এম-ওয়র্ড এবং শব্দচয়ন (সংশোধিত)

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ১৮/০৬/২০১২ - ১০:০২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

দুদিন আগে ইন্টারনেটে ‘প্রথম আলো’র একটা খবরের শিরোনাম দেখে ঠোঁটে মুচকি হাসি খেলে গেল,
“রোহিঙ্গাদের জন্য ধর্মভিত্তিক দলের বিক্ষোভ”।

হাসিটা আকর্ণবিস্তৃত হল যখন দেখলাম খবরের নিচে প্রথম মন্তব্যটিই হল, “হোয়াট এ ল্যাঙ্গুয়েজ় ইউজ়ড বাই দ্যা রিপোর্টার ‘ধর্মভিত্তিক দল’! দে হ্যাভ গট এ রেজিস্টার্ড নেম আই থিঙ্ক” । আমার এ হাসি অনেকটা একটামাত্র রচনা পড়ে হলে গিয়ে ওইটাই কমন পাও্য়ার হাসির মত, কারণ এই কদিন আগে ল্যাঙ্গুয়েজ় ব্যাবহারের এরকমই আরেকটা বিষয় শিখলাম।

টু মেক দ্যা শর্ট স্টোরি লং; সামার এ ওয়াশিংটন ডিসি তে গেলে যেদিকেই তাকাবেন বিচ্ছুর দল, মানে আমাদের দেশে বাচ্চাদের যেমন স্কুল থেকে বোটনিকাল বা চিড়িয়াখানায় নি্যে যায় (বা কোনোকালে যেত), এখানে অনেক স্কুল সামার এর ছুটি হলে বাচ্চাদের নিয়ে আসে রাজধানী দেখাতে।এয়ারপোর্ট, রেলস্টেশন যেখানেই যান, কিচিরমিচির। তো আমি ডিসির কমলাপুর-তুল্য ইউনিয়ন স্টেশনে বেকার বসে আছি, এদের কিচিরমিচির বোঝার চেষ্টা করে ছেড়ে দিয়েছি, লাঞ্চ নিয়ে হাবিজাবি কথা, আলফ্রেডো সস বলে যেটা দিল সেটা মোটেও আলফ্রেডো না, চিকেন অ্যাড করলাম বলে দুইইইটাকা বেশি রাখল, এইসব। হটাৎ করে একটা কথা কানে লাগলো, ‘ওহ্, বিকজ় ইটস এম-ওয়র্ড?’। আরে, নতুন জিনিস মনে হয়! কৌতূহলী হয়ে কান খাড়া করতে করতেই আরেকটা শব্দ ধাক্কার মত কানে লাগ্ল ‘মুসলিম’! তবে কি… …?

যা বুঝলাম, ওদের একজন মুসলমান তাই ক্যাপিটল ট্যুর এ (এদের সংসদ ভবন, দর্শণার্থীদের জন্য এয়া্রপোর্ট এর মত সিকিউরিটি) ঢোকার সময় তাকে ‘মাই নেম ইজ খান’ এর মত ভোগায় কিনা তাই নিয়ে টেনশিত ছিল, তা ভোগায় নাই বলে এখন সবাই আহ্লাদিত, তবে মুসলিম শব্দটা বলতে একজন আরেকজনকে বারণ করছিল।

বাড়িতে ফিরে গুগ্লাইলাম, তেমন কিছু পেলাম না, তবে কয়েকটা ব্লগ পড়ে যা বুঝলাম তা হল এদের মিডিয়া অনেকদিন ধরেই ‘ডোন্ট সে দ্যা এম-ওয়র্ড’ নীতি অবলম্বন করছে। মানে কথায় কথায় মুসলিম বলা যাবেনা, বিশেষ করে যেখানে উস্কানির সম্ভাবনা আছে। যেমন হয়ত কোনো মুসলিম পরিবারে খুন হয়েছে, খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই তারা রিপোর্ট করছে ‘আরব বংশোদ্ভূত পরিবার’ বলে। অথবা অনেক স্কুলে ইতিহাস পড়ানোর সময় ‘ক্রুসেড’ বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের (আসলে মূলত মুসলিমদের) ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের আশঙ্কা। কা্রণটা হল নাইন ইলেভেনের পর থেকে মুসলিম, জ়ঙ্গি, সন্ত্রাস এগুলো সমার্থক হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এদের সন্দেহের চোখে দেখে, ভয় পায়। সেইসময় মিডিয়াই তাদের নাম বারবার পাঞ্চওয়র্ড হিসেবে তুলে আনে, বা আনতে হয়। কিন্তু একটা বিচ্ছিন্ন খুনের ঘটনা যেকোনো ধর্মের পরিবারেই ঘটতে পারে। সেখানেও যদি বলা হয় মুসলিম পরিবার, মানুষ বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম ধরে নেবে ‘মুসলিম’ মানেই খুনখারাপি। অথবা যদি বলা হয় মুসলিমরা খেপে যাবে সেই ভয়ে ইতিহাস থেকে ক্রুসেড বাদ দেয়া, ভাববে না জানি এরা কি ভয়ঙ্কর। এভাবে একটা জাতিকে বারবার আঙ্গুল তুলে দেখালে তাদের প্রতি বাকিদের বিষেদাগারকে বদ্ধমূল করা হয়, আবার সেই জাতিকেও খেপিয়ে তোলা হয়। এর কোনটাই কারো কাম্য নয়। ‘মুসলিম’ মানেই ত্রাস নয়, তাই আপাতত এই শব্দটাকেই এড়িয়ে যাও। এই সিদ্ধান্ত সরকারের, বুদ্ধিজীবিদের, না মিডিয়ার, তা জানিনা, কিন্তু সূত্রপাত যেহেতু মিডিয়ার মাধ্যমে, শোধরাবার ভারও তাদের উপরই বর্তায়।
তাই মনে হল আমাদের দেশেও মিডিয়া তাই আর ‘ইসলামি দল’ না বলে বলছে ‘ধর্মভিত্তিক দল’। এরা কারা আমরা সবাই জানি, অহেতুক আর উস্কানি বাড়িয়ে লাভ কি? আর তাছাড়া ইসলামকে এভাবে জড়ালে ‘ইসলাম’ কি তা শেখার আগেই শব্দটার উপর একটা ভুল ধারণা হবে। এখনি দেশেবিদেশে তরুণরা ধর্ম নিয়ে কথা বলতেই অনীহা দেখায়, কারণ তারা দেখে ধর্ম মানবধর্মের উল্টোপথে হাটে। এরপর ‘রিলিজিয়ন’টাই এড়িয়ে যাবার জিনিস হয়ে যাবে, বলা হবে, ওরা বলবে “ডোন্ট সে দ্যা আর-ওয়র্ড”।

আবার যেমন আজকে রোহিঙ্গারা আসলেই অসহায়, কিন্তু দেখা যাচ্ছে এদের উপর মানুষের রাগও কম নয়; রোহিঙ্গারা এই অকাম করেছিল, ওই অকাম করেছিল। এখনকার এই রোহিঙ্গা-ঝড় একসময় ঝিমিয়ে যাবে, রোহিঙ্গারাও তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাবে। কিন্তু দেখবেন তখন মিডিয়া টোন লো করে ফেলবে, তখন বলা হবে একটি সুইট গোষ্ঠীর কিউট মানুষ এই অকামটা করে ফেলেছে। এই স্ট্র্যাটেজি কখনো কাজে দেয়, কখন দেয়না। আসলে শিষ্টাচারের বাইরে গেলে তার গুষ্টি ধরে মানুষ টান দেবেই, তা সে অনাচার, অবিচার, অত্যাচার বা ব্যাভিচার যাই হোক। এখনও কূটবুদ্ধির লোককে আমরা ‘ব্রিটিশ’ বলি। সেই সূত্রে এই বলে শেষ করি, ‘তুই মানুষ না পুলিশ’ এই কৌতুক তো পুরনো, মিডিয়া এই শব্দটাও এখন আর বেশি ব্যবহার করেনা, কয়েকগুন কষ্ট বেশি হলেও বলে ‘আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য’!

-----------------

চয়নকার


মন্তব্য

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

লেখার মোটিভটা ঠিক বুঝিনি

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

রামগরুড় এর ছবি

সহমত, লেখার অর্ধেকই দেখি ডি.সি. আর আলফ্রেডো সসের কাহিনী। আরেকটু ঝেড়ে কাশা দরকার ছিল মনে হয়।

অনিন্দ্য রহমান এর ছবি

আপনার লেখায় তো কোনো জে-ওয়ার্ড (জামাত) বা এস-ওয়ার্ড (শিবির) পাইলাম না। ভুলে বাদ পড়ছে মনে হয়। আমাদের মিডিয়াতেও এইটা হয়। তবে মিডিয়ার এই অভ্যাসের সাথে বিশ্বরাজনীতির কোনো দুরূহ বাস্তবতার সংযোগ নাই। এইটা তাদের ডাইরেক্ট মতলববাজী।

'ধর্মভিত্তিক দল' বলতে বহুত লোক বহুত ধান্দায় নানা কিছু বুঝায়। কিন্তু সুশীলরা একটা বিষয়ে প্রায় কনসিসটেন্ট তারা জামাত-শিবিরের নাম নেয় না।

আর ইসলাম কী, মুসলমান কী ইত্যাদি নিয়া লম্বা তর্কে সময় নষ্ট করা যায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হইল এইটা বুঝা যে জামাত-শিবিরের একটা স্ট্র্যাটেজি আছে যে তারা এইটা প্রমাণ করতে উদগ্রীব যে তারা আক্রান্ত কারণ তারাই ছহীহ ইসলাম এবং মুসলিম।

সম্পূরক মন্তব্য, কিঞ্চিত অফটপিক

ব্লগের জামাত-শিবিরীয় ধান্দাবাজদের ৪ প্রকার টোন

টোন ১: ধর্ম বুঝি রাজনীতি বুঝি, হেহে সব বুঝি, বুঝে গোপনে অন্যের লেখা মেরে দেই
(টোন ১ এর ভ্যারিয়েশন: বয়স তো অনেক হইল, কতকিছু দেখলাম। ধর্মও বুঝলাম, রাজনীতিও বুঝলাম। আমাদের আসলে জাতীয় স্বার্থে বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসা উচিৎ, এবং বিম্পি-জামাতকে ভোট দিতে কোনো অপরাধবোধে ভুগা উচিৎ না)

টোন ২: ধর্ম বুঝি রাজনীতি বুঝি না, দুআ করি মানুষ সৎ ও যোগ্যলোকগুলিকে চিনতে পারবে

টোন ৩: ধর্ম বুঝিনা রাজনীতি বুঝি, আর তাই বুঝি শোষকশ্রেণীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ধর্মভিত্তিক দলগুলি সামিল হইলে আপত্তির কিছু নাই ... হক কথা

টোন ৪: ধর্ম বুঝিনা রাজনীতি বুঝি না, বুঝি-শুধু-মানবতা, মানবতার মুড়ি খাই ... এইসব মুড়ি দিয়া জঙ্গীবাদের মোয়া তৈরি হইলে আমি কি দুষ করলাম ...


রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক

অরফিয়াস এর ছবি

আপনার লেখার মূলভাবটা ধরতে পেরেছি, কিন্তু লেখাটা আর একটু বিস্তারিত হলে অনেকের কাছে সরাসরি জিনিসটা ধরা দিতো। লেখা চালিয়ে যান।

----------------------------------------------------------------------------------------------

"একদিন ভোর হবেই"

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

শব্দচয়ন নিয়ে চয়নকারের এই লেখার প্রেক্ষিতটা ভাল লাগল।
তবে এই দুটো ক্ষেত্র ছাড়াও আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সুবিধেমাফিক শব্দচয়ন ব্যাপারটা ঘটে থাকে।
এ নিয়ে আরও একটা বিস্তারিত পোষ্টের আশায় থাকলাম।

প্রকৃতিপ্রেমিক এর ছবি

আপনার লেখার হাত ভালো মনে হচ্ছে। নিয়মিত লিখে যান।

মরুদ্যান এর ছবি

লেখায় কি বুঝাতে চেয়েছেন তার চেয়ে ভাল বুঝেছি যে আপনার লেখার হাত বেশ ভাল।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।