আমাদের এই ভাষা

ঈয়াসীন এর ছবি
লিখেছেন ঈয়াসীন [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ১৭/০২/২০১৫ - ৪:৩৩পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

কয়েকটি ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। ফিনল্যান্ডে আসবার কিছুদিন পর ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। লিখিত পরীক্ষা শেষে ধোঁয়া ওঠা গরম এক কাপ কফি নিয়ে এসে বসে অপেক্ষা করছিলাম। খানিক বাদেই মৌখিক পরীক্ষার ডাক পড়ার কথা। আমার আশপাশে আরো কয়েকজন অপেক্ষায় ছিল, বেশীর ভাগই বাইরের দেশ থেকে আসা। তন্মধ্যে চীনাই বেশী। এক স্বাস্থ্যবান শ্যামলা বর্ণের ছেলে এসে ইংরেজিতে আমাকে জিজ্ঞেস করলো- আর ইউ ফ্রম ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ অর পাকিস্তান? খুব সংক্ষেপে উত্তর দিলাম। ফিরতি প্রশ্ন করবার আগেই সে উর্দুতে যা বললো তার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- ‘তো ভাইজান আসো আমরা নিজেদের ভাষাতেই কথা বলি, আমি পাকিস্তানি’; আমার হাতে কফি থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছে, অতিরিক্ত রেগে গেলে আমার শরীর কাঁপতে থাকে, কান দুটো বড্ড গরম হয়ে ওঠে। কফিটুকু তার চেহারায় ছুড়ে মারতে পারলে কানের তাপ আর শরীরের কাঁপন দুটোই কমতো। অবস্থা, পরিবেশ বিচারে তা করতে পারিনি। প্রবল ইচ্ছে থাকলেও এসব ক্ষেত্রে এমনটা ঠিক করা হয়ে ওঠে না।

বৌ একদিন হঠাৎ করে রসগোল্লা খেতে চাইলো। আমার বাসা হেলসিঙ্কি শহর থেকে কিছুটা বাইরে। আশপাশে সর্বসাকুল্যে একটি এশিয়ান গ্রোসারি শপ; সেটি আবার পাকিস্তানি মালিকাধীন। সন্ধ্যে গড়িয়ে গিয়েছিল তাই হেলসিঙ্কি পর্যন্ত যাবার উদ্যম ছিল না। অগত্যা বাড়ীর কাছে সেই পাকিস্তানি দোকানেই গেলাম, এর আগে কখনও যাওয়া হয়নি। ক্যাশের পাশে বসে তিন চারটি ছোকরা গালগপ্প করছিল। ফিনিশ ভাষাতেই জিজ্ঞেস করলাম টিনজাত তৈরি মিষ্টি আছে কিনা। কর্মরত ছেলেটির চোখে রাজ্যের বিস্ময়। মনে হল ফিনিশ ভাষাটা এখনও রপ্ত করতে পারেনি। দোষ নেই, বড্ড খটখটে আর ত্যাঁদড় ধাঁচের ভাষা। এরপর ইংরেজিতেই জিজ্ঞেস করলাম। কি জানি কি হল, ছোকরার বিস্ময়ে জাগ্রত উত্থিত ভ্রু যুগল কপালের সীমানা ছাড়িয়ে প্রায় ছাঁদ ছোঁয় ছোঁয় অবস্থা। মনে হল যেন জোনাকি সিনেমা হলের পাশের কোনো টং দোকানির কাছে গ্রীক ভাষায় এক খিলি পান চেয়েছি। বিস্ময় টিস্ময় ঝেড়ে চোস্ত উর্দুতে সে আমাকে শেল্ফে মিষ্টির টিনগুলো দেখিয়ে দিয়ে বললো- ফিনিশ আর ইংরেজি বলার মধ্যে বাহাদুরির কিছু নেই। আমি তাকে জানালাম আমি কোন দেশ থেকে আগত, প্রত্যুত্তরে সে জানালো যে সে জানে আমি বাংলাদেশী আর সে কারনেই উর্দু বলিনি বলেই তার এত বিস্ময়। সে রাতে বৌয়ের মিষ্টি খাওয়া হল না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ী ফিরলাম।

আমার নিজের ক্লাসে কোনো পাকিস্তানী ছিল না। ছাত্রাবাসের যে ফ্ল্যাটটিতে থাকতাম সেখানে চারটি ঘর, একটি রান্নাঘর আর গোসলখানা চারজনকে ভাগাভাগি করে নিতে হয়। বাকী তিন ঘরের একটিতে ছিল সুদান থেকে আগত গাসিম, আর বাকী দুই ঘরে দুই পাকিস্তানী- বাবর আর সাকিব। প্রথম দিনই আমাদের মাঝে সমঝোতা হয়ে যায় যে আমাদের বাক্যবিনিময়ের ভাষা হবে ইংরেজী। ওরা আপত্তি করেনি। আমার তখন খেলতে গিয়ে পা ভেঙ্গে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল। সে সময়টায় বাবর, সাকিব আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে, তার জন্যে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। হাসপাতালের অখাদ্য মুখে রচতো না, সাকিব ঘর থেকে আমার জন্যে খাবার নিয়ে আসতো, সারাদিন আমার বিছানার পাশে বসে থাকতো। সে নিজে থেকেও কখনও উর্দুতে কথা বলেনি। কিন্তু কোনো এক কোর্সে গিয়ে আরেক পাকিস্তানীর কবলে পড়লাম। প্রথম দেখাতেই সোজা সাপটা উর্দুতে বললো- ‘তুমি বাঙ্গালী না? খুব ভাল হল নিজের ভাষায় কথা বলার একজন পেলাম’। আমি বললাম দুঃখিত আমি তোমার কথা কিছু বুঝিনি আর তোমার ভাষা আমি বলতে পারিনা। সে যে কি পরিমানে অবাক হয়েছিল তা বোঝানো কষ্টকর। সে জানালো এই স্কুলে অন্তত আরো চারজন বাঙ্গালী পড়ে এবং তাদের সবাই খুব ভাল উর্দু বলে।

আমি জানি, এখানকার বেশীর ভাগ বাঙ্গালীই ভারতীয় আর পাকিস্তানীদের সাথে গদগদ হয়ে হিন্দি অথবা উর্দুতে কথা বলে। স্কুলের ঐ ছাত্র কিংবা মিষ্টির দোকানির বিস্ময়ের অন্যতম কারণটিও মনে হয় এইটি; কেননা অন্য সব বাঙ্গালীদের সাথে কথা বলবার সময় তাদের বোধহয় ফিনিশ কিংবা ইংরেজী ব্যবহার করতে হয় না। এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাটি বলি, এখানে প্রতিবছর গ্রীষ্মে ক্রিকেট লীগ হয়। একদম পুরাদস্তুর ক্রিকেট। আইসিসি মনোনীত। এখানকার প্রায় কুড়িটি দলের বেশীর ভাগ খেলোয়াড়ই পাকিস্তানী। প্রায় প্রতিটি দলেই তাদের আধিক্য। আমাদের বাঙ্গালীদেরও একটি দল আছে এবং দলের সবাই বাঙ্গালী। আমার এই কথাটি উল্লেখ করতে প্রতিবার বিবমিষার উদ্রেক হয়, প্রচণ্ড ঘৃণার উদ্রেক হয়- আমাদের দলের অন্য প্রতিটি খেলোয়াড় পাকিস্তানীদের সাথে খেলার মাঠে উর্দুতে কথা বলে। নিজেকে তখন খুব অপাংক্তেয় মনে হয়। আমি কি সত্যিই এদের একজন? পাকিস্তানীরা প্রথম দেখাতেই আত্মবিশ্বাসের সাথে যে উর্দু বলে কিংবা বলতে চায় তার জন্যে এরা কি কম দায়ী? আহ্বানরত অবারিত পশ্চাৎদেশ সম্মুখে পেলে শিশ্নোদরপরায়ণগণ শিশ্ন লুকিয়ে আড়ালে পালাবে না।

কী পরিমান ত্যাগ, কী পরিমান সংকল্প, কী অদম্য সাহস, কী বিপুল বীরত্বগাঁথা নিহিত আছে আমাদের এই ভাষায়! রাজনৈতিক নেতারা আন্দোলনের ডাক দিয়েও নির্বাচন পিছিয়ে যাবার ভয়ে তা থেকে পিছিয়ে এলো। যাদের মাঝে ভাসানীও ছিলেন। ওইসব হাই প্রোফাইল নেতাদের বিবেচনায় হরতাল প্রত্যাহার করা হল। কিন্তু না, আমাদের অকুতোভয় ছাত্রেরা পিছিয়ে গেল না। গভীর রাতে ঢাকা হলের পাশের পুকুর পাড়ে নেয়া সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে পাকিস্তান সরকারের সেই হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুললো, প্রাণ দিল। নিজের ভাষায় কথা বলার জন্যে জীবন দেয়া যায়! ভাবতেই শরীর অবশ হয়ে আসে। আপনি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সাথে তার ভাষায় পারলে কথা বলেন, আপত্তি দূরে থাক, সে বরং প্রশংসারই দাবীদার। কিন্তু যখনি কোনো পাকিস্তানীর সাথে উর্দুতে কথা বলবেন সেই মুহূর্তে আপনার সাথে বরাহের পার্থক্য ঘুচে যায়, ঘুচে যাবে।


মন্তব্য

এক লহমা এর ছবি

"আপনি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সাথে তার ভাষায় পারলে কথা বলেন, আপত্তি দূরে থাক, সে বরং প্রশংসারই দাবীদার। কিন্তু যখনি কোনো পাকিস্তানীর সাথে উর্দুতে কথা বলবেন সেই মুহূর্তে আপনার সাথে বরাহের পার্থক্য ঘুচে যায়, ঘুচে যাবে।" চলুক

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

আপনি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সাথে তার ভাষায় পারলে কথা বলেন, আপত্তি দূরে থাক, সে বরং প্রশংসারই দাবীদার। কিন্তু যখনি কোনো পাকিস্তানীর সাথে উর্দুতে কথা বলবেন সেই মুহূর্তে আপনার সাথে বরাহের পার্থক্য ঘুচে যায়, ঘুচে যাবে।

ভাল লাগলো আপনার প্রত্যয়।

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

আয়নামতি এর ছবি

আসলে আমরা বাঙ্গালিরা তো ওদের চাপিয়ে দেয়া ভাষা না নিয়ে মায়ের ভাষাকেই আপন করেছি।
এই হতাশা ওরা ভুলতেই পারে না, যেকারণে আমাদের দেখলেই হুক্কা হু করে ওঠে।
ওরা ওদের ব্যর্থতাটা ভুলেনি, অথচ আমরা আমাদের অর্জনটা ভুলে যাবো এটা কেমন অবাক করার মত ব্যাপার লাগে!!!
এটা'র ফিনিশিয় আর ইংরেজি করে ওদের শোনাবার ব্যবস্হা করেন।

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

চলুক

এটাও শোনাতে পারেন চাল্লু

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

ঈয়াসীন এর ছবি

চলুক

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনার মতো করে সবাই যদি ভাবতে পারত, তাহলে আপনারই মতো অন্য কাউকে উর্দু না বলার সংকল্প করে বিপাকে পড়তে হতো না। আমরা জাতি হিসেবে কি খুব বিস্মৃতিপরায়ণ? আপনি এমনই থাকুন-পৃথিবীর আর সব ভাষায় কথা বলুন, উর্দুতে কখনও নয়............ হাসি

দেবদ্যুতি

অতিথি লেখক এর ছবি

কী পরিমান ত্যাগ, কী পরিমান সংকল্প, কী অদম্য সাহস, কী বিপুল বীরত্বগাঁথা নিহিত আছে আমাদের এই ভাষায়! রাজনৈতিক নেতারা আন্দোলনের ডাক দিয়েও নির্বাচন পিছিয়ে যাবার ভয়ে তা থেকে পিছিয়ে এলো। যাদের মাঝে ভাসানীও ছিলেন। ওইসব হাই প্রোফাইল নেতাদের বিবেচনায় হরতাল প্রত্যাহার করা হল। কিন্তু না, আমাদের অকুতোভয় ছাত্রেরা পিছিয়ে গেল না। গভীর রাতে ঢাকা হলের পাশের পুকুর পাড়ে নেয়া সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে পাকিস্তান সরকারের সেই হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুললো, প্রাণ দিল। নিজের ভাষায় কথা বলার জন্যে জীবন দেয়া যায়! ভাবতেই শরীর অবশ হয়ে আসে। আপনি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সাথে তার ভাষায় পারলে কথা বলেন, আপত্তি দূরে থাক, সে বরং প্রশংসারই দাবীদার। কিন্তু যখনি কোনো পাকিস্তানীর সাথে উর্দুতে কথা বলবেন সেই মুহূর্তে আপনার সাথে বরাহের পার্থক্য ঘুচে যায়, ঘুচে যাবে।

ভালো লাগল আপনার কথাগুলো চলুক

মহাবিশ্বের পরিব্রাজক

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আপনার বলা ঘটনাগুলোর অনুরূপ আরো অগণিত গল্প আমাদের দেখা/জানা/শোনা। পাকিস্তানী দেখলে আহ্লাদে গদগদ হয়ে যাওয়া বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর উপস্থিতি স্বীকার করলেও আমার মনে হয় সমস্যাটা উর্দ্দু নিয়ে নয়। একটু লক্ষ করলে দেখবেন, এই গল্পগুলোর মধ্যে 'পাকিস্তানী' স্থলে 'ভারতীয়' আর 'উর্দ্দু'র স্থলে 'হিন্দী' বসিয়ে দিলেও গল্পগুলো ঠিক থাকবে। আরো ভালো করে লক্ষ করলে দেখবেন যে কোন বিদেশী দেখলেই আমরা আহ্লাদে লেজ নাড়তে থাকি। সমস্যাটা শুধু বাংলাদেশীদের মধ্যে না, ভারতীয় বাঙালীদের মধ্যেও দেখেছি (তবে অপেক্ষাকৃত কম)। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর বিপক্ষে বাঙালীদের লড়াইয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাস আমাদের জানা। তো অমন লড়াইকরা আত্মমর্যাদাবান জাতির আচরণে এহেন বৈপরীত্য বোধগম্য হয় না।

পুনশ্চঃ এই মেরুদণ্ডহীনতা নিয়ে ব্লগে পোস্ট লিখে, পোস্টে মন্তব্য করে, ফেসবুকে লিখে এতবার বলেছি যে এখন এই বিষয়টা দেখলে একই সাথে বিরক্তি আর তীব্র ক্রোধ চেপে ধরে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ওডিন এর ছবি

অমন লড়াইকরা আত্মমর্যাদাবান জাতির আচরণে এহেন বৈপরীত্য বোধগম্য হয় না।

এই জিনিসটা ভেবে আমি কোন কূলকিনারা পাই না মন খারাপ

অতিথি লেখক এর ছবি

ইউনিভার্সিটি ডরমিটরিতে আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকতো এক ভারতীয় ছাত্রী। তার জন্ম কেরালায়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া চেন্নাইতে, এবং সোজা পিএইচডি করতে এসেছে আমেরিকায়। দক্ষিণ ভারতের বাইরে এটাই ছিল তার প্রথম প্রবাস। তো সেই ছাত্রী মালয়ালম, তামিল, আর ইংরেজি ছাড়া আর কোন ভাষা জানত না (অথবা বলত না)। তার ফ্ল্যাটমেট ছিল বাংলাদেশের এক ছাত্রী। ভারতীয় ফ্ল্যাটমেট পেয়ে বাংলাদেশের সেই ছাত্রী হিন্দি বলা শুরু করেছিল; এবং ভারতের একজন নাগরিক হিন্দি জানে না (বা বলে না), এটা আবিষ্কার করে সে যতটা না বিব্রত, তার চেয়ে বেশী আশ্চর্য হয়েছিল।

Emran

মেঘলা মানুষ এর ছবি

এরকম ঘটনা বাঁধাই করে ঢাকা বিমানবন্দরে ঝুলিয়ে রাখা উচিত

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

মিজান, পিষে ফ্যালো

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনার অনুভূতি ,চেতনা, আবেগ ও মূল্যবোধ হ্রদয়কে আচ্ছন্ন করল ।এতদূরে বসে ভাষাকে বুকের গভীরে লালন করছেন এটা ভাষা অন্দোলনের বিশাল প্রাপ্তি ও বটে । বিদেশে অবস্থানকারী বালাদেশীরা হলেন দেশের পক্ষের একেক জন রাষ্টদূত, একথাটি মনে রাখা জরুরী ।চমৎকার উপস্থাপনা ।

হিমু এর ছবি

আমাদের দেশের "শিক্ষিত" মানুষেরা নানারকম হীনমন্যতা সম্বল করে বিদেশে যান। বিদেশে গিয়ে তাদের অনেকের মধ্যেই এই হীনমন্যতা আরো প্রবল হয়। আমাদের দেশটা কতো খারাপ, সেটা তারা তাদের বিদেশী বন্ধুদের বোঝানোর জন্য বেয়াকুল হয়ে পড়েন। পাকিদের সঙ্গে উর্দু বা ভারতীয়দের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলার জন্যে তাদের এই বেয়াকুলপনা সেই হীনমন্যতার প্রকাশ মাত্র। এতে করে তারা নিজেদের আরেকটু বেশি "আন্তর্জাতিক মানের" ভেবে সুখ পান।

কেউ সেধে সেধে উর্দু বা হিন্দিতে কথা বলতে এলে অম্লানবদনে বাংলায় উত্তর দিতে থাকুন। লাইনে চলে আসবে।

ঈয়াসীন এর ছবি

চলুক

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

কেউ সেধে সেধে উর্দু বা হিন্দিতে কথা বলতে এলে অম্লানবদনে বাংলায় উত্তর দিতে থাকুন। লাইনে চলে আসবে।

- এটা একটা পরীক্ষীত দাওয়াই। আমি বহুবার ব্যবহার করে ভালো ফল পেয়েছি।

একটা গল্প বলি। একবার এক মেলায় বিনা নোটিশে হাজির হয়েছি। পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় থাকার ঠাঁই ঠিক করা হয়নি। স্থানীয় দালালরা আমাদের মতো মুরগীদেরকে নানা প্রকার 'চিৎ-কাইত' বোর্ডিং দেখিয়ে কনভিন্স করার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতি রাতের ভাড়া তিন অঙ্কে পৌঁছে যাচ্ছে বলে আমরা পালাই পালাই করছি। অবশেষে এক মুরগীর খোঁয়ারে আমার ঠাঁই হলো। একটু পরে আরেক দালাল দুইটা পাইক্যা নিয়ে হাজির তাদেরকে ঐ খোঁয়ারে গছাতে চাইছে। আমাকে দেখে পাইক্যা দুজন ইঞ্জিরিতে জিজ্ঞেস করলো আমি কোথা থেকে এসেছি। আমি বললাম। তারাও তাদের নিবাস জানালো। আমি তাদের ইঞ্জিরিতে জিজ্ঞেস করলাম এই খোঁয়ার তারা ঘুরে দেখেছে কিনা। ধাড়ি পাইক্যাটা এবার বলা শুরু করলো, "দেখা, লেকিন পাসান্দ নেহি হুয়া"। এবার আমি অম্লান বদনে বাংলায় বললাম, "এই মুরগীর খোঁয়ার পছন্দ হবার তো কোন কারণ নেই, কিন্তু আর কোন ঠাঁই না মিললে কী উপায়"! অবস্থা বেগতিক বুঝে কচি পাইক্যাটা এবার বলা শুরু করলো, "Actually Sir you know .......


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

স্যাম এর ছবি

শয়তানী হাসি

মন মাঝি এর ছবি

সে রাতে বৌয়ের মিষ্টি খাওয়া হল না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ী ফিরলাম।

কোন পাকু ছাগলের ছাগলামির জন্য রাগে কাঁপাকাপি করে নিজেকে কষ্ট দেওয়াটা বোকামি। এটা অনেকটা 'চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া'-র মতই। ছাগলের হাম্বা-আ-আ- রবে কি আপনি রাগ করেন? মোদ্দা কথা হল, এসব জিনিষ উপরে হিমু যেমন বলেছেন - "অম্লানবদনে" মোকাবেলা করতে হয়। এবং আরও বাস্তবানুগ ভাবে। উপরে হিমুর বুদ্ধিটা খুব ভাল, স্রেফ বাংলায় কথা চালিয়ে গেলেই দেখবেন সব ছাগলই লাইনে চলে এসেছে - হাম্বা ছেড়ে ইংরেজী বলা শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে আমিও পড়েছি, এবং তখন বাংলা বলার বুদ্ধি না আসলেও অন্যপক্ষের বলা হিন্দি-উর্দুর একদম কিচ্ছুটি না বুঝার ভান করে স্রেফ ইংরেজির বুলডোজার চালিয়ে চালিয়ে দিয়েছি। এতেও কাজ হয়েছে। একদম জোকের মুখে নুনের মত। হাসি

মোদ্দা কথা, প্রেশার ছাগলদের উপ্রেই থাকুক। খামাখা নিজের উপ্রে নিয়েন না।

****************************************

মেঘলা মানুষ এর ছবি

ভারতীয় বা পাপি দেখে গলে গিয়ে ওদের ভাষায় কথা বলার মাহাত্ম‌্য আমি আজও ধরতে পারি নি।

একটা সত‌্যি স্বীকার করি। অল্প বয়স (৮-৯ বছর হবে) ছিল আমার যখন একজন পাকিস্তানি পরিচয়সূত্রে আমাদের বাসায় ছিলেন এক সপ্তাহ। তখন বাসায় ভিসিআরে সিনেমা-টিনেমা দেখার কারণে হিন্দি পারতাম কিছুটা। সেটা দিয়েই তার সাথে কথা বলেছিলাম সেবার (সে হয়ত ভেবেছিল উর্দু)। পরেরবার উনি বাংলাদেশে আসেন যখন তখন আমার বয়স ১৬ -১৭ হবে, পেপার পড়েটড়ে ইতিহাস জেনে গিয়েছি ততদিনে। এবার আমি আর ইংরেজি ছাড়া কথা বলিনি। তার চোখে তখন বিস্ময়, "আরে তুমি তো আগে উর্দু পারতা, ভুলে গেলা কিভাবে?"

আমি আশায় থাকি আমদের দেশের যারা আজ হিন্দি বা উর্দুতে কথা বলছেন, তারা একসময় আমার মত নিজের ভুলটা বুঝতে পারবেন, নিজের ভাষাটা চিনতে পারবেন। ৮-৯ বছর বয়সটা হয়ত আমার বোঝার জন্য যথেষ্ট ছিল না। আপনারা তো বয়সে অনেক বড় তার চেয়ে!

শুভেচ্ছা হাসি

ঈয়াসীন এর ছবি

চলুক , একটি স্মৃতি আমারও আছে। আমাদের এক আত্মীয় ছিল পাকিস্তানে। তার ছেলে আমাদের বয়েসীই। আমার তখন ৮ কি ১০ বছর বয়েস। আমরা এক সাথে রাস্তার পাশে লাটিম ঘুরাচ্ছিলাম, একটি কুকুর যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। সে জিজ্ঞেস করেছিল- ইয়ে তেরা কুত্তে হ্যায়? আমার মামাতো ভাই শিমু ছিল সেখানে। সে বলেছিল- নেহি নেহি ইয়ে সোজা কুত্তে হ্যায়।

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

রোমেল চৌধুরী এর ছবি

লেখাটির বুকে প্রত্যয়ের অনলেপনীয় ছাপ জ্বলজ্বল করছে।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।

অতিথি লেখক এর ছবি

অসাধারণ লাগলো।

স্বয়ম

অতিথি লেখক এর ছবি

"কিন্তু যখনি কোনো পাকিস্তানীর সাথে উর্দুতে কথা বলবেন সেই মুহূর্তে আপনার সাথে বরাহের পার্থক্য ঘুচে যায়, ঘুচে যাবে।"
এক্কেবারে খাটি বরাহের বাচ্চা ঐই পাকি গুলা।

------------
রাধাকান্ত

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।