আমার পৃথিবী

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শুক্র, ২০/০৫/২০১১ - ৭:৪৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১.
প্রায় মাঝরাত।
জানালাটা খুলে বাইরে তাকালাম।
ব্যস্ত এ শহরটা এখনও যেন ঘুমায়নি।
অনেকদূরে রাস্তার আলো দেখতে পাচ্ছি।
ঝাপসা।
শুধু আলোর কতগুলো বৃত্ত।
হলুদ সবুজ লাল আর নীল।
যেগুলো স্থির সেগুলো স্ট্রীটল্যাম্প।
আর যেগুলো চলছে সেগুলো গাড়ির হেডলাইট।
রাত আমার ভালো লাগে।
ভালো না লাগে বলে এভাবে বললে মনে হয় ঠিক হবে, দিনের থেকে রাতটা ভালো যায়।
অন্ধকারে সবকিছু কেমন যেন ধোঁয়াটে হয়ে যায়।
নিশ্চুপ অন্ধকার আর ঝাপসা দৃষ্টি মিলিয়ে রাতটা বেশ ভালো চলে যায়।
অদ্ভুত এ নির্জনতা আমার ভেতরটা ফাঁকা করে দেয়।
আমার ভালো লাগে।

আমি এমনটা কখনো ছিলাম না।
রাত তো ঘুমানোর সময়।
রাত জেগে থাকার কোন মানে হয়না, অযথা আদিখ্যেতা-এমনটা ভাবতাম।
কিন্তু তখন আমার কোন সঙ্গী ছিলো না।
কিন্তু আজ আমার আছে,হাহাহাহাহাহা।
আমি কখনোই মানুষের সাথে মিশতে পারতাম না।
আজও পারিনা।
স্কুলে আমার কখনো কোন বন্ধু ছিলো না।
আমার সাথে কেউ কখনো যেচে পরে কথা বলতো না।
আমিও বলতাম না।
বাসায় থাকলে একলা নিজের ঘরে বসে থাকতাম।
গল্পের বই পড়তাম।
ছবি আঁকতাম।
আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতাম।
ভালো লাগতো অনেক।
কিন্তু কোনটাই আমাকে খুব একটা বেশি সঙ্গ দিতে পারতো না।
১৭০০ স্কয়্যার ফীট এর একটা বাসা।
দিনের বেশিরভাগ সময় একলা নিজের খুপড়ি-তে এঁটো থালা বাসন এর মতো পড়ে থাকতাম।
কাজের মানুষ কাজ করে আসার পর আর যাবার সময় একবার করে বলে যেত।
অনেক গভীর রাতে কলিঙ বেল হঠাৎ বেজে উঠতো।
কিছুক্ষণের জন্য এমন দু‘টো মানুষকে আমার সহ্য করতে হতো যাদের এ পৃথিবীতে সব থেকে বেশি ঘৃণা করতাম আমি।
কিন্তু আমার তো তাদের ঘৃণা করার কথা ছিলো না।
আমি অনেক চেষ্টা করেছি না করার জন্য।
কিন্তু পারিনি।

একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
তখন আমার বয়স এগারো।
এখনকার মতো তখন সবকিছু মেনে নিতে পারিনি।
সারাদিন বসে বসে কাঁদতাম।
শোনার কেউ ছিলো না।
তাও কাঁদতাম।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
ভেঙচি কাটতাম নিজের প্রতিফলনকে।
মাঝে মাঝে হাসতাম।
উন্মাদের মতো।
ওইটুকু বয়সেই নিজেকে অনেক বড় মনে হতো।

এমনই একটা দিনের কথা।
স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছি বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে।
খুবই খারাপ লাগছে আমার।
ক্লাস করতে আমার ভালো লাগতোনা।
এর আগের দু‘দিন ক্লাসে যাইনি।
দেয়াল টপকে আর পাইপ বেয়ে ক্লাস নাইনের এর ক্লাসরুমের টেরেস এর উপর বসে কাটিয়ে দিয়েছি।
জায়গাটা আমার খুবই ভালো লাগতো।
নির্জন।
অনেক দূরের হাইওয়েটা দেখা যেত। গাড়িগুলোর আসা যাওয়া দেখে অনেক সময় কাটিয়ে দিয়েছিলাম। এখনো মনে আছে।
কতগুলো গাড়ি আসলো গেলো তার একটা হিসাবও করেছিলাম।
তো যাই হোক।
আমাদের ক্লাস ক্যাপ্টেন ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ক্লাস টিচারকে বলে দেয়।
পানিশমেন্ট হিসেবে আমার গলায় একটা প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
“I am a class-bunker. Please laugh at me.”
এই লেখা ছিলো প্ল্যাকার্ডটাতে।
পুরো স্কুল দু‘বার রাউন্ড দেওয়ানো হয় আমাকে।
সবাই হেসে কুটি কুটি হচ্ছিলো।
আমার কোন বন্ধু না থাকাতে কেউ কোন সান্ত্বনা দিতেও এলোনা।
খুবই লজ্জা লাগছিলো আমার।
বাসায় আসার পর অনেকক্ষণ কাঁদলাম।
চিৎকার করে করে।
কেউ শুনলো না।
বিকাল হয়ে আসলো।
চোখ মুছে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
এইতো,এই জানালাটা দিয়েই বাইরে তাকিয়ে ছিলাম সেদিনও।
অনেকগুলো ছেলে ক্রিকেট খেলছে সামনের ছোট গ্যারেজটাতে।
হঠাথ খুব খেলতে ইচ্ছে হলো ওদের সাথে।
কিন্তু কিভাবে যাবো?
বুয়া যাবার সময় তালা লাগিয়ে দিয়ে যায়।
বের হবার কোন উপায় নেই।
অনেক রাগ লাগতে লাগলো হঠাৎ ।
চিৎকার করলাম কিছুক্ষণ।
নিজেকে খুব নিচ মনে হতে লাগলো।
আমার তো কোন অস্তিত্বই নেই।
একটা প্রশ্নই শুধু মাথায় কাজ করছিলো।
আমি এখনো বেঁচে আছি কেন?
সিঙ্গেল বেডটাতে এসে বসলাম।
দুই হাতে মুখ লুকিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলাম।
উঠে গিয়ে পড়ার টেবিল থেকে মার্কার পেনটা নিয়ে সামনের দেয়ালটা জুড়ে বড় বড় করে লিখলাম
PLEASE LET ME LIVE, PLEASE….

রাতে অনেকগুলো মার খেতে হয় আমাকে।
আর অনেকগুলো বকা শুনতে হয়।
এরপর কি হয়েছিলো এখন আর ঠিক মনে পড়ছে না।

২.
খেয়াল করলাম বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।
কখন শুরু হয়েছে টেরই পাইনি।
বৃষ্টি খুব ভালো লাগে আমার।
রবীন্দ্রনাথ এর একটা গান মনে পড়ছে, বরিষ ধারা মাঝে শান্তিরও বাণী।
আমার খুব প্রিয় গান।
জানালা দিয়ে বাইরে হাত বাড়িয়ে দিলাম।
ফোটা ফোটা বৃষ্টি এসে পড়লো।
ভেজা হাত দুটো এনে মুখে ছোঁয়ালাম।
অপার্থিব একটা ভালোলাগা ভর করলো আমাকে।
হেসে উঠলাম আপন মনে।
অনেকদিন এভাবে হাসি না।
অ্নেকদিন পর অনেক অনেক বেশি ভালো লাগছে।
কেন আমি জানি না নিজেও।

হঠাথ একটা দানব যেন ভর করলো আমাকে।
সারা শরীর ঘামতে শুরু করলো।
হাঁপাতে লাগলাম জোরে জোরে।
ইচ্ছে করছে জানালার গ্রিলটার সাথে নিজেকে আটকে রেখে বৃষ্টি দেখতে।
খুব ইচ্ছে হচ্ছে।
কিন্তু পারছি না।
আমার পা দুটো সরে যাচ্ছে।
নিজেকে আটকে রাখতে পারছিনা।
চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে।
কাঁপছি কেন এমন?
চিৎকার করে উঠলাম।
কিন্তু ভেতরের দানবটাকে ঠেকাতে পারলাম না।
আমাকে সে জোর করে নিয়ে চললো ঘরের আরেক পাশে।
যেখানে আমার টেবিলটা আছে।
টেবিলটার উপর অনেকগুলো জিনিস এলোমেলোভাবে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে।
একপাশটা একটু পরিষ্কার করা।
একটু ফাঁকা জায়গা।
সেখানে বেশ কিছু শুকনো তুলা।
দু‘টা ইনজেকশান।
আর একটা খবরের কাগজ।
তার উপর স্তূপাকারে পড়ে আছে কিছু সাদা বস্তু।
পাউডারের মতো দেখতে।
ভয়ে বুক কাঁপে আমার এ জিনিসটা দেখলে।
গা গুলিয়ে ওঠে।
বমি আসতে চায়।
কিন্তু...
এ জিনিসটাই যে এখন আমার সবকিছু।
এটা ছাড়া যে আমি থাকতে পারিনা।
এটা ছাড়া যে আমি বাঁচতেও পারবোনা।
হাহাহাহাহাহা.......
কিছুক্ষণ পর।
দানবটা নেমে গেছে বুকের ওপর থেকে।
অদ্ভুত পাশবিক এক ভালো লাগায় ভরে দিয়ে গেছে যেন সবকিছু।
ভেঙে আসতে চাইছে আমার সারা শরীর।
মেঝের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম।
চোখগুলো বড় বড় হয়ে আছে, চাইলেও যেন আর বন্ধ করতে পারছি না।
হাতটা বুকের উপর রাখলাম।
হাপরের মতো ওঠানামা করছে হৃৎপিন্ডটা।
অনেক ক্লান্ত লাগছে।
কিন্তু মাথার ভেতরটা একদম হালকা।
সব ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছি যেন।
আমি যেন আর এ পৃথিবীতে নেই।
অদ্ভুত এক ঘোর যেন পেয়ে বসলো আমাকে।
অপার্থিব এক স্বপ্ন ভর করলো দু‘চোখে।

৩.
বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল আমার।
চোখ মেলে তাকালাম।
কোথায় আমি???
ঠিক বুঝতে পারছিনা।
একটা কাঠের চৌকি।
ছোটখাটো একটা ঘর।
দেয়ালগুলো মাটির, চাল-টা টিনের।
সেই টিনের উপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার ঝমঝম শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
কেন জানি চোখটা খুলে রাখতে ভালো লাগছে না।
অদ্ভুত একটা আলসেমি ভর করেছে অনেকদিন পর।
চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকলাম।
মনটা ভীষণ রকম এলোমেলো লাগছে আজ।
কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি।
আমার জন্য নতুন কিছু নয়।
কিন্তু এ পুরনোর মাঝেও আজ একটা অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে।
চৌকিতে উঠে বসে পাশের ছোট জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকালাম।

ভোর হবে-হবে করছে।
হালকা ধোয়াটে আলোর মাঝে বর্ষার প্রথম বৃষ্টি।
অপার্থিব লাগছে কেমন যেন।
বাইরে বেরোতে ইচ্ছা করছে।
বৃষ্টিতে ভিজবো আজ।
বৃষ্টির ফোটাগুলোর সাথে কেঁদে কেঁদে যদি এ মনটা কিছুটা হালকা হয়।
অনেকগুলো কালো মেঘ অনেকদিন ধরে জমেছে মনের আকাশটাতে।

খালি-পা।
ছোট্ট একটা পায়ে‌-চলা পথ।
বৃষ্টির ছাট কিছুটা কমে এসেছে।
হালকা একটা-দুটো ফোঁটা মাঝে মাঝে কপালটাতে এসে পড়ছে।
চুলগুলো ভিজে এলোমেলো হয়ে কপালটার উপর চলে আসছে।
হাত দিয়ে বারবার সরিয়ে দিচ্ছি।
বৃষ্টিতে কাদায় ভরে গেছে পথটা।
সে কাদা আমার পায়ে লাগছে।
নোঙরা করে দিচ্ছে সাদা পাজামাটার অনেকটুকু।
সাদা পাজামা আর সাদা পান্জাবী।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো।
পুব-আকাশে সূর্যটা উকি মারতে শুরু করেছে এর মধ্যেই।
হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে এসেছি।
সামনে ছোট একটা নদী।
মনে হলো নদীর নামটা জানি আমি।
কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না।

নদীর পাড়টা কাদায় ভরে আছে।
সেই কাদার মধ্যে একটুখানি সবুজ ঘাস।
গিয়ে বসতে ইচ্ছে হলো সেখানে।
সাদা পান্জাবীটা অনেক আগেই নোঙরা হয়ে গেছে।
হোক আরেকটু নোঙরা।
ক্ষতি কী??

বসে আছি নদীর পাড়ে।
একা।
এ নিঃসঙ্গতা বেশ ভালো লাগছে।
হঠাৎ পায়ের শব্দে ঘোরটা ভেঙে গেলো।
কাছে আসতে আসতে আমার পাশে এসে থেমে গেলো শব্দটা।
একটু ইতস্তঃত একটা ভাব দেখা গেলো আগন্তুকের মধ্যে।
চুড়ির শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
আমি মুখ তুলে তাকালাম না।
ইচ্ছা করছে না একদমই।
কিন্তু এ অজানা সঙ্গটা খারাপও লাগছে না তেমন।
বেশ ভালোই লাগছে।

খানিকটা অবাক হলাম।
আগন্তুক আমার পাশে এসে বসেছে।
আমি তার লাল পাড়ের শাড়ির কিছুটা যেন দেখতে পাচ্ছি।
আগন্তুক তার একটা হাত আমার হাতের উপর রাখলো হঠাৎ করেই।
সূর্যের আলো তার হাতের চুড়িগুলোর উপর পড়ে চিকচিক করে উঠলো।
আমি অবাক হয়ে দেখছি সে প্রতিফলন।
আজ যেন আমার অবাক হওয়ার পালা কেবলই।
আমার পাশেই সে বসে আছে।
অথচ মুখটা তুলে একটিবারও তার দিকে তাকাচ্ছি না।
আমি জানি সে আছে।
আমি জানি কেউ একজন আছে যে আমাকে ছেড়ে কখনো যাবেনা।
এটুকু জানাই যেন আমার কাছে সবকিছু।

না হোক এটা বাস্তব।
হোক এটা কল্পনা।
আমার জন্য....
হাহাহাহাহা.....
আমার জন্য কল্পনাই যে বাস্তব
আর বাস্তবই যে কল্পনা......
এই নিয়েই তো আমার পৃথিবী।

“ভালোবাসি ভালোবাসি
এই সুরে কাছে দূরে জলে-স্থলে বাজাই
বাজাই বাশি ভালোবাসি
ভালোবাসি...
আকাশে কার বুকের মাঝে
ব্যথা বাজে
দিগন্তে কার কালো আঁখি
আখির জলে যায় ভাসি।

সেই সুরে সাগরকূলে বাঁধন খুলে
অতল রোদন উঠে দুলে
সেই সুরে বাজে মনে
অকারণে
ভুলে যাওয়া গানের বাণী
ভোলা দিনের কাদন
কাদন-হাসি ভালোবাসি
ভালোবাসি.....”

ইশতিয়াক আহমেদ(ফাহিম)
পুরকৌশল বিভাগ
বুয়েট।
২০/০৫/২০১১


মন্তব্য

সন্দেশ এর ছবি

আপনার এই লেখাটির ৩০ কপি ডিলিট করে এক কপি প্রকাশ করা হয়ছে। এরপরেও আপনার এই লেখার আরো ৫ কপি জমা পড়েছে। এইরকম হারে ফ্লাডিং চালু রাখলে আপনার এই সহ ব্লক করা হবে।

কবি-মৃত্যুময় এর ছবি

ব্যক্তিগত পরিচয়(শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) লেখার কী প্রয়োজন স্পষ্ট হল না!! প্রতিটি বাক্যকে আলাদাভাবে লেখায় বিরক্তির উদ্রেক করল। কন্টেন্ট নিয়ে কিছু বললাম না। প্রচুর পড়ুন, চর্চা করুন। আরো ভালো লিখুন এই শুভ কামনা রইল।

ধৈবত(অতিথি) এর ছবি

প্রতিটি কথায় একমত।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।