলেরা বাইরে গিয়ে পড়াশুনা করুক, দেশের মুখ উজ্জ্বল করুক---এইসব ব্যাপারে আবার রাজ্জাক সাহেব ছিলেন যথেষ্ট উদার। এমনকি সেই ছেলে যদি তার বিরুদ্ধে উলটাপালটা কিছু লিখে থাকে, তাও। সলিমুল্লাহ খান নাকি একবার প্রফেসর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী একটা কিছু লিখেছিলেন। পরবর্তীতে তার স্কলারশিপের জন্য রাজ্জাক স্যারের রেকমেণ্ডেশনের দরকার হয়। অন্যরা এই ক্ষেতের কী করেন, আমার জানা নেই। রাজ্জাক সাহেব কিন্তু ঠিকই তাকে রেকমেণ্ড করেছিলেন এবং আরো জায়গা থেকে রেকমেণ্ডেশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, পোলাডার ট্যালেন্ট আছে। ওরে না করি ক্যাম্নে?

সলিমুল্লা খানের লেখাটা আমার পড়া নেই। 'যদ্যপি আমার গুরু' পড়ার সামান্য সমস্যা হচ্ছে, প্রচুর রেফারেন্সের প্রয়োগ। এই রেফারেন্সগুলো পড়তে গেলেই আমার আরো এক জীবন সময় লাগবে, কোন সন্দেহ নেই। তদ্দিন পর্যন্ত, স্টে টিউনড :পি


মন্তব্য

কর্ণজয় এর ছবি

আপনার লেখাটি পড়ে একটি আনন্দদায়ী ভ্রমণ হলো...

একটি ... না, দুটি বিষয়ে আমার সামান্য কিছু বলতে ইচ্ছে করছে।
প্রথমটি প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সুপারিশ প্রসঙ্গে।
এই সুপারিশের পেছনে একটি ব্যাখ্যা রয়েছে সেই সময়ের সামাজিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে। প্রফেসর রাজ্জাক সেই সময়ের মানুষ যখন মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী মুসলমান সমাজ একটা রূপ পাচ্ছে। এই মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী সমাজ গড়ে উঠেছিল মূলত কৃষক সন্তানদের শিক্ষিত হবার মধ্য দিয়ে। সেই সময়টা এমন ছিল- যারা অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক দিক থেকে এগিয়ে ছিলেন তাদের নৈতিক একটা প্রথার মতই ছিল অন্য বাঙ্গালী মুসলমানদের শিক্ষা এবং চাকুরীক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার জন্য সাহায্য করা। তিনি এই কাজটি একজন খাটি বাঙ্গালী মুসলমান হিসেবে তার কর্তব্যজ্ঞান করে করে গেছেন। ঠিক এই কারনে একজন বাঙ্গালী মুসলমানের প্রতিষ্ঠাগত উপকার হতে পারে এন যে কোন কাজই কোন রাখঢাক কিংবা লজ্জার প্রয়োজন বোধ করেন নি।

আর দ্বিতীয়টি পল্লীকবি জসিমউদ্দীন প্রসঙ্গে।
কবি জসিমউদ্দীনের একটি অনন্য কীর্তি আছে। তিনি কবিতার মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের চিহ্ণ বা আর্কিটাইপ তৈরী করে গেছেন। চিত্রকলায় জয়নুল আবেদীনকে সামনে রেখে কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, কামরুল হাসানরা বাঙ্গালীর রেখা রূপের চিহ্ণ বা সিম্বল তৈরী করেছিলেন। পূর্ব বঙ্গের মেঘ, গরুর গাড়ি, একটি ছেলেমেয়ের যুগল দৌড়, রমণী, নৌকা, নদী, কাশ ফুল- এইসব চিরায়ত বাঙ্গালীর প্রতীক তারা সৃষ্টি করেছেন যা দিয়ে আমরা আবহমান বাঙ্গালীকে চিনতে পারি। একদিন বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে। কিন্তু আবহমান বাংলা বলতে আমরা এই চিহ্ণকে ধরে রাখবো।
কবি জসিমউদ্দিন এই কাজটি করে গেছেন কবিতায়। আমরা তার কবিতায় এই আবহমান পূর্ববঙ্গের ছবি পাই। এই পূর্ববঙ্গ পল্লীপ্রধান। কৃষি নির্ভর। তিনি বাংলার এই ছবি বা চিহ্ণগুলো আমাদের জন্য তৈরী করে গেছেন। আমার কাছে পল্লী কবি শব্দটা কবি হিসেবে তাকে সংকীর্ণ করার বদলে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে বলে মনে হয়। যিনি এককভাবে বাংলার আবহমানতার কাব্যিক সূত্রধর হিসেবে থেকে যাবেন চিরকাল। এই অর্থে আরও অনেক কাল পরে, বাংলাদেশের রূপ প্রকৃতি যখন পুরো পাল্টে যাবে তখন আজকের আধা নাগরিক, সিকি গ্রামীন, পুরো আধূনিকতা বিলীন হবে পরবর্তী সমাজ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে- কিন্তু আবহমান গ্রামীণ বাংলার প্রতীক হয়ে জসিমউদ্দীনই বেচে থাকবেন, যারা তাকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত তারা নয়।

মৃত্যুময় ঈষৎ(অফ্লাইন) এর ছবি

কবি জসিমউদ্দীনের একটি অনন্য কীর্তি আছে। তিনি কবিতার মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের চিহ্ণ বা আর্কিটাইপ তৈরী করে গেছেন। চিত্রকলায় জয়নুল আবেদীনকে সামনে রেখে কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, কামরুল হাসানরা বাঙ্গালীর রেখা রূপের চিহ্ণ বা সিম্বল তৈরী করেছিলেন। পূর্ব বঙ্গের মেঘ, গরুর গাড়ি, একটি ছেলেমেয়ের যুগল দৌড়, রমণী, নৌকা, নদী, কাশ ফুল- এইসব চিরায়ত বাঙ্গালীর প্রতীক তারা সৃষ্টি করেছেন যা দিয়ে আমরা আবহমান বাঙ্গালীকে চিনতে পারি। একদিন বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে। কিন্তু আবহমান বাংলা বলতে আমরা এই চিহ্ণকে ধরে রাখবো।
কবি জসিমউদ্দিন এই কাজটি করে গেছেন কবিতায়। আমরা তার কবিতায় এই আবহমান পূর্ববঙ্গের ছবি পাই। এই পূর্ববঙ্গ পল্লীপ্রধান। কৃষি নির্ভর। তিনি বাংলার এই ছবি বা চিহ্ণগুলো আমাদের জন্য তৈরী করে গেছেন। আমার কাছে পল্লী কবি শব্দটা কবি হিসেবে তাকে সংকীর্ণ করার বদলে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে বলে মনে হয়। যিনি এককভাবে বাংলার আবহমানতার কাব্যিক সূত্রধর হিসেবে থেকে যাবেন চিরকাল। এই অর্থে আরও অনেক কাল পরে, বাংলাদেশের রূপ প্রকৃতি যখন পুরো পাল্টে যাবে তখন আজকের আধা নাগরিক, সিকি গ্রামীন, পুরো আধূনিকতা বিলীন হবে পরবর্তী সমাজ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে- কিন্তু আবহমান গ্রামীণ বাংলার প্রতীক হয়ে জসিমউদ্দীনই বেচে থাকবেন, যারা তাকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত তারা নয়। চলুক চলুক চলুক

তারেক অণু এর ছবি

চমৎকার বলেছেন কর্ণ দা।
বইটি পড়েছি অল্প কিছু দিন আগে, অধ্যাপক রাজ্জাক সম্পর্কে আরো জানতে চাই। আর এমন মানুষদের নিয়ে চট করে কোন সিদ্ধান্তে আসা সহজ কোন কাজ নয়।

আশফাক আহমেদ এর ছবি

কর্ণদা, এখন তো এই গ্রন্থের উপর আপনার একটা আলোচনা পড়ার দাবি জানাতে ইচ্ছা করছে। সংকোচ না করে দাবি জানিয়ে গেলাম। অপেক্ষায় থাকবো

-------------------------------------------------

ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেফ সমস্ত কাগজ !
আমি বাজে ছেলে, আমি লাষ্ট বেঞ্চি, আমি পারবো না !
আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ !

সালেহ এর ছবি

সোহরাওয়ার্দি সম্পর্কে এমন জঘন্য মিথ্যা কথা বলার জন্য লেখাটির নিন্দা করছি।

সাত্যকি. এর ছবি

সোহরাওয়ার্দি সম্পর্কে লেখক নিজস্ব কোন বিশ্লেষণ এখানে লিখেননি। যেটুকু লিখেছেন সেটা হুমায়ূন আহমেদ ও আহমদ ছফার বই থেকে নেয়া। এবং লিখার শেষে লেখক এও বলেছেন যে, এই বইএর সূত্র ধরে যেসব রেফারেন্স আসছে, সেগুলো পড়তেও আরো অনেক সময় দরকার। সেকারণেই এই লিখাটি যতটা না রিভিউ, তারচে অনেক বেশি গ্রন্থ সারাৎসার।
আপনি সোহরাওয়ার্দি সম্পর্কে কি কি রমণীয়, কমনীয় সত্য কথা জানেন বলুন। শুধু তেব্র নিন্দা কিংবা গভীর শোক জ্ঞাপন জাতীয় এক লাইনের আলটপকা মন্তব্য করে সটকে পড়ার বিটিভিয় মানসিকতা ফেসবুকের জন্য তুলে রাখুন, পারলে।

নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরী এর ছবি

আপনার লেখাটা ল্যাপটপে ওপেন করা ছিল প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা। পড়তে গেলেই কোন না কোন ভাবে বাঁধা পড়ছিল। তারপরও বারবার আগ্রহ নিয়ে ফিরে আসার কারণ ছিল লেখার মূল দুই চরিত্র। কিন্তু পুরো লেখাটা পড়ে আমি কিছুটা হতাশ। আপনি যে সুরে লেখাটা শুরু করেছিলেন, অর্থাৎ আপনার বইটাকে নিয়ে কিছু বলার অদম্য ইচ্ছে ছিল - তাতে আমি আশা করেছিলাম বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনি বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেই ইতি টানলেন। খানিকটা হতাশ হলাম।

বানান আমি নিজেই প্রায়ই ভুল করি। তাই সেটা নিয়ে আপত্তি তোলার আমার অধিকার নেই। কিন্তু এ লেখায় কিছু ভুল রীতিমত চোখে পড়ার মত। 'য়ামাদের', 'শ্বচ্ছন্দ' ইত্যাদি ভুল খুব চোখে লেগেছে।

আশফাক আহমেদ এর ছবি

বানান ভুলের জন্য দুঃখিত। ভবিষ্যতে আরো সতর্ক হবার চেষ্টা করবো।
আর লেখা প্রসঙ্গেঃ শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছি, এটাকে গ্রন্থালোচনা ভাবলে ভুল হবে। এটা হচ্ছে, গ্রন্থটি পড়ার পর বহুদিন ধরে জমে থাকা কিছু চিন্তাভাবনা কীবোর্ডে উঠে আসার ব্যর্থ প্রয়াস।
আর গ্রন্থালোচনা লেখার মত পড়াশোনা আমার যথেষ্ট কম। পড়াশোনা করি, আরেকটু জ্ঞানগম্যি হোক, ভবিষ্যতে চেষ্টা থাকবে চমৎকার কিছু লেখার

-------------------------------------------------

ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেফ সমস্ত কাগজ !
আমি বাজে ছেলে, আমি লাষ্ট বেঞ্চি, আমি পারবো না !
আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ !

মন মাঝি এর ছবি

চমৎকার লেখা।

****************************************

আশফাক আহমেদ এর ছবি

ধন্যবাদ মন মাঝি ভাইয়া হাসি

-------------------------------------------------

ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেফ সমস্ত কাগজ !
আমি বাজে ছেলে, আমি লাষ্ট বেঞ্চি, আমি পারবো না !
আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ !

হাসান মোরশেদ এর ছবি

http://www.sachalayatan.com/hasan_murshed/25436

এই পুরনো লেখাটা একনজর দেখে যেতে পারে।

-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।

আশফাক আহমেদ এর ছবি

আপনার এই লেখাটা আগেই পড়েছিলাম মোরশেদদা। তবে এইবার আপনার লেখার সূত্র ধরে সরদার ফজলুল করিমের সাক্ষাৎকারটাও পড়লাম। ধন্যবাদ

-------------------------------------------------

ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেফ সমস্ত কাগজ !
আমি বাজে ছেলে, আমি লাষ্ট বেঞ্চি, আমি পারবো না !
আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ !

আব্দুল্লাহ্ এ. এম. এর ছবি

জসিমউদ্দীনের স্মৃতিকথাটি সবার অবশ্যপাঠ্য, এটি একুশের বইমেলায় সহজপ্রাপ্য। বইটি পড়ার আগে তাঁর বিশালত্ব এবং আধুনিকতা সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই ছিল না, আপনাদেরও ধারনা বদলে যাবে।

আশফাক আহমেদ এর ছবি

পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
কবি জসীমিউদ্‌দীনের বইটি নিয়ে লেখে ফেলুন না একটি চমৎকার রিভিউ।

-------------------------------------------------

ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেফ সমস্ত কাগজ !
আমি বাজে ছেলে, আমি লাষ্ট বেঞ্চি, আমি পারবো না !
আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ !

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

চলুক

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

আশফাক আহমেদ এর ছবি

ধন্যবাদ নজরুলদা।
আপনার কমেন্ট, তা বইপড়ুয়া গ্রুপেই হোক আর সচলেই হোক, পেতে সবসময়ই ভালো লাগে। কাইন্ড অফ ইন্সপিরেশ্ন

-------------------------------------------------

ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেফ সমস্ত কাগজ !
আমি বাজে ছেলে, আমি লাষ্ট বেঞ্চি, আমি পারবো না !
আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ !

সবুজ পাহাড়ের রাজা এর ছবি

চমৎকার লেখা। চলুক

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।