বই মেলায় প্রাপ্তি আর হতাশা

মাসুদ সজীব এর ছবি
লিখেছেন মাসুদ সজীব [অতিথি] (তারিখ: সোম, ২৪/০২/২০১৪ - ১২:৪৬পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ঢাকা থেকে বেশ দূরে থাকি বলেই ছুটির দিন ছাড়া বই মেলায় আসার কোন সুযোগ হয়না। তাই শুক্র-শনি বারের অপেক্ষায় থাকি, অপেক্ষার প্রহর কত দীর্ঘ হয় সেটা আমি ফেব্রুয়ারি আসলে সবচেয়ে ভালো বুঝি। বই মেলা এই পর্যন্ত তিনটি শুক্রবার পার করলো, প্রতি শুক্রবার তাই উপস্থিত ছিলাম মেলাতে। বই মেলায় উপস্থিত থাকা টা এইবার আমার জন্যে বেশ কষ্টকর ছিলো. কোন সন্দেহ নেই যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছে গত কয়েক বছরে তারপরও ধৈর্য্যর সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি দিতে হয় এই যোগাযোগ মাধ্যমেই। অজস্র বার সেই ধের্য্য পরীক্ষায় সফলতার সহিত পাশ করার সাফল্যকে সাথী করে দুই ঘন্টার পথ ৫-৬ ঘন্টায় শেষ করে গত পরশু মেলায় পৌছালাম বিকেলে। জনস্রোতের সাথে এইবার দেখলাম ধূলোর স্রোতও ফ্রি। এদিক সেদিক ঘুরোঘুরি করে এক ছোট ভাই এর প্রকাশনা স্টলে বসলাম। প্রচুর মানুষ বরাবরের মতো, ঠিক উৎসবের একটা আমেজ, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সবাই এসেছে মেলায়। ঘন্টা দুয়েক স্টলে বসে কিছুটা হতাশ হয়ে লক্ষ করলাম বই বিক্রি হলো ২-৩ টি। কিছুক্ষন পর দেখি একটা হট্টগোল পড়ে গেল মেলায়। উৎসুক হয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি প্রায় ৫০ সদস্যের দল নিয়ে বাংলার বেসম্ভব নায়ক জলিল ভাই বইমেলায় হাজির! সিনা টান করে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির লায়ক সাহেব ভাব নিলেন উনার উচ্চতা ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি. তার সবুজ কোর্ট পড়া বিশেষ বাহিনী কে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন আর ধূলার একটি জগত তৈরিী করে দিলেন। বেসম্ভব নায়ককে দেখতে মেলায়ও যে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে সেটা আমি ভাবিনি। এই ঘটনায় কিছুটা বেদনাহত হয়ে ফিরলাম নিজের ঠিকানা ধ্রুবপদের স্টলে। সেই বেদনাকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিলো যখন পা রাখলাম পাঠক সমাবেশ প্রকাশনায়, বই এর দাম তারা বোধহয় স্বর্ণের দামে রাখতে শুরু করেছে। ২০০ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম ৪৫০ টাকা! তারপরও এক বইয়ের মাধ্যমে শহীদুল্লাহ জহিরের সব লেখাকে প্যাকেট ভর্তি করে লাইনে না দাঁড়ানোর ভয়ে দৌড় দিলাম নান্দনিক প্রকাশনার দিকে। অথচ কোন প্রকার লাইনে না দাঁড়িয়েই নিয়ে নিলাম চরম উদাসের লাইনে আসুন, লাইনে না দাঁড়িয়ে যেহেতু এই পুস্তক নিতে পারছে বাঙালি. তাই এই বই পড়ে লাইনে আসার কোন সম্ভবনা দেখছি না আমি, হা হা। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনা স্টলে গিয়ে বোকা বনে গেলাম, বললো গোয়েন্দা ঝাকানাকার সব কপি শেষ! কাল পাবেন, সেই দুক্কে আর পৃথিবীর পথে পথে ঘুরতে ইচ্ছে করেনি তাই ছায়াবীথিতে আর যাওয়া হয়নি।

গতকাল শনিবার বইমেলায় একটু তাড়াতাড়ি উপস্থিত হলাম, আর তাড়াতাড়ি আসার উপহার হিসাবে নতুন আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ হতে দেখলাম, যদিও বই মেলা নাটকের কোন স্থান না..! তবু মাঝে মাঝে নাটক কিছু হয়, বেশ কয়েক বছর আগে একবার হলুদ পাঞ্জাবির নাটক হয়েছিলো বই মেলাতে. ভুলে যাওয়া সেই স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলে বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে এই মহা নাটকও দেখতে হলো. বিকেল ৫টার দিকে বসে আছি ধ্রুবপদরে স্টলে, তখন চারদিকে হৈ হৈ শুনি, ছোটভাই শুভ্রকে জিজ্ঞেস করলাম বিষয়টা কি? ও বললো, ভাইয়া ভূত..! আমিতো অবাক? দিনে দুপুরে ভূত আসবে কোথায় থেকে? পরে বললো এফএম ভূত, রেড়িওতে প্রচারিত জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান, যা নাকি সত্য ঘটনার উপর নির্মিত হয় (সৌভাগ্য আমার সে অনুষ্ঠান কখনো শুনতে হয়নি, ভুল উচ্চারন আর বেংলিশ ভাষা দ্বারা পরিচালিত এফএম কখনোই আমাকে টানে নি) তো সেই ভূতের কাহিনী নাকি পুস্তক আকারে বের করেছে আর তাতেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বইটি কিনতে...!

সময়ের সাথে হৈ হুল্লুড় বেড়েই চললো, শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে গেল বইটি সংগ্রহ করতে. দোকান ভেঙ্গে ফেলার উপক্রম তখন, ঘন্টাখানিকের মাঝেই বইটি শেষ, কিন্তু লাইন ঠিক আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে. তারপর পুলিশ এসে মহৎ পাঠকদের বোঝাতে সক্ষম হলো কাল আবার পাবেন বইখানি, সাহিত্যের সেই সব পাঠকেরা হাসিমুখে দেখি সব মেনে নিলো আর সন্ধ্যার আগেই স্টলটি বন্ধ হয়ে গেল..!

বই নিয়ে নাটক করবে প্রকাশক কিংবা লেখকে এটা অগ্রহনযোগ্য. আজকে জানলাম কালকে যা কিছু হয়েছে তার পুরোটাই নাটক. নাটক কি ছিলো? নাটক আসলে ওই প্রকাশনাই করেছে, ভাড়া করা কিছু লোক দিয়ে একটা গুজব আর হৈ হুল্লোড় সৃষ্টি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে চেয়েছে এবং তারা সেটাতে বেশ সফল হয়েছে. বই মেলার এখন মূল আলোচনা এই ভূত বইটি. বই এর মার্কেটিং পলেসি যদি এমন অভিনব ভন্ডামিতে হয় তাহলে বইয়ের ভিতরে কি থাকতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা..!

মানুষের ভীড় যখন কিছুটা কমে আসলো আবারো গেলাম নান্দনিক এর সামনে, অণু দাকে পেলাম, সেখানে পরিচয় হলো সুপ্যার ম্যান সিমন ভাই, ছড়াকার রিটন ভাই এর সাথে। দূর থেকে হাসিব ভাইকেও দেখলাম কিন্তু কথা হয়নি। একসাথে এতগুলো প্রিয় আর জ্ঞানী মানুষগুলোকে দেখতে পাওয়া বই মেলায় আমার সবচেয় বড় পাওয়া। সমস্ত দিনের ক্লান্তি শেষে আবারও সীমাহীন কষ্ট আর ধৈর্য্য পরীক্ষা দিয়ে ট্রেনে ২-৩ ঘন্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাত দুটোয় ফিরলাম নিজের ঠিকানাতে. ক্লান্তি ছুঁয়েছে শরীরকে কিন্তু পারেনি মনকে ছুঁতে. বই মেলা এমনি ভালোবাসার নাম যা ক্লান্ত করেনা কোনদিন মনপ্রাণ. ভালোথাকুক বাংলার বই মেলা, ভালোকাটুক লেখক পাঠকের এই মিলন মেলা.

মাসুদ সজীব


মন্তব্য

তারেক অণু এর ছবি

সেদিন টা অছাম ছেলো !

অতিথি লেখক এর ছবি

আসলেই অসাধারণ ছিলো, আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মাসুদ সজীব

ত্রিমাত্রিক কবি এর ছবি

শহীদুল্লাহ জহির নাকি শহীদুল জহির?

_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজীবনের অপূর্ণ সাধ মেটাতে চাই
আরেক জীবন, চতুর্দিকের সর্বব্যাপী জীবন্ত সুখ
সবকিছুতে আমার একটা হিস্যা তো চাই

অতিথি লেখক এর ছবি

অবশ্যই শহীদুল জহির, ভুলের জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু ঠিক করে নেওয়ার কনো উপায় নেই বলে আপতত ঠিক করতে পারছি না মন খারাপ । মন্তব্যের জন্যে আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মাসুদ সজীব

প্রোফেসর হিজিবিজবিজ এর ছবি

শনিবার সকালে শিশুপ্রহরে আমার ছেলেকে নিয়ে গেছিলাম বইমেলায়। আপনি ছিলেন জানলে তো দেখা করে আসা হতো! এর আগে একদিন তারেক অণু, রিসালাত বারী আর নিয়াজ মাওলা ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল।

____________________________

অতিথি লেখক এর ছবি

শনিবারে আপনি গিয়েছেন সকালে আর আমি বিকেলে, দেখা হলে কোলাকুলি অবশ্যই ভালোলাগত। দেখা হবেই নিশ্চিয় একদিন আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মাসুদ সজীব

অতিথি লেখক এর ছবি

বাংলাদেশে বইয়ের চেয়ে নাম বিক্রি হয় বেশি।

সাফিনাজ আরজু এর ছবি

বইমেলায় গিয়ে এত সব সেলিব্রেটি দেখছেন- ছবি কই মাসুদ ভাই? চোখ টিপি

__________________________________
----আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে---

অতিথি লেখক এর ছবি

লাইট ক্যামেরা এ্যাকশান সবি ছিলো কিন্তু ছবি তোলার মতো কেউ না থাকায় আর তোলা হয়নি দেঁতো হাসি । মন্তব্যের জন্যে আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মাসুদ সজীব

অতিথি লেখক এর ছবি

বই মেলা এমনি ভালোবাসার নাম যা ক্লান্ত করেনা কোনদিন মনপ্রাণ

-------------------
সলিটারি সাইলেন্স

অতিথি লেখক এর ছবি

হাসি আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

মাসুদ সজীব

অতিথি লেখক এর ছবি

তারপরেও এতোজন মানুষ বইকে কেন্দ্র করে এক জায়গায় আসছে, এটা অনেক ভালো লাগে। ধূলার সমস্যাটা নিয়ে যদি কিছু করা যেতো। ইচ্ছে করলে করা যায়। পুরো জায়গাটাতে ইট বিছিয়ে বা ঘাসের কার্পেটিং করে। তাহলে অনেক ভালো হতো।

- ফরহাদ হোসেন মাসুম

অতিথি লেখক এর ছবি

এত মানুষের মিলন মেলা আর নতুন নতুন বইয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি প্রিয় লেখকদের সান্নিধ্যে আসার জন্যে মেলা তো একমাত্র সুযোগ, তাই বই মেলার প্রতি আকর্ষন কোনদিন ই কমবেনা পাঠক-লেখক সবার। ঘাসের কার্পেটিং করা যেতে পারে, তবে বছরে ১মাস পর দেখা যাবে কেউ তার যত্ন নিচ্ছে না চিন্তিত

মাসুদ সজীব

আয়নামতি এর ছবি

বই নিয়ে নাটক করার প্রয়োজন পড়লো কেন। যদি শব্দের জোর থাকে এমনিতেই বিকোবে।
আজবই হলাম ভাই ঘটনা জেনে। আপনি নিজে কয়খান বই কিনলেন তার ফটুক তো দিলেন না রেগে টং
প্রাণের টানেই কতোসব কষ্টস্বীকার করে মানুষজন বইমেলাতে যায়।
ফেব্রুয়ারির এই মেলা মার্চ আর ডিসেম্বরে করার ব্যবস্হা নিলে মন্দ হতো না।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে এই মাস দুটো জড়িত, হলে মন্দ হয় না বলেন?

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

হাততালি
বুদ্ধমুর্তি কই? খালি কথায় হপে? খাইছে

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA