নিজ দেশে পরবাস

রেজওয়ান এর ছবি
লিখেছেন রেজওয়ান (তারিখ: শুক্র, ৩০/১০/২০১৫ - ৪:৩৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অস্ট্রেলিয়ার উত্তরের ডারউইন নর্থার্ন টেরিটোরির রাজধানী হলেও খুব একটা বড় শহর নয়। জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখের মত। ১৮৩৯ সালে এইচএমএস বিগল জাহাজ সেই অঞ্চলে জরিপ করতে যাওয়ার পর বন্দরটির নাম পোর্ট ডারউইন রাখা হয় নামকরা জীববিজ্ঞানী ও বিবর্তণবাদের ধারনা প্রদানকারী চার্লস ডারউইন এর সম্মানে। এই এইচএমএস বিগলে করেই ডারউইন তার দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রা শেষ করেন ১৮৩৬ সালে।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সন্নিকটে বলে ডারউইন শহরটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডারউইনে অস্ট্রেলিয়া ও ইঙ্গ-মার্কিন অ্যালাইড ফোর্স এর গুরুত্বপূর্ণ ঘাটি ছিল ডারউইনে এবং ১৯৪২ সালে জাপানিদের দ্বারা উপুরযপুরি বোমা হামলার শিকার হয় এবং অনেক লোক মারা যাবার পাশাপাশি শহরের অনেক ক্ষতি সাধিত হয়। তবে যুদ্ধপরবর্তী সময় শহরটির বেশ উন্নয়ন হয় এবং ১৯৫৯ সালে ডারউইন পূর্ণ শহরের মর্যাদা পায়।


মিন্ডিল সমুদ্রসৈকত, ডারউইন

তবে এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা হচ্ছে লারাকিয়া সম্প্রদায়ের লোক যারা নিজেদের 'লোনাপানির মানুষ' বলত এবং আসে পাশের তিউই, ওয়াগাইট ইত্যাদি দ্বীপের সাথে পণ্য আদানপ্রদান করত। সেটেলাররা আসার পর তারা প্রথমদিকে বাধা দিলেও পরে তাদের জন্যে শিকার জাতীয় খাবার সরবরাহ করা শুরু করে। প্রথম দিকে তারা শহরের মধ্যেই বা প্রান্তে সহাবস্থান করত। পরে তাদের শহর থেকে অনেক দূরে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে প্রায় ২০০০ লারাকিয়া সম্প্রদায়ের লোক বেঁচে আছে।

অস্ট্রেলিয়ার অনেক বড় শহরে (যেমন ক্যানবেরা/সিডনী) রাস্তা এবং এলাকার নাম রয়েছে আদিবাসীদের ভাষায়। কিন্তু তাদের চাক্ষুষ দেখা যায় খুব কম। তবে ডারউইন এবং নর্থার্ন টেরিটোরির অন্যান্য অনেক শহরের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে পার্কে, রাস্তার মোড়ে এবং অন্যান্য উন্মুক্ত স্থানে অনেক আদিবাসীর দেখা মেলে। এদের অনেকে বাস্তুহীন - তবে অনেকে সংস্কৃতিগতভাবে চার দেয়ালের ভিতরে বা ছাদের নীচে থাকতে চায়না এবং উন্মুক্ত আকাশের নীচে থাকতে পছন্দ করে। স্থানীয়ভাবে এদের বলে লং গ্রাসার্স। প্রতি রাতে প্রায় ১০০০ আদিবাসী ডারউইনের বিভিন্ন পার্কে/রাস্তার ধারে খোলা আকাশের নীচে থাকে।

একটি দেশে কর্মরত জনতাকে দিয়েই বর্ণবাদ ভালভাবে বোঝা যায়। ডারউইন এর দোকানে বা অফিসে আদিবাসীরা খুব অল্প পরিমাণেই কাজ করে। আদিবাসীদের জন্যে রয়েছে সরকারি বাসা বা ক্যাম্প - যেখানে তারা থাকেনা। তারা রাত কাটায় খোলা আকাশের নিচে। পার্কে, জঙ্গলে বা মরুভূমিতে। তাদের বাসায় যেতে বললে তারা বলে এটাই তো আমার বাড়ি। এমন যাযাবর জীবন সংস্কৃতিকেই তারা নিজেদের মনে করে। এটাও অস্ট্রেলিয়া - ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রি, বিশেষ করে নর্দার্ন টেরিটোরিতে।

এর মূল কারণ - শ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলিয়ানরা ভেবেছে ইট পাথরের বাসায় আদিবাসীদের রেখে পশ্চিমা খাবার খাইয়ে, বাচ্চাদের স্কুলে পড়িয়ে তাদের মত সভ্য মানুষ করে ফেলতে পারবে। কিন্তু তাদের কখনো সময় নিয়ে শেখানো হয়নি কিভাবে চার দেয়ালের মাঝে ছাদের নিচে বসবাস করতে হয় অন্যান্য অস্ট্রেলিয়ানদের মত। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তাদের জন্যে বিশেষ কারিকুলাম ছিল। তাদের অনেকে চাকরি পায়না কারণ তাদের বদনাম রয়েছে যে তারা কাজে মনযোগী না - বা মদ খেয়ে পরে থাকে ইত্যাদি। অস্ট্রেলিয়া উন্নত বিশ্বের একটি দেশ - সেখানে কেন ৫ লাখ আদিবাসী গরিব বা বাস্তুহীন থাকবে? সরকারের তো সামর্থ্য আছে এদের জীবনের জরুরি চাহিদাগুলো পুরণ করার।

অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসীদের বসতি মোটামুটি ৪০ হাজার বছর ধরে। তবে গুহাচিত্র ছাড়া তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত কোন তথ্য পাওয়া যায়না কারণ এই অঞ্চলে দূরের কেউ আসতো না। ইন্দোনেশিয়া বা মাকাসার এর নাবিকরা উল্লেখ করেছে আদিবাসীদের সাথে তাদের দেখা পাবার কথা যখন তারা জাহাজ নিয়ে পারি জমাতো মাছ ধরার জন্যে এবং মাঝে মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার ভূমিতে নোঙ্গর গাড়ত।


গুহাচিত্র

১৭৮৮ সালে ব্রিটিশরা যখন সিডনীর বোটানি বে'তে প্রথম আসল, তখন স্থানীয় আদিবাসীরা তাদের জাহাজ লক্ষ্য করে তীর আর বর্শা ছুড়েছিল। কিন্তু এর পরেই তারা আধুনিক অস্ত্রের ও কূটবুদ্ধির কাছে অনুগত হয়েছে কারণ স্বভাবগত দিক দিয়ে তারা নিউজিল্যান্ডের মাউরিদের মত যোদ্ধা জাতি না।

যখন একের পর এক শহর পত্তন হওয়া শুরু করল এই বিশাল মহাদেশে তখন স্থানীয় আদিবাসীদের দিয়ে রাস্তা বানানো/খনিতে কাজ ইত্যাদি করানো হতো এবং তাদের পরিবারদের সরিয়ে নেয়া হয় গির্জার তত্ত্বাবধানে বা সরকারি ক্যাম্পে। যুগে যুগে যখন আদিবাসীদের সভ্য জীবন যাপনে অভ্যস্ত করার চেষ্টা বিফলে গেল তখন জোরপূর্বক তাদের সন্তানদের ছিনিয়ে নেয়া হল আলাদা জায়গায় - অনেক ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গ পরিবারে। পশ্চিমা কায়দায় ছোটকাল থেকে তাদের মানুষ করানোর চেষ্টা করানো হল (এরা স্টোলেন জেনারেশন নামে পরিচিত) ।

১৯৫০ এর দশক থেকে চেষ্টা করা হল আদিবাসীদের উপর একত্রীকরণ (এসিমিলেশন) ধারনা আরোপ করতে - যার মূল বিষয় ছিল আদিবাসীরা অন্যান্য সব অস্ট্রেলীয় বাসির মতই সভ্যভাবে কাজ করবে ও বসবাস করবে - একই ধরনের আইন ও সুযোগ সুবিধা পাবে।

আদিবাসীরা বলে অস্ট্রেলিয়ানদের সংস্কৃতি এসেছে ইংল্যান্ড থেকে - তারা ইংরেজি গানের সাথে নাচতে পারে। কিন্তু আমরা গাই আমাদের ভাষার গান। আমরা তার সাথে নাচি - ইংরেজি গানের সাথে কখনোই নয়। ওরা ছাদ ওয়ালা - চার দেয়ালে ঘেরা বাসায় না থেকে রাস্তায়, পার্কে আকাশের নীচে থাকতে পছন্দ করে পূর্বপুরুষের মত- ওখানে বসে বন্ধু, প্রতিবেশীর সাথে দেখা করে, কথা বলে। এটাই ওদের জীবনযাত্রার অংশ।

আবার তাদের জন্যে সরকার থেকে বানানো অনেক ক্যাম্প টিন শেডের - সেখানে এয়ার কন্ডিশন নেই - তাই তারা বাইরে থাকতে পছন্দ করে। তারা তাদের আদি পেশা শিকার করা বা মাছ ধরায় আর ব্যস্ত থাকে না। কারণ সরকার তাদের ভাতা দেয়। বসে বসে টাকা পেলে কষ্ট করবে কেন? আর তাদের নতুন কাজ শেখানোও তো হয় নি।


আদিবাসী চিত্র

তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগঃ তারা অর্থকে বোঝে না - সরকারি পেনসন ঠিকমত খরচ করার মত প্রজ্ঞা তারা দেখায়না। সপ্তাহান্তে বা মাসিক ভাতা একসাথে পেলেই সব খরচ করে ফেলে মদ বা জুয়া খেলায় - আর তাদের শিশুরা অভুক্ত থাকে। এর জন্যে এখন শুরু হয়েছে তাদের সরকারি ভাতার কোয়ারান্টাইন - তাদের সরকারি পেনসনের ৫০% নগদে হবে না - হবে ফুড ভাউচারে। কমিউনিটি স্টোরে খাবার বা অন্নকিছু কেনার জন্যে ব্যয় করতে হবে। পেনসনের টাকা দিয়ে মদ বা তামাক কিনতে পারবে না - কিনলে পুরো পেনসন বন্ধ হয়ে যাবে। তবে আদিবাসীরা মনে করে এটি পুরোই একটি বর্ণবাদি সিদ্ধান্ত - এবং এতে আসল সমস্যার সমাধান হবে না।

আদিবাসীরা অনেকেই ভূমির অধিকার থেকেও বঞ্চিত। লারাকিয়া সম্প্রদায় ৩০ বছর আইনি লড়াই চালিয়েছে ৬০০ বর্গ কিলোমিটারের কক্স পেনিন্সুয়ালায় তাদের ভূমি অধিকার (কেনবি ল্যান্ড ক্লেইম) প্রতিষ্ঠার জন্যে। ভূমি কমিশনার ২০০০ সালে তাদের পক্ষে মতামত দিলেও ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল কোর্ট এই অধিকার নাকচ করে দেয়।

ইউরোপ থেকে লোকেরা অস্ট্রেলিয়ায় বসতি স্থাপনের পর থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত আদিবাসীদের নিয়ে যত নীতি ও আইন হয়েছে সবই করেছে শেতাঙ্গরা - আদিবাসীদের কোন ভূমিকা ছিলনা। এবং এইসব নীতিমালার পেছনে একটিই যুক্তি দেখানো হয়েছে এটি করা হচ্ছে তাদের ভালোর জন্যে - এই ভালোটা শ্বেতাঙ্গদের দৃষ্টিতে ভালো। কিন্তু তাদের ভাবনা বা অনুভূতি কখনোই আমলে নেয়া হয়নি। ফলে আদিবাসীদের অবস্থা কখনোই ভাল হয়নি - তাদের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হলেও তারা সব সময়ই পিছিয়ে থেকেছে।

একই দেশের নাগরিকদের জন্যে যেন দুটো আইন। যেন স্বাধীন দেশে পরাধীন।

২০০৭ সালের জুন মাসে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রি জন হাওয়ার্ড নর্দার্ন টেরিটোরিতে (যেখানে অস্ট্রেলিয়ার এক তৃতীয়াংশ আদিবাসী বাস করে) জরুরি আইন জারী করেন আদিবাসীদের সমাজে শিশু নির্যাতনের খবর বের হবার পরে। তাদের নিয়ন্ত্রণকারী আইন বলবত করা হয় - আদিবাসীদের মদ্যপান ও পর্ণগ্রাফি নিষিদ্ধ করা হয়। বেকার ভাতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় (টাকা দেবার বদলে খাবার বা কাপড় কেনার ভাউচার ইত্যাদি), আদিবাসীদের জমি আরও কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণে আসে। এই নীতির ব্যপারে সরকারি আর বিরোধী দলের অবস্থান একই - রাজনৈতিকভাবেও আদিবাসীদের পক্ষে কেউ নেই।

এই আইন ভঙ্গকারীদের জন্যে রয়েছে উচ্চ ফাইন - এবং অনাদায়ে জেল। নর্দার্ন টেরিটোরিতে দুটি বড় জেলখানা রয়েছে যার ৯০% কয়েদিরাই আদিবাসী। যে পরিমাণ আইন অমান্য হচ্ছে - সামনে আরও দুটি জেলখানা লাগবে।

আদিবাসীদের বক্তব্য সারা অস্ট্রেলিয়া জুড়েই মদ্যপান সমস্যা আছে - আছে শিশু নির্যাতন ও। গুটি কয়েক আদিবাসীর খারাপ কাজের কারণে সমগ্র আদিবাসীদের কেন স্বাধীনতা হরণ? কেন একই আইন অন্যান্য সমাজের শিশু নির্যাতনকারীদের জন্য নয়। অনেকে বলে আদিবাসী শিশু নির্যাতনের মূলে রয়েছে তাদের গাদাগাদি করে থাকা ক্যাম্প - ২০-২৫ জন লোক এক বাসায় থাকে।

ষাটের দশকে প্রথম আদিবাসী ইউনিভারসিটি গ্রাজুয়েট চার্লি পারকিন্স (যাকে অস্ট্রেলিয়ার ম্যান্ডেলা ও বলা হয়) এর নেতৃত্বে একটি দল নিউ সাউথ ওয়েলস এর প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাসে করে যেত এবং আদিবাসীদের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ সম্পর্কে লোককে জানানো শুরু করল। ষাটের দশকেও আদিবাসী শিশুরা সুইমিং পুলে সাতার কাটতে যেতে পারত না - ভাল জামা কাপড় না পরে দোকানে ঢুকতে পারত না - আর তাদের প্রতি বিরক্তিপুরন চাহুনি তো ছিলই।


আদিবাসী ভাস্কর্য

আদিবাসী নেতারা বলেন যে আদিবাসীদের মধ্যে মদ্যপানের প্রবণতা বেড়েছে - আশাহীনতা এবং প্রতিবাদ করতে পাড়ার অক্ষমতার কারণে। তারা মাতাল হয়ে ভুলে থাকতে চায় যে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার তাদের হাতে নেই। তারা ফুল টাইম কাজ পায়না, খুব কম সংখ্যক আদিবাসী শিক্ষার বৈতরণী পার হতে পারে এবং বাসার অবস্থা খুব খারাপ। তথাকথিত সভ্য মানুষের ভিড়ে এইসব আদিবাসীদের অসামাজিক আবর্জনা হিসেবে দেখা হয় যারা ময়লাভাবে থাকে, উন্মুক্ত স্থানে চেঁচামেচি করে, পেশাব করে আর সবার সমস্যা বাড়ায়।

যেসব অস্ট্রেলীয় সিডনি-মেলবোর্ণের মত মেগাসিটিতে থাকেন তারা লং গ্রাসার্সদের কখনো চাক্ষুষ দেখেন না তাই এই সমস্যা সম্পর্কে কোন ধারনা নেই - বা চোখে ঠুলি পরে থাকেন। পুরোপুরি তথাকথিত সভ্য হয়ে যাওয়া বা বিলীন হয়ে যাওয়ার আগে আর কতকাল অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মানুষেরা এরকম কষ্টের মধ্যে থাকবে?


মন্তব্য

নজমুল আলবাব এর ছবি

এসব পড়লে কথিত সভ্যতার প্রতি একটা বিতৃষ্ণা তৈরি হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

ইউরোপ থেকে লোকেরা অস্ট্রেলিয়ায় বসতি স্থাপনের পর থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত আদিবাসীদের নিয়ে যত নীতি ও আইন হয়েছে সবই করেছে শেতাঙ্গরা - আদিবাসীদের কোন ভূমিকা ছিলনা।

ঝা চকচকে পাশ্চাত্য সভ্যতার সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার পেছনে থাকা অন্ধকারও জানার সুযোগ হল লেখাটি পড়ে। অনেক ধন্যবাদ, রেজওয়ান ভাই।
।।।।।।।
অনিত্র

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA