ফুটবল ও আমেরিকাঃ বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ের একটি স্মৃতি

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ২০/০৮/২০১৪ - ৩:১৪অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ঘটনা এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দিকের। ঠিক তারিখ মনে নেই, কিন্তু তখনও গ্রুপ স্টেজের খেলা চলছে, সম্ভবত প্রথম সপ্তাহের কোন এক দিন। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে ওয়ালমারট গিয়েছিলাম। কিছু টুকিটাকি জিনিস কেনার ছিল। কিনে বের হয়ে আসার পথে দেখি এক বয়স্ক সাদা ভদ্রলোক ৫৫ ইঞ্চি এলইডি টিভি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কি মনে হতে তার সাথে কথা বলা শুরু করলাম। ভদ্রলোক খাস টেক্সান, কাউবয়দের দক্ষিনা টানে ইংরেজি বলেনঃ

আমিঃ 'সো, ওয়াটস দ্যা নিউ টিভি ফর?'
ভদ্রলোকঃ 'ওয়েল, দ্যা ওয়ার্ল্ড কাপ হ্যাস স্টারটেড, সান। নিড এ বিগার টিভি ইফ আই এম গোয়িং টু ইনজয় ইট প্রপারলি!'

বলতে বলতে ভদ্রলোক তার শপিং কার্ট ঠেলতে ঠেলতে চলে গেলেন। আমি কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম। মনে পড়ল আজ থেকে প্রায় বারো বছর আগের কথা, যখন আমেরিকায় প্রথম আসি উচ্চশিক্ষার জন্য। ভার্সিটির হলে নতুন সহপাঠীদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি। কোন খেলা প্রিয় সেই প্রসঙ্গ উঠতে যখন বলেছিলাম আমি ফুটবল সবচেয়ে পছন্দ করি তখন আমার সাদা সহপাঠীরা বিদ্রুপভরা অট্টহাসি হেঁসে মন্তব্য করেছিলঃ 'সকার? সিরিয়াসলি? হাহাহা দ্যাটস এ গার্লস গেম, হাউ ক্যান এ গাই লাইক সকার? আর ইউ গে?'

এক দশক পেরোতে না পেরোতে এখন আমেরিকার ধারনাই পাল্টে গেছে ফুটবল সম্বন্ধে। ২০০২ সালে আমেরিকার কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত উত্তীর্ণ হওয়া, তারপর ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের সাথে ড্র করা এবং আলজেরিয়ার সাথে নাটকীয়ভাবে ল্যান্ডন ডনভানের গোলে জয়লাভ করা... ফুটবলের জনপ্রিয়তা আমেরিকাতে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এখন আমেরিকানরা নিজেদের জাতিয় দলের খবর রাখে, ডনভানকে কেন দলে নিল না ক্লিন্সম্যান, জজি আল্টিডর কতগুলো গোল করতে পারবে, ক্লিন্ট ডেম্পসি কি এবার অধিনায়ক হিসেবে ভাল করবে, এসব নিয়ে তারা আলোচনা করে। ইএসপিএনে ফুটবলের খবর ও হাইলাইটস নিয়ে থাকে দৈনিক আয়োজন। এমনকি শুধু ফুটবল-কেন্দ্রিক টিভি চ্যানেল আছে কয়েকটি, যারা ইউরোপিয়ান লীগগুলো একচেটিয়া সম্প্রচার করার অধিকার জিতবার জন্য কোটি কোটি ডলারের চুক্তি করে। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে আমেরিকান ছেলেরা আজকাল ফিফা ভিডিও গেম খেলে। ফিফা প্রতিবছর আমেরিকার বেস্টসেলার গেমের লিস্টের উপরের দিকে থাকে, বাস্কেটবল কিংবা আমেরিকান ফুটবলের ভিডিও গেমের চেয়েও ফিফার কাটতি বেশী। বিশ্বকাপ দেখার উপলক্ষে এখন টেক্সান কাউবয়রাও নতুন টিভি কিনে।

বদলে যাচ্ছে এই আমেরিকাও, আমার চোখেরই সামনেই! 'নো আই ওয়াজ নট গে, বাট ইউ গাইস ইউজড টি বি ইগনরান্ট ইডিওটস ফর শিউর' ভাবতে ভাবতে মুচকি হেসে আমার গাড়ির দিকে পা বাড়ালাম।

কিছু মৌলিক পরিসংখ্যানঃ এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল আমেরিকাতে টিভি দর্শকের রেকর্ড গড়েছে - আনুমানিক ২.৬ কোটি দর্শক আমেরিকাতে বসে জারমানি/আরজেন্টিনা ফাইনাল উপভোগ করেছিলেন। সেই তুলনায় ২০০৬ সালের ফ্রান্স/ইতালি ফাইনাল দেখেছিলেন আনুমানিক ১.৭ কোটি দর্শক, এবং ২০১০ সালের স্পেন/হল্যান্ড ফাইনালের দর্শক সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২.৪ কোটি। আশা করি আমেরিকায় ফুটবলের জনপ্রিয়তাবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

- ইয়ামেন


মন্তব্য

আয়নামতি এর ছবি

কাহিনি সত্যি। এবারে আম্রিকানেরা অনেক আগ্রহ নিয়ে খেলা দেখেছে।
আর দলটা খেলেছেও দারুণ(আমি তাদের সাপুটার নই দেঁতো হাসি)!

অতিথি লেখক এর ছবি

শুরুতেই আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-। ডালাসের কাউবয় (স্থানীয় আমেরিকান ফুটবল দল) স্টেডিয়ামে বড় পর্দায় জাতীয় দলের খেলা দেখানো হয়েছিল...যদিও যেতে পারিনি শুনেছি হাজার হাজার মানুষ হয়েছিল। সাধারনত ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে ফুটবলের জনপ্রিয়তা অনেক বেশী, কারন সেদিকা মেক্সিকান ও ল্যাটিন জনসংখ্যা বেশী... কিন্তু এবার দেখলাম সাদারাও অনেক আগ্রহ নিয়ে খেলা দেখেছে। জিনিসটা অনেক চোখে পড়েছে এবার তাই লেখাটা লিখলাম। হাসি

- ইয়ামেন।

সাফি এর ছবি

ফুটবল কিন্তু আমেরিকায় অনেক আগে থেকেই পপুলার। কিন্তু স্কুলের পরে আর ওরা খেলতনা। দর্শক আর স্পন্সরের অভাবে। আমি আত্মীয় স্বজনের বাচ্চাকাচ্চাদের অনেক কেই দেখেছি স্কুলে ছোটবেলায় ফুটবল সিরিয়াসলি খেলতে, কোচিং শুদ্ধ। সাধে কি আর সকার মম কথাটা আসছে? চোখ টিপি

ধ্রুব আলম এর ছবি

হো হো হো

অতিথি লেখক এর ছবি

আমার মনে হয় সেটাই ছিল সামাজিকভাবে ফুটবলের জনপ্রয়িতা লাভের পথে বাঁধা। ২০০২ সালের আগে পর্যন্ত আমেরিকায় ফুটবল বলতে মেয়েদের বা বাচ্চাদের খেলাই বুঝাত, কারন মেয়েদের জাতীয় দল সবসময় অনেক সফল ছিল... মিয়া হ্যাম এখনও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমীলা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃত, এবং বিশেষ করে ১৯৯৯ সালে টাইব্রেকারে মহিলা বিশ্বকাপ আমেরিকা জিতার পর (যেই খেলায় ব্র্যান্ডি চাস্টেইনের শেষ পেনাল্টি শটে গোল দেবার পর জার্সি খুলে উচ্ছাস কালো স্পোর্টস ব্রা বিক্রেতাদের কপাল খুলে দেয় দেঁতো হাসি ) থেকে আসলে মেয়েদের মধ্যে ফুটবল প্রথম জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করে। আমি আমেরিকায় আসি ২০০২ সালের জানুয়ারিতে, তখনও আমেরিকানদের চোখে ফুটবল মানে বাচ্চাকাচ্চাদের এবং মেয়েদের খেলাই। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে আমেরিকা প্রথম কোওয়ারটার ফাইনাল পর্যন্ত যায়, পথে পর্তুগালের কথিত 'গোল্ডেন জেনেরেশন' এবং চির প্রতিদন্ধি মেক্সিকোকে হারিয়ে। তখন থেকেই আস্তে আস্তে ফুটবলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে এই দেশে।

- ইয়ামেন

অতিথি লেখক এর ছবি

হ, আম্রিকায় ফুটবল খেলা জনপ্রিয় হইতাছে, ভাবতেই কেমুন যানি গা শিরশির করতাছে।

-- চুরুৎ-ফ্যাক্টর

অতিথি লেখক এর ছবি

বলদাগুলার কাছে খেলা মানেই ত কুস্তি। জোরাজোরি ছাড়া আর কি জানে বলদাগুলা? শয়তানী হাসি

---------------
আশফাক(অধম)

সত্যপীর এর ছবি

বেসবল বাস্কেটবলে জোরাজুরি কোন জায়গায় দেখায় যায়েন অ-বলদা আশফাক(অধম) ভাই।

..................................................................
#Banshibir.

অতিথি লেখক এর ছবি

বেসবলে জোরাজোরি কিছুটা কম, যদিও মাঝে মধ্যে মারদাঙ্গি দেখানোর জন্য প্লেয়াররা মাঠ চার্জ করে, যদিও সেটা খালি চার্জ করে 'ওই বেটা কুসসে, আমারে চিনস?' মার্কা হম্বিতম্বি করা পর্যন্তই সীমিত। বাস্কেটবলে অবশ্য মাঝে মাঝে ভালই মারপিট লাগে... আমার মনে আছে ২০০২ না ২০০৩ সালে ডেট্রয়েট আর ইন্ডিয়ানার একটা খেলার সময় ইন্ডিয়ানার প্লেয়ার রন আরটেস্ট স্ট্যান্ডে ঢুকে দর্শকদের সাথে হাতাহাতি শুরু করেছিল।
তবে সবচেয়ে জংলী খেলা হল আইস হকি। এই খেলায় পুরাপুরি মাঠের মধ্যে ঘুশাঘুশি হয়, এবং সেটা পুরাই স্বাভাবিক।

- ইয়ামেন

আয়নামতি এর ছবি

আমেরিকান ফুটবলে যদি মারামারি কুস্তাকুস্তি না থাকে তাইলে পিতিমির কোন খেলায় তাহা নাই।
রাগবি বলে যেটারে সেটার কথা বলতেছি ভাই। নিউইর্য়ক টিট্যান্স আর বোস্টন প্যাট্রিয়টসের খেলা ভালু পাই যদিও দেঁতো হাসি

মেঘলা মানুষ এর ছবি

আমেরিকার অনেক পরিবারেরই সবচেয়ে 'ছোট ছেলে' এখন ফুটবল খেলে। নতুন পিচ্চি দের মাঝে খেলাটা নিয়ে আগ্রহ আছে। এরা ইউরোপিয়ান ফুটল নিয়া মাথা ঘামায় না, কিন্তু বাচ্চাকে ফুটবল খেলতে মাঠ নিয়া যায়।

Soccer mom বলে একটা প্রচলিত শব্দও আছে (এর মানে কিন্তু এদের বাচ্চারা ফুটবলে খেলে এমন না)।

শুভেচ্ছা হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

ধন্যবাদ ভাই। হাসি

- ইয়ামেন

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA