টাওয়ার অফ সাইলেন্স

তানভীর এর ছবি
লিখেছেন তানভীর (তারিখ: শনি, ০৩/০৮/২০১৩ - ২:১৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

==১==

সৈয়দ মুজতবা আলী এর নাম দিয়েছিলেন মৌন শিখর।মানুষ মরলে সাধারণভাবে কবরে সমাহিত করা হয় বা পোড়ানো হয়। কিন্তু মাটি, পানি, আগুন এগুলো জোরোয়াস্ট্রিয়ান পার্সিদের কাছে অতি পবিত্র। তাই নাপাক দেহের সৎকারে এগুলোর ব্যবহার পার্সিদের জন্য নিষিদ্ধ। এ থেকে পরিত্রাণে তারা এক অভিনব পদ্ধতি বের করেছিলো। যেসব জায়গায় পার্সিদের বসতি রয়েছে, সেখানে লোকালয় থেকে কিছু দূরে পাহাড় চূড়া বা বনে তারা একটা স্তম্ভ বানায়। কেউ মারা গেলে পার্সিরা সেই স্তম্ভের ওপরে মৃতদেহ রেখে আসে। নিমেষে তা শকুন, চিল আর বাজপাখির খাদ্যে পরিণত হয়- টাওয়ারে শুধু কঙ্কাল পড়ে থাকে। পার্সিদের এই স্তম্ভের নাম ‘টাওয়ার অফ সাইলেন্স’; হিন্দিতে বলে ‘চিল ঘর’ আর পার্সিরা ডাকে ‘দাখমা’


চিত্র ১- শিল্পীর আঁকা 'টাওয়ার অফ সাইলেন্স'


চিত্র ২- টাওয়ার অফ সাইলেন্সে খাদ্যের প্রতীক্ষায় শকুনের দল

==২==

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে ঢাকায় যেসব সিপাহী জড়িত ছিলেন তাঁদের শায়েস্তা করার জন্য ব্রিটিশরাও অনেকটা একই পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলো। পুরান ঢাকায় এখন যেখানে বাহাদুর শাহ পার্ক, তখন এর নাম ছিলো আন্টাঘর ময়দান। সেখানে সাহেবরা বিলিয়ার্ড খেলতে যেতেন। বিলিয়ার্ড বল দেখতে ডিমের মতো। মূর্খ, নেটিভরা তাই একে ডাকত আণ্ডা খেলা। আণ্ডা খেলার ঘর- আণ্ডাঘর, সেখান থেকে আন্টাঘর ময়দান। এই আন্টাঘর ময়দানে ব্রিটিশরা বিদ্রোহী সিপাহীদের সবাইকে গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিলো। তবে এখানেই শেষ নয়। মৃতদেহের সৎকারের পরিবর্তে তারা দিনের পর দিন সিপাহীদের দেহগুলি ময়দানে ঝুলিয়ে রেখেছিলো যতদিন না তারা শকুনের খাদ্য হয়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিণাম কতখানি ভয়াবহ হতে পারে তারা সেদিন মানুষকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলো। বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে গেলে আমার এখনো মনে হয় এখানকার মাটিতে মিশে আছে রক্তের ছাপ, বাতাসে ভেসে আসে পচে যাওয়া মৃতদেহের গন্ধ, এই পার্কের গাছে গাছে ঝুলে আছে অসংখ্য সিপাহী আর শকুনেরা তা ঠুকে ঠুকে খাচ্ছে- এমন একটা দৃশ্য এখনো আমাকে তাড়া করে।

==৩==

ব্রিটিশদের তুলনায় আমাদের দয়ামায়া অনেক বেশি। পাকিস্তানিদের তুলনায় তো বটেই। আমরা ভুলে গেছি বাহাদুর শাহ পার্কের কথা, আমরা ভুলে গেছি মিরপুর, রায়েরবাজার, অগণিত বধ্যভূমির কথা। আমাদের ত্রিশ লক্ষ স্বজনকে হত্যা করার পরও আমরা পাকিস্তানিদের কিছু করতে পারি নি। আজ স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে যখন পাকিস্তানিদের সহযোগী রাজাকার-আলবদরদের বিচার হচ্ছে তখন এদের নেতা গোলাম আযমকে আমরা দয়াপরবশ হয়ে তার ‘বয়স’ বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে দিয়েছি! শুনেছি গোলাম আযম এখন হাসপাতালে পোলাও-কোর্মা-বরই আচার খেয়ে ভালোই দিন যাপন করছে।

পার্সিদের ‘মৌন শিখর’ নিয়ে একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম “Towers of Silence: Zoroastrian Architectures for the Ritual of Death”।এটা দেখে মনে হলো যদি আমাদের মেরুদণ্ড থাকতো তবে আমরা হয়ত এই রাজাকারদের জন্য একটা ‘ঘৃণার শিখর’ বানাতাম। রাজাকারদের যখন মৃত্যু হতো তখন পার্সিদের মতো এই টাওয়ারে তাদের রেখে আসতাম শকুনের খাদ্য হিসেবে। যে বাংলার স্বাধীনতা তারা অস্বীকার করেছিলো, তার মাটি অপবিত্র করার কোন অধিকার তাদের থাকতে পারে না। এই শিখর হোক বা না হোক, আমি আজীবন অন্তরে এদের জন্য একটা ‘ঘৃণার শিখর’ পুষে যাব।


মন্তব্য

রণদীপম বসু এর ছবি

চলুক আমাদের আগামী প্রজন্ম নিশ্চয়ই তা করতে ভুল করবে না !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

তানভীর এর ছবি

বেশি আশাবাদী নই। আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মনের রাজা টারজান এর ছবি

আগামীর জন্য সব রাখলে চলবে কি করে??? আমরাই করি আসেন।

অতিথি লেখক এর ছবি

"যে বাংলার স্বাধীনতা তারা অস্বীকার করেছিলো, তার মাটি অপবিত্র করার কোন অধিকার তাদের থাকতে পারে না।"
- একলহমা

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

রাত-প্রহরী এর ছবি

মাভৈঃ মাভৈঃ
চলুক

আমি আর কিছু না পারি, আমার পরিবার, আমার সন্তানদের মনের ভেতর আসমুদ্রহিমাচল ঘৃণা তৈরী করতে পেরেছি।
ঘৃণা কাদের জন্য? আবার জিগায়!!

-------------------------------------------------
কামরুজ্জামান পলাশ

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

অতিথি লেখক এর ছবি

আমি চাই সবগুলো রাজাকারকে একই জায়গায় পুতে একটা ঘৃনার স্তম্ভ বানানো হোক,যেখানে বছরে একদিন গিয়ে আমরা থু থু দিয়ে আসবো,কিংবা ছেড়া জুতো মেরে আসবো।এমন ঘৃনার স্তম্ভ করতে পারলে আগামি প্রজন্মেরশিশুরা জানবে আমরা ওই পশুগুলোর জন্যে কতটুকু ঘৃনা পুষে রেখেছিলাম,আজো আছি,চিরকালি থাকবো।আমাদের এই ঘৃণা দেখে তারা ইতিহাস জানতে আগ্রহী হবে,এবং একদিন তারাও এর চেয়ে বেশি ঘৃণা প্রদর্শন করবে আর দেশটাকে ভালোবাসতে শিখবে।

মাসুদ সজীব

তানভীর এর ছবি

চলুক

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

চলুক

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

তানিম এহসান এর ছবি

বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে গেলে আমার এখনো মনে হয় এখানকার মাটিতে মিশে আছে রক্তের ছাপ, বাতাসে ভেসে আসে পচে যাওয়া মৃতদেহের গন্ধ, এই পার্কের গাছে গাছে ঝুলে আছে অসংখ্য সিপাহী আর শকুনেরা তা ঠুকে ঠুকে খাচ্ছে- এমন একটা দৃশ্য এখনো আমাকে তাড়া করে। চলুক চলুক

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

রুবাই এর ছবি

চলুক

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

প্রৌঢ় ভাবনা এর ছবি

মৃতদেহ সৎকার:
জরথুস্ত্রবাদীরা মৃতদেহকে অপবিত্র মনে করেন। তাঁরা, পাহাড় চুড়ায় একটি বড়সড় আধার নির্মান করে সেই আধারের মাঝে পাথর বসিয়ে তার উপর মৃতদেহটি রেখে আসেন। পাহাড় চুড়ার এই আধারটিকে 'টাওয়ার অব সাইলেন্স' ('ডখমা') বলা হয়। পরবর্তীতে মৃতদেহটি শকুনের খাবারে পরিনত হয়। তৃতীয় দিনে হাড়গোড়গুলো সংগ্রহ করে অন্যত্র কয়লা ও বালির মিশ্রনের মধ্যে রেখে দেওয়া হয়। মনে করা হয়, এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে ভূমি বা বায়ু দুষিত হবেনা। পারসীক ধর্মে পরিবেশ দুষণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

মৃতদেহ সৎকারের জন্য মুম্বাইতে ৫৭ একর অরণ্য-উদ্যানের মাঝে একস্থানে একটি বিরাটাকার 'ডখমা' বা টাওয়ার নির্মান করা হয়েছে।

পারসীক ধর্ম নিয়ে একটা লেখা আছে, ধর্মসার- (৪) জরথুস্ত্র ও পারসীক ধর্ম
হ্যাঁ, রাজাকরদের জন্য এটাই উপযুক্ত ব্যবস্থা।

তানভীর এর ছবি

সিরিজের কয়েকটা লেখা পড়েছিলাম আগে। এটা চোখে পড়েনি। ধন্যবাদ।

সঠিক উচ্চারণ কি 'ডখমা' হবে?

প্রোফেসর হিজিবিজবিজ এর ছবি

আন্টাঘর নামকরনের ইতিবৃত্ত জেনে খুব ভালো লাগলো।

আসলেই আমরা গোল্ডফিশ মেমোরীর জাতি। না হলে চার দশকের উপরে সময় লাগাই একটা অত্যাবশ্যক কাজ শুধু শুরু করতে! আর আমরাই বোধহয় শুধু পারি দয়া দেখানোর নাম করে নিজেদের পশ্চাদ্দেশ উন্মুক্ত করে দিয়ে প্রমাণিত হায়নাদেরকে পাশবিক আমন্ত্রণ জানাতে।

বলিহারি যাই।

____________________________

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মাহবুব লীলেন এর ছবি

একমত

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

সুবোধ অবোধ এর ছবি

সহমত।
আর লেখায় হাততালি

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

আয়নামতি এর ছবি

শেয়াল শকুনের খাদ্য হবারই যোগ্য এইসব নরাধমেরা।
১০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০...% সহমত

তানভীর এর ছবি

চলুক

স্যাম এর ছবি

এই শিখর হোক বা না হোক, আমি আজীবন অন্তরে এদের জন্য একটা ‘ঘৃণার শিখর’ পুষে যাব

চলুক চলুক সাথে আছি।

তানভীর এর ছবি

চলুক

অতিথি লেখক এর ছবি

গো আযমদের কোনো শাস্তিই আমার মনপুত হয়না। সব রকমেই মনে হয় কম হয়ে যাচ্ছে। লেখার সাথে সহমত।

স্বয়ম

তানভীর এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

সাফি এর ছবি

শকুনের মত উপকারী প্রাণীদের এরকম অপকারী ঘাতকের মৃতদেহ না খাওয়ানোই ভালো।

আন্ডাঘরের নামকরণটা মজার লাগলো।

তানভীর এর ছবি

শকুনেরা খাদ্য পেয়ে তো খুশিই হওয়ার কথা।

হাসিব এর ছবি

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে ঢাকায় যেসব সিপাহী জড়িত ছিলেন তাঁদের শায়েস্তা করার জন্য ব্রিটিশরাও অনেকটা একই পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলো।

মনে রাখা দরকার একটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরেকটা সৎকার। প্রকাশ্য মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখা বা কাটা মুন্ডু ঝুলিয়ে রাখা শাস্তি হিসেবে অনেকে আগে থেকেই প্রচলিত।

তানভীর এর ছবি

প্রকাশ্য মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখা বা কাটা মুন্ডু ঝুলিয়ে রাখা শাস্তি হিসেবে অনেকে আগে থেকেই প্রচলিত।

অনেক আগে থেকে প্রচলিত হলেও মধ্যযুগের পরে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তেমন দেখা যায় নি। সুসভ্য ব্রিটিশরা যাদের কাছ থেকে আমরা অনেকে মনে করি সভ্যতা শিখেছি তারা এইসব আদিম কাজ-কারবার উনিশ-কুড়ি শতকেও বহাল রেখেছিলো। আন্টাঘর ময়দানে দিনের পর দিন মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখাটা অবশ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেয়েও বেশি ছিলো। তখন এই বাহাদুর শাহ পার্ক আর সংলগ্ন অঞ্চল ছিলো ঢাকা শহরের কেন্দ্রবিন্দু। এমন ঘনবসতিপূর্ণ লোকালয়ে মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখার সভ্যতাটা যতটা না সিপাহীদের জন্য শাস্তি হিসেবে করা হয়েছিলো, তার চেয়ে বেশি করা হয়েছিলো ঢাকাবাসীকে মানসিক নির্যাতনের জন্য। এমনকি এর আশেপাশে পোগজ স্কুল বা যেসব স্কুল তখন ছিলো, বাচ্চারাও স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে এই সিপাহীদের ঝুলে থাকতে দেখত। যাই হোক, বিটিশদের সাম্প্রতিক সভ্যতার নমুনা দেখলাম তারা পাবলিক প্লেসে গায়ের চামড়া দেখে দেখে লোকজনের কাগজ-পত্র তল্লাশী করছে। ইল্লিগাল হলেই দেশে-ফেরত।

অতিথি লেখক এর ছবি

মাসুদ সজীব ভাইয়ার কমেন্টটাই আমি কপি করলাম-

আমি চাই সবগুলো রাজাকারকে একই জায়গায় পুতে একটা ঘৃনার স্তম্ভ বানানো হোক,যেখানে বছরে একদিন গিয়ে আমরা থু থু দিয়ে আসবো,কিংবা ছেড়া জুতো মেরে আসবো।এমন ঘৃনার স্তম্ভ করতে পারলে আগামি প্রজন্মেরশিশুরা জানবে আমরা ওই পশুগুলোর জন্যে কতটুকু ঘৃনা পুষে রেখেছিলাম,আজো আছি,চিরকালি থাকবো।আমাদের এই ঘৃণা দেখে তারা ইতিহাস জানতে আগ্রহী হবে,এবং একদিন তারাও এর চেয়ে বেশি ঘৃণা প্রদর্শন করবে আর দেশটাকে ভালোবাসতে শিখবে।

-এস এম নিয়াজ মাওলা

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।