প্রিয় মেহেদী

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শনি, ১১/০৬/২০১১ - ৯:৪৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

প্রিয় মেহেদী,

কোনো এক বছরে দিনাজপুর-ঢাকার একটা চলন্ত নাইটকোচ মির্জাপুরের কাছে রোড ডিভাইডারে ধাক্কা খেয়ে উল্টে গেল। উল্টে, ছেঁচড়ে কিছুদূর গিয়ে ঠিক খাদের কাছে থেমে যাওয়া ঐ বাসের ভেতরে ছিলাম আমি আর দাদা। আমার বাবা-মায়ের দুইমাত্র সন্তান। কোনো অজানা পূণ্যে আমরা দুজনই অক্ষত থাকলাম। বাসের অনেকে গুরুতর জখম হ'ল, কিন্তু মরলনা কেউ। দাদার শার্টে বুকের কাছটায় চাপ চাপ তাজা রক্ত দেখে কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে ছিলাম। পরে বোঝা গেল ওটা দাদার নয়, কোনো সহযাত্রীর শরীরের রক্ত। মৃত্যু একবারের জন্য তার মুখটা সামান্য দেখিয়ে গিয়েছিল সেদিন। সেযাত্রায় পরপার বা ঢাকায় যাওয়া হ'লনা আমার। আব্বা-আম্মার ক্রমবর্ধমান উদ্বেগে একটা মাইক্রো ভাড়া করে সেইখান থেকে সোজা আবার ঘরের ছেলে ঘরে। কিন্তু ঢাকায় ফেরাটা জরুরী ছিল। ঢাকা য়্যুনিভার্সিটিতে আমার ভর্তির তারিখ পেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ট্রমাটা থেকে বেরুতে পারছিলামনা সহসা। তাহলে ভর্তির কী হবে? ভাবার চেষ্টা করলাম, কে আছে ঢাকায় যে আমার হয়ে একটা দরখাস্ত করে দেবে ভার্সিটিতে আমার ভর্তি হতে চাওয়া ডিপার্টমেন্টে? মামা নেই, মাস তিনেক আগে সপরিবারে সিলেট চলে গেছে পোস্টিং হয়ে। আর কেউ? সেদিন হঠাৎ বুঝতে পারলাম, ঢাকায় আক্ষরিক অর্থে আমার আর কেউ নেই। অনেক ভেবে শেষপর্যন্ত যে মুখটা মনে করতে পারলাম, তার সঙ্গে আমার পরিচয় মাত্র অল্পদিনের। জাহাঙ্গিরনগর য়্যুনিভার্সিটিতে অল্প কিছুদিন পড়ার সময় আলাপ হওয়া বড় বড় চোখের বুদ্ধিদীপ্ত একটা ছেলে। নতুন সম্পর্ক তৈরিতে বরাবর অপটু, ধীর আমার কেন যে তাকে বন্ধুর মতো মনে হয়েছিল! কাউকে তো হয়না! সীমাহীন সঙ্কোচ দূরে ঠেলে তাকেই ফোন দিলাম, -"মেহেদী, আমার একটা কাজ করে দেবে...."
মেহেদী করল। আমার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে অল্প পরিচিত একজনের জন্য যা সম্ভব সবটুকু করল। আমি অভিভূত হলাম। আজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ হলাম।
এরপর এরকম গল্প আরো অনেক আছে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি, তার অসংখ্য বন্ধুর সবারই আছে এরকম অগুণতি অসাধারণ অভিজ্ঞতার সঞ্চয় ।

মাঝে মাঝে ভেবেছি, আমি হ'লে কী করতাম? বিরক্ত হতাম না কি? অজুহাত? আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু মেহেদী'র ওপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায়। বিশ্বাস করা যায়। এর চেয়ে ভালো গুণ আর কী হতে পারে মানুষের? কারণ, মনের ভেতরে তো আমি জানি, আত্মমগ্নতা স্বার্থপরতারই পোশাকি নাম।

তার এই ব্যাপারগুলো কেন এতটা সহজ, অচর্চিত, এখন আমি জানি। যার বাবা অন্যায়ের জন্য এই অবাস্তব অস্থির সময়েও একটা গুন্ডাকে টেনে চড় মারতে পারেন, ছেলে তো তাঁর সংস্কারই বহন করবে। আফসোস ঐ মানুষটিকে আরো কাছ থেকে জানা হ'লনা, তাঁর সাথে দেখা হ'লনা কোনোদিন। তার আগেই বিদায় নিলেন, অসময়েই। নইলে যে হাসপাতাল থেকে দু'সপ্তা আগে তাঁর প্রাণহীন দেহটা বেরিয়েছিল, সেখানেই এলো নতুন প্রাণ, তাঁর কন্যার প্রথম সন্তান, তাঁর প্রথম নাতনি!

তুমিও চড় মারছো মেহেদী। প্রতিদিন...অন্যায়, অপশাসন, অসঙ্গতির মুখে। বিরামহীন চড় মেরে যাচ্ছ। তোমার অসাধারণ শক্তিশালী কার্টুন দিয়ে। কতজন পারছে এভাবে? আমি সবসময়ই জেনেছি, তুমি যা করছো তা অনেক বেশি অর্থপূর্ণ। আমরা অনেকেই যা পারছিনা। আর আমি এও জানি, চাচার মৃত্যু তোমার জীবনদর্শনকে যেখানেই সরিয়ে নিক, শেষপর্যন্ত তা আরো গভীরই হবে।

একজন অসামান্য মানুষ এবং পিতার জন্য প্রণতি। নতুন জীবনের উদ্বোধনকে স্বাগত, নিরন্তর শুভকামনা।
মেহেদী তুমি ভালো থেকো।

সারওয়ার রেজা

পাদটীকা

  • ১. গত ২৫ মে কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন

মন্তব্য

The Reader এর ছবি

মেহেদী ভাল থাকুক এবং শাথে তার নতুন আগত ভাগ্নি টি ও ।

আয়নামতি1 এর ছবি

মেহেদীর বাবার আত্নার শান্তি কামনা করছি। শুভকামনা থাকলো মেহেদী, তার পরিবারে আসা নতুন সদস্য এবং পোষ্টদাতার প্রতি।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।