রূপালী পর্দায় ঈগল ভাইদের গল্প

তারেক অণু এর ছবি
লিখেছেন তারেক অণু (তারিখ: মঙ্গল, ১৫/০৯/২০২০ - ৪:১৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


আল্পস পর্বতমালার খাঁজে খাঁজে বাসা বাঁধে সোনালী-ঈগলেরা ( Golden Eagle), পরম মমতায় ডিম ফোঁটার পর ছানাকে লালন করে মিয়াঁ-বিবি দুই ঈগল মিলেই। অনেক শিকারি পাখির মতই সাধারণত দুইটা ডিম দিলেও, ডিম ফুটে বের হওয়া শক্তিশালী ছানাটিকেই ঈগল দম্পতি লালন করতে থাকে খাবার দিয়ে, অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছানাটি সাধারণত মারা যায় তাদের অবহেলার শিকার হয়ে এবং প্রায়ই তার শক্তিশালী ভাই/বোনটির আক্রমণে। নিষ্ঠুর দেখালেও এটাই প্রকৃতির নিয়ম। এভাবেই ঠিক চলছিল সব।

এই সময়ে আল্পসের এক উপত্যকায় একটি দুর্বল ঈগলছানা (ক্যেন) তার ভাইয়ের (আবেল) ধাক্কায় পড়ে যায় বাসার নিরাপদ আশ্রয় থেকে, যার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু। ( উল্লেখ্য কেন এবং আবেল বাইবেলে আব্রাহামিক ধর্মগ্রন্থে উল্লেখকৃত প্রথম মানব আদমের দুই পুত্র, যাদের একজনের আরেক জনকে খুন করার মাধ্যমে পৃথিবীর প্রথম বারের মত পাপের আবির্ভাব ঘটে, আমরা এদের সাধারণত হাবিল ও কাবিল নামে চিনি।)

কিন্তু সেখানে ছিল লুকাস নামের এক প্রকৃতিপ্রেমী কিশোর, যে তার বাবার সাথে আল্পসের এই অংশে বাস করতো, যদিও ব্যক্তিগত জীবনে নানা টানাপোড়নের কারণে নিজের বাবার সাথে ছিল এক অব্যক্ত যোগাযোগ, মানে কথা বলত না সে, কিন্তু মুখ বুজে বাবার সকল আদেশ মান্য করত। কিন্তু তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল ডানজের নামে এক বনরক্ষীর সাথে ( যে ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন কিংবদন্তীর ফরাসী অভিনেতা জন রেনো),

নিসর্গের নানা বিষয় ও রহস্য নিয়ে আলাপের মাধ্যমে এই দুই অসম বয়সীর মাঝে গড়ে উঠেছিল এক খাঁটি বন্ধুত্ব। তো লুকাস কাকতালীয় ভাবে খুঁজে পেল সেই পরিত্যক্ত ঈগল ছানাকে, যার নাম সে রাখলো ক্যেন। এবং বাবার চোখ এড়িয়ে তাকে যে এক গোলাঘরে রেখে বড় করতে থাকল পরম মমতায় ও স্নেহের উষ্ণতায়। ক্যেনকে ছোট ছোট মাংসের টুকরো করে সে খাওয়াতো এবং অপেক্ষা করছিল যে কবে ছানাটি বড় হবে। ঈগলের প্রতি হাঁটিহাঁটি পা পা পদক্ষেপে স্নেহাদ্র নজর রাখত লুকাস।

বনরক্ষী ডানজেরের নজরে ঠিকই পড়ে যায় এই বিষয়টি, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নানা পরামর্শ দিতে থাকেন তিনি লুকাসকে, সেই সাথে এটাকে যে বদ্ধ ঘরে না রেখে নিয়মিত ওড়বার প্রশিক্ষণ দিতে হবে সেই কথার গুরুত্বও সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেন তিনি। সেই সাথে লুকাসের মাঝে পাখিটির প্রতি মমত্ব দেখতে পেয়ে খুশী হন ডানজের।

লুকাসের বাবাও খেয়াল করেন নিজের ছেলের মাঝে এই পরিবর্তন, গোমড়ামুখো ছেলেটি যে আনন্দ ডগমগ করছে সবসময়, সেই সাথে সে এখন সবসময়ই অস্থির থাকে বাবার দেওয়া কাজ শেষ করে কোথাও যেন যাবার জন্য। কিন্তু ঈগল ছানার কথা কোন এক অজানা ভয়ে বাবার কাছ থেকে সবসময় গোপনই রেখেছে লুকাস, হয়ত ভেবেছিল বাবা জানতে পারলে তাকে ছানাটি পালতে দিবে না, ফলে বন্ধুহারা হতে হবে ফের তাকে।

সময় গড়াতে থাকে, নানা ভাবে চলতে থাকে ক্যেনের ওড়বার প্রশিক্ষণ। একসময়ে ওড়বার পালক গজায় সোনালি ঈগলটার, এবং মানুষের সংস্পর্শ নিয়েই তাদের বন্ধন ছিন্ন করে সে মিলিয়ে যায় আল্পসের নীল আকাশে।

কিন্তু নিসর্গী লুকাস ঠিকই জানতো ক্যেনের ভাই অ্যাবেলের কথা, তার তীক্ষ্ণ ডাক ঠিকই শুনেছে সে উপত্যকায়। অ্যাবেল ততদিনে এই উপত্যকার একমাত্র ঈগল, অন্য অনেক শিকারি পাখির মতই নিজের অধিকৃত এলাকায় অন্য কোন ঈগলের উপস্থিতি সহ্য করবে না সে, বিশেষ করে তার শিকারে যারা ভাগ বসাবে তাদের।

কিন্তু ক্যেন তো আর আগের মতো বাসা থেকে বিতাড়িত দুর্বল ঈগলছানাটি নেই, সেও এখন প্রস্তত আগের অপমানের বদলা নেবার জন্য, প্রকৃতির নিয়মের ধার ধারছে না ক্যেন, ব্যক্তিগত অপমান হিসেবেই নিয়েছে সে তাকে হত্যার চেষ্টাকে। চলচ্চিত্র পরিচালক অপূর্ব মুন্সিয়ানার সেই বুনো জগতের ঘটনাকে তুলে আনেন সেলুলয়েডের রূপোলী ফিতেয়, আমরা অবাক হয়ে দেখি এক অবাক রোদেলা দিনে ক্যেন তার ভাই শিকারি পাখিদের রাজা অ্যাবেলকে শিকার ধরার সময় আক্রমণ করে, এবং পরাস্ত করে। সেই সাথে তাকে বুঝিয়ে দেয় যে অ্যাবেলকে হত্যা করার বা উপত্যকা ছাড়া করার কোন ইচ্ছে তার নেই, কিন্তু অ্যাবেল যেন ক্যেনকে স্বীকৃতি দেয় এখানে থাকে, এবং শিকারের অঞ্চল ভাগ বসাতে দেয়, তাহলেই সে খুশী।
তাইই হয়। আল্পসের নিস্তরঙ্গ জীবন চলতে থাকে।

এর মাঝে প্রবল ঝড়ে লুকাসদের বাসা প্রায় ভেঙে পড়ে, কিন্তু লুকাসের মন জুড়ে থাকে কেবল ঈগল ক্যেনের কথা, এই ঝড়ে ঈগলটা নিষ্ঠুর পাহাড়ি এলাকায় টিকে আছে কিনা এই চিন্তাতেই অস্থির লুকাস ঝড় থামতেই ডানজেরের সাথে বেরিয়ে পড়ে এবং আবিষ্কার করে একটি পূর্ণ বয়স্ক ঈগলের মৃতদেহ।

কিন্তু সেটি যে ক্যেনের সেটা মানতে লুকাসের চরম আপত্তি ছিল, তার দৃঢ় বিশ্বাস এই মৃতদেহে ক্যেনের ভাই অ্যাবেলের, ঝড়ের মধ্যে পাথর চাপা পড়ে মারা গেছে সে। ক্যেনের সন্ধানে ফিরে ফিরে আসতে থাকে সে একই উপত্যকায়, এবং একই ভাবে ডাকতে থাকে হারিয়ে যাওয়া ঈগলকে।

এই সিনেমায় খুব সুন্দর ভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে দুইটি আলাদা প্রাণীর আলাদা যাত্রাকে, একাকী নিঃসঙ্গ কিশোরের, এবং একাকী অসহায় ঈগলের, অথচ দুইজনেরই দরকার ছিল দুইজনকে। দুইজনের যাত্রাপথ এক হয়ে যাওয়ায়ই বরং দুইজনেরই যাত্রা পূর্ণতা পেয়েছে, তারা নতুন করে খুঁজে পেয়েছে জীবনকে।

সিনেমার শেষ দৃশ্যে দেখা যায় আল্পসের বনাঞ্চল ফুঁড়ে বিশাল ঈগল ক্যেন এসে বসে কিশোর লুকাসের বাড়ানো হাতে, তৈরি হয় এক অসামান্য আবেগঘন মুহূর্ত। এইভাবেই প্রাণীজগতের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবার আহ্বান জানিয়ে শেষ হয় ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া গেরার্ড অলিভার এবং ওট্মার পেংকারের ‘ব্রাদার্স অফ দ্য উইন্ড’ চলচ্চিত্রটি।

মাত্র ৯৮ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি শুটিং করতে সংগত কারণেই পরিচালকদ্বয়ের লেগেছিল চার চারটি বছর। শ্যুটিং হয়েছিল অষ্ট্রিয়ার ডলোমিতি, তিরলসহ নানা পার্বত্য অঞ্চলে। লুকাসের ভূমিকায় কিশোর ম্যানুয়েল কামাচোর অভিনয় সবার নজর কাড়লেও দিনের শেষে সকলের নিসর্গপ্রেমী বনরক্ষীর ভূমিকায় অভিনয় করে আবারও সকলের মন জিতে নেন জন রেনো। আর দর্শকদের সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করেছে সিনেমার অসাধারণ সব ল্যান্ডস্কেপ।

( এই লেখাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ শিকারিপাখি গবেষক, পড়ুয়া, প্রকৃতিপ্রেমী, ক্যারাতে ব্ল্যাকবেল্ট ধারী মোহাম্মদ ফয়সালের জন্য। উল্লেখ্য যে ফয়সাল ভাই শিকারি পাখি নিয়ে কৈশোর থেকেই এতই উৎসাহী, আগ্রহী ও প্রেমী যে সারাজীবন তাকে পিতৃপ্রদত্ত নামের বদলে ‘ফ্যালকন ফয়সাল’ নামেই চিনেছি সবসময়।

বাংলাদেশের একাধিক প্রজাতির ফ্যালকন ও ঈগল নিয়ে তাঁর মূল্যবান গবেষণা আছে এবং সেগুলো নিয়ে উনার লেখা আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্য এই শিকারি পাখিদের টানেই ব্যস্ত থাকায় ‘ফ্যালকন ফয়সাল’ এখনো একজন চিরকুমার। বাংলাদেশে উনার মত মানুষ অনেক অনেক দরকার। )


মন্তব্য

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।