"সে"

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: রবি, ২৯/০১/২০১২ - ১২:১৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

(১)

প্রায় নয় মাস যাবত সে এ ঘরে বন্দী হয়ে আছে। বন্দীত্ব ব্যাপারটা তার কাছে খুব একটা খারাপ মনে হচ্ছে না। আশপাশ থেকে যা শুনেছে সে হিসেবে তার মুক্তি পেতে বেশি দেরি নেই। কেমন হবে মুক্ত বাতাস;সে জানে না,সে কোন দিন কিছু দেখে নি। সে শুধু জানে,একটা বন্ধ অন্ধকার ঘরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় সে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। সে যখন ঘরটার দেয়ালে লাথি মারে তখন এক মহিলার আনন্দিত কণ্ঠ শোনা যায়। ইনি নাকি "মা" হবেন। "মা" ব্যাপারটা কি,সে আন্দাজ করতে পারে। এই মহিলা সম্ভবত তারই মা হবেন।

যখন থেকে সে বুঝল যে,সে একটা ঘরে আটকা পড়ে আছে, তখন থেকে তার মা "হাসপাতাল" নামের একটা কোলাহলপূর্ণ জায়গায় যাওয়া শুরু করলেন। এই জায়গাটা তার একটুও পছন্দ না। কেননা এখানে এলেই এক মহিলা শক্ত হাতে তার গা হাত পা টিপে দিতে চেষ্টা করেন। মহিলার হাতে মনে হয় চুড়ি আছে,ঝন-ঝন শব্দ পাওয়া যায় ।

যে মহিলা তার মা হবেন, তিনি তাকে নিয়ে প্রায়ই ভাবেন। সে দেখতে কেমন হবে, তার নাম কি হবে এই সব। এখন পর্যন্ত তিনটা নাম এসে ঠেকেছে,
অরিত্র
অক্ষিক
অরণ্য।
এর একটা শব্দের মানেও সে জানেনা। বের হবার পর নিশ্চয়ই জানবে। মুক্ত পৃথিবী তে সূর্য নামে নাকি একটা জিনিস আছে। তার নাকি অনেক আলো। আলো কী,সে এখনও চিনেনা । আস্তে আস্তে সব চিনবে। মা তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন "আল্লাহ্‌" নিশ্চয়ই সে সব স্বপ্ন সত্যি করে দেবেন। সমস্যা হচ্ছে সে আল্লাহকেও চেনে না। উনি নাকি সৃষ্টিকর্তা। তাহলে তার মা কী? মা কি সৃষ্টিকর্তা না? সে কিছুই বুঝতে পারে না। একদিন নিশ্চয়ই সব বুঝবে। অন্ধকারে দুর্বোধ্য অনেক কিছুই আলোতে চেনা হয়ে যাবে। আলো জিনিসটা কেমন কে জানে!

আরেকটা ব্যাপারও সে বুঝতে পারে না। "জন্মদাতা পিতা" কথাটা সে শুনেছে। পিতা আবার জন্মদাতা হয় কিভাবে? গম্ভীর গলায় কথা বলতে বলতে এক ভদ্রলোক একদিন তার ঘরের দেওয়ালে কান পেতে কি যেন শুনতে চেষ্টা করেছিল। এই লোকটাই মনে হয় তার "পিতা"
পিতাও তাকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবেন। মাঝে মাঝে তিনি ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,স্পেস সাইন্টিস্ট এই সব কঠিন কঠিন শব্দ বলেন। মনে হচ্ছে বড় হয়ে তাকে এগুলো হতে হবে। নিশ্চয়ই সম্ভব। কারন সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। তার নাকি অসীম ক্ষমতা। সৃষ্টি কর্তা মানে হচ্ছে আল্লাহ্‌।

একদিন "দীপালি দি" নামে এক মহিলা এসে মায়ের সাথে হড়বড় করে অনেক কথা বললেন। তার মধ্যে ভগবান শব্দটি বহুবার এসেছে। ভগবানেরও নাকি অনেক ক্ষমতা। দীপালি দি মাসী হবেন। মা তাই বলছেন। কার মাসী? মাসী ব্যাপার টা কী?

বাবা, মা, দীপালি দি সবাই তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। এই স্বপ্নগুলোর অর্থ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে বোঝে না। নিশ্চয়ই সুন্দর কিছু হবে। সে সুন্দর পৃথিবী দেখার জন্য অপেক্ষা করে। তার বড় ভাল লাগে।

(২)

মায়ের নাকি "ডেট" এসে গেছে,এখন হাসপাতালে যেতে হবে। ডেট ব্যাপারটা কী? আর তার সাথে হাসপাতালে যাওয়ার সম্পর্কই বা কী? হাসপাতালে নাকি তার জন্ম হবে। মানে বন্ধ ঘর থেকে মুক্তির প্রক্রিয়াটা এখানেই ঘটবে। হাসপাতালকে তার এখন খুব একটা খারাপ লাগছে না। এই মুহূর্তে সে গাড়ি করে যাচ্ছে। গাড়ির নাম "এ্যাম্বুলেন্স"

হাসপাতালে একদল ছেলেমেয়ে তার মাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। একজন বয়স্ক মহিলা তাদের দিকে হাত নাড়িয়ে কিছু বলছেন। হাত নাড়া দেখা যাচ্ছে না,চুড়ির শব্দে বোঝা যাচ্ছে। তার হাতে লোহা টোহা জাতীয় কোন বস্তু ঠং ঠং আওয়াজ করছে। মহিলার কথা বার্তার বেশিরভাগই দুর্বোধ্য। এগুলোর মধ্যে সে কিছু শব্দ মনে রাখতে চেষ্টা করল। মহিলা পড়াচ্ছেন "ডেসট্রাকটিভ অপারেশন"

যে সব "ফিটাস" বাঁচবে না,তাদের মাথা কেটে বা ফুটো করে মাঝে মাঝে বের করতে হয়। ফিটাস মানে কী কে জানে!ভদ্রমহিলা বললেন "হাইড্রকেফালাস" এ ফিটাস এর মাথা বড় হয়। যেগুলো বাঁচবে না এই ফিটাস গুলোর মাথা "ক্রেনিওপারফোরেটর" দিয়ে ফুটো করে "নরমাল স্যালাইন" দিয়ে "ওয়াশ" করতে হয়। সে মোটামুটি কিছুই বুঝল না। বাইরের পৃথিবীটা মনে হয় খটমটে শব্দে ভর্তি। সে আরও কতগুলো খটমটেশব্দ শুনল,"ক্রেনিওক্লাস্ট","ক্রেনিওটমি স"
এগুলো দিয়ে কী করে তা আর শোনা হল না। সে ঘুমিয়ে পড়ল ।

(৩)

যখন ঘুম ভাঙল,সে বুঝল তার ঘর নিজে নিজেই নড়াচড়া শুরু করেছে। এত জোরে নড়ছে,মনে হচ্ছে ঘরটাই ভেঙ্গে যাবে। তার মায়ের চীৎকার শোনা যাচ্ছে। মনে হয় মুক্তির সময় এসে গেছে। সে ধীরে সুস্থে দরজা খুঁজতে গেল। দরজা পাওয়া গেছে কিন্তু বের হওয়া যাচ্ছে না। এত ব্যাস্ত হওয়ার কিছু নেই। আগামি একশো বছর তো ওই পৃথিবীটা ই দেখতে হবে। সে ধৈর্য ধরে বসে রইল।

ঘর এসে বেশ জোরে ই ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে কিছুতেই এগোতে পারছে না। যারা তাকে বের করতে এসেছে তারা নিজেদের মধ্যে কি কি জানি বলাবলি করছে। একজন বলল "ফিটাস এর মাথা বড় নাকি!"
সে কি ফিটাস? হলেই কী আর না হলেই বা কী! আল্লাহ্‌ আর ভগবান নামের দুই মহাশক্তিধর ব্যাক্তি তার পক্ষে আছেন। নিশ্চয়ই তাঁরা মুক্তিও খুব সহজেই দিতে পারবেন।

কিছুক্ষন পর দরজা দিয়ে একটা চকচকে লোহার জিনিস ঢুকে গেল। সে আনন্দিত চোখে এটাকে দেখল। নিশ্চয়ই তাকে পথ দেখাবার জন্য এটা এসেছে। সে হাত দিয়ে ধরতে গেল। সম্ভব হল না। জিনিসটা সোজা এসে তার মাথায় ঢুকে গেল। সে তখনও পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর। নিশ্চয়ই এটা জন্মের কোনও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একটু পরেই পৃথিবী দেখা যাবে। পৃথিবীতে নাকি খুব সুন্দর একটা রঙ আছে, তার নাম সবুজ।

বেশিক্ষন স্বপ্ন দেখা গেল না। সে স্থির হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে তার মাথায় যে জিনিসটা ঢুকেছে তার নাম সম্ভবত "ক্রেনিওপারফোরেটর"
একটু পরে ই নরমাল স্যালাইন দিয়ে ওয়াশ করা হবে।
তখন হয়তো তার, আর ভাবনার ক্ষমতা থাকবে না। কী বা আসে যায় তাতে! একটা স্বপ্নভঙ্গই তো। ব্যাপারটা তার কাছে খুব বেশি দুঃখের মনে হল না।

একটা নল দিয়ে নোনতা পানি আস্তে শুরু করেছে। এটাই মনে হয় নরমাল স্যালাইন।
তার মনে হচ্ছে সে সংজ্ঞা হারাচ্ছে । ও আচ্ছা। এটাকে ই মৃত্যু বলে! এ আর এমন মন্দ কী!
সে প্রাণ পণে "মা" বলে ডাকতে চেষ্টা করল।
মহাবিপদের সময় যে মাকে ডাকতে হয়,পৃথিবী না দেখা এই শিশুটা তা কিভাবে জানল কে জানে!

________
শুভ্র সৈকত


মন্তব্য

মরুদ্যান এর ছবি

সিনারিওটা কি এরকম যে বাচ্চাটা বাঁচবেনা তাই মাকে বাঁচাবার জন্য এই অপারেশন? কিন্তু বাচ্চাটা তো মাথায় রড ঢুকানোর আগ পর্যন্ত বেঁচে ছিল। সিজারিয়ান করা যায়না এসব ব্যাপারে?
থিম ভাল লেগেছে।

দ্যা রিডার এর ছবি

মন খারাপ

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

লেখা ভালো লেগেছে, তবে মরুদ্যান এর প্রশ্নটা আমারও ।

আসলে, মনে হচ্ছিল বাঁচবে না, তবে যদি কোনও রাস্তা থাকত বাঁচাবার তাই আর কি । মন খারাপ

ধূসর জলছবি এর ছবি

চলুক

তাপস শর্মা এর ছবি

ভালো লাগলো। চলুক

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।