প্রতিলিপি(১০)

তুলিরেখা এর ছবি
লিখেছেন তুলিরেখা (তারিখ: মঙ্গল, ১৯/০১/২০১০ - ৫:৪৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

এখানে ৯ম

১০
গিবান আর ওরিয়ানা কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে বেড়াতে চলে গেছে এমন একজায়গায় যেখানে পাহাড় এসে সমুদ্রের আয়নায় মুখ দেখছে। ওদের মধ্যে কথোপকথন শুরু হয়েছিলো সেদিন সন্ধ্যায় কফি-সামোসা খেতে খেতে।

গানের পরেই ওরিয়ানা উঠে গিয়ে গড়ে রাখা সামোসাগুলো ভেজে কফি বানিয়ে নিয়ে এসেছিলো। এত ভালো স্বাদের খাবার আগে নাকি গিবান কোনোদিন খায় নি, খেয়ে সে দিওয়ানা হয়ে গিয়ে কথা কইতে শুরু করেছিলো অনেক। এমনিতে গিবান মিতভাষী, কিন্তু সেদিন সন্ধ্যাবেলা প্রগলভ হয়ে গেছিলো।

"ওরিয়ানা, তুমি কী ভালোবাসো? সমুদ্র না পাহাড়?"

ওরিয়ানা হেসে ফেলে, বলে, " শতকরা নব্বইজন এইরকম জানতে চায়, তুমিও চাইছো?"

গিবান অল্প অপ্রস্তুত হয়, তারপরে সামলে নিয়ে হেসে বলে, "দেখা যাচ্ছে আমিও নব্বইয়ের দলেই, সংখ্যালঘুর দলে নই। বলো না ওরিয়ানা, পাহাড় না সমুদ্র? কোনটা ভালোবাসো? আমি সিরিয়াস কিন্তু।"

" দু'টোই। এমন কোনো জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে যেখানে পাহাড় এসে সমুদ্র ঝুঁকে পড়েছে। জানো এমন জায়গা? ভীড় নেই কোলাহল নেই, শুধু সমুদ্রবেলা নারিকেলবাগান আর নীলসবুজ পহাড়ের সারি।"

দূরের আকাশের দিকে চেয়ে স্বপ্নাচ্ছন্নের মতন বলছিলো ওরিয়ানা, কিন্তু বলা শেষ করেই তাড়াতাড়ি সম্বিত ফিরে পেয়ে হাসে, বলে," দিবাস্বপ্ন দেখছিলাম গিব। এসব আসলে কল্পনাতেই সত্য আর সুন্দর। বাস্তবের দুনিয়ায় এদের চাইলে হয় না, জোর করে চাইতে গেলে সব ভেঙে যায়।"

গিবান কিন্তু অবাক হয়ে ওকে দেখছিলো, আস্তে আস্তে আস্তে বললো,"বেড়াতে যাবে? কতদিন ছুটি নিই নি। ছুটি নিয়ে তুমি আমি চলো কোথাও বেড়িয়ে আসি। আগে থেকে ঠিক করা কোনো জায়গায় না, এমনি এমনি বেরিয়ে পড়ি চলো, যেখানে গিয়ে পৌঁছই। যাবে?"

ওরিয়ানা গলা ছেড়ে হেসে বলেছিলো,"এখনো সেইরকমই পাগল আছো তুমি। একদম সেই কলেজের দিনগুলোর মতন।"

কিন্তু গিবান সিরিয়াস ছিলো,তলে তলে সব ঠিক করে ওরিয়ানাকে নিয়ে বেড়াতে এসেছে পাহাড়সমুদ্রের মিলনস্থলের প্রায়নির্জন এক অঞ্চলে।

এখানের সমুদ্রবেলায় লোকজনের ভীড় নেই, সূর্যস্নানের জন্য লোকে ছাতার নীচে মাথা দিয়ে উন্মুক্ত দেহে পড়েও নেই। সমুদ্রতীরে শুভ্র বালুকনা ঝকমক করে, একটু দূরে নারিকেল বীথি, ঝাউগাছের দল আর কাজু গাছের মতন একরকম গাছের বন।

এখানে সত্যি সত্যি খুব ভালো করে ছুটি উপভোগ করছে গিবান আর ওরিয়ানা। সকালে উঠে চলে আসে, নারিকেল বীথির মধ্যে বালির উপরে মাদুর টাদুর বিছিয়ে বসে বসে সমুদ্রশোভা দেখে, সঙ্গে করে নিয়ে আসে খাবারবাদার আর ফ্লাস্কে গরম চা, জলের বোতলে জল।

খেয়েদেয়ে দুজনে ছেলেমানুষের মতন সমুদ্রতীরে ঝিনুক টিনুক কুড়িয়ে বেড়ায়, ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দিলে দৌড়ে তফাতে হটে আসে আর প্রাণ খুলে হাসে। এখন ওদের নিত্য পিকনিক। কখনো দুপুরবেলা ছাতা মাথায় দু'জনে চলে সমুদ্রকিনারের পাহাড়টির দিকে, উপর থেকে নীল সমুদ্রটা অনেকটা পর্যন্ত দেখা যায়, দিগন্তলীন লবনাম্বুরাশি, তীরে যেমন ঢেউয়ে ফেনায় মাখামাখি, এত উপর থেকে সেসব নেই হয়ে যায়, শুধু জেগে থাকে বিশাল নীল এক পারাপারহীন তরল রাত্রি, সর্বদা আন্দোলিত কিন্তু কিন্তু তাও চিরস্থির, প্রশান্ত।

ওরা কাছের ছোট্টো শহরের সরাইখানায় একটু জায়গা নিয়েছে। খুবই ছোট্টো একটি পারিবারিক সরাইখানা, সরাইমালিকের পরিবারের লোকেরা নিজেরাই রান্নাবান্না করে অতিথিদের খাওয়ায়। বাগানের লাগোয়া দোতলার ব্যালকনিসমেত একটি ঘর ভাড়া নিয়েছে ওরা, ব্যালকনিতে দাঁড়ালে বা জানালার পর্দা সরালেই দেখা যায় দূরে নীলপাহাড়। ওরা সকালে উঠেই রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ে, ফেরে সন্ধ্যেবেলা ডিনারের সময়। কোনো কোনোদিন লাঞ্চ খেতে দুপুরে ফেরে, যেদিন কিনা সরাইয়ের মালকিন বলে দেন উনি স্পেশাল সী-ফুডের প্রিপারেশান করবেন। এই ক্ষুদ্র সরাইয়ের সরল মানুষগুলির সস্নেহ আন্তরিকতা স্পর্শ করে ওদের তরুণ মনকে। এবারে ওদের আউটডোরেই কাটছে দিনরাত্রের বেশীরভাগ সময়। অবশ্য তাইই ওরা চেয়েছিলো।

ওদিকে নামকরণের দিন প্রায় সারাদিন ঘুমিয়ে বিকেলবেলা ঝরঝরে হয়ে উঠলো তিশান, স্নানটান সেরে তিহার করা গরম খাবার খেয়ে তাজা হলো আরো।

চাঁদের আলোয় সেদিন গ্রামের মাঝে নাচের আসর বসেছিলো, উপজাতির গ্রুপ নাচ, তবে সবাই অংশ নেয় না, একদল ট্রেইন্ড লোকই মুখ হাতে পিঠে গলায় গাঢ় উজল রঙের নক্সা করে বিশেষ ধরনের ঝালর ঝোলর পোশাক পরে তবে নাচতে নামে।

তিহা তিশান আজ সন্ধ্যায় সেখানে। নাচের আসর শুরু হওয়ার আগে গাঁওবুড়োদের কাছে তিহা জানিয়েছে তিশানের কথা, তাকে সে সঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করতে চায় এইকথাও। হয়তো তিহার বিশেষ মর্যাদা আছে গাঁয়ে এই প্রকৃতিনির্ভর উপজাতির মধ্যে, হয়তো সে সর্দারবংশের কন্যা বা হয়তো বিশেষ কোনো স্কিল দিয়ে সে জাতির সেবা করে যা কিনা আর বেশী লোক জানেনা। তাই খুব সহজেই তিহার প্রস্তাব গৃহীত হয়।

সত্যি বলতে কী, তিহা যখন কথা বলছিলো গাঁওবুড়াদের সঙ্গে, তখন তিশানের কেমন শীত শীত লাগছিলো,ও এখানে বাইরের লোক, যদি এনারা গ্রহণ না করেন? না করারই বেশী সম্ভাবনা। এদের ভাবলেশশূন্য কুঞ্চিত মুখ আর ক্ষুদ্র চোখ থেকে মনের কথা প্রায় কিছুই অনুমান করা যায় না। এদিকে তিশান এদের ভাষার বিন্দুবিসর্গ বোঝে না।

অবশেষে তিহা যখন হাসিমুখে তিশানের দিকে ফিরে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলো যে সে গৃহীত হয়েছে, তখন অবরুদ্ধ শ্বাস মুক্ত করে দিয়ে গাঁওবুড়াদের মস্ত একটা বাও করে দর্শকাসনে গিয়ে বসে পড়লো তিশান। এতটাই হাল্কা লাগছিলো যে তিহাকে ধন্যবাদ দেবার কথাও খেয়াল ছিলো না।

নৃত্য আরম্ভ হলো, তিহা একরকম সুস্বাদু পানীয় এনে ওকে দিয়ে নিজেও ওর পাশে বসে আস্তে আস্তে চুমুক দিয়ে খেতে লাগলো।তিশান চুমুক দিয়ে টক ঝাল মিঠে ঝাঁজ মেলানো মেশানো অভূতপূর্ব স্বাদ পেলো,পান করতে করতে মিঠে রকমের নেশা হচ্ছিলো।

নাচ লক্ষ্য করে তিশান বুঝলো এ নিছক বিনোদনের নাচ নয়, তার চেয়ে অনেক গভীর ও ব্যাপ্ত ব্যাপার। নাচতে নাচতে এরা গোল হয়ে ঘুরছে,নুয়ে পড়ছে,ছন্দ তাল মেলানো নিঁখুত নৃত্য, সঙ্গে অজানা ভাষার অজানা সুরের সম্মোহনী গান আর অপূর্ব বাজনা। হঠাৎ তিশান অনুভব করলো এরা যারা দর্শকাসনে বসে আছেন, তারাও আবিষ্টের মতন, মনের দ্বারা যেন সংযুক্ত হচ্ছেন নৃত্যশীল দেহমনগুলির সঙ্গে। যেন নাচ নয়, একধরনের পূজা, সম্মিলিত আত্মনিবেদন। একটা শক্তিশালী তরঙ্গের মতন কিছু তিশানকে স্পর্শ করে যাচ্ছিলো, কিছু বোঝার আগেই সে একটা অন্য জগতের মধ্যে তলিয়ে গেলো।

(চলবে)


মন্তব্য

ধুসর গোধূলি এর ছবি

ওরিয়ানা, গিবানের সময় যাপনটা বেশ ভালো লাগলো।

তখন তিশানের কেমন শীত শীত লাগছিলো,ও এখানে বাইরের লোক, যদি এনারা গ্রহণ না করেন?
তিশান তো তিহাদের ভাষা বুঝতে পারে না! সে কী করে নিজেকে ঐরকম একটা জটিল পরিস্থিতিতে অন্তর্ভুক্ত করে ফেললো? তিশানকে একদিনের মধ্যেই এই রকম একটা ব্যাপার বুঝানো তো তিহার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হওয়ার কথা। মূলতঃ যেখানে ভাষা ও সংস্কৃতির একটা বিরাট ব্যবধান থাকে।

তিশান মিয়ার কপাল দেখেন। একটা বিবাহ করে হানিমুনটুন সেরে আসতে না আসতেই আরেক বিবাহের জন্য মাতব্বরদের এনওসি পেয়ে গেলো। পক্ষান্তরে আমার কপালটা দেখেন। মন খারাপ
___________
চাপা মারা চলিবে
কিন্তু চাপায় মারা বিপজ্জনক

তুলিরেখা এর ছবি

এরেই কয় রাজকপাল! হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

বইখাতা এর ছবি

" ....এমন কোনো জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে যেখানে পাহাড় এসে সমুদ্র ঝুঁকে পড়েছে। জানো এমন জায়গা? ভীড় নেই কোলাহল নেই, শুধু সমুদ্রবেলা নারিকেলবাগান আর নীলসবুজ পহাড়ের সারি।"

....এখন তো আমারো এমন জায়গায় যেতে ইচ্ছা করছে ! হাসি

কাহিনী তো ধীরে ধীরে চরম মুহূর্তের দিকে এগোচ্ছে মনে হচ্ছে। এরপর কী হবে কিছুটা বোধহয় আন্দাজ করতে পারছি। দেখি আমার অনুমান মিলে যায় কি না। হাসি পরের পর্বের অপেক্ষায়।

তুলিরেখা এর ছবি

ঠিকই কইছেন। একটা চরম মুহূর্ত আইতাছে বটে! তবে সেইডাই শেষ না। হাসি

আরে আমারও এমুন জায়গায় যাইতে মন চায়-পাহাড় আর সমুদ্র একলগে গলাগলি যেখানে।

পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

তুলিরেখা এর ছবি

বইখাতা,
আপনাকে একটা প্রশ্ন করি যদি কিছু মনে না করেন। "প্রতিলিপি" শেষ হলে "সাংগ্রিলা" র পরের কিস্তি থেকে আবার দিতে থাকলে লোকে পড়বে বলে মনে হয় আপনার? আগেরবার কয়েক কিস্তি দিয়ে দেখেছিলাম বিশেষ কেউ পড়েন না, কমেন্টও কিছু করেন না, তাই বন্ধ করে দিলাম। আপনি সাংগ্রিলা নিয়ে বললেন বলে সাহস করে আপনাকে জিগালাম। ভালো থাকবেন।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

বইখাতা এর ছবি

প্লিজ ! সাংগ্রিলা আবার লিখুন। আমি নিজে তাহলে খুব খুশি হব। 'সাংগ্রিলা'য় মন্তব্য কম থাকলেও লেখাতে হিট কিন্তু খুব একটা কম হয়নি। আর আমার বিচারে 'প্রতিলিপি'র চেয়েও 'সাংগ্রিলা' ভালো হচ্ছিল - সব দিক দিয়েই। পুরোনো কিস্তির লিংকসহ আবার লিখে দেখুন। যদি মনে করেন যে আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছেন না, তাহলে যদি ইচ্ছা করেন তো বন্ধ করে দিতে পারেন (বন্ধ না করলেই খুশি হব কিন্তু হাসি )। তবুও আবার লিখুন।

তুলিরেখা এর ছবি

ভাই বইখাতা,
আপনার অনুরোধ মান্য হলো। দিলাম সাংগ্রিলা পরের পর্ব। কিন্তু রেসপন্স দেখে মনে হচ্ছে আরেকটু চিন্তা করে দেখলে হতো দেবার আগে।
ভালো থাকবেন।
-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

-----------------------------------------------
কোনো এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।