নাইব উদ্দিন আহমেদ – এক নতুন ধারার শিল্পী-কবি-সাহিত্যিক

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: মঙ্গল, ১৩/১২/২০১১ - ১:৫৩পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

লেখক : নৃপেন্দ্র সরকার
---------------------------

এখন ডিসেম্বর মাস। বিজয় আনন্দ উল্লাসের মাস। যারা অকাতরে জীবন দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করে গেছেন তাঁদের প্রতি হৃদয় ভরা শ্রদ্ধা জানানোর মাস। ২০০৯ সালে এই মাসের ১৪ তারিখে আমাদের নাইব ভাই চলে গেলেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে এক নতুন মাত্রিক অবদান ছিল তাঁর। শেখ মুজিবের ডাক এসেছিল – ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় ঝাপিয়ে পড়।’ নাইব ভাইএর সাথে থাকত ক্যামেরা আর ক্যামেরার সাথে নাইব ভাই। তিনি তাই নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধে। ক্যামেরায় বন্দী করলেন পাকবাহিনী আর তার দোশরদের গনহত্যা, বর্বরতা, ধর্ষন আর পৈশাচিকতা। শিল্পবন্ধী করলেন ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত আর অগনিত মা-বোনের ইজ্জৎহানির ইতিহাস। জীবনের ঝুকি নিয়ে অনেক ছবি পাঠিয়ে দিলেন দেশের বাইরে বিদেশী পত্রিকায়। বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করতে তাঁর এই অবদান অতুলনীয়। বাংলাদেশের আপামর জনতা এবং ভবিষ্যৎ বংশধর একদিন উনার সৃষ্টিশীলতার এবং মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারবে।

প্রায় তেইশ বছর আগে বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে এসেছি। কিন্তু নাইব ভাই আমার কাছে স্ফটিকের মত স্বচ্ছ। প্যান্টের উপর দিয়ে হাফ স্লিভ ঢোলা সাদা জামা; বাম হাতে ধরা কাঁধ থেকে ঝুলানো ক্যামেরা। মোটা ফ্রেমের চশমা। হেঁটে চলছেন । ডাইনে বামে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। মগজে কোন সৃষ্টি সতত উঁকিঝুকি মারছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে তিনজন ব্যক্তিত্ব নিষ্কলূষ চরিত্রের অধিকারী তিনি তাঁদের একজন। তিনি চাইলেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন বড়কর্তা হতে পারতেন - পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, কোষাধ্যক্ষ বা রেজিস্ট্রার। এই শিল্পী-কবি-সাহিত্যিক তুচ্ছ জিনিষ নিয়ে ভাবেন নি কোন দিন। এমনকি তাঁর নিজের দপ্তরের প্রধানটুকু না হয়ে অন্যদেরকে বিব্রত করেই রেখেছেন। তিনি ডুবে থাকতেন তাঁর আপন ভূবনের মাঝে।

স্বল্প পরিসরে, সামান্য উপকরণ সম্বল করেই তাঁর সৃষ্টিশীলতার শুরু। তাঁর নিজের কথায়, “টেবিলের চারপাশে কাঁথা এবং হারিকেনে লাল সেলোফেন মুড়িয়ে, নদীর পানিতে ধুয়ে ছবি ডেভেলপ ও প্রিন্ট করতাম।” তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ শুরু হয়েছিল বাল্যকালে। চলেছিল সারাজীবন। পাকবাহিনীর বর্বতার অজস্র দলিল তিনি সৃষ্টি করেছেন দীর্ঘ নয়মাস। স্বাধীনতার পর কয়েকটি প্রদর্শনীও করেছেন আর স্বাধীনতার বেদনা তিনি বার বার উপলব্ধি করেছেন। পাকিস্তানী হানাদের সৃষ্ট বীভৎস্য দৃশ্য দেখে দেখে স্থবীর, মুক-বধির হয়ে গিয়েছিলেন। ছবি থেকে ছবি সৃষ্টি করে স্বাধীনতার দলিল ভান্ডারে তিনি নতুন দিগন্ত সংযোগ করেছেন। তারপরেও তাঁর সৃষ্টির নেশা মিটেনি। যেন ছবির ভাষায় সবটা লিখতে শেষ করতে পারলেন না। এই বেদনা তাঁকে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করেছে। কিন্তু তিনি যা লিখে রেখে গেছেন তা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে নতুন প্রজন্মের বিস্তর সময় লাগবে।

প্রতিটি ছবি তাঁর প্রচুর সময় এবং চিন্তার ফসল। বর্ষা ঋতুতে নদীতে নতুন জল নামে। মৃদু মৌসুমী সমীরণ। জলের থৈ থৈ শব্দ, নতুন গন্ধ। শিশুরা আনন্দে দিকবিদিক লাপালাফি-ঝাপাঝাপি করে। তিনি প্রাণভরে গ্রামবাংলার এই দৃশ্য উপভোগ করেছেন। হাজারো কৌনিক অবস্থান থেকে হাজারখানি ছবি তিনি তুলতে পারতেন। তিনি তুলেছেন মাত্র একটি। বাংলাদেশের একটি চিরায়ত অপরূপ দৃশ্য বন্দি হয়ে থাকল।

“চুপি চুপি দেশটাকে ভালবেসে যারা দিয়ে গেল প্রাণ।” বিজয়ের তিন-চার দিন আগে ময়মহসিংহের শম্ভুগঞ্জে বিশেষ পোজে তোলা তিন মুক্তিযোদ্ধার ছবি। এটি শুধু খালেক, মজিবুর আর মজিদের একক ছবি নয়। মুক্তিযুদ্ধের চলমান দৃশ্য। বিলম্বে হলেও এই ছবিটির মূল্যায়ন হয়েছে। ১৯৯০/৯১ বিজয় দিবসের পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। তথ্যমন্ত্রনালয়ের চলচ্চিত্র ও প্রকাশণা বিভাগ পোস্টারে ব্যবহার করেছে ছবিটি। রাষ্ট্রযন্ত্রের রাঘব বোয়ালেরা তাদের ছবির পশ্চাদপ্রচ্ছদ হিসেবে এই ছবিটি ব্যবহার করে দেশপ্রেমে স্বকীয় ভূমিকা জাহির করছেন।

নাইব উদ্দিন এক একটি ছবিতে হাজার পাতার বই লিখতেন। নয় মাসে অগনিত মা-বোনদের ইজ্জত-সম্ভ্রম নস্যাত করেছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। এই ছবিটিও কোন একক নুরজাহান, হরিদাসী, বা হালিমা খাতুনের নয়। ছবিটি জার্মান নাৎসিদের বর্বরতাকেও হার মানায়।
ধর্ষিতা নারীর অভিব্যক্তির আর একটি ছবি। বিশেষ কোন একক মা বা বোনের ছবি এটি নয়। স্বাধীনতার জন্য যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে তারই করুণ রাগিনী এই ছবিটি।

মুখায়ব চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে পৃথিবীর অন্ধকারে। ছবিটি বাংলাদেশ অভ্যূদয়ের করুণ ইতিহাসের মূর্ত প্রতীক। নাইব ভাই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক-বাহিনী আর আলবদর, রাজাকার, আল-শামসদের কূ-কীর্তির হাজারো ছবি তুলেছেন। এগুলোর কোনটি রেখে কোনটি বাদ দিবেন! তিনি সমগ্র লাঞ্ছনার চিত্র একটি ছবিতে উজ্জীবিত করলেন। ছবিটি তাঁর মেধাপ্রসুত আরো একটি অসাধারণ সৃষ্টি। এটি সমগ্র বাংলাদেশের শত সহস্র লাঞ্ছিতা মা-বোনদের সম্মিলিত ছবি। স্বাধীনতা যুদ্ধে চরম আত্মত্যাগের ইতিহাস। এটি কোন একক শাহীনের চিত্র নয়। এই ছবিতে ইজ্জৎ হারা শাহীন, সালমা, আনোয়ারা, কুলসুম, সুবর্না, মায়া, সাবিত্রী, করবী, বিলকিসদের ক্রন্দনের রোল একাকার হয়ে আছে। অসাধারণ প্রতিভাদীপ্ত আলোচিত্রশিল্পী নাইব উদ্দিন আহমদের লেখা স্বাধীনতার দীর্ঘ ইতিহাস এটি। এই ছবির গভীরে যা লেখা আছে তা ভুক্তভোগী একজন সন্তান, ভাই, এবং মা-বাবার কাছে অত্যন্ত স্বচ্ছ। এবং যারা হারান নি তারাও নিমিলেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারেন। ধীরে ধীরে এর ভাষা পরিষ্কার হয়ে আসবে। বুঝবে অনাগত ভবিষ্যৎ বংশধর – একটা দেশের স্বাধীনতার জন্য কতটা চরম মূল্য দিতে হয়।

তিনি এই ছবিটির নাম দিয়েছেন, “স্বাধীনতা”। স্বাধীনতা যুদ্ধের কী নেই এই ছবিতে? তখন ফটোশপ টেকনোলোজী ছিল না। তাতে কী! কাঁথা দিয়ে ঢেকে হারিকেনের আলোয় ছবি ডেভেলপ ও প্রিন্ট করার পদ্ধতি বাল্যে যার মাথায় খেলে, একাধিক ছবি একত্র করে ছবির জগতে নতুন মাত্রা সংযোজনের বুদ্ধি তাঁর মাথাতেই আসা সাঝে। মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র দলিল এই ছবিটি। দেশমাতৃকার চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে - ওরে তোরা আমায় মুক্ত কর! কাতারে কাতারে মুক্তিকামি মানুষ বেরিয়ে আসে – “ও আমার দেশের মাটি, তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা।” স্বাধীনতার চরম মূল্য – তিরিশ লক্ষ শহীদের কংকাল; অগনিত মা-বোনের ইজ্জতের যন্ত্রনা ভেদ করে জাতীয় ফুল শাপলা বেরিয়ে এসেছে। রক্ত-রঙ্গীন জাতীয় পতাকা কাঁধে শিশুরা ধাইছে উজ্জল ভবিষ্যতের পানে। স্বাধীনতার দলিলে আর বেশী কী দরকার? কোন ঐতিহাসিক এর চেয়ে সুন্দর করে স্বাধীনতার ইতিহাস রচতে পারে?

“স্বাধীনতা” ছবিটা তাঁর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টির একটি। এই অনন্য অসাধারণ সৃষ্টির পর নাইব ভাইয়ের কাছ থেকে আর বেশী কী আর চাওয়ার থাকতে পারে?

তাই রবিঠাকুরের ভাষা নিয়ে বলতে চাই –
হে সম্রাট কবি
এই তব হৃদয়ের ছবি।
এই তব অবিনশ্বর সৃষ্টি।।

---------------------------
অন্য লেখার লিংক :
স্বাধীনতার এক অনন্য ঐতিহাসিক নাইব ভাই চলে গেলেন : নৃপেন্দ্র সরকার


মন্তব্য

ফাহিম হাসান এর ছবি

শৈশবে যখন ক্যামেরা হাতে নেই, তখন থেকে প্রতিটি ক্লিকের সাথে এম এ বেগ, নওয়াজেশ আহমেদ, রশীদ তালুকদার বা নাইব উদ্দীনের কথা স্মরণ করি। ক্যামেরার প্রতি ভালবাসা তাদেরই প্রেরণায়।

ধন্যবাদ এমন মর্মস্পর্শী লেখার জন্য।

তাপস শর্মা এর ছবি

ছুঁয়ে গেলো...

নৃপেন্দ্র সরকার এর ছবি

"ছুঁয়ে গেলো..."

ধন্যবাদ।

আসল কথা হলঃ
নাইব ভাইএর ছবিগুলো নানাজনে ব্যবহার করছেন। কিন্তু কয়জন তাঁর এই সৃষ্টিশীলতার স্বীকৃতি দিচ্ছেন। একদিন আসবে কেউ জানবেই না কোন হাতে তোলা এবং সৃষ্টি এই ছবিগুলি। এগুলোর সংরক্ষন হওয়া উচিৎ। নাইব ভাইএর বংশধরদেরই এরজন্য তৎপর হওয়া উচিৎ।

নৃপেন্দ্র সরকার এর ছবি

"ছুঁয়ে গেলো..."

ধন্যবাদ।

আসল কথা হলঃ
নাইব ভাইএর ছবিগুলো নানাজনে ব্যবহার করছেন। কিন্তু কয়জন তাঁর এই সৃষ্টিশীলতার স্বীকৃতি দিচ্ছেন। একদিন আসবে কেউ জানবেই না কোন হাতে তোলা এবং সৃষ্টি এই ছবিগুলি। এগুলোর সংরক্ষন হওয়া উচিৎ। নাইব ভাইএর বংশধরদেরই এরজন্য তৎপর হওয়া উচিৎ।

তাপস শর্মা এর ছবি

উনার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। জেনে এত ভালো লাগল। উনাকে সালাম...

তারেক অণু এর ছবি

শ্রদ্ধা ইতিহাস রচয়িতাকে।

কুলদা রায় এর ছবি

নাইবউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে এই লেখাটি প্রাণ ছুঁয়ে গেল। আমি দীর্ঘদিন নাইব চাচার আশ্রয়ে ছিলাম। আমার ভালো লাগছে চাচাকে নিয়ে এই লেখাটি। যিনি লিখেছেন তিনিও আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। লেখককে কৃতজ্ঞতা জানাই।

...............................................................................................
'এই পথ হ্রস্ব মনে হয় যদিও সুদূর'

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

শ্রদ্ধা।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।