শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবসে স্মৃতিচারণ এবং কিছু ভাবনা

ইয়ামেন এর ছবি
লিখেছেন ইয়ামেন [অতিথি] (তারিখ: সোম, ১৪/১২/২০১৫ - ৪:৫৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

উপরের ছবিটা ১৯৯০ সালের ১৪ই ডিসেম্বরের। আমার বয়স তখন আট কি নয়। দেশ তখন মাত্র এরশাদের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। বয়স কম হলেও চোখের সামনে একটা নতুন ইতিহাসের সূচনা হতে দেখেছি, তাই অনেক কিছু না বুঝলেও গম্ভির মেজাজে প্রতিদিন খবরের কাগজ নিয়ে বসাটা একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার জন্য। বাসায় বাংলা খবরের কাগজ বলতে দৈনিক বাংলা এবং দৈনিক ইত্তেফাক দুটিই রাখা হতো। যাই হোক, শীতের ছুটি শুরু হয়ে গেছে, সকালে নাস্তার টেবিলে আব্বার সাথে বসেছি, আমি যথারীতি খবরের কাগজ খুললাম। দৈনিক বাংলার পিছনের পৃষ্ঠায় একটি ছবির কলাজ আর শিরোনামে চোখ আটকে গেলঃ 'আমরা তাঁদের স্মরণ করি'।

ছবির মানুষগুলোকে দেখে খবরটা পড়ার আগেই মন কেমন খারাপ হয়ে গেল। এরপর খবরটা পড়ে যে কিরকম বিষণ্ণ লাগলো তা বলার মত নয়। নয় বছরের আমি ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের কথা জানি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি কোনটার সংজ্ঞা কি বুঝতে শিখেছি। সেকালে ৭ই মার্চ নিয়ে গণমাধ্যমে কোন উচ্চবাচ্য না হলেও বাবা মা নানীর মুখ থেকে শুনেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামের এক কিংবদন্তীর নেতার কথা। কিন্তু একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে কিছুই জানতাম না এই খবরটা পড়ার আগে।
তখনও পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ আমার কাছে ছিল কিছুটা সিনেমায় দেখা যুদ্ধ বা মারপিটের মত। মুক্তিযোদ্ধারা ছিল নায়ক/নায়িকার দল, তারা সব মিলে ভিলেনের দল হানাদার বাহিনীর (তখন তো আর পাকিস্তানের নাম খুব বেশী মুখে আনা হতো না, হানাদার বাহিনী বলে সম্বোধন করাই ছিল স্বাভাবিক!) সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে ফেলেছে, ব্যাস। কিন্তু এই ছবির কলাজে কাউকেই তো সেরকম যোদ্ধার মত মনে হলো না। এনাদেরকে এভাবে তুলে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলার কি মানে থাকতে পারে?

আমার মনে আছে খবরটা পড়া শেষ করে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আব্বু, এভাবে এদেরকে মেরে ফেলল? কিন্তু এরা তো যুদ্ধ করতো না আব্বু, তাহলে এদেরকে কেন মেরে ফেলল?' বাবার উত্তর ছিল কিছুটা এরকম, 'এনারা দেশের সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানীগুণী মানুষদের মধ্যে ছিলেন, এনারা যুদ্ধে না গিয়ে থাকলেও মনেপ্রানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইতেন। সেজন্য যেভাবে পারতেন সাহায্য করারও চেষ্টা করতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। পাকিস্তান এনাদের এভাবে মেরে ফেলেছিল কারন তারা চাচ্ছিল যাতে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও একটা মূর্খ জাতি হিসেবে থেকে যায়। যাতে জাতিগতভাবে আমাদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ অন্তত কয়েক দশক পিছিয়ে দেয়া যেতে পারে।'

বাবা অফিস চলে গেল তার কিছুক্ষন পর। কিন্তু আমি তখনও স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম খাওয়ার টেবিলেই। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। মনে চিন্তা আসলো, আমার বাবাও তো বুয়েটের শিক্ষক, এখন যদি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় হত, আমার বাবাকেও কি এভাবে ধরে নিয়ে যেত? সেদিন রাতে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিটিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছিল, সেই অনুষ্ঠান অধীর আগ্রহ নিয়ে দেখেছিলাম। কিছু ছবি দেখিয়েছিল রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে হাত চোখ বাঁধা লাশ পরে আছে। আমরা তখন থাকতাম লালমাটিয়ার ই ব্লকে, সাতমসজিদ রোডের ধারে। রায়েরবাজার ছিল ঠিক রাস্তার ওপারেই, আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে দেখা যেত সেই নদীর তীর। বাসার এত কাছেই যে সেই বধ্যভূমি, সেটা বুঝতে পেরে ভয়ে শিউরে উঠেছিলাম। কিছু শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তানদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছিল, সেরাতে প্রথম জানতে পারি প্রিয় অভিনেত্রী শমি কায়সার এখন শহীদ সন্তান, তার পিতাই শহিদুল্লাহ কায়সার (তাঁর নাম ইতিমধ্যে জানতাম কারন সেসময় সংশপ্তক ধারাবাহিক নাটক হিসেবে ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল)। মনে আছে সেরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে বারবার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল আমার। একটা স্বপ্ন এখনও বারবার তাড়া করে চলে আমায়ঃ রায়েরবাজারের বধ্যভূমি থেকে উঠে বসেছে অজস্র লাশ, চোখ বাঁধা, শরীর বুলেটে জর্জরিত, হাত বাড়িয়ে আছে আমাদের বাসার দিকে মুখ করে, আকাশে বাতাসে ভাসছে বুকফাটা হাহাকার...

এর পর কেটে গেছে দুই যুগেরও বেশী। মাঝে অনেক কিছুই দেখলাম। স্বাধীনতাবিরোধী দালাল আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি হতে দেখলাম, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জনতার আদালত দেখলাম, সেই আদালত গঠন করার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী তোলার 'ধৃষ্টতার' জন্য শহীদ জননীকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ মাথায় নিয়ে আমেরিকাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখলাম, বাংলাদেশের মাটিতে ক্রিকেট ম্যাচে 'মেরি মি আফ্রিদি' পোস্টার হাতে জনৈক মেয়ের নির্লজ্জ খেমটা নাচ দেখলাম (এসব , মতিউর রহমান নিজামি আর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মত রাজাকারদের বাংলাদেশের মন্ত্রী হয়ে পতাকাবাহী গাড়িতে করে ঘুরতে দেখলাম, সেই মুজাহিদকে দম্ভের সাথে 'দেশে কোন রাজাকার নাই' বলতে শুনলাম, শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ফাঁসির দাবীতে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ দেখলাম, এবং শত বাঁধাবিপত্তি এবং প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার করা অঙ্গীকার মত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে দেখলাম, কাদের মোল্লা থেকে শুরু করে কামারুজ্জামান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হতে দেখলাম। চার শীর্ষস্থানীয় রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড হওয়া পর এই প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমার ব্যক্তিগত বিষণ্ণতা বোধহয় আগের থেকে একটু কম হবে।

কিন্তু আমাদের এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া বাকি। সামনের বছরের শুরুতেই মতিউর রহমান নিজামির রিভিউ পিটিশনের রায় বের হবে। এর পর ক্রমানুসারে আছে এ টি এম আজহার, মীর কাশেম, প্রমুখের আপীলের রায়। এ ছাড়া বিদেশে অবস্থানরত আছে দুই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী, আশরাফুজ্জামান খান আর চৌধুরী মুইনুদ্দীন আহমেদ। যারা দুজনেই বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল এবং দুজনেই যথাক্রমে আমেরিকা আর ইংল্যান্ডে বহাল তবিয়তে সমাজ শিখরে প্রভাবশালী মুসলিম নেতা হয়ে বসে আছে। তাদেরকে ফিরিয়ে এনে ফাঁসিতে না ঝুলানো পর্যন্তও আমার দুঃস্বপ্ন সম্পূর্ণ পিছু ছাড়বে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশে ১৪ই ডিসেম্বর হয়ে গেছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন শুরু হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ সময় রাত বারোটা এক মিনিট থেকে। সুদূর প্রবাস থেকে বাংলাদেশের সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীকে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। হে সূর্যসন্তানেরা, তোমাদের শুন্যতা প্রতিবার অনুভব করি যখন দেখি আজ দেশে 'সুশীল/বুদ্ধিজীবী সমাজ' বলতে কাকে বোঝায়। আমরা তোমাদের ভুলবো না। জয় বাংলা।

খবরের কাগজের আর্কাইভের জন্য কৃতজ্ঞতায়ঃ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম (ICSF), সেন্টার ফর বাংলাদেশ জেনোসাইড রিসার্চ (CBGR), ওমর শেহাব।


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

বুদ্ধিজীবি হত্যা শুরু হয়েছিল ১৪ ডিসেম্বরের আরও আগে, এবং সারা দেশ জুড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সাথে একদল বাঙালীকে আইয়ুব খানের আমল থেকেই গুপ্তহত্যার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে তারা তাদের নৃশংস দক্ষতা প্রদর্শন করে। এবং বুদ্ধিজীবি হত্যা এখনো বন্ধ হয়নি। পাকিস্তানী আমলের গুপ্তঘাতকরা এখন কেউ বৃদ্ধ বা কেউ পরপারে গেছে, কিন্তু সত্তরের দশক থেকেই তারা নতুন নতুন দলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ফলে একজন প্রশিক্ষিত ডাক্তারের অপারেশন টেবিলে রোগীর হাতের পায়ের রগ খুঁজে পেতে সময় লাগলেও ভিকটিমের হাতেপায়ের রগ কেটে ফেলতে ঘাতক দলের এক মুহূর্তও সময় লাগে না। তারা জানে কোথায় একটা আঘাত করলেই মৃত্যু নিশ্চিত হবে। তারা জানে কাকে হত্যা করলে শিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন, দর্শন, বুদ্ধিমুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি'র অগ্রযাত্রাকে বার বার পিছিয়ে দেয়া যাবে, মন্দিভূত করা যাবে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অনেকগুলো বিষয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে ইউনিক - তার কিছু গর্বের, কিছু ক্ষোভের ক্রোধের। বুদ্ধিজীবি হত্যার ব্যাপারটাও ইউনিক। আর কোন দেশের ইতিহাসে এমনটা ঘটেছে বলে শুনিনি।

অতিথি লেখক এর ছবি

উত্তর-পূর্ব ভারতের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সাথে একদল বাঙালীকে আইয়ুব খানের আমল থেকেই গুপ্তহত্যার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল।

- এ তথ্যের রেফারেন্স দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

রিপন

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

হে সূর্যসন্তানেরা, তোমাদের শুন্যতা প্রতিবার অনুভব করি যখন দেখি আজ দেশে 'সুশীল/বুদ্ধিজীবী সমাজ' বলতে কাকে বোঝায়।

চলুক

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

এক লহমা এর ছবি

চলুক

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA