| ‹ পুরোনো ব্লগ | সব ব্লগ | নতুন ব্লগ › |
দুপুরে খাওয়ার পর আম্মা সবসময় বকাঝকা করে ঘুমুতে চাই না বলে। এইসব বেয়াড়া স্নেহের বকুনিতে খুব বিরক্ত লাগে আজকাল। একটু রুঢ় হয়েই জবাব দেই, "ঘুম না আসলে কী করব? সবসময় এসব ভাল্লাগে না শুনতে।" আম্মা হয়তো কষ্ট পান তাই কথা বাড়ান না এরপর। আমি আমল দিই না। মা যখন হয়েছেন ছেলের এইসব একগুঁয়েমি সহ্য করে যেতে হবে- এইরকম একটা কিছু ভেবে নিই মনে মনে। স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি খুব টের পাই আমি এবং এই ভাবনাটা তেমন সুখকর নয়। আমরা তিনজন মাত্র মানুষ থাকি বাসায়। তাই আব্বা-আম্মা ঘুমিয়ে গেলে আমি দুপুরের অধিকর্তা। হাঁসফাঁস গরমে কিছুই ভালো লাগে না। জানি না কেন, এইরকম রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুরে যখন বাসায় থাকি, আমার জানালা দিয়ে বাইরে ঝকঝকে রোদ দেখা যায়- হলদেটে, তীক্ষ্ণ রোদের ফলায় ঘুম মরে যায় যখন, অতীতচারী হয়ে উঠি আমি।
তখন অনেক ছোট, ক্লাস টু কিংবা থ্রি-তে পড়ি সেই বয়সে একবার টাইফয়েড হয়েছিল আমার। জ্বর সেরে যাবার পরও শরীর দূর্বল, একারণে স্কুলে যেতে দেওয়া হয় না। বিকেলে খেলতে যাওয়াও বন্ধ। সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে সময় কাটে। ভাই-বোনদের সবাই যে যার স্কুলে বা কলেজে, আব্বা অফিসে। আম্মা দুপুরের কাজকর্ম সেরে অবসরটুকু ঘুমিয়ে কাজে লাগান যথারীতি। সেই দুপুরগুলোতেও আমি ভীষণ একা! বাইরে যাবার অনুমতি নেই বলে বিছানার লাগোয়া জানালার চওড়া দেয়ালের উপর পা মেলে একপাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে রোদের সাথে বন্ধুত্ব করি। কোলের উপর রেখে সেবা’ র অনুবাদ পড়ি – কিডন্যাপড্ কিংবা প্রবাল দ্বীপ। মাঝে মাঝে বই হাতে গড়িয়ে নামি বিছানায়। জানালার দিকে মুখ করে উপুড় হয়ে শুয়ে মাথা উঁচিয়ে আকাশ দেখি, বইয়ের সাথে মেঘের ছবি মিলাই। মেলাতে না পারলে নীল আকাশে সাদা মেঘের তুলি চালাই, তাতে নানান ছবি হয়। আজ এত বছর পর সে বইয়ের কিছুই মনে পড়ে না আমার। মনে করতে চাই ও না। তার চেয়ে বরং কিছু ভুলে থাকা হোক চিরকাল, ভুলে যাওয়াটাকেই মনে রাখি। আমি জানি, চেনা পুরনো রাস্তাগুলোয় আমার আর তেমন করে ছুটে বেড়ানো হবে না কোনদিন। কিছু অধ্যায় চাপা পড়ে গেছে পুরোপুরি, কিছু হারিয়ে গেছে। হারায়নি সেই বিকেলের রোদে জানালার আবছায়ায় বসে থাকা দেড় মাসের জ্বরে ভোগা রুগ্ন ছেলেটার স্মৃতি, যার পৃথিবী এঁটে গিয়েছিল ছোট্ট একটা ঘরে, অনেক আগ্রহ নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত যে ছুঁয়ে দেখতো, আকাশে মেঘের ফাঁকে প্রবাল প্রাচীরের সীমানা খুঁজে বেড়াতো, সরকারী কোয়ার্টারের পলেস্তারা উঠে যাওয়া দেওয়ালের নকশায় খুঁজে নিত জলদস্যু জাহাজ। আজ সে অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। জানালার গরাদে পা তুলে বসে কিছু পড়ার পাগলামো তার হয় না আর। সেই দুপুর মিলিয়ে গেছে সন্ধ্যায়, সেই সময় ছেড়ে গেছে কবে।
সেই বোকাসোকা অভিমানী ছেলেটার জন্য এখন এই সুনসান দুপুরে আমার মন খারাপ হয় অকারণে।
৩
এখনও বাইরে দুপুর। এখনও
সেই বোকাসোকা অভিমানী ছেলেটার জন্য এখন এই সুনসান দুপুরে আমার মন খারাপ হয় অকারণে।
কত কত দুপুর প্রচণ্ড মাথাব্যথা, জ্বর আর উদভ্রান্ত বিষন্নতা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি ম্যাট্রিকের পরের কয়েকটি বছর। কত কত দুপুরের রোদ থেকেই নিয়েছি প্রাণের পুষ্টি। কত কত দুপুরে পালিয়ে গিয়েছি বাড়ী থেকে। আর কতিপয় দুপুরে তার সঙ্গে হাঁটাহাঁটি। শহরের কোনো পথ, আশেপাশের গ্রামের কোনো মাটি আমরা না চষে ছাড়িনি। আজো দুপুর জানালা দিয়ে ডাকে। কিন্তু এই শহরে দুপুর মন শুষে নেয়।
সব মনে করিয়ে দিলেন।
৪
কিন্তু এই শহরে দুপুর মন শুষে নেয় - ঠিক তাই। এই শহরের প্রতি আমার কোন বিশ্বস্ততা নাই
_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে
৫
মাটির ঘ্রান পেলাম...
অস্তিত্বের মুখোমুখি হলাম।
---------------------------------
ছেঁড়া স্যান্ডেল
৬
সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি ...
৭
দারুণ!!!
আমি একটা কবিতা খুঁজছি অনেকদিন, ক্লাস ফোর-ফাইভে ছিল ঃ দুপুরে বাবা মা ঘুমিয়ে গেলে দরজাটা আস্তে করে খুলে পাড়ার গলির মোড়টা পেরিয়ে... এরকম কিছু।
মনে পড়ে নাকি কারো?
৮
হাসান আজিজুল হক-এর একটা ভয়ানক গল্প আছে 'সারাদুপুর' নামে। এক বালকের একটা দুপুরেই গল্পটার শুরু ও শেষ।
১০
-
আমি জানি, চেনা পুরনো রাস্তাগুলোয় আমার আর তেমন করে ছুটে বেড়ানো হবে না কোনদিন। কিছু অধ্যায় চাপা পড়ে গেছে পুরোপুরি, কিছু হারিয়ে গেছে।
একে একে দিন গুলো সব কোনো এক রাক্ষসের পেটে চলে গেছে, সেখান থেকে আর সেই দিনগুলি মোর ফিরে আসবে না কখনোই। না পাওয়ার একটা হাহাকার নিয়ে আমাদেরকেও একদিন সেই রাক্ষসের পেটে চলে যেতে হবে।
|
_________________________________
<সযতনে বেখেয়াল>
১১
এই গানটা শোনালেন কেন? ![]()
_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে
১২
অসাধারণ লাগল! পুরাতন স্মৃতি মনে পড়ে গেল আমারও। আর হ্যাঁ, বোকাসোকা অভিমানী ছেলেটার জন্য আমার মনটাও কেন যেন খারাপ হয়ে গেল!
১৩
ধন্যবাদ।
মানুষ আছেন এখনও, পুরোপুরি বিডিআর হয়ে যান নি ![]()
_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে
১৪
@শিমুল... ঐ কবিতটা ছিল এরকম : মা-মণিটার চোখ এড়িয়ে/গলির মোড়ের পুল পেরিয়ে/ হঠাত্ যদি যেতাম উড়ে/ প্রজাপতির মতো/ কেমন মজা হত!
এটা শামসুর রাহমানের একটি কিশোর কবিতা, নাম ভুলে গেছি, এবং শব্দগুলো সব যে ঠিকঠাকমতো আছে সে নিশ্চয়তাও দিতে পারি না!
@ ওয়াসিফ এবং সবাই... দুপুর নিয়ে আরো একটা অসাধারণ গল্প আছে দেবেশ রায়ের। সেই গল্পটির নামও "দুপুর"। শুধুমাত্র একটা বেলার গল্পটা আছে সেখানে। এই অসাধারণ গল্পটিও পড়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাই। "দেশ"-এর পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত বাছাই ছোটগল্প সঙ্কলনে এটা পাওয়া যাবে।
দুপুরের মধ্যে যে ঝাঁঝাঁলো প্রাণশক্তি, একটা উদাস বিষণ্ণতা, একটা বৈরাগী বাতাস আছে, এটা পাবেন সেই গল্পে। দেখি, গল্পটা যোগাড় করে একটা পিডিএফ পাঠাতে পারি কিনা...
---------------------------------------------
বুদ্ধিমানেরা তর্ক করে, প্রতিভাবানেরা এগিয়ে যায়!
১৫
মৃদূল আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। ![]()
মা-মণিটার চোখ এড়িয়ে/গলির মোড়ের পুল পেরিয়ে/ হঠাত্ যদি যেতাম উড়ে/ প্রজাপতির মতো/ কেমন মজা হত!
বইয়ে ছবি ছিল একটা ছেলে দরজা খুলে বাইরে যাচ্ছে, চোখের চাহনিটা এখনো মনে পড়ে।
১৬
- কেবলমাত্র এই প্রথম লাইনটাই মুখে আসছিলো, বাকী আর কিছুই ছিলোনা বলে শিমুলকে সাহায্য করা গেলো না!
কবিতাটা ক্লাস ফোরের। প্রথম লাইনটা মনে আছে কারণ, "মা- মণিটার চোখ এড়িয়ে"- এই বাক্যে 'মণিটা'র মানে বুঝতে পারছিলাম না। আনোয়ার স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি একেবারে মদনগঞ্জের খাঁটি এ্যকসেন্টে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ![]()
_________________________________
<সযতনে বেখেয়াল>
১৭
হ্যাঁ, পড়েছি। বইটা (দেবেশ রায়ের গল্প সংগ্রহ) আছে আমার কাছে। আবছা মনে আছে। দেবেশ রায় আমার প্রিয় গল্পকারদের একজন।
১৮
ভাইগ্না,লেখা দারুন লাগ্লো।মনে করাইতে করাইতে বহুদুর নিয়া গেলা...
--------------------------------------------------------
শেষ কথা যা হোলো না...বুঝে নিও নিছক কল্পনা...
১৯
দুপুরে ঘুমানো যে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস না এটা মা-বাবাকে বুঝানোর জন্য কিছু পাইলে ডাউনলোড করে রাখেন ...
লেখাটা দারুন .... .... ![]()
________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।
২০
কিছুদিন আগে স্বাস্থ্যবিষয়ক কোন একটি পত্রিকায় পড়েছিলাম দুপুরে আহারান্তে একটা ছোট্ট ন্যাপ স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী।
কি মাঝি? ডরাইলা?
২১
এইজন্যই বোধহয় দুপুরের সাথে উদাস শব্দটাকেই সবচেয়ে ভাল মানায়। এই সময়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে পুরোনো দিনের কথাই মনে পড়ে কেন কে জানে !
সেই বোকাসোকা অভিমানী ছেলেটার লেখা ভাল লাগলো।
নষ্টালজিক !
...........................
সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন
২২
কোথায় যেন পড়েছিলাম. "জীবন হচ্ছে যাবতীয় স্মৃতির সমষ্টি।"
আপনার লেখার জন্য জাঝা
পুনশ্চ. এতোক্ষণে লক্ষ্য করলাম, লিখতে চেয়েছিলাম "স্মৃতি", অথচ টাইপ করেছিলাম "সৃষ্টি"
কয়েক ঘণ্টা ওটি "সৃষ্টি" হয়েই ছিলো।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব দেবো। কিন্তু কী পাবো তার বদলে?
২৩
তাহলে মৃত্যু কী? a lid on the flow of memories?
পুনশ্চ. মজার! "জীবন হচ্ছে যাবতীয় সৃষ্টির সমষ্টি।" - আপনি বরং এটার কপিরাইট নিয়ে রাখেন ![]()
_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে
২৪
তারেক। লেখাটা পড়ে পুরা ঘাবড়াইয়া গেলাম।
সোজা কথায় দারুন। ..................আমার ভাষায় পুরা কোপানী।
কি মাঝি? ডরাইলা?
২৫
ঘাবড়াইছেন ক্যান? হাতে রাইফেল নিয়ে ঘাবড়াইলে তো বিপদ ![]()
_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে
২৬
খুব ভালো লাগলো আত্মকথন, স্মৃতিচারণ।
...লেখার ভাষাটা প্রবল আকর্ষণের।
২৭
তারেক, অনেক পুরানো কথা মনে করিয়ে দিলেন, গল্পটা যেন আমারই, অনেক ধন্যবাদ গল্পটার জন্য
-----------------------------------------
রাজামশাই বলে উঠলেন, 'পক্ষীরাজ যদি হবে, তা হলে ন্যাজ নেই কেন?'
২৮
ইশকুলের কালে দুপুরে ক্লাশ থাকতো... মাঝে মাঝে ক্লাশ করতেই হতো... সেটা বড্ড বিরক্তিকর ছিলো... দুপুরবেলার কিশোর যে পড়ায় মনোযোগি হতেই পারবেনা এই সত্যি কথাটা কোনও গাধা টিচারই বুঝতো না... তো আর কি করা... আমাদেরও টিফিনের পরেই ইশ্কুল পলাতে হতো... তখন সেটা দারুণ এক কাজ... গাবতলী টার্মিনালে গিয়ে ক্যারম খেলা বা আরেক্টু এগিয়ে পর্বতে বিদেশী সিনেমা দেখা... অথবা কবরস্থানে বসে টুয়েন্টি নাইন খেলা... আহা...
৩০
দুপুরে ঘুমানোটা যে কী বিরক্তিকর লাগতো! প্রায় প্রতিটা দিনই ভান করতাম যে ঘুমিয়েছি। বাসার সবাই চোখ মুদলে আমি ব্যস্ত হতাম আমার কাজে।
আর এখন... একটা দুপুরের জন্য কতো হাপিত্যেশ করি
.............................................
আজকে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল
এই জীবনের পদ্মপাতার জল - জীবনানন্দ দাশ
৩১
যারা পড়েছেন, যারা মন্তব্য করেছেন সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ভাল থাকুন সবাই ![]()
_________________________________
ভরসা থাকুক টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙের ল্যাজে
১
আপনার শবদচয়নেও রয়েছে পুরোনো সময়ের গান!
**********************************
কৌনিক দুরত্ব মাপে পৌরাণিক ঘোড়া!