ক্ষত

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ১৮/০৫/২০১৫ - ৯:২৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

শাহীনকে আরেকবার ফোন করলাম এইমাত্র। ওর বিখ্যাত অভয়দানের ভঙ্গিতে শাহীন আবারও বলল, “চিন্তা করিস না রে, একটা না একটা উপায় হয়ে যাবে।” উপায় যে একটা না একটা হবে সে বিষয়ে সন্দেহ আমারও নেই, আজ পর্যন্ত যে যে সমস্যায় নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়েছে, সমাধানের পর নিজেরই অবাক লেগেছে বেশিরভাগ সময়, যাহ্, এটা আবার তেমন কোনো সমস্যা ছিল নাকি! তবে এবারেরটা খুব জরুরি, একটা বাসা খুঁজে পাওয়া অবশ্যই দরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

শাহীনের আগে শিরিনের সাথে কথা হয়েছে, অফিসে রাশেদা আপার সাথে ছাড়াও কথা বলেছি শাওনের সাথেও। ওহ্, যতক্ষণ না একটা বাসা পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ শান্তি নেই কিছুতেই। বউদি কাল স্পষ্টই মুখের উপর জানিয়ে দিয়েছে-বিয়েশাদি হয়ে গেছে, এবার যত তাড়াতাড়ি তাদের বাসা ছেড়ে চলে যাই ততই মঙ্গল। দাদাও ছিল, বলল না কিছু, বরং একটু থেমে থেমে বলেছিল-“থাক না ক’টা দিন। ধীরে ধীরে বাসা দেখে চলে যাবি না হয়।”
বিষয়টা হজম করা কঠিন আমার জন্য, এই অনাত্মীয় শহরটায় নিজের দাদা-বৌদির সাথে মাগনা থাকি না আমি, নিজের বেতনের বড় একটা অংশ বেতন পাওয়ার দিনই হাতে ধরিয়ে দিই; তার সাথে বাড়ির হাজারটা কাজ তো আছেই। তবুও আশ্রিতের মতন করুণায় আমাকে দেখে বউদি, জানি। তারপরও তাদের ছেড়ে বিশেষ করে পিচ্চিটাকে ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে মন সায় দেয়নি কখনও। কালকের এই আচরণ তাই অপ্রত্যাশিত আর নিষ্ঠুর মনে না হওয়ার কোনো কারণ নেই। সৈকতের পোস্টিং কুমিল্লায়, আমাকে একাই থাকতে হবে আলাদা বাসা নিলে। তবু এই ক’টা দিন থাকার অপমান মানতে ভালো লাগছে না।

বন্ধুরা কথা দিয়েছে, একটা না একটা উপায় খুঁজে বের করা হবে। চট করে যেকোনো জায়গায় উঠেও যেতে পারছি না তাই পরিচিত জনরাই বড় ভরসা। মোবাইল ফোনটা সাথে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকি আমি, কে জানে, কে কখন ফোন করে। মুরগি ভিজিয়ে রেখেছিলাম আগেই, ধুয়ে তুলে দিই, একটু আলু না মেশালে মাংস খেতে ভালো লাগে না আমার, আলু কাটি বড় দেখে একটা। আর বেগুন ভাজি, ভাত সবার শেষে করলেই হবে। পিচ্চি ঘুমাচ্ছে ওর মা’র সাথে। সারাদিন অফিসের পর রান্না করতে খুব ক্লান্ত লাগছে এখন।

কলিংবেল বাজছে, মুরগি কষানো রেখে আমি দরজা খুলে দিই। দাদা ঢোকে একগাদা কাগজপত্র হাতে। ওগুলো বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্ট, জানি, ও ডাক্তার দেখাতে গেছে শুনেছি ফোনে মণির কাছে। বেগুনভাজি তুলে রেখে আমি এবার ভাত তুলে দিই চুলায়, মুরগির তরকারিটা কষাতে হবে আরেকটু। দাদা আসে রান্নাঘরের দরজায়-“কী রান্না করিস?”

মুখ না তুলেই জবাব দিই-“মুরগি আর বেগুন ভাজি, ভাত”-আমার অভিমান খুব বরাবরই, এখনও গলা বুজে আসতে চায়। ওরা আমায় কাল ভদ্রভাবে তাড়িয়েই দিয়েছে বাড়ি থেকে, মনে পরে আবার। পেছন ফিরে তাকাই না, পাছে চোখের জল দেখতে পায়। দাদা বলে এবার-“খাওয়া দাওয়া সব বাদ হয়ে গেল রে এবার থেকে। আমার ডায়াবেটিস।”

অপরিসর রান্নাঘরে আমি এবার আমার শ্বাসকষ্ট অনুভব করি, শ্বাসকষ্ট অনেক পুরনো বন্ধুর মতো অসুখ আমার। দম বন্ধ হয়ে যেতে চায় পুরোপুরি, সেটা কাটানোর জন্য হড়বড় করে একগাদা কথা বলে ফেলি, “কে খেতে বলে এইসব খাবারদাবার? খাসির মাংস, লুচি, আলুর দম, পরোটা, মিষ্টি। ব্যায়ামের নামও তো নিস না কোনোকালে…।”

দাদা ওদের ঘরে ঢুকে গেছে। আমি রান্নাঘরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি, কড়াইয়ে মুরগির ঝোল ফুটছে টগবগ করে। আমার মনে পড়ে, অনেক ছোটবেলায় দস্যি আমি এক দুপুরে চোখ বেঁধে খেলছিলাম সীমাদের উঠোনে। সীমাদের বাড়িটা তখন ছিল আমাদের বাড়ি লাগোয়া, ভিতর দিয়েই যাওয়া আসার রাস্তা ছিল। উঠোনে মুড়ি ভাজা উনুনটাতে কাঠের আগুন তখনও গনগনে। চোখ বেঁধে সেই উনুনের চারপাশে ঘোরার প্রস্তাব অন্যরা মেনে না নিলেও আমি বাহাদুরির চূড়ান্ত দেখাতে গিয়ে ডান পাটা একবারে উনুনের ভিতর। অবশ হয়ে যাওয়া পা নিযে ত্রাহি চিৎকার দিয়েছিলাম আমি। দুপুরের খাওয়া ফেলে ছুটে এসে পা’টা উঠিয়ে গনগনে এক টুকরা কাঠ হাত দিয়ে সরিয়েছিল দাদা। প্রায় পুরোটা পাতা জুড়ে দগদগে ঘা হয়ে গিয়েছিল, খুব জ্বালা করত। এখনও ভালো করে দেখলে পায়ের পাতায় প্রায় মিশে যাওয়া দাগটা চোখে পড়ে। দাগ মোছার জন্য অনেকদিন ধরে মা কালোকেশী বেটে লাগিয়ে দিত।

ফোনটা বাজছে, শাহীন, কেটে দিই। গ্যাস নিভিয়ে দিয়ে ডায়াল করি ওর ফোন নম্বরটা। ও কি বাসা খুঁজে পেল? কে জানে। বহু আগের শুকিয়ে যাওয়া দগদগে পোড়া ক্ষতটা হঠাৎ জ্বালা করে ওঠে আবার পায়ের পাতায়। আমার ডান পায়ের পাতাটা আবার অবশ হয়ে যেতে চায় সেই যন্ত্রণায়।

দেবদ্যুতি


মন্তব্য

আয়নামতি এর ছবি

চলুক
বেশ গল্পটা! কেম্নে কেম্নে জানি সবাই গোটা একটা গল্প লিখে ফেলে। আরো লেখা আসুক হে হাসি

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- হাসি

দেবদ্যুতি

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

গল্প ভালো লেগেছে। চালিয়ে যান।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- হাসি

দেবদ্যুতি

সাক্ষী সত্যানন্দ এর ছবি

চলুক

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

দেবদ্যুতি

তাহসিন রেজা এর ছবি

বেশ লাগল গল্পটা ।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

দেবদ্যুতি

রানা মেহের এর ছবি

গল্পের মায়া মায়া ভাবটা ভাল লেগেছে।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

দেবদ্যুতি

স্পর্শ এর ছবি

অনেকদিন পর একটা গল্প এভাবে ছুঁয়ে গেল।
আশাকরি আরো লিখবেন। হাসি


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- । আশা করি হাসি

দেবদ্যুতি

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাল লাগছে। সাংসারিক বাস্তবতা। আমিও চেষ্টা করছি একটি গল্প লিখতে।শেষ করিনি এখনো। সচলে বিভিন্ন লিখা পড়তে পড়তে সাহস জুটালাম। সচলের ভাল লাগলে হয় _____anne masud

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- । আপনার গল্পটার অপেক্ষায় রইলাম হাসি

দেবদ্যুতি

সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর এর ছবি

খুব সুন্দর। দারুণ ভালো লাগলো গল্পটা। আরো লিখুন

______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- । আশা করি আরো লিখব হাসি

দেবদ্যুতি

এক লহমা এর ছবি

হাততালি হাসি অণু-গুলো জুড়ে জুড়ে আরও বড় হোক।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- লহমা’দা।

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

আমার ভাইকে বেশ ফোন দিচ্ছি এই সপ্তাহ জুড়ে, উত্তর করছে না। ফেবুতেও দেখছি না। মনটা কেমন যেন খারাপ লাগে। রাগ লাগে। অভিমান হয়। ক্ষত তৈরি হয়। আবার একটা আধ লাইনের মেসেজ পেয়ে ক্ষতে প্রলেপ লাগে। গল্পটা বেশ মন খারাপের।

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

অতিথি লেখক এর ছবি

ভাইদের উপর মাঝে মাঝে রাগ আর অভিমান জমা হতে হতে চোখে বাষ্প জমবার দশা হয় বৈকি। আমার ভাই ক্যাম্পাসে গেল এতদিন পর, আমাদের সব ভাই বোনের একই ক্যাম্পাস-ওখানে গিয়ে একটা ফোন পর্যন্ত করল না। বোঝ! রাগে দুঃখে অন্ধ হয়ে নিজেই ফোন দিলাম ইয়ে, মানে...

তোমার মন্তব্যটা অনেকদিন পর দেখতে পেলাম, উত্তর করতে দেরি হয়ে গেল, সাদিয়া ‘পু। ডোন মাইন, ঠিকাছে?

দেবদ্যুতি

সুলতানা সাদিয়া এর ছবি

হাসি

-----------------------------------
অন্ধ, আমি বৃষ্টি এলাম আলোয়
পথ হারালাম দূর্বাদলের পথে
পেরিয়ে এলাম স্মরণ-অতীত সেতু

আমি এখন রৌদ্র-ভবিষ্যতে

গৌতম হালদার এর ছবি

দারুন লেখা।

অতিথি লেখক এর ছবি

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা- হাসি

দেবদ্যুতি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।