| ‹ পুরোনো ব্লগ | সব ব্লগ | নতুন ব্লগ › |
এক রাতে ঢাকা থেকে ফোন। হ্যালো বলতেই ওপাশে রীতিমতো গোলাবর্ষণ (গলাবর্ষণ আর কি!)। ফারুকের গলা। কোনোরকম সম্ভাষণ নয়, কয়েক বছর পর কথা হচ্ছে, ভালোমন্দ খোঁজখবর নেওয়ারও যেন দরকার নেই। সরাসরি প্রসঙ্গে চলে গেছে সে, কী একখান নাম দিয়া গ্যালেন মিয়া, এখনো সবাই আমারে ওই নামে ডাকে!
পুরো নাম গোলাম ফারুক। এক মুহূর্ত সুস্থির হতে জানে না – তড়বড় করে ছুটে বেড়াচ্ছে, পোশাক-আশাকে ভদ্রস্থ থাকার চেষ্টা থাকলেও বেশিরভাগ সময় প্যান্টের জিপার ওপরের দিকে খানিকটা আলগা প্রায় সারাক্ষণ, সঙ্গে আধভাঙা গলায় ক্রমাগত কথার খই ফুটছে। এতো দ্রুত কথা বলে যে অভ্যস্ত না হলে মর্মোদ্ধার করা কঠিন। এই চরিত্রের নামের প্রথমাংশের গোলামকে গোলমাল বানিয়ে ফেলা কঠিন কিছু নয়, স্বাভাবিক বলেই ধরে নেওয়া উচিত। ভুলও হয় না। অবিলম্বে নামটি আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা পায়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে চালু আছে। কোন ফারুক জিজ্ঞেস করলে এই ফারুককে চেনাতে হলে বলতে হয়, গোলমাল ফারুক।
ফোনে তখনো ফারুকের কথা শেষ হয়নি। সে বলে যায়, আমার পোলা সেদিন জিগায়, আচ্ছা বাবা সবাই তোমারে গোলমাল কয় ক্যান?
ফারুককে চিনি ১৯৭৮ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষা তখনো হয়নি, বিজয়নগরে ‘নান্দনিক’ নামে একটি বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানে কপিরাইটারের কাজ করি। সেখানেই ফারুকের সঙ্গে প্রথম দর্শন ও পরিচয়। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব বা ঘনিষ্ঠতা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু তার নির্ভেজাল সরলতা ও স্বভাবের কারণে তাকে উপেক্ষা করাও কঠিন। নান্দনিক যুগের পরে পুরানা পল্টনে হাউজ বিল্ডিং ভবনের পেছনে ‘অ্যাডবেস্ট’ নামের বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানেও একসঙ্গে কাজ করেছি। তারপরেও আমাদের যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব অটুট।
ফারুকের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। তার দ্রুতকথনে তা অনায়াসে হয়ে যায় ন্যাঞ্জো, তাকে দিয়ে নারায়ণগঞ্জ শব্দটা কখনো উচ্চারণ করানো যায়নি। ফারুকের শর্টহ্যান্ডসদৃশ দ্রুতকথনের আরো কিছু নমুনা দিই। মুন্নি নামে একটি মেয়ে অ্যাডবেস্টের একটি বিজ্ঞাপনে মডেলিং করেছিলো। একদিন দুপুরে প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ফারুক বলে, মুন্নি অ্যারেস্ট হইছে।
অবাক হয়ে বলি, কেন কী হয়েছে? মুন্নি অ্যারেস্ট হবে কেন?
আরে না না, মুন্নি অ্যারেস্ট হইয়া গেছে তো।
এই ধরনের কথোপকথন আরো খানিকক্ষণ চলার পরে উপস্থিত একজন কেউ ফারুকের কথার অনুবাদ করতে সক্ষম হয়। অনুবাদে যা পাওয়া গেলো তা এইরকম: মুন্নি বিমানে এয়ারহোস্টেস হয়েছে!
আমার বিয়ের কিছুদিন পর এক সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় এসেছে সে। চা খেতে খেতে একসময় বউকে জিজ্ঞেস করে, ফ্রিজ কই?
খাবার টেবিলের পাশে ফ্রিজ দেখিয়ে বউ বলে, ওই তো!
না না, ফ্রিজ ফ্রিজ। ফ্রিজ কই?
আমি ততোক্ষণে বুঝে গেছি। আমার ছোটো ভাইয়ের নাম ফিরোজ, ফারুক তার খোঁজ করছে।
ভাতের জন্যে ফারুকের খুব দুর্বলতা। কোনোদিন হয়তো অফিসের সবাই মিলে ভরপেট চাইনিজ খেয়ে ফিরেছি। অফিসে ঢুকেই সে পিয়নকে ডেকে বলবে, জলদি ভাতমাছ লইয়া আয়।
অ্যাডবেস্ট ছিলো উৎকৃষ্ট আড্ডার জায়গা। দিনমান বিভিন্ন জাতের মানুষের আনাগোনার শেষ নেই, আড্ডার জন্যে একটি বড়ো কক্ষ আলাদা বরাদ্দ ছিলো। ক্রমাগত চা সরবরাহ চলছে। গ্রুপ থিয়েটারের দল, সাহিত্যের দল, আঁকিয়েদের দল তো ছিলোই। আরো আসতো ফুটবল-ক্রিকেট খেলোয়াড়দের দল, এমনকি বিশুদ্ধ আড্ডাবাজরা স্রেফ আড্ডার টানেই সেখানে সমবেত হতো। একসময় বলা হতো, এটা অ্যাডবেস্ট নয়, আড্ডাবেস্ট।
আমাদের গোলমাল ফারুক ফুটবলে মোহামেডানের পাঁড় সমর্থক। তার তখন স্বপ্ন ছিলো, একদিন অনেক টাকার মালিক হয়ে সে মোহামেডান ক্লাবের কর্মকর্তা হবে। সত্যি কথা বলতে কী, এমন মোহামেডান-অন্তপ্রাণ আর কাউকে আমি দেখিনি। মোহামেডানের খেলার দিন বিকেলে তাকে কিছুতেই অফিসে পাওয়া সম্ভব নয়। অফিস থেকে পায়ে হেঁটে তিন মিনিটে স্টেডিয়াম, তাকে আর পায় কে! একদিন সন্ধ্যায় খেলা দেখে থমথমে মুখ করে ফিরেছে ফারুক। জিজ্ঞেস করার দরকার নেই, তার মুখই খেলার ফলাফল বলে দিচ্ছে। জানা গেলো, খুব বাজে টীমের কাছে সেদিন হেরেছে মোহামেডান। অফিসে কয়েক মিনিট অস্থিরভাবে পায়চারি করে ফারুক, তারপর একসময় ছুটে বাইরে যায়। কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বলে, শালার মোহামেডান ক্লাবে ঢিল মারতে যাই!
সে সময়ের আবাহনীর তারকা ফুটবলার টুটুলও নিয়মিত আসে আড্ডা দিতে। ফারুকের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য যেমন ছিলো, আবাহনী-মোহামেডান নিয়ে তর্কবিতর্ক, খোঁচাখুঁচিও কম হতো না। ঠাট্টার ছলে মোহামেডানকে হেয় করা ছোটো ছোটো মন্তব্যে ফারুককে উত্যক্ত করায় টুটুল ছিলো এক প্রতিভাবিশেষ। ফারুক রেগেমেগে হৈ চৈ শুরু করে দিলে আমরা মজা দেখি। একদিন এরকম খোঁচাখুঁচি চলছে, ফারুকের গলাও চড়ছে। মিটিমিটি হাসতে হাসতে টুটুল কিছু একটা মন্তব্য করতেই ফারুকের উত্তেজনা চরমে উঠে যায়। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে, হাত-পা নেড়ে চিৎকার করতে করতে চেয়ারে ওপর উঠে দাঁড়ায় এবং আমার জীবনে শোনা শ্রেষ্ঠতম কৌতুককর প্রশ্নটি সে করে টুটুলকে, আপনে মিয়া ফুটবলের কী বোঝেন?
২
আমি তো ডালাসেই আছি, নিশ্চয়ই দেখা হবে। ব্যক্তিগত মেসেজে এর মধ্যে ফোন নম্বর বিনিময়টাও করে রাখা যাবে।
৩
প্রশ্নটি সে করে টুটুলকে, আপনে মিয়া ফুটবলের কী বোঝেন?
সিরাম !!!!!!!!!!!!!
৫
আমি ফ্লাড করি জনগণের স্বার্থে। একরাতের ফ্লাডিংয়েই মন্তব্য লিমিট প্রায় দ্বিগুন হয়ে ১০০ তে উন্নীত হয়েছে। আমি অবশ্য আবদার করেছি আরও বাড়ানোর জন্য। ![]()
কি মাঝি? ডরাইলা?
৯
- এটার মানে তো কনস্ট্যান্ট না জুবায়ের ভাই।
"লগে আছি" থেকে শুরু করে "ফাট্টাফাট্টি" পর্যন্ত বুঝায়। ![]()
___________
চাপা মারা চলিবে
কিন্তু চাপায় মারা বিপজ্জনক
১০
হা হা। মজাদার সব ঘটনা ঃ)
১২
হা হা।
ঃ) = হাসিমুখ।
বিপ্লব, জা'ঝা, কোপানি, ঞঁ, ঝ!, ষ্ণ!, হ এর পাশাপাশি ঐদিন দেখলাম আরেক নতুন কমেন্ট ঞ্ঝ্বৌঁ, সংসারে এক সন্ন্যাসী বললেন, ঞ্ঝ্বৌঁ = জটিল।
নতুন অভিধানের আসলেই দরকার।
১৫
ঠিক ঠিক !!
খেললেই যে বেশি বুঝবে এমন তো কোন কথা নেই !
>>> ম্যালাদিন পর জুবায়ের ভাই এর লেখা পড়লাম, কই ডুব মেরেছিলেন ? সুস্থ তো ?
১৬
একদম ঠিক কথা।
হ্যাঁ, শরীর সুস্থ। একটু ব্যস্ত ছিলাম অন্যত্র। খোঁজ নেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ। এবং পড়ার জন্যে।
১৭
অসাধারণ লাগল।
কিন্ত ইদানীং কী যেন হইছে স্মৃতির কিছু পড়লেই মনটা খারপ হয়ে যায়...
---------------------------------
ছেঁড়া স্যান্ডেল
১৮
শুধু মন খারাপ করা কেন, মন ভালো করা স্মৃতিও নিশ্চয়ই অনেক আছে। সবারই থাকে। তবে আপনি একা নন, পুরনো দিনের কথা ভেবে কিছু বিষাদাক্রান্ত হওয়া বোধহয় এক ধরনের দুঃখবিলাস। আমি নিজেও এর বাইরে নই। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, ওই বিষাদের ভেতরেও কিছু আনন্দ লুকানো আছে।
১৯
আমারো হয়, তার মানে বয়স বাড়ছে আর বাড়ছে স্মৃতি।
@জুবায়ের ভাই, লেখা পড়ে আনন্দ পেলাম।
২১
হা হা হা
গোলমাল ফারুক তো দেখি দারুণ জিনিস, জুবায়ের ভাই !
খুবই মজা পেলাম। তাকে নিয়ে আরো কিছু লেখা দেয়া যায় না?
...........................
সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন
২৩
অন্যের খেতাব নিয়ে লিখলেন
আপনারে কোনো খেতাব দেয়নি কেউ কোনোদিন?
২৫
তিনি এখন কোথায় বস? দারুন লাগলো... ______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল
২৭
হাহাহা ফিরোজ থেকে ফ্রিজ, মজা লাগল পড়ে ।
-----------------------------------------
রাজামশাই বলে উঠলেন, 'পক্ষীরাজ যদি হবে, তা হলে ন্যাজ নেই কেন?'
২৯
ক্যারেক্টার একখান!
খুব মজা পেলাম ঘটনাগুলি পড়ে। ![]()
৩১
অসুস্থ ছিলেন নাকি বস, আশা করি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এই বেলা সিগারেটটা ছেড়ে দেয়াই মংগল।
আমাদের আড্ডার খান সাহেব ছিলেন আপনাদের ফারুকের পরিপূরক। একসন্ধার জলসায় কোন এক উদাস সময়ে পরিচিত সুরসহ হঠাৎ'গাঙ্গাজা-না-' বলে চিল্লান দিলেন। সুরটা পরিচিত, কিন্তু কথাটা পরিচত না হওয়ায় সবাই জিজ্ঞাসু। খান সাহেব সবার উপর বিরক্ত হয়ে বললেন, ত'রা কি আর উদ্দু বুঝবি? জাগজিতের এইটা নতুন গান।
জাগজিত আর লতার সাজদা এল্বামের 'গাম কা খাযানা' তখন বাজার মাত করেছে।
৩৩
কীর্তিমান এই ফারুকের গল্প মুহম্মদ জুবায়ের, আপনার কাছে অনেক শুনেছি,আমাদের দীর্ঘ টেলি সংলাপে। সচলায়তনের পাঠকদের সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, আর দেখুন পাঠক কি রকম মজা পেয়েছেন!
দ্বিতীয়বার মজা পেলাম, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
৩৫
অনেকদিন পরে আপনাকে দেখে ভালো লাগলো ...
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৩৭
আপনার লেখা নিয়ে কিছু বলার দরকার আছে? ![]()
................................................................................
objects in the rear view mirror may appear closer than they are ...
৩৮
![]()
________________________________
সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; পালিয়ে লাভ নাই।
৪০
দীর্ঘদিন পর সচলায়তনে এসেই মজার এক লেখা পড়লাম। আরো কিছু সাংকেতিক বাক্য জানতে চাই _____
.....................................................................................
সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চ'লে যেতে হয়
কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি..........
৪১
একটা মনে পড়লো। একদিন ফারুক একজনকে বললো, তুমি কাল অভিসারে আইসো। যাকে বলা হলো, সে তো অবাক - অভিসারে (সিনেমা হল হোক বা আরেক অর্থেই হোক) যেতে হবে কেন! পরে বোঝা গেলো, ফারুক তাকে অফিস আওয়ারে আসতে বলছিলো। ![]()
৪৫
বস, বসের মতই লেখা দিয়েছেন।
৪৬
জুবায়ের ভাই ,পড়ে প্রাণ খুলে হাসছি।
এরকম আরো কিছু লেখা তাড়াতাড়ি দিন প্লীজ।
৪৮
ধন্যবাদ অনিকেত ও কনফুসিয়াস।
১
মজা পেলাম
জুবায়ের ভাই, আশা করি সুস্থ হয়ে উঠেছেন এতদিনে। ডালাস যাবার প্ল্যান আছে ফোবানায়। আপনি গেলে হয়তো এ যাত্রা দেখা হয়ে যেতে পারে!
= = = = = = = = = = =
তখন কি শুধু পৃথিবীতে ছিল রং,
নাকি ছিল তারা আমাদেরও চেতনায়;
সে হৃদয় আজ রিক্ত হয়েছে যেই,
পৃথিবীতে দেখ কোনখানে রং নেই।