তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবঃ নিকন কুল্পিক্স এ

মনি শামিম এর ছবি
লিখেছেন মনি শামিম [অতিথি] (তারিখ: সোম, ১১/০১/২০১৬ - ৫:৩১অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

[img]DSC_1938 by Shamimur Rahman, on Flickr[/img]

নিকন কুল্পিক্স এ

২০১৩ সালে নিকনের ঘর আলো করে এল এক ছোট্ট ক্যামেরা। দেখতে ছোট খাটো হলেও এটি ছিল আসলে ব্যাটম্যানের ছোট ভাই রবিন। এর আগে এত ছোট এপিএসসি অথবা ডিএক্স ক্যামেরা পৃথিবী দেখেনি। আদ্যপান্ত এক মিনি ডিএসএলআর যেন। পার্থক্য বলতে ওই এক লেন্সের জায়গাতেই। মানে আর যাই হোক, লেন্স আপনি চাইলেও বদলাতে পারছেন না। তাছাড়া সমস্ত স্পেসিফিকেশন ডি ৭০০০ নামক এক ডাকাবুকো ক্যামেরার মতন। তো আপনি আস্ত একখান ডি ৭০০০ কোট অথবা জ্যাকেট পকেটে নিয়ে দিব্যি ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছেন আর যেই না হাত নিশপিশ শুরু হল, কাউকে বিরক্ত না করে আচমকা দিলেন ক্যামেরার শাটার টিপে আর সেই সাথে বের হল একেবারেই ডিএসএল আর মার্কা টিপটপ ছবি- এমন জিনিষ এই জগতবাসী দেখেছে কি আগে কখনও? দেখেনি বলেই বাজারে আসার আগে নিয়ে চলল ব্যাপক জল্পনা কল্পনা। তবে নিকনের বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দেয়ার কাজ করে দিল নিকন স্বয়ং- এর দাম সকলের নাগালের বাইরে রেখে। আরে ভাই, কে আর ১১০০ ডলার খরচ করে নেহাত এক পয়েন্ট এন্ড শুট কিনতে চাইবে? তার ওপর আবার ফিক্সড ২৮ মিমি লেন্স। আবার অনেকে ভাবলেন ভিউফাইন্ডার ছাড়া আবার ডিএক্স ক্যামেরা হয় নাকি? তাই বাজারে আসার সাথে সাথে মিলল বিস্তর সমালোচনা, ব্যাপক নিন্দে মন্দ, বিস্তে বিস্তে লেখা হল এর দুর্বল ফোকাস সামর্থ্য এবং ক্লোজ ফোকাস দূরত্বের সীমাবদ্ধতার ওপর। ক্যামেরার সীমাহীন সম্ভাবনার কথা ধামাচাপা পড়ে রইল।

চলল না নিকন কুল্পিক্স এ। নবীন এই ক্যামেরা বৃদ্ধে উপনীত হল বছর যেতে না যেতেই। আর মৃত ঘোষিত হল ২০১৪ সালের শেষে এসে। বুড়ো বয়সে এসে এর দাম কমতে কমতে নেমে এলো ৪০০ ডলারে। আর তখনই আমার মতন ওঁত পেতে থাকা সুযোগ সন্ধানী মানুষদের ভিড় জমে গেল এর পেছনে। কিন্তু ততক্ষন মেঘে মেঘে অনেক বেলা চলে গেছে। কুল্পিক্স এ পরিণত হয়েছে নিকনের এক মূর্তিমান বোঝা হিসেবে। এই বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্যই এই ৪০০ ডলারের ব্যাবস্থা। তাছাড়া তখন বাজারে এসে গেছে রিকো-র জিআর। এর খানিক আগেপরেই নিকন হাজির হল তাঁর ১ ইঞ্চি সেন্সর সমৃদ্ধ নিকন ১ এর ভাণ্ডার সমেত। তারপর থেকেই এই ১ নিয়েই পরে রইল তারা, আর যে সামর্থ্য আর সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিল কুল্পিক্স এ, অঙ্কুরেই তাঁর সর্বনাশ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম কুল্পিক্স এ এর ধারা অনুসরণ করে ফিক্সড লেন্সের একটি পকেটে ঢোকানোর মতন ফুল ফ্রেমের ক্যামেরা যদি আসে বাজারে। সেই আশায় এখন পর্যন্ত গুড়ে বালি!

আগেই বলেছি কুল্পিক্স এ হচ্ছে গিয়ে এক জমজমাট ক্যামেরা। বিস্মিত হতে হয় এর সামর্থ্য দেখলে। মানে শুধু সম্ভাবনার জায়গা থেকে বিচার করলে এটি সফল না হবার কোন কারণ ছিলনা। কারণ কি নেই এই ক্যামেরায়। অসাধারণ অটো আইএসও এবং অটো হোয়াইট ব্যালান্স, দু দুটো ফাঙ্কশন বোতাম, পেখমের মতন হালকা সুন্দর গড়ন, ৩ ইঞ্চি এলসিডি, দুটো মোড ডায়াল, শক্ত পোক্ত বোতাম, ফুল মেটাল বডি তাও আবার মেইড ইন জাপান, নিকনের অনুকরণীয় কাস্টম ইন-ক্যামেরা প্রসেসিং, প্রমানিত ১৬ মেগাপিক্সেল সেন্সর, দ্রুততর ফ্ল্যাশ সিঙ্ক (১/২০০০), লেন্সের ধারে যুক্ত মোলায়েম ফোকাস রিং, ফোকাল দূরত্ব নির্দেশক-মানে একটি পকেটে ঢোকানোর মতন বহনযোগ্য ক্যামেরায় যা যা থাকা সম্ভব সব কিছু সুন্দর একটি প্যাকেজের মাধ্যমে গুছিয়ে রাখা হয়েছে যেন ক্যামেরাটির গায়ে। প্রায় নীরব শাটার শব্দ সমৃদ্ধ ক্যামেরার গায়ের যেখানে অটো, ম্যানুয়াল এবং ম্যাক্রো ফোকাস সুইচ আছে তাকে প্রশংসা না করবার মতন প্রাণী এই ধরাধামে আছে বলে মনে হয়না।

যে জায়গায় এই ক্যামেরার আসল শক্তি লুক্কায়িত সেটি হচ্ছে এর লেন্সে। লেন্সটাই হচ্ছে এই ক্যামেরার চ্যাম্পিয়ন অংশ। যে লেন্সের ফোকাল দূরত্ব নিয়ে এত এত সমালোচনা, সেটির যখন সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন এসেছে সেখানে নিকন শতভাগ সফল। নিকনের ২৮ মিমি এফ ২.৮ ডি এক্স লেন্স যেটি নিকন কোন ডিএক্স ক্যামেরার জন্য আজ অব্ধি তৈরি করেনি (জগতজোড়া এত নিকন প্রেমীর কাকুতি মিনতির পরেও), সেটি এই ক্যামেরায় এসে সার্থক রূপে প্রতিভাত হয়েছে। এই লেন্স এতটাই শার্প যে এই ক্যামেরায় আপনি যাই তুলুন না কেন, ছবির গুনমান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও সুযোগ নেই। এন্ড টু এন্ড, প্রতিটি এপারচারে অসাধারণ সব ইমেজ এসে ধরা দেয়, একের পর এক। ভাবতে অবাক লাগে এখনও, কিভাবে এক অতি সাধারণ কিট লেন্স, এফ ৩.৫ দিয়ে নিকন ডি এক্স জগতকে সামাল দেয় বছরের পর বছর। আর আমরা যে একটি ছোট্ট ১৮ মিমি এফ ১.৮ এর জন্য হা পিত্যেশ করি ফি বছর তাঁদের কিভাবে দুরে সরিয়ে রাখে। সংক্ষেপে বলা যায় এই ক্যামেরা আসলে একটি ২৮ মিমি লেন্স যাকে চালানোর জন্য নিকন একটি বডি বানিয়েছে।

তবে হ্যাঁ, যত্ন নিতে হবে এই ক্যামেরার প্রতি। মাত্র তিন সপ্তাহ ব্যাবহার করতেই দেখলাম কিছু হালকার ওপর ঝাপসা ধরনের স্ক্র্যাচ পড়েছে ক্যামেরার গায়ে। আর জ্যাকেটের পকেটে সার্বক্ষণিক থাকাতে এলসিডি তে খানিক দাগ লেগেছে। একটি এলসিডি কভার লাগানো উচিত ছিল পয়লা দিন থেকেই। আর ক্যামেরার শাটার কাউন্ট আদতে ডি ৭০০০ মতন হবে কিনা, লেখকের সন্দেহ আছে এবং এ সংক্রান্ত কেউ কোন তথ্য দিলে উপকৃত হব। ২৮ মিমি দিয়ে পোর্ট্রেট তো ভালো তোলা গেলনা। তবে নেচার কিংবা ল্যান্ডস্কেপ কিংবা ট্র্যাভেল, কিংবা দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে ছবি ভালই তোলা গেল দেখলাম। ঠিক এই ধরণের ছবি তোলার ক্ষেত্রে যে এর উপযোগিতা বেশী হবে, তা তো জানা রয়েছে আগে থেকেই। মনে রাখতে হবে, ২৮ মিমি হল মোটামুটি গোছের ওয়াইড, টেলি তোলার ইচ্ছেকে খারিজ করে দিতে হবে পয়লা দিনেই। লাল রঙ দারুণ আসে দেখলাম, আর আরেকটা ব্যাপার দেখলাম যে ইন ক্যমেরায় মনোক্রোমে রূপান্তর করলে ইমেজগুলি বেশ ভালো দেখায়। দিলেও ম্যাক্রো ফোকাসের ক্ষেত্রে বেশ সুন্দর আউট অফ ফোকাস ছবি ধারণ করা সম্ভব। ম্যাক্রো ফোকাসিং জটিল আলোয় ফোকাস খুঁজতে থাকে প্রতিনিয়ত। এর চাইতে বরং ম্যানুয়াল ফোকাসের মাধ্যমে ম্যাক্রো ছবি তোলাটা শ্রেয়তর বলে মনে হল। আর সামাল দিতে হবে আরেকটা বিষয়। এই ক্যামেরার ক্লোজ ফোকাস দূরত্ব হচ্ছে ১.৭ মিটার। কাজে কাজেই বেশি কাছে আবার অটো ফোকাস নেবেনা। সমস্যা নেই, ম্যানুয়াল আছে না? ম্যানুয়ালি ১ মিটার দূরত্ব থেকে তোলা যাবে বটে। আর দুর্বল ফোকাস সামর্থ্য? দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে ছবি, গ্রুপ ফটো এগুলি তুলতে তো একটুও বেগ পেতে হলনা। বরং স্বল্প আলোতেও দিব্যি তুলতে পারলাম। তবে আমার ক্যামেরায় ফেস ডিটেক্ট অটো ফোকাস সবসময় নিখুঁত থাকেনি। সেটি কি আমার না ক্যামেরার ত্রুটি, বুঝতে পারছিনা। আর স্থির ছবির ক্ষেত্রে তো আর সমস্যা নেই, এই ক্যামেরা দিয়ে উড়ন্ত পাখির ছবি তুলতে যাচ্ছেই বা কে, শুনি? আমি এই ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলেছি রাজশাহী, আরিচা ঘাট, শিবালয়, নয়ারহাট, বিক্রমপুর এবং আরও অনেক ছোট ছোট গ্রামে গঞ্জে। সামনে আরও অনেক জায়গায় যাওয়াও হবে নিশ্চয়ই।

যে ক্যামেরায় ছবি তোলা এত সহজ, যার গুন মান এমন অনন্য তাঁকে কি আর হৃদ মাঝারে না রেখে যেতে দেয়া যাবে? সম্ভব?

ক।

[img]CSC_0307 by Shamimur Rahman, on Flickr[/img]

খ।

CSC_0276 by Shamimur Rahman, on Flickr

গ।

CSC_0274 by Shamimur Rahman, on Flickr

ঘ।

CSC_0277 by Shamimur Rahman, on Flickr

ঙ।

CSC_0303 by Shamimur Rahman, on Flickr

চ।

CSC_0384 by Shamimur Rahman, on Flickr

ছ।

CSC_0387 by Shamimur Rahman, on Flickr

জ।

CSC_0392 by Shamimur Rahman, on Flickr

ঝ।

CSC_0418 by Shamimur Rahman, on Flickr

ঞ।

CSC_0418 by Shamimur Rahman, on Flickr

ট।

CSC_0461 by Shamimur Rahman, on Flickr

ঠ।

CSC_0456 by Shamimur Rahman, on Flickr

ড।

CSC_0275 by Shamimur Rahman, on Flickr

ঢ।

DSC_2629 by Shamimur Rahman, on Flickr

ণ।

DSC_0087 by Shamimur Rahman, on Flickr

ত।

DSC_0236 by Shamimur Rahman, on Flickr

থ।

DSC_0264 by Shamimur Rahman, on Flickr

দ।

DSC_0394 by Shamimur Rahman, on Flickr

ধ।

DSC_0478 by Shamimur Rahman, on Flickr

ন।

DSC_0381 by Shamimur Rahman, on Flickr

প।

DSC_2635 by Shamimur Rahman, on Flickr

ফ।

DSC_1944 by Shamimur Rahman, on Flickr

ব।

DSC_1947 by Shamimur Rahman, on Flickr

ভ।

DSC_2640 by Shamimur Rahman, on Flickr

ম।

CSC_0388 by Shamimur Rahman, on Flickr

- মনি শামিম


মন্তব্য

তারেক অণু এর ছবি
মেঘলা মানুষ এর ছবি

আপনার রিভিউ লেখার পদ্ধতিটা চমৎকার লেগেছে। শুরুতে এত দামে না ছাড়লে হয়ত এটা ভালো মার্কেট পেত। জে ১ সিরিজও খানিকটা আধা সেদ্ধ ছিল শুরুতে। পরে অবশ্য অনেকের কাছে মোটামুটি ভালো কদর পেয়েছে।

আর, পোস্টের সাথের ছবিগুলোর কথা নাই বা বললাম খাইছে

শুভেচ্ছা হাসি

এক লহমা এর ছবি

চলুক

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সজীব ওসমান এর ছবি

চলুক

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

বাহ! চমৎকার!!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।