আমরা গরীব কেন?

সৌরভ সাখওয়াত এর ছবি
লিখেছেন সৌরভ সাখওয়াত [অতিথি] (তারিখ: বিষ্যুদ, ০৫/০৯/২০১৯ - ৪:৪৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১।
সবচেয়ে সহজ উত্তর আমার বাবা গরীব ছিলেন তাই। তখন প্রশ্ন আসে বাবাই বা গরীব কেন ছিলেন। কিংবা দাদা, অথবা দাদার বাবা। তখন উত্তরটা একটু জটিল হয়ে দাড়ায়। আরো জটিল হয় যখন প্রশ্ন আসে আমার দেশটা গরীব কেন। এই জটিল প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য প্রফেসর ড্যারন এ্যাসেমগ্লু বেশ অনেক বছর ধরে গবেষণা করছেন। তার গবেষণার কিছু কিছু অনুসিদ্ধান্ত বেশ মজার। যেমন যেসব জায়গায় ইউরোপিয়ান সেটেলাররা নানান কারণে টিকতে পারে নাই সেইসব দেশে পরবর্তীতে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি

তো যাই হোক।

২।
এ্যাসেমগ্লু আর আরেক প্রফেসর জেমস রবিনসন মিলে একটা বই লিখেছেন। ৫৪৬ পৃষ্ঠার বই। নাম হচ্ছে "Why Nations Fail"। নামের শেষে আরো কিছু আছে। উইকিতে দেখে নিয়েন। বইয়ের মোদ্দা কথা যেহেতু দেশগুলা পরীক্ষার জন্য ঠিকমতো প্রস্তুতি নেয় না, তাই তারা ফেল করে। পরীক্ষার জায়গায় পড়েন ভবিষ্যত, আর প্রস্তুতিগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক নীতি। বইয়ে ভদ্রমহোদয়গণ কি বলতে চেয়েছেন তার সংক্ষিপ্তসার উইকিতে সুন্দর করে দেয়া আছে। সারাংসটা এমন:

একটা দেশ গরীব হবে নাকি ধনী হবে তা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করতে পারে, যেমন: ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, সংস্কৃতি, ধর্ম, কিংবা রাজনীতি। লেখকদ্বয়ের মতে এগুলো কোনটাই অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট না। ধরা যাক উত্তর আর দক্ষিণ কোরিয়া। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, সংস্কৃতি, এবং ধর্ম- সবকিছুতেই দুইটি দেশ একই অবস্থানে ছিলো। এমনকি আলাদা হয়ে যাওয়ার পরের বেশ অনেকটা সময় দুইটা দেশই স্বৈরাচার শাসকের অধীনে ছিলো। তাহলে ২০১৯ সালে এসে উত্তর কোরিয়া এতো গরীব আর দক্ষিণ কোরিয়া ধনী হয় কিভাবে? এ্যাসেমগ্লু আর রবিনসনের মতে প্রতিটা দেশেই কিছু অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক চর্চা, ভিত্তি কিংবা বিধান (Institutions) থাকে। যেমন সম্পতির ওপর যথাযথ মালিকানা একটা অর্থনেতিক বিধান। আরো আছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী আইনী কাঠামো। এগুলো সব অর্থনৈতিক ভিত্তি। অপরদিকে রাজনৈতিক চর্চা বা ভিত্তির মধ্যে আছে গণতন্ত্র। আবার গণতন্ত্রের কাঠামো রাষ্ট্রপতি শাসিত নাকি সংসদীয় সেটাও একটা ব্যাপার। যখন এই অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ভিত্তি বা বিধানগুলোতে জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে তখন সেটা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক চর্চা। প্রফেসরদ্বয়ের মতে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক চর্চা থাকলেই শুধুমাত্র একটা দেশ পাস করবে অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে সফল হবে, আর না থাকলে ফেইল। ব্যাপারটা হয়তো এতো সহজ না, তবে মূল কথা এটাই। অন্তুর্ভুক্তিমূলক এর উল্টাদিকে হচ্ছে একচেটিয়া অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক চর্চা। যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকা, দূর্নীতি, এসব একচেটিয়া অর্থনৈতিক চর্চার উদাহরণ।

৩।
বইটার অনেক কিছুই ভালো লাগে নাই। এদের বলার ধরণটা ভালো তবে এক কথাই ঘুরেফিরে বারবার লেখা। যেটা উপরে বল্লাম। আবার বলি। যখন একটা দেশের অর্থনৈতিক নীতিগুলোয় সাধারণ মানুষের অধিকার থাকে না তখন সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে ফেইল করে। যেমন আপনার প্রপার্টি রাইট থাকতেই হবে। আইনের শাসন থাকতেই হবে। খেয়াল করেন এইখানে রাজনৈতিক ভিত্তির প্রয়োজনীয়তাটা বাদ দিয়েছি। এ্যাসেমগ্লু রবিনসন দুইজনই কড়া গণতন্ত্রপন্থী। গণতন্ত্র তাদের দৃষ্টিতে খুবই দরকার উন্নয়নের জন্য। আমার মতে এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং হি, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান আর চীনের দেং জিয়াওপিং এর জন‍্য এই ইস‍্যুতে কোন একটা পক্ষে চূড়ান্ত মতামত দেয়া কঠিন। তাই রাজনীতি বাদ। শুধু অর্থনীতি নিয়ে থাকি।

৪।
ভালো নীতি কোনটা? অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি ভালো। আর একচেটিয়া নীতি খারাপ। কিন্তু নীতিটা আসলেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নাকি একচেটিয়া হল সেটা বের করা বেশিরভাগ সময়েই কঠিন। অন্তর্ভুক্তিমূলক মনে হলেও অনেকসময় দেখা যায় ওই নীতিতে একটা দেশের কোটিপতি ছাড়া কারো লাভ হয় নি। ধরেন বিনিয়োগ বাড়ানোর জন‍্য সরকার ২% ট্যাক্স কমালো ২০১৫ সালে। এখন ২০১৯ এসে আমি বের করবো যে ওই ট্যাক্স কমানোর কারণে জিডিপিতে কি পরিবর্তন আসছে। সেটা করার জন্য জিডিপিতে "শুধুমাত্র ট্যাক্সের" প্রভাবটা বের করতে হবে। খুব ভালো ডেটাসেট ছাড়া সেটা খুবই দূরহ ব‍্যাপার। ইকোনোমেট্রিক্সে নানান টুল্স আছে সেটা করার জন্য। তবে সবগুলাতেই কিন্তু থাকে।

এখন কোনটা ভালো কোনটা খারাপ নীতি সেটা বের করা কঠিন বুঝলাম। এর বাইরে আরেক ধরনের নীতি আছে যেটা ভালো খারাপের মধ্যেই পড়ে না। সেটা বলদ নীতি। বলদ নীতি অনেকসময় শুনলে ভালো লাগে কিন্তু নিখাদ বলদামী ছাড়া তাতে কিছু থাকে না। এই বলদ নীতির খুব চমৎকার একটা উদাহরণ পাওয়া যায় Why Nations Fail বইয়ের ২১১ পৃষ্ঠায়। ১৪৪৫ সালে মানবজাতির ইতিহাসে বেশ বড় একটা ব্যাপার ঘটে। গুটেনবার্গ নামক এক জার্মান ভদ্রলোক একটা যন্ত্র বানান যেটা দিয়ে কাগজের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছোট ছোট অক্ষর ছাপা যায়। সেটা ছিলো প্রথম আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র। আধুনিক মুদ্রণযন্ত্রের এই আবিষ্কার পশ্চিম ইউরোপে বলতে গেলে একটা বিপ্লব নিয়ে আসে। ১৪৬০ সালে ইতালির রোম, ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ, ১৪৭৩ সালে বুদাপেস্ট, ১৪৭৬ সালের মধ‍্যে লন্ডনে মুদ্রণযন্ত্র চলে আসলো। ওই সময়টাতে, ১৪৮৫ সালে অটোমান সম্রাট ছিলেন এক নির্বোধ। তার নাম বায়েজিদ-২। তো সেই বায়েজিদ-২ একটা ডিক্রি জারি করলেন যাতে বলা হলো মুসলমানগণ আরবীতে প্রিন্ট করতে পারবে না। ১৫১৫ সালে সুলতান সেলিম-১ এই নির্বুদ্ধিতা অব্যাহত রাখলেন। শেষ পযর্ন্ত ১৭২৭ সালে এসে অটোমান সাম্রাজ্যে প্রথম মুদ্রণযন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। সেটাও শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকে যিনি সুনির্দিষ্ট কিছু বই ছাপাতে পারতেন। সেই বইগুলো ছাপানোর আগে আবার তিনজন ধর্ম আর আইন বিশেষজ্ঞ দিয়ে ভেটিং করে নিতে হতো। এইভাবে একটা সভ্যতা আগানোর কথা না। আগায়ও নি। ১৮০০ সালের দিকে অটোমান সাম্রাজ্যে শিক্ষিতের সংখ্যা ছিল ২-৩% যেখান ওই সময়টাতেই ইংল্যান্ডে এই হার পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬০% আর নারীদের ক্ষেত্রে ছিল ৪০%। এক নির্বোধ সম্রাট কিভাবে বলদমার্কা নীতি তৈরী করে একটা জাতিকে পিছিয়ে নিতে পারে সেটা দেখলাম।

৫।
৫০০ বছর পরে এসে সুলতান বায়েজিদ একটা বলদ ছিল এটা আমি বলতে পারলেও তখনকার অটোমান সাম্রাজ্যের নীতিপ্রণেতাদের মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পেছনে নিশ্চয়ই কোন কারণ ছিল। খুজলে হয়তো পাওয়া যাবে তবে সেদিকে না যাই। আমরা আমাদের দিকে তাকাই। ১৯৯১ এবং ১৯৯৪, দুইবার সিমিউই-৩ নামক সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকারিভাবে প্রত্যাখ্যান করে। প্রত্যাখ্যান করার পেছনে তথ্য পাচার এর যুক্তিটা এখন আমলাদের নিরেট মস্তিষ্কজাত উদ্ভাবন মনে হলেও তখন ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা হইচই হয়েছে বলে মনে পড়ে না। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের পেছনে কোন গূঢ় রাজনৈতিক অভিসন্ধি ছিল না। ছিল নির্ভেজাল আমলাতান্ত্রিক বলদামি।

প্যারালাল ইউনিভার্সের খবর যেহেতু আমাদের কাছে আসে না তাই ওই বলদমার্কা নীতির প্রভাবে আমাদের কি পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে সেটা বের করা প্রায় অসম্ভব। মূল সমস্যা হচ্ছে দেখতে নিরীহ ধরনের এসব নীতি একটা দেশের যে কি পরিমাণ ক্ষতি করতে পারে সেটা ১-২ বছরে বোঝা যায় না।

৬।
একটা রামবলদমার্কা নীতি এখন আমাদের দেশে চালু করার চেষ্টা হচ্ছে। এটার নাম "সুদের হার ৬-৯% নীতি"। ব্যাপারটা শুনতে কিন্তু খুব ভালো লাগে। ১৫% সুদের চাপে পিষ্ট রহমান মিয়া এইবার বুঝি রক্ষা পেল! ব‍্যাংক ৬% এ ডিপোজিট নেবে, ৯% এ ঋণ দেবে। সমস্যা কোথায়? সমস্যা বোঝার আগে বুঝতে তবে ব্যাংক ৯% এই বা ঋণ দেয় কেন? ১% স্প্রেড যোগ করে ৭% এ ঋণ দিলেই তো পারে। এই প্রশ্ন আসলে স্প্রেড এর হিসাবটা ব্যাখ্যা করতে হয়। ধরে নিলাম ব্যাংক ৬% এই তহবিল যোগাড় করেই ফেললো। এখন ঋণ দেয়ার পালা। ঋণ দেয়ার আগে ব্যাংকের বিল্ডিং এর ভাড়া, ম্যানেজারের বেতন দেয়া লাগবে। সেটার জন্য ব্যাংকভেদে ঋণের ওপর ১-২% চার্জ করতে হয়। এরপর আসে রিস্ক প্রিমিয়ামের হিসাব। একটা ব্যাংক তার গ্রাহককে ঋণ দেয়ার মাধ্যমে একটা ঝুকি নেয়। ঝুকিটা হচ্ছে গ্রাহক টাকা নিয়ে আর ফেরত দেবে না। সাথে আরো নানান ঝুকি আছে। ওগুলো বাদ। ধরলাম, শতাব্দী ব্যাংকের দুইজন গ্রাহক, এস রহমান আর রহমান মিয়া। এস রহমানের সম্পদের পরিমাণ ২০০০ কোটি টাকা, আর রহমান মিয়ার ২০ লাখ। এস রহমানের দেশে বিদেশে নানান ব্যবসা, সম্পদ সবখানে ছড়ানো ছিটানো। তার শতাব্দী ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি। অন্যদিকে রহমান মিয়ার টংগী বাজারে একটা পাইকারের দোকান ছাড়া কিছু নাই। শতাব্দী ব্যাংক থেকে তার নেয়া ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ টাকা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এস রহমানের কাছ থেকে শতাব্দী ব্যাংক কত ঝুকি প্রিমিয়াম নেবে আর রহমান মিয়ার কাছ থেকেই বা কতো? এস রহমানের কাছে টাকা দেয়ার ঝুকি একটাই, উনার ইচ্ছা না হইলে উনি টাকা নাও দিতে পারেন। এর বাইরে আর কোন ঝুকি নাই। যেহেতু একটাই ঝুকি তাই ওনার জন্য ঝুকি প্রিমিয়াম ধার্য করলাম ১%। কাজেই ওনাকে ঋণের সুদ দিতে হবে (৬%+ব্যাংকের খরচ ২%+ ঝুকি প্রিমিয়াম ১%) বা ৯%। অপরদিকে রহমান মিয়ার জীবনে অনেক অনিশ্চয়তা। চালের দাম কমে যাইতে পারে, দোকানের ক্যাশিয়ার টাকা নিয়ে ভেগে যাইতে পারে, ছেলের ক্যানসার ধরা পড়তে পারে, উনি নিজেই মারা যাইতে পারেন। এর মধ্যে যেকোন একটা হলেই ব্যাংকের ঋণ ধরা। এস রহমান হচ্ছেন ব্যাংকের প্রাইম গ্রাহক আর রহমান মিয়া হচ্ছেন সাবপ্রাইম গ্রাহক। সাবপ্রাইম গ্রাহক রহমান মিয়ার ব্যবসায়, ব্যক্তিগত জীবন সব বিবেচনায় নিয়ে শতাব্দী ব্যাংক হিসাব করলো তার রিস্ক প্রিমিয়াম ৪%। ঋণের সুদ দাড়ালো (৬%+ ২%+ ৪%) বা ১২%। কিন্তু সরকারি নির্দেশ আসলো যে ঋণের সুদের হার ৯% এর ওপরে যেতে পারবে না। তাহলে কেমনে কি? সমাধান হচ্ছে সাবপ্রাইম রহমান মিয়া বাদ। তার জায়গায় আসবেন প্রাইম গ্রাহক এস রহমান-২। যিনি আবার এস রহমান-১ এর মতোই খেয়ালী, তার অনেক টাকা কিন্তু তিনি ইচ্ছা হলে ঋণ ফেরত দেন, ইচ্ছা না হলে ব্যাংক কাঁচকলা খায়।

৭।
এই বলদ নীতির ফলাফল কি? ফলাফল এইরকম:
১. ব্যাংক দীর্ঘ মেয়াদে তহবিল নেয় আর স্বল্প মেয়াদে ঋণ দেয়। বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা রেখে ১১.৫০% সুদ পাওয়া যায়। ব্যাংকে রাখলে পাওয়া যাবে ৬%। কাজেই ব্যাংকে তহবিলের পরিমাণ কমতে থাকবে আশংকাজনক হারে
২. ব্যাংকে টাকা না থাকার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমবে। তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ছোট উদ্যোক্তাদের। একদিকে ব্যাংকে টাকা নাই, অপরদিকে ৯% এ ঋণ দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় টাকা যা ছিল সেগুলো সব পাবে এস রহমানরা, মাঝখান দিয়ে রহমান মিয়ারা বাদ।

৮।
উপরের দুটো ব্যাপার ইতিমধ্যেই হালকাভাবে আর্থিক খাতে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে পরিণতিটা কি? ৬-৯% সুদহারের সাথে সাথে ধ্বজভঙ্গ বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপী ঋণ বিষয়ক নীতিমালা যদি বলবৎ থাকে তবে আগামী ৫ বছরের মধ্যে,
১. অনেক ব্যাংকে ঋণ দেয়ার মতো টাকা থাকবে না। ওই ব্যাংকগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
২. সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিতে পারবে না, ফলে অবকাঠামো উন্নয়নের অনেকগুলো প্রকল্প মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাবে।
৩. বেসরকারি খাতে ঋনপ্রবাহ মারাত্মক ভাবে কমে যাওয়ার কারণে অর্থনীতিতে রিসেশন দেখা দেবে।

অতি অদক্ষ আমলাতন্ত্র আর অত্যন্ত দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে এই রিসেশন দীর্ঘমেয়াদী মন্দায় পরিণত সম্ভবনা খুবই বেশি।

৯।
গরীবমারা নীতি বানানো আমাদের দেশের শত বছরের ঐতিহ‍্য। সহজে এ থেকে মুক্তি নাই, আশাও করি না মুক্তির। কথা হচ্ছে গরীব মারার জন‍্য একচেটিয়া নীতি করে গরীব টিকায়া রাখতে হয়। একচেটিয়া নীতিগুলো কিছু লুপ তৈরী করে। তাতে ধনী আরো ধনী হয়, গরীব হয় আরো গরীব। মাঝখান দিয়ে পুজিবাদী অর্থনীতি একে ওকে ধরে টিকে যায় কোনভাবে। কিন্তু যখন বলদমার্কা নীতি তৈরী হবে তখন আপনি ধনী হন, গরীব হন, পুরা ভেসে যাবেন। অর্থনীতিই টিকবে না।

প্রশ্ন ছিলো আমরা গরীব কেন। বাপের আমলের নীতিগত দুর্বলতা না হয় মেনে নেয়া যায় যে তখন আমরা কুয়ার ব‍্যাঙ ছিলাম এই কারণে। ফোন ছিলো না, নেট ছিলো না, গুগল ছিলো না, উইকি ছিলো না। কাঠালপাতা খেয়ে রামছাগল মার্কা পলিসি বানানোর পক্ষে একটা যুক্তি ছিলো। কিন্তু এখন যুক্তিটা কি? গুগলে সার্চ করলে শতশত পেপার, ব্লগ পাওয়া যায় সুদহারে ক‍্যাপ বসানোর সমস‍্যা নিয়ে। ২০১৯ সালেও কাঠালপাতা খেলে কই যাবো? দিব‍্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি ১০০ বছর পরে কোন এক অর্থনীতিবিদের পপ-সায়েন্স মার্কা বইয়ে পলিসি ফেইল‍্যুর এর উদাহরণ হিসাবে ২০১৯ এর বাংলাদেশ।


মন্তব্য

স্পর্শ এর ছবি

চমৎকার ঝরঝরে লেখা। মূল বক্তব্যও বোঝা গেল সহজেই। এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে দায়িত্ব প্রাপ্ত আমলা ও নীতিনির্ধারকরা এরকম বেসিক ভুল করবে। এটা কি এই কারণে যে, যথাযথ বিষয়ে পড়াশোনার ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ্নীতিনির্ধারণী পদে অসীন হয়ে আছে এরা? নাকি দেশে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনার মান ভাল না?


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

সৌরভ সাখওয়াত এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ।

যা যা বললেন সবগুলোই কারণ। বর্তমান রাজনৈতিক চর্চা আর তার সাথে আমলাতন্ত্রের সম্পর্কটা অনেকটা ৫০ থেকে ৭০ দশকের সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মেলে। এখন ওই সময়ে নেয়া অর্থনৈতিক নীতিগুলো পড়লে সবগুলোই বেসিক ভুল মনে হয় কিন্তু উদ্দেশ্য মহানই ছিলো।

হিমু এর ছবি

উল্লিখিত বইটার লেখকদের একজনের নামের বাংলা প্রতিবর্ণ দারন আজেমোলু (তুর্কি -oğlu মানে পুত্র, ~আজেমপু্ত্র দারন)।
রিস্ক প্রিমিয়ামকে কি ঝুঁকি অধিহার লেখে বাংলা পাঠ্যবইতে?

গত দশ বছরে ব্যাঙ্কিং খাতে যে পরিমাণ হরিলুট হয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই মধ্যম (সাবপ্রাইম) ঋণগ্রহীতার গাফিলতির কারণে হয়নি? রহমান মিয়ার কাছ থেকে ব‍্যাঙ্ক যে জামানত (কোলেইটারাল) নিয়েছে, সেটা তারা উসুল করে ছাড়ে। উত্তম ঋণগ্রহীতা এস রহমান ঠিকই গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ৬-৯% এর প্রসঙ্গ এলে মধ্যম ঋণগ্রহীতাকে সামনে ঠেলে "দেখেন গরিবের কী হাল দেখেন" বলে ব্যাঙ্কগুলি না কেঁদে যদি তাদের উত্তম ঋণগ্রহীতাদের কড়া হাতে সামলাতে পারে, তাহলেই তো ল‍্যাঠা চুকে যায়? আমার ধারণা ছিলো, ব্যাঙ্কের পরিচালন ব্যয় গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা নানা পরিষেবামূল্য দিয়েই পোষানো দস্তুর, পরিসরে (স্প্রেডে) হাত দিতে হয় না; নাকি?

ব্যাঙ্কগুলোর আবদার সম্ভবত সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমিয়ে তাদের আমানতি সুদহারের ধারেকাছে রাখা এবং চওড়া পরিসরের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু সেটা করা হলে এস রহমানরা টাকা লোটা বন্ধ করবে, সে নিশ্চয়তা তো নাই? বরং তারা যদি নগদ লেনদেনকে ব‍্যাঙ্কিং খাতে নিয়ে আসতে পারে (যেমন বাড়িভাড়া যদি ব্যাঙ্কিং খাতের মাধ্যমে দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়), তাহলে বরং আমানতের বেগ বাড়বে।

সৌরভ সাখওয়াত এর ছবি

উল্লিখিত বইটার লেখকদের একজনের নামের বাংলা প্রতিবর্ণ দারন আজেমোলু (তুর্কি -oğlu মানে পুত্র, ~আজেমপু্ত্র দারন)।

তুর্কি ভাষায় আজেমোলু বলে জানতাম, বাংলায় যে এটাই হবে জানা ছিলো না। ধন্যবাদ।

রিস্ক প্রিমিয়ামকে কি ঝুঁকি অধিহার লেখে বাংলা পাঠ্যবইতে?

আমিও ঝুঁকি অধিহারই লিখেছিলাম, কিন্তু কেমন জানি খটোমটো লাগছিলো পড়তে।

৬-৯% এর প্রসঙ্গ এলে মধ্যম ঋণগ্রহীতাকে সামনে ঠেলে "দেখেন গরিবের কী হাল দেখেন" বলে ব্যাঙ্কগুলি না কেঁদে যদি তাদের উত্তম ঋণগ্রহীতাদের কড়া হাতে সামলাতে পারে, তাহলেই তো ল‍্যাঠা চুকে যায়?

ব্যাপার এইটাই।

আমার ধারণা ছিলো, ব্যাঙ্কের পরিচালন ব্যয় গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা নানা পরিষেবামূল্য দিয়েই পোষানো দস্তুর, পরিসরে (স্প্রেডে) হাত দিতে হয় না; নাকি?

পরিসরের হার একেক ব্যাংকে একেক রকম
একইভাবে কিছু ব্যাংকের পরিষেবা থেকে আয় কম, কিছু ব্যাংকের বেশী।

সত্যপীর এর ছবি

সমীকরণের আরেক দিক হল, এস রহমান এই সুযোগে অল্প সুদে টাকা ধার নিয়ে বারিধারায় আর টঙ্গীবাজারে সমানে রাহমান টাওয়ার শপিং সেন্টার খুললে দেশের ও দশের উন্নয়ন ইত্যাদি। এছাড়া শতাব্দী ব্যাঙ্ক রহমান মিয়াকে এক কথায় নাকচ না করে দিয়ে ৯% সুদের উপর নানাবিধ ফী চার্জ করে মোট টাকা ১২% উঠিয়ে নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে। ৯% সিলিং এ ভালো খারাপ দুটাই আছে। বাজারের পরিস্থিতি বুঝে সরকার পরে এইটা উঠানামা করে কিনা বুদ্ধিমানের মত সেইটা একটা চিন্তা বটে।

চমৎকার লেখা। আরো আসুক।

..................................................................
#Banshibir.

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

ঠিক এইরকম না হলেও কাছাকাছি এক ধরনের সিস্টেম কিন্তু গ্রামাঞ্চলে চালু আছে। আব্দুল আলি আশা কিংবা গ্রামীন ব্যাঙ্ক থেকে ১২% হারে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মোখলেস মিয়া কিংবা শরাফত আলির কাছে মাসে ২% কিংবা ৩% সুদে খাটায়। মোখলেস মিয়া রিক্সা ভ্যান কেনে, শরাফত আলি মুদি দোকান দেয়।

সত্যপীর এর ছবি

আব্দুল আলি কি মস্তান টাইপের লোক? মোখলেস মিয়া টাকা ফিরত দেওয়ার ভাও না করলে আব্দুল আলির পরবর্তী পদক্ষেপ কি আইনি না বেআইনি?

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি

খুব ভোরে রহস্যময় কে বা কাহারা মোখলেস মিয়ার রিক্সা ভ্যানে যাত্রীর গদির ওপর এপাশ থেকে ওপাশ পন্ত পেট খুলে ত্যাগ স্বীকার করে যেতে পারে। সক্কালটা একটু কড়া হলে পরে আব্দুল আলি তারপর লাক্স সাবানের ভুরভুরে গন্ধেমাতোয়ারা বাম হাত মোখলেসের গালে রেখে "ইশ দিনকাল খুব খারাপ পড়েছে তাই বলে এইভাবে মাইনষের ব্যবসায় মাইনষে ত্যাগে!" বলে সমবেদনা জানিয়ে যেতে পারে। মোখলেস সারাদিন রিক্সা ভ্যান ঠেলে সকালের ঘুম আর গদি পাকসাফের কষ্ট বাঁচাতে দ্রুত সিধা পথে ফিরে যাবে।

সত্যপীর এর ছবি

..................................................................
#Banshibir.

হিমু এর ছবি
আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

দেঁতো হাসি
প্রতিটি ব্যাবসার জন্যই একটা প্রাক যোগ্যতার প্রয়োজন আছে। ঠিকই ধরেছেন, আব্দুল আলি'র এই ব্যবসায় তার প্রাক যোগ্যতা হল তার মাজার জোর। তা ছাড়া ব্যাংকগুলোর মত তার নিজেরও এক ধরনের গ্রাহক মূল্যায়নের পদ্ধতি জানা আছে। টাকা সে তার কাছেই খাটাবে, যার কাছ থেকে সে সেটা আদায় করতে পারবে। প্রয়োজন বোধে মোখলেস মিয়ার রিক্সা ভ্যান সে জব্দ করে নিবে, শরাফত আলির মুদি দোকানের মাল সাবার করে দিবে। তবে আব্দুল আলির সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে মেদা মিয়ার মত কমজোরি মাজার কেউ কেউ অনেক সময় এই ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে যে পড়ে না তা নয়। সে ক্ষেত্রে মেদা মিয়াদের মাসিক কিস্তি বাকি পড়ে, টাকা উদ্ধারের জন্য নেতা পাতি নেতাদের দ্বারস্থ হতে হয়, কিছু টাকা উদ্ধার হয়, সেখান থেকে নেতা পাতি নেতাদের কমিশন দিয়ে আখেরে মেদা মিয়া ব্যবসায় ধরা খেয়ে যায়, পরিশেষে ব্যাঙ্কের লোকেরা এসে তার ঘরের চাল খুলে নিয়ে যায়।

আব্দুল্লাহ এ.এম. এর ছবি

সরকার যদি ৬-৯% নীতি চাপিয়ে না দেয়, যদি এ ক্ষেত্রে একটা মুক্ত নীতি বিজায় থাকে, তাহলে কি ব্যাঙ্কগুলো স্বাধীনভাবে এস রহমানদের জন্য ৯% এবং রহমান মিয়াদের জন্য ১২% সুদহার চালু রাখতে পারে? কারন রহমান মিয়াদের টাকা দিতে হলে এরকম দ্বৈত সুদহার কার্যকর করা ছাড়া তো কোন উপায় দেখছি না। বাস্তবতার এবং নৈতিকতার নিরিখে সেটা কি গ্রহনযোগ্য হবে? যতদূর জানি এ দেশে এরকম দ্বৈত সুদহার নীতি কখনো চালু ছিল না(ব্যাঙ্কভেদে সুদহারের তারতম্য ছিল), অন্য কোন দেশে কি তেমনটা ছিল কিংবা এখন আছে?

সৌরভ সাখওয়াত এর ছবি

সরকার যদি ৬-৯% নীতি চাপিয়ে না দেয়, যদি এ ক্ষেত্রে একটা মুক্ত নীতি বিজায় থাকে, তাহলে কি ব্যাঙ্কগুলো স্বাধীনভাবে এস রহমানদের জন্য ৯% এবং রহমান মিয়াদের জন্য ১২% সুদহার চালু রাখতে পারে?

হ্যা, পারে।

যতদূর জানি এ দেশে এরকম দ্বৈত সুদহার নীতি কখনো চালু ছিল না(ব্যাঙ্কভেদে সুদহারের তারতম্য ছিল), অন্য কোন দেশে কি তেমনটা ছিল কিংবা এখন আছে?

এটা দেখতে পারেন। ৪ এর সাথে ৫ আর ৬ এর সাথে ৭ নম্বর কলাম তুলনা করলে দেখতে পাবেন বড় শিল্প এবং ছোট শিল্পে সুদের হারে কিছু কিছু ব্যাংকে এখনো দ্বৈত সুদহার চালু রেখেছে। বেশিরভাগ দেশে ব্যাপারটা এমনই। এটা অস্ট্রেলিয়ার।

হাসিব এর ছবি

তাই রাজনীতি বাদ। শুধু অর্থনীতি নিয়ে থাকি।

তারপর এই কথা সেই কথার পর সুদের হারে ক্যাপ বসানো খারাপ (পেপারসহ)।

ভাই কি নিওলিবারেল তরিকার?

সৌরভ সাখওয়াত এর ছবি

না ভাই। শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্য খাত পুরাপুরি সরকারিকরণ করেন, সমস্যা নাই। তবে কিছু কিছু জায়গায় সরকারের বা হাত না ঢুকানো ভালো।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।