One day in the life of Ivan Denisovich (আইভান ডেনিসোভিচের জীবনের একদিন) - পর্ব - ২ : A novel by Alexander Solzhensitsyn

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: সোম, ২৩/০১/২০১৭ - ৯:৫৭অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সেদিন সকালে ভাগ্যদেবী বুঝি চোখ মেলে চাইলেন, কোন ভীড় বা লম্বা লাইন নেই। সোজা হেঁটে ঢুকে পরা যায়।

খাবার-হলের বাতাস যেন গোসলখানার মত ভারী। হিম-শীতল হাওয়া দরোজা দিয়ে ঢুকে ট্যালট্যালে লপসির ধোঁয়ার সাথে মিশে যাচ্ছে। এক দল টেবিলে বসা, আরেক দল টেবিলের সারীর মাঝের করিডোরে দাঁড়িয়ে, ফাঁকা সিট পাওয়ার অপেক্ষায়। চাপাচাপি-ঠেলাঠেলির মধ্যে এ ওকে উদ্দেশ্য করে চেচাঁমেচি করছে, প্রতিটা দলের দু’তিনজন বাটি ভর্তি লপসি আর কাঠের ট্রে ভর্তি জাউ নিয়ে খালি জায়গা খোঁজায় ব্যাস্ত। ওদিকে, ওই দেখো দেখো ঐ গোঁয়ার-গোবিন্দটা কি করে, কথা শোনে না, হাতের ট্রেটা ফেলেই দিলো, ঝপ-ঝপাৎ ঝপাস! হাত খালি থাকলে দাও ব্যাটাকে কষে একটা ঘাড়-ধাক্কা। ঠিকই আছে, অকারনে করিডোর জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, জোচ্চুরির ধান্দা!

ওদিকে এক টেবিলে লপসিতে চামুচ ডুবানোর আগে এক যুবক বুকে ক্রস আঁকলো। সে পশ্চিম ইউক্রেনের লোক, অবশ্যই নতুন চালানের মাল। রাশানরাতো ভুলেই গেছে কোন হাত দিয়ে ক্রস করতে হয়।

ঠান্ডা হলঘরে সবাই বসা, বেশিরভাগের মাথায় টুপি, কালো সিদ্ধ বাঁধাকপির ভেতর থেকে পচা মাছ খুঁজে বের করে ধীরে ধীরে খাচ্ছিলো আর কাঁটাগুলো থু করে টেবিলের উপর ফেলছিলো। খাওয়া শেষে টেবিলের উপর এঁটোকাটার ডাঁই হয়ে যাওয়ার পর আরেক দলের পালা। ওদের কেউ একজন ওগুলো সরিয়ে ফ্লোরে ফেলে দেয়ার পর ওগুলো পায়ের চাপে পিষ্ট হতে হতে জাউয়ের মত হয়ে যায়। কিন্তু মাছের কাঁটা সরাসরি ফ্লোরের উপর থু দিয়ে ফেলাটাও অভদ্রতা।

দুই সারি টেবিল হলঘরের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত বসানো। ওগুলোর একটার কাছেই ১০৪ নম্বর দলের ফেতিউকোভ বসে ছিলো। সে সূকোভের সকালের খাবার আলাদা করে রেখে দিয়েছে। দলে ফেতিউকোভের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে। সূকোভের নিচে। বাইরে থেকে সবাইকে একই রকমই মনে হয়, তাদের নম্বর দেয়া কালো কোটগুলো দেখতেও একই রকম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দলের মধ্যে অনেক উঁচুনিচু ভেদাভেদ আছে। সবারই নিজ নিজ অবস্থান আছে। যেমন ধরা যাক বুইওনভস্কি, অন্য জেক (Zek = রাশান ভাষায় সংক্ষেপে কয়েদি) এর খাবারের বাটি নিয়ে অপেক্ষা করার বান্দা সে না। সূখোভও সেধরনের কাজ করার লোক না। এসব তারচেয়ে নিচু পদের লোকেদের কাজ।

ফেতিউকভ সূকোভকে ইশারায় ডাকলো এবং একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তাকে জায়গা ছেড়ে দিলো।

“এটা একেবারেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমিতো খাবারটা খেয়েই ফেলতে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোমাকে লক-আপে ভরে দিয়েছে।”

সে আর ওখানে অপেক্ষা করলো না। সূখোভের লপসি থেকে উচ্ছিষ্ট কিছু পাওয়ার কোন সুযোগই নেই।

সে তার বুটের ভেতর থেকে চামুচটা বের করলো। তার ছোট্ট সাত-রাজার ধন। সে যখন উত্তরে ছিলো, তখনো সেটা সবসময় তার সাথে থাকতো। সে নিজ হাতে এটা এলুমিনিয়ামের তার গলিয়ে বানিয়েছিলো এবং এটার উপর খোদাই করে লেখা “উস্ত-ইযমা ১৯৪৪”।

তারপর সে তার খুর দিয়ে চেঁছে একেবারে ন্যাড়া করে ফেলা মাথা থেকে টুপিটা নামিয়ে রাখলো। যতই ঠান্ডা পরুক, টুপি মাথায় খাওয়াটা তার পক্ষে মোটেই সম্ভব না। এরপর কি ধরনের খাবার দিয়েছে বোঝার জন্য লপসিটা নাড়াতে লাগলো। সেই একই জিনিস। কড়াইয়ের উপরের দিককারও না, তলানিরটাও না। ফেতিউকভ হচ্ছে সেই জাতের লোক যারা অন্যের খাবার সামলে রাখার সময় আলগোছে আলুগুলো সাবড়ে ফেলে।

লপসির একমাত্র ভালো দিক হচ্ছে সেটা গরম গরম খেতে দেয়া হয়, কিন্তু সূকোভেরটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো। যাই হোক, সে তার স্বাভাবিক ধীর গতিতেই খেতে লাগলো। তাড়াহুড়ো নেই, ঘরে আগুন লাগলেও না। ঘুম ছাড়া আর যে সময়টা একজন বন্দীর একান্ত নিজের জন্য বরাদ্দ সেটা হচ্ছে সকালের খাবারের জন্য ১০ মিনিট, সন্ধ্যাবেলার খাবারের জন্য ৫ মিনিট আর রাতের খাবারের জন্য ৫ মিনিট।

প্রতিটা দিনই সেই একই লপসি। তবে কি দিয়ে তৈরী হবে সেটা নির্ভর করে ঐ বছর শীতে কি ধরনের সবজি দেয়া হলো তার উপর। গতবার ছিলো শুধু লবন মাখা গাজরের, মানে সেপ্টেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত শুধু গাজরের লপসি। এই বছর হচ্ছে কালো বাঁধাকপির। বছরের সবচেয়ে পুষ্টিকর সময় হচ্ছে জুন, যখন সব শাকসব্জি শেষ হয়ে আসে, আর তার বদলে দেয়া হয় শস্যদানার জাউ। সবচেয়ে খারাপ সময় হলো জুলাই, যখন হাড়িতে বরাদ্দ কেবল ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেয়া বিছুটি জাতীয় পাতা।

ছোট ছোট মাছগুলোতে যতনা আমিষের অংশ, তারচেয়ে বেশী কাঁটা; সিদ্ধ করতে করতে সব গলে আলাদা হয়ে মিশে গিয়ে শুধু মাথা আর লেজের দিকে খুব সামান্য কিছুই অবশিষ্ট লেগে ছিলো। সূখোভ মাছের কুড়মুড়ে কাঁটাগুলো কচমচ করে চিবিয়ে চুষে খেতে লাগলো যাতে একটি আঁশ বা মাছের ছোট টুকরোও বাদ না পরে, আর উচ্ছিষ্টগুলো থু থু করে টেবিলের উপর ফেলে দিতে লাগলো। ফুলকা, লেজ, কোটরে বসানো চোখ, সবকিছুই সে খেলো, কিন্তু সিদ্ধ হতে হতে কোটর থেকে বেড়িয়ে এসে বাটির মধ্যে ভেসে থাকা চোখগুলো ছাড়া। মাছের চোখ তার দারুন লাগে! কিন্তু ওগুলো তার পছন্দ না। অন্যরা এই কারনে তাকে নিয়ে হাসাহাসিও করে। আজ যেহেতু ছাপড়ায় ফেরা হলো না, রেশনও তোলা হলো না, সেহেতু সে তার সকালের নাস্তা রুটি ছাড়াই সেরে ফেললো, সেটা পরে খাওয়া যাবেক্ষন। সেটাই বরং ভালো।

লপসির পরে ছিলো মাগারার (মাগারা = একপ্রকার ঘাস আব ঘাসের বিজ) জাউ। এটাও ঠান্ডা আর শক্ত হয়ে দলা দলা হয়ে গিয়েছিলো। সূখোভ সেটাকে ভেংগে টুকরো টুকরো করলো। জাউটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো বলে না, গরম অবস্থাতেও খেতে একেবারে বিস্বাদ, পেট ভরেছে বলে মনেই হয় না। শুধুই ঘাস, রঙটাই কেবল হলুদ, আর দেখলে মনে হয় যেন ভুট্টা। লোকে বলে, ওরা নাকি শস্যের জাউয়ের বদলে এটা খাবার হিসেবে দেয়ার ধারনাটা পেয়েছিলো চীনাদের কাছ থেকে। এটার এক বাটি সিদ্ধ করলে প্রায় এক পাউন্ডের মত ওজন হয়। জাউয়ের ধারে কাছেরও কিছু না, কিন্তু এটাকেই জাউ বলে চালানো হয়।

চামুচটা চেটেপুটে বুটের ভেতর গুঁজে দিয়ে সূখোভ ডাক্তারখানার দিকে গেলো।

আকাশ তখনও অন্ধকার। ক্যাম্পের আলোর দাপটে তারাগুলো অদৃশ্য। সার্চলাইট দুটোর তীব্র আলো তখনও এলাকাময় চষে বেড়াচ্ছে। যখন এই ক্যাম্পটা, এই “বিশেষ” ক্যাম্পটা চালু হয়েছিলো, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তখনো অনেক যুদ্ধের সময়কার অব্যহৃত ফ্লেয়ার রয়ে গিয়েছিলো, এবং যখনই বিদ্যুত চলে যেত, ওরা ফ্লেয়ারগুলো এলাকার আকাশের দিকে ছুঁড়তো, সাদা, সবুজ আর লাল রঙের, ঠিক আসল যুদ্ধের মত। পরে ওরা এগুলো ছোঁড়া বন্ধ করে দিয়েছিলো। হয়তো পয়সা বাঁচানোর জন্য।

রেভেলির সময় যেরকমটা থাকে, চারিদিক এখনো ঠিক সেরকমই অন্ধকার। কিন্তু কিছু ছোটখাট বিষয় দেখে অভিজ্ঞ চোখ ঠিকই পার্থক্যটা ধরতে পারে, বুঝতে পারে কিছুক্ষনের মধ্যেই সবাইকে কাজে বেরুনোর হুকুম দেয়া হবে। খ্রোমোই’র এসিস্ট্যান্ট (মেস-আর্দালী খ্রোমোই, সে আবার একটা এসিস্ট্যান্ট পুষে)৬ নম্বর বিল্ডিং এর দিকে গেলো সবাইটে সকালের খাবার খাওয়ার জন্য ডাকতে। এটা হাসপাতাল। এরা এলাকার বাইরে যায় না।

একজন দাড়িওয়ালা বুড়ো আর্টিস্টকে সি.ই.ডি’তে (কালচারাল এন্ড এডুকেশনাল ডিপার্টমেন্ট)সরিয়ে আনা হয়েছে বন্দীদের ইউনিফর্মের মলিন হয়ে যাওয়া নম্বরগুলোকে ব্রাশ আর রঙ দিয়ে স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য।

তাতারটাকে আবার দেখা গেলো। বড় বড় কদম ফেলে আড়াআড়ি ভাবে জমায়েত হওয়ার ময়দানটা পেড়িয়ে স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে আসছে। ওখানটায় এসময় খুব কম লোকজনই থাকে। সবাই এখানে-সেখানে কোন এক কোনায় গিয়ে শেষ কয়েকটা মুল্যবান মিনিট কাজে লাগিয়ে গা গরম করে নেয়ার সুযোগ নিতে ব্যাস্ত।

সূখোভ বুদ্ধি করে ব্যারাকের এক কোনায় তাতারটার চোখের আড়ালে সটকে পরলো। ব্যাটা তাকে আবার ধরতে পারলে আঠার মত লেগে থাকবে। যাই হোক, চোখের সামনে খুব বেশী ঘোরাফেরা করা ঠিক না। মূল কথা হচ্ছে একা ক্যাম্প-গার্ডদের সামনে পড়া যাবে না, দলের সাথে থাকলে পরে ঠিক আছে। কে জানে ব্যাটা কারো ঘাড়ে কোন কাজ চাপিয়ে দেয়ার জন্য, কিংবা শুধু রাগের বশেই ছোঁ মারার জন্য ঘুরছে কিনা? ওরা কি ব্যারাকে ব্যারাকে গিয়ে নতুন আইন-কানুনগুলো সবাইকে পড়ে শোনায় নি? কোন গার্ডের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাঁচ কদম আগেই টুপি খুলে হাতে নিতে হবে, আবার পার হয়ে যাওয়ার দু’কদম পরেই তবে আবার টুপি পরা যাবে। কিছু গার্ড আছে যারা এসব বিষয় বেশী পাত্তা দেয় না, অন্ধের মত পাশ দিয়ে হেটে চলে যায়, কিন্তু অন্যদের জন্য এটা যেন ঈশ্বরের ওহী। কত বন্দীকে যেই এই সামান্য টুপির কারনে লক-আপে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে! নাহ, কোনায় গিয়ে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই ভালো।

তাতারটা হেঁটে পার হয়ে যাওয়ার পর সূখোভ শেষ পর্যন্ত ডাক্তারখানায় যাওয়ার চুরান্ত সিদ্ধান্ত নিলো। তক্ষুনি তার ৭ নম্বর ব্যারাকের লম্বু ল্যাটটার (Lett : লাটভিয়ার অধিবাসী) কথা মনে পড়ে গেলো, সে তাকে সেদিন সকালে কাজে যাওয়ার আগে কয়েক গ্লাস ঘরে-তৈরী তামাক কিনতে যেতে বলেছিলো। এত উত্তেজনার বশে ব্যাপারটা সে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো। ল্যাটের কাছে তামাকের পার্সেলটা তার আগের বিকেলে এসেছিলো এবং জানতো যে আগামীকালের মধ্যে আর কোন তামাকই বাকী থাকবে না। পরবর্তী চালানের জন্য আবার একমাসের অপেক্ষা। ল্যাটের তামাকগুলো বেশ ভালো, কড়া আর সুগন্ধি, ধূসর-বাদামী বর্ণের।

রাগে-দুঃখে সে মাটিতে পা ঠুকতে লাগলো। সে কি ফিরে আবার ল্যাটটার কাছে যাবে? কিন্তু ডাক্তারখানা খুব কাছে হওয়াতে সে পা চলিয়ে সেদিকেই গেলো। দরোজার কাছে যাওয়ার সময় পায়ের তলায় বরফ ভাঙ্গার কড়কড় শব্দ কানে আসছিলো।

সবসময়কার মতই ভেতরের করিডোরটা এতটাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন যে তার পা ফেলে ঢুকতেই ভয় করছিলো। দেয়ালগুলো সাদা এনামেলের রঙ করা। আসবাবপত্রগুলাও সব সাদা।

ভেতরের দরোজাগুলো সব বন্ধ। ডাক্তারেরা মনে হয় এখনো ঘুমে। ডিউটিতে ছিলো কোলয়া ভডউভুশকিন নামের একজন তরুন মেডিকেল-এ্যাসিস্ট্যান্ট। সে একটা সাদা টুপি আর একটা ধবধবে সাদা স্মক (Smock : কুঁচি দেয়া ঢিলেঢালা পোশাক) পরে একটা ছোট্ট পরিষ্কার টেবিলের ধারে বসে ছিলো। কিছু একটা লিখছিলো। আর কাউকে দেখা যাচ্ছিলো না।

সূখোভ তার টুপি খুলে নিলো যেন সামনে ক্যাম্পের কোন কর্তা আছেন, ক্যাম্পের রীতিমাফিক চোখ নামিয়ে নিলো। যদিও ব্যাপারটা তার দেখার বিষয় না, তবুও সে লক্ষ্য করলো কোলয়া সুন্দর গোটগোট অক্ষরে কি যেন লিখছে, দুটি লাইনের মধ্যে সমান ব্যাবধান আর কাগজের প্রান্ত থেকে সামান্য দূরত্ব রেখে লিখছে, এবং লেখা শুরু করছে বড় হাতের অক্ষর দিয়ে। সে তখনই খুব সহজেই বুঝে গেলো যে সে অফিসের কোন কাজ না, অন্য কিছু করছে। কিন্তু সেটা তার দেখার বিষয় না।

“ইয়ে, নিকোলাই সেমিয়োনিচ, ব্যাপারটা হয়েছে কি..., আমার না কেমন যেন... খারাপ লাগছে” সে এমন লজ্জাবনত ভাবে বললো যেন সে কিছু লুকোনোর চেষ্টা করছে। কোলয়া ভডউভুশকিন তার বড় বড় শান্ত চোখ তুলে তাকালো। স্মক পরার কারনে তার নম্বরটা দেখা যাচ্ছিলো না।

“তুমি এত দেরি করে আসলে কেন? গত রাতেই কেন তুমি অসুস্থ রিপোর্ট করলে না? তুমিতো ভালো করেই জানো যে সকালবেলা দেখা করার কোন সুযোগ নেই। অসুস্থদের তালিকাতো এরমধ্যেই প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।”

এসব কথাই সূকোভের জানা। এটাও তার ভালো করে জানা যে সন্ধ্যেবেলা অসুস্থদের তালিকায় নাম উঠানো কোন সহজ কথা না।

“কিন্তু তারপরেও, কোলয়া... দেখ, আমি যে আসবো... সন্ধ্যেবেলা..., তখনতো ব্যাথা ছিলো না।”

“আর এখন ব্যাথা হচ্ছে? কি রকম ব্যাথা?”

“মানে, ব্যাথার কথা না ভাবলে ব্যাথা করছে না, কিন্তু আমার শরীর খারাপ লাগছে।”

সুযোগ পেলেই ডাক্তারখানায় ঘুরঘুর করা দলের লোক সূখোভ না। ভডউভুশকিনও সেটা জানে। কিন্তু সকালবেলা সর্বোচ্চ দুজন লোককে কাজ থেকে রেহাই দেয়ার ক্ষমতা সে রাখে, এবং ইতিমধ্যে দু’জনকে দিয়েও দিয়েছে। তাদের নামও ডেস্কের সবুজাভ কাঁচের নিচে রাখা আছে, এবং সে তার মধ্যে দাগও টেনে দিয়েছে।

“তোমারতো এটা আগে ভাবা উচিত ছিলো তাই না? তুমি কি ভাবছো? সবাই মাঠে জমায়েত হওয়ার আগে অসুস্থ রিপোর্ট করবে? দেখি, এদিকে আসোতো, এটা নাও।”

সে একটা জারের মধ্য থেকে গজের উপর অনেকগুলো ছিদ্রের মধ্যে রাখা থার্মোমিটার থেকে একটা নিয়ে মুছে সূখোভের হাতে দিলো। সে সেটা তার বগলের তলায় রাখলো।

সূখোভ দেয়ালের দেয়ালের কাছে রাখা একটা বেঞ্চের একেবারে প্রান্তে এমনভাবে বসেছিলো যেন সেটা আরেকটু হলেই উলটে যাবে। নিজের অজান্তেই সে এমন একটা অস্বস্তিকর ভংগীতে বসে ছিলো যেটা বলে দিচ্ছিলো যে সে এই জায়গায় এসে অভ্যস্ত না এবং সে যেন খুব তুচ্ছ কারনে এই জায়গায় এসেছে।

ভডউভুশকিন লেখায় ব্যাস্ত হয়ে পরলো।

ডাক্তারখানাটা এলাকার সবচেয়ে দূরে একটা নির্জন কোনায়, যেখানে কোন ধরনের শব্দই এসে পৌঁছোতে পারে না। কোন ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনার সুযোগও ছিলো না, কারন বন্দীদের ঘড়ি ব্যাবহারের অনুমতি ছিলো না। তাদের জন্য সময়ের হিসেব যা রাখার, সেটা কতৃপক্ষই রাখতো। এমনকি ইঁদুরদের পক্ষেও সেখানে একটা আচঁড় কাটার সুযোগ ছিলো না। ইঁদুর মারার জন্য হাসপাতালে বিড়াল রেখে দেয়া হয়েছিলো।

এরকম একটা ঝকঝকে-তকতকে ঘরে, চারিদিকে এমন নিঃস্তব্ধতা, উজ্জ্বল আলোর নিচে কোন কাজ ছাড়া টানা পাঁচ মিনিট বসে থাকা সূখোভের জন্য এক অদ্ভূৎ অভিজ্ঞতা। সে চারদিকের দেয়ালে চোখ বোলালো, সবগুলোই ফাঁকা। সে নিজের জ্যাকেটের দিকে নজর দিলো। নম্বরটা মুছে গেছে প্রায়। চোখে পড়ে যেতে পারে। অবশ্যই আবার লিখিয়ে নিতে হবে। সে তার একটা হাত থুতনিতে বোলালো, এবং খড়খড়ে ভাবটা টের পেলো। শেষবার গোসল করার পর দাড়ি বেশ দ্রুত বেড়েছে, সেও দশ দিন আগে। তাতে চিন্তার কিছু নেই। পরের গোসলের তারিখের আরো তিনদিন বাকী আছে, এবং তখন শেভ করিয়ে নিলেই চলবে। শুধুশুধু নাপিতের কাছে লাইন দেয়ার কি দরকার? আর কার জন্যেই বা এত সাজুগুজু করবে?

ভডউভুশকিন এর তুষার-শুভ্র টুপিটা দেখে তার লভাট নদীর ধারের হাসপাতালটার কথা মনে পড়ে গেলো। ভাঙ্গা চোয়াল নিয়ে তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। আর সে এমন গবেট ছিলো! সেচ্ছায় আবার যুদ্ধে ফিরে গিয়েছিলো। চাইলেই সে আরামে হাসপাতালে শুয়ে পাঁচদিন কাটিয়ে দিতে পারতো।

আর এখন তার স্বপ্ন হচ্ছে দু’তিন সপ্তাহের জন্য অসুস্থ হওয়া, তবে এমন বেশী না যে একেবারে অপারেশন করতে হবে। শুধু যাতে দু’তিন সপ্তাহের জন্য নড়াচড়া না করে শুয়ে থাকতে হয় ততটা। আর তারা তাকে শুধু তাদের নিজেদের জন্য বানানো টলটলে স্যুপ খেতে দেবে, খারাপ হতো না ব্যাপারটা।

কিন্তু তার মনে পড়লো, ওরা তাকে হাসপাতালেও থাকতে দেবে না। একজন নতুন বদলি ডাক্তার এসেছে, নাম স্টেফান গ্রিগোরিচ, মোটা গলার ব্যস্তবাগিশ লোক, যে নিজে যেমন শান্তিতে থাকতে পারে না, তেমন রোগীদেরও শান্তিতে থাকতে দেয় না। দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই এমন রোগীদের জন্যেও সে হাসপাতালের আশেপাশে কাজের ব্যাবস্থা করেছে। বাগানে বেড়া দেয়া, রাস্তা তৈরী করা, ফুলগাছে পানি দেয়া, এবং শীতকালে বরফের দেয়াল তৈরী করা। তার মতে কাজই হচ্ছে সমস্ত রোগবালাই সারানোর সবচেয়ে ভালো ঔষধ।

সীমার বাইরে খাটাতে খাটাতে একটা ঘোড়াকেও মেরে ফেলা যায়। এটা ডাক্তারটার বোঝা উচিত। রাস্তার ব্লক বসানোর কাজ করাতে করাতে যদি ওই ব্যাটার ঘামের সাথে রক্ত ঝরিয়ে দেয়া যায়, তাহলে নিশ্চিত সেও কাত হয়ে যাবে।

ভডোভশকিন লিখেই যেতে লাগলো। সে অবশ্য তার কাজের বাইরে অন্য কিছুই করছে, কিন্তু সেটা সূকোভের বোঝার ক্ষমতার বাইরে। সে আসলে গতকাল বিকেলে শেষ করা একটা কবিতার সুন্দর একটা কপি তৈরী করছে এবং সে সেটা ডাক্তার স্টেফান গ্রিগোরিচকে সেদিন দেখানোর প্রতিজ্ঞা করেছে, যে কিনা কাজের মাধ্যেমে রোগ সারাইয়ের পদ্ধতির গুনগান করে।

একমাত্র ক্যাম্পেই যা সম্ভব, স্টেফান গ্রিগোরিচ ভডোভুশকিনকে উপদেশ দিয়েছিলো নিজেকে মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে পরিচয় দেয়ার জন্য এবং সে তাকে হাসপাতালে নিয়ে শিখিয়েছিলো কিভাবে শিরার ভেতর ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশন দিতে হয়। এ সম্পর্কে অজ্ঞ বন্দীদের নিরীহ মনে কখনো এই ধারনাই আসার কথা না যে ভডোভুশকিন আসলে কোন মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্টই না। ভডোভুশকিন আসলে ইউনিভার্সিটির সাহিত্যের ছাত্র। দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ডাক্তারের ইচ্ছা যে সে বন্দী অবস্থাতেই লেখালেখি করুক, যে সুযোগ স্বাধীন জীবনেও পায় নি।

তুষারে ঢাকা দুই স্তরের জানালা ভেদ করে সকলের জমায়েত হওয়ার সংকেত সামান্যই শোনা যাচ্ছিলো। সূখোভ বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাড়ালো। তখনো সে ঠান্ডা জ্বর জ্বর ভাব টের পাচ্ছিলো, কিন্তু কাজ বাদ দেয়ার কোন উপায় নেই। ভডোভুশকিন থার্মোমিটারটা হাতে নিয়ে জ্বরের মাত্রা দেখলো।

“হুম, এদিকও না, ওদিকও না। সাঁইত্রিশ দশমিক দুই। আটত্রিশ হলেও বোঝা যেতো। আমি তোমাকে ছাড় দিতে পারছি না। তুমি যদি কাজ বাদ দিতে চাও, সেটা তোমার নিজের দায়-দায়িত্ব। ডাক্তার সাহেব তোমাকে পরিক্ষা করবেন। তিনি যদি মনে করেন তুমি অসুস্থ, তাহলে মাফ। আর যদি মনে করেন তুমি ঠিক আছো, তাহলে দেবেন না। তখন তোমাকে লক-আপে ভরে দেবেন। তুমি কাজে গেলেই বরং ভালো।

সূকোভ কিছুই করলো না। ভদ্রতাবশতঃ মাথাও ঝোঁকালো না। তার টুপিটা চোখের উপর পর্যন্ত নামিয়ে এনে সে বেড়িয়ে গেলো।

যে উষ্ণতার আরামে আছে সে শীতার্ত মানুষের কষ্ট বুঝবে কিভাবে?

ঠান্ডাটা হুলের মত বিধছিলো। তাকে ঘিরে থাকা একটা কুয়াশার কারনে কাশতে কাশতে তার বুক ব্যাথা হয়ে গেলো। বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস সাতাশ, আর সূকোভের শরীরের প্লাস সাঁয়ত্রিশ। ঠান্ডা-গরমে যুদ্ধ চলছে যেন।

জোর কদমে পা চালিয়ে সে দ্রুত তার ব্যারাকে পৌঁছে গেলো। জমায়েত হওয়ার ময়দানটা একেবারে খালি। ক্যাম্পটা মনে হচ্ছিলো জন-মানব শুন্য। সে মুহুর্তে তার নিজেকে কেন যেন খুব নির্ভার মনে হচ্ছিলো, যদিও যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, তবু আশপাশের সবকিছু দেখে মনে হচ্ছিলো তাকে যেন আজ আর কাজের জন্য ছুটতে হবে না। সেন্ট্রিরা সব ঢুলুঢুলু চোখে বন্দুকের সাথে মাথা ঠেকিয়ে কোয়ার্টারের উষ্ণতায় বসে ঝিমুচ্ছে। কিন্তু তীব্র ঠান্ডার মধ্যে ওয়াচ-টাওয়ারের দায়িত্বে থাকা গার্ডদের জন্য ব্যাপারটা এত সুখকর না। মূল ফটকের দায়িত্বে থাক গার্ডেরা উনুনে কয়লা ছুঁড়ে দিচ্ছে। আর ক্যাম্প-গার্ডেরা ব্যারাকে তল্লাসি শুরুর আগে শেষ সিগারেটটায় সুখটান দিয়ে নিচ্ছে। ওদিকে বন্দীরা, সমস্ত শরীর ছেঁড়াখোড়া কাপর দিয়ে পেঁচিয়ে, কোমড়ে দড়ি বেঁধে, আর থুতনি থেকে চোখ পর্যন্ত ছোট কাপরের টুকরো দিয়ে মুড়ে, পায়ে বুট গলিয়ে বন্ধ চোখ আর দুরুদুরু বুকে বাংকে বসে সর্দারের চিৎকারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো, “সবাই বাইরে চল....”।

১০৪ নম্বর দলটি সাত নম্বর ব্যারাকে অন্যদের সাথে বসে ঝিমুচ্ছিলো, শুধু মেঝ-সর্দার পালভো ছাড়া। সে ঠোঁটে পেন্সিল নিয়ে কি একটা যেন করারর চেষ্টা করছিল, এবং আলয়োশা, সূখোভের সাফ-সুতরো প্রতিবেশী, একটা নোটবুক খুলে পড়ছিলো, যেটাতে সে নিউ টেস্টামেন্টের অর্ধেক টুকে রেখেছিলো।

সূখোভ নিঃশব্দে সোজা পালভোর বাংক বরাবর ছুট দিলো।

পালভো চোখ তুলে তাকালো।

“আইভান ডেনিসভিচ, তাহলে ওরা তোমাকে লক-আপে পুরেনি? সব ঠিকঠাক?” মার্কামারা ইউক্রেনিয় টানে সে বললো, ঠিক যেভাবে জেলে থাকা অবস্থাতেও পশ্চিম-ইউক্রেনীয় বন্দীরা নাম এবং পদবী উচ্চারন করে ঠিক সেভাবে।

রেশনে পাওয়া সূখোভের ভাগের রুটিটা তুলে সে তার হাতে দিলো। রুটির টুকরোটার উপরের দিকের ছোট্ট ঢিবি মত অংশের উপর চিনির গুড়ো ছড়ানো। সূখোভের হাতে সময় খুব কম তারপরেও সে সব ঘটনা খুলে বললো (মেঝ-সর্দারও কতৃপক্ষেরই একজন এবং তারা তার উপর কমান্ডেন্টের চেয়েও বেশী নির্ভরশীল)। এবং তাড়া থাকা সত্বেও সে একটা পাদানীতে পা রেখে বিছানা গোছানোর জন্য উঠতে উঠতে ঠোঁট আর জিভ দিয়ে চিনিটুকু চেটেপুটে খেয়ে নিলো আর রুটিটার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ওজন করে অনুমানে বুঝতে নিতে চেষ্টা করতে লাগলো রুটিটার ওজন নিয়ম মাফিক ৫৫ গ্রাম কি না। বন্দী জীবনে সে কয়েক হাজার বার রেশনের রুটি নিয়েছে, এবং যদিও পাল্লা দিয়ে মেপে দেখার সুযোগ তার কোনদিনও হয় নি, এবং ভিতু মানসিকতার লোক হওয়ার কারনে প্রতিবাদ করার সাহসও তার কোনদিন ছিলো না, তবুও অন্যান্য কয়েদিদের মতই সে বহু আগেই বুঝে গিয়েছিলো যে রুটি কোনদিনও সঠিক ওজনে কাটা হয় না। সব রেশনেই ওজনে কম পরে। কিন্তু বিষয় হচ্ছে কতটা কম। তাই প্রতিদিন একবার করে মেপে দেখা, নিজেকে স্বান্তনা দেয়ার জন্য, হয়তো আজ ওরা ওজনে কম দেয় নি।

রুটিটাকে দুই ভাগে ভাগ করার পর তার মনে হলো ২০ গ্রাম কম আছে। অর্ধেকটা সে তার বুকের কাছে জ্যাকেটের ভেতরের লুকোন পকেটে রেখে দিলো (ফ্যাক্টরিতে কয়েদিদের জন্য পকেট ছাড়া জ্যাকাট বানানো হয়)। সকালের নাস্তার সময় যেটা না খেয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলো, সেটা তক্ষুনি খেয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে গোগ্রাসে খাওয়া আসলে কোন খাওয়াই না, বরং খাবারের অপচয়। কোন তৃপ্তিই পাওয়া যায় না। রুটির টুকরোটা সে তার নিজের লকারে রাখতে গিয়েও রাখলো না। চুরির দায়ে দুজন ব্যারাক-আর্দালীর মার খাওয়ার কথা তার মনে পড়ে গেলো। ব্যারাকটা একটা বিশাল জায়গা, খোলা ময়দানের মত।

সে একহাতে রুটির টুকরোটা ধরে সাবধানে ভ্যালেংকি থেকে এমনভাবে পা বের করলো যেন পায়ে জড়ানোর ন্যাকড়া আর চামুচ ভেতরেই থাকে। তারপর বাংক বেয়ে উঠে তোষকের একটা অংশ ফুটো করে এর ভেতরে ভর্তি কাঠের গুড়োর মধ্যে তার খাবারটা লুকিয়ে রাখলো। তারপর তার টুপি খুলে তার ভেতর লুকোন সুঁই-সুতো দিয়ে দ্রুত সেলাই দিতে দিতে দিতে ছেঁড়া অংশটা জুড়ে দিলো (সুঁই-সুতো টুপির অনেক গভীরে সাবধানে লুকোন থাকে কারন ওরা দেহ তল্লাসির সময় টুপিও হাতড়ায়। একবার এক গার্ডের আংগুলে ফুটে গিয়েছিলো। তারপর রাগের চোটে মেরে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো প্রায়)। তার মুখে লেগে থাকা চিনির প্রলেপ এর মধ্যে গলে গিয়েছিলো। প্রত্যেকটা নার্ভ যেন উত্তেজনার চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলো। সবার তালিকা রাখার দায়িত্বে থাকা গার্ড দরজায় এই গার্ড এলো বলে! সুখোভের হাত দ্রুত কাজ করছিলো, কিন্তু তার মগজ তার চেয়েও দ্রুত কাজ করছিলো, পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে তা নিয়ে।

ব্যাপ্টিস্ট আলয়োসা বিড়বিড় করে বাইবেল পড়ছিলো (হয়তো শূখোভকে উদ্দেশ্য করেই, দীক্ষা দিয়ে দলে ভেড়ানো এদের খুব পছন্দ)

“যদি তুমি যন্ত্রনাক্লিষ্ট হও, তবে তা যেন না হয় হত্যা, চৌর্যবৃত্তি, অথবা যাদুবিদ্যা কিংবা অপরের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপহেতু। পরন্তু কেউ যদি যন্ত্রনাক্লিষ্ট হয় খৃষ্টের অনুসারী হওয়ার দায়ে, সে যেন লাঞ্চিত বোধ না করে, বরং গুনকীর্তন করে সেই নামের মাঝে নিহিত ঈশ্বরের ।”

আলোয়শা চালু লোক, সে দেয়ালে একটা ছোট্ট ফাটল তৈরী করে তাতে ছোট্ট বইটা এমনভাবে লুকিয়ে রাখে যে কোন তল্লাশিতেই বইটা ধরা পরে নি।

আগের মতই দ্রুততালে সূখোভ তার কোটটা কড়িকাঠে ঝুলিয়ে রাখলো এবং যেগুলো তার দরকার; একজোড়া মিটেন্স, আরেকজোড়া পুরোন পায়ে প্যাঁচানো ন্যাকড়া, এক টুকরো লম্বা দড়ি, দু’দিকে ফিতা লাগানো একফালি কাপড়; ম্যাট্রেসের তলা থেকে বের করে নিলো। সে কাঠেরগুড়ো গুলো ঝেড়ে হয়ে থাকা ম্যাট্রেসটা সোজা করলো (যেটা একেবারে ঠাঁসা আর এবড়োথেবড়ো হয়ে ছিলো), কম্বলটা গুঁজে রাখলো আর বালিশটা ঠিকঠাক করে খালি পায়ে নেমে গেল এবং ন্যাকড়া পায়ে জড়াতে শুরু করলো। প্রথমে যেগুলো ভালো আছে সেগুলো দিয়ে, তার উপর ছিঁড়েখুঁড়ে জীর্ণ হয়ে যাওয়াগুলো দিয়ে।

ঠিক তক্ষুনি তিউরিন উঠে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলো, “১০৪, ঘুমের টাইম শেষ, বেড়িয়ে পরো সবাই।”

আর সঙ্গে সঙ্গে পুরো দল, চোখে ঘুমঘুম ভাব থাক আর না থাক, আড়মোড়া ভেঙ্গে দরজার দিকে হাঁটা দিলো। তিউরিনের বন্দী জীবনের বয়স ১৯ বছর এবং এতবছরে একটিবারের জন্যেও তার দলকে নির্দিষ্ট সময়ের আগে মাঠে জড়ো করে নি। সে যখন “বেড়িয়ে পরো সবাই” বলে হাঁক দেয় তখন সেটা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সবাই যখন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে পায়ের ভারী শব্দ তুলে করিডোর হয়ে বারান্দার দিকে যাচ্ছিলো, তখন ২০ নম্বর দলের নেতা, তিউরিনকে অনুকরন করে “বেরিয়ে পরো সবাই” বলে হাঁক দিলো। সূখোভ ডবল করে প্যাঁচানো পায়ে জুতো গলিয়ে দিলো, কুঁচকে যাওয়া জ্যাকেটের উপর কোট পরে দড়ি দিয়ে কোমড়ে শক্ত করে বেঁধে নিলো (যাদের যাদের চামড়ার বেল্ট ছিলো, সব নিয়ে নেয়া হয়েছিলো, “স্পেশাল” ক্যাম্পে চামড়ার বেল্ট নিষিদ্ধ)।

ইকরাম ফরিদ চৌধুরী

পর্ব ১ = http://www.sachalayatan.com/guest_writer/56419


মন্তব্য

রনি এর ছবি

অনুবাদ বেশ ঝরঝরে।

অতিথি লেখক এর ছবি

পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। অনুবাদ সহজ রাখাটাই আমার প্রধান বিবেচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে একটি।

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী।

নৈ ছৈ এর ছবি

অনুবাদ ভাল লাগলো। পরের পর্বের অপেক্ষায় আছি

অতিথি লেখক এর ছবি

সময় নিয়ে পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। পরবর্তী কিস্তি আসছে।

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী

সোহেল ইমাম এর ছবি

অনেক দিন ধরেই দেখছি সময়ের অভাবে পড়া হয়ে উঠছিলোনা। আজ একরকম জেদ করেই প্রথম আর দ্বিতীয় দু’টো পর্বই পড়ে ফেললাম। অদ্ভুত ভালো লাগলো। বলতে ইচ্ছে করছে চালিয়ে যান, কিন্তু সিরিজ লেখার একটা কুখ্যাতি এই যে, অনেকেই মাঝ রাস্তায় পাঠককে রেখে সরে পড়েন কিংবা অন্য গল্প বলতে শুরু করেন। লেখা চলুক, অনেকদিন হয় সোলঝেনিতসিনের বই গুলো পিডিফ আকারে ল্যাপটপে পড়েই আছে পড়ার সময় পাচ্ছিনা, আপনার জন্য পড়া হয়ে যাচ্ছে একারণে কৃতজ্ঞতা। চলুক

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

অতিথি লেখক এর ছবি

সময় নিয়ে পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। ৩য় পর্ব পোস্ট করেছি। চোখে পরেছে কিনা জানি না। আরো এক পর্ব আপলোড করার মত রসদ হাতে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি নিজেও বইটা পড়ছি আর সমান্তরাল ভাবে অনুবাদ করছি। শেষে কি আছে নিজেও জানি না। আশা করি পড়া শেষ হলে সেই সাথে অনুবাদের কাজও শেষ হবে, যদি কোন দৈব বিপর্যয় না ঘটে। এভাবে কাজ করেই মজা পাচ্ছি। ভুলত্রুটি আছে অনেক। সেগুলো ধরিয়ে দিলে উপকৃত হব।

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী

অতিথি লেখক এর ছবি

পরে ভালো লাগলো । ধন্যবাদ আপনাকে । পরের পর্বের লিংক টা পাচ্ছি না ।

অতিথি লেখক এর ছবি

পড়ার জন্য এবং মন্তব্যের মাধ্যমে উৎসাহিত করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। পর্ব-৩ তো "নীড়পাতার" প্রথমেই আছে কয়েকদিন ধরেই। যাইহোক লিঙ্ক দিয়ে দিলাম। পর্ব-৩ : http://www.sachalayatan.com/guest_writer/56431। পড়ে মন্তব্য করলে কৃতজ্ঞ থাকব।

-ইকরাম ফরিদ চৌধুরী

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
Image CAPTCHA