| ‹ পুরোনো ব্লগ | সব ব্লগ | নতুন ব্লগ › |
১.১ নিশি
ডিমের ভাঙা কুসুমের মতো রং আজ সকালের। কতোদিন পর সূর্য উঠলো। যেন কোনোদিন সাক্ষাৎ হয়নি, এমন অপরিচিত লাগে। হিয়ার কামস দ্য সান! করমর্দন করে তাকে স্বাগত জানানো যেতে পারে, হাউ ডু ইউ ডু? পরিষ্কার নীল শরৎকালের আকাশ, চারপাশের গাছপালাগুলো ভেজা গায়ে রোদ খাচ্ছে। বৃষ্টির পর প্রথম রোদে চারদিক এমন নিষ্কলুষ দেখায়। যেন এইসব এই পৃথিবীর নয়। সম্পূর্ণ একটি গোসলের পরে সারা শরীরে যেমন পরিচ্ছন্নতার রেশ ছড়িয়ে পড়ে।
কয়েকদিন টানা বৃষ্টি গেছে। আকাশ ছিলো গাঢ় ধূসর বর্ণের, বৃষ্টি থামেনি এক মুহূর্তের জন্যে। ইলশেগুঁড়ি, টাপুর-টুপুর, ঝিরিঝিরি, ঝমঝম ও ঝমাঝম – বাংলা বইয়ে যতো আছে, পালা করে সবরকম বৃষ্টি হলো এই ক'দিন। কীভাবে কে জানে, মেঘলা আকাশ মন খারাপের উপলক্ষ তৈরি করে দেয়। বৃষ্টি আমার এমনিতে খারাপ লাগে না, সব মৌসুমেই দিনে এক-আধ পশলা হলে ভালোই হয়। গভীর রাতের বৃষ্টি আমার সবচেয়ে প্রিয়, বাইরে বৃষ্টির শব্দ ছাড়া তখন আর কোনো শব্দ নেই। আমার নিশীথরাতের বাদলধারা। ঘুম ভেঙে কী যেন কী মনে হয়। ভুলে যাওয়া কোনো কথা মনে আসতে চায়, তবু আসে না। বুকের ভেতরে কী এক অনুভব উঠে আসে, নিষ্কৃতি চায়। অল্প অল্প বেদনা ও বিষাদের ছায়া-অনুভব। এমন দুঃখ-দুঃখ সুখ আর কিছুতে নেই।
আমার ভালো লাগবে বলেই সব রাতে বৃষ্টি হবে, তা তো হয় না। দিনে এক-আধবার, তা-ও না। গত ক'দিনের মতো এরকম টানা বর্ষণে বিশুদ্ধ মন খারাপ, ভালো লাগার মিশেল একদম নেই।
কাল রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও বাইরে টিপটিপ হচ্ছিলো শুনেছি। আজ জেগে উঠে এই সোনালি আলোর সকাল। আদুরে বেড়ালের বাচ্চার মতো নরম-নরম। এরকম রোদকে হয়তো রোদ্দুর বলা যায়। মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ডিমের ভাঙা কুসুমের কথা মনে এলো কেন জানি না। ডিম আমার দুই চক্ষের বিষ। দেখতে পারি না। ভাঙা ডিমের আস্ত কুসুমটুকু তবু দেখতে তেমন খারাপ লাগে না। কিন্তু ভাঙা কুসুমের হলুদের সঙ্গে স্ববচ্ছ ট্যালটেলে বিবর্ণ অংশটা মিলেমিশে গেলে কী গা ঘিনঘিন! দেখলে বমি আসে। সেই জিনিস খাওয়ার জন্যে মায়ের প্রতিদিনের পীড়াপিড়ি, শরীর-গঠনে ডিমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষণ। এড়ানোর জন্যে নাশতার টেবিলে একটা ছোটোখাটো যুদ্ধ লড়তে হয় আমাকে। বারো বছরের ঋষি কিন্তু দিব্যি তৃপ্তি নিয়ে খায়। আমার ভাগেরটা তার পাতে পাচার করে দিলেও আপত্তি করে না। ছেলে বলেই কি? হতে পারে।
বাবাও ডিম খুব ভালোবাসে, তা সে যে কোনো চেহারা নিয়ে টেবিলে আসুক – অমলেট, পোচ, ঝুরি ঝুরি, এমনকী হালুয়া রূপে হলেও। আজকাল বাবার প্রিয় ডিম তার খাদ্যতালিকা থেকে ছাঁটতে হয়েছে। ডাক্তার বলে দিয়েছে সপ্তাহে একটার বেশি কিছুতেই নয়। হাই কোলেস্টেরলের রোগীদের জন্যে বিষ। আমারও বিষ লাগে, তবু মা শুনবে না। বুঝবেও না। আচ্ছা, মানুষ ডাক্তারের বারণ বুঝতে পারে, কারো ভালো-লাগা মন্দ-লাগা বোঝে না কেন?
কাঁঠালবাগানের ফ্রী স্কুল স্ট্রীটে ছয়তলা এই ভাড়া ফ্ল্যাটবাড়ির দোতলায় আমরা আছি পাঁচ বছর। আমরা চারজন। দুই বেডরুমের ছোটো বাসা, তার একটা বাবা-মা'র। অন্যটায় আমি আর আমার ছয় বছরের ছোটো ঋষি। দুই ভাইবোন দুটি বিছানায়, পড়ার টেবিল ও আলনা ভাগাভাগি হয়। আগে অসুবিধা হতো না। ঘুমানোর সময় দু'জনে অনেকরাত পর্যন্ত বকবক করা যেতো। এখন দু'জনেই বড়ো হয়ে উঠছি, ঘর আলাদা হওয়া দরকার। পড়ার টেবিল পালা করে ব্যবহার করতে অসুবিধা হচ্ছে। আলনায় আমার কিছু পরিধেয় জিনিস এখন ঋষিকে আড়াল করে রাখতে হয়। ঘর আলাদা না হলে আর চলছে না। দেনদরবার করছি। মা বলেছে, হবে। বড়ো বাসায় গেলেই তোকে আলাদা ঘর দেবো।
একই কথা দুই বছর ধরে শুনছি। আরো কতোদিন শুনবো, কে জানে!
ব্যালকনি আছে এরকম একটা ঘর যদি আমার থাকতো! এই বাসায় ছোটো একটা ব্যালকনি আছে, বসার ঘরের সঙ্গে লাগানো। কেউ যায় না, সেখানে স্তূপ করা আছে ঘরে সবসময় লাগে না এইসব জিনিসপত্র। রোদবৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্যে বড়ো একটা পলিথিনে ঢাকা। ঋষির ছোটোবেলার তিন-চাকার সাইকেল পড়ে আছে একলা, পরিত্যক্ত। আর আছে দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা দুটো ফোল্ডিং চেয়ার। এমনিতে ব্যবহার হয় না, বাসায় বেশি লোকজন কখনো এলে চেয়ারগুলো ভেতরে আসার অধিকার পায়। সোফার পাশে পেতে বাড়তি বসার ব্যবস্থা। তা-ও আজকাল আর তেমন হয় না। কয়েক বছর আগেও বাবা ছুটির দিনগুলোতে বাসায় থাকতো, তার বন্ধুবান্ধবদের আনাগোনার শেষ ছিলো না। এখন কেউ আসে কালেভদ্রে। এই বাসায় উঠে আসার পর থেকে আমাদের জীবন অনেক বদলে গেছে। হয়তো বদলে গেছে বলেই আমাদের এখানে আসা।
সকালে নাশতা পর্যন্ত বাবার বাসায় থাকা, নয়টার মধ্যে বেরিয়ে যাওয়া, ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। তখন তার হতক্লান্ত চোখমুখ দেখে ভারি মায়া লাগে। বাবা যখন ফেরে, তার মুখ থাকে বিষণ্ণ ও চিন্তাক্লিষ্ট। এরকম দিন আমাদের ছিলো না, কয়েক বছরে কতোটা বদলে যেতে হলো বাবাকে। এই মানুষ ব্যালকনিতে যায় কখন, যাওয়ার কথা হয়তো মনেও আসে না।
মা বাইরে যাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে, দরকার না পড়লে ব্যালকনিতেও যায় না। পর্দা করার ঝোঁক হয়েছে আজকাল, ধর্মকর্মে মন দিচ্ছে। বাইরে গেলে হেজাব পরে, তখন তাকে খুব অচেনা লাগে। মনে হয় আমার মা নয়, অন্য কাউকে দেখছি। মাকে একসময় টিভিতে নজরুল আর লালনের গান গাইতে দেখেছি। ঋষিও দেখেছে খুব ছোটোবেলায়, ওর হয়তো মনে নেই। তখনকার উঠতি গায়িকা নীলাঞ্জনা সুলতানা কীভাবে যেন নেই হয়ে গেলো। কী সুন্দর সুর উঠতো তার গলায়। নিয়ম করে রেওয়াজে বসতো, এখন যেমন নামাজে বসে। আমি নিজেও মাঝেমধ্যে গলা মেলানোর জন্যে পাশে বসেছি। আমাকে গান শেখানোর শখ ছিলো, কিন্তু তা পূরণ করা আমার হলো না। সারেগামা শিখতেই ধৈর্য ফুরিয়ে যায়। বাক্সবন্দী হারমোনিয়াম পড়ে আছে মার ঘরে খাটের তলায়। গান-বাজনার কথা মা আর মুখে তোলে না, হয়তো শুনতেও চায় না।
একদিন মা নামাজ শেষ করে উঠেছে তখন বললাম, তুমি না আমাকে গান শেখাতে চেয়েছিলে। ছোটোবেলায় ইচ্ছে করেনি, বুঝিওনি ভালো। এখন শেখাবে?
মা খর চোখে কতোক্ষণ তাকিয়ে থেকে বোধহয় আমার মতলব বোঝার চেষ্টা করলো। কী বুঝলো বলা মুশকিল। তারপর আলগা গলায় বললো, তোর বাবাকে বলিস মাস্টার দেখতে।
বাবাকে বলতে হলে আমাকে বলতে হবে। মা বলবে না। তাদের দু'জনের মধ্যে কথা কম হয়, খুব দরকার না পড়লে একদম বন্ধ। চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বাসার ভেতরটা কেমন যেন গুমোট হয়ে থাকে টের পাওয়া যায়। বাবা-মা দু'জনেই বাসায় থাকলে ঋষি আর আমি নিজেদের ঘরের ভেতরে থাকি, গান শুনি। ঋষি টিভি দেখার জন্যে মাঝেমধ্যে বসার ঘরে যায়, আমি যাই না। কখনো-সখনো দু'চারদিন আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়, বাবা-মা দু'জনেই বেশ হাসিখুশি। আমরা দুই ভাইবোনও তখন তাদের সঙ্গে বসে গল্প করি। তখনো আমার ভয় ভয় করতে থাকে, এই বুঝি লেগে গেলো আবার। অনেক বছর ধরে এরকম দেখে আসছি। হয়ও তাই, কোনো ব্যতিক্রম নেই।
সবসময় বোঝা যায় না, বুঝতে চাইও না কী নিয়ে গলা চড়ে যায় তাদের। তারাও হয়তো বোঝে না, বুঝতে চায় না – আমরা দুই ভাইবোন কাছাকাছি আছি, শুনতে না চেয়েও সব শুনতে পাচ্ছি। আমরা তখন নিজেদের অদৃশ্য করতে দিতে পারলে, এই বাসার বাইরে কোথাও পালাতে পারলে বেঁচে যাই। এইসব চিৎকার-হল্লা চলে, যতোক্ষণ না বাবা উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে যায়। মা তখনো একা একা বাতাসের সঙ্গে, হয়তা কল্পনায় বাবাকে সামনে রেখে সরব থাকে। সব বাড়িতে কি এরকম হয়? জানি, হয় না। আমার নিজের জন্যে, ঋষির জন্যে মন খারাপ হয়। আমাদের বাবা-মা এরকম কেন? ভালো লাগে না।
(ক্রমশ)
৩
জুবায়ের ভাই এর লেখা কথা বলতে পারে নিজেই। অন্যদেরটা পড়তে হয়, আপনার লেখা কেমন পর্দা থেকে উঠে বসে নিজেই কথা বলা শুরু করে। নকল করতে হবে...
৫
সুন্দর শুরু। ভাল লাগছে, ভাল লাগবেও। শুভকামনা...!
**********************************
যাহা বলিব সত্য বলিব
৭
এরকম একটু একটু পড়বোনা।
পুরোটা শেষ হলে একেবারে পড়বো।
কারণ নিশ্চিত জানি খুব ভালো কিছু পড়া হবে
৯
পড়া শুরু করলাম। জানি ভাল জিনিসই পাবো।
_____________________________
যতদূর গেলে পলায়ন হয়, ততদূর কেউ আর পারেনা যেতে।
১৩
আমিও হাত তুললাম। পড়ছি...
=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=-=
LoVe is like heaven but it hurts like HeLL
১৫
উপ হোক আর অপই হোক,নাশই হোক কিংবা ন্যাসই হোক-শুরু তো হলো ।
অভিনন্দন ।
xxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxxx
...অথবা সময় ছিলো;আমারই অস্তিত্ব ছিলোনা
১৭
বাহ জুবায়ের ভাইয়ের আরেকটা উপন্যাসের শুরু, নিয়মিত পড়ার চমৎকার একটা কিছু পাওয়া গেলো।
শুরুতেই ভালো লাগা শুরু হয়েছে, সাধারণ ঘটনার কি চমৎকার প্রাণবন্ত বর্ণনা।
----------------------------------------------------
আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ
১৯
আমিও পুরোটা একসাথে পড়বো - অবশ্য মন্তব্য আগেই করে ফেললেও অসুবিধে নেই ------- ভালো তো হবেই
২১
- এইখানে হামকো কমেন্টকো কিসনে খিলায়া? ![]()
মানে হলোঃ আমার এইখানে দেওয়া মন্তব্য খাইলো ক্যাডা? ![]()
_________________________________
<সযতনে বেখেয়াল>
২৩
চমৎকার শুরু। এক নিঃশ্বাসে পড়া গেলো।
২৫
শুভলক্ষণ ....জুবায়ের ভাইর আরেকটা ক্লাসিক হতে যাচ্ছে
========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে
২৭
অফলাইনে পড়েছি। কিন্তু কমেন্ট করতে সাহস পাচ্ছি না। কারণ আমি জুবায়ের ভাইয়ের গত উপন্যাসে কমেন্ট খেলাপী হয়ে আছি। ঋণ খেলাপীর মতো পালিয়ে বেড়াই। (আমি কে? - তা কি জুবায়ের ভাই ধরতে পেরেছেন?)
গত বারের অনাদায়ী মওকুফ করা হলে, স্বনামে এসে কমেন্ট করতে পারি। এ ব্যাপারে জুবায়ের ভাইয়ের সদয় অনুমতি প্রার্থনা করছি।
২৮
চিনবো না? খুব চিনি। তবে খেলাপী হিসেবে জনসমক্ষে নাম-পরিচয় করা হলো না। ![]()
আগের অনাদায়ী সুদ মওকুফ করা হলো, আসলটা স্থগিত রাখা যেতে পারে। সবটা মাফ করে দিলে আমি পথে বসে যাবো তো! ![]()
এখন উদিত হও। নাকি ফুল হয়ে ফুটে উঠবে?
২৯
জুবায়ের ভাই অবশ্যই উদার এবং কমেন্ট-মওকুফকারী। ![]()
খুব ভালো লাগছে, আরেকটি উপন্যাস ব্লগে আমরা পাচ্ছি। বাংলা ব্লগে সম্ভবতঃ জুবায়ের ভাইয়ের লেখা 'পৌরুষ' - প্রথম পরিপূর্ণ উপন্যাস। ব্যাপক পাঠক প্রিয় সে উপন্যাসের নিয়মিত পাঠক ছিলাম, ভেবে - আমার নিজের কাছে ভালো লাগে।
সাথে আছি, নিয়মিত।
ধন্যবাদ।
৩০
সঙ্গী-সাথী কেউ আছে জানলে ভরসা পাই।
'পৌরুষ' লেখাটা এখানে তুলে আনবো কি না ভাবছিলাম। সাহস পাচ্ছি না। ![]()
৩১
এখানে আমি একটা প্রস্তাব করতে পারি -
যেহেতু পিডিএফ করা আছে, তাই - একটা পোস্টে শিরোনাম 'পৌরুষ' দিয়ে ভেতরে লিংক দেয়া যায়। আগ্রহী পাঠক পুরোটাই ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
আর ঐ পোস্টে আমরা শুনতে চাইবো - ব্লগে উপন্যাস দেয়া নিয়ে লেখকের অনুভূতি। পাঠক প্রতিক্রিয়া নিয়ে লেখকের মূল্যায়ন আর উপন্যাসটি লেখার পেছনের গল্প।
জুবায়ের ভাই কী বলেন?
৩২
আরে কী আশ্চর্য, এই মন্তব্যটা চোখেই পড়েনি। না পড়লেই মনে হয় ভালো ছিলো। একটা সরল প্রশ্নের উত্তরে কীভাবে প্যাঁচ লাগানো যায়, তোমার এই মন্তব্যটা তার প্রমাণ। 'আর ঐ পোস্টে আমরা শুনতে চাইবো' ইত্যাদি বলে আমাকে বিপদগ্রস্ত করার কোনো মানে হয়! ![]()
১
অনেক বাড়িতে হয়।
আমি জানি।
পাইছি। প্রথম পর্বের প্রথম কমেন্ট!