স্বজনসকাশে নবনীতা

মনি শামিম এর ছবি
লিখেছেন মনি শামিম [অতিথি] (তারিখ: শুক্র, ০৯/১০/২০১৫ - ৯:১৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

DSC_1821 by Shamimur Rahman, on Flickr

হলফ করে বলতে পারি, নবনীতা দেব সেনের কোনও লেখাই আমি পড়িনি আর তাঁর সম্পর্কে কীই বা জানতাম? প্রচণ্ড বিদুষী, , যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামুলক সাহিত্য বিভাগে পড়েছেন, পড়িয়েছেন, কবিতা লেখেন, উপন্যাস লেখেন, অমর্ত্য সেনের প্রথম স্ত্রী-এটুকুই।তাঁর লেখন জগতের বাসিন্দা কস্মিনকালেও নই। নাম শুনেছি, ধামের আশপাশ দিয়েও যায়নি এই বেচারি। তবে শুনেছি তার 'ভালোবাসার বারান্দা'-র কথা। আমার সংগ্রহে নবনীতার কোনও বই নেই। তো সেই বই কিনতেই 'তক্ষশিলা'-য় যাওয়া। পেয়েছিলাম বটে ভালোবাসার বারান্দা, মলাট ছেঁড়া বইটিতে ভালোবাসার নিদারুণ অভাব দেখে কিনলাম স্বজনসকাশে!

বর্ষণসিক্ত দিনটিতে বই আমি আরও কিনেছি। অমর্ত্যর ’তর্কপ্রিয় ভারতীয়’, তপন রায়চৌধুরীর ভিমরতী...., রফিক আজাদের ’কোনও খেদ নেই।’ শাহবাগ থেকে ফেরার সময় বাসে বসে বইগুলি নাড়াচাড়া করছিলাম। তবে চোখ যাচ্ছিল বারবার ওই স্বজনসকাশের দিকেই। তার জন্য বইটির চমৎকার প্রোডাকশনকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। বাসের ভেতরেও ওই ঘর্মাক্ত চাপাচাপির মধ্যেই শুরু করলাম একে অনেকে-সত্যজিৎ রায়- পৃষ্ঠা ৪৮- ৫১।

"মজা হয়েছিল আমার বাবার এক-শো বছরের জন্মদিনে, যখন সত্যজিৎ নত হয়ে আমার মাকে নমষ্কার জানালেন। মায়ের বয়স তখন পঁচাশি, দুই চোখে ছানি পড়ছে। মা বললেন, ’এই ছেলেটি কে খুকু? চিনতে পারলুম না তো?’ ১৯৮৮ তে কলকাতা শহরে সত্যজিৎ রায়কে কেউ 'এই ছেলেটি' বলে উল্লেখ করবে এবং মোটে চিনতেই পারবে না, এই দুটি ঘটনাই প্রায় অবিশ্বাস্য। আমি তো লজ্জায় মরে যাচ্ছি। নামটা বলতেই মা একগাল হেসে সত্যজিতের হাতদুটি সস্নেহে ছোটছেলের মতো করেই নিজের হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ’ওহো অমুকদির ছেলে? তোমার মা অতি মহৎ মানুষ ছিলেন, তাঁর মতো গুণী, আর সাহসী মহিলা খুব কমই দেখেছি। জানো আমরা ছেলেবেলায় তাঁর কাছে এমব্রয়ডারি শিখতে যেতুম।’ তারপরে, হঠাৎই বোধ হয় বর্তমান ব্যক্তিটির আরেকটি পরিচয় মনে পড়ে গেল মা-র তখন- আর, তুমি তো বাবা আমাদেও দেশের গৌরব’-ইত্যাদি। সেই মুহূর্তে, যখন তরুণ সত্যজিৎ সযত্নে কান পেতে হেঁট হয়ে আমার শুভ্রকেশী মায়ের মুখে, নিজের পরলোকগতা মায়ের অল্প বয়সের গল্প শুনছিলেন, তখন তাঁর চোখ-মুখের নরম ভাবটিতে তাঁকে সত্যিই মনে হচ্ছিল যেন, ছেলেটি। আজকে মা নেই। থাকলে দেখতেন, সেই ছেলেটিরও সত্তর হল"-একে অনেকে/সত্যজিত রায়/ পৃষ্ঠা ৫১।

বাসায় ফেরার আগেই দেখি সত্যজিৎ, সুনীল আর অমর্ত্য-দের নিয়ে লেখা ৬টি সুখপাঠ্য প্রবন্ধ এক নিমেষে শেষ!

আচ্ছা কেমন হত, যদি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বাড়ির বাগানটিতে আমাদেরও শৈশবের কথামালা লিপিবদ্ধ থাকত? কিংবা আমােদরই কারোর বিয়ের অনুষ্ঠানে ভেঙ্গে ফেলা হত জ্যোতি বসুর বাড়ির দেয়াল, অতিথিদের বসার সুবন্দোবস্ত করবার জন্য!

কেমন হত যদি বুদ্ধদেব বসু স্বয়ং হতেন আমার অভিভাবক-পড়শী-শিক্ষক আর তাঁর কন্যাদ্বয় হতেন আমার আজীবনের স্বজন? কিংবা সুচিত্রা মিত্রকে আামিও ডাকতে পারতাম 'গজুদি' বলে? কিংবা লীলা মজুমদার, প্রতিভা বসু আমােদরও মাসীমা হতেন?

কেমন হত যদি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আমার বন্ধু এবং সহপাঠি হতেন, তাঁর নানান আব্দার যেমন চম্পাহাটি গ্রাম প্রকল্পে কিংবা আস্ত একখান উড়োজাহাজ কেনার অংশীদার হবার অনুরোধ শুনতে?

কেমন হত যদি নিত্যই দেখা মিলত তপন রায়চৌধুরীর 'কীর্তিপাশার জমিদারি মেজাজখানা', নিয়ম করে যাওয়া হত 'স্বাতী-সুনীলের বাড়ির আড্ডায়', শক্তির সাথে অবিস্মরণীয় কিছু মুহূর্ত কাটাতে?

কেমন হত, কোন এক ঘোর লাগা সন্ধ্যায় টেমস নদীর ধাওর অমর্ত্যর বিবাহপ্রস্তাব কিংবা 'কফি খাবেন?' কেমন হত প্রতি রোববার সন্তানবয়সী রিঙ্কু (রীতুপর্ণ)র সাথে হাত ধরাধরি কওর চায়ের কাপ নিয়ে আড্ডায় বসতে! কিংবা ’নায়ক’ রবিশংকরের সাথে তাঁর স্ত্রী সুকন্যার হাতে তৈরী ফাটাফাটি রান্না খেতে?

নিয়তি বলে দিয়েছে, এগুলো আর হবার নয়। ওই সময়, ওই মুহর্তগুলি আর ফিরবার নয়। তবে যাঁর জীবনে এগুলি ঘটেছে, আমাদের নবনীতা, এত অকপটে আর তার চাইতেও অধিক আন্তরিকতার সাথে কথাগুলি এমনভাবে বললেন, আমি যেন বিহ্বল হয়ে তন্ময় হয়ে তা কেবল শুনেই গেলাম, শুনেই গেলাম!

নবনীতাকে আত্মজীবনী লিখতে বলা হয়েছিল, যেহেতু তাঁর 'সৌভাগ্য হয়েছে অনেক প্রনম্য মানুষের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের।' তবে স্বজনসকাশে অবশ্যই আত্মজীবনী নয়। ৪৬ টি গদ্য। মোটের ওপর সবগুলিই ব্যক্তিবিশেষ নিয়ে স্মৃতিচারণ। স্বজনসকাশেতে ঘটেছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রচনার সন্নিবেশ। একদম নির্ভার হয়ে, মুক্ত হয়ে, ঝরঝরে ভাষায় রচনাগুলি লিখেছেন নবনীতা। এমন আটপৌরে ভাষায়, এমন কাব্যিক গদ্যে লেখা রচনাগুলি পড়ে মনে হয় যেন আশীর্বাদ ধেয়ে আসছে আমারই দিকে! এর একটি কারণ হয়ত স্মৃতিচারণকৃত মানুষগুলির কর্ম, অর্জন, ধরণ এবং তাঁদের প্রকৃতি। মনে হয়েছে লেখা পড়ে, নবনীতা যেন আশৈশব আশীর্বাদ কুড়িয়েছেন সদ্য ফোটা ফুলের মতন, অদ্যাবধি স্নেহ বিলিয়েছেন দু’চোখ ভরে। এইজন্যই মনে হল তাঁর লেখাগুলি কৃত্রিম নয় খাঁটি, তেতো নয় স্বাদু। এমনকি অমর্ত্য নিয়েও লিখছেন যখন, কোথাও তিক্ততার চিহ্নটুকু নেই। সেটা কি শুধু বয়সের সৌন্দর্য্য অথবা ক্ষমাসুন্দরতা নাকি সারাজীবনের চর্চিত উদারমনষ্কতা?

ঈর্ষণীয় এক জীবনের অধিকারিনী নবনীতা। জন্মেছেন ’ভালো-বাসা’ য়। মা কবি রাধারাণী দেবী বাল্যে বিধবা, পরে সধবা। বাবা নরেন্দ্র দেব 'রোমান্টিক কবি মানুষ, আর এক রহস্যময়ী কবি অপরাজিতা দেবীর (রাধারাণী হয়েছেন বিয়ের পরে) প্রেমে পড়ে বিধবা বিবাহ করে, পুরনো বনেদি বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে সংসার পেতেছিলেন। মেঘদূত, ওমরখৈয়াম, হাফিজ অনুবাদ করেছেন (এটিই সম্ভবত বাংলাতে প্রথম হাফিজের অনুবাদ)।' এহেন বাবা মার একমাত্র সন্তান নবনীতা। পড়শী হিসেবে বেড়ে উঠেছেন বুদ্ধদেব বসুর ২০২, কবিতা-ভবন, যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ইলাবাস, সুনিতীকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সুধর্মা-য়। জ্যেতি বসুর বাড়িও তাঁদের পাড়াতেই। উনাদের আত্মীয় স্বজনরাই নবনীতার সারা জীবনের সখা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামুলক সাহিত্য বিভাগে পড়েছেন প্রথম যখন তা খোলা হয়। সহপাঠি হিসেবে পেয়েছিলেন ৫জন তরুণ তুর্কিকে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রনবেন্দু দাশগুপ্ত, মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, অমিয় দেব, তরুণ ঘোষ। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুকুমারী ভট্টাচার্য-দের। বাবা-মার কবিতার রক্ত তাঁর ধমনীতে। তাই বন্ধু হিসেবে পেয়েছেন শক্তি, সুনীল, শঙ্খ, অলোকরঞ্জন, প্রনবেন্দু, সমরেন্দ্র, বিনয়, পর্ণেন্দুদের। লন্ডনে থাকার সত্রে সঙ্গ মিলেছে নীরদচন্দ্র চৌধুরী, রবিশংকর, কেতকী কুশারী ডাইসনের। অমর্ত্যর সাথে দাম্পত্য জীবনে পেয়েছেন সুখময় চক্রবর্তী, আনিসুর রহমান, অশোক মিত্র- এমন আরও অনেককে। পুরো বইজুড়ে এদের উপস্থিতি কখনও রচনার বিষয় হিসেবে আবার কখনও বিক্ষিতভাবে, হঠাৎ!

স্বজনদের নিয়ে লিখতে গিয়ে নিজেও কি উদ্ভাসিত হননি নবনীতা? মায়ের আঁচলধরা মেয়ে তিনি, বাবার অমনযোগ সইতে পারতেননা। শৈশবে ডাকাবুকো নেহাৎ কম ছিলেননা। ’ইলাবাস’ এর মেয়েরা ভদ্রসভ্য হলেও নবনী তো ’ভালো-বাসা’ প্রাপ্ত। তাই ইলাবাসের ফলন্ত জামরুল গাছ কিংবা পাড়ার একটি খেজুড় গাছের ডাল বেয়ে ওঠানামা করা তার জন্য ছিল নস্যি! পাড়ায় গুজগুজ না করেও তাঁর মাত্র ষোল বছর বয়সে প্রেমে পড়া, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো শুরু করা মাত্রই কখনো দেবদাস স্টাইলে, কখনো অতীব সাবধানে দরজা বন্ধ কওর সিগারেট খাওয়া, বড়ো হয়ে তাঁর একা একা কুম্ভমেলায় যাওয়া, র‌্যাশনট্রাকে হিচ হাইক করে তাওয়াং যাওয়া, তেল কোম্পানির এরোপ্লেনে ফ্রি রাইড (হিচহাইকিং?) নিয়ে উত্তর মেরু ভ্রমন, এইসব পাগলামির গল্প প্রত্যেকবার ঘুরে আসার পরে যখন বলেছেন, ধৈর্য ধরে বসে মন দিয়ে প্রশ্ন করে শুনেছেন সত্যজিৎ, আর হাসতে হাসতে বলেছেন: ’এই মেয়েটাকে আমার হিংসে হয়।’ আবার রৗতুপর্ণ যখন লেখার অনুরোধ নিয়ে হাজির, নবনীতার সরল স্বীকারোক্তি, ”ওরে রীতু, আমি পারবো না ভাই, আমি বড়ো উড়নচন্ডি প্রকৃতির মানুষ, ঘড়ি ধরে কোন কিছুই করে উঠতে পারিনা। সব সময়ে- সব ব্যাপারে লেট! এই ভয়ে বাদলবাবুর বন্ধুত্বপর্ণ উপদেশেও এবং সাগরমামার সস্নেহ অনুরোধেও আশির দশকে আমি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখতে সাহস পাইনি ’দেশ’ পত্রিকায়। ’ফেমাস’ হওয়ার অমূল্য সুযোগ হেলায় নষ্ট করে ফেলেছি। আমি চিরকালের লেটলতিফ, ভাই, আমার নিশ্চয়ই প্রত্যেক সপ্তাহে দেরী হয়ে যাবে, ঠিকমতন খেপে খেপে লেখা জমা পড়বে না, সময়মত কাগজ বের করতে মুশকিল হয়ে যাবে, আমি একেবারেই রিলায়েবল নই-”

তা তিনি লেটলতিফ কিংবা আনরিলায়েবল যাই হোন কি না হোন, ভূমিকায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নবনীতার শ্রেষ্ঠ গুনের কথা জানিয়েছেন আমাদের আগেভাগেই, আর তা হল, পরকে আপন করে নেওয়া। ’এই গুন কি সকলের থাকে? পনেরো আনা মানুষেরই থাকে না। নবনীতার কিন্তু আছে। এবং আছে একটু বেশী মাত্রাতেই। যাঁরা তাঁর কাছের মানুষ, তাঁদের নিয়ে যেমন তাঁর ভাবনা-চিন্তর অন্ত নেই। তেমনি যাঁরা তাঁর দুরের মানুষ, এক আধ দিনের খুচরো আলাপচারিতার পরে তাঁরাও তাঁর আত্মজনের বৃত্তের মধ্যে চলে আসেন। তখন আবার তাঁদের নিয়েও শুরু হয়ে যায় নবনীতার ভাবনা-চিন্তা।’

বইখানি পুরোটা পড়লে নীরেন্দ্রর মন্তব্যের সাথে দ্বিমত করার আর কোনও সুযোগ থাকেনা।

”বসন্তের সন্ধে। স্থান শান্তিনিকেতন, আম্রকুঞ্জ। দুজন তরুণী দোল উৎসবের আগের রাত্রে বৈতালিকে হাঁটছেন। সব কুঁড়ি মোর ফুটে ওঠে তোমার হাসির ইশারাতে/ দখিন হাওয়া, দিশাহারা দখিন হাওয়া’ গান গাইতে গাইতে বৈতালিক চলেছে। একজন দীর্ঘকায় যুবক এসে শোভাযাত্রায় মিশলেন, তরুণীরা একজন নবনীতা, অন্যজন শান্তিনিকেতনের মেয়ে, মঞ্জরী দে।

নবনীতা এই যুবকটিকে চেনেন, ইনি শান্তিনিকেতনেরই ছাত্র। কিন্তু এখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতিবিদ, আবার যাদবপুর ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি। নবনীতাও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগীতায় দাপুটে তার্কিক! সেখানে তাঁদেও আলাপ হয়েছে। কিন্তু আজ সন্ধের হঠাৎ দেখা হওয়ার মধ্যে অন্য কিছু ছিল, ছিল পূর্ণ চাঁদের মায়া আর বাসন্তী উৎসবের মাধুর্য। বৈতালিকের পথ চলা শেষ হলে অমর্ত্য নবনীতাকে অনুরোধ করলেন, তাঁর এক বিদেশিনি বন্ধুর বাড়িতে জ্যাজ শুনতে এবং কফি খেতে যেতে। খানিক ইতস্ততঃ করে নবনীতা রাজি। কফির শেষে চাঁদের আলোয় হেঁটে মঞ্জরীর বাড়ি ’চিত্রলেখা’ য় নবনীতাকে পৌছে দিয়ে গেলেন।

পরদিন কলকাতা ফেরার সময় আবার দেখা, আবার। কলকাতায় স্টেশনে নেমে অমর্ত্য নবনীতাকে ট্যাক্সিতে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিলেন। হিন্দুস্তান পার্কে নবনীতাকে নামিয়ে চলে যাবেন, আয়রনসাইড রোডে নিজের বাসস্থানে। সে দিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল ... অন্ধকারে বৃষ্টি পড়েছিল/গাড়ির কাচে নৃত্যপর ছায়া/নদীর হাওয়া হঠাৎ ছঁয়ে দিল/ চিত্তে কাঁপে গোপন অশনায়া .. ( নদীর হাওয়া, নবনীতা দেব সেন- এর শ্রেষ্ঠ কবিতা।)”

কত আন্তরিক, কত সাবলীল এই বর্ণন। পড়া শেষ হলেও মুগ্ধতার রেশ যেন ছড়াতেই থাকে! এই কোমল গদ্যে রোমাঞ্চ যেমন রয়েছে, আবার কোন কোন লেখায় আমরা পেয়েছি বিষাদের ছায়া, হাহাকার। আফসোস করেছেন শ্যামলকে তাঁর যোগ্য সম্মানটুকু দেয়া হয়নি বলে, আর্তনাদ করেছেন মল্লিকা, রীতুপর্ণের মৃত্যতে। শোকের মিছিল বড়ো হয়েছে আরও। স্মৃতিকথায় বেজে উঠেছে করুণ সুর। তারপরেও লেখা খেই হারায়িন কোথাও।

কিছু কিছু জায়গায় নবনীতা কি কার্পণ্য করেছেন? নইলে তপন সিংহকে নিয়ে উনার স্মৃতিচারণ এত সামান্য কেন মনে হল? মল্লিকার জন্যে আরেকটু কি বেশী পরিসর দেয়া যেত না? কিংবা এত বিবণ কের্ন মনে হল সুনীল মাধবকে? কিছু কিছু বাক্য বিন্যাসে সামঞ্জস্যের ঘাটতিও রয়েছে। বানান বিভ্রাট চোখে মিলেছে খানিক। তারপরেও হৃদয়ের উত্তাপ মলিন হয়নি একটুও। ছোটখাট ভুল, তা প্রকাশকের,নবনীতার নিশ্চয়ই নয়।

স্বজনসকাশের লেখিকাকে আমি প্রনাম জানাই। উনি অনেক মানুষ সম্পর্কে জানালেন, শোনালেন। আমরা জানলাম, শুনলাম। কৌতুহল নিঃসন্দেহে মিটেছে। আর আমার লাভ হল, আমি এক অচেনা লেখকের হৃদজগতের বাসিন্দা হবার সুযোগ পেলাম। তার ভালোবাসার বারান্দায় যাবার সুযোগটা আরেকটু উন্মুক্ত হল। আচ্ছা, স্বজনসকাশে-র কি আর খানিক পর্ব আশা করাটা অভদ্রতা হবে?


মন্তব্য

শাব্দিক এর ছবি

"উড়নচন্ডি প্রকৃতির মানুষটার" লেখার প্রতি আগ্রহ জাগছে।
হাতে পেলে বইটা অবশ্যই পড়ব।

---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।

মনি শামিম এর ছবি

ধন্যবাদ শাব্দিক। অনেকদিন পর লিখছি। পড়ুন বইখানি। ভাল থাকুন।

অতিথি লেখক এর ছবি

'যারা তাঁর কাছের মানুষ, তাঁদের নিয়ে যেমন তাঁর ভাবনা-চিন্তর অন্ত নেই। তেমনি যাঁরা তাঁর দুরের মানুষ, এক আধ দিনের খুচরো আলাপচারিতার পরে তাঁরাও তাঁর আত্মজনের বৃত্তের মধ্যে চলে আসেন। তখন আবার তাঁদের নিয়েও শুরু হয়ে যায় নবনীতার ভাবনা-চিন্তা।’

আর এমন একজন ব্যাক্তির হাতে নির্মিত 'স্বজনসকাশে' যে কতটা মূল্যবান এক দলিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেক ধন্যবাদ, শামীম ভাই, এমন একটি বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য। এর আগে আপনি অকল্পনীয় সুন্দর এক ক্যামেরার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সেই ক্যামেরার মত করে এই বইটিও হাতে পেলে জীবনটা আরও অনেক সুন্দর হবে নিশ্চিত।
।।।।।।।।
অনিত্র

মনি শামিম এর ছবি

ধন্যবাদ অনিত্র। আপনার মন্তব্য আগে সচলে দেখিনি তো! বইটি পড়ুন। ভালো লাগুক।'অকল্পনীয় সুন্দর এক ক্যামেরার' নামখানি কি ভাই? আমি তো অনেক ক্যামেরা নিয়েই লিখেছি।

অতিথি লেখক এর ছবি

'অকল্পনীয় সুন্দর এক ক্যামেরার' নামখানি কি ভাই?

যে ক্যামেরা দিয়ে অনেক দূরের ছবি তুললেও ছবির মান এতটুকু নষ্ট হয় না, যে ক্যামেরা দিয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পতঙ্গের ছবিও নির্বিবাদে তোলা যায়, যে ক্যামেরা দিয়ে ঊষালগ্নে এবং কনে দেখা আলোয় সবচেয়ে সুন্দর ছবি তোলা যায়, যে ক্যামেরা ডিএসএলআর না হয়েও এর অনেক গুনকে ধারণ করে, যে ক্যামেরা সহজেই পকেটে ঢুকিয়ে ফেলা যায়, এবং সর্বোপরি, যে ক্যামেরা এক নিতান্তই নির্বোধকেও ভাল ফটোগ্রাফির প্রশংসা এনে দেয়, তেমন এক ক্যামেরার কথাই বলতে চেয়েছি, শামীম ভাই!
।।।।।।।।।।
অনিত্র

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

বইটা পড়ে ফেলতে হবে।

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

মনি শামিম এর ছবি

ধন্যবাদ সত্যানন্দ। পড়ে ফেলুন এক লহমায়!

তাহসিন রেজা এর ছবি

বইটি পড়ার ইচ্ছে রইল।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

মনি শামিম এর ছবি

পড়ুন। ধন্যবাদ।

তিথীডোর এর ছবি

নবনীতা দেবসেন কি এতোই অপরিচিত, হলফ করে বলতে হয়? অ্যাঁ

ভালো-বাসার বারান্দা পাঁচে চার দাগানো বই। গুডরিডসে ছিলো না খেয়াল করেই অবাক হলাম।

রিভিউ বেশ ভাল লেগেছে। চলুক
পড়তে হবে বইটা।

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

মনি শামিম এর ছবি

ধন্যবাদ তিথী। নবনীতার নাম আমি অনেক আগেই শুনেছি, পড়া হয়নি। আমার নিজের কর্মক্ষেত্রের বাইরে পড়াশুনা কম। সেভাবে তার লেখা পড়ার সুযোগ হয়নি। ঠিক যেমন তার শিক্ষক সুকুমারি ভট্টাচার্যর লেখাও পড়া হয়নি এই অধমের। এইটা পাঠক হিসেবে আমার সীমাবদ্ধতা।তবে এটাও জানি পাঠের জগত অতলস্পর্ষী।এইখানে নতুন নতুন লেখকের সাথে পরিচয় হবে প্রায় হর হামেশা।

আর যা হয়। মনে হচ্ছে উনার লেখা আগে কেন পড়া হয়নি!

গুডরিডস এখন পর্যন্ত আমার কাছে অচেনা এক জগৎ। দেখি, ঢুকতে হবে শীঘ্রই।

মন মাঝি এর ছবি

একসময় নবনীতার অনেকগুলি বই পড়েছিলাম। ভাল লাগত। এখন একটা বাদে আর কোনটারই নাম মনে পড়ছে না। যেটা মনে পড়ছে সেটা হল - 'ট্রাকবাহনে ম্যাকমাহনে'। অরনাচল প্রদেশে নবনীতার ভ্রমনের উপর ভ্রমণ-কাহিনি।

****************************************

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

হুমম... তারমানে, নবনীতাও ফেলুদা-জটায়ুর কাহিনী পড়তেন! চিন্তিত

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

জিপসি এর ছবি

আরে ভাই, কই ছিলেন এদ্দিন? আমি তো ভাবছিলাম গাঁটটি-বোচকা বাইন্ধা বিলাত চইলা গেছেন!!!! শুভ প্রত্যাবর্তন।
রিভিউ ভাল হয়েছে, ডাইরিতে নামটি টুকে রাখলাম।

------------------------------------------------------------------------------
জিপসিরা ঘর বাঁধে না,
ভালবাসে নীল আকাশ

এক লহমা এর ছবি

নবনীতা-র লেখা অতি উপাদেয়। আপনার রিভিউ ভাল লাগল। কত দিন বাদে লিখলেন!

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

চমৎকার! আপনার রিভিউ এবং যতটুকু বুঝলাম, বইটিও।

ঝিঁ ঝিঁ পোকা এর ছবি

পড়ার ইচ্ছা রইল ৷ চলুক

Hasan Rahman এর ছবি

আহ! বড় সুস্বাদু গদ্য! খুব খুব ভালো লাগল। নবনীতা আমার কেন যেন খুব প্রিয় মানুষ। এই একটা অসাধারন বাঙালি প্রজন্ম অমর্ত্য, তপন রায়, সুনীল, নবনীতা, এবং আরো অনেক অনেক মানুষ সবাই মিলে আমাদের বহুকিছুকেই একটা উন্নত মানে নিয়ে গেছেন। হাসি

নাফিস মাহমুদ খান এর ছবি

তোর লেখার হাত বরাবরই ভালো। তুই বই লিখিস না কেন?

কর্ণজয় এর ছবি

আপনার লেখাটুকু পড়েই বলতে ইচ্ছে করছে, আপনার ভাষায়
স্বজনসকাশের লেখিকাকে আমি প্রনাম জানাই। উনি অনেক মানুষ সম্পর্কে জানালেন, শোনালেন। আমরা জানলাম, শুনলাম।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।