বিবর্তন ১০: অরিজিন বই নিয়ে ব্যক্তিগত খত

সজীব ওসমান এর ছবি
লিখেছেন সজীব ওসমান (তারিখ: বুধ, ২৭/১১/২০১৯ - ১২:৫৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


ছবিসূত্র: শন কারি

ঠিক ১৬০ বছর আগে, ১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর, অর্থাৎ আজকের দুদিন আগে, চার্লস ডারউইনের অন দ্য অরিজিন অফ স্পেসিজ বইটা প্রকাশিত হয় লন্ডনের জন মুরে প্রকাশনা থেকে। এর আগে ডারউইন ওয়ালেসকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বিবর্তন ধারনাটি প্রকাশ ঘটান ব্রিটেনের লিলিয়ান সংঘে যা তাৎক্ষণিকভাবেই আলোচনা আর সমালোচনার মুখোমুখি হয়। আর বহুদিন ধরে চলা চিন্তাভাবনাকে এক করে যখন অরিজিন বইটি প্রকাশ করেন তখন জগৎজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয় বিজ্ঞানী, চিন্তক এবং পাঠকমহলে।

বিবর্তনের ধারণাকে ডারউইন আর ওয়ালেস কেলাসীকৃত করলেও বিবর্তনতত্ত্বের পেছনের চিন্তাগুলি অনেকদিন ধরেই মনীষীরা চর্চা করে এসেছেন। যেমন যিশুর জন্মেরও আগে এক রোমান দার্শনিক ছিলেন, নাম লুক্রেসিয়াস। তার অন দ্য নেচার অফ দ্য ইউনিভার্স বইটার কিছু লেখা পড়লে চমকে ওঠার কথা! সেখানে বিবর্তন আর জীবের টিকে থাকা নিয়ে কিছু চিন্তা বেশ চমকপ্রদ। যেমন ডারউইনের সারভাইভেল অফ দ্য ফিটেস্ট বা যোগ্যতমের বিজয় রেখাপন্থি চিন্তায় তিনি বলছেন দুই হাজার বছর আগে -

এবং অনেকগুলি প্রজাতিই নিশ্চিতভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো এবং পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে আর বংশবৃদ্ধি চালু রাখতে পারেনাই। প্রায় সকল জীবের ক্ষেত্রেই বলা যায় অস্তিত্বের শুরু থেকেই কৃষ্টি অথবা সাহস অথবা গতি জীবকে বেঁচে থাকতে অথবা বিলুপ্ত হতে ভূমিকা রেখেছে।

- অন দ্য নেচার অফ দ্য ইউনিভার্স

প্রকৃতি নিয়ে এমন কিছু পর্যবেক্ষণ অন্যান্য দার্শনিকরাও করেছেন। বিশেষ করে গ্রীক দার্শনিক হেরোডোটাসের কথা বলে চলে। মিথোজীবিতা প্রজাতির টিকে থাকার অন্যতম উপায় বুঝতে পেরেছিলেন আড়াই হাজার বছর আগে (হেরোডোটাসের অনুসন্ধান, দ্বিতীয় খন্ড)। কুমির কিভাবে তার মুখে লেগে থাকা জোঁক থেকে পরিত্রাণ পায় সেই কাহিনী বর্ণনা করেছেন। পানিতে থাকা অবস্থায় কিছু পাখি এবং অন্যান্য জীবেরা জোঁক গুলিকে খেয়ে নেয়। কিন্তু একটু পরে কুমির যখন ডাঙায় ওঠে তখন তার মুখ মেলে ধরে রাখে পানিকাটা (স্যান্ডপাইপার) পাখির জন্য যারা পানিতে খেতে পারেনা। সেই পাখি একদম কুমিরের মুখের ভেতরে ঢুকে জোঁকগুলিকে খেয়ে নেয়। কুমিরে সেই পাখিকে খায়না। এক মিথোজীবি সম্পর্ক গড়ে ওঠে যাতে দুই ভিন্নবর্গের প্রজাতির প্রাণীর বেঁচে থাকাটা সহজ হয়ে ওঠে।

প্রকৃতিতে জীবের বেঁচে থাকার উপায়গুলির যেসব চিন্তা পরবর্তীতে তীক্ষ্ণতর হয়ে তত্ত্ব হিসেবে গড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে একটা হলো মিথোজীবিতা। এমনকি মিথোজীবিতার ফলে নতুন প্রজাতির সৃষ্টিই হয়েছে। আমরা, মানুষেরা মিথোজীবি প্রাণী। আমাদের দেহের একক কোষ হলো একধরনের উন্নত ব্যাকটেরিয়া। যারা অন্যকোষকে খেয়ে উন্নত হয়েছে। এভাবে মাইটোকন্ড্রিয়া/ক্লোরোপ্লাস্ট ইত্যাদি অঙ্গাণু তৈরি হয়েছে আমাদের কোষে। এটা জীববৈচিত্রের মিথোজীবি সম্পর্কগুলির আদিমতম উদাহরণগুলির একটি।

যাই হোক, ডারউইন এবং আলফ্রেড ওয়ালেস, এই দুইজন বিজ্ঞানীই প্রথম বিবর্তনের ধারণাকে কেলাসিকৃত করে প্রকাশ করেন এবং বিবর্তনের কারনসমূহ ব্যাখ্যা করেন। দুজনের ধারণার উদ্ভব নিয়ে দুটো কথা বলে নিচ্ছি এখানে।

১৮৩৮ সাল, ইংল্যান্ডে তখন শ্রমবিপ্লব চলছে। কিন্তু, এই বিপ্লব শুধু মালিক শ্রেণিকেই ধনপতি করেছে, শ্রমিকদের নয়। ক্রম ঘণবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে সাধারন মানুষ নিত্যদিনকার বেঁচে থাকা নিয়ে সংগ্রাম করছে। কিছু কিছু দরিদ্র মানুষ দাঙ্গার চেষ্টা করছে। দরিদ্রসেবার আইনকে (দ্য পুওর ল'জ) দমন করা হয়েছে যেখানে শহরগুলি বলা শুরু করেছে - পরহিতৈষণা শুধুমাত্র দরিদ্রের উপর নির্ভরশীলদের সংখ্যাই বাড়াবে এবং তাদের প্রজনন হার বৃদ্ধি করে ক্ষুধার্থ মুখে সংখ্যা বাড়ানো বৈ কমাবে না। এ ছিলো সেইসব গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সন্ধিক্ষণ যখন ডারউইন তার প্রথম বিগলভ্রমন শেষ করে ফিরেছেন এবং প্রজাতির উদ্ভবের কারনগুলি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। এসময় তিনি থমাস ম্যালথাস নামক এক পাদ্রী এবং সামাজিক অর্থনীতিবিদের বই পড়া শুরু করেছেন।

ইউটোপিয় চিন্তকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ম্যালথাস বিশ্বাস করতেন যে মানুষ যদি জন্মনিরোধ প্রক্রিয়া অবলম্বন শুরু না করে তবে অবশ্যম্ভাবীভাবেই তারা খাদ্যসংকট এবং অতিজনসংখ্যার একটা নিম্নগামি চক্রের এক অশেষ সংগ্রামে লিপ্ত হবে। এই নির্দয় যুদ্ধে কেউ কেউ হয়তো টিকে থাকবেন, কিন্তু বেশিরভাগই থাকতে পারবেন না। দূর্ভিক্ষ, রোগবালাই এবং যুদ্ধ - এগুলো হবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিপূরক কারন।

এইসব ধারনাই প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য যে সংগ্রাম তা নিয়ে ডারউইনের ধারনাগুলিকে একত্রিত করেছে। ম্যালথাসকে পড়ার আগে ডারউইন ধারনা করতেন যে জীবেরা ঠিক ততটুকুই জন্মদান করে যতটুকু একটা জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রিত বা স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পারলেন যে মানুষের সমাজের মতোই প্রকৃতিতেও জীবেরা তাদের জনসংখ্যার হিসেবে অনেকগুণ বেশি জন্মদান করে এবং তাদেরকে বিজয়ী এবং হেরো এই দুইদলের একটা টিকে থাকার সংগ্রামে ফেলে দেয়।

প্রায় সাথে সাথেই ডারউইন দেখতে পেলেন যে প্রকৃতিতে জীবের যে বিভিন্নতা তিনি দেখেছেন তা আসলে জীবকে কিছু নির্দিষ্ট কাজে অল্প একটু বেশি সুবিধা দেয় কোন নির্দিষ্ট সময়ে। যারা সুবিধা পাচ্ছে তারা সাধারণতঃ বেশি সন্তান উৎপাদন করছে, তারপর কয়েক প্রজন্ম পরে তাদের এই বৈশিষ্ট্যধারী বংশই তাদের জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে দেখা দিচ্ছে। ডারউইন লিখছেন -

এই ফলাফল হতে পারে, নতুন প্রজাতির উদ্ভব! এখানে তাহলে আমি একটা তত্ত্ব পাচ্ছি যার উপর কাজ করা চলে।

এই তত্ত্বই আসলে প্রাকৃতিক নির্বাচন, বিবর্তনের বল! যদিও বিশেষজ্ঞগণ ডারউইনের চিন্তার উপর ম্যালথাসের প্রভাব নিয়ে বির্তক করেন, তবুও এবিষয়ে কোন সন্দেহই নেই যে সামাজিক সংগ্রামের ধারনা আসলে ডারউইনকে প্রকৃতির সংগ্রামের ব্যাপারে ভাবিয়েছে। একজায়গায় ডারউইন যা লিখছেন তার সংক্ষেপ করা চলে এমন -

নিউটনের কাছে আপেলটা যেমন, আমার কাছে ম্যালথাসকে পড়া তেমন!

বীগল ফিরে আসে ১৮৩৬ সালের ২ অক্টোবর। ডারউইন তার প্রথম ছোট্ট নোট লিখেন ১৮৩৮ সালে, ৩৫ পৃষ্ঠার একটি অপ্রকাশিত প্রবন্ধ লিখেন ১৮৪২ এ এবং ২৪০ পৃষ্ঠার এক অপ্রকাশিত প্রবন্ধ লিখেন ১৮৪৪ সালে। ১৮৪৪ সালের প্রবন্ধটিতে তিনি তখনও বিবর্তন এবং তাঁর খৃষ্টীয় বিশ্বাসের টানাপোড়েনে দোদুল্যামান ছিলেন -

It accords with what we know of the laws impressed by the creator on the matter that the production and extinction of forms should, like the birth and death of the individuals, be the result of the secondary means. It is derogatory that the Creator of countless Universe should have made His will of myriads of creeping parasites and worms, which since the earliest dawn of life have swarmed over the land and in the depths of the ocean.

অরিজিন বইয়ের মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রকাশের আগে, এমনকি লিনিয়ান সোসাইটি তে প্রদর্শনেরও আগে ডারউইন তার প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব নিয়ে আসলে প্রায় ২০ বছর ধরে কাজ করেছেন। তার ইচ্ছা ছিল ধীরে সুস্থে কোন এক ভবিষ্যৎ দিনে কয়েকটা বিরাট ভল্যুমে তাঁর বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে চিন্তার প্রকাশ ঘটাবেন। কিন্তু ১৮৫৮ সালের জুন মাসে তাঁর ঠিকানায় এক পার্শেল আসে। কোন এক অখ্যাত তরুন আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস সম্পূর্ন আলাদাভাবে একেবারে তার মতো চিন্তাভাবনা করেই একটা লেখা পাঠিয়ে দিয়েছে, ডারউইনকে দেখে মন্তব্য জানানোর জন্য। ডারউইন ওয়ালেসকে উৎসাহ দিলেও ভড়কি খেয়েছিলেন কিছুটা। যদিও ওয়ালেস যখন জানতে পারলেন যে ডারউইন এনিয়ে ২০ বছর ধরে কাজ করছেন সেহেতু তিনি জানালেন যে প্রথম কৃতিত্ব ডারউইন নিতে তাঁর কোন সমস্যাই নাই। সিদ্ধান্ত হলো তার একসাতে লিলিয়ান সোসাইটিতে তাদের গবেষণা প্রকাশ করবেন। লিনিয়ান সোসাইটির মিটিংয়ে তাদের নিবন্ধ প্রকাশ হয়, যেখানে ডারউইন বা ওয়ালেস কেউই উপস্থিত ছিলেন না। ওয়ালেস বিদেশ, আর ডারউইন? তার শিশু ছেলের মৃত্যুর শেষকৃত্য সম্পন্ন করছিলেন!

তাৎক্ষণিকভাবেই জীবের বিবর্তনের ধারণা বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এর পক্ষে এবং বিপক্ষে বেশ বড়সড় দুদলে বিভক্ত হয়ে যান বিশেষজ্ঞরাই। তবে জীবের ইতিহাসকে নতুন করে দেখার এই আয়না এবং প্রতিচ্ছবির ব্যাখ্যা আসলে জীববিজ্ঞানীদের সাহায্যই করেছিলো। যেমন এইখানে একটা ছোট কাহিনী। আলফ্রেড নিউটন নামক এক প্রকৃতিবিদ, প্রাণীবিদ এবং গবেষক কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যার প্রথম অধ্যাপক ছিলেন। গ্রেট অক নামক এক অধুনা বিলুপ্ত পাখি খুঁজছিলেন তিনি আইসল্যান্ডের দ্বীপে। জীব কেন বিলুপ্ত হয় এবং এর উদ্ভব কিভাবে হয় এসব তাঁর চিন্তাভাবনার ক্ষেত্র ছিল।

প্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিউটন প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে লেখাদুটি সারারাত জেগে গলাধঃকরণ করেন। উত্তর খুঁজতে থাকা নিউটনের কাছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণা এসেছিল প্রায় ওহীর মত! তাঁর ভাষায় -

It came to me like direct revelation of a higher power, and I awoke next morning with the consciousness that there was an end of all the mystery in the simple phrase, "Natural Selection."

ইউরোপের বিজ্ঞান মহলে ডারউইনের ধারনা প্রতিষ্ঠা পেতে বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, হয়তো জানেনই। তাদের ব্যঙ্গ করে বেশ কয়েকটা ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করেছে। জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং সাধারন মানুষ মানুষেরও যে অন্যান্য জীবের মতো প্রাকৃতিক ইতিহাস থাকতে পারে সেটা গ্রহণ করতে সমস্যা হয়েছে। আমি সেসব নিয়ে আজকে বেশি লিখছিনা। বরং আমেরকিায় অরিজিন বইটা কেমনভাবে গৃহীত হয়েছিলো তাই নিয়ে দুটো কথা বলে রাখি।

প্রকাশ হওয়ার একই বছরে অরিজিন বইটার একটা নমুনা আমেরিকায় এসে পৌঁছায়। ডারউইনের নিজের হাতের, কালির গন্ধ আছে বইটাতে। সবুজ মলাটের এই বইটা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকাতে আবিভূর্ত হওয়া প্রথম নমুনা, ১৮৫৯ সালেই। বন্ধু উদ্ভিদতাত্ত্বিক আসা গ্রেকে পাঠিয়েছিলেন বিলেত থেকে। আসা গ্রে হার্ভার্ডে পড়াতেন, এখনও হার্ভার্ডের গ্রন্থাগারেই বই রয়ে গিয়েছে। আসা গ্রে সেই অরিজিন এক সপ্তাহেই আদ্যোপান্ত শুধু পড়েনইনি, দাগিয়ে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিলেন। মানে মন্তব্য করেছেন, নোট করেছেন পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়। পৃথিবীতে প্রথম অরিজিন বইটা পড়া আমেরিকান কে সেটা তাই সহজেই বলা চলে। প্রথম বাঙালি কে কে জানে!

কোনরকম অনুলিপি আমেরিকার বাজারে আসার আগেই সেই বই যায় কিছু প্রথিতযশা মানুষের কাছে। আসা গ্রের বউয়ের চাচাতো/মামাতো/খালাতো ভাই সমাজকর্মী চার্লস লোরিং ব্রেইস আসা গ্রের কাছ থেকে বইটা ধার নেন এবং খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েন। বেইসের সমাজবিজ্ঞান ধারণার সবটুকু পাল্টে দিয়েছিলো এই বই। ১৮৫৯ সালের ক্রিসমাস দিনে বইটা পেয়েই ১৮৬০ সালের বছরের প্রথম দিনের একটা রাতের খাবারের উৎসবে সেই বই ব্রেইস দেখান আরও তিনজন প্রথিতযশা আমেরিকানকে। সমাজ পরিবর্তনের যোদ্ধা সানর্বন, দার্শনিক এলকট এবং লেখক ও প্রকৃতিবিদ থুরো! সবাই নিজের নিজের ক্ষেত্রে অরিজিন বইটা দিয়ে প্রভাবিত হন। এদের মাধ্যমেই বিবর্তনের ধারণা আমেরিকার সমাজে প্রথম প্রবেশ করে এবং আমেরিকার সমাজ এবং বিজ্ঞান চীরদিনের জন্য পাল্টে যায়।

আসা গ্রে জীবজগৎকে দেখার এই অভিনব নতুন তত্ত্ব সম্বন্ধে ডারউইনের কাছ থেকে আগে থেকেই জানতেন, তাদের মধ্যে এ নিয়ে চিঠি চালাচালি চলে সেই ১৮৫৬ সাল থেকেই। আসা গ্রে বিবর্তনের ধারণাতে প্রভাবিত হয়ে আমেরিকায় বিবর্তন পক্ষে কথা বলা একজন শক্ত কন্ঠ ছিলেন। ১৮৫৮ থেকে ১৮৬০ পর্যন্ত বিবর্তন নিয়ে আমেরিকান একাডেমি অফ সায়েন্স এন্ড আর্টস এর বেশ কিছু বির্তক চলে। তখন আমেরিকার সাংস্কৃতিক এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিলো বস্টন শহর। বিভিন্ন সামাজিক/রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব এসেছে এখান থেকে। বুদ্ধিজীবিদের বাস ছিলো এখানে, যাদের বেশিরভাগই হার্ভার্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। ঠিক সেই সময় আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র খোলার চেষ্টা করছেন আরেকজন ভদ্রলোক, উইলিয়াম বার্টন রজার্স। ভার্জিনিয়া থেকে তিনি বস্টনে চলে আসলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজিকেন্দ্রিক একটা বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে। ম্যাসাচুসে্টস এর সরকারের কাছ থেকে চালর্স নদীর পাড়ে জমি এবং পয়সা পান কিছু। ১৮৬১ সালে যাত্রা শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির, আমরেকির গৃহযুদ্ধের পরে ১৮৬৫ সাল থেকে কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন পৃথিবীর অন্যতম প্রথমসারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংক্ষেপে একে এমআইটি নামে চেনেন আপনারা।

যাই হোক, এই উইলিয়াম বার্টন রজার্স ছিলেন আমেরিকান একাডেমি অফ সায়েন্স এন্ড আর্টস এর বিতর্কগুলিতে বিবর্তনের পক্ষে কলম ধরা অন্যতম ব্যক্তি। আসা গ্রের সাথে মিলে তিনি যুদ্ধ করে গিয়েছেন এই তত্ত্বের পক্ষে। রজার্স তার ভাই হেনরি এবং বিবর্তন তত্ত্বের অন্যতম প্রচারক থমাস হাক্সলীর সাথে অনেকগুলি চিঠি চালাচালি করেছেন এই সময়ে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক জীববিজ্ঞানী লুই আগাসিজের সাথে তার ব্যাপক একাডেমিক দ্বন্দ ঘটে বিবর্তনতত্ত্ব নিয়ে। আগাসিজ বেশ বিতর্কিত মানুষই ছিলেন, বৈজ্ঞানিক বর্ণবাদের পক্ষে থাকতেন। সেজন্য সেই দ্বন্দগুলি নিয়ে এখন আর ততটা মাথা ঘামায়না লোকে। বিশেষ করে এখন, কারন পরের একশ বছরে বিবর্তন তত্ত্বের পেছনে এতোসব প্রমাণ পাওয়ার কারনে বিবর্তনকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে গৃহীত ধরে নেয়া হয়েছে বলে।

উইলিয়াম বার্টন রজার্স ১৮৭০ সাল পর্যন্ত এমআইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন, কী অদ্ভুত একটা প্রতিষ্ঠান যে তৈরি করে গিয়েছেন। যাই হোক, আসা গ্রের কাছ থেকে যখন ১৮৫৯ সালে ক্রিসমাসের দিনে অরিজিন বইটা ধার করতে আসেন তরুন সমাজকর্মী ব্রেইস তখন তিনি তাকে কিছুটা সাবধান করে দিয়েছিলেন। কারন আগেই তিনি ব্রেইসকে

একটা চিঠিতে বলছিলেন -

When you unscientific people take up a scientific principle you are apt to make too much of it, to push it to conclusions beyond what is warranted by the facts.

এখনকার জন্যও বেশ চমৎকার মন্তব্য। বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন বোঝাই যায়। বিবর্তনকে সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে গিয়ে যেইসব ঝামেলাগুলি হতে পারে তার প্রতি ইঙ্গিত দেয়া চলে, বিশেষ করে হিটলারের ইউজেনিক্স বা সৌজাত্যবাদ কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনাগুলি।। তবে সামাজিক ক্ষেত্রে একে ব্যবহারের একটা ভালো সময় তখন ছিলো, বিশেষ করে গৃহযুদ্ধের সময়। বর্ণবাদের কারনে কৃষ্ঞাঙ্গদের নিচু জাত মনে করার যেই প্রবণতা তাকে প্রচন্ডভাবে আঘাত করে এই ধারণা যে - আমরা সবাই একে অপরের সাথে জীববৈজ্ঞানিকভাবে যুক্ত, একই সূত্র সকল মানবজাতির।

অরিজিন বইটা নিয়ে একটা মজার তথ্য দিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি।

পৃথিবীর সবচেয়ে দামী বইগুলার একটা হইলো চার্লস ডারউইনের লেখা অরিজিন বইয়ের প্রথম সংস্করণগুলি। লাখ ডলারের উপরে বিক্রি হওয়ার কয়েকটা উদাহরণ আছে। তাতে যদি বিশেষ করে ডারউইনের সাক্ষর থাকে তবে তো কথাই নাই। ১৮৫৯ সালে লন্ডনের জন মুরে প্রকাশনা সংস্থা থেকে ১২৫০ টি মুদ্রিত হয়েছিলো যা হটকেকের মতো বিক্রি হয়ে যায়।

জানাশোন না থাকলে কোন জিনিসের মূল্য বোঝাটা বেশ কষ্টকরই। যেমন, অরিজিন বইটার একটা কাহিনী আছে। এই প্রথম সংস্করণের একটা বই নিলামে প্রায় ১ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। তবে সেই বইটা একটা পরিবারের কাছে ছিলো ৪০ বছর ধরে। তারা তাদের গোসলখানায় সাজিয়ে রেখেছিলেন এর মূল্য কী তা না বুঝেই। সবুজ মলাটের বইটি ৪০ বছর আগে তারা একটা পাড়ার দোকান থেকে কিনেছিলেন কয়েক শিলিং দামে মাত্র। ২০০৯ সালে পরিবারটির এক আত্মীয় এক অনুষ্ঠানে এই বইয়ের কী গুরুত্ব সেটা জানার পরে সেই পরিবারকে গিয়ে তা বলেন। পরিবারটি নিলামে তুলে দেন।

ডারউইনের অরিজিন বইটার প্রথম সংস্করণের মলাটটা আমি মুখস্থ করে রেখেছি। যদি কোনদিন পেয়ে যাই কোন পুরানো বইয়ের দোকানে! তবে সেই সম্ভাবনা কমই। কারন, সময়টা যখন তখন নিউ ইংল্যান্ডে, অর্থাৎ এই বোস্টন/ নিউইয়র্কে ইংল্যান্ডের বই সব নকল কপি ছাপা হতো। এটা সবাইকে জানিয়েই হতো। বিরাট বিরাট প্রকাশনা সংস্থা এই নকল কপি তৈরি করে বিক্রি করতো। অরিজিন বইয়ের নকল আসতেও বেশি সময় লাগেনি। তাই, প্রথম প্রকাশের কাছাকাছি সময়ের যেই অরিজিন আমেরিকায় পাওয়া যায় তা আমেরিকার প্রকাশনা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। সেজন্য, প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে জন মুরের নাম মনে রাখাটা জরুরী।


মন্তব্য

রকিবুল ইসলাম কমল এর ছবি

আপনার লেখার হাত দিনদিন অসাধারণ হয়ে যাচ্ছে! এত পরিপক্ক, গোছানো, যথাযথ শব্দের ব্যাবহারে তরতরকরে এগিয়ে যাওয়া গদ্য বহুদিন পর পড়লাম।

তারেক অণু এর ছবি

ডারইউনিজম শব্দর সৃষ্টিকর্তা তো ওয়ালেস নিজেই। তাদের দুইজনের সম্পর্ক নিয়েও লিখতে পারেন, মানুষের মধ্যে খামোখায় অনেক ভুল ধারণা আছে।

হিমু এর ছবি

বইয়ের দোকানের বদলে বুড়ো লোকজনের গোসলখানায় হানা দিলে কাজ হবে মনে হচ্ছে।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।